Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মার্কসের অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার

গৌতম গাঙ্গুলী
ফরাসি বিপ্লবের কারণ সম্পর্কে  সাধারণ  মতামত হল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাবলী সেই সময়কার ফরাসি শাসক ষোড়শ লুই সামলাতে পারছিলেন না। প্রচলিত প্রাচীন ব্যবস্থার প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। এই ব্যবস্থা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যের সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছিল। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ও সরকারি ঋণ শোধ করার ব্যর্থতা এক অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনে। তার ফলাফল হ'ল অর্থনৈতিক নিম্নগামীতা, বেকারি ও ভয়ংকর খাদ্য সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দমবন্ধ করা কর-ব্যবস্থা যার সংশোধনে অভিজাতরা নারাজ ছিলেন। এই সংকট ষোড়শ লুই সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সামাজিক অস্থিরতা এমন পর্যায়ে যায় যে ১৭৮৯ সালে এস্টেট জেনারেলের সভা ডাকা হয়। যা শেষ বসেছিল দেড়শো বছর আগে। ১৭৮৯ সালকে ধরা হয় ফরাসি বিপ্লবের শুরু হিসাবে।
The Eighteenth Brumaire of Louis Bonaparte

১৮৪৮ সাল গোটা  ইউরোপে এক গুরুত্বপূর্ণ বছর। ১৮৪৭ সালের অর্থনৈতিক সংকট গোটা ইউরোপকে এক বিপ্লবী সম্ভাবনার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ও জার্মানিতে মার্চ বিপ্লব তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলি ও রাশিয়া বাদে গোটা ইউরোপে এই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে।

১৮৪৮ সালে কমিউনিস্ট  ম্যানিফেস্টো রচিত হয়। তার প্রাথমিক খসড়া দেখতে পাওয়া যায় এঙ্গেলসের  Principle Of Communism-এ। মার্কসকে লেখা এঙ্গেলসের চিঠি থেকে জানা যায় যে, এঙ্গেলস  নিজেই এই বইটি সম্পর্কে  খুব খুশি ছিলেন  না। এর সঙ্গে ঐতিহাসিক উপাদান ও প্রেক্ষাপট যুক্ত করা প্রয়োজন। সে কথা এই চিঠি থেকেই পাওয়া যায়। যার ফলাফল কমিউনিস্ট  ম্যানিফেস্টো। মার্কস এই সময়ে লণ্ডনে।

এই কথার উল্লেখ কেন? এর উত্তর এঙ্গেলস দিয়েছেন মার্কসের লেখা ফ্রান্সের শ্রেণিসংগ্রাম বইয়ের ভূমিকায়। ঐতিহাসিক বস্তুবাদের একটি খসড়া (এঙ্গেলসের ভাষায় rough sketch) ম্যানিফেস্টোতে হাজির করেছিলেন তাঁরা। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর উল্লেখ তাই প্রয়োজনীয় এই লেখার শুরুতে।

১৮৪৮ থেকে ১৮৫২ এই সময়কালে কার্ল মার্কস দুটি বই লেখেন– ফ্রান্সের শ্রেণি সংগ্রাম ও লুই বোনাপার্টের ১৮ ব্রুমেয়ার। ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউনের পর লিখবেন– ফ্রান্সের গৃহযুদ্ধ। কিন্তু কেন? ২৩ বছরের ব্যবধানে একটি দেশের, ইউরোপের একটি দেশের ঘটনাবলী নিয়ে তিনটি লেখা মার্কস কেন লিখলেন?

১৮৪৮ সালের আগের ও বিশেষ করে তার পরের সময়পর্ব শিল্প বিপ্লবেরও সময়। ১৮৪৭-এর অর্থনৈতিক সংকট পুঁজিবাদ কাটিয়ে ওঠেনি গোটা ইউরোপে, আগেই উল্লেখ করা হয়েছে বিপ্লবের সময়। তবু ফ্রান্স কেন? এঙ্গেলসের  কথা অনুযায়ী, মার্কস-এঙ্গেলসের  একটি খসড়া তত্ত্বের সঠিকতা বিচার করার উপযুক্ত জায়গা ছিল ফ্রান্স। প্রথম ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটেছে, সংসদীয় গণতন্ত্রের উন্মেষ ঘটেছে। বুর্জোয়ারা প্রগতিশীল ভূমিকায়। আবার বুর্জোয়ারা মুনাফার লোভে (পু্ঁজিবাদের যা চূড়ান্ত লক্ষ্য) জনবিরোধী নীতির আশ্রয় নিয়েছে। শ্রমিকদের গোটা বিশ্বের প্রথম অভ্যুত্থান। রাষ্ট্রের নিপীড়নের  হাতিয়ারগুলিকে ১৮ দিনের জন্য স্তব্ধ করে দেওয়া অন্ততপক্ষে প্যারিসে, মার্কসকে সুযোগ করে দিয়েছিল তাঁদের উত্থাপিত ঐতিহাসিক বস্তুবাদের তাত্ত্বিক খসড়াকে বাস্তবের জমিতে পরীক্ষা করে নেওয়ার। এর পাশাপাশি ১৭৮৯-১৮৭১ পর্যন্ত শ্রেণিগুলির গড়ে ওঠা ও তার ঘনীভবনকে পর্যবেক্ষণ  করা ও তার ধারাবাহিক  বিকাশকে লিপিবদ্ধ  করার সুযোগ মার্কস হারাতে চাননি।

মার্কসবাদীরা ১৮৪৮ সালের বিপ্লবকে দ্বিতীয়  ফরাসি  বিপ্লব বলেন। লুই বোনাপার্টের ১৮ ব্রুমেয়ার সেই সংক্রান্ত আলোচনা ও বিশ্লেষণ। তার মধ্যে ঢোকার আগে প্রথম ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে সামান্য আলোচনা সুবিধাজনক হবে।

ফরাসি বিপ্লবের কারণ সম্পর্কে  সাধারণ  মতামত হল সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যাবলী সেই সময়কার ফরাসি শাসক ষোড়শ লুই সামলাতে পারছিলেন না। প্রচলিত প্রাচীন ব্যবস্থার প্রতিনিধি ছিলেন তিনি। এই ব্যবস্থা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্যের সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছিল। জনসংখ্যার দ্রুত বৃদ্ধি ও সরকারি ঋণ শোধ করার ব্যর্থতা এক অর্থনৈতিক সংকট ডেকে আনে। তার ফলাফল হ'ল অর্থনৈতিক নিম্নগামীতা, বেকারি ও ভয়ংকর খাদ্য সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দমবন্ধ করা কর-ব্যবস্থা যার সংশোধনে অভিজাতরা নারাজ ছিলেন। এই সংকট ষোড়শ লুই সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। সামাজিক অস্থিরতা এমন পর্যায়ে যায় যে ১৭৮৯ সালে এস্টেট জেনারেলের সভা ডাকা হয়। যা শেষ বসেছিল দেড়শো বছর আগে। ১৭৮৯ সালকে ধরা হয় ফরাসি বিপ্লবের শুরু হিসাবে।

এস্টেট জেনারেলের  তিনটি অংশ। প্রথম অংশ বা এস্টেট ধর্মগুরুদের নিয়ে তৈরি - Men With Clothes

দ্বিতীয় অংশ অভিজাতদের- Men With Breaches

তৃতীয়  অংশ সাঁকুলোৎ- Men Without Breaches

তিনটি অংশ আলাদা আলাদা করে বসতেন এবং প্রথম দুটি অংশ অনায়াসে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জনসংখ্যার  বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্রতিনিধিদের  প্রস্তাব খারিজ করে দিতে পারতেন। নিজেদের স্বার্থরক্ষাকারী সিদ্ধান্ত অনুমোদন  করাতে পারতেন।

মে মাসে ডাকা এস্টেট জেনারেল জুন মাসে জাতীয় সংসদে পরিণত হয়। ১২ জুলাই  সংসদ বসে। অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য চালিয়ে যাওয়া হয়। কারণ একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে, সুইস গার্ডদের ব্যবহার করে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে। অভিজাত সেনাবাহিনী তাদের ছত্রভঙ্গ করতে অস্বীকার করে। ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গ, যা স্বৈরাচারের প্রতীক, আক্রান্ত ও বিজিত হয়। এর জন্য অনেক ঐতিহাসিক ১৪ জুলাই দিনটিকে ফরাসি বিপ্লবের বিজয়ের দিন হিসাবে চিহ্নিত  করেন।

প্রথম ফরাসি বিপ্লব মূল যে তিনটি কাজ করেছিল সেগুলি হল - ১। সামন্ততন্ত্রের অবসান;  ২। ক্যাথলিক চার্চের ওপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা; ৩। ভোটাধিকারের  পথ প্রশস্ত  করা।

পরের তিন বছর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই। তার সঙ্গে অর্থনৈতিক মন্দা ও সামাজিক  বিশৃঙ্খলা। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয় অস্ট্রিয়া, ব্রিটেন, প্রাশিয়া সহ অন্যান্য বিদেশি  শক্তির  আক্রমণ, গায়ের জোরে প্রাচীন সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য। জাতীয় ঐক্য ও বিপ্লবী মনোভাব অটুট রাখার জন্য ফরাসি রাজনীতিবিদরা যুদ্ধকে আক্রমণকারীদের জমিতে ফিরিয়ে দেবার সিদ্ধান্ত  গ্রহণ করেন। ১৭৯২ সালে এপ্রিল মাসে ফরাসি বিপ্লবী যুদ্ধ শুরু হয়। এর সঙ্গে আরও দুটি ঘটনা ঘটে; সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম ফরাসি রিপাবলিকের ঘোষণা হয় এবং ১৭৯৩ সালের জানুয়ারিতে ষোড়শ লুইয়ের প্রাণদণ্ড হয়।

গিরোনদিনরা (Girondin) জাতীয় সংসদে আধিপত্য করতেন। প্যারিসকে কেন্দ্র করে ১৭৯৩ সালের ৩১ মে থেকে ২ জুন এক অভ্যুত্থান ঘটে ও গিরোনদিনদের আধিপত্যের অবসান হয়। ম্যাক্সমিলান রোবসপিয়রের নেতৃত্বে জনগণের নিরাপত্তা কমিটি (Committee Of Public Safety) সংসদে আধিপত্য বিস্তার করে। বিপ্লবের Reign Of Terror-এর পর্যায় শুরু হয়। এর শেষ হয় ১৭৯৪ সালের জুলাই মাসে। ততদিনে বিপ্লব বিরোধী  ও যাদের সন্দেহ করা হয়েছিল বিপ্লব বিরোধী  হিসাবে, এমন ১৬৬০০ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। দেশের বাইরের শত্রু ও দেশের ভিতর রাজানুগত ও জ্যাকোবিনদের মধ্যেকার বিরোধ সামাল দিতে ক্ষমতা ও শাসনভার গ্রহণ করে French Directory। ১৭৯৫ সালের নভেম্বর মাসে। অনেক যুদ্ধ জয় করার পরেও অর্থনৈতিক স্থবিরতা ও রাজনৈতিক অনৈক্যের ফলাফল হল, DIRECTORY-র জায়গা নেয় কনস্যুলেট, ১৭৯৯ সালে। অনেক সফল যুদ্ধের নায়ক নেপোলিয়ন  বোনাপার্ট  প্রথম কনসাল হন।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ফ্রান্সের বিপ্লবী যুদ্ধের সফলতম রণনায়ক ছিলেন। তিনি বিপ্লবের আদর্শ গ্রহণ করেছিলেন। জ্যাকোবিনদের সমর্থক ছিলেন। যুদ্ধের  কারণে ইজিপ্টে থাকাকালীন তিনি খবর পান ফ্রান্স বেশ কয়েকটি যুদ্ধে পরাজিত  হয়েছে। রিপাবলিকের অবস্থা আশঙ্কাজনক, এই খবর পেয়ে তিনি কারোর অনুমতি ছাড়াই ফ্রান্সে ফিরে আসার জন্য যাত্রা শুরু করেন ২৪ আগস্ট, ১৭৯৯। অক্টোবর মাসে যখন তিনি প্যারিসে কপর্দকহীন এবং দেশের জনগণের কাছে তাদের জনপ্রিয়তা তলানিতে ঠেকেছে, তখন নেপোলিয়নরা কয়েকজন ফ্রান্সে পৌঁছান। ফ্রান্স পরপর কিছু যুদ্ধ জয়ের মাধ্যমে তখন খানিকটা সামাল দিতে পেরেছে। কিন্তু ডিরেক্টরি তখন ডিরেক্টরের সঙ্গে আঁতাত করে ডিরেক্টরির বিরুদ্ধে কু-দে-তা সংগঠিত করে। তারিখটা ছিলো ৯ নভেম্বর ১৭৯৯। বিপ্লবী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮ ব্রুমেয়ার। কনস্যুলেট তৈরি হয়। নেপোলিয়ন প্রথম কনসাল হন। আরো দুজন কনসাল ছিলেন। কিন্তু তাদের ভূমিকা ছিল একেবারেই পরামর্শদাতার। তার ক্ষমতা সুনিশ্চিত হয় Constitution  of The Year VIII দ্বারা। রিপাবলিককে রাখা হয়, কিন্তু প্রতিষ্ঠিত হয় একনায়কতন্ত্র। নেপোলিয়ন ফ্রান্সের প্রথম কনসাল ছিলেন ১৭৯৯ থেকে ১৮০৪ পর্যন্ত। ফ্রান্সের সম্রাট ছিলেন ১৮০৪ থেকে ১৮১৪। পরে আবার ১৮১৫ সালে সম্রাট হন। ২ ডিসেম্বর ১৮০৪ তার প্রথম সম্রাট হবার সময় পোপ Pius VII পৌরোহিত্য করেন। কনস্যুলেট তৈরি হওয়ার ঘটনাকেই প্রথম ফরাসি বিপ্লবের পরিসমাপ্তি হিসাবে ঐতিহাসিকেরা বিবেচনা করেন।

(খ)

লুই বোনাপার্টের ১৮ ব্রুমেয়ার বইটি কার্ল মার্কস লেখেন ১৮৫০ থেকে ১৮৫২ অবধি। মার্কসের এই বইটির একটি বৈশিষ্ট্য আছে। মার্কসের অন্য লেখায় তা দেখা যায় না। প্রায় ধারাবিবরণীর মতো। মার্কস তখন লন্ডনে। সেখানে বসেই তৈরি করেছেন তার সূত্রায়ন; এই বই। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্পর্কে তার তত্ত্বের সত্যতা ও বাস্তবতা খুঁটিয়ে দেখার জন্য সম্ভবত এই ধারাবাহিক ঘটনাক্রমকে মার্কস আশ্রয় করেছিলেন।

বইটি লেখা হয় ১৮৫১ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৮৫২ সালের মার্চ মাসের মধ্যে। ১৮৫২ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত  Die Revolution পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়। ১৮ ব্রুমেয়ার হল বর্তমান ক্যালেন্ডার অনু্যায়ী ৯ নভেম্বর ১৭৭৯। যা ফ্রান্সের প্রথমে বিপ্লবী, পরে রিপাবলিকান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী VIII বর্ষের ১৮। ফ্রান্সের পত্র-পত্রিকা এবং ফ্রান্স সম্পর্কে  ইংল্যান্ডে প্রকাশিত যাবতীয় তথ্য সংকলন করে তার বিশ্লেষণ করেন মার্কস ১৮ ব্রুমেয়ারে। এই দিন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এক ক্যু-দে-তার মাধ্যমে প্রথম নেপোলিয়ন ফ্রান্সে একনায়কত্বের প্রচলন করেন। তার ভাইপো প্রায় পঞ্চাশ বছর পরে ১৮৫১ সালে একই ভাবে, একই ঘটনা ঘটান। বইয়ের নামকরণকে এই ভাবে দেখা যেতে পারে। যদিও একটা প্রশ্ন থেকে যায়। পঞ্চাশ বছর পর বিপ্লবী ক্যালেন্ডার চালু ছিল না। তবু হেমন্তকালের মাস ব্রুমেয়ারকে, মার্কস ব্যবহার করলেন কেন? প্রথম ফরাসি  বিপ্লবের পর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার পাল্টে বিপ্লবী ক্যালেন্ডার, যা পরে রিপাবলিকান ক্যালেন্ডার হয়ে যায়, চালুর পিছনে অন্যতম কারণ ছিল পুরনো যুগের সঙ্গে বিচ্ছেদ সাধন। রোমের সাংস্কৃতিক ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে বিচ্ছেদ। নতুন কিছু করার প্রণোদনা। এই বইটির প্রথম অধ্যায়ের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদটি খেয়াল করে পড়লে বোঝা যায় সেই সময় ফ্রান্সের বিভিন্ন  শ্রেণি  ও তাদের বর্গগুলি কীভাবে অতীতকে সামনে আনার চেষ্টা  করছে। মার্কস তার সমালোচনা করেছেন। এই সমালোচক অবস্থান থেকেই অতীতের অযথা রোমন্থনকে মার্কস সম্ভবত ব্যঙ্গ করেছেন। ঘটনাবলীর পুনরাবৃত্তিকে মনে করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি। তাই এই লেখা শুরু হয়েছে হেগেলকে উল্লেখ করে ‘HEGEL, says somewhere that, upon the stage of universal history, all great events and personalities reappear in one fashion or other. He forgot to add that, on the first occasion, they appear as tragedy; on the second, as farce.’

কেমন ছিল এই সময়কাল যার ঘটনাক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে মার্কস ধরতে চেয়েছেন এই লেখায়? মার্কসই এক নজরে সেই ঘটনাবলী বইটির ষষ্ঠ অধ্যায়ে আমাদের সুবিধার জন্য উপস্থিত করেছেন। আগ্রহী পাঠকেরা এই অধ্যায়ের একেবারে শেষ অংশটি দেখে নিতে পারেন।

প্রথম পর্যায়: ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ মে ১৮৪৮- ভূমিকা, সর্বজনীন ভ্রাতৃত্বের ধারণার প্রতারণা

দ্বিতীয় পর্যায়: সাধারণতন্ত্র  ও জাতীয় সাংবিধানিক সংসদ গঠনের পর্যায়।

এই পর্যায়কে মার্কস তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন।

(ক) ৪ মে থেকে ২৫ জুন: সর্বহারার বিরুদ্ধে সমস্ত শ্রেণির সংগ্রাম। সর্বহারার পরাজয়।

(খ) ৫ জুন থেকে ১০ ডিসেম্বর, ১৮৪৮: বিশুদ্ধ বুর্জোয়া সাধারণতন্ত্রীদের একনায়কতন্ত্র। সংবিধানের খসড়া রচনা, প্যারিস দখল সংক্রান্ত ঘোষণা, ১০ ডিসেম্বর বোনাপার্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্রকে সরিয়ে রাখা।

(গ) ২০ ডিসেম্বর, ১৮৪৮ থেকে ২৮ মে, ১৮৪৯: সাংবিধানিক সংসদের সঙ্গে বোনাপার্ট ও তার সঙ্গে মৈত্রীতে আবদ্ধ, পার্টি অফ অক্টোবরের বিরোধ ও সংঘাত, সংবিধানের অনুমোদন, সাধারণতন্ত্রী বুর্জোয়াদের পতন।

তৃতীয় পর্যায়: সাংবিধানিক সাধারণতন্ত্র ও জাতীয় সংসদ সভার পর্যায়। এই  পর্যায়কেও মার্কস তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন।

(ক) ২৮ মে, ১৮৪৯ থেকে ১৩ জুন, ১৮৪৯: পাতি বুর্জোয়াদের সঙ্গে বোনাপার্ট ও বুর্জোয়াদের সংঘাত। পাতিবুর্জোয়া গণতন্ত্রের পরাজয়।

(খ) ১৩ জুন, ১৮৪৯ থেকে ৩১ মে, ১৮৫০: পার্টি অফ অর্ডারের সংসদীয় একনায়কতন্ত্রের অবসান। তার আগে তারা সর্বজনীন ভোটাধিকারের অধিকারের বিলোপ সাধন করে ও একইসঙ্গে সংসদীয় মন্ত্রিত্ব হারায়।

(গ) ৩১ মে, ১৮৫০ থেকে ২ ডিসেম্বর, ১৮৫১: সংসদীয় বুর্জোয়াদের সঙ্গে বোনাপার্টের সংঘাত।

মার্কস এই পর্যায়কে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন।

(১) ৩১ মে, ১৮৫০ থেকে ১২ জানুয়ারি, ১৮৫১: সংসদ সৈন্যবাহিনীর ওপর তার সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ হারায়।

(২) ১২ জানুয়ারি থেকে ১১ এপ্রিল, ১৮৫১: প্রশাসনিক ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের সংসদীয় প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সংসদে পার্টি অফ অর্ডার তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। তারা সাধারণতন্ত্রী ও মন্টেগুর সাথে মৈত্রী গড়ে তোলেন।

(৩) ১১ এপ্রিল থেকে ৯ অক্টোবর, ১৮৫১: সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্য পূরণের জন্য পরস্পর বিরোধী প্রচেষ্টা। পার্টি অফ অক্টোবর যে যে অংশ নিয়ে গঠিত ছিল, তা আলাদা আলাদা ভাবে ভেঙে গেল। সাধারণ ভাবে বুর্জোয়ারা ও বুর্জোয়া সংসদ ও প্রচার মাধ্যমের মধ্যে ফাটল আরও বিস্তৃত হল।

(৪) সংসদ ও প্রশাসনের মধ্যে প্রকাশ্য বিভাজন। সৈন্যবাহিনী, নিজস্ব শ্রেণি ও অন্যান্য শ্রেণি দ্বারা পরিত্যক্ত সংসদ মৃত্যু মুখে পতিত হল। সংসদীয় যুগ ও বুর্জোয়া আধিপত্যের অবসান হল। নেপোলিয়নের জয় হল। এক সাম্রাজ্যবাদী পুনরুত্থানের প্রহসন।

মার্কসের কাছে ১৯৪৮ সালের দ্বিতীয় বিপ্লবের ফলাফল হিসাবে লুই বোনাপার্টের ডিক্টেটরশিপ প্রহসন হিসাবেই বিবেচিত হয়েছিল।

মার্কসবাদীদের কাছে এই বই, এই সময়, এই বিপ্লব অনুধাবন করা জরুরি। কারণ ১৮৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ও বিশেষ করে জুন মাসে শ্রমিকদের উত্থান, ইউরোপের ইতিহাসে শ্রমিক শ্রেণির প্রথম স্বাধীন রাজনৈতিক কার্যকলাপ, যা জুন উত্থান হিসাবে খ্যাত। এই সময়কে চিহ্নিত করা যায় আধুনিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের শুরুর মূহুর্ত হিসাবে। আমরা ভুলব না ১৮৪৮ সালেই ২১ ফেব্রুয়ারি  কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশিত হয়েছে। মার্কস এঙ্গেলসের কাছে, তাদের উত্থাপিত  ঐতিহাসিক বস্তুবাদের যে তাত্ত্বিক  মডেল তারা উপস্থিত করেছেন, হাতে কলমে তার পরীক্ষালব্ধ ফলাফল পর্যবেক্ষণ  ও বিশ্লেষণ করার সুযোগ উপস্থিত। এই বইয়ের তৃতীয়  জার্মান সংস্করণের ভূমিকায় এঙ্গেলস বলছেন, ‘....প্রকৃতি বিজ্ঞানে শক্তির রূপান্তরের নিয়মাবলীর যে অভিঘাত, ইতিহাসে এই নিয়মাবলীর  একই রকম অভিঘাত। দ্বিতীয় ফরাসি রিপাবলিক  ইতিহাস  বোঝার ক্ষেত্রে চাবিকাঠি। তিনি তার এই নিয়মাবলীকে, এই ঐতিহাসিক ঘটনাবলীকে ব্যাখ্যা করার পরীক্ষায়  বসিয়েছিলেন। তেত্রিশ  বছর পর এখন আমরা বলতে বাধ্য যে সেই পরীক্ষায় তা খুবই সাফল্যের সঙ্গে  উত্তীর্ণ।’

এই লেখায় মার্কস যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন ও বিশ্লেষণ করেছেন তা এই রকম–

১। পঞ্চাশ বছর পর কেন মহান ফরাসি বিপ্লবের পুর্ননির্মাণ অসম্ভব?

২। এই সময়কালে ফরাসি সমাজে কী পরিবর্তন হয়েছে? 

৩। কেন ১৭৮৯-এর পুর্ননির্মাণের যে কোনও প্রচেষ্টা লুই বোনাপার্টের মতন জোকার একনায়কের জন্ম দেয়। এছাড়া, মার্কস তার দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সূত্রায়নকে ব্যবহার করে, ঘটনাবলীর বাহ্যিক রূপের আড়ালে থাকা ১৮৪৮ সালের বিপ্লবের সমকালীন সামাজিক শক্তিসমূহের যে বিন্যাস ও সম্পর্ক, তার কাছে পৌঁছেছিলেন। সমাজের ভিত্তিমূলে এই শক্তিসমূহের মধ্যেকার সংঘাত সম্পর্কে  মার্কসের  মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য—  ‘বিভিন্ন ধরণের সম্পত্তি ও সামাজিক অবস্থার অস্তিত্বের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় এক সামগ্রিক উপরিকাঠামো। যার অংশ হল অদ্ভুতভাবে তৈরি কিন্তু পৃথক পৃথক আবেগ, ভ্রান্তি, চিন্তার ধরণ ও জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি। শ্রেণির  বস্তুগত ভিত্তি ও সংশ্লিষ্ট সামাজিক সম্পর্ক থেকে তা তৈরি। ঐতিহ্যের পথ বেয়ে নিজের বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে একজন ব্যক্তি এগুলি আহরণ করেন। তিনি কল্পনা করতেই পারেন এইগুলিই তার যাত্রা শুরু করার আসল জায়গা বা এইগুলিই তার আসল কাজ।

কিন্তু ঐতিহাসিক সংগ্রামে রাজনৈতিক দলগুলিকে তাদের আসল স্বার্থ ও অবস্থান থেকে তাদের স্লোগান আর কল্পনাকে পৃথক করতে হয়।’

এই সূত্রায়নের উপর ভিত্তি  করেই মার্কস ফরাসি দেশের সেই সময়কার বিভিন্ন  শ্রেণি ও তাদের মতবাদ বিশ্লেষণ করেছেন এই বইয়ে।

১৮ ব্রুমেয়ারে মূল নায়ক ফ্রান্সের বুর্জোয়ারা। এই শ্রেণির প্রতি মার্কসের ভালোবাসা ও ঘৃণার মনোভাব। কমিউনিস্ট পার্টির ইস্তাহারে যখন তিনি লেখেন ‘ঐতিহাসিক ভাবে বুর্জোয়ারা সব চাইতে বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে’, তখন শুধুমাত্র এই কারণের জন্যই লেখেন না যে, কেবলমাত্র তারা উৎপাদনের হাতিয়ারের উন্নয়ন  করেছে। তিনি লেখেন এই কারণের জন্যও যে তারা রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ করেছিলেন এবং এক গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু এই বইটি  যে সময়কালকে ধরেছে, সেই সময়কালে এই শ্রেণির ভূমিকা কি? এই বইয়ের অন্যতম লক্ষ্য এটা ব্যাখ্যা করা যে, কেন ইউরোপের বুর্জোয়াদের অগ্রণী অংশ, একটি বিপ্লবে বীরের ভূমিকা পালন করার পর, আর একটি বিপ্লবের বিস্তার ও সুযোগকে সীমাবদ্ধ করার জন্য তাদের ক্ষমতার মধ্যে যা যা তারা করতে পারেন; তার সবকিছুই তারা করলেন।

মার্কসের বিবেচনা অনুযায়ী এই সময় ফরাসি বুর্জোয়াদের মূল তিনটি  গোষ্ঠী। বৃহৎ  ভূসম্পত্তির মালিক, শিল্পপতিরা ও লগ্নি পুঁজির মালিক। ভূসম্পত্তির মালিক ও শিল্পপতিরা পার্টি অফ অক্টোবরে পরষ্পরের বিরোধী। ভূসম্পত্তির মালিকরা পার্টি অফ অক্টোবরে লেজিটিমিস্ট নামে পরিচিত ছিলেন। এরা বুঁরবো রাজবংশকে সিংহাসনে ফেরানোর পক্ষে ছিলেন। শিল্পপতিরা লুই ফিলিপের বংশধারার কাউকে সিংহাসনে বসানোর পক্ষে ছিলেন। দু-পক্ষই একই পার্টিতে থেকে পরষ্পরের বিরুদ্ধে নানা রকম কৌশল গ্রহণ করতেন। বিষয়টি এমন নয় যে, এই দুই রাজবংশের কারোরই  ফ্রান্সের সিংহাসনের উপর কোনও ন্যায়সঙ্গত দাবি বা অধিকার ছিল। আসলে ভূসম্পত্তি জনিত সম্পদ ও পুঁজির স্বার্থের বিবাদ, একের আধিপত্য অন্যের উপর প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়াস। দু-পক্ষের  ঘোষিত দাবি অনুযায়ী পার্টি অফ অর্ডার হয়ে ওঠে রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্খার প্রতিনিধি। অথচ পার্টি অফ অর্ডার বুর্জোয়াদের  প্রতিনিধি বা দল। প্রথম বিপ্লবের পঞ্চাশ বছর পর দ্বিতীয় বিপ্লবের সময় বুর্জোয়াদের পক্ষে এটি পশ্চাদাপসরণ। আসলে এই সময়কালে বুর্জোয়ারা শ্রেণি হিসাবে তখনও কেলাসিত নয়। যার জন্য শ্রেণি শাসনের বদলে, শ্রেণির মধ্যেকার গোষ্ঠীর স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে। আগে উল্লিখিত, মার্কসের মন্তব্য এই অবস্থানকে সমর্থন করে।

১৮ ব্রুমেয়ারে  মার্কস বলছেন, বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক শাসন সব চাইতে শক্তিশালী ও নিরাপদ হতে পারে এক গণতান্ত্রিক রিপাবলিকে। কারণ গণতান্ত্রিক রিপাবলিকই বুর্জোয়াদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যেকার মতভেদ শান্তিপূর্ণ ভাবে মিটিয়ে ফেলার সুযোগ ও পরিবেশ দিতে পারে। ফলে সমগ্র শ্রেণির শাসন কায়েম করা যায়, সমগ্র শ্রেণির সামগ্রিক স্বার্থ বজায় রাখা যায় ও বুর্জোয়া শ্রেণির বিভিন্ন গোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। এই কাজটি ফরাসি বুর্জোয়ারা সেই সময় করেননি।

পাশাপাশি রিপাবলিক  বুর্জোয়াদের সম্পর্কে এক বিপরীতমুখী দু-ধরণের  অবস্থান গ্রহণ করে। একদিকে নিজেদের ব্যবহৃত হতে দেয় পুঁজিপতি শ্রেণির জন্য, অন্যদিকে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করে যাতে বুর্জোয়ারা ফরাসি সমাজের অন্যান্য শ্রেণির  সঙ্গে একসাথে থাকতে বাধ্য হয়। এই প্রসঙ্গে মার্কসকে উদ্ধৃত করা প্রয়োজন, ‘এটা সত্যি রিপাবলিক তার রাজনৈতিক শাসন সম্পূর্ণ করেছে। আবার একই সাথে তার সামাজিক ভিত্তিকে ছোট করে দেখেছে। রাজতন্ত্রের দেওয়া কোন আড়াল ছাড়াই এখন তাদের অধীনস্থ শ্রেণিসমূহের সাথে সংঘাতে যাওয়া উচিত। কোনরকম চিন্তা ছাড়াই প্রতিযোগিতায় যাওয়া উচিত। রাজতন্ত্র  ও নিজেদের মধ্যেকার লড়াই যা জাতীয় স্বার্থকে বিপথে পরিচালিত করে, তা উপেক্ষা করে তাদের এই কাজ করা উচিত।’ রিপাবলিকও এই কাজ করেনি। বুর্জোয়ারা ও রিপাবলিক কোন পক্ষই তাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালন করেনি। ১৭৮৯ সালের তুলনায় ১৮৪৮ সালে বুর্জোয়ারা যে ভিন্ন ভূমিকা পালন করেছে, এটাই তার চাবিকাঠি। ইতিহাস অগ্রসর হয়েছে। ফ্রান্সে বুর্জোয়ারা ক্রমেই রক্ষণশীল হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল  শ্রমিকশ্রেণির জুন মাসের অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানকে প্যারিসের রাস্তায় রক্তস্রোতে মোকাবিলা করা হলেও, ঘটনাটি পুঁজিপতিদের আতঙ্কিত করেছিল। এই ঘটনা পরবর্তী সময়ে শোষক শ্রেণির কাছে প্রেতাত্মার ভূমিকা পালন করেছে। বুর্জোয়ারা এতটাই আতঙ্কিত ছিল যে সামাজিক শান্তির পরিবেশ বজায় রাখতে তারা রিপাবলিককে বর্জন করতেও রাজি ছিল। কারণ তা না হলে তাদের ব্যবসা করার প্রয়োজনীয় পরিবেশ বিঘ্নিত হবার সম্ভাবনা ছিল।

ফরাসি সমাজে পাতি বুর্জোয়াদের নিয়ে আলোচনাও মার্কস এই বইতে করেছেন। মার্কসের মতে এরা সংশোধনবাদী সমাজতন্ত্রী-গণতান্ত্রিক। এদের কাছে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম ছিল সমাজে তৈরি  হওয়া বৈরিতামূলক দ্বন্দ্বকে ভোঁতা করে দেওয়া। এরা মনে করতেন বুর্জোয়া ও সর্বহারার মধ্যেকার দ্বন্দ্বকে মিটিয়ে সবাই মিলে একসাথে শান্তিতে বসবাস করা সম্ভব। তারা মনে করতেন তারা নিজেরা সাধারণ ভাবে সব রকমের দ্বন্দ্বের উপরে। ফলে তাদের স্বার্থই  আসলে জনগণের স্বার্থ। তারাই জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধি। ১৮৪৮ থেকে ১৮৫১ এই সময়কালে, এরা এক পরষ্পরবিরোধী অবস্থানে নিমজ্জিত হন। একদিকে ১৮৪৮ সালের জুন মাসে ন্যাশনাল গার্ডদের ব্যবহার করে শ্রমিকশ্রেণিকে রক্তাক্ত করে অবদমিত করেন। অন্যদিকে পার্টি অফ অর্ডার ও বুর্জোয়াদের সাথে সংসদীয় বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। সরকারের বিরুদ্ধ তারা প্রতিবাদ করেন, কিন্তু সাথে অস্ত্র নিতে ভুলে যান। তাদের আন্দোলন পরাজিত হয়।

এই পর্যন্ত আলোচনায় আমরা যেখানে পৌঁছলাম, লুই বোনাপার্টের একনায়কত্ব সেই সময়কার ফ্রান্সে উপস্থিত কোনও শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে না। অর্থাৎ সমাজের ওপর কোন শ্রেণিই তাদের আধিপত্য বা শাসন প্রতিষ্ঠা  করতে পারেনি। লুই বোনাপার্টের শাসন আসলে রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্রমবর্ধমান বিস্তার ও ক্ষমতার প্রতিনিধিত্বকারী। যা ফরাসি সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন অথচ সমাজের উপর আধিপত্যকারী।

ফরাসি সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশের ফলাফল হিসাবে রাষ্ট্রের, বিশেষ করে তার প্রশাসনিক ক্ষমতা বৃদ্ধির কথা মার্কস এই বইতে আলোচনা করেছেন। এই সময় ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততন্ত্র, পুঁজিবাদী সম্পর্কের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করছে, অভিজাত ও শহুরে অভিজাতদের কুক্ষিগত ক্ষমতা ও সুবিধা জমা হচ্ছে চরমপন্থী রাষ্ট্রের কাছে। সামন্ততন্ত্রের বিশিষ্টজনেরা পরিণত হচ্ছেন বেতনভুক সরকারী আমলায়। মধ্যযুগের শীর্ষ ক্ষমতাগুলির সংঘাতের বিন্যাস পরিবর্তিত হচ্ছে রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রিত পরিকল্পনায়। এবং তা কারখানার মতন কেন্দ্রীভূত ও কর্মবিভাজন ভিত্তিক।

সামন্ততন্ত্রের পরের পর্যায়ে বুর্জোয়া বিপ্লবের পর যে কোনো মুক্ত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে থাকে ও  ক্রমশ তা বিবর্তিতও হতে থাকে। এক বিশাল ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার অধিকারী হিসাবে তা সে প্রয়োগ করে তার অধীন সমস্ত আঞ্চলিক ক্ষেত্রে এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রেই। সে এটা করে বুর্জোয়া বিপ্লবের পর উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থ পূরণের জন্য। সাধারণভাবে বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যেকার পারষ্পরিক স্বার্থ-বিরোধী বর্গগুলি কেবল দেখে নেয় তাদের নিজ নিজ বর্গের স্বার্থ সিদ্ধি কতটা হচ্ছে। আর এই কাজে যা ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ সুনিশ্চিত কিনা। মার্কসের কাছে মনে হয়েছিল  লুই বোনাপার্টের একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আগে-পরে পরিস্থিতি  পাল্টে গেছে। ফরাসি দেশের শ্রমিক শ্রেণির শক্তি ও ১৮৪৮ -এর অর্থনৈতিক সংকট বুর্জোয়াদের মনোবল ধ্বংস করে দিয়েছিল। তারা ভাবতে পারেননি যে তারা তাদের শ্রেণি শাসন নিজ দক্ষতায় করতে সক্ষম। বোনাপার্টের  উত্থানকে মেনে নেওয়া ও তার কাছে সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়া প্রমাণ করে যে, তারা মনে করেছিল সমাজে তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব আরোপ করার যোগ্যতা নেই। আমলাতন্ত্র  ও সামরিক বাহিনীকে মনে হচ্ছিল, তারা নির্দিষ্ট যে কোন সামাজিক গোষ্ঠীর ইচ্ছা নিরপেক্ষ।

মার্কস বলছেন, ‘দ্বিতীয় বোনাপার্টের অধীনে রাষ্ট্রকে মনে হল তা নিজেকে সম্পূর্ণ ভাবে স্বাধীন করেছে।’

মার্কস এই বইতেই খুঁজেছেন ফরাসি সমাজের কোন অংশ বা শ্রেণি থেকে বোনাপার্টের প্রতি সমর্থন উৎসারিত। তিনি দেখিয়েছেন সেই অংশ হ'ল ছোট জমির মালিক-কৃষক সমাজ। এই অংশের স্রষ্টা প্রথম ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল। যার শেষ অঙ্কে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সম্রাট প্রথম নেপোলিয়ন হয়ে ওঠা। প্রথম ফরাসি বিপ্লবের সময় অনেক নোবেল এস্টেট ভেঙে দেওয়া হয় ও জমি কৃষকদের দিয়ে দেওয়া হয়। কৃষকদের এক বড় অংশ তাদের অংশের সেই গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলির জন্য শ্লাঘা অনুভব করে। পঞ্চাশ বছর মানে এক বা দুই প্রজন্ম, এজন্য নেপোলিয়ন বোনাপার্টের শাসনকালকে তাদের জন্য উপকারী সময় মনে করত। লুই বোনাপার্ট যেহেতু নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ভাইপো, কাকার প্রতি কৃতজ্ঞতা ভাইপোর প্রতি উছলে পড়ে। ফরাসি সমাজে অন্যান্য অংশের সাথে লুই বোনাপার্টের সংঘাতের সময় এই জন্যই তারা লুই বোনাপার্টের সমর্থনের মূল ভিত্তি। প্রথম ফরাসি বুর্জোয়া  বিপ্লব ছোট জমির স্বাধীন  মালিক হিসাবে কৃষকদের  একটি বড়ো অংশ হিসাবে তৈরি করেছিল। কিন্তু ১৮৪৮ সালের মধ্যে বুর্জোয়া আধিপত্যের দ্বারাই তারা সাধারণ ভাবে বুর্জোয়াদের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে  মার্কস ১৮ ব্রুমেয়ারে  বলছেন, ‘উনবিংশ শতাব্দী জুড়ে সুদ-গ্রহীতারা সামন্তদের জায়গা নেয়, মর্টগেজে রূপান্তরিত হয় সামন্ততান্ত্রিক দায়, বুর্জোয়া পুঁজি প্রতিস্থাপিত করেছে অভিজাতদের ভূসম্পত্তি। কৃষকদের কাছে পড়ে আছে তাদের ক্ষুদ্র জমি, যা থেকে বুর্জোয়ারা মুনাফা, সুদ ও জমির ভাড়া আদায় করতে পারে। কৃষকদের নিজেদের মজুরি জোগাড় করার জায়গাটাও সেই জমিটুকুই। দায়িত্বও তার।’ পুঁজিপতিদের আধিপত্য ও কৃষকদের স্বার্থের মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকলেও বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে তারা মূলগত ভাবে অযোগ্য। শহর ও গ্রামীণ জীবনের সামাজিক পরিস্থিতি কৃষকদের বাধা দেয় শ্রেণি হিসাবে এক সমষ্টিগত চেতনার ভিত্তিতে তাদের শ্রেণি স্বার্থ  গড়ে তোলায়। এই সামাজিক বস্তুগত পরিস্থিতি কি ছিল?

১৮ ব্রুমেয়ারে মার্কস বলছেন, ‘বিশাল সংখ্যক ক্ষুদ্র জমির মালিকেরা ছিলেন। তারা একই পরিবেশ-পরিস্থিতিতে বসবাস করতেন। কিন্তু একের সাথে অন্যের সামাজিক অন্যান্য সম্পর্ক ছিল না। উৎপাদন পদ্ধতিই তাদের একের সাথে অন্যের মেলামেশাকে বাধা দিত। পৃথক করে রাখত একের থেকে অন্যকে। ফ্রান্সের সেই সময়কার অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও কৃষকদের দারিদ্র এই বিচ্ছিন্নতাকে বাড়তে সাহায্য করেছিল। উৎপাদনের ক্ষেত্র ছিল ক্ষুদ্র একখণ্ড জমি। ফলে শ্রম বিভাজনের কোন প্রশ্ন ছিল না। বিজ্ঞানের প্রয়োগ ছিল না। ফলস্বরূপ বিকাশের বহুমুখীনতা অনুপস্থিত ছিল। প্রতিভার বৈচিত্র্য ছিল না। সামাজিক সম্পর্ক সম্পদ হিসাবে ছিল না। প্রত্যেক কৃষক পরিবার ছিল স্বনির্ভর। নিজস্ব উপভোগের সামগ্রী কৃষক নিজেই উৎপাদন করত। জীবনের যা প্রয়োজন, প্রকৃতির সাথে বিনিময়ের মাধ্যমে তা সে জোগাড়  করত। সমাজের সাথে মেলামেশার কোন প্রয়োজন ছিলো না।’

পুরনো বস্তুগত স্মৃতি আর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের স্মৃতি প্রজন্মান্তরে কৃষকদের লুই বোনাপার্টের সমর্থকে রূপান্তরিত করেছিল। কিন্তু এর অর্থ কখনোই এটা নয় যে লুই বোনাপার্টের শাসন কৃষকদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করত। তা একেবারেই ছিল বুর্জোয়া শোষণের শর্তাবলীর সংরক্ষণ করবার জন্য।

মার্কস অষ্টাদশ ব্রুমেয়ারে বলছেন, ‘বুর্জোয়ারা স্বীকার করে যে তাদের নিজস্ব স্বার্থই তাকে নিজস্ব শাসন থেকে নিষ্কৃতি নেবার নির্দেশ দেয়। দেশে শান্তি ফেরাতে বুর্জোয়া সংসদকেই সর্বপ্রথম মৃত্যু প্রদান করতে হবে। এর সামাজিক  ক্ষমতার পূর্ণ সংরক্ষণ করতে গেলে এর রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ভাঙতেই হবে। যাতে বুর্জোয়ারা অন্যান্য শ্রেণিকে শোষণ করার কাজটা চালিয়ে যেতে পারে। কোনও রকম বাধা ছাড়াই সম্পত্তি, পরিবার, ধর্ম ও শৃঙ্খলা বজায় থাকে। কেবলমাত্র একটাই শর্ত। অন্যান্য শ্রেণির মতন তাকেও নিন্দার সম্মুখীন হতে হবে, তা হল রাজনৈতিক শূন্যতার। অর্থাৎ তার টাকার থলি সামলাতে তাকে রাজমুকুটকে জলাঞ্জলি দিতে হবে।’

যে কয়েকটি শিক্ষা ১৮ ব্রুমেয়ার থেকে নেওয়া যায়:

১। কৃষক সমাজ কোন শহুরে শ্রেণির নেতৃত্বেই কেবলমাত্র পুঁজিবাদকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। মার্কসের ভাষায় ‘কৃষকদের স্বার্থ আর কোন ভাবেই পুঁজির স্বার্থের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বরং তা বুর্জোয়াদের স্বার্থের বিরোধী। তাই তারা তাদের স্বাভাবিক  মিত্র খুঁজে নেবে শহুরে সর্বহারার মধ্যে যার কাজ হবে বুর্জোয়াতন্ত্রকে ছুঁড়ে ফেলা’

২। উপরে উল্লেখিত এই চিন্তাটিই ১৮৫১ পরবর্তী সময়ে সমজাতান্ত্রিক আন্দোলন কোন পথে যাবে তার পথনির্দেশিকা।

৩। অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার দেখায় শ্রমিক শ্রেণিই কেবলমাত্র এক বিপ্লবী ভূমিকা পালন করতে পারে যদি সে বুর্জোয়াদের ছাড়া স্বাধীনভাবে কাজ করে।

৪। ১৮৭১ সালে এই সূত্রায়নের ভিত্তিতেই প্যারিসের শ্রমিকরা তৈরি করেছে প্যারী কমিউন।

৫। অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার ও প্যারী কমিউন থেকে শিক্ষা নিয়ে মার্কসের নির্দেশ, শ্রমিক শ্রেণি বুর্জোয়া রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতার মাধ্যমে সমাজতন্ত্র  নির্মাণ করতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন পূর্বতন রাষ্ট্র ক্ষমতাকে ধ্বংস করে একেবারেই  নতুন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন। সে এক পৃথক আলোচনা।

 

 




প্রকাশের তারিখ: ০৩-মে-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

It is important to circulate this article to our comrade because of their understanding without which we are not in a position to handle this turbulent situation...our comrade may be well equipped mentally and knowledgeable to establish the ideological base....
- Tanusree Chakraborty , ০৪-মে-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫