Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

স্তালিনের প্রজ্ঞা: শিল্প সাহিত্যে

হীরেন ভট্টাচার্য
বুর্জোয়া উত্তরাধিকারের ইতিবাচক উপাদানগুলি সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে কমরেড স্তালিনের ধৈর্য্যশীল পদক্ষেপ পুরোপুরিভাবে 'লেনিনিক'। লেনিন তাঁর বহু রচনায় বারবার এই কথার উপর জোর দিয়েছেন যে বুর্জোয়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ইটকাঠ দিয়েই আমাদের সমাজতন্ত্র গড়তে হবে; সমাজতন্ত্র আকাশ থেকে পড়বে না। সমাজতন্ত্র গড়ার উপাদানগুলির মধ্যে সোভিয়েতের নিজস্ব উপাদান হচ্ছে একমাত্র সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট শ্রমিকরা, কিন্তু এ'দের সম্পর্কে লেনিন বলেছেন- "এরা যথেষ্ট শিক্ষিত নয়। শ্রেষ্ঠ যন্ত্র গড়ে দিতে তারা উৎসুক। কিন্তু কী করে তা করতে হবে তা তারা জানে না। সেটা তারা করতে পারে না। তার জন্য যে বিকাশ মাত্রা, যে সংস্কৃতি দরকার সেটা এখনো পর্যন্ত তারা অর্জন করেনি।"
Stalin's Prescience: Art in Literature

একটা কথা প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায় শিল্প সাহিত্যের ক্ষেত্রে কমরেড স্তালিন 'সহিষ্ণু' ছিলেন! তার প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়, তিনি বুর্জোয়া-পন্থী সোভিয়েত-বিরোধী নাট্যকার বুলগাকভকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেছেন, প্রতিক্রিয়াশীল গোলোভানবকে 'সংশোধনের অতীত' বলে মনে করতেন না; যে স্তানিস্লাভ্‌স্কি বলেছেন 'লাল ঝাণ্ডা নিয়ে মিছিলে যোগদান করায় আমাদের কোন আগ্রহ ছিলনা', সেই স্তানিস্লাভ্‌স্কির প্রতি তিনি শুধু উদারতাই দেখাননি তাঁকে 'অর্ডার অব রেড ব্যানার' এবং 'অর্ডার অব লেনিনে' ভূষিত করেছেন। এই সব নজীর দেখিয়েই বলা হয় স্তালিন শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে 'সহিষ্ণু' ছিলেন। কিন্তু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলে বোঝা যায় এটা স্তালিনের সুকৃতির প্রশংসা নয়, বরং পরোক্ষ নিন্দাত্মক সমালোচনা। হঠাৎ অন্য সব ছেড়ে শিল্প-সাহিত্যে তাঁর 'সহিষ্ণুতা'র বিশেষ উল্লেখের মানে দাঁড়ায় অন্যান্য ক্ষেত্রে বিশেষ করে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তাঁর সহিষ্ণুতার অভাব ছিল! কিন্তু প্রকৃত ঘটনা আদৌ তা নয়। তাঁর সাংস্কৃতিক সহিষ্ণুতার পাশাপাশি তাঁর অর্থনৈতিক রাজনৈতিক কর্ম-কাণ্ডের আলোচনা করলে দেখা যাবে, তাঁর সমস্ত ধ্যান-ধারনা, চিন্তা ও কর্ম একই ঐক্য সূত্রে বিধৃত; আর সে সূত্র মার্কস-এঙ্গেল্স লেনিনের চিন্তাধারার সঙ্গে নিখুঁতভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। 

কমরেড স্তালিন ভালভাবেই জানতেন যে দুনিয়াটা অত্যুৎসাহের বেগে বল্‌গাহীন ঘোড়ার মত লাফিয়ে চলে না, চলে বিশেষ নিয়মের (Laws-এর) কঠিন নিয়ন্ত্রণে। বিপ্লবী আবেগের আতিশয্যে সে নিয়ম লঙ্ঘন করে দ্রুত অগ্রগতি সাধনের কোন short cut নেই এই দুনিয়ার নিয়মের রাজত্বে। নিয়ম ('Laws of society') ভঙ্গ করে কোন রাজনৈতিক শক্তি সমাজের উপর কিছু জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইলে যেটা ঘটে সেটা প্রগতি নয় বিশৃংখলা! সোভিয়েত বিপ্লবের সাফল্যের একটা স্তরে সোভিয়েতের কিছু কিছু অত্যুৎসাহী অসহিষ্ণু বিপ্লবী ভেবেছিলেন (স্তালিনের ভাষায়)- 

"Soviet Government can do 'any thing', that nothing is beyond it, that it can abolish scientific laws and form new ones," 

কিন্তু কমরেড স্তালিন জানতেন-

"Marxism regards laws of science whether they be laws of natural science or laws of political economy as the reflection of the objective processes which take place independently of the will of man. Man may discover these laws, get to know them, reckon with them in his activities and utilize them in the interest of society, but he cannot change or abolish them, Still less can he form or create new laws of science."

কি অর্থনীতি, কি রাজনীতি, কি সংস্কৃতি সকল জগতেরই নিজস্ব কিছু কিছু নিয়ম কানুন আছে; এই সব নিয়ম কানুনকে উড়িয়ে দিয়ে সমাজের বিকাশ বা পরিবর্তন সাধন করা যায় না। নিয়মকে মেনেই প্রকৃতি ও সমাজের উপর মানুষ প্রভুত্ব করতে পারে। মানুষ যে প্রকৃতির বিদ্যুৎ শক্তির উপর বা আনবিক শক্তির উপর আজ প্রভুত্ব বিস্তার করতে পেরেছে তা বৈদ্যুতিক বা আনবিক নিয়মকে ইচ্ছামত লঙ্ঘন করে নয়, বরং নিয়মকে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে আয়ত্ত করেই। নিয়মকে আয়ত্ত করে, নিয়মকে মেনে সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করার প্রজ্ঞা যাঁর আছে কর্মের ক্ষেত্রে সহিষ্ণুতা তাঁর আপনি এসে পড়ে। সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে স্তালিন যে সহিষ্ণুতা দেখিয়েছেন সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সমস্যাবলীর সমাধানের ক্ষেত্রেও সেই মার্কসীয় সহিষ্ণুতাই দেখিয়েছেন। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আলাদা কিছু নয়। বিপ্লবোত্তর সোভিয়েতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্তালিন যখন উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বুর্জোয়া অর্থনীতির 'পণ্য-উৎপাদন' বা Commodity Production-কে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির একটি বিশেষ স্তর পর্যন্ত স্বীকৃতি দিলেন তখন সে ক্ষেত্রেও তার নামে 'সহিষ্ণুতা'র অভিযোগ শোনা গেছে। বলা হয়েছে বুর্জোয়া অর্থনীতির 'Pemnant' এর প্রতি সহিষ্ণুতা 'is bound to lead to capitalism.' তখনও স্তালিন তাঁর বিখ্যাত 'Economic Problems of socialism' গ্রন্থ মারফৎ অর্থনীতির নিয়মগুলি মেনে অর্থনীতি পরিবর্তনের কথাই বলেছেন। তিনি বলেছেন-

"...they cannot be washed away before social conditions are ripe for their disappearance."

মার্কসও বলেছেন-

"কোন সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে যতটা পর্যন্ত বিকাশ লাভের অবকাশ থাকে, যাবতীয় উৎপাদন শক্তি ততটা পর্যন্ত বিকশিত হবার পূর্ব পর্যন্ত সেই সমাজ ব্যবস্থা অন্তর্হিত হয় না; আবার পুরাতন সমাজ ব্যবস্থার গর্ভেই যতদিন পর্যন্ত উচ্চতর সমাজ-সম্পর্ক সমূহের অস্তিত্বের উপযোগী অবস্থাসমূহ পরিণত রূপ লাভ না করে ততদিন পর্যন্ত উচ্চতর সমাজ সম্পর্কসমূহ আবির্ভূতও হয় না। সুতরাং মানব জাতি সেই সব দায়িত্ব সাধনেই আত্মনিয়োগ করে যে সব দায়িত্ব সমাধানের ক্ষমতা সে রাখে...।"

শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও স্তালিন সেই সব দায়িত্ব পালনেই আত্মনিয়োগ করেছিলেন তৎকালীন সামাজিক রাজনৈতিক বস্তুগত অবস্থায় যে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব ছিল। এখানেও মার্কসীয় দৃষ্টিতেই শিক্ষা ও সাহিত্য ক্ষেত্রে বুর্জোয়া শিল্পের উত্তরাধিকারগুলির প্রশ্নকে তিনি বিচার করেছেন। যেসব ক্ষেত্রে তিনি দেখেছেন নতুন সমাজ পুরাতন বুর্জোয়া উত্তরাধিকারগুলি বর্জন করার মত 'পরিণত রূপ' লাভ করেনি সেসব ক্ষেত্রে তিনি বুর্জোয়া উত্তরাধিকার সম্পর্কে (ঐ Commodity production-এর মতই) মার্কসীয় সহিষ্ণুতা দেখিয়েছেন।

উদাহরণ স্বরূপ ধরা যেতে পারে বুর্জোয়াপন্থী নাট্যকার বুলগাকভের 'টারবাইনের দিনগুলি' নাটকটি সম্পর্কে স্তালিনের সহিষ্ণুতা। বিপ্লবোত্তর কালে বুলগাকভের এই নাটকটি যখন সোভিয়েত আর্ট থিয়েটারে মঞ্চস্থ হল তখন প্রলেতকাল্টবাদীরা নাটকটির তীব্র সমালোচনা করে বললেন, গৃহযুদ্ধের পটভূমিকায় এ নাটকে শত্রু- সৈন্যের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখানো হয়েছে। সোভিয়েতকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। আর শুধু সমালোচনাই নয়, চেরকাসভের বাচনিক জানা যায় এই নাটকটি বন্ধ করার জন্য প্রেক্ষাগৃহের বাইরে মেসিনগান বসাবার আয়োজনও করা হচ্ছিল। এহেন নাটককে জোর করে বন্ধ করার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন স্তালিন। তাঁর যুক্তি ছিল এ নাটক বন্ধ করার মত পরিপক্ক সামাজিক অবস্থার উদ্ভব তখনো হয়নি। বিল বেলোভসেরকভ্‌স্কিকে লিখিত এক পত্রে স্তালিন বলেছেন-

"বুলগাকভের নাটক প্রায়ই মঞ্চস্থ করা হয় কেন? মনে হয় মঞ্চস্থ করার মত যথেষ্ট নাটক আমাদের নেই বলে। সমালোচনা করা ও অ-সর্বহারা নাটক নিষিদ্ধ করার দাবী তোলা অত্যন্ত সহজ; কিন্তু সহজ বলেই তা শ্রেষ্ঠ একথা মনে করার কোন কারণ নেই। নিষিদ্ধ করার ব্যাপার এটা নয়। মঞ্চ থেকে ধাপে ধাপে পুরাতন ও নতুন অ-সর্বহারা জঞ্জাল দূর করতেই হবে-তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, প্রকৃত চিত্তাকর্ষক শিল্পসম্মত সোভিয়েত নাটক সৃষ্টি করে, যা তার জায়গা দখল করতে পারে।"

Commodity Production-এর ব্যাপারে যে কথা, এখানেও তাই। বুর্জোয়া জগৎ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত নাটকে যতক্ষণ পর্যন্ত নূতন যুগের পক্ষে কোন ইতিবাচক তাৎপর্য থাকবে, (তা যত সামান্যই হোক) ততক্ষণ তাকে বাতিল করা যেতে পারে না। বুলগাকভের নাটকেও সেই ইতিবাচক দিকটির সন্ধান পেয়েছিলেন স্তালিন, তাই পূর্বোক্ত চিঠিতে তিনি বলেছেন-

"টারবাইনের দিনগুলি,' খারাপ নাটক নয়। কারণ ক্ষতির থেকে এ নাটক ভালই করে বেশি এটা যেন না ভুলে যাই। যে প্রধান ছাপ এ নাটক মনে রেখে দেয় তা বলশেভিকদের ক্ষেত্রে অনুকূল। পরাজয় সুনিশ্চিত বুঝে যদি টারবাইনের মত মানুষকেও অস্ত্র পরিত্যাগ করে জনগণের ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয় তাহলে বলতে হবে বলশেভিকরা দুর্ভেদ্য, আর তা হলে করারও কিছু নেই।"

পরিবর্তনের যুগে সমাজ যখন ক্রমেই পুরাতন থেকে নতুন রূপান্তর গ্রহণ করছে, তখন সমাজের রাজনৈতিক, অর্থ নৈতিক, সাংস্কৃতিক সর্বক্ষেত্রেই ইতিবাচক যা কিছু নতুনকে সাহায্য করে তাকেই গ্রহণ করে কাজে লাগানোটাই বড় কথা। তাতেই পরিবর্তনের বেগ দ্রুত হয়। অন্যথায় অতি দ্রুতির আবেগে সম্ভাব্য সহায়তাকে ধ্বংস করলে পরিবর্তনের বেগ বরং ব্যাহতই হয়।

বুর্জোয়া উত্তরাধিকারের ইতিবাচক উপাদানগুলি সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে কমরেড স্তালিনের ধৈর্য্যশীল পদক্ষেপ পুরোপুরিভাবে 'লেনিনিক'। লেনিন তাঁর বহু রচনায় বারবার এই কথার উপর জোর দিয়েছেন যে বুর্জোয়া উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ইটকাঠ দিয়েই আমাদের সমাজতন্ত্র গড়তে হবে; সমাজতন্ত্র আকাশ থেকে পড়বে না। সমাজতন্ত্র গড়ার উপাদানগুলির মধ্যে সোভিয়েতের নিজস্ব উপাদান হচ্ছে একমাত্র সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট শ্রমিকরা, কিন্তু এ'দের সম্পর্কে লেনিন বলেছেন-

"এরা যথেষ্ট শিক্ষিত নয়। শ্রেষ্ঠ যন্ত্র গড়ে দিতে তারা উৎসুক। কিন্তু কী করে তা করতে হবে তা তারা জানে না। সেটা তারা করতে পারে না। তার জন্য যে বিকাশ মাত্রা, যে সংস্কৃতি দরকার সেটা এখনো পর্যন্ত তারা অর্জন করেনি।"

নিজস্ব উপাদান গত এই খামতির জন্য লেনিন সমাজতন্ত্র গড়ার কাজে বুর্জোয়া বিশেষজ্ঞদের ব্যবহার করার কথা বলেছেন- "We have bourgeois experts and nothing else. We have no other bricks with which to build socialism."

এই বুর্জোয়া 'এক্সপার্টদের' মধ্যে বুদ্ধিজীবীরাও আছেন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যাদের ব্যবহার করতে হবে। লেনিন বলেছেন- "We know socialism can only be built from elements of large capitalist culture, and the intellectuals are one of those elements."

কিন্তু এই 'elements' দের শুধু বলপ্রয়োগেই সমাজতন্ত্র গড়ার কাজে ব্যবহার করা যায় না। এ বিষয়েও লেনিন স্পষ্টই বলেছেন- "We must now solve the problem of using the bourgeois specialists. Here, I repeat, Violence alone will get us no where…. Some people may say that Lenin is recommending moral persuasion instead of violence! But it is foolish to imagine that we can solve the problem of organising a new science and technologly for the development of communist society by violence alone. That is nonsense." (বড় হরফ লেখকের)

সোভিয়েত বিরোধী, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসহীন এই বুর্জোয়া বা বুর্জোয়া পন্থী বুদ্ধিজীবীর প্রতি প্রলেতকান্টিয় 'violence' এর পরিবর্তে স্তালিন, লেনিন নির্দেশিত 'Moral persuasion'-এর কর্তব্যই গ্রহণ করেছিলেন। বলা বাহুল্য কর্তব্যটি কঠিন, এবং প্রচুর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার দাবী রাখে এ কর্তব্য।

গোলোভানবের প্রতি স্তালিনের যে দৃষ্টিভংগীর জন্য বিল বেলোভসেরকভ্‌স্কি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তা ঐ লেনিনীয় দৃষ্টিভংগী ছাড়া আর কিছুই নয়।

"গোলোভানববাদ হচ্ছে পেশাদার মঞ্চ শিল্পীদের একটা অংশের সেভিয়েত মঞ্চে বুর্জোয়া অভ্যাস ও পদ্ধতির পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টার একটি প্রকাশ। ১৯২৬-২৮ সালে অর্কেস্ট্রার পরিচালক গোলোভানবের নেতৃত্বে বলশয় থিয়েটারের অভিনেতাদের এক অংশ শ্রমজীবী মানুষের বৃহদাংশের উন্নতমান ও চাহিদা অনুযায়ী প্রিপারেটরী কমিটির (অভিনেতা, অভিনেত্রী, পার্টি- সংগ্রাহক কমিটির) সংস্কারের বিরোধিতা করেছিল আর তাই সমাজতন্ত্রের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করেছিল। এই অংশটি কমিটির সাধারণ সদস্যদের প্রতি মারমুখী মনোভাব গ্রহণ করেছিল এবং দক্ষ শিল্পীদের উন্নতি বিধানে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।”(অনুবাদ: সলিল ঘোষ)

এই গোলোভানববাদীদের মঞ্চ থেকে স্তালিন সবলে উৎখাত না করে তার সংশোধনের প্রতি জোর দিয়েছিলেন। স্তালিন এ সম্পর্কে বলেছেন- "গোলোভানবাদ হচ্ছে সোভিয়েত-বিরোধী ব্যবস্থার একটা প্রকাশ। অবশ্য তার মানে এই নয় যে গোলোভানব নিজে সংশোধনের অতীত বা কোনদিনই সে তার ভুল ভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না, এমন কি সে যদি তার ভুল বুঝতে পেরে তা পরিত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে তাহলেও তাকে কুকুরের মত তাড়া করে শেষ পর্যন্ত দেশ ত্যাগে বাধ্য করতে হবে!"

এই দৃষ্টিভংগীর ভিত্তিতে স্তালিনের নেতৃত্বে তখন পার্টি সোভিয়েত থিয়েটারের পুনর্গঠনের জন্য যে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন তার ফলে সাফল্যের সঙ্গেই গোলভানববাদকে কাটিয়ে তোলা গিয়েছিল।

শিল্পের ফুলকে গুলী করে ফোটানো যায় না, তার জন্য 'moral persuasion' এবং ধৈর্যশীল প্রতীক্ষা প্রয়োজন সোভিয়েত রাষ্ট্রের প্রাণ পুরুষ তা ভালভাবেই জানতেন। তাঁর এই সহিষ্ণু প্রতীক্ষার নীতি কি ভাবে ফলপ্রসূ হয়েছিল তা সব চেয়ে ভাল বোঝা যায় নাট্য শিল্পী স্তানিস্লাভ্‌স্কির পরিবর্তনের গতি প্রকৃতি থেকে।

যে স্তানিস্লাভ্‌স্কি একদিন বলেছিলেন-

"লালঝাণ্ডা নিয়ে মিছিলে যোগদানে আমাদের কোন আগ্রহ ছিল না।"

সেই স্তানিস্লাভ স্কিই আর একদিন বললেন-

"আমি প্রোলেতারিয়েত হয়ে গেছি।"

এই দুই প্রান্তের দুই বিপরীত মনোভংগীর মাঝখানে কি ঘটেছিল যা এই পরিবর্তনকে সম্ভব করেছিল? ঘটেছিল বগদানভবাদী প্রলেতকালিস্টদের হিংস্র আক্রমণ, কিন্তু সকলেই জানেন সে আক্রমণে স্তানিস্লাভ্‌স্কি পাল্টাননি বরং তাঁর বিরোধিতা আরো শক্ত হয়েছিল। তিনি কিছুতেই প্রলেতকাল্টবাদীদের কাছে মাথা নত করেন নি। তবে কি সে জিনিষ যা তাঁকে শেষ পর্যন্ত 'প্রলেতারিয়েত'-করে তুলেছিল? তা আর কিছুই নয় স্তালিন সরকারের 'moral persuasion' এবং বিস্ময়কর ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা। এ বিষয়ে স্তানিস্লাভ্‌স্কি নিজেই বলেছেন-

"বিপ্লবের একটা ঝোড়ো মুহূর্ত এসেছিল যখন লেনিনও বলে দিয়েছিলেন শিল্প সাহিত্যের জন্য ঠিক এই মুহূর্তেই কিছু করা সম্ভব নয়। সেই সময় আমাদের সাংস্কৃতিক রত্নভাণ্ডারটিকে রক্ষা করতে হয়েছিল; নানা আক্রমণ থেকে থিয়েটারকে রক্ষা করতে হয়েছিল। তখন সোভিয়েত সরকার আমাদের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন। তাঁদের জন্য আমরা বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম। সোভিয়েত সরকারের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার আরও কারণ আছে-আমরা, মস্কো আর্ট থিয়েটারের অভিনেতারা অনেকেই প্রথম দিকে রাজনৈতিক ঘটনাগুলি বুঝতে সক্ষম হই নি। কিন্তু সে সময়, সরকার আমাদের লাল রং মেখে যা আমরা নই, তার ভাণ করবার জন্য জোর করেন নি। তা করলে আমরা ডিগবাজী খাওয়া প্রবঞ্চক অথবা স্বার্থপর সুবিধাবাদী হতে পারতাম। কিন্তু আমরা বিপ্লবের প্রতি আমাদের মনোভংগী পরিবর্তনের জন্য আগ্রহী হয়েছিলাম। লাল নিশান নিয়ে শোভাযাত্রায় আমাদের বিশেষ আগ্রহ ছিল না, কিন্তু দেশের বিপ্লবী পরিস্থিতির অভ্যন্তরে দৃষ্টি চালনায় আমরা সচেষ্ট হয়েছিলাম। এই বিজ্ঞান ও শিল্পে, আমাদের চেতনাকে আরো উন্নত করার জন্য আমরা সচেষ্ট ছিলাম। নিরুদ্বেগচিত্তে এই চেষ্টা করার অবকাশ দেবার জন্য সরকারকে আমরা ধন্যবাদ জানাই।"  এই হল স্তালিনের 'moral persuasion'-এর ফলশ্রুতি'।

স্তালিনের রাজনৈতিক ভাবনা এবং শিল্প ভাবনা একই মার্কসবাদী লেনিনবাদী ঐক্যসূত্রে বাঁধা। কোথাও কোন অকারণ 'সহিষ্ণুতা' নেই। তা ছাড়া 'এস্‌থেটিক' ক্ষেত্রের পরিবর্তনের নিজস্ব নিয়মগুলি সম্পর্কে স্তালিন বিশেষভাবেই অবহিত ছিলেন। শিল্পক্ষেত্রে তাঁর এই সহিষ্ণুতা যে একটা শুষ্ক রাজনৈতিক নিষ্ঠা-প্রসূত তা নয়, অনেকের অজ্ঞাত হলেও একথা সত্য যে স্তালিনের একটি সুদৃঢ় 'Aesthetic base' ছিল। জীবনপ্রারম্ভ-পর্বে স্তালিন সাহিত্যের আগ্রহী পাঠক ছিলেন। তিনি তাবৎ ক্লাসিক সাহিত্য শেক্সপীয়ার, শিলার, তলস্তয়, গোগল, শেখভ, চেনিশেভস্কি, পিসারেভ প্রমুখের রচনা গভীর আগ্রহের সঙ্গেই পড়েছিলেন। বিদেশী সাহিত্যের অনুবাদের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহের কথা অনেকেই জানেন। তৎকালে জর্জিয়ায় 'সোসেলো' নামে একজন কবি ছিলেন, যাঁর কবিতার নমুনা এই-

"শ্রমভারে যার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে ভেঙ্গে গেছে 
কাল অবধি যে আতঙ্কভরে 
হাঁটুগেড়ে বসেছিল 
সে আবার উঠবে পর্বতের চেয়ে উঁচুতে 
আশার ডানা মেলে সে উঠবে 
সবাব উপরে।"

(অনুবাদ: অনুনয় চট্টোপাধ্যায়)

এই কবি সোসেলো সেকালের জর্জিয়ায় জনপ্রিয় কবি ছিলেন এবং জর্জীয় বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁর খ্যাতি প্রতিষ্ঠিত ছিল। এই কবি আর কেউ নন -স্বয়ং স্তালিন। কাজেই কর্মী স্তালিনের একটা এসথেটিক ভিত্তি ছিলই, যার উপর দাঁড়িয়ে সোভিয়েত শিল্প-সংস্কৃতির হাল ধরে তাকে সহিষ্ণুতার সঙ্গে সঠিক পথেই নিয়ে যেতে পেরেছিলেন। এক্ষেত্রে শিল্পী স্তালিন এসে রাজনীতিজ্ঞ স্তালিনের হাত ধরেছিল। কাজেই স্তালিনের শিল্প-সহিষ্ণুতা তাঁর রাজনৈতিক- অর্থনৈতিক সহিষ্ণুতা থেকে পৃথক কিছুই নয়।

(প্রথম প্রকাশ: নন্দন/পৌষ-মাঘ ১৩৮৬)

হীরেন ভট্টাচার্য। ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ তথা বামপন্থী সংস্কৃতি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান তাত্ত্বিক নেতা। বহু প্রবন্ধের রচয়িতা, গণসংগীতের গীতিকার, সুবক্তা ভট্টাচার্য পেয়েছেন নাট্য আকাদেমি, রাজ্য আকাদেমির পুরস্কার। ১০ জুন, ১৯২৫: জন্ম শ্রীহট্ট জেলার পাথরখোলা চা বাগানে। শান্তিনিকেতন কলাভবনে আংশিক সময়ের ছাত্র হিসেবে আচার্য নন্দলাল বসুর কাছে অঙ্কন শিক্ষালাভ। আজ তিনি শতবর্ষে পদার্পণ করবেন। আগামী বছর এই দিনে পূর্ণ হবে তাঁর শতবর্ষ।


প্রকাশের তারিখ: ১০-জুন-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

এই প্রবন্ধের ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন।
- Amitabha Ray, ১০-জুন-২০২৪


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৩ টি নিবন্ধ
০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫

১১-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৩-নভেম্বর-২০২৫