সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শ্রমজীবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আতঙ্ক কেন?
সাত্যকি রায়
একমাত্র যে ক্ষেত্রে মালিক অন্য উৎপাদকের চেয়ে খরচ কমাতে পারে, তা হল, তার দ্বারা নিযুক্ত শ্রম বাবদ খরচ। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শ্রমিকের মজুরি উন্নত দেশগুলির তুলনায় কম হওয়ার কারণে এই সব দেশের উৎপাদকেরা প্রতিযোগিতায় প্রচুর সুবিধা পাবে বলে মনে করে একে অপরকে টেক্কা দিতে চাইছে। শ্রমিকের অর্জিত অধিকারগুলি খর্ব করে শ্রম-খরচ কমানোর জন্য নয়া উদারবাদী যুগে রাষ্ট্র ময়দানে অবতীর্ণ। এবং এ ব্যাপারে গত চার দশকের সংস্কার পর্বে এক অদ্ভুত সামাজিক ও রাজনৈতিক সহমত গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে যে - শ্রমিকশ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই উন্নয়ন-বিরোধী, এবং দেশের সামগ্রিক কল্যাণ-বিরোধী, কোনো মতেই একে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়, এবং তাকে যথাসম্ভব অপ্রয়োজনীয় হিসাবে দেখানো দরকার, অথবা জনমানসে কার্য্যত অদৃশ্য করে দিতে হবে। এটা ভুলিয়ে দেওয়া হয় যে, প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র শ্রম খরচের উপর নির্ভর করে না।

একটি প্রবণতা বর্তমান সময়ে বিশেষ লক্ষণীয়, সেটা হল - এই যে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে পরিচিতির রাজনীতি সম্পর্কে একটা আলতো সহানুভুতি যদিও বা দেখা যায়, কিন্তু ‘শ্রমজীবী’ এই পরিচিতিতে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই- এ যেন একেবারেই গর্হিত ব্যাপার!
বিভিন্ন মানুষকে অনেক ক্ষেত্রেই নানাবিধ পরিচিতিভিত্তিক নিপীড়ন ও অবমাননার সম্মুখীন হতে হয়। এবং সেগুলির বিরুদ্ধে লড়াই সামগ্রিক সমতা প্রতিষ্ঠার গণতান্ত্রিক বোধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। কিন্তু, প্রশ্ন হল আলাদা করে শ্রেণিভিত্তিক সংহতি ও প্রতিরোধ নির্মাণের প্রচেষ্টাকে একান্তই সেকেলে অথবা উন্নয়ন-বিরোধী হিসেবে দেখার প্রেক্ষাপটটি আসলে কী? সোজাভাবে বললে, এ নিয়ে আপত্তির প্রধান কারণ হল এই ধরণের সংগ্রাম ও অধিকার প্রতিষ্ঠা শ্রমিক বাবদ মালিকের খরচ বাড়িয়ে দেয়। এবং নয়া উদারবাদী দুনিয়ায় এর চাইতে বড় অপরাধ আর কী-ই বা হতে পারে! এই বর্ধিত উৎপাদন-খরচ উৎপাদককে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দেবে। সরল যুক্তিটা এরকম যে, কাঁচামাল বা পরিকাঠামো এসবের খরচ ব্যক্তি মালিকের হাতে নেই। তাকে এগুলি বাজার থেকে কিনতে হয়, এবং সেসব খরচ কোনো একজন উৎপাদকের পক্ষে কমানো কঠিন।
একমাত্র যে ক্ষেত্রে মালিক অন্য উৎপাদকের চেয়ে খরচ কমাতে পারে, তা হল, তার দ্বারা নিযুক্ত শ্রম বাবদ খরচ। উন্নয়নশীল দেশগুলিতে শ্রমিকের মজুরি উন্নত দেশগুলির তুলনায় কম হওয়ার কারণে এই সব দেশের উৎপাদকেরা প্রতিযোগিতায় প্রচুর সুবিধা পাবে বলে মনে করে একে অপরকে টেক্কা দিতে চাইছে। শ্রমিকের অর্জিত অধিকারগুলি খর্ব করে শ্রম-খরচ কমানোর জন্য নয়া উদারবাদী যুগে রাষ্ট্র ময়দানে অবতীর্ণ। এবং এ ব্যাপারে গত চার দশকের সংস্কার পর্বে এক অদ্ভুত সামাজিক ও রাজনৈতিক সহমত গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে যে - শ্রমিকশ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই উন্নয়ন-বিরোধী, এবং দেশের সামগ্রিক কল্যাণ-বিরোধী, কোনো মতেই একে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয়, এবং তাকে যথাসম্ভব অপ্রয়োজনীয় হিসাবে দেখানো দরকার, অথবা জনমানসে কার্য্যত অদৃশ্য করে দিতে হবে। এটা ভুলিয়ে দেওয়া হয় যে, প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র শ্রম খরচের উপর নির্ভর করে না।
প্রসঙ্গত, দেখা যাবে চীনের মজুরির হার ভারতে হারের চেয়ে দ্বিগুণ হলেও পৃথিবীর প্রায় ২৫ ভাগ শিল্প-উৎপাদন চীনের অধিকারে। আর ভারতের মজুরি হার কম হলেও ভারত পৃথিবীর মাত্র ২.৪ শতাংশ শিল্প-উৎপাদনের অধিকারী। আসলে প্রতিযোগিতা শ্রমের উৎপাদনশীলতার উপরও নির্ভর করে। যদি শ্রমের উৎপাদনশীলতা মজুরি বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পায়, তবে মজুরি বাড়লেও একক শ্রম খরচ কমে যায়।
কিন্ত আরেকটা বিষয়ও পাশাপাশি লক্ষণীয়। দেশের অধিকাংশ রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকার শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে নেতিবাচক মানসিকতা দেখালেও তারা এমন অনেক ক্ষুদ্র জনকল্যাণ প্রকল্প চালু করেছে যেগুলি গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের সাময়িক কিছুটা সুরাহা এনে দিচ্ছে। কোথাও বিনামূল্যে চাল বা গম, কোথাও ছাত্রদের জন্য বইখাতা, মহিলাদের জন্য মাসিক কিছু ভাতা, সাইকেল, কোনো রাজ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা, আবার কোথাও পড়ুয়াদের জন্য ল্যাপটপ বা ট্যাবলেট ইত্যাদি। এগুলি নিঃসন্দেহে প্রাপকদের সমস্যার কিছু সুরাহা তো করছেই, এবং এগুলি প্রসারিত হলে আরো ভাল। এই সব প্রকল্পের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, এদের অধিকাংশই যে কোনো নাগরিকের জন্য প্রযোজ্য। সে কাজ করুক বা না করুক। অর্থাৎ এই সুবিধাগুলির সাথে সুবিধাপ্রাপকের আয় গুরুত্বপূর্ণ হলেও সে কাজ করে কি করে না, তাতে কিছু এসে যায় না। এগুলি গরিব মানুষের নাগরিক পরিচিতির বিভিন্ন অংশের সাপেক্ষে তৈরি, তাদের শ্রমিক পরিচিতির ভিত্তিতে নয়।
কিন্তু সত্তরের দশকের আগে পৃথিবীতে জনকল্যাণের ব্যবস্থাপনাটা অন্যরকম ছিল। যেমন অধিকাংশ জনকল্যাণের অধিকার ছিল সর্বজনীন। সবার জন্য বিনা পয়সায় শিক্ষা অথবা স্বাস্থ্য পরিষেবা, অথবা কর্মরত শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি অথবা উন্নত দেশে ‘ফেয়ার ওয়েজ’ ইত্যাদির ধারণা পুঁজিবাদ এনেছিল - সমাজতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ কমাতে এবং একই সাথে পুঁজিবাদে উৎপাদন, ও ভোগব্যয়ের একটা সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে, যা তার সংকটকে কিছুটা প্রশমিত করতে সাহায্য করবে। নয়া উদারবাদের যুগে এই জনকল্যাণের ধারণাটি বদলে গেল। সর্বজনীন জনকল্যাণের পরিবর্তে খণ্ডিত জনকল্যাণের ধারণা জায়গা পেল। সবার জন্য নয়, সমাজের কোনো অংশের জন্য বিশেষ কিছু। আর এই বিশেষ প্রাপ্তি ক্ষমতাসীন দলগুলিকে জনসমর্থন ধরে রাখায় বাড়তি সুবিধা দিল। সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবস্থা অপ্রাপ্তির যন্ত্রণাকেও খণ্ডিত করতে সক্ষম হল। আমি কোনো একটা কিছু পেয়েছি, অন্যটা পাইনি আবার তৃতীয়টা পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এই রকম ভাবনা অপ্রাপ্তির ক্ষোভকে খণ্ডিত করে।
কিন্ত সেভাবে দেখলে এই সুবিধার প্রাপক তো বিভিন্ন ক্ষেত্রে আসলে কর্মরত মানুষেরাই। আমাদের মত দেশে অল্প কিছু ধনী ব্যতিরেকে সবাইকেই শ্রম বিক্রি করেই বাঁচতে হয়। ফলে বৃহত্তর জনগণ বা নাগরিক আর শ্রমজীবীদের মধ্যে কার্যত বিরাট ফারাক তো কিছু নেই। কিন্তু আসলে এই ব্যবস্থাপনা পুঁজিপতিদের সাহায্য করছে নানাভাবে।
প্রথমত, শ্রমজীবীদের জীবনধারণের প্রয়োজনীয় আয় তাদের মজুরি থেকে আসার কথা। অর্থাৎ তার ও তার পরিবারের বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজনীয়, সেসব তার প্রাপ্য/ প্রাপ্ত মজুরির মেটাতে পারা উচিত। জনকল্যাণের প্রকল্পগুলি “কাজ” থেকে বিযুক্ত হওয়ার অর্থ হল, ওই ধরণের প্রকল্পের খরচ আসবে সরকারি কোষাগার থেকে। সরকার এই বর্ধিত খরচ কর্পোরেটদের উপর বাড়তি কর বসিয়ে রোজগার করছে তা নয়, বরং কর্পোরেট কর তো ক্রমাগত কমানো হয়েছে। সরকারি আয়ে যেমন প্রত্যক্ষ কর আছে, যা বেশি আয়ের লোকেদের থেকে আদায় করা হয়, সেরকম পরোক্ষ করের অংশও রয়েছে, যার মধ্যে গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষদের দেওয়া করও আছে। অতএব জনকল্যাণ বাবদ খরচে গরিব নিম্নবিত্ত শ্রমজীবী মানুষদের অর্থ ও রয়েছে। অতএব এক অর্থে এই প্রকল্পগুলি নিয়োগকারী পুঁজিপতিদের কিছুটা দায়িত্ব লাঘব করে সমাজের সব অংশের মানুষের উপর এই দায়িত্ব স্থানান্তরিত করছে।
দ্বিতীয়ত, এই ধরণের প্রকল্পগুলির রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ে ও ক্ষোভ বিক্ষিপ্ত করতে বিশেষ সুবিধা করে থাকে। মানুষ সরকারের সঙ্গে এককভাবে নেগোশিয়েট করার সুযোগ পাচ্ছে বলে মনে করে থাকে, যা একই ধরণের বঞ্চনাজনিত সংহতির চেতনাকেও দুর্বল করে।
তৃতীয়ত, এই ধরনের প্রকল্প বাবদ প্রাপ্ত সুবিধাগুলি গরিব নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনে কিছু সুরাহা এনে দিলেও এগুলির মাত্রা প্রসারিত করার অধিকারের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। এর প্রধান কারণ হল এগুলিকে দেখা হয় সরকারের দান হিসেবে, যা উৎপাদনে অংশগ্রহণের বিনিময় অর্জিত নয়। কোনো কিছু আয়, যা কাজের বিনিময় অর্জিত নয় তার অধিকারের স্বীকৃতি ও প্রসার তুলনামূলকভাবে কঠিন। এই অধিকারের ভিত্তি সেক্ষেত্রে কাজের সমমূল্যের পারিশ্রমিক নয় বরং মানুষ হিসেবে বাঁচার সর্বজনীন অধিকার যা নৈতিকতা বা ন্যায্যতার ধারণা সম্বলিত হতে হবে। এই বৃহত্তর নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও প্রসারিত করার লড়াই কাজের সঙ্গে যুক্ত অধিকারগুলিকে সুরক্ষিত করা ও প্রসারিত করা ব্যতিরেকে অসম্ভব।
একারণেই কাজের সঙ্গে সমস্ত অধিকারগুলিকে শাসক শ্রেণি খর্ব করতে চায়, যাতে প্রয়োজনভিত্তিক প্রকল্পের পরিসরটাও সর্বদা সীমিত থাকে। ঠিক এই কারণেই দেশের সমস্ত ধরনের শ্রমিকদের জন্য প্রযোজ্য জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হার রাষ্ট্রের মদতে অত্যন্ত কম রাখা হয়। আমাদের দেশের জন্য ২০১৯ সালে আই এল ও একটি হিসাব করে দেখায় যে ন্যূনতম মজুরি মাসে চোদ্দ থেকে পনেরো হাজার টাকা হওয়া উচিত, যা সরকার মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় বেঁধে দিয়েছে। অর্থাৎ পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের অবাধ শোষণের সুযোগ পাবে, তাদের জন্য কর্পোরেট করও কমানো হয়েছে বছর বছর এবং তাদের অধীনে কর্মরত মানুষদের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর দায়ও কিছুটা সরকারের উপর চালান করা হয়েছে। একটি কম-মজুরি-কম-কর এই নয়া উদারবাদী ব্যবস্থাপনায় কাজ সম্পর্কিত সমস্ত অধিকারগুলিকে খর্ব করে পুঁজিবাদ আসলে মোট সৃষ্ট মূল্যে শ্রমজীবী মানুষের অংশ দীর্ঘমেয়াদী কায়দায় কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করছে।
এই কারণেই অনেক আলোচনা গরিবদের সম্পর্কে সহানুভূতিশীল বলে মনে হলেও, শ্রমিকদের অধিকারের প্রশ্নে যেন অদ্ভুতভাবে আতঙ্কিত। বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত শ্রমজীবী মানুষ তার প্রতিদিনের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে শোষণের যন্ত্রণা অনুভব করে থাকে। প্রথমে সে ব্যক্তিগত স্তরে সেই যন্ত্রণা লাঘব করার চেষ্টা করে। কিন্তু ক্রমাগত সে বুঝতে পারে লড়াইটা তার একার নয়। সে বন্ধু খুঁজে পায়। আর চিনতে পারে তার সাধারণ শত্রু এবং শত্রুর বন্ধুদেরকেও। এটাই শ্রেণিচেতনা, যা কোনো শ্রমিক জন্মগতভাবে অর্জন করে তা নয়, বা হঠাৎ কোনো মুহূর্তে এই চেতনা আবির্ভূত হয়, তা নয়। এই প্রক্রিয়া চলমান সংগ্রামের পথ। পুঁজির পরিবর্তনশীল শোষণের কায়দাগুলিকে পর্যুদস্ত করতে করতেই তা এগোতে থাকে। এই লড়াইয়েরও বিভিন্ন পর্যায়ে শ্রমজীবীদের কোন অংশ সামনে এগিয়ে আসবে বা কারা একটি পর্যায়ে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে - তা পূর্বনির্ধারিত নয়। আবার লড়াইয়ের নানা পর্যায়ে নতুন বন্ধুর পরিসর যেমন তৈরি হয়ে থাকে, অনেক অদেখা শত্রুকেও নতুন করে চেনা যায়। কিন্তু এই সব কিছুর মধ্যে দিয়েই শ্রমজীবী মানুষ তার বেঁচে থাকার লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
সেকারণেই মানব সভ্যতার ইতিহাস একপেশে পুঁজির শোষণের ইতিহাস নয়, তা শ্রেণি সংগ্রামের ইতিহাস।
প্রকাশের তারিখ: ০২-এপ্রিল-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
