Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষাগুলি শুষ্ক তত্ত্ব নয় - প্রাণশক্তিতে ভরপুর

সরোজ মুখোপাধ্যায়
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) একমাত্র গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার যে শিক্ষা কমরড লেনিন-স্তালিনের নেতৃত্বে পাওয়া গেছে এই পার্টিই তাকে নিজ দেশের অভিজ্ঞতায় বাস্তবে প্রয়োগ করার অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নভেম্বর বিপ্লবের ফলে যে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে তাকে অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়া, সেই নীতিতে অবিচল থাকা প্রতিটি প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য। আমাদের পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-ই সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার নীতি অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর করার চেষ্টা করেছে।
The lessons of the November Revolution Are Not Dry Theories- Filled With Vitality

মহান নভেম্বর বিপ্লবের তোপধ্বনি সারা বিশ্বের শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী জনগণকে বিপ্লবী প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৯১৭ সালের ৭ই নভেম্বর থেকে রাশিয়ার বুকে যে যুগান্তকারী বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটে যায় তার বার্তা পৌঁছে যায় দেশে দেশে লাঞ্ছিত বঞ্চিত অত্যাচারিত মানুষের কাছে। সংগঠিত হতে থাকেন তাঁরা শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়নে, কৃষকদের কৃষক সমিতিতে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপ্লবীরা সংগঠিত হতে থাকেন দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে। নবজীবনের স্পন্দন শুরু হয় শ্রমিকশ্রেণির মধ্যে। শোষণহীন সমাজ গঠনের বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হয়ে যায়। ধনবাদী শোষণ ও সাম্রাজ্যবাদী অপশাসনের নিষ্ঠুর সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেবার সংগ্রাম ও আন্দোলনে ব্যাপকতা এবং তীব্রতা দেখা দেয়। বুর্জোয়া-জমিদার রাষ্ট্র ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে শ্রমিক-কৃষক-মেহনতী জনগণের নিজস্ব রাজত্ব প্রতিষ্ঠার শপথ গ্রহণ করে দেশে দেশে নিপীড়িত মানুষ।

নভেম্বর বিপ্লবের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অগ্রসর হবার জন্য দেশে দেশে বিপ্লবীরা মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অধ্যয়ন করতে শুরু করেন। কমরেড জে ভি স্তালিন মার্কসবাদের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ লেনিনের শিক্ষা ও কর্মপ্রণালীকে লিপিবদ্ধ করে লেনিনবাদের প্রচার শুরু করেন। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ আয়ত্ত করতে না পারলে কোন দেশেই সফলভাবে বৈপ্লবিক কর্মধারা পরিচালিত করা সম্ভব নয়। এছাড়া কোন দেশেই বিপ্লব সফল করে শোষণমূলক রাষ্ট্রযন্ত্রকে উচ্ছেদ করে মেহনতী জনগণের স্বার্থবাহী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা সম্ভব নয় কথাগুলি বলেছেন, কমরেড স্তালিন। লেনিনবাদের ভিত্তি ও লেনিনবাদের সমস্যা কমরেড স্তালিনের এই দুটি পুস্তকের মাধ্যমে সে যুগের কমিউনিস্টদের বৈপ্লবিক শিক্ষা শুরু হয়। নভেম্বর বিপ্লবের প্রেরণায় উৎসাহিত হয়ে বিপ্লবী কর্মধারায় উদ্দীপিত হয়ে নিজ দেশে বিপ্লব সমাধা করতে হলে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে হয়। এই প্রয়োগ ধারার নির্দেশক নীতিগুলিই স্তালিনের লেনিনবাদে বর্ণিত হয়েছে।

শ্রমিকশ্রেণিকেই এগিয়ে আসতে হবে

চূড়ান্ত বিশ্লেষণে শ্রমিকশ্রেণিই সর্বাপেক্ষা বেশি বিপ্লবী। বর্তমানে ধনবাদী সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেবার বৈপ্লবিক সংগ্রামে তারাই পারে নেতৃত্ব দিতে। শ্রমিকদের অগ্রণী বাহিনীকে সংগঠিত করতে হবে কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনে। শ্রেণি সচেতন করে তুলে বৈপ্লবিক কর্মধায়ায় বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ভূমিতে দাঁড়িয়ে, কৃষক সম্প্রদায়সহ অন্যান্য সমস্ত অত্যাচারিত শ্রেণি ও শ্রেণির অংশ বিশেষের দাবিদাওয়া ও অধিকার রক্ষার আন্দোলনে তাদের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক সংগ্রামে, গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার আন্দোলনে সেই শ্রমিকশ্রেণিকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। শ্রমিকশ্রেণি অন্য সমস্ত বঞ্চিত অআচারিত শ্রেণির স্বার্থরক্ষার কাজে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করবে। শ্রমিকশ্রেণির এই দায়িত্ব সম্পর্কে লেনিনবাদে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে। শ্রমিকশ্রেণিকে রাজনৈতিক কর্তব্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা পরিষ্কার করার জন্য কমরেড লেনিন লিখলেন "কি করিতে হইবে।" রাজনীতিটা কী তা খুব ভাল করে শ্রমিকদের বুঝতে হবে। লেনিন লিখেছেনঃ যারা শুধু শ্রেণী সংগ্রাম স্বীকার করে, তারা মার্কসবাদী হয়ে ওঠেনি। তারা বুর্জোয়া চিন্তা ও বুর্জোয়া রাজনীতির গন্ডির মধ্যেই রয়ে গেছে। মার্কসবাদকে শ্রেণি সংগ্রামের মতবাদে সীমাবদ্ধ করে রাখার অর্থ তাকে ছেঁটে দেওয়া, বিকৃত করা, বুর্জোয়াদের কাছে গ্রহণযোগ্য এমন কিছুতে পরিণত করা। একমাত্র সে-ই মার্কসবাদী যে শ্রেণী সংগ্রামের স্বীকৃতিকে প্রসারিত করে সর্বহারার একনায়কত্বের স্বীকৃতিতে। এই হলো সাধারণ পেটি (এবং বৃহৎ) বুর্জোয়া এবং মার্কসবাদীদের মধ্যে গভীরতম পার্থক্য। (খন্ড ২৫, পৃঃ৪০৪)।


শ্রমিকশ্রেণিকে মার্কসবাদে দীক্ষিত করে প্রকৃত মার্কসবাদী পার্টি গঠন করে তবেই লেনিনের পরিচালনায় রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি নভেম্বর বিপ্লব সার্থক করে তুলতে পেরেছিল। কমরেড স্তালিন লিখেছেনঃ শুধু উপযুক্ত কমিউনিস্ট পার্টি থাকলেই হবে না। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের বিজয়ের পূর্বশর্তস্বরূপ সর্বহারাশ্রেণি ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে মৈত্রী সম্বন্ধে লেনিনের যে নীতি ষষ্ঠ কংগ্রেসের সকল সিদ্ধান্তে সেই নীতির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছিল। ১৯১৭ সালের ২৬শে জুলাই থেকে ৩রা আগস্ট পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির এই ষষ্ঠ কংগ্রেসের অধিবেশন চলেছিল। সেখানেই বলশেভিক পার্টির ভূমিকা চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছিল। খবরের কাগজে অধিবেশনের কথা ঘোষণা করা হলেও সে অধিবেশন কোথায় হবে, ঠিক কোন্ সময়ে হবে তা কাগজে জানানো হয়নি। বুর্জোয়া কাগজগুলি পার্টি কংগ্রেসের প্রতিনিধিদের গ্রেপ্তারের দাবি করল। গোয়েন্দা পুলিশ মরিয়া হয়ে ভাইবর্গ শহরে সর্বত্র বলশেভিকদের খোঁজাখুঁজি করে কংগ্রেস অধিবেশনের স্থান জানার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। প্রথমে ভাইবর্গ জেলায় অধিবেশন শুরু হলেও পরে নার্ভাগেটের নিকট একটি স্কুল বাড়িতে অধিবেশন চলতে থাকে। রাজলিভ স্টেশনের কাছে একটা পোড়ো বাড়িতে কমরেড লেনিন গোপনে আশ্রয় নেন। রাশিয়ায় তখন ফেব্রুয়ারী বিপ্লবে জারতন্ত্রের উচ্ছেদের পর বুর্জোয়া শাসন চলেছে। বুর্জোয়াদের পুলিশ পাগলা কুকুরের মত খুঁজেও কাউকে ধরতে পারেনি। স্তালিন, ভালভ, মলোটভ, অর্জনিকিজস প্রমুখ নেতাদের মারফত লেনিন গোপন আশ্রয় থেকে পার্টি কংগ্রেসের কাজে নেতৃত্ব দেন। এই ধরনের সাংগঠনিক যোগ্যতা অর্জন করেছিল রাশিয়ার বলশেভিক পার্টি। দু লক্ষ চল্লিশ হাজার পার্টি সভ্যের ৫৭ জন পূর্ণ প্রতিনিধি ও ১২৮ জন ভোটবিহীন প্রতিনিধি মোট ২৮৫ জন বলশেভিক নেতাদের আলোচনার মধ্য দিয়ে নভেম্বর বিপ্লবের আশু প্রস্তুতি শুরু হয়। স্তালিন বলেছিলেন বিপ্লবের শান্তিপূর্ণ পর্যায় শেষ হয়েছে, আরম্ভ হয়েছে শান্তিহীন পর্যায়, আরম্ভ হয়েছে সংঘাত ও বিস্ফোরণের পর্যায়।

সশস্ত্র অভ্যুত্থানের দিকে পার্টি অগ্রসর হলো। এই কংগ্রেসে ট্রটস্কিপন্থীরা, কামেনেভ বুখারিনপন্থীরা নানাদিক থেকে অধিবেশনের মূল প্রস্তাবকে আক্রমণ করে। এই বিভিন্ন ধরনের বিচ্যুতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বলশেভিক পার্টির প্রতিনিধিরা লেনিনের নির্দেশমত কর্মধারা স্থির করেন এবং লেনিনের নির্দেশমত প্রস্তাবাদি রচনা করেন স্তালিন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

ট্রেড ইউনিয়নগুলি নিরপেক্ষ থাকবে বলে মেনশেভিকরা যে মত প্রচার করে পার্টি কংগ্রেস তার নিন্দা করে। পার্টি কংগ্রেসে বলা হয় রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণীর সামনে আছে বিরাট কর্মযজ্ঞ। যদি ট্রেড ইউনিয়নগুলি বলশেভিক পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্বীকার করে সংগ্রামশীল সংগঠনে পরিণত হয় তবেই এই কর্মভার সুসম্পন্ন করা সম্ভব।

স্তালিনের পরিচালনায় রচিত "সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে" নভেম্বর বিপ্লবের প্রাক্কালে কিভাবে দ্রুত তালে প্রস্তুতি চলেছিল, বিভিন্ন সংগঠনকে কিভাবে বলশেভিক পার্টির রাজনীতিক নেতৃত্বের পরিচালনাধীনে আনা হয়েছিল তার বিশদ বর্ণনা আছে। এই ইতিহাসে শ্রমিকশ্রেণির কর্তব্য ছাড়াও অন্যান্য সংগঠনের কর্তব্য সম্পর্কেও বলা হয়েছে। যুব সংগঠনের ক্ষেত্রে বলা হয়েছেঃ "তখন প্রায়ই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুব সংঘের উদ্ভব ঘটছিল। এগুলি সম্পর্কে পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। পার্টির পরবর্তী প্রচেষ্টার ফলে এইসব যুব সংগঠনের আনুগত্য অর্জনে বলশেভিক পার্টি বেশ সাফল্যলাভ করে। এরা পার্টির মজুত শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।

এই অধিবেশনে পার্টির গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নীতির ভিত্তিতে সমস্ত পার্টি সংগঠনকে সুসংবদ্ধ করার আহ্বান জানান হয়। সশস্ত্র অভ্যুত্থানের জন্য সর্বহারাশ্রেণি ও দরিদ্র কৃষকদের প্রস্তুত করাই ছিল ষষ্ঠ কংগ্রেসের সমস্ত সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য। বুর্জোয়া শ্রেণির বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সংগ্রামের জন্য শ্রমিক সৈনিক ও কৃষকদের আহ্বান করে পার্টির ষষ্ঠ কংগ্রেস একটি ইস্তেহার প্রচার করে। ইস্তেহারের উপসংহারে লেখা হয়ঃ "কমরেডরা সকলে আসুন, নতুন সংগ্রামের জন্য আমরা আয়োজন করি। অটল, সতেজ ও অবিচলিত মনে, প্ররোচকদের ফাঁদে পা না দিয়ে, আপনাদের শক্তি সমাবেশ করুন। আপনাদের সংগ্রামী বাহিনী গঠন করুন। সর্বহারা ও সৈনিকদের পাশে ও পার্টির পতাকাতলে সকলে সমবেত হোন। গ্রামের নিপীড়িত জনগণ, আমাদের পতাকাতলে শামিল হোন।"

নভেম্বর বিপ্লবের মূল শিক্ষা ষষ্ঠ কংগ্রেসের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই পরিস্ফুট হয়ে ওঠে। মহান নভেম্বর বিপ্লবের বিজয়ের যে পাঁচটি মূল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে, তা আমাদের সকলেরই ভাল করে অধ্যয়ন করা উচিত। এর মধ্য থেকে কয়েকটি উল্লেখ করা বর্তমানে প্রয়োজনীয় বলে মনে করি। এই ইতিহাসের সপ্তম অধ্যায় থেকে এই উদ্ধৃতি দিচ্ছি: "১৯১৭ সালের নভেম্বর বিপ্লবের প্রাক্কালে শ্রমিকশ্রেণীই শান্তি, ভূমি, স্বাধীনতা ও সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে জনগণের নেতা বলে স্বীকৃত হয়েছিল। রাশিয়ার শ্রমিকশ্রেণির মত নেতৃত্ব যদি বিপ্লবে না থাকত, জনগণের আস্থা অর্জন করেছে এমন নেতা যদি না মিলত, তবে শ্রমিকশ্রেণি ও কৃষক সম্প্রদায়ের মধ্যে মৈত্রী ঘটত না। এবং এই মৈত্রী না ঘটলে বিজয়ও সম্ভব হত না।"

"কৃষকরা বুঝেছিলেন যে রাশিয়ার একমাত্র যে পার্টি জমিদারদের সঙ্গে একেবারে জড়িত ছিল না এবং কৃষকদের প্রয়োজন মেটাবার জন্য জমিদারদের শক্তি চূর্ণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল, সেই পার্টিই হলো বলশেভিক পার্টি। এই বিশ্বাসই হলো সর্বহারা শ্রমিকশ্রেণি ও দরিদ্র কৃষকদের মধ্যে মৈত্রীর সুদৃঢ় ভিত্তি। যে মাঝারি কৃষকরা বহুদিন দোদুল্যমান অবস্থায় ছিল এবং মাত্র নভেম্বর বিপ্লবের প্রাক্কালে সর্বান্তঃকরণে বিপ্লবের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে দরিদ্র কৃষকদের সাথে হাত মেলালো, সেই মাঝারি কৃষকরা যে কি করবেন তাও নির্ধারিত হয়ে গেল এই শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর দ্বারা। এই মৈত্রী ছাড়া নভেম্বর বিপ্লব যে জয়যুক্ত হত না তা বলা বাহুল্য।" সর্বোপরি, "রাজনৈতিক সংগ্রামে বারবার পরীক্ষিত ও পরিশোধিত বলশেভিক পার্টির মতো পার্টি ছিল শ্রমিকশ্রেণীর নেতা। চূড়ান্ত আক্রমণে জনগণকে পরিচালনা করার মত সাহস ও লক্ষনস্থলে পৌঁছুবার পথে যে প্রচ্ছন্ন বাধা থাকে সেগুলি অতিক্রম করার মত সতর্কতা ছিল বলেই বলশেভিক পার্টির মত পার্টি এমন নিপুণভাবে একটি ব্যাপক বিপ্লবী প্রবাহের মধ্যে যুদ্ধ-শান্তির দাবিতে সাধারণ গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জমিদারী দখলের দাবিতে কৃষকদের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, জাতীয় স্বাধীনতা ও সমানাধিকারের দাবিতে অত্যাচারিত জাতিসমূহের আন্দোলন এবং বুর্জোয়াশ্রেণির উচ্ছেদ ও সর্বহারাশ্রেণির একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি সর্বহারাশ্রেণির সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মতো বিভিন্ন বিপ্লবী ধারাকে মিশিয়ে দিতে পেরেছিল।"\

এই একটি প্যারাতেই মূল বিষয়টি সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাসে স্তালিনের নেতৃত্বে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। আমাদের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি ১৯৬৪ সাল থেকেই সংশোধনবাদীদের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্কে ছিন্ন করার পর থেকেই উপরোক্ত মূল শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। পার্টি সংগঠনকে লেনিনীয় পদ্ধতিতে শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য বিগত চৌদ্দ বছর ধরে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বারে বারে পার্টি সংগঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে দলিলও প্রস্তুত হয়েছে। এবার আবার ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে হাওড়ায় এই পার্টি-সংগঠন সম্পর্কেই কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনাম অধিবেশন বসছে। নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার সূত্র ধরেই পার্টি এই কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করেছে।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) একমাত্র গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারে সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার যে শিক্ষা কমরড লেনিন-স্তালিনের নেতৃত্বে পাওয়া গেছে এই পার্টিই তাকে নিজ দেশের অভিজ্ঞতায় বাস্তবে প্রয়োগ করার অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নভেম্বর বিপ্লবের ফলে যে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতা সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো কমরেড লেনিনের নেতৃত্বে তাকে অগ্রসর করে নিয়ে যাওয়া, সেই নীতিতে অবিচল থাকা প্রতিটি প্রকৃত কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য। আমাদের পার্টি কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-ই সর্বহারার আন্তর্জাতিকতার নীতি অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর করার চেষ্টা করেছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের সময় সমস্ত রকমে সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের পার্টিই শত লাঞ্ছনা, কারা যন্ত্রণা - সরকারের নির্মম দমন-পীড়ন সব কিছুকে তুচ্ছ করে সর্বহারা আন্তর্জাতিকতার পতাকা উড্ডীন করে রেখেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মহাচীনের দুই বৃহৎ কমিউনিস্ট পার্টির ভুল ত্রুটি ও বিচ্যুতি সম্পর্কে ভ্রাতৃত্বসুলভ সমালোচনা করেও বরাবর দুইটি দেশের সমাজতান্ত্রিক অগ্রগতি ও জয়যাত্রাকে জনসমক্ষে সগৌরবে তুলে ধরেছে এবং বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের ঐক্য গঠনে অবিরাম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

আমাদের পার্টি যে নভেম্বর বিপ্লবের মূল শিক্ষাগুলিকে বাস্তবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে সাধ্যমত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এ বিষয়ে আমাদের গভীর আত্মবিশ্বাস থাকা প্রয়োজন। এজন্যই কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হলো। আরো একটি বিষয়ে বলতে পারা যায়, ১৯৬৪ সাল থেকে যতগুলি বড় বড় আন্দোলন শ্রমিকশ্রেণী কর্মচারী ও কৃষকদের ক্ষেত্রে সংগঠিত হয়েছে, সেগুলির প্রত্যেকটিতে আমাদের পার্টি (বিশেষতঃ পশ্চিমবাংলার অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়) শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর শুধু প্রচারই করেনি, কৃষক সংগ্রামের সময় শ্রমিকদের স্কোয়াড প্রেরণ এবং শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে কৃষকদের সাহায্য ও সহযোগিতা সুনিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তা যথাসাধ্য বাস্তবায়িত করা হয়েছে। শ্রমিক কর্মচারীরা কৃষকদের ফসল কাটার সংগ্রামের, উচ্ছেদ বিরোধী সংগ্রামের সমর্থনে ধর্মঘট-হরতালও পালন করেছেন কয়েকবার। শ্রমিক কর্মচারীদের ধর্মঘটের সময় কৃষকরা প্রচারাভিযানে যোগদান করেছেন। ১৯৭৪ সালের রেল ধর্মঘটের সময় কৃষকদের আশ্রয় দান, অর্থদান, পুলিশি নির্যাতনের সময় সর্বতোভাবে সাহায্য দান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন কৃষক সংগ্রামের পাশে শ্রমিক কর্মচারীর অবস্থান এবং শ্রমিক-কর্মচারীর সংগ্রামের সময় কৃষক সংগঠনের সহযোগিতা এবং পাটের দাম ও পাট শিল্পে সমস্যা নিয়ে শ্রমিক ও পাটচাষীদের যুক্ত সম্মেলন ও যৌথ আন্দোলন শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী গড়ে তোলার অভিযানে কয়েকটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত মাত্র। এই পথেই মৈত্রী গড়ে তুলতে হবে। একথা মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টি প্রতি পার্টি সম্মেলনে ও গণসংগঠনের সম্মেলনে বারে বারে ঘোষণা করে এবং তা কার্যকর করার চেষ্টা করে। এ বিষয়ে জেলায় জেলায় যে অগ্রগতি হয়েছে তা ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণে আমাদের আরো সাহায্য করবে। মনে রাখতে হবে, এ দিকে আমাদের দৃঢ় পদক্ষেপে আরো বহুদূর যেতে হবে। করেছি আমরা সামান্যই। লক্ষ্যে পৌঁছবার ক্ষেত্রে এই মৈত্রী সুসংগঠিতভাবে গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরী – একথা স্মরণে রেখে আমাদের অগ্রসর হতে হবে। নভেম্বর বিপ্লবের মূল শিক্ষাগুলি মনে রাখলে আমাদের দেশের বাস্তব পরিস্থিতিতে এই কাজগুলি বিশেষ যত্ন সহকারে করবার জন্য আমাদের উদ্যোগ ও উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে। নভেম্বর বিপ্লবের শিক্ষা সম্পর্কে সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস থেকে এই প্রবন্ধে যে মূল্যবান উদ্ধৃতিগুলি দিয়েছি সেগুলি শুষ্ক তত্ত্ব কথা নয়, মার্কসবাদ লেনিনবাদের মতে সে সব তত্ত্বে জীবনী শক্তি আছে, তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে হয়। জনগণের সংগ্রামের ময়দানে, বৈপ্লবিক জীবনে তাকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলাই আমাদের কর্তব্য।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয় গণশক্তির ১৭ই নভেম্বর, ১৯৭৮ সংখ্যায়। 

 

 


প্রকাশের তারিখ: ০৭-নভেম্বর-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

পার্টি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জনের জন্য নিয়মিত পড়াশোনা ও প্রতিদিনের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত থাকা জরুরি, লেখাটা আমার ভালো লেগেছে।
- Nishitosh Biswas, ১৫-নভেম্বর-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫