সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শব্দ নিয়ে কুস্তি-খেউড়
টিম মার্কসবাদী পথ
ধরুন গিয়ে হিন্দু-মুসলমান দু-তরফই আচারকে আচার বলে। মানে ওই খাবার জিনিসটার কথা বলছি, আচার-আচরণের ব্যাপারটা নয়। ঐটে কিন্তু ফারসি শব্দ একখান। কোত্থেকে যে সুট করে সে ঢুকে পড়েছে বাংলায় জানেন আল্লাপাক আর বিধাতাপুরুষ। কৃষ্ণদাস কবিরাজের মহাগ্রন্থ শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত–এ আছে, ‘নেবু-কোলি আদি নানাপ্রকার আচার’। কিন্তু বাংলায় ঢুকে যখন পড়েছে এবং চোখে যখন এবার ফেলেই দিলাম আপনার, তাহলে তো দুটিই মাত্র সম্ভাবনা পড়ে থাকে এরপর। এক, এখন থেকে আচার খেতে গেলেই আপনি বিষম খাবেন, বিদেশি ফার্সি খাবার ছোঁয়া লেগে গেল ভেবে সংকুচিত হবেন।

শুরুয়াত্
এক বন্ধু এসে জিগেশ করলেন আজ, এই যে বাংলায় আরবি-ফারসি শব্দের উপস্থিতির পক্ষে সওয়াল করছ এত, বলো দেখি, যখন দেখা যায় আজকের বাঙালি মানুষজন দিওয়ালি, সাওয়ান, কিংবা হোলি, নাভ্রাত্রি বলছেন, অনেকে তখন ক্ষেপে ওঠে কেন? ক্ষেপে ওঠার সত্যি কিছু নেই। একটু ব্যথিত, একটু বিষণ্ণ হই বটে। যাঁরা/যিনি দীপাবলি বলে এসেছেন এতকাল, তিনি যদি হিন্দির দাপটে কিংবা হিন্দির দ্বারা আবিষ্ট হয়ে দিওয়ালি বলতে থাকেন এখন, তাহলে কানে লাগবে বৈকি। অন্তত কিছু কাল তো লাগবেই। তারপরে এই-ই যদি চলতে থাকে, বিনা বাধায়, তাহলে হয় দুটোই থাকবে পাশাপাশি, নয়তো দীপাবলিকে সরিয়ে দিওয়ালি নিজেই বসবে গেঁড়ে। এইটে ধাক্কা, অনুপ্রবেশ, গা-জোয়ারি।
একই কথা খাটবে সাওয়ান, কিংবা হোলির ক্ষেত্রেও। ‘শ্রাবণ’ বেশ চলছিল যাঁর/যাঁদের বুলিতে, তাঁদের অনেকে ‘সাওয়ানে’ সরে যাচ্ছেন আলতো। খারাপ লাগবে তো। এতদিনের প্রতিবেশী, আত্মীয় অন্য পাড়ায় চলে গিয়ে থাকবেন, তাতে বিষণ্ণ হবারই কথা। আমি করব না অমন উচ্চারণ। তাঁকে/ তাঁদের কয়েকবার বোঝাবারও চেষ্টা করব, কেন অমন হচ্ছে, কেন তিনি এতদিনের অভ্যাস পালটে ফেলছেন এখন, এইসব শুধবো। কিন্তু একই সঙ্গে খেয়াল করব, এগুলি সব একই উৎসজাত শব্দ, কেবল উচ্চারণের তফাত, ধ্বনির দিক থেকে ঈষৎ আলাদা। যাঁদের সঙ্গে ইদানিং তাঁর ওঠা-বসা, সেই প্রবল প্রতিবেশীদের দেখেশুনে তিনি বেছে নিয়েছেন ভিন্ন উচ্চারণটি। ওঠা-বসা যদি পালটায়, প্রতিবেশী যদি বদলায়, তাহলে উচ্চারণ ফেরত আসতেও পারে। বাংলার শব্দগুলি আছে কিন্তু, মুছে যায়নি মোটেই। কেবল তার উচ্চারণের কায়দাটি আমি অন্য একজনের কাছ থেকে নিলুম। কিন্তু এর পরেও বলতে বাধ্য হব, বহু শতক ধরে চলতে থাকা উচ্চারণ যদি হিন্দিওয়ালাদের নকলে বদলে যেতে দেখি, আগের উচ্চারণগুলি যদি ক্রমশ বিস্মৃত হতে থাকে তাহলে খারাপ লাগবে বটে, কিন্তু পালটা গা-জোয়ারি করে এই বদলে-যাওয়া আটকাতে পারব না কিছুতেই। বারবার বলব, এই উচ্চারণ ‘বদল’ তোমাকে কেবল উচ্চারণেই আটকে রাখছে না ভাই, দীপাবলির সঙ্গে ‘দিওয়ালি মানানো’র যে আচরণগত তফাত তার দিকেও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। নবরাত্রি থেকে নাভ্রাত্রিতে যাওয়া শুধু উচ্চারণ পিছলে যাওয়া নয়, নবরাত্রিতে যা-যা করতে তুমি, তা থেকেও সরে যাওয়া— নাভ্রাত্রিতে যা-যা করা হয় তার অভিমুখে। এবং এই পিছলে যাওয়া ঠেকানো যাবেও না, যদি অর্থনীতি, সংস্কৃতি, গণমাধ্যমে একটি স্পষ্ট অধিকার না-থাকে। ওপর ওপর মিটিং-মিছিল চলতে পারে, কিন্তু বালি সরতে থাকবে পায়ের তলায়।
২
তাহলে এবার ওই নষ্টের-গোড়া, মুসলমানি শব্দগুলির ক্ষেত্রে কী হবে? মুসলমানি শব্দ আবার কী জিনিস? শব্দের কি হিন্দু-মুসলমান হয়? সংস্কৃত, তামিল, ফার্সি, মারাঠি হয়। আচ্ছা বুঝলাম, মুসলমান সমাজে সচরাচর বলা হয়, কিন্তু হিন্দু বাঙালি সাধারণত যে-সব শব্দ এড়িয়ে চলেন, সেগুলির দিকে ইঙ্গিত করছেন। আপনাদের ইশারা অনুযায়ী ঘোর মুসলমানি শব্দ আম্মা, আব্বা, গোসল, নাশ্তা ইত্যাদির ক্ষেত্রেও একই কথা বলব যদি দেখি, এতদিন বাবা-মা-স্নান-জলখাবারে থাকতে থাকতে টুক করে প্রচারের দাপটে বাংলা ভাষা নিজের ভঙ্গি বদলে নিয়েছে। বাতিল করে দিয়েছে বাবা-মা-স্নান-জলখাবার। কিন্তু এইসব শব্দের ক্ষেত্রে কি সত্যি ঘটেছে অমন? কিছুতেই শুনব না, আগে থেকেই যা স্থির করে রেখেছি, তার বাইরে যাবই না, যতই তুমি যুক্তি-ফুক্তির কথা বল— এমন যদি স্থির করে রাখেন, তাহলে অবশ্য ভিন্ন কথা। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত ঘৃণা সরিয়ে ভাবলে সহজেই চোখে পড়বে, আম্মা, আব্বা, গোসল, নাশ্তা শব্দগুলি এই বাংলাতেই ছিল। বহুকাল ধরে ছিল। আপনাদের পাশেই ছিল। হয় খেয়াল করেননি। নয়তো, নাক সিঁটকে, অবজ্ঞা ভরে অস্বীকার করছিলেন। শব্দগুলি তত নয়, বরং ওই সব শব্দের পিছনে থাকা লোকগুলির জন্য যে-অপছন্দ জমা রেখেছিলেন, যে-অসম্মান জমা রেখেছিলেন সেইগুলিই আসলে আপনার কথার ভিত।
কিন্তু দয়া করে যদি একটিবার ঘৃণা আর ক্রোধ সরিয়ে রেখে খোঁজেন, কে কে ঠিক স্নান বলতে বলতে গোসল করতে চলে গেছে এর মধ্যে? গত পঞ্চাশ ষাট বছরে? নাকি উল্টোটাই ঘটেছে আসলে? গোসল-বলা ঘর থেকে বেরিয়ে আসা লোক ধীরে ধীরে চারপাশের বেশির ভাগ মানুষের মাঝে মুদ্রাদোষে একা হয়ে যাবার আশঙ্কায় স্নান বলতে শিখে নিয়েছে বেশি? বাড়িতে আব্বা কিংবা পানি বললেও রাস্তায় বেরোলেই অক্লেশে বাবা আর জলে শিফ্ট করে যায় বেশি লোক? ওপার বাংলায় যেমন ঘটে বাবা থেকে আব্বায় এবং জল থেকে পানিতে যাওয়ার ক্ষেত্রে? নাকি ক্লেশ থাকে কিছু? অভ্যেস দিয়ে সে ক্লেশ সইয়ে নেওয়া হয়? আসলে যে কথাটি আপনি বা আপনারা বলছেন স্যর ও দিদিমনিরা, সেটি হল এই— গল্পের চরিত্র টরিত্রের সংলাপে কিছু থাকলেও, অন্যান্য লিখিত বয়ানে বিশেষ চল ছিল না এসবের, বাইরে তো বলছিস না বুঝলাম, কিন্তু ঘরেই বা কেন তোরা গোসল বলবি? নাশ্তা বলবি? আমরা লাইসেন্স দিয়েছি বলার? সাহস যে বড়ো?
উনিশ শতক থেকে ছাপা বই আর পত্রিকাগুলিকে কেন্দ্র করে ‘ভদ্র-সভ্য’ লোকজনের উপযোগী বাংলা লেখার যে জগৎ গড়ে তোলা হয়েছিল, কালে কালে সেই গড়ে-তোলা, বানানো বাংলাই এবার একমাত্র, সভ্য, আসল হিসেবে আসন দাবি করছে। তার বাইরে আর যা কিছু ছিল, সেই তথাকথিত মধ্যযুগের পল্লী থেকে, সেই ময়মনসিং থেকে, সোঁদরবন থেকে, মানভূম ছুঁয়ে, বীরভূমের খাদান-ঘেঁষা বস্তিতে, কোচ-সমাজের আচারে, খাবারে, সংগীতে, মেদিনীপুরের মন্দিরসংলগ্ন আদিবাসী মহল্লায়, সে-সবকে দাবড়ে ধমকে শাসিয়ে, ছোটোলোকিপনা বলে, অসভ্য, গাঁইয়া বলে উপহাস করে বহুদিন ধরেই ত্রস্ত করে রাখা হয়েছে।
যেসব শব্দ নিয়ে খুব আপত্তি শোনা যাচ্ছে নতুন করে, তার দু-চারটি নিয়ে একটু বলি। রাগে অন্ধ না-হয়ে গেলে আপনার চোখে নিশ্চয় পড়ত, পড়তই, হরিচরণ, জ্ঞানেন্দ্রমোহন, রাজশেখর তিনজনেই, (আপনাদের গোসা হবে বলে ওই ওপারের ‘মোল্লাগুলোর’ ডিকশনারি বাদই দিয়েছি, ধরলে তাঁরাও) বলেছেন, চাচা কথাটা, মানে যে শব্দে মুসলমানেরা বাংলার ‘নিজস্ব শব্দ’ কাকা না-বলে মুসলমানি ফলায়, সেই চাচা কথাটি এসেছে সংস্কৃত ‘তাত’ থেকে। কিন্তু ওই যে... আপনি যেহেতু কাকা বেছে নিয়েছেন, সেই বেছে নেওয়াকে যারা যারা বেছে নিচ্ছে না তারা তো শয়তান হবেই হবে, তাই না? তারা ভাষা-জেহাদি বিবেচিত হবে বইকি। আপনারা বলছেন যখন, না-হয়ে যায় কোথায়?
কিংবা ধরুন এই যে কথা আপনারা বলছেন, মানে এই যে আশ্চর্য সব যুক্তি টুক্তি নিয়ে আসছেন, একই ভাষায় একগোছা করে শব্দ থাকতে অন্য আরেক গুচ্ছ দরকারটা কী? এই যুক্তি খাটলে কী যে সব তালগোল পেকে যাবে কী বলি... ধরুন গিয়ে হিন্দু-মুসলমান দু-তরফই আচারকে আচার বলে। মানে ওই খাবার জিনিসটার কথা বলছি, আচার-আচরণের ব্যাপারটা নয়। ঐটে কিন্তু ফারসি শব্দ একখান। কোত্থেকে যে সুট করে সে ঢুকে পড়েছে বাংলায় জানেন আল্লাপাক আর বিধাতাপুরুষ। কৃষ্ণদাস কবিরাজের মহাগ্রন্থ শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত–এ আছে, ‘নেবু-কোলি আদি নানাপ্রকার আচার’। কিন্তু বাংলায় ঢুকে যখন পড়েছে এবং চোখে যখন এবার ফেলেই দিলাম আপনার, তাহলে তো দুটিই মাত্র সম্ভাবনা পড়ে থাকে এরপর। এক, এখন থেকে আচার খেতে গেলেই আপনি বিষম খাবেন, বিদেশি ফার্সি খাবার ছোঁয়া লেগে গেল ভেবে সংকুচিত হবেন। অথবা দুই, ভাববেন, ও তো আগেই অনেক এসে গিয়েছে। মিশে গিয়েছে ভাষায়। সংস্কারে। অভ্যাসে। ওটাকে নিয়ে গোল নেই। ও আমার বাংলাই এখন। আমি আচারই খাব।
তাহলে দাদা ও দিদিরা, বাবুমশাইগণ এইটেই আপনেদের যুক্তি হয়ে উঠল দেখছি শেষমেশ, যেগুলিকে আপনারা বুঝে হোক, না-বুঝে হোক মেনে নিয়েছেন, স্বীকৃতি দিয়েছেন সেইগুলি শুধু থাকবে। বাকি শব্দেরা সব জেহাদির বাচ্চা।
৩
আমরা আম্মু-আব্বায় ফিরি। এক পিস ‘মোল্লার’ নেতৃত্বে গড়ে ওঠা বাংলা ভাষার বিবর্তন-মূলক অভিধান বলছে, আম্মা শব্দটার উৎস আসলে সংস্কৃত। এই সম্ভাবনার কথা আবার হরিচরণ কিংবা জ্ঞানেন্দ্রমোহনে নেই। কিন্তু বিশ্বাস করুন, না-করলে কী আর করি, আম্মা শব্দটা ফার্সি, আরবি, তুর্কি থেকে আসেনি। কোনো ভাবেই না। মা বোঝাতে ওদের শব্দ আলাদা— সেসব থেকে আম্মা নিষ্পন্ন হওয়ার কোনও উপায় নেই। মুসলমান দুনিয়ার সুরেই ‘মোল্লারা’ সব আম্মা বলে— এই যুক্তি খুবই যাকে বলে ভঙ্গুর, তাও না, তার চেয়েও দুব্লা। তামিল (তমিড়্ উচ্চারণ করব কি? থাক্গে) ভাষায় মা কে আম্মা বলা হয় সে তো সবাই জানেন। এ বাবা, এমন নয় কিন্তু, তামিল ভাষা থেকে মালদা কিংবা দিনাজপুরের মোল্লার পো শিখেছে কথাটা, কিংবা অলৌকিক উপায়ে তামিল ভাষাই ঋণ নিয়েছে এখান থেকে— এর কোনোটিই নয়। নিশ্চিত কী তা জানি না। তবে কী কী নয় তা নিশ্চিত জানি। তুর্কি, ফারসি, আরবি নয়। নিশ্চিত। সংস্কৃত থেকে কি তাহলে গেছে তামিলে এবং বাংলায়? হতেও পারে। আশুতোষ ভট্টাচার্য তেমনই বলেছেন সেই উনিশশো ছত্তিরিশে, আর বাংলুকাংলু ‘মোল্লা’ ভাষাবিদেরা তো বলছেনই। হবেও বা। এই সেদিনের অভিধান, মর্যাদায় পূর্বসূরীদের তুলনায় খাটো কিছুটা, কিন্তু তবুও গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই— সংসদ বাঙ্গালা অভিধান। বেরিয়েছিল ১৯৫৭ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রামতনু লাহিড়ী অধ্যাপক শ্রীশৈলেন্দ্র বিশ্বাস তার সংকলক ছিলেন। সেখানে আম্মা শব্দটি জায়গা পেয়েছে দেখি। ওপার বাংলার মুসলমান অভিধানকারের আগেই দেখছি তিনিও অনুমান করছেন আম্মা এসেছে সংস্কৃত অম্বা থেকে। অবশ্য তার সঙ্গে একটি বিকল্পও বলে রেখেছেন তিনি। আরবি ‘উম্ম’ থেকেও আম্মা আসতে পারে, তাঁর মত। তাড়াহুড়োয় খেয়াল করেননি হয়তো, আরবি উম্ম শব্দের অর্থে একেবারেই আলাদা। ধ্বনির সাদৃশ্য ছাড়া আর কিছুতেই সুতো জোড়া যাবে না— আরবি উম্ম মানে গোষ্ঠী, জনতা, জাতি ইত্যাদি। তাহলে দাঁড়াল এই, অন্তত আম্মা শব্দের উৎস বিদেশ নয়। এদেশেই তার নিবিড় যোগ রয়েছে। শব্দের ক্ষেত্রেও দেখুন কেমন এনআরসি ভাব এসে যাচ্ছে... কতটা এদেশি তুমি শব্দ ব্যবহারে? কত শতাংশ উর্দু ফারসি নিয়ে থাকা হয়? অ্যাঁ? উর্দু এদেশের ভাষা প্রমাণ আছে ঠিকই, কিন্তু অক্ষরগুলো তো বিদেশের। অই অক্ষরে তোর খুব ভাব দেখছি যেন!
চব্বিশ পরগণা, দিনাজপুর, বাঁকড়ো, মুর্শিদাবাদ, বিশ্বাস করুন এসব নিয়ে ভাবে না। তারা জরির পাড় সেলাই করে, রাজমিস্ত্রির হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে বচ্ছরকার ঈদে মায়ের কাছে ফিরতে পারবে কিনা ভাবে। তারপর আর তেমন কিছু ভাবার সময় পায় না। সেই বুরবাকগুলো যখন দেখে তারা আম্মা বলছে বলে তাদেরকে বাংলাদেশি বলে দেগে দিচ্ছে কিছু লোক, আর তাদের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য কাউকে কাউকে ভাষা-জেহাদি বলা হচ্ছে— তখন সে বেচারা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া কী-ই বা করতে পারে আর? আর আব্বা? হরিচরণ (১৩৪০) এবং জ্ঞানেন্দ্রমোহনে (১৩২৩) আব্বা ভ্যানিশ, আম্মার ঠাঁই নেই। ‘আম্রেড়িত’ বাংলা। অভিধানেই আছে। সাধারণ লোক বলে বা লেখে নিশ্চয়। কিন্তু আম্মা নেই। কেননা ওটা সাধারণ লোক বলেও না, লেখেও না। যারা বলে বা লেখে তারা সাধারণ নয়। অন্তত তখন ছিল না। পরে অবশ্য অভিধানে এসেছে তারা। বেশ পরে। বাবা কিন্তু আছে প্রথম থেকেই। বাবা যে গুজরাটি, মারাঠি ভাষায় চলে তাও আছে হরিচরণে। তুর্কি ভাষার কথাও আছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন বলছেন, ইনি মাকু মোল্লা কিছুই নন বাপু, নিপাট বাঙালি পন্ডিত, তিনিও লিকেচেন, বাবা তুর্কি শব্দজাত। কিন্তু আব্বা কোথা থেকে এল তা নিয়ে তিনি নীরব। এমন হতে পারে, আরবি ‘আব্’ আর তুর্কি ‘বাবা’ মিলে এসেছে আব্বা। কিংবা স্রেফ বাবা থেকেও আসা অসম্ভব নয়। খালা অবশ্য আরবি থেকেই এসেছে। আসবাব, ইশারা কলম, কুলুপ, গরিব, শখ ইত্যাদির মতোই। ফুপা-র উৎস দেশি হতে পারে। হিন্দি হওয়াও খুব সম্ভব। উনিশ শতকের গোড়ায় ঈশ্বরগুপ্তের কবিতায় দরিদ্র সাধারণের জবানিতে রয়েছে ফুপা-ফুফু এবং নানি। বিজয়গুপ্তের কাব্যেও ছিল। ঘনরামের ধর্মমঙ্গল বইতেও আছে। মানে এরা বাংলাভাষার অন্তর্গতই তো হল তাহলে, নাকি? সতেরো শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে সাধারণ মানুষের বোধগম্যতায় বহাল যে শব্দ, তা বাংলা নয়? আর কত দিন-বছর লাগবে নাদের আলি? খালা কেন বলে ওরা মাসিকে, ও তো আরবি-- এই বলে বিরক্ত হবার সময়ে বলব কি, তাহলে খালি শব্দটিও বাদ দিন ভাইসকল। ওটিও যে আরবি। তার বদলে আনুন, শূন্য, রিক্ত, ফাঁকা। না ‘ফাঁকা’ ব্যবহারে ঈষৎ সন্দেহ রাখা উচিত। কেননা, একটি মতে যদিও বাংলায় ফাঁকা শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘ভঙ্গ’ থেকে! ভঙ্গ থেকে অপভ্রংশে ভাগ, তার থেকে ভাক, তার থেকে ফাক, তার থেকে ফাঁক, তাতে আ লাগিয়ে ফাঁকা। একটু লম্বা পথ ঠিকই, কিন্তু নেহাত অসম্ভব তো নয়। এই পথে সংস্কৃত থেকে যদি এসে থাকে তো আপত্তি নেই। কিন্তু অন্য একটি মতে ফাঁকাও এসেছে আরবি থেকে। এইসব সন্দ-টন্দ নিয়ে ভাষা ব্যবহার করা যায়, বলুন? আর ফুফু/নানি যদি সাধারণের মধ্যে অচলিত বলে সিদ্ধান্ত করি, তার মানে দাঁড়াবে এই, যারা এগুলি বলে তারা আসলে যথেষ্ট সাধারণ নয়। তারা মুসলমান। যদি মনসামঙ্গলের কবি বিজয়গুপ্ত লিখে থাকেন, তবে তিনিও তাই। ঘনরাম, ঈশ্বরগুপ্ত, প্যারীচাঁদ? হ্যাঁ, তারাও।
‘মানে’ কথাটা এতবার লিখেছি এইখানে, মানেমানে এখন মনে করিয়ে দিই, এই শব্দটাও মুসলমানের বাচ্চারা এনেছে। ওটা আরবি। আর সংযোজক অব্যয় হিসেবে ব্যাকরণ বইতে, এমনকি বামনদেববাবুর ব্যাকরণেও ঠাঁই পাওয়া ‘ও’ (এবং অর্থে) কিন্তু বাংলার জিনিস নয়। ওটা ফারসি থেকে পাওয়া। এখন থেকে ‘ও’ দেখলেই তিড়িং করে লাফিয়ে এবং-এ চলে যাবেন কিনা দেখুন ভেবে। রাধা ও কৃষ্ণ যেন খবরদার না লেখা হয়। লিখব রাধা এবং কৃষ্ণ। আর এই যে বামনদেববাবু বল্লুম, এর এই ‘বাবু’টিও ফারসির চোহদ্দি থেকে কুড়িয়ে পাওয়া। কেউ অবশ্য তর্ক তুলতে পারেন, বাবু এসেছে বাপু থেকে, আর বাপুর আগায় ছিল, বাপ, তার পিছনে বপ্র এবং বপ্প। যেতে পারেন, যে-কোনও দিকেই আপনি চলে যেতে পারেন, কিন্তু ওদিকে যাবার আগে একটি বার ভেবে দেখবেন, উনিশ শতকে যখন বাবু শব্দটির বর্তমান ব্যবহার শুরু হয়েছিল, তখন এর লক্ষণের সঙ্গে ফারসি ‘বাবু’র সহজ সম্পর্কটিই স্বাভাবিক। ভবাণীচরণের লেখা নববাবুবিলাসে যে বাবুদের দেখা মেলে তাঁরা কিঞ্চিৎ ফারসি-সংলগ্ন, কেননা ফারসিতে বাবু মানে শৌখিন, আয়েশী, কেতাদুরস্ত লোক। শৌখিন, আয়েশ, কেতা এবং দুরস্ত এসবও কিন্তু মুসলমানি, জেহাদি শব্দ। আরবি, ফারসি, তুর্কি গন্ধওয়ালা। সাবধান। খুঁজেপেতে দেখতে পারেন, চর্যাপদ, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কিংবা আশেপাশের বইপত্রে— মানে মুসলমান জেহাদিগুলো জাঁকিয়ে বসার আগে অব্দি যে বাংলা ভাষাটা ছিল সেখানে বাবু, আয়েশ, ও, কেতা এইসব শব্দ খুঁজে পান কিনা। কিংবা দেখতে পারেন, সেই সময়ে এসবের বদলে কী কী শব্দ ব্যবহৃত হত, তাদের আবার ফেরত আনা যায় কিনা তাও ভেবে দেখা যেতে পারে। কী সব্বোনাশ, বদল এবং ফেরত— এ-দুটিও সন্দেহের বাইরে থাকবে না যে। ওরাও মোল্লাঘেঁষা।
কী আর করবেন, স্বয়ং বঙ্কিমচন্দ্রের সেই যে বাংলার চাষাভুষোকে নিয়ে লেখা প্রবন্ধ ‘বঙ্গদেশের কৃষক’— তার একেবারে প্রথম পাতাতেই— দ্বিতীয় পাতা অব্দি যাবার সাহস হয়নি— সেখানেও এত এত মুসলমানি শব্দ ছড়ানো যে ভয় পেয়ে যাই— আরাম, দূরবীণ, জমি(দার), চশমা (অ্যাঁ, চশমাও!!! বেশ, হটাও চশমা), বাহাদুর, হিসাব, আবাদ, বন্দোবস্ত, বেশি-- এমন আর কত...কিংবা তাঁর মুচিরাম গুড়ের বৃত্তান্তেও বদমাইশি, ওরফে, হক্দার এইসব আক্ছার আছে।
৪
আহা আমরা তো বল্লুম, যেগুলি আস্তে ধীরে এসেছে, গা-জোয়ারি করেনি, বহু বছরের প্রয়োগে পোষ মেনে গেছে, সেগুলিকে থাকতে দিয়েছি তো... বেয়াড়াগুলোকে নিয়ে আপত্তি করছি। ওইটুক না-করলে তো বেড়া ভেঙে সব ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে। না কর্তাবাবুবিবিরা, বেড়া তো আগেই ভেঙে গেছিল। ভারতচন্দ্র এমনকি রামপ্রসাদের মতো লোকেরাই তো সব্বোনাশ করেছিল সেদিন। ফলে, মেরামত করতে হলে ওখান থেকেই শুরু করা উচিত। বাংলা ভাষাকে সাফসুতরো করা উচিত ওই তেনাদের লেখা দিয়েই। ভারতচন্দ্র এবং রামপ্রসাদের লেখায় যে সব বিদিশি, মানে মুসলমানি, মানে আরবি-ফারসি শব্দ আছে, সে-সব আরব সাম্রাজ্যবাদের লেজুড় কিংবা জেহাদি বলে ঘোষণা করতে হবে। ওদের লেখা থেকেও দরকারে সেই শব্দগুলিকে তাড়াতে হবে। শব্দগুলোকে আগে তাড়াতে পারলে তবে না পরবর্তী জেহাদি-তাড়ানো-অভিযান, মানে এনআরসি শুরু করা সম্ভব। রামপ্রসাদে যেন পানি-স্পর্শ না-থাকে। প্যাদা (পেয়াদা) তাড়াও, পারলে বাজার তাড়াও, নিয়ে এসো বার্তাবহ কিংবা প্রহরী এবং বিপণি।
‘প্যাদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, তার নামেতে নিলাম জারি/ঐ যে পান বেচে খায়, কৃষ্ণ পান্তি, তারে দিলি জমিদারি’ বদলে করো ‘প্রহরীর রাজা কৃষ্ণচন্দ্র, তার নামেতে নিলাম জারি’। ‘এ সংসার ধোঁকার টাটি/ও ভাই আনন্দ বাজারে লুটি’ বদলে দাও, লেখো ‘ও ভাই আনন্দ হাটেতে লুটি’। কিংবা ‘কারেও দিলে ধন জন মা, হস্তী রথী জয়ী/আর কারও ভাগ্যে মজুরখাটা,’ চলবে কেন? মজুর এসেছে মজদুর থেকে, তাই করো, ‘কারও ভাগ্যে শ্রমিক খাটা’। ‘এমন মানবজমিন রইল পতিত/ আবাদ করলে ফলত সোনা’ পালটে গাও, ‘এমন মানবভূমি রইল পতিত/ চাষ করলে ফলত সোনা’। কেমন, দারুণ না? ভাষা থেকে কেমন বদ-বু দূর হয়ে যাচ্ছে, দেখেছ?
খাসতালুক, সওয়াল, মোকদ্দমা, তছরুপ, দস্তাবেজ, মিছিল, জমাবন্দি, ঘুষ, কর্জ, আমদানি, পাট্টা, কবুলতি— এইসব রামপ্রসাদ কেন ব্যবহার করবেন? লালনের না-হয় একটা মুসলমান কানেকশন থাকতেও পারে, তাই বলে রামপ্রসাদ? ব্রুটাস আপনিও? ঠিক আছে, পরে আমরা এই সব বদল করে নেব। মোহন ভাগবত কেমন সোঁদর হিন্দি বলেন দ্যাকোনি? একটাও আরবি-ফার্সির ইল্লি পাও? কেমন খটমট করে সংস্কৃত, কেমন দার্ঢ্য... একবার রুখে দাঁড়ালে হালে পানি পাবে না ওরা।
আচ্ছা, হালে পানি? না হালে জল?
চাষার ব্যাটার মুখ থেকে বেরোলে যে পানিই বেরোবে বাপ। ‘আল্লা ম্যাঘ দে পানি দে’-র কথক ও গায়ক কী বে-আক্কেলে লোক ছিলেন... শুধু পানি নয়, আল্লাকেও পুরে দিয়েছেন গানের ভিতর। লালন কিংবা দুদ্দু-শার পরিস্থিতিও কিন্তু খুব খারাপ। গোঁড়া মুসলমানের কাছে তাঁদের কথা পৌঁছনো বারণ, কেননা পুরাণ-টুরানের কথা আছে যে ওদের লেখায়। ফলে ওরা মুসলমানের কেউ নয়। উল্টোদিকে আবার এতে ভারি শঙ্কিত হয়ে কেউ কেউ ভাবেন, যাহ, লালনকেও হিন্দুরা কেড়ে নিয়ে যাবে? তাঁরা আবার তোড়জোড় করেন, লালনের সব গানেই আসলে কোরানের প্রতি নিঃশর্ত নিবেদন আছে তা প্রমাণ করার জন্য প্রায় কুস্তিগীরের মতো প্যাঁচ-রচনায় মশগুল হয়ে পড়েন তাঁরা।
৫
রবীন্দ্রনাথের ১১ চৈত্র, ১৩৪০ বাংলা সনে লেখা একখানি পত্রাংশ এদানি বেশ হইচই ফেলেছে। ঠাকুরের দিব্বি গেলে, তাঁর অন্য নানা কথা ঝোপ বুঝে মুলতুবি রেখে, গোরা মুলতুবি রেখে, ‘মুসলমানির গল্প’ ভুলে গিয়ে, ‘দালিয়া’ কিংবা ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ হটিয়ে, হেমন্তবালা দেবীকে লেখা পত্রসম্ভার নাকচ করে দিয়ে, এই পত্রখানি মাত্র, যেখানে তিনি সাহিত্যসমাজের রক্ষকের ভঙ্গিতে নিদান দিচ্ছেন, ভাষায় কী চলবে আর কী চলবে না, সেইটিকেই তুলে ধরা হয়েছে। যেসব লেখা ও বক্তৃতায় তিনি মুসলমান সমাজের সঙ্গে হিন্দুর অপরিচয়ের জন্য আক্ষেপ করেছেন, যেখানে স্পষ্ট ভঙ্গিতে দোষারোপ করেছেন দুই পক্ষকেই, আচারে ও গোঁড়ামিতে আটকে থাকার জন্য নিন্দা করেছেন উভয় সম্প্রদায়ের মানুষজনকে, এমনকি ধর্মগ্রন্থ গীতার প্রতি ক্ষোভ উগরে দিতেও কসুর করেননি লিখিত ভাবে— সেই সব প্রসঙ্গ যেন নেই-ই কোথাও। রবীন্দ্রনাথ বলে দিচ্ছেন, বাংলা ভাষায় হত্যা অর্থে খুন শব্দটি চলেছে, কিন্তু রক্ত অর্থে খুন বাতিল। যেন ডিক্রি জারি হয়ে গেল, যেন বুলডোজারের ধাক্কায় সাকিন ঠিকানা দুরমুশ, তাঁর মতে, রক্ত অর্থে খুন যেহেতু এতদিন চলেনি সমাজে, তাই এর পরেও আর কোনও দিন চলবেও না। অথচ এই তিনিই, এই রবীন্দ্রনাথই এ-চিঠির কাছাকাছি সময়েই কাজী ইমদাদুল হকের উপন্যাস ‘আবদুল্লাহ’ (১৯৩৩) পড়ে লিখিত ভাবেই জানিয়েছিলেন, খুশি হয়েছেন তিনি। লিখেছেন, এ বই পড়ে ‘মুসলমানের ঘরের কথা জানা গেল’। মজার কথা, সেই উপন্যাসে কিন্তু আম্মা, আব্বা, গোসল, গোশ্তের ছড়াছড়ি। কী মজার না? গোসল গোশ্ত, পানি, তস্বিহ, বাদ-জুম্মা ইত্যাদির পাশাপাশি, খালা, চাচারাও রয়েছে পষ্টাপষ্টি। ফুফা নয় শুধু, একেবারে ‘ফুফাজান’ অবদি আছে। কী আজব লোক রে ভাই! যিনি কিনা বলেছেন, ইউরেশীয় শব্দে তোমার বেশি লোভ থাকলে উর্দু ভাষায় লেখো গিয়ে, এই বাংলাপাড়ায় হুলোহুলি কোরোনিকো, কদিন বাদেই সেই তিনি-ই আবার লিখছেন, ওই সব ইউরেশীয় শব্দে বোঝাই উপন্যাস পড়ে তিনি ভারি খুশি হয়েচেন। সেই লোকটিই আবার তাঁর জীবনের শেষ গল্পের খসড়ায় একই সঙ্গে বাবা এবং বাপজান দুই-ই এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন একই সংলাপের ভিতরে। সে আবার অংশত লাভ-জেহাদের গল্প।
কিন্তু এরপরেও দুইখান কথা আছে। আগেপিছের কথা ছেড়ে যদি রবি ঠাকুরের ওই ফতোয়াটুকুই ধরি, ওই যেখানে উনি লিখছেন, বাংলায় রক্ত অর্থে খুন চলবেনি, হত্যা অর্থে চলবে, কারণ ‘সর্বজনের ভাষায় সেটা বেমালুম চলে গেছে’— ওইখানে ওই সর্বজনটি কে? সে কোথায় এসে নিজের এই অন্তিম ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাল? গোটা কথাটা একবার দেখি আসুন, অবিশ্যি, এইসব দেখে-ফেকে লাভ নেই কিছু, ও আপনি যে ঘৃণায় আছেন সেই তিমিরেই থাকবেন আমি জানি, নিজের এবং দিল্লি পুলিশের হয়ে চোখ-মাথা বেঁধে লড়তে গিয়ে একবার বাইশে শ্রাবণ একবার এগারোই জৈষ্ঠ্যে হাতড়ে বেড়াবেন আবারও, কিন্তু তবু অন্যরা তেলচিটে ঘৃণায় চিপকে যাবার আগে অন্তত একটিবার যদি খেয়াল করেন রবি ঠাকুরের কথাটা ঠিক কী ছিল, আর কেন তা চোক-মাথা বেঁধে মেনে নেওয়া মুশকিল, তাই আর কী... যাকগে, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন চিঠিতে,
আজকের বাংলা ভাষা যদি বাঙালী মুসলমানদের ভাব সুস্পষ্টরূপে ও সহজভাবে প্রকাশ করতে অক্ষম হয়, তবে তাঁরা বাংলা পরিত্যাগ করে উর্দ্দু গ্রহণ করতে পারেন। সেটা বাঙালী জাতির পক্ষে যতই দুঃখকর হোক না, বাংলা ভাষার মূল স্বরূপকে দুর্ব্যবহারের দ্বারা নিপীড়িত করলে সেটা আরো বেশি শোচনীয় হবে।
বাংলা ভাষায় সহজেই হাজার হাজার পারসী আরবী শব্দ চলে গেছে। তার মধ্যে আড়াআড়ি বা কৃত্রিম জেদের কোনো লক্ষণ নেই। কিন্তু যে-সব পারসী আরবী শব্দ সাধারণ্যে অপ্রচলিত অথবা হয়তো কোনো-এক শ্রেণীর মধ্যেই বদ্ধ, তাকে বাংলা ভাষার মধ্যে প্রক্ষেপ করাকে জবরদস্তি বলতেই হবে। হত্যা অর্থে খুন ব্যবহার করলে সেটা বেখাপ হয় না, বাংলায় সর্বজনের ভাষায় সেটা বেমালুম চলে গেছে। কিন্তু রক্ত অর্থে খুন চলেনি, তা নিয়ে তর্ক করা নিষ্ফল।
এইবার কথাটার ভিতরে একটু এগোই। যিনি বাংলা ভাষায় ‘বে-আব্রু’ চালিয়ে দিয়েছেন কোনও কিছুর তোয়াক্কা না-করে, এই উদ্ধৃতিতেই ‘জবরদস্তি’, ‘বেখাপ’, ‘বেমালুম’ ব্যবহার করেছেন অবলীলায়, তিনিই বাঙালি মুসলমানের জন্য নিদান দিচ্ছেন, তোমার ভাব সহজে যদি বাংলায় প্রকাশ করতে না-পার, তো উর্দুতে লেখো গিয়ে! আপনি বলতে পারেন, এখানে আসল কথাটা হল ‘সাধারণ্যে যা অপ্রচলিত’ সেই সব শব্দের ব্যবহার নিয়ে। যা সাধারণ লোক ব্যবহার করে তা চলবে, যা করে না তা চলবে না— মিটে গেল। তা কৃতাঞ্জলিপুটে জিগাই, ‘বে-আব্রু’ কি সাধারণ্যে প্রচলিত ছিল খুব? ‘জবরদস্তি’, ‘বেখাপ’ এবং ‘বেমালুম’— এগুলো? আপনার চারপাশে হয়তো ছিল, কিন্তু গোটা বাংলার অভিজ্ঞতায় ছিল কি? আপনি ব্যবহারের পরে লোকে বে-আব্রু ব্যবহার শিখেছে। আর কোনও শব্দ ‘সাধারণ্যে প্রচলিত’ হয় কীভাবে? ‘সাধারণ্যে’ বলতে ঠিক কোন লোকগুলিকে বোঝায়? বোলপুরে আর জোড়াসাঁকোর বাইরে আর কোথাও সাধারণ্য নেই? মেদিনীপুর আর মালদহের সাধারণ্য এক? মৈমনসিং আর সুন্দরবনের প্রচলনে ভেদ নেই? আসলে আপনার অভিজ্ঞতার, যোগাযোগের মানুষজন যেখানে ঘোরাফেরা করে সেইটে আপনার সাধারণ। তাছাড়া যদি ধরেও নিই, ‘বেমালুম’ এবং ‘জবরদস্তি’ ছিল আগে থেকেই, তাহলেও প্রশ্ন ওঠে, ওগুলো যখন তথাকথিত সাধারণ্যে প্রচলিত হতে শুরু করে, সেই শুরুর দিনে সেগুলিকেও জবরদস্তি মনে হওয়া কি অসম্ভব? আমরা তো জানি, কোলকাতা শহরের কেন্দ্রে বসে গোটা উনিশ শতক জুড়ে যে বাংলা ভাষাটা বানিয়ে তোলা হল কাঁটা বাছার মতো করে শব্দ বেছে বেছে, সেই বিশেষ সাময়িকপত্র ও গ্রন্থ-কেতাবের ভদ্র পরিসরে তথাকথিত ছোটোলোকদের রঙ্গ তামাশা, সঙ, বারবার ধিকৃত হয়েছে। বাবুদের মনে হয়েছে বিপজ্জনক। তাঁরা যে-সব শব্দ এবং ভণিতির উপর ‘টেস্টেড, ওকে’-র লেবেল সেঁটে দেবেন সেইগুলিই শুধু থাকবে ভাষায়— এ খবরদারি তো চলেছে উনিশ শতকের বাংলায়। শুধু আরবি ফারসি নয়, দেশি সরস্বতীর দেশি ইতরসন্তানদের যেভাবে ঢিঁট করা হয়েছিল তার খতেন ধরা আছে নানা গবেষণা গ্রন্থে। এ কেবল ফারসি আরবি উর্দুর ব্যাপারও নয়, আসল কথাটা হল, আমরা যে বাংলাটা গড়ে দিইচি বাপু, সেইটেই বাংলা। কবিগান, জেলেপাড়ার সঙ সাজিয়ে সোজা এসে বৈঠকখানায় উটে পড়বে তোমরা তা তো চলতে পারে না। নীলদর্পণ-এর তোরাপ কিংবা আদুরি— তোরা ভদ্রজনের লেখা নাটকে পার্শ্বচরিত্র হয়ে থাকবি, উটতে বললে উটবি, বসতে বললে বসবি। যেমন ভাষায় কতা কোস, আমাদের নাটকে তার দু-একটা নমুনা দেখাবি, আমরা তোদের নিয়ে কত ভাবিত সেসব দেখানো হয়ে গেলেই সুড় সুড় করে বিদেয় হবি— বাংলা ভাষা আমাদের, সেখানে আসন পাততে চাস কোন আক্কেলে? আমাদের গড়ে দেওয়া ভাষার এলাকায় থাকলে থাকবি, নইলে উর্দুতে গিয়ে থাক। এমনকি শরৎচন্দ্র, হিন্দু মহাসভার সঙ্গে এককালে বেশ যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল তাঁর, একাধিক লেখা কুড়িয়ে বাড়িয়ে এনে মাঝেমাঝেই দেখানো হয়, কীভাবে ও কতটা সচেতন ছিলেন তিনি মুসলমানদের ‘বদমাইশি’ বিষয়ে— হিন্দু মুসলমানের সম্প্রীতির অন্যতম বাধা যে মুসলমানদের একবগ্গা গোঁড়ামি— এমন ধারা কথা তিনি বলেওছেন বটে— সেই তাঁকে নিয়েও যে মুশকিল। যেসব লেখা তাঁকে অমর করেছে তার অন্যতম হল ‘মহেশ’। মূলচরিত্র গফুর আর আমিনা। কিন্তু তাদের গৃহপালিত প্রাণির নাম মহেশ; আব্বাস কিংবা খালিদ কিংবা ফারুক নয়। এবং সাধারণ্যে বেশ অপ্রচলিত ‘তোবা তোবা’ সে গল্পে থাকে বহাল তবিয়ত। ‘সম্মান’ ও ‘আবরণের’ বদলে গল্পে ‘ইজ্জত’ ও ‘আব্রু’ লিখেছেন শরৎচন্দ্র। এসব শব্দ কোলকাতার সাময়িকপত্র শাসিত বাংলা-সাধারণ্যে বিশেষ প্রচলিত ছিল কি? কিন্তু গফুর আমিনার সাধারণ্যে যে ছিল, তা নিশ্চিত। গল্পের বাইরে চলে যাবার আগে মহেশের কথা ভেবে স্মরণীয় যে বাক্যটি বলে যায় গফুর, সেখানে জ্বলজ্বল করে, ‘আল্লা’ এবং ‘কসুর’। ‘ভগবান’ এবং ‘অপরাধ’ নয় : ‘আল্লা! আমাকে যত খুশি সাজা দিয়ো, কিন্তু... যে তোমার দেওয়া মাঠের ঘাস, তোমার দেওয়া তেষ্টার জল তাকে খেতে দেয়নি, তার কসুর তুমি ক্ষমা কোরো না।’
ওহো, আমারই বোধহয় ভুল হচ্ছে। এ তো আসলে সংলাপ, ওখানে চলতেই পারে আল্লা-খোদা, আব্বা, কসুর ইত্যাকার আলফাল শব্দ। ওগুলো তো চরিত্রের ভাষা। ওখানে ওসব বিচ্যুতি চলিবেক। কিন্তু তোরাপ কিংবা গফুর যদি গল্প-প্রবন্ধ লিখবে বলে পণ করে, তবে তো তাদের নিদেন মেনেই চলতে হবে। গল্পে আমাদের পালিত চরিত্রের জন্য যেটুক সুযোগ সুবিধা লাগে আমরা দেব বইকি, আমরা হলেম মানবতাবাদী। কিন্তু তা বলে তারা গল্প ছেড়ে বেইরে আসতে চায়? তা আবার বুলি-সমেত? যেসব শব্দ আমরা মেনে নিইচি, মাঝে মাঝে আমাদের উদারতার নমুনা হিসেবে সেগুলো থাকবে, যেগুলো আমাদের না-পসন্দ সেগুলো নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বলব, ‘তর্ক নিষ্ফল’।
কিন্তু এর পরেও মনে রাখতে হবে যে, ওই মানুষটির নাম রবীন্দ্রনাথ। খপ করে তাঁকে প্রয়োজন মতো মাপে আঁটিয়ে ফেলা প্রায় অসম্ভব। উক্ত চিঠির বেশ কিছুদিন, মানে প্রায় সাত বছর পরে, সাহিত্যিক আবুল ফজল নিজের দুটি বই রবীন্দ্রনাথকে পাঠান। সঙ্গে একটি ভক্তি-নম্র চিঠি। নিজের বইদুটি সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন,
বঙ্গের পূর্বে সীমান্তবাসী মুসলমান সমাজ ও পরিবার জীবনের কিছু কিছু ছবি আঁকবার চেষ্টা করা হয়েছে, ফলে তাদের মুখের ও জীবনের, সাহিত্যে এখনও অপ্রচলিত বহু শব্দ ও প্রকাশ ভঙ্গিমা বাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি এবং আমার বিশ্বাস মুসলমান সমাজের ছবি আঁকতে গেলেই এ রকম বহু অপ্রচলিত শব্দ বাংলা ভাষাকে হজম করতেই হবে।
১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে, আবুল ফজলের পাঠানো দুটি বই পড়ে তাঁকে একখানি ফিরতি-পত্র লেখেন রবীন্দ্রনাথ। নিজের ওই খুন বিষয়ক মত তিনি পাল্টাননি, সে মতে অটল থেকেও লিখেছিলেন এই কথাগুলি, মৃত্যুর বছর খানেক আগে—
শক্তিমান মুসলমান লেখকেরা বাংলা সাহিত্যে মুসলমান জীবনযাত্রার বর্ণনা যথেষ্ট পরিমাণে করেন নি, এ অভাব সম্প্রদায়-নির্বিশেষে সমস্ত সাহিত্যের অভাব। এই জীবনযাত্রার যথোচিত পরিচয় আমাদের পক্ষে অত্যাবশ্যক। এই পরিচয় দেবার উপলক্ষে মুসলমান সমাজের নিত্যব্যবহৃত শব্দ যদি ভাষায় স্বতই প্রবেশলাভ করে তবে তাতে সাহিত্যের ক্ষতি হবে না, বরং বলবৃদ্ধি হবে, বাংলা ভাষার অভিব্যক্তির ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত আছে...
সাধারণ্যে যা প্রচলিত নয় তা ভাষার মধ্যে আনা অনুচিত, যিনি তা করবেন তিনি অন্য ভাষায় লিখুন— এই কথা বলার সাত বছর বাদে তিনিই জানালেন, মুসলমানের জীবনযাত্রার যথোচিত পরিচয় দেবার স্বার্থে তাদের নিত্যব্যবহৃত শব্দাবলি যদি ‘ভাষায়’ অর্থাৎ বাংলাভাষায় ‘স্বতই’ ঢুকে আসে, তাতে বাংলা সাহিত্যের শক্তি বাড়বে। এবং বাংলাভাষা ফুটে ওঠার, অভিব্যক্ত হওয়ার ইতিহাসে এই উদাহরণ আগেও ছিল। তথাকথিত সাধারণ্যে অপ্রচলিত শব্দ ভাষার আয়ত্ত্ব হলে যে ভাষার শক্তি বাড়ে এ কথা রবীন্দ্রনাথের মতো করে জানে আর কেউ? হ্যাঁ, মৃত্যুর বছর খানেক আগের এই মতটি এইটেকে বলে রবীন্দ্রনাথ। ওঁর কথায় আপত্তি করতে গিয়ে, রেগে উঠতে গিয়ে, ব্যথিত হতে গিয়ে দেখা যায়, আগেই তিনি নিজে সে ব্যথা নিয়ে বসে আছেন, নিজেকে করে তুলেছেন আরও কিছুটা মানব-বেদনা-ঘনিষ্ঠ। ওঁকে খামচে, কেটে পকেটে পুরে ফেলতে পারা শক্ত। তার পর প্রায় পঁচাশি বছর পেরিয়েছে। মুসলমানের নিত্য ব্যবহৃত শব্দ একটি-দুটি করে বাংলা ভাষায় প্রবেশ লাভ করার সময় কি হল? রবিঠাকুর যে ভেবেছিলেন, এতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষতি তো নয়ই বরং বলবৃদ্ধি হবে, সেই আশা কি সফল হল? এক ফুফু, আপা, আব্বা নিয়েই এখনও যা ধুন্ধুমার কাণ্ড তাতে আশা ক্রমে দুরাশায় ঠেকেছে মনে হয়।
৬
আমাদের পূর্বোল্লিখিত দুইখান কথার দ্বিতীয়টি হচ্ছে ‘জবরদস্তি’ নিয়ে। ঠিক কোন কোন জায়গায় জবরদস্তি হচ্ছে এখন বাংলা ভাষায়? গোসল বলতেই হবে স্নান বলা চলবে না, কিংবা আজ থেকে মা বললেই পিটিয়ে সিধে করে দেব, আম্মা বলা চাই— এমন কোনও হুড়ুমতাল হচ্ছে নাকি পশ্চিমবঙ্গে? নাকি শয়ে শয়ে বছর ধরে ওই ‘ওরা’ গোসল, নাশ্তা/নাস্তা বলেই চলবে কেন এই নিয়ে খোঁচাখুঁচি হচ্ছে আসলে? গোসলের পানিতে বাংলা সাহিত্য ভেসে যাচ্ছে, ভাষাটাই উঠে যাবে এইবার— এইসব ভূত-নাচানো ভয়-সৃষ্টিকারী কারা? গত ত্রিশ-চল্লিশ বছরের বাংলা সাহিত্যে কিংবা তার আগেও— গল্প উপন্যাস প্রবন্ধে এমন ছমছমে গোসলের পানি, বিশ্বাস করুন, চোখে পড়েনি। আমার ন্যাবা হয়ে থাকার সম্ভাবনা যেমন আছে, তেমনি আপনার শিরায় ঘৃণার পলি পড়ে থাকাও অসম্ভব নয়। আব্বা-আম্মাও যেটুক যা এসেছে সাহিত্যে, তা ওই পাত্রপাত্রীর মুখেই, লেখকের বয়ানে তেমন নয়। মানে অন্তত ভাষা একেবারে ভেসে যাবার মতো নয়। এমনকি একেবারে মুসলমান ঘরের জীবনযাত্রা নিয়ে লেখা কাহিনিগুলিতেও মোটের উপর তাই। রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিমে মানভূম-জঙ্গলমহল কিংবা উত্তরে ধুপগুড়ি- আলিপুরদুয়ার অঞ্চলের লেখকেরাও চরিত্রের মুখে তাঁদের ‘সাধারণ্যে’ প্রচলিত শব্দ বসান বটে, কিন্তু তার বাইরে, লেখকের নিজের বয়ানে মূলত জোড়াসাঁকো-বালিগন্জো-শান্তিপুরের যে ‘সাধারণ্য’, তাকেই মাথা নুইয়ে মানেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে অশেষ অবদান আছে যে কজন মানুষের, তাঁদের অন্যতম হলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। বাংলা ভাষার প্রকৃতি, সংস্কার, শক্তি, উন্নতি ইত্যাদি নিয়ে তাঁর ভাবনার শেষ ছিল না। তাঁর দুটি নিবন্ধ থেকে একটুখানি যদি এখানে উদ্ধৃত করি, অপরাধ নেবেন না ভাষা-মহাজনেরা। ‘নূতন কথা গড়া’ প্রবন্ধে লিখেছেন হরপ্রসাদ—
যে পারস্য-ভাষায় প্রায় ৭০০ শত বৎসর ধরিয়া দেশের প্রধান প্রধান কার্য সম্পন্ন হইয়াছে, ভদ্রসমাজে কথিত বাংলা ভাষায় শতকরা ৫০টি কথা যে ভাষা হইতে গৃহীত, বাংলা ব্যাকরণের হাড়ে হাড়ে যে ভাষা বিন্ধিয়া আছে, যে ভাষার কথা ব্যবহার করিলে দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা বুঝিতে পারে, আমরা প্রাণপণে সে ভাষার কথাগুলি লিখিত ভাষা হইতে দূর করিবার চেষ্টা করি। নালিশ বলিলে সকলে বুঝিতে পারে; কিন্তু তাহা ত্যাগ করিয়া গ্রন্থকারেরা অভিযোগ লেখেন।
দ্বিতীয়টি আরও চিত্তাকর্ষক। একেবারে পিলে চমকানো। খেয়াল করব, এই লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রের পত্রিকা ‘বঙ্গদর্শন’-এ। বঙ্কিম তখন আর সম্পাদক নেই অবশ্য, কিন্তু একই দোর্দণ্ডপ্রতাপ হয়েই আছেন তখনও। সেই পত্রিকার ‘বাংলা ভাষা’ শীর্ষক নিবন্ধের একেবারে শেষে যা লিখেছেন হরপ্রসাদ তা হুবহু তুলে দিচ্ছি। মনে রাখব, প্রায় দেড়শো বছর পার হয়ে গেছে মাঝে। পরিপ্রেক্ষিতও কিছু আলাদা। কিন্তু মূল সুরটি এখনও যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক—
বিশুদ্ধ বাংলা কী ছিল, তাহা জানিবার উপায় নাই। এ অবস্থায় আমাদের মতো লেখকদের গতি কী? হয়, ইংরেজি, পারসি, বাংলা ও সংস্কৃতময় যে ভাষায় ব্রিটিশ ইণ্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনাদি প্রসিদ্ধ ভদ্রসমাজে কথাবার্তা চলে সেই ভাষায় লেখা, না-হয়, যাহার যেমন ভাষা যোগায় সেই ভাষায় নিজের ভাব ব্যক্ত করা। এই সিদ্ধান্তের প্রতি যাঁহাদের আপত্তি আছে, তাঁহারা কিরূপ ভাষাকে বিশুদ্ধ বাংলাভাষা বলেন, প্রকাশ করিয়া বলিলে গরিব লোকের যথেষ্ট উপকার করা হয়। যতদিন না বলিতে পারেন, ততদিন কুঠার আঘাত বিষয়ে তাঁহাদের কিছুমাত্র অধিকার নাই।
বোঝাই যাচ্ছে, এই শাস্ত্রীমশাই নির্ঘাৎ কোনও মাকুকুলতিলক কিংবা মোল্লাশিরোমণি। অথবা দুই-ই। এ কি সেই ব্যক্তি যিনি বাংলা ভাষার প্রথম নমুনা আবিষ্কার করেছিলেন— যাকে লোক চর্যাগীতি বলে চেনে— সেই চর্যাগীতি, যাতে মুসলমানের শব্দ ‘পানি’ ছিল হিন্দুর শব্দ ‘জল’-এর চাইতে বেশি। বাংলার পানি যে ফারসি আসার আগে থেকেই বাংলাভাষায় ছিল, এক্ষেত্রে ফারসির কণামাত্র কৃতিত্ব নাই, সেকথা এই মক্কেলের ওই কেতাব আবিষ্কারের চক্করে পাকাপোক্ত হয়ে আছে। ভাষা-কুস্তির সময় ভবিষ্যতের মাকুরা যাতে ব্যবহার করার মতো একটা উদাহরণ পায় হাতে, এ লোক তার বন্দোবস্ত করে গেছে সেই কবে! মোটেও সুবিধার লোক নয়। তাই না?
অন্ত্য কথা
কিন্তু এত তর্ক উঠছে কেন এখন? কথা তো ছিল অন্য। কথা দরকার ছিল বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপরে তথাকথিত হিন্দি বলয়ের বিরাগ বিষয়ে। বহু বহু দিন ধরেই হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতিকে একটি গোটা দেশের একচ্ছত্র মালিক করে তোলার লাগাতার চেষ্টা চলেছে। নানা অছিলায়, নানা কৌশলে। মাঝে মাঝেই সেসব চেষ্টা ফেঁসে গেছে প্রতিরোধে, কিন্তু হাল তারা ছাড়েনি। বিশেষ করে বলিউড লেলিয়ে (রাগ করবেন না বন্ধুরা, বলিউডে বহু ভালো কাজ হয়, তার কদর করি, আমরা কাজ নিয়ে বলছি না, ছবির বাণিজ্য-পন্থা নিয়ে, সাংস্কৃতিক অভিসন্ধির কথা বলছি মূলত) ঘুর পথে সারা ভারত গিলে খাবার চেষ্টা করে গেছে। তারই অংশ হিসেবে বাংলা ভাষায় কথা বলতে দেখলেই একরকম গা-জ্বলুনি হয় ওদের। মাত্র কিছুদিন আগে দিল্লির বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় মাছ বিক্রি চলবে না— বলে তেড়ে এসেছিল। বাঙালির উপর ক্রোধ, বেয়াড়া হিসেবে খ্যাত বাঙালির অবাধ্যতায় বিরক্ত এবং অস্থির হিন্দিবলয় বিজেপি জমানায় আরও খুল্লামখুল্লা, আরও বেলাগাম হয়েছে। বাঙালির প্রতি ঘৃণা ও আক্রোশ, বাংলা ভাষার উপরেও আছড়ে পড়বে এ তো স্বাভাবিক। আর এই ক্রোধ এবং সন্দেহ উগরে দেওয়া সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ স্থান হল হিন্দি বলয়ে বাধ্যত কর্মরত, ঘরছাড়া, প্রবাসী শ্রমিক মহল্লা। তার প্রথম ধাপ ছিল ভাষাটিকেই অস্বীকার করা, দিল্লি পুলিশের কর্মকর্তারা জানেন না ভারতে বাংলাভাষা বলে একটি ভাষা আছে তা তো হতে পারে না। তবে কেন তাঁরা লিখলেন, ‘বাংলাদেশি ভাষায়’ লেখা ডকুমেন্ট চেক করতে হবে? বাংলা ভাষাটাকেই হয় তাঁরা মনে মনে বিদেশি স্থির করে নিয়েছেন, বাংলা ভাষা কেবল বাংলাদেশেই আছে, ভারতে নেই আর। ফলে ওটিকে এখন থেকে বাংলা না-বলে বাংলাদেশি বলাই ভালো। খেয়াল রাখেননি দেশের সংবিধান— যাকে প্রায় রোজ বিজেপি শাসকেরা খর্ব করার চেষ্টা করে থাকেন— সেই সংবিধানে বাংলা এখনও মর্যাদার সঙ্গে স্বীকৃত। আর নয়তো, ধৃত লোকগুলোকে আগে থেকেই ধরে নিয়েছেন বাংলাদেশি। ফলে তাদের ভাষা তো বাংলাদেশি ভাষাই হবে— কেননা, ইতালিয়দের ভাষা ইতালীয়, ফরাসীদের ভাষা ফরাসি, জার্মানির ভাষা জর্মন। আর ওই ধৃতদের ভাষা মোটেই বাংলা নয়। মানে ওঁদের মতে যা বাংলা তেমন নয়।
এই পর্যন্ত ব্যাপার একরকম। এই অসভ্য, নির্বোধ, হিংস্র বিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে যখন সব বাঙালির একসঙ্গে রাস্তাঘাট তোলপাড় করে দেওয়ার কথা, বাংলা ভাষা শুধু নয়, আসলে পশ্চিমবাংলাকেই ভারতের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র মনে হওয়ার কথা, তখনই দেখা গেল জনৈক মালবসন্তান আরও স্পষ্ট করে বলেই দিলেন, বাংলা বলে ভাষাই নেই। ভ্যাবাচাকা খাওয়ার পালা ফুরোতে না ফুরোতেই, আমাদের বাংলারই একদল সুশিক্ষিত মানুষ মালবসন্তানের ওই টুইটের প্রথম বাক্য বিষয়ে, ‘আহা ওইটে উনি ঠিক বলেননি হয়তো, কিন্তু...’ বলে বাংলা ভাষা কীভাবে মুসলমানের হাতে বিনষ্ট হয়ে যাবার জোগাড় তা নিয়ে নেমে পড়লেন আসরে। এতে তিনখান লাভ হল তাঁদের। এক, অসভ্য দিল্লি পুলিশ এবং অসভ্য মালব্য যে অপরাধ করেছিলেন তা থেকে ঈষৎ নজর ঘুরল; দুই, বাংলা ভাষায় এত খুন কেন, মানে এত আরবি ফারসি কেন— এই নিয়ে বহু পুরাতন ঘিনঘিনে হিংসেপনা আবার খানিক চর্চা করা গেল, ওই সুনীতিকুমার যাকে বলেছিলেন হাস্যকর ‘আর্য্যামি’— সেই জিনিস আর একবার ঝালিয়ে নেওয়া হল; আর তিন, এই গোটা ব্যাপারটি যে ঘরছাড়া, গরিব প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে শুরু হয়েছিল সেটিও বেশ উবে গেল। এইটে বেশ উলিয়েঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, ঠিকঠাক বাংলা বললে কেউ মারে না, ভুলভাল বাংলা বললেই সন্দ সন্দ হয়— উয়ারা বাংলাদেশি বটেক? তো কোথায় যাব বাবুসকল, ঠিকঠাক বাংলা বলতি পাল্লে তো ইতিহাস ভূগোলই অন্যরকম হত বাপজান, উত্তর দক্ষিণ চব্বিশ চব্বিশ পরগণা ছেড়ে বালিগঞ্জো, কেয়াতলা, কালিঘাট কিংবা তালতলায় গিয়ে উঠতুম— চেকনাই বাংলা বলতুম সাজিয়ে গুছুয়ে, কখ্খনো খুন বলতুম না, অক্ত বলতুম, হ্যাঁ কে হ্যাঁ-ই বলতুম, হঁ বলতুম না পুরুল্যার লোকেদের মতো— ওই যাকে সুরেলা করে ‘পুরুলিয়া’ উচ্চারণ না-করলে আপনেরা হেসে হেসে বলেন, এ বাবা, জানে না, দেখো, গাঁইয়া, ওই তাদের মতো কথা বলতুম, লিখতুম একটুন ভেবলে না-গিয়ে। আমরা বাংলাই বলি বাবুবিবিরা, আমাদের ঘরের ছাওয়াল-বেটিরা যখন কলকাতায় পড়তে-লিখতে যায়, তখন ক্লাসে পড়ার ফাঁকে এক টুকরা পুরুল্যা-মানভূম টসকে বেরোঁই গেলে লোকে হেসে কুটিপাটি হয়— ‘এ বাবা বাংলা জানে না’ বলে কত আদর করে তখন, আর কোচবিহার থেকে এলে তো কতাই নাই, বলে বাংলাদেশ থেকে এয়েচ বাবারা? কতায় এত বাঙ্গাল টান তোমাদের, ‘কইর্যে’ বল কেন? ‘করে’ বলতে পার না? ক্যান? কী সুন্দর করে হাসে ওরা, ঝলমল করে হাসে, আমরা ওই হাসির দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি গো আমাদের অন্য বাংলাভাষা নিয়ে। আমাদের মুখে চোখে কাঠ-শুক্না নদীনালা ফুটে উঠতে থাকে, ভরভরন্ত মাতলা-গোসাবা কুল ছাপিয়ে বয়। তা এখন তারাই আবার আব্বু-আম্মু লিয়ে এট্টু হেঁসে লিচ্ছে, লেক। কথায় বলে, হাঁসির দাম লাখ মোহর আছে।
তা বাবুদের একটি কথা বলে এইবার ক্ষান্ত হই। যে-ঔদ্ধত্যে কোলকাতার এবং তার আশপাশের ভাষাকে একমাত্র বাংলা বলে, সাধারণ্যে প্রচলিত বলে মানতে বলছেন, আর বাকিদের বলছেন খালাস, ওই একই ধাঁচের (আরও খতরনাক, আরও আগ্রাসী) কসরতে দিল্লি পুলিশ আর মালবপুত্রও বলছে বাংলা ভাষাটিই নেই, বাংলাদেশি আছে। আর তার সুরে মিলিয়ে-জুলিয়ে একদল বলছেন বাংলাদেশি ভাষা আছে তো, কিন্তু ওটা তো বাংলা নয় মোটে। ওই যেখানে বাবা-মা থাকে না, আব্বু-আম্মু থাকে, সেইটে। এই পর্বটায় মালবসন্তানের সঙ্গে থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন যাঁরা, তাঁরা জেনে রাখুন, পরের ধাপে মালবের তির উড়ে আসছে আপনার দিকেও। শ্রমিকের দুর্বলতার সুযোগে ওদেরকে দেখে নেওয়া হচ্ছে আগে। আপনারা ভাবছেন বাংলাদেশের লোকজনেরা মেলাই আরবি-ফার্সি-উর্দু শব্দ ব্যবহার করে তো, তাই ওদের ধরাই উচিত, ওরা তো আমাদের বাংলাকে খতম করে দেবে তা নইলে। কিন্তু শুধু আরবি ফার্সি মালপত্তর বলে নয়, গরিবগুর্বো শ্রমিক ক্যানিং, লক্ষ্মীকান্তপুর, বাঁকড়ো, মল্লারপুর, গাজোল, রঘুনাথগঞ্জ থেকে যায় বিভুঁইয়ে কাজের খোঁজে, পাড়ায়, গাঁয়ে, মফস্সলে, শহরে কাজ নেই বলেই যায়, তাদের ভাষাও এমন বহু ‘সাধারণ্যে অপ্রচলিত’ শব্দের সুবাসে ম-ম করে। সে-সব শব্দও আপনাদের অজানা। এই যেমন, নানা এবং নানি শব্দদুটিকে আপনাদের মনে হয় ফারসি-আরবি হবে নির্ঘাৎ, কেননা মুসলমানেরা বলে যে, ওরা দাদু কেন বলবে না যদি বাঙালি হয়? আপনাদের ‘সাধারণে’, বাবুমশাইরা, ওইটিই একমাত্র অভিজ্ঞতা। আপনি খেয়ালই করেন না, কেবল হিন্দিতেই চলে তা নয়, নানা একটি মুন্ডারি শব্দও বপ্টে। মারাঠিরাও প্রায় একই অর্থ ব্যবহার করে থাকেন। মারাঠি বলতে মনে পড়ল, মারাঠি সংস্কৃতির শান জড়িয়ে আছে যে রাজশক্তির নামধামের সঙ্গে সেই রাজত্বে বহুব্যবহৃত ‘পেশওয়া’ শব্দটি কিন্তু ফার্সি। তার মানে সামনে-থাকা, নেতৃত্ব-দেওয়া বীর। সাড়ে সব্বোনাশ। পেশওয়া শব্দটি মারাঠি ভাষা থেকে ঝেড়ে ফেলে তার বদলে যদি সেনাধিপতি, সেনানায়ক ইত্যাদি চালু করা হয় কী হবে তখন?
অনেক গ্রামে গঞ্জে একটি নিষ্ঠুর প্রবাদ চালু আছে— একেক জায়গায় একেক রকম তার ঢঙ— ‘ভাতার মরে মরুক, তবু সতীন হোক বিধবা’। বাংলা ভাষার অঙ্গচ্ছেদ হয় হোক, বাংলাভাষী চরম বিপদে পড়ে পড়ুক, তবু ‘মোল্লাদের’ যেন ট্যাঁ-ফোঁ শোনা না-যায়। এটা যে আদতে বাংলাভাষার উপর আক্রমণ হচ্ছে তা ভুলে থাকব, গোসল-বলা লোকগুলি যেন টাইট হয় খানিক। মুসলমান বাঙালি মাত্রই পণ করে স্নান/চান/ গা-ধোওয়া বলেন না, কেবল গোসলই করেন তাঁরা, মা-শব্দটি মুখে আনেন না কদাচ, তোবা তোবা, সক্কলে নিয়ম করে আম্মা-ই বলেন শুধু, টিফিন কিংবা জলখাবার বললেই তাঁদের ফিট্ লাগে, তাই সমস্ত মুসলমানই নাশ্তা খান-- এ কিন্তু একটা কুৎসিত মিথ-- কেবল কল্পনায় শত্রু না-গড়ে, গাঁ-গঞ্জ, শহর-মফস্সল ঢুঁড়ে দেখে নিতে পারেন একবার। কিন্তু টাইট দেবার উদগ্র বাসনায়, ঘৃণা করার জন্য, অপর এবং ওরা বানাবার জন্য একটা অজুহাত চাই যে। মাঝখান থেকে এই টাইট দেবার চক্করে বাংলা ভাষার উপরে দীর্ঘদিন ধরে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের প্রবক্তারা যে আক্রমণ চালিয়ে এসেছেন তা অবলীলায় অগ্রাহ্য করছি, করে এসেছি। খেয়াল করছি না, ঘরছাড়া শ্রমিকদের প্রথমেই বিদেশি ঠাউরে হেনস্থা করা আসলে বাংলা ভাষায় কথা-বলা লোকেদের উপর, বাঙালির উপর আক্রমণ। আসলে ওঁদের যাবৎ পরিশ্রম ধাবিত হচ্ছে এই অঙ্কের দিকে— মেনে নাও, ওরা যা বলে সেটা বাংলা ভাষা নয়, অথবা মেনে নাও ওরা বাঙালিই নয় আসলে। আবার অন্যদিকে এটি কেবল বাঙালি ও বাংলা ভাষার লড়াই মনে করে খুব তেড়ে পাল্টা দিচ্ছেন যাঁরা, তাঁরাও ভেবে দেখছেন না, অন্তত এই ধাপে এটি কেবল ভাষায় আক্রমণ নেই, এটি বাংলায় দীর্ঘদিন ধরে প্রান্তে ঠেলে রাখা শ্রমজীবীদের একহাত নেওয়ার চক্রান্তও বটে। সেই শ্রমিকদের দলে হিন্দু মুসলিম দুই-ই আছে। মুসলিমদের বেশ বাগে পাওয়া গেছে ভেবে যাঁরা উৎফুল্ল, তাঁরা আসলে বাকি হিন্দুদের তেমন ‘সাধারণ্য’ বলে ভাবেননি কোনওদিন। সে ইতিহাসও খুব গভীর এবং অতি বেদনাবহ।
প্রকাশের তারিখ: ১৩-আগস্ট-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
