সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
লড়াইয়ের কবি, জীবনের কবি
ছন্দম চক্রবর্তী
সেই সময়টা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অস্থির ও রক্তাক্ত এক পর্ব। বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে শেষমেশ প্রাণান্তকর হয়ে ওঠে উপনিবেশের শাসন। মন্বন্তর ও উপর্যুপুরি দাঙ্গায় সাধারণ মানুষের তখন বেঁচে থাকাই দায়। কলকাতার এক নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে-ওঠা সুকান্তের জীবনও এই আর্থ-সামাজিক অনিশ্চয়তায় অস্থির। অথচ তার সামনে রয়েছে এক নবীন রাজনৈতিক আদর্শ, যা শুধু ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের কথাই বলে না, শ্রেণি-শোষণ থেকে মুক্তিরও স্বপ্ন দেখায়।

সুকান্ত যেন এক শাপগ্রস্ত কবি, স্মিত হাসি নিয়ে তারুণ্যের দোরগোড়ায় যিনি চিরকালের মতো স্থির হয়ে আছেন। স্পর্ধিত তারুণ্যের সেই স্বর্গ থেকে তাঁর মুক্তি নেই। আজও, আমরা যখন তাঁর কবিতার কাছে ফিরি, তখন দেখি বদলে যাওয়া পৃথিবীর জন্যে জরুরি কিছু কথা সেখানে সঞ্চিত হয়ে আছে। প্রশ্ন হল কারা শুনতে পাবেন তাঁর কথা, কারা পড়তে পারবেন তাঁর কবিতার অক্ষর। না, সুকান্তের কবিতা দুর্বোধ্য ভাষায় রচিত নয়। গুপ্ত ভাষাতেও মুদ্রিত নয়, যে ভাষা উদ্ধারের জন্য তালিম দরকার। বরং তাঁর সমস্ত কবিতার ভাষাই দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। অস্পষ্ট করে তুলবার সাধনা তাঁর ছিল না। ১৯৪৬-এর ধর্মঘট ও নৌবিদ্রোহের খবর পেয়ে তাই তিনি লিখতে পারলেন—
‘বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে,
আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে,
এতো বিদ্রোহ কখনো দেখেনি কেউ,
দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ;
স্বপ্নচূড়ার থেকে নেমে এসো সব–
শুনেছ? শুনছ উদ্দাম কলরব?
নয়া ইতিহাস লিখছে ধর্মঘট,
রক্তে রক্তে আঁকা প্রচ্ছদপট’ (অনুভব: ১৯৪৬)
বিদ্রোহের খবর দিচ্ছেন কবি। যেন চিৎকার করে দিচ্ছেন। যাকে দিচ্ছেন, ‘শুনেছ? শুনছ...?’ বলে যেন তার কলার খামচে ধরে উত্তেজনায় আর উল্লাসে খবরটা দিচ্ছেন। সরল কলাবৃত্তের ছয়-ছয়-দুই মাত্রার চালে, বিশেষত প্রথম ছয় মাত্রার পরে তৈরি ধাক্কায় ওই উল্লাস আর উত্তেজনা স্পষ্ট হয়। পঙ্ক্তিগুলো কবিতা হয়ে ওঠে।
আসলে কবি আর কবিতার মধ্যে দূরত্বের যে তত্ত্ব আমরা নন্দনতত্ত্বের ক্লাশে শিখি— ‘ইমোশাসন্ রিকলেকটেড ইন ট্র্যাঙ্কুইলিটি’ বলে যে পাঠ রোমান্টিক কাব্যতত্ত্বের কাছে পাই, সবকিছু তুড়ি মেরে উড়িয়ে রাজনৈতিক কর্মী সুকান্ত তাঁর কবিতার মুঠিকে কিছুতেই শিথিল করেন না। রাজনীতির কাজেকম্মে তাঁর গায়ে যে ঘামের গন্ধ তা কবিতায় লেগে যেতে পারে, একথা ভেবেও মুঠি শিথিল করেন না। বরং রাজনীতির জন্যেই কবিতা অথবা আরেকটু স্পষ্টভাবে বললে, কবিতাই রাজনীতি— এ-বিশ্বাসকে আরও জোরের সঙ্গে জাপটে ধরেন। তাই তাঁকে স্পষ্ট হতে হয়। তাঁর রাজনীতির মতোই স্পষ্ট হতে হয় তাঁর কবিতাকে। এমনকী যখন আবেগের গভীরতায় কবিতার ভাষা ঈষৎ বেঁকে যায়, তৈরি হয় ইমেজ, এমনকী তখনও স্পষ্টতার সঙ্গে আপস করে না কবি—
‘দু চোখে আমার বিচ্ছুরিত মাঠের আগুন,
নিঃশব্দে বিস্তীর্ণ ক্ষেতে তরঙ্গিত প্রাণের জোয়ার
মৌসুমি হাওয়ায় আসে জীবনের ডাক
শহরের চুল্লী ঘিরে পতঙ্গের কানে’ (ফসলের ডাক: ১৩৫১)
মন্বন্তরের পর পাকা ফসল উপোসী জনতার চৈতন্যে একই সঙ্গে ‘সোনালী সমুদ্র’ এবং ‘মাঠের আগুন’ হয়ে ওঠে। সেই সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ার আকাঙ্ক্ষায় ধ্রুবপদের মতো ফিরে-ফিরে আসে এই পঙ্ক্তি—‘কাস্তে দাও আমার হাতে’।
কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী সুকান্তের রাজনীতিই তাঁর কবিতার ভরকেন্দ্র। সেই রাজনীতি যা শ্রেণি-শোষণের ষড়যন্ত্রকে ধরিয়ে দেয়, শোষণমুক্তির লক্ষ্যে শ্রেণিসংগ্রাম চালিয়ে যায়। মনে রাখা প্রয়োজন গত শতকের তিন ও চারের দশকে যখন কবিতা লিখছেন সুকান্ত, সেই সময়টা ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অস্থির ও রক্তাক্ত এক পর্ব। বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতে শেষমেশ প্রাণান্তকর হয়ে ওঠে উপনিবেশের শাসন। মন্বন্তর ও উপর্যুপুরি দাঙ্গায় সাধারণ মানুষের তখন বেঁচে থাকাই দায়। কলকাতার এক নিম্নবিত্ত পরিবারে বেড়ে-ওঠা সুকান্তের জীবনও এই আর্থ-সামাজিক অনিশ্চয়তায় অস্থির। অথচ তার সামনে রয়েছে এক নবীন রাজনৈতিক আদর্শ, যা শুধু ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের কথাই বলে না, শ্রেণি-শোষণ থেকে মুক্তিরও স্বপ্ন দেখায়। এই অনিশ্চয়তা এবং স্বপ্ন— দুই-ই সুকান্তের নিজের জীবন থেকে পাওয়া। আমরা দেখি সুকান্তের কবিতার অঙ্গীরস শাসকের প্রতি ঘৃণা, লড়াইয়ের প্রত্যয় এবং মুক্তির স্বপ্ন—
‘ঘরে তোল ধান, বিপ্লবী প্রাণ, প্রস্তুত রাখ কাস্তে,
গাও সারিগান, হাতিয়ারে শান দাও আজ উদয়াস্তে।
আজ দৃঢ় দাঁতে পুঞ্জিত হাতে প্রতিরোধ কর শক্ত,
প্রতি ঘাসে ঘাসে বিদ্যুৎ আসে জাগে সাড়া অব্যক্ত’ (উদ্যোগ)
আসলে সুকান্তের কবিতাকে তাঁর জীবন থেকে আলাদা করা যায় না। জীবনের প্রত্যয়ভূমিতেই গড়ে ওঠে তাঁর কবিতা। ফলে রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁর কবিতাকে বোঝা যায় না।
আমাদের নিশ্চয়ই মনে পড়বে, কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী, সুকান্তের অগ্রজ কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কয়েকটি লাইন—
‘শত্রুপক্ষ যদি আচমকা ছোঁড়ে কামান–
বলবো, বৎস! সভ্যতা যেন থাকে বজায়।
চোখ বুজে কোনো কোকিলের দিকে ফেরাবো কান’ (প্রস্তাব)
কোকিলের দিকে ফেরানো কানে সুকান্তের কবিতা চিরকাল বেসুরো শোনায়, শোনাবেও। কিন্তু সুকান্ত তার কবিতা কাদের শোনাতে চেয়েছিলেন? সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জবানিতে জানা যায় সুকান্তের প্রত্যাশা: ‘আমার কবিতা পড়ে পার্টির কর্মীরা যদি খুশি হয় তাহলেই আমি খুশি— কেননা এই দলবলই বাড়তে বাড়তে একদিন এ-দেশের অধিকাংশ হবে।’ শ্রমিক শ্রেণির পার্টির কর্মী মানে তো শ্রমিক-কৃষক-মেহনতি জনতা। সুকান্ত তাঁদের কবি হতে চেয়েছিলেন। পেরেওছিলেন। তাঁর কবিতার লাইন পার্টির সীমানা পেরিয়ে স্লোগানের মতো সাধারণ মানুষের ঠোঁট স্পর্শ করে আছে। শ্লোগান নিয়ে ‘পরিশীলিত’ পাঠকের আপত্তি থাকতে পারে। কবিতাকে স্লোগানের সীমানায় পৌঁছে দিলে যে মান্য নন্দনতত্ত্বে অন্তর্ঘাত ঘটে সে-কথা বলা বাহল্য। সুকান্ত তা করতে পারেন। কবিতায় থেকেও তিনি কবিতার যুগসঞ্চিত লালিত্যকে বাতিল করতে পারেন। অনায়াসে বলতে পারেন—
‘প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা–
কবিতা তোমায় আজকে দিলাম ছুটি
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়:
পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝল্সানো রুটি’ (হে মহাজীবন)
গত শতাব্দীর চার থেকে সাতের দশকের মধ্যে আবিশ্ব বহু কবির রচনাতে অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম। এই প্রসঙ্গে পাবলো নেরুদা, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, মিগেল এরনানদেজ, নাজিম হিকমতের মতো বহু নাম আমাদের মনে আসবে। নানা দেশের নানা ভাষার এই কবিদের মধ্যে একটাই মিল। তাঁরা শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াইকে মহিমান্বিত করেছেন। অনেকেই শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজনৈতিক সংগ্রামে সঙ্গী করেছেন কবিতাকে। শাসকের হাতে অত্যাচারিত হয়েছেন, মারাও গেছেন। এরকমই একজন কবি চিলির পাবলো নেরুদা। ১৯৭১ সালে নোবেল পুরস্কার পান বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্টভাবে যুক্ত এই কবি। তাঁর নোবেল ভাষণটি নানা কারণে উল্লেখযোগ্য। সেখানে এক জায়গায় লিখছেন তিনি—‘সুদূর লাতিন আমেরিকার কবি আমরা। অবিচার, ক্লেশ, যন্ত্রণা আর শূন্যতায় ভরা এক অজ্ঞাত ভূখণ্ডের কবি। আমাদের লেখাগুলি তাই রক্তেমাংসে সেই শূন্যতাকে পূরণ করার চেষ্টা। মৃত শহরের পাথরের মূর্তির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন স্বপ্নগুলোকে আবার জাগিয়ে তুলব আমরা। জাগিয়ে তুলব অরণ্যের নৈঃশব্দ্যে, নদীর কোলাহলে লুকিয়ে থাকা স্বপ্নদের ...বহু সৌভাগ্য-দুর্ভাগ্য, জয়-পরাজয় আমি দেখেছি। লাতিন আমেরিকার সংগ্রামের পথ চলতে চলতে অনুভব করেছি সম্মিলিত মানবজীবনের রক্ত, আত্মা, ব্যথা আর স্বপ্নের অংশীদার হতে হবে আমাকে। এই জনস্রোত থেকেই কবি পেতে পারে অভিনবত্ব, দেশ পেতে পারে পরিবর্তন।’ নেরুদার কবিতায় প্রেম ও সংগ্রাম হাত-ধরাধরি করে এসেছে। এ-কথা বললাম এই কারণে যে, সুকান্তের কবিতায় প্রেমের অনুষঙ্গ তেমনটা নেই। প্রিয়ার উল্লেখ একাধিকবার থাকলেও প্রেমজনিত আনন্দ-বেদনা, যা নাকি একান্ত ব্যক্তিগত, তা সুকান্তের কবিতায় ধরা পড়েনি। অথচ তাঁর অনতি-তরুণ জীবনে প্রেম কী চাপা ঝড় তুলেছিল তার সাক্ষ্য আছে সুকান্তের চিঠিপত্রে। কিন্তু কবিতায় সেই হৃদয়াবেগের কোনও তর্জমা ঘটেনি। প্রসঙ্গত, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কাব্যগ্রন্থ পদাতিক সম্পর্কে আলোচনায় বুদ্ধদেব বসু খেয়াল করেছিলেন ইদানিং বাঙালি ছেলেরা বয়ঃসন্ধি সময়েও প্রেমের কবিতা লিখছে না। যা দশ বছর আগেও কল্পনা করা যেত না। বুদ্ধদেব লেখেন, ‘এতে বোঝা যায় যে সময় বদলাচ্ছে’। সুকান্তের জীবন দীর্ঘ হলে তিনি নিশ্চয়ই প্রেমের কবিতা লিখতেন— লিখতেন যে, তার প্রমাণ তাঁর স্বল্পপরিচিত গানগুলো। ব্যক্তিগত অনুভবের প্রকাশ রয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ পূর্বাভাস-এর কোনও-কোনও কবিতায়। কবি সুকান্ত সময়ের সঙ্গে নিশ্চয়ই পাল্টাতেন নিজেকে। কিন্তু নেরুদার ভাষায় কবি হিসেবে ‘সম্মিলিত মানবজীবনের রক্ত, আত্মা, ব্যথা আর স্বপ্নের অংশীদার’ হওয়ার যে পথকে তিনি শিরোধার্য করেছিলেন, আমরা বিশ্বাস করি, তা থেকে কখনও বিচ্যুত হতেন না।
মৃত্যু সুকান্তের জীবনকে সংক্ষিপ্ত করেছে। কিন্তু সময়ের আক্রমণে তাঁর কবিতারা মরে যায়নি। বরং এই পুঁজিবাদী বিশ্বে স্বৈরাচার যখন শক্তিশালী হচ্ছে, আবিশ্ব মাথাচাড়া দিচ্ছে ফ্যাসিবাদী শক্তি, চতুর্দিকে যুদ্ধের দামামা, বিশ্বজুড়ে সাম্প্রদায়িক শক্তির দাপাদাপি, তখন তাঁর কবিতার শব্দে নতুনভাবে প্রাণ সঞ্চারিত হয়। সেই শব্দেরা আশ্চর্যভাবে ধারণ করে থাকে কোণঠাসা জনতার প্রাণের আবেগ। একই সঙ্গে জনতার প্রাণে ফুটিয়ে তোলে মুক্তির স্বপ্ন—
‘হে জীবন, হে যুগ-সন্ধিকালের চেতনা
আজকে শক্তি দাও, যুগ যুগ বাঞ্ছিত দুর্দমনীয় শক্তি,
প্রাণে আর মনে দাও শীতের শেষের
তুষার-গলানো উত্তাপ’ (বোধন)
প্রকাশের তারিখ: ১৬-আগস্ট-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
