Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

বাবার কিছু স্মৃতি

জেতা সাংকৃত্যায়ন
সভা মঞ্চে এক ৯৩ বছরের প্রবীণকে নিয়ে আসা হল। উনি ছিলেন বকাস্ত আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে সেনানীজী বলে ডাকছিলেন। ঘোষণা হল, তিনি আমাদের কৃষক আন্দোলনের গান গেয়ে শোনাবেন। ঋজু ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা অথচ তখনও শক্তিশালী কণ্ঠে তিনি গাইলেন বকস্ত আন্দোলনের সম্মেলক সংগীত। এক পরাবাস্তব মুহূর্ত। অতীতের রাতের স্মৃতি ছায়া, নিষ্প্রভ আলো এবং নানা অবয়বের মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠছিল। সবার শেষে, সংগঠকরা তখন সেই প্রবীণকে কথা শেষ করতে বলেন, তিনি চিৎকার করে ওঠেন ‘চলো!’ ‘চলো’…(এগিয়ে চলো!... এগিয়ে চলো!)
Rahul Sankrityayan 125th birth anniversary

রাহুল সাংকৃত্যায়ন-কে স্মরণ করা হয় এমন এক উচ্চস্তরের বুদ্ধিজীবী হিসেবে যিনি গ্রাম, পরিবার, বর্ণ বা জাতি-র প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে এক বিদগ্ধ দার্শনিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ও লেখক রূপে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। এ বছর তাঁর ১২৫ তম জন্মবার্ষিকী দেশের নানা অংশে শ্রদ্ধার সঙ্গে উদযাপিত হচ্ছে। 

১৮৯৩ সালের ৯ এপ্রিল আজমগড়-এ তাঁর জন্ম। ভোজপুরী ভাষার কেন্দ্রস্থল ছিল ওই আজমগড়। রাহুল সাংকৃত্যায়ন-এর প্রকৃত নাম কেদারনাথ পাণ্ডে। যে সচেতনতার পুনর্জাগরণের পথ ধরে ভারতের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল, চেতনার সেই পুনর্জাগরণের প্রক্রিয়ায় একজন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী হিসাবে তাঁর ভূমিকার কথাও স্মরণ করা হয়। দীর্ঘ সত্তর বছর ধরে এই দেশে নানা আঁকাবাঁকা পথে হেঁটেছে, এবং সেই দীর্ঘ পথচলায় তাঁর বক্তব্যগুলি ছিল ঠিক যেন আলোকবর্তিকার মতো।  গভীর বিভাজনের প্রয়াসে ফের যখন গোটা দেশ আলোড়িত, সেই পরিস্থিতিতে তাঁর জীবন ও স্মৃতি আমাদের প্রাণিত করে এবং এই আশা সঞ্চারিত করে যে সামনে উজ্জ্বল সময় আসছে। 

পঁচিশ বছর আগে রাহুল জন্মশতবর্ষের বছরে আমি বর্ধমান গিয়েছিলাম। সে বছরে গোটা বাংলা দেখেছিল এক নতুন ব্যস্ততা ও কর্মতৎপরতা। কলকাতায় রাহুল সাংকৃত্যায়ন জন্মশতবর্ষ কমিটি এক দীর্ঘ শ্রমসাধ্য কাজ হাতে নিয়েছিল। পাঁচ খণ্ডে রাহুলজি-র ‘মেরি জীবন যাত্রা’–র বাংলা অনুবাদ পুনঃপ্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিল শতবর্ষ কমিটি।  লক্ষ্য ছিল বাঙালি পাঠক যাতে রাহুল সাংকৃত্যায়ন-এর বৌদ্ধিক বিবর্তন ও জীবনের নানা পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে অবহিত হতে পারেন। ১৯৯৩ সালের ৯ এপ্রিল যখন তাঁর জন্মশতবর্ষ দেশের নানা শহরে উদ্‌যাপিত হচ্ছিল আমি তখন কলকাতায় ছিলাম। কারণ রাহুলজি কলকাতাকে তাঁর বৌদ্ধিক বাসস্থান বলেই মনে করতেন। 

পঁচিশ বছর পর ওই সব ঘটনাবলী ও সম্প্রসারিত স্মৃতি বাবার জীবনকেও অতিক্রম করে নিয়ে যাচ্ছে আমায়। 

জন্মশতবর্ষের এক সভা অনুষ্ঠিত হয় পশ্চিমাঞ্চল এলাকায়। কয়লাক্ষেত্রে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে বক্তব্য রাখেন কমরেড বিনয় চৌধুরি। সমবেত কয়লাখনির শ্রমিকরা অধিকাংশই ছিলেন হিন্দিভাষী। ঝাড়খণ্ড, বিহার ও বাংলার নানা প্রান্ত থেকে তাঁরা এসেছিলেন। কয়লা উত্তোলনে তাঁদের সমষ্টিগত শ্রমের প্রতি ঐক্যবদ্ধ মনোভাবই ছিল ওই সমাবেশের মূল বন্ধনশক্তি। আমার তখন মনে পড়ছিল শৈশবে তিন বছর বয়সে ১৯৫৮ সালে বাবার সঙ্গে চীনের কয়লাক্ষেত্রে যাওয়ার কথা। চীন তখন ক্রমশ এগিয়ে চলেছিল। সাধারণ সংগ্রামের নিরিখে ঐক্যবদ্ধ শত শত শ্রমিককে দেখা যে কোনও দেশের পক্ষেই অনুপ্রেরণাদায়ক। ওই বছর আমরা চীনের কৃষকদের কাছেও গিয়েছিলাম। চীনের নতুন কমিউনে কৃষিজীবী মানুষরা কোদাল, রাইফেল পাশে স্তূপীকৃত করে রেখে কাজ করেছিলেন। দানহুইয়াং, চীনের বিখ্যাত প্রাচীর, প্রাচীন সৌধ এবং শিল্পক্ষেত্রগুলিতে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়। কয়লাখনির কাছে শিল্পের অবস্থান আমরা দেখি। যাই সাংহাইয়ের মিল-এ যেখানে ছিল হাজার হাজার সুতো কাটার টাকু। ১৯৫৯ সালে আমরা ভারতে ফিরে আসি। রাহুলজি দুটি বই লেখেন ‘চিন কি কমিউন’ এবং ‘চিন মে কেয়া দেখা’। উদ্দেশ্য ছিল এশিয়ার অত্যন্ত প্রভাবশালী দেশ সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের মাধ্যমে কী অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করছে তা ভারতীয় পাঠকসমাজের সামনে উপস্থাপিত করা। বর্ধমানের শত শত কয়লা শ্রমিকের সমাবেশে ওই দিনের স্মৃতি ছিল অনুপ্রেরণার। পশ্চিমবঙ্গে যে নতুন প্রবাহ বয়ে চলেছিল তা নতুন ভারতকে এক দিশা দেখাচ্ছিল। 

এক বছর পর, ১৯৯৪ সালে আমি, আমার মায়ের সঙ্গে উত্তর বিহার-এ ছিলাম যা ছিল রাহুলজির কর্মভূমি। ভোজপুরী ভাষা অধ্যুষিত ছাপড়া-সিওয়ান অঞ্চলই ছিল রাহুলজির সাংগঠনিক কাজের ক্ষেত্র। প্রথমে পার্সা মঠের উদাসী সন্ন্যাসী, এরপর বিশ শতকের সূচনায় কংগ্রেস নেতা, তারও পরে ১৯৩০ এর দশকের শেষে বিহারে কৃষক উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনে খাকি পোশাক পরিহিত কৃষক সভার নেতা হিসেবে তাঁকে দেখা যায়। একবার গভীর রাতে মিশকালো অন্ধকারে আমরা একমা স্টেশনে এসে নামলাম। ট্রেনে আমরা প্রলেতারিয়েতের স্লিপার ক্লাসেই সফর করি। নেমে দেখি দূরে বাতানুকূল কামরার কাছে ফুলের মালা নিয়ে মানুষ জড়ো হয়েছেন। ওই সময় বিহারে চরম লোডশেডিং চলছিল। জলসেচ বিভাগের বাংলোয় গোটা রাত অন্ধকারেই কাটল। পরদিন সকালে আমরা সড়কপথে পার্সাগড়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এই মঠেই আমার বাবা তাঁর সন্ন্যাস জীবনের দিনগুলি কাটিয়েছিলেন মোহন্তজির উত্তরাধিকারী স্বামী রামোদরদাস হিসেবে। মঠে আমার ও আমার মায়ের জন্য বৈষ্ণব মধ্যাহ্ণভোজনের আয়োজন করা হয়। এরপর মঠের থেকে দূরে দীঘির প্রত্যন্ত পাড়ে ছিল এক জনসভা। ইটের তৈরি নানা নির্মাণ জানান দিচ্ছিল যে এটিই ছট উৎসবে সূর্য নমস্কারের স্থান। 

১৯৫৮ সালে ওই মঠে বাবার সঙ্গে যাওয়ার আরও কিছু স্মৃতি মনে থেকে গেছে। চারশো বছরের পুরোনো দেবালয়, পবিত্র বেদী কেন্দ্রে অবস্থিত। এর সঙ্গেই রয়েছে রেলিং দিয়ে ঘেরা ছোটো ছোটো থাম। একে ঘিরে আছে পাথরের আংশিক দেবতা, আংশিক মানব এবং দেবীমূর্তি যা জলাশয় খনন করে উত্থিত। গার্সা মঠের স্মৃতিচারণ করে রাহুলজি লিখেছিলেন, তাঁর উপর ন্যস্ত প্রধান কাজগুলির অন্যতম ছিল রোজ পাথরের মূর্তিগুলিকে স্নান করানো। সময় বাঁচাতে তিনি সব কটি মূর্তিকে একসঙ্গে জলভর্তি গামলায় রাখতেন। ব্যক্তিগত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে তিনি সময়ের সদ্ব্যবহার করতেন হিন্দি সাহিত্য পত্রিকা ‘সরস্বতী’ পাঠ করে। এরপর পার্সা থেকে পায়ে হেঁটে তিনি নবদ্বীপ, তারকেশ্বর যান। এরও পরে ওড়িশা ও তেলেঙ্গানা হয়ে তিরুমিশি-র দক্ষিণ বৈষ্ণব মঠে পৌঁছন।  সেখানে সংস্কৃত চর্চা ও অধ্যয়নের ভালো সুযোগ সুবিধা ছিল। সেখানে কিছুদিন থেকে মঠের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর তিনি তিরুমিশি ছেড়ে কর্ণাটকের কোদাগু (কুর্গ) হয়ে উত্তর ভারত ফিরে যান। এই সময়ই গোটা ভারতব্যাপী স্বাধীনতার নতুন সংগ্রাম সংগঠিত হচ্ছিল। আর্য সমাজ-এর আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি একদিন সারন-এর কংগ্রেস দপ্তরে চলে আসেন। এক সন্ন্যাসী হিসেবে তিনি অসহযোগ বা আইন অমান্য আন্দোলন-এর দিনগুলিতে কাজ করতে চান। এই সময়টা ছিল বৌদ্ধিক বিকাশের পর্ব। যে অঞ্চলে তিনি বৈষ্ণব সন্ন্যাসী হিসেবে কাজ করে গেছেন সেখানেই এক রাজনৈতিক নেতৃত্বরূপে তাঁর উত্থান ঘটল। কৃষকের সমস্যার সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয় তাঁকে চালিত করেছিল রুশ বিপ্লবের অনুপ্রেরণায় সমাজতান্ত্রিক সমাধানের পথে অগ্রসর হতে।

পার্সা-র জলাশয়ের কাছেই অনুষ্ঠিত ওই জনসভায় মঠের বর্তমান উত্তরাধিকারী এক তরুণ উদাসী সন্ন্যাসী আমাদের সঙ্গে ছিলেন। মঠের পক্ষ থেকে তিনিই বক্তব্য রাখেন। এই কর্মক্ষেত্র থেকে সূত্রপাত হওয়া রাহুলজির জীবন ও কাজ নিয়ে তরুণ সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বক্তব্য রাখলেন। ওই তরুণ স্বামীজির অন্তরের স্বরকে ধরে রাখার জন্য আমি তাঁর একটি ছবি তুলেছিলাম। তখন তিনি তাঁর পূর্বসূরি বা আমার বাবা জীবনে কত পথ পেরিয়ে এসেছিেলন সেই চিন্তায় মগ্ন ছিলেন। এই সেই মঠ, যেখানে একসময় আমার বাবা ছিলেন তরুণ সাধু রামোদরদাস, সেখান থেকেই বুদ্ধিজীবী রাহুল সাংকৃত্যায়ন –এর জন্ম হয়।

এরপর সারা দিন ধরে উত্তর বিহারের ধূলি ধূসরিত অবহেলিত সড়ক পথে আমরা আমওয়াড়ি গ্রামে পৌঁছই। ১৯৩৭ সালের কৃষকদের বকাস্ত বা উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনের এক প্রধান কেন্দ্র ছিল এই গ্রাম। অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। গরিব কৃষিজীবী মানুষরা দু-ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ধৈর্যসহ রাহুলজির পরিবারের সদস্য-সদস্যাদের আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। একদল সংস্কৃতি কর্মী তাঁদের বিনোদনের ব্যবস্থা করেছিলেন। জনসাধারণের সংগ্রাম ও তাঁদের টিক থাকার লড়াইয়ের গান গাওয়া হচ্ছিল। লোডশেডিং ধ্বস্ত বিহারে জমাট বাঁধা অন্ধকারের মাঝেও পেট্রোম্যাক্স–এর বাতি জ্বালিয়ে মঞ্চ তৈরি হল। বক্তারা বক্তৃতা শুরু করলেন, শ্রোতারা ধৈর্য ধরে শুনছিলেন।

আমি বলার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। ভাবছিলাম, কী বলা যেতে পারে। আমার তিন বছর বয়সেই আমি বাবার কাছ থেকে আমওয়াড়ির সংগ্রামের কাহিনি শুনেছিলাম। আখ-রোপণ করার জন্য মধ্যরাতে কৃষকদের সমবেত হওয়া, বন্যায় ফুঁসতে থাকা নদীর জল, জমিদারের লেঠেল বাহিনী এবং হাতির দল আখচাষিদের আখ-রোয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা ছিল। এই কৃষক সংগ্রামের নেতাকে হত্যা করার জন্য পূর্ব পরিকল্পিত ছক কষা হয়। মাহুতের হাতে থাকা ভারি লোহার লোহার অঙ্কুশ দিয়ে আমার বাবার মাথার পিছনে আঘাত করা হয়। এরপর চুরির অপবাদ ও অভিযোগে অনেক মাস জেলবন্দি করে রাখা হয়। কারণ জমিদার অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর সম্পদ হিসেবে বেড়ে ওঠা ফসল কৃষকরা লুঠ করার পরিকল্পনা করেছিল। 

সভামঞ্চের চারপাশে গোল হয়ে বসে থাকা শ্রোতৃমণ্ডলীকে ছাড়িয়ে জমাট বাঁধা নিকষ অন্ধকারে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম জমিদার কুঠির পাঁচিল। মনে হচ্ছিল চুনকাম করা, ভুতুড়ে অবয়ব। আমওয়াড়ি সংগ্রামের ৬৬ বছর পূর্তির কথা স্মরণে রেখে আমি বলতে শুরু করি। আমওয়াড়িতে এই ছিল  আমার প্রথম সফর যার কথা আমি বাবাকে বলতে শুনেছিলাম। ভারতের বামপন্থী কৃষক আন্দোলনের প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠার পর ৬৬ বছর অতিক্রান্ত।  আমি এক পরিবর্তিত চালচিত্র দেখার প্রত্যাশা করেছিলাম। পরিবর্তে দেখলাম অন্ধকার, কেরোসিন  বাতি, কনকনে ঠান্ডার রাতে কাঁপতে থাকা কৃষকদের ছায়ামূর্তি।

  গত এক সপ্তাহের মধ্যেই আমার এই স্মৃতি মনে পড়ছিল। আমার উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে আমি বেলাকোবা, জলপাইগুড়িতে এক গ্রামীণ সমীক্ষায় যাই। তিস্তা প্রকল্প থেকে জলসেচের খাল বাম শাসিত বাংলার কৃষিজ ভূপ্রকৃতির চেহারাতেই রূপান্তর ঘটিয়ে দিয়েছিল। বাংলায় যে পরিবর্তন আমি দেখেছি এবং বিহারে যে পরিবর্তনের অভাব রয়েছে তার মধ্যে তুলনা না-টেনে পারছি না। আমার পর বামপন্থী কর্মীরাও বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন। যদি ভূমি সংস্কার না-হয়, মঠ ও জমিদারির অধিকৃত হাজার হাজার একর জমি বিহারে ভূমিহীনদের মধ্যে বিিল করা না-হয়, তাহলে কোনও পরিবর্তনই হতে পারে না। 

সভা মঞ্চে এক ৯৩ বছরের প্রবীণকে নিয়ে আসা হল। উনি ছিলেন বকাস্ত আন্দোলনের অন্যতম যোদ্ধা। সবাই তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে সেনানীজি বলে ডাকছিলেন। ঘোষণা হল, তিনি আমাদের কৃষক আন্দোলনের গান গেয়ে শোনাবেন। ঋজু ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা অথচ তখনও জোরালো কণ্ঠে তিনি গাইলেন বকাস্ত আন্দোলনের সম্মেলক সংগীত। এক পরাবাস্তব মুহূর্ত। ছায়া, নিষ্প্রভ আলো এবং নানা অবয়বের মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে উঠছিল অতীতের রাতের স্মৃতি । সবার শেষে, সংগঠকরা যখন সেই প্রবীণকে কথা শেষ করতে বললেন, তিনি চিৎকার করে ওঠেন ‘চলো!’ ‘চলো’…(এগিয়ে চলো!... এগিয়ে চলো!) 

সিওয়ানের পথে রওনা হওয়ার জন্য অনেক দেরি হয়ে যাওয়ায় ওই রাতে নৈশযাপনের জন্য স্থানীয় এক কৃষক সভার কর্মীর বাড়িতে আমাদের আমন্ত্রণ করা হয়। পরদিন খুব ভোরে আমাদের নদীর তীরে নিয়ে যাওয়া হয়। সামনে পিছনে অনেকেই ছিলেন। আমার বাবাকে যেখানে হাতি আক্রমণ করেছিল সেই স্থানটি ওঁরা আবার দেখাতে চাইছিলেন। সেই কাকভোরে কুয়াশামাখা নদীর তীরে ঘুঁটে পোড়ার গন্ধ পেলাম। পিছনেই বড়ো বড়ো পাত্রে আখের রস ফুটিয়ে জাল দিয়ে গুড় তৈরি হচ্ছিল। যেতে যেতে আমাদের গ্লাসভর্তি টাটকা আখের রস খেতে দেওয়া হল। অবশেষে,  নদীর তীরে ডুব জলে পৌঁছে ওঁরা আমায় থামতে বললেন।  যিনি আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছিলেন তিনি তাঁর দলীয় কর্মীকে বললেন হাতি আক্রমণের জায়গাটি চিহ্নিত করে দেখাতে যাতে নদীর কাদায় পা দেবে গিয়ে আমার জুতো নষ্ট হয়ে না যায়।

আমার নড়াচড়া করা, কথা বলা বা চিন্তা করার ক্ষমতাই ছিল না। নদীর উঁচু পার থেকে আমি অনুভব করছিলাম আমার জুতো এবং পশ্চিমী পোশাক আমাকে একঘরে করে দিয়েছে। রাহুলজি, আমার বাবা ছিলেন জনসাধারণেরই একজন। সংগ্রামী কৃষকরা তাঁকে নিজেদেরই একজন বলে ভাবতেন। যেখানেই তিনি নেতৃত্ব দিতেন তাঁরা ওঁর  প্রতি বিশ্বাস রেখেই ওঁকে অনুসরণ করতেন। আজকের ভারতে সংগ্রামী গরিব মানুষ এমন একজন জননেতার অপেক্ষায় আছেন যিনি বলতে পারবেন 'চলো!' 'চলো!'। বর্তমান  কৃষি ও শিল্পক্ষেত্র, দুর্দশা ও নিদারুণ যন্ত্রণার মধ্যে, মাটি থেকে গণআন্দোলন পুনর্জাগরিত হওয়ার জন্য অপেক্ষমান।

তিন বছর বয়সে আমি চীনে এক কয়লাখনিতে যাই। আমার অনুরোধে ১৯৯৩ সালে রানিগঞ্জে এক কয়লাখনিতে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন ইস্টার্ন কোলফিল্ডস-এর সিটু নেতা কমরেড হারাধন রায়। শ্রমিকদের জুতো ও শক্ত টুপি পরে আমি যাই জামুরিয়ার এক কয়লা খনিতে। প্রায় এক কিলোমিটার নিকষ অন্ধকারে হেঁটে দেখা করি কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গে। মাটির নীচে অত্যন্ত বেশি উত্তাপ। হঠাৎ কোথা থেকে এক সতর্ক ঘণ্টা বাজতে লাগল এবং আমরা পিছিয়ে পাশের এক প্রকোষ্ঠে নিরাপদ দূরত্বে চলে গেলাম। মূল সুড়ঙ্গ পথে এক বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পেলাম। এরপরই সদ্য বিস্ফোরণে প্রাপ্ত কয়লা ভর্তি ওয়াগন গড়িয়ে গড়িয়ে চলে গেল। এর কিছুক্ষণ পর যখন আমি খনি থেকে বেরিয়ে আসি আমাকে বলা হলো দুজন কয়লা খনির শ্রমিক ধৈর্য নিয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। যখন আমার সঙ্গে তাঁদের দেখা হল তখন ওই দুই শ্রমিক নিজেদের পরিচয় দিয়ে বললেন, আমার বাবার পৈতৃক গ্রাম আজমগড় এর খুব কাছে অবস্থিত কানাইলা-র বাসিন্দা ওঁরা। আমি তাঁদের জিজ্ঞাসা করলাম রাহুলজি সম্পর্কে ওঁরা কোথাও কিছু লিখেছেন কিনা। ওঁরা জানালেন, লেখেননি। তবে ওঁরা বললেন, ওই বছর গোটা দেশব্যাপী রাহুলজির বিষয়ে যেসব  আলোচনার আয়োজন করা হয়েছিল সেগুলি থেকে অত্যন্ত অনুপ্রাণিত হয়েছেন। ওঁদের গ্রাম গোটা এখন দেশে এখন সুপরিচিত। ওঁরা গর্বিত যে ওঁদেরই একজন এতদূর উঠতে পেরেছেন।

অনুবাদ- পল্লব মুখোপাধ্যায়
‘কাটোয়ার কলম’ পত্রিকা থেকে পুনর্মুদ্রিত।


শিরোনাম মার্কসবাদী পথের

 


প্রকাশের তারিখ: ০৯-এপ্রিল-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

স্কুল জীবনের শেষের দিকে রাহুলজির "মানবসমাজ" পড়েই আমার মার্কসবাদ সম্বন্ধে আগ্রহ জন্মায় । তারপর তাঁর বেশিরভাগ বইই পড়ার চেষ্টা করেছি । আধুনিক ভারতে যে কয়জন সত্যিকারের "পণ্ডিত" জন্মেছেন, তিনি তারমধ্যে একজন । সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপদ সম্বন্ধে তাঁর 'মেরি জীবন যাত্রা'-য় ইঙ্গিত পাওয়া যায় । একবার তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে ভারতে ফিরছিলেন । কোনো এক সীমান্তের কাছে তাঁর অর্থের টানাটানি পড়ল । বাস ভাড়া নেই । এক চাকরিরত ইঞ্জিনিয়ারকে তিনি বললেন, আমার হাত ঘড়িটা বিক্রি করে বাস ভাড়া সংগ্রহ করতে চাই । ইঞ্জিনিয়ারের হাতঘড়ি নেই । তিনি পুরো দাম দিয়ে পুরনো ঘড়িটা কিনতে চাইলেন । রাহুলজি বললেন, "আমায় শুধু বাস ভাড়াটা দিয়ে ঘড়িটা আপনি রেখে দিন"। তাই হলো । সোভিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ে (লেনিন?) অধ্যাপনা করার সময় তিনি সেখানকার নানা ঘটনায় বিপদের গন্ধ পেয়েছিলেন । বর্তমান লেখাটিও খুব ভালো হয়েছে । রাহুলজি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানার জন্য আমি উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বর্তমান লেখক অধ্যাপক জেতা সাংকৃত্যায়ন এবং দিলখুসা স্ট্রিটে কমরেড মহাদেব শাও (সাহা)-র সঙ্গে দেখা করেছিলাম । এই লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সম্পাদককে অভিনন্দন জানাই ।
- dipak nag, ০৯-এপ্রিল-২০২৩


Jeta, I was your year mate and also hostel mate. I am a follower of your father.
- Dr Abhijit Bhattacharya , ০৯-এপ্রিল-২০২৩


অসাধারণ একটি লেখা রাহুল সাংকৃতাযনে র যথার্থ মূল্যায়ন আজো হয়নি। লেখাটি র বহুল প্রচার হোক পন্ডিত রাহুল জির জীবন কথা জানা খুব জরুরী।
- রণজিৎ কুমার মিত্র , ১০-এপ্রিল-২০২৩


খুব ভালো লাগলো পড়ে
- sibaji chatterjee, ২০-এপ্রিল-২০২৬


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৩ টি নিবন্ধ
০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫

১১-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৩-নভেম্বর-২০২৫