সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমরেশ বসু ও দেশের খোঁজ
অম্লান দেব
বিলডিহির দত্ত বোস মিত্তিররাও এদেশে এসেছেন। তাদের অসুবিধা হয়নি। সেখানে তাদের ছিল দোতলা বাড়ি এখানে হয়েছে চার তলা। তারা হলেন বড়ো বড়ো বাস্তুহারা মাতব্বর। দেশে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরাত এখন তাদের বাড়ির দরজায় মোটর গাড়ি। বলির পাঁঠা হয়েছে কেবল সুঁচাদরা সরকারি রিফিউজির তালিকায় যাদের নাম নেই। নাম থাকে না কোনোদিন। “মাঝে মাঝে সুঁচাদের মনে হয়, মানুষের বোকা হওয়ার একটা সময় আসে। সব মানুষের একসঙ্গে। তা না-হলে সব মানুষ একসঙ্গে ভাগাভাগি মানল কেমন করে। এমন কি হয় না সব মানুষ একসঙ্গে ভাগাভাগিটা তুলে দেবে। হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে।”

আমরা ভারতবর্ষকে খুঁজছি। আলোর ভারত-অন্ধকারের ভারত। বড়োলোকের ভারত-গরিবের ভারত। ধর্মের ভারত-নাস্তিকের ভারত। ব্রাহ্মণের ভারত-দলিতের ভারত। ১৫ তলা হাইরাইজের ভারত-ফুটপাতে বসানো সংসারের ভারত, ভারতবর্ষে কত রকম? ভারতবর্ষ কোন দিকে? ভালোবাসার ভারত-ঘৃণার ভারত। বিশ্বাসের ভারত-চক্রান্তের ভারত। শিল্পপতির ভারত-মজদুরের ভারত। মুনাফাখোর জোতদারের ভারত-১০০ দিনের কাজের ভারত। অসংখ্য ভারতবর্ষের গায়ে ধাক্কা খেতে খেতে গঞ্জ-গ্রাম, মহল্লা, পাড়া, হাইওয়ে, গলি পেরিয়ে আমরা এসে থমকেছি তিনটে দরজার সামনে। এই তিনটে দরজা তথা উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে আমরা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করব ভারতবর্ষের ভুলভুলাইয়াকে সমরেশ বসু নামের একটি লোক কীভাবে দেখছেন! দেশপ্রেমের গরজ যে ভারতবর্ষকে চেনালো আর দেশভাগের যন্ত্রণা যে ভারতবর্ষ দিল সে দুটো কি এক?
আমাদের আলোচনার তিনটি উপন্যাস সময়ের হিসেবে যথাক্রমে শ্রীমতী কাফে (১৩৬০ ব.), সুঁচাদের স্বদেশযাত্রা (১৯৬৯), খণ্ডিতা (১৯৮৭)। কিন্তু ভারতবর্ষকে খুঁজতে গিয়ে বিগত একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যে নাটকের মুখোমুখি আমাদের হতে হবে তার সুবিধার্থে আমরা এই ক্রমটাকে একটু পাল্টে নিয়েছি। ‘নাটক’ বলছি এ-কারণে কেন-না স্বয়ং সমরেশ বসুই (১৯২৪-৮৮) আমাদের ভাবনাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। শ্রীমতী কাফে-এর প্রথম সংস্করণে যে ভূমিকার মতো অংশ তিনি জুড়েছেন তাতে পাচ্ছি ‘শ্রীমতী কাফে’ যেন রঙ্গমঞ্চ। ক্ষেত্র বড়ো বিস্তৃত নয়। অথচ অনেক ঘটনা। সুতরাং ভারতবর্ষকে খোঁজার অভিযাত্রায় শ্রীমতী কাফে আমাদের রঙ্গমঞ্চ। যে-রঙ্গমঞ্চে ক্রম ভেঙে প্রথমে আবির্ভূত হবেন খণ্ডিতা, তারপর সুঁচাদের স্বদেশযাত্রা।
১৯২২ সালের বসন্তকালের শেষ দিকের এক ভ্যাপসা দুপুরে আপনাদের শ্রীমতি কাফে-এর রঙ্গমঞ্চে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি আমরা। একশো বছর আগের ভারতবর্ষ তখন ঝিমুচ্ছে। কোর্ট ঝিমুচ্ছে, রাস্তা ঝিমুচ্ছে, গাছ ঝিমুচ্ছে। ঝিমুনি সর্বত্র। সারাদেশে।
চৌরিচৌরার ঘটনার (১৯২২) পর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন গান্ধী (১৮৬৯-১৯৪৮)। আন্দোলনের তুঙ্গ অবস্থায় এরকম সিদ্ধান্ত অবসাদ এনে দিয়েছে আন্দোলনের স্বাদ পাওয়া পরাধীন মানুষ, বিশেষত তরুণদের মধ্যে। এমনই এক তরুণ ভজন। শ্রীমতী কাফে-এর ভজুলাট।
ভজন বি.এ. পাস। মামলাবাজ মাতাল বাবার প্রতি সে বিরক্ত। দাদা নারায়ণ পথ বেছে নিয়েছে দেশের কাজ করার। কিন্তু ভজনের কোনও পথ নেই। সে জানে না সে কি চায়! তার পথ কোনটা! প্রথমে বাড়ির সামনে একটা খুপরি চায়ের দোকান, সেখান থেকে বউয়ের গয়না বেচে স্টেশনের পাশে চপ-কাটলেট-ঘুগনির একটি রেস্টুরেন্ট খুলে ফেলে সে— নাম, 'শ্রীমতী কাফে'।
কত কথা ছিল মনে। কত ছিল ভাববার, কত হিসাব-নিকাশ। জীবনের সমস্ত শিক্ষা-দীক্ষা নিয়ে আড়ম্বরের যুক্তি-তর্ক। 'বিরাট' ভারতবর্ষের 'বিরাট' ইতিহাস গিলে নিল ভজন হালদারের 'ছোট্ট' জীবনের 'ছোট্ট' ইতিহাসকে। ১৯২১-এর অসহযোগ আন্দোলনের পর থেকে ভারতের রঙ্গমঞ্চে চলতে থাকা স্বাধীনতার লড়াই, গান্ধী, অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলন, অহিংসা, সশস্ত্রতাকে নিজের রেস্টুরেন্টে জায়গা দিলেন একজন আপাত বিভ্রান্ত আপাত অস্থির যুবক। পরবর্তী প্রায় দুশো পাতা জুড়ে এই শ্রীমতী কাফে-ই স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ভারতবর্ষ।
সন্ধ্যেবেলা জমে ওঠে রেস্টুরেন্ট। এসে বসে হীরেন, কৃপাল, প্রিয়নাথ, সুনির্মল, জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আসে নারায়ণ। দোকানের সামনে আলোচনা চলে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি, আঞ্চলিক নির্বাচন, সত্যাগ্রহ আর দোকানের পিছনে প্রায় গোপন একটি কুঠুরি ঘরে গোপন মিটিংয়ে তর্ক ওঠে ইয়ার্ডের ম্যানেজারকে এখনই খুন করে ফেলা উচিত কী-না? 'সাম্যবাদ' আনতে গেলে কি সশস্ত্রতা অবশ্যম্ভাবী? প্রিয়নাথ-নারায়ণের তর্ক ভারতবর্ষের রাজনীতির বাঁক বদলের ইতিহাস ধরে রাখে ‘শ্রীমতী কাফে’র পেছনের গোপন ঘরে। প্রায় অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে ততক্ষণে শ্রীমতি কাফের পাতাতেও উঠে এসেছে ইতিউতি ফিসফাস শোনা একটি নাম 'কমিউনিস্ট পার্টি'!
আমাদের প্রস্তাবে দেশপ্রেমের গরজের মধ্যে যতটুকু তর্ক, যতটুকু বিভ্রান্তি, যতটুকু অসংবেদনশীলতা, তাকে ধারণ করে আছে শ্রীমতী কাফে। দিল্লির নেতা নিদান দিয়েছিলেন অস্পৃশ্যতা দূর করার। নির্দেশ ছিল হরিজন পল্লীতে যাও। নিচু জাতের লোকেদের সঙ্গে একসঙ্গে খেতে গিয়ে যার সারবত্তা টের পায়ে হীরেন। জোর করে তাকে 'তাড়ি' খাওয়ানোর চেষ্টা হয়। বিধ্বস্ত, আক্রান্ত দেশসেবক হীরেন পালিয়ে আসে। অভাব, দারিদ্র ও দেশি 'তাড়ি'-তে বন্দী হয়ে আছে যে ভারতের আত্মা তাকে উদ্ধার করার উপায় কী? দিল্লির ওয়ার্কিং কমিটি আর রেল ইয়ার্ডের ওয়ার্কিং ক্লাসের ভারত যে এক নয় তার হিসেব ধরে রেখেছে শ্রীমতী কাফে। শুধু হিসেব নয়, অন্য কোনও ভারতের আশাও আছে ভজনের, হয়তো সমরেশ বসুরও। একসময় এই রেস্টুরেন্টে আড্ডা মারা কংগ্রেসিরা নেতা মন্ত্রী হয়ে হুকুম দিয়েছেন শ্রীমতি কাফে বন্ধ করে দেওয়ার। কারণ ওটা সন্ত্রাসীদের ডেরা। ভজন মরে গেছে— দেউলিয়া শ্রীমতী কাফেতে বাবুর্চির কাজ করতে এসেছে ক্রাচে ভর দিয়ে ভজনেরই ছেলে নিতাই।
স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ভারতের বিভ্রান্ত ভজুলাট অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে রেখে গেছেন তার উত্তরাধিকারীকে। শুধু কানুকে দিয়ে গেছেন একটি বই। বইয়ের ভেতরে একটি ছবি। ছবির তলায় লেখা ঋষি কার্ল মার্কস। ‘এ কোথাকার ঋষি? ভজু— বিশ্বের’।
ঋষি বাক্য না-শুনলে তার ফল কী হয় আমরা জানি। ভারতবর্ষকেও সেই গুনাগারি দিতে হয়েছিল। সেই গুনাগারির হিসেব নিতে বন্ধ হয়ে যাওয়া শ্রীমতি কাফের স্টেজে এবার আমরা হাজির করব ১৯৮৭-এর খণ্ডিতা-কে।
‘১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ। ১৪ই আগস্ট। বিকাল বেলা।’ এই হল খণ্ডিতা উপন্যাসটির প্রথম তিনটি লাইন। অনুমান করতে পারি আমরা এক কালবেলার ভারতবর্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। শ্রীমতি কাফেতে যে মত ও পথের তর্ক, পিছনের ঘরের আড়াল, তা শেষ পর্যন্ত আমাদের কোন উপসংহারে এনে দাঁড় করাল তা দেখতেই নৈহাটির পাড়া ছেড়ে কলকাতায় যাচ্ছে তিন বন্ধু সতু, বিজু, গোরা। একে একে উপন্যাসের পাতায় আসবেন গান্ধী, জিন্না (১৮৭৬-১৯৪৮), সোহরাওয়ার্দী (১৮৯২-১৯৬৩), ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২)। দাঙ্গা বিধ্বস্ত কলকাতাকে আশ্বস্ত করতে হায়দারি ম্যানসনে বসে আছেন গান্ধীজি। কলকাতা তো দেখা হল কিন্তু আরেকটা দেশ? রাতারাতি 'অপর' হয়ে গেল যে রংপুর, নোয়াখালী, ঢাকা তাদের উপলব্ধি কেমন? নতুন ভারতকে চিনতে এক কাপড়ে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসে উঠে পড়ল তিন বন্ধু। গন্তব্য? না তারাও জানে না। আর এই জার্নি-ই আমাদের মুগ্ধ করে। ইতিহাসের একনিষ্ঠ গবেষকের মতো সমরেশ বসু খুঁজছেন ভারতকে। এবং শুধু খুঁজছেন না, সেই ভারতের খোঁজকেই উপন্যাসের বিষয় করে তুলছেন অনায়াসে।
এই উপন্যাসে অসংখ্য রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, নাম, ঘটনার উল্লেখ আছে। সাইমন কমিশন (১৯২৭), বাঙালি মুসলমানের দেশভাগ সম্পর্কিত অভিব্যক্তি, পূর্ববঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে ধারণা, দ্বিজাতি তত্ত্বের সমর্থন কিংবা অসমর্থন ইত্যাদি। এমনকি 'সীমানা নির্ধারণ' প্রসঙ্গে টাকার খেলার উল্লেখও আছে এই উপন্যাসে। ধনী হিন্দু জমিদাররা তাদের এলাকাকে হিন্দুস্তানে রাখার জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালছেন। ধনী মুসলিম ব্যবসায়ীরাও চেষ্টা কসুর করছেন না। দেশভাগের রাজনৈতিক ইতিহাসের বহু চর্চিত বয়ানের পুনরাবৃত্তি আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা শুধু সমরেশ বসুর চশমায় একবার উঁকি দিতে চাইছি মাত্র। স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর লেখা এই উপন্যাসের নাম খণ্ডিতা। তবে কি সমরেশের উপলব্ধি এই যে 'ভারতবর্ষ' আসলে খণ্ডিতা?
হিলি পার হয়ে পার্বতীপুর হয়ে তিন বন্ধু এসে পৌছায় রংপুর। ১৫ আগস্টের রঙ মেখে নিয়ে তাদের পরবর্তী গন্তব্য সৈয়দপুর। সমরেশ বসু অপ্রতিরোধ্য। কলকাতা-নৈহাটি-রংপুর, ভারতবর্ষ কোন দিকে? জন্মের আগেই মুণ্ডু ও ধড় কেটে আলাদা করে ফেলা হল যে শিশু রাষ্ট্রের; অবিশ্বাস ও ঘৃণার জল হাওয়ায় সে কীভাবে বড়ো হবে? অবশেষে ভারতবর্ষের দেখা পাওয়া গেল সৈয়দপুরের সেটেলমেন্টে। উপন্যাসে তার নাম মতি।
জেলের বাইরে যেন আরেক জেলে বন্দি আছে কতগুলো মানুষ। সতু জিজ্ঞাসা করল “তোমরা হিন্দু না মুসলমান?” “আমরা না-মোছলমান না-হিন্দু” রক্তে আগুন ধরানো হাসি মতির বাঁশির সুরে বেজে উঠল। “মা কালী ভজি, পীরেরেও ভজি। রুদ্রাক্ষ পরি, তসবিও পরি। গরু খাই, শুয়োর খাই। আমারে হিন্দুও খায়, মোছলমানে খায়। আমি জমিন। জমিন সবাই চায়। সবাই চষে। জমিন লইয়া খুনোখুনি করে।”
মফস্বলের বহু বাবুর আকাঙ্ক্ষিত চটকদার মতি সবার চোখে বেশ্যা হলেও সমরেশের কাছে সে 'জমিন'। যে 'জমিন' নিয়ে হিন্দু মুসলমান খুনোখুনি করে। চুরি করার দায়ে ছোটোবেলায় মতির এক হাত কেটে নিয়েছিল গ্রামের লোক। সেই থেকে মতি খণ্ডিতা। যেমন ১৯৪৭-এর ১৪ আগস্ট মাঝরাত থেকে ‘খণ্ডিতা’ আমার ‘ভারতবর্ষ’।
তিন বন্ধু কবে কীভাবে নৈহাটি ফেরত এসেছিল, আদৌ এসেছিল কিনা সে-খবর এই উপন্যাসে নেই। সম্ভবত সমরেশ বসুর কাছে তা জরুরিও নয় কেন-না তিনি ভারতবর্ষ খুঁজতে বেরিয়েছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত তাকে পেয়েছেন এক গরীব মহল্লায় খণ্ডিত অবস্থায়। ভারতবর্ষ সেই খণ্ডিত 'জমিন' হিন্দু-মুসলমান যাকে নিয়ে মারামারি করে, ব্যবহার করে বেশ্যার মতো, কেবল ভালোবাসে না।
সমরেশ বসুর ভারত সন্ধানের রঙ্গমঞ্চে আমাদের শেষ ও অন্তিম পেশকারী সুঁচাদের স্বদেশযাত্রা। অসহযোগ (১৯২০-২২), আইন অমান্য (১৯৩০), ভারত ছাড়ো (১৯৪২) শেষ। ভারতবর্ষের মানচিত্র প্রস্তুত। ঢাকা জেলার বিলডিহি গ্রাম থেকে কলকাতা শহরতলীর এক কলোনিতে এসে উঠেছে সুঁচাদ, সুঁচাদ বহুরূপী। জন্মাবধি যে-দেশ তার ছিল, গাছ-নদী-বিল-পাখির ডাক, সে-সব ছেড়ে সে ভারতে চলে এসেছে। দলে দলে হিন্দুরা আসছিল। সুঁচাদও তাদেরই সঙ্গে এসেছে। নমঃশূদ্রদের মেয়ে বুঁচি যার সঙ্গে ছিল আর আশনাই তার বিয়ে হয়ে গেছে। সুঁচাদের আর বিলডিহিতে থাকার কোনও কারণই নেই। তিনকূলে কেউ না-থাকা সুঁচাদ কলোনির ভাঙা ঘরে এসে উঠেছে একাকী। ততদিনে ভারতবর্ষের ভবিষ্যৎ লেখা হয়ে গেছে গানে গানে—
“মাউন্টব্যাটেন সাহেব ও
তোমার সাধের ব্যাটন কার হাতে
থুইয়া গেলা ও
যে বাঁশেতে বাজলো রে ভাই স্বরাজের বাঁশরী
সেই বাঁশ যে ডাণ্ডা হইয়া মাথায় মারল বাড়ি
মাটি চাইয়া লাঠি পাইলাম দিয়া বুকের খুন
হাসির বদল ফাঁসি পাইলাম দইয়ের বদল চুন
চাকরি চাইয়া ছাটাই পাইলাম কাপড় চাইয়া দড়ি
এখন কলস যে ভাই কিনি হাতে নাইকো এমন কড়ি
হিন্দুস্তানের শ্বশুরবাড়ি পাকিস্তানের ঘর মধ্যিখানে ভূতের ময়দান বউ হইলো পর রাম রাজ্য চাইয়া পাইলাম হনুমানের বংশ
লেজের আগুন দিয়া সোনার লঙ্কা করে ধ্বংস
ঠগের বাড়ি নিমন্ত্রণ বুঝিলায় অবেলা রাজভোগ খাওয়াইব কইরা খাওয়াইলো কাঁচকলা
মাথায় ভাঙলো কাঁঠাল ভাইরে মুখে লাগল আঠা
স্বরাজের মন্দিরে আমরা হইলাম বলির পাঁঠা
মাউন্টব্যাটেন সাহেব ও
তোমার সাধের ব্যাটন
কার হাতে থুইয়া গেলায় ও”
বিলডিহির দত্ত বোস মিত্তিররাও এদেশে এসেছেন। তাদের অসুবিধা হয়নি। সেখানে তাদের ছিল দোতলা বাড়ি এখানে হয়েছে চার তলা। তারা হলেন বড়ো বড়ো বাস্তুহারা মাতব্বর। দেশে যাদের নুন আনতে পান্তা ফুরাত এখন তাদের বাড়ির দরজায় মোটর গাড়ি। বলির পাঁঠা হয়েছে কেবল সুঁচাদরা সরকারি রিফিউজির তালিকায় যাদের নাম নেই। নাম থাকে না কোনোদিন। “মাঝে মাঝে সুঁচাদের মনে হয়, মানুষের বোকা হওয়ার একটা সময় আসে। সব মানুষের একসঙ্গে। তা না-হলে সব মানুষ একসঙ্গে ভাগাভাগি মানল কেমন করে। এমন কি হয় না সব মানুষ একসঙ্গে ভাগাভাগিটা তুলে দেবে। হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে।” সুঁচাদের গলা দিল্লির মসনদ পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই হতাশ সুঁচাদ দেশে ফিরে যাওয়া স্থির করে। ব্যাক টু ঢাকা-বিলডিহি। অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে আড়কাঠি দালালদের সাহায্যে সে বর্ডার পেরিয়ে যশোর লৌহজং হয়ে বিলডিহি পৌঁছায়। রহমত জিজ্ঞাসা করে, কিরে সুঁচাদ 'হিন্দুস্তান থেকে আইলি?' সুঁচাদ হিন্দুস্তান পাকিস্তান জানে না। সে বলে 'দ্যাশে আইলাম'।
সুঁচাদের দ্যাশ কোনটা? ৪৭-এর পর আমাদের আর দেশ আছে কোনও? গ্রামে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে সুঁচাদকে পুলিশে ধরে, একদিন হাজতবাস করিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় মুন্সীগঞ্জের জেলে। বহুরূপী সুঁচাদ, হতবাক সুঁচাদ দেশ খুঁজতে খুঁজতে, দ্যাশ খুঁজতে খুঁজতে জেলে চলে যায়।
দেশপ্রেম আমাদের কী স্বপ্ন দেখিয়েছিল এবং দেশভাগ আমাদের কী দিল? এই বৈপরীত্যের অভিজ্ঞানে আমরা সমরেশ বসুর তিনটি উপন্যাসকে আলোচনায় রাখতে চাইলাম। আমাদের বিচারে দেশপ্রেম থেকে দেশভাগের যে ক্রোনোলজি তাতে সমরেশ বসুর সৃষ্টি, একটি নিজস্ব পৃথক পরিসর অর্জন করার দাবি রাখে। প্রসঙ্গত, ঢাকা থেকে নৈহাটিতে আসা সমরেশ বসুর ব্যক্তিগত জীবনকে যদি আমরা এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করি তাহলে উপন্যাসগুলি আরও অযুত নতুন পাঠের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। একশো বছর পার করে আমরা কি আরেকবার পড়ে দেখব ‘বাংলা সাহিত্যের উত্তম কুমার’ সমরেশ বসুকে? মন্দির ভেঙে মসজিদ অথবা মসজিদ ভেঙে মন্দিরের যে বাইনারিতে আজকের ভারতবর্ষে ঢুকে পড়ছে তার সামনে দাঁড়িয়ে সমরেশ বসুর ভারতবোধ কি ঘৃণার বদলে ভালোবাসার পাঠ দিতে পারে আমাদের? ওই যে ঢাকা থেকে নৈহাটি, আঁতপুর, চটকল, শ্রমিক মহল্লা তাতিপাড়া, ডোমপাড়া, কলেজ স্ট্রিট হয়ে ভারতবর্ষের পথে নয়নপুরের মাটি (১৯৫২) মেখে অমৃতকুম্ভের সন্ধানে (১৯৫৪) বিটি রোডের ধারে (১৯৫২) ধারে হেঁটে যাচ্ছেন সওদাগর (১৯৭১)। অন্ধকার গভীর গভীরতর (১৯৭৩) হলে আমরা তার কাছেই ফিরব। ব্যথায় আনন্দে যন্ত্রণায় হতাশায় তাকেই হাতড়ে পড়ব। ছায়া ঢাকা মন (১৯৭২) নিয়ে স্বীকারোক্তি (১৯৬৭) করব সমরেশ বসু যুগ যুগ জিয়ে (১৯৮১)।
আমরা ভারতবর্ষের খোঁজ করতে বেরিয়েছিলাম। আমাদের আজকের হতভাগ্য জীবনে, সন্ধ্যাবেলার খবর চ্যানেল গুলজার করা তর্ক-বিতর্ককে যদি শ্রীমতী কাফে বলি যেখানে ঝগড়া হয়, গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার হয়, কিন্তু মত ও পথের বিভ্রান্তি ঘোচে না। ‘খণ্ডিত’ হৃদয়ে আমরা বেঁচে থাকি। কোনোরকম ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের উত্তেজনায়, সীমান্তে যুদ্ধের ঘোষণায়, নিদেনপক্ষে ১৫ আগস্টের মেরি বিস্কুট হাতে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে আমাদের স্বদেশ যাত্রা সম্পূর্ণ হয়। আমরা ভাবি ভারতবর্ষ আছে, আমাদের ভাঙাচোরা জীবনের আশ্রয় হয়ে ভারতবর্ষ আছে। কিন্তু যখন লক্ষ লক্ষ শ্রমিক সুঁচাদের মতোই মহামারী কাটিয়ে পায়ে হেঁটে অথবা সাইকেলে, অভাবে অনটনে স্বদেশে ফেরার লং-মার্চ করেন আমরা দেখি ভারতবর্ষ নেই। বাবা ভারতীয়, মা ভারতীয়, অথচ কমিশন-কাগজ-আইন প্রমাণের জাঁতাকলে সন্তানকে থাকতে হয় ডিটেনশন ক্যাম্পে— আমরা দেখি ভারতবর্ষ নেই। খাদ্য-জমি-জীবন-জীবিকার কথা বলতে যায় যে মানুষ তারও ভারতবর্ষ নেই।
বেঁচে থাকলে নির্ঘাত আরেকবার শ্রীমতি কাফের দরজা খুলে দিতেন সমরেশ বসু। সৈয়দপুর থেকে ফিরে আসত সতু, বিজু, গোরা। রাজনৈতিক স্বার্থপরতা ও ধান্দাবাজির সামনে মা কালী সেজে দাঁড়িয়ে পড়ত সুঁচাদ বহুরূপী। এ-লেখার শিরোনামটা হয়তো পাল্টে যেতে অনিবার্যভাবে। মুষ্টিমেয় মুনাফাখোর স্বার্থান্ধ মানুষের ভোগ দখলের বাইরে ভারতবর্ষ নেই। ভারতবর্ষ নিখোঁজ।
প্রকাশের তারিখ: ১১-ডিসেম্বর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
