সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মৃতদের মধ্যে দুজন মৃত্যুহীন
গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ
সেই কারণেই যখন আলেন্দের বিধবা স্ত্রী কফিনে তার মুখ দেখতে চেয়েছিলেন, তারা খুলে দেখাতে অস্বীকার করেছিল, শুধু চাদর ঢাকা একটা শরীরের গড়ন দেখিয়েছিল। তাঁকে সান্তাইনেস কবরখানায় মারমাদুকো গ্রোভের পরিবারের শবগৃহে কবর দেওয়া হয়েছিল, আর কিছু না, শুধু এক স্তবক ফুল রেখেছিলেন তাঁর বিধবা স্ত্রী, সঙ্গে লেখা ছিল- ‘সালভাদর আলেন্দে, চিলির রাষ্ট্রপতি, এখানে সমাধিস্থ হয়েছেন।‘

নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ চিলির বিখ্যাত চিত্র পরিচালক মিগুয়েল লিটিন-এর রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার কথা শুনে লিখেছিলেন ‘ক্ল্যান্ডেসটাইন ইন চিলি’ গ্রন্থটি। সেই গ্রন্থের একটি ছোট্ট অধ্যায়ে আলেন্দে এবং নেরুদার প্রসঙ্গ এসেছে। পিনোচেতের সামরিক জুন্টার নেতৃত্বে যে ভয়ঙ্কর শ্বাসরোধকারী পরিবেশ চিলিতে তৈরি হয়েছিল এবং কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের নির্বিচার হত্যা সংগঠিত হয়েছিল তার বিরুদ্ধে অগণিত সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ একটু অন্য ভঙ্গিমায় এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
গ্রন্থটি বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তিনি ভূমিকায় জানিয়েছেন এই গ্রন্থ রচনার কাহিনি: ‘চিলির বিখ্যাত চিত্র পরিচালক মিগুয়েল লিটিন অভ্যুত্থানের পরেই দেশ থেকে নির্বাসিত হন। পরে তার নাম স্থান পায় অবাঞ্ছিত ব্যক্তিদের ঘোষিত তালিকায় বারো বছর পর মাদ্রিদ থেকে ছদ্মবেশে, মিথ্যা নামে, অন্যের পাসপার্টে এমনকি সাজানো বউ নিয়ে গোপনে চিলিতে ঢুকেছিলেন লিটিন। সামরিক শাসনের বিপর্যয়কর পরিবেশে নিজের দেশ আর দেশের মানুষকে নিয়ে একটি ফিল্ম করতে। ছ’সপ্তাহ তিনি চিলিতে ছিলেন। সামরিকবাহিনী ও গোয়েন্দাদের জাল এড়িয়ে, সারা দেশে ঘুরে, তার কাজ শেষ করে শেষ পর্যন্ত ফিরেও এসেছিলেন। সেই কাহিনি তিনি মুখে মুখে শুনিয়েছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্বনামধন্য ঔপন্যাসিক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজকে। মার্কেজ সেই রোমাঞ্চকর সাহসিকতায়ভরা অভিযানকে ফুটিয়ে তুলেছেন ‘ক্ল্যান্ডেসটাইন ইন চিলি’ গ্রন্থে।
আলেন্দের প্রভাব সবচেয়ে বেশি বোঝা যায় ভালপারাইসোতে, কর্মব্যস্ত বন্দরশহর, যেখানে তাঁর জন্ম হয়েছিল, সেখানেই বড় হয়েছিলেন, রাজনীতির শিক্ষাও পেয়েছিলেন। সেখানে একজন নৈরাজ্যবাদী, জুতো তৈরির কারখানা মালিকের বাড়িতেই তিনি প্রথম তাত্ত্বিক রচনাগুলি পড়েছিলেন। সেখানেই তিনি সারা জীবনভোর দাবার নেশার খপ্পরে পড়েছিলেন। তার ঠাকুরদা রেমন আলেন্দে, চিলির প্রথম ধর্মনিরপেক্ষ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আর সেখানেই তৈরি করেছিলেন প্রথম ‘ম্যাসনিক লজ’, যেখানে যোগ দিয়ে সালভাদর আলেন্দে গ্রান্ড মাস্টারের সর্বোচ্চ পদ পেয়েছিলেন। তাঁর প্রথম জীবনের রাজনৈতিক কার্যকলাপ শুরু হয়েছিল ‘বারো দিন ব্যাপী সমাজতান্ত্রিক দিনগুলিতে’, যেটি সংগঠিত করেছিলেন কিংবদন্তী নায়ক মারমাদুকো গ্রোভ, যাঁর ভাই আলেন্দের বোনকে বিয়ে করেছিলেন।
এটাই একটা অদ্ভুত ব্যাপার যে স্বৈরতন্ত্রী শাসকরা এলেন্দেকে ভালপারাইসোতেই কবর দিয়েছিল, যে জায়াগাটা তিনি নিজেও নিঃসন্দেহে বেছে নিতেন। কোনো ঘোষণা ছাড়াই, কোনো অনুষ্ঠান ছাড়াই, ১৯৭৩-এর ১১ই সেপ্টেম্বরের রাত্রিতে তাঁকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সঙ্গে ছিলেন শুধু তাঁর স্ত্রী হরটেনসিয়া বাসি, আর তাঁর বোন লরা। মান্ধাতা আমলের বিমানবাহিনীর একটা প্রপেলার বিমানে, দক্ষিণের বরফ হাওয়া এসে ঢুকছিল ভাঙাচোরা দিয়ে। মিলিটারি শাসকদের গুপ্তচর বিভাগের একজন প্রাক্তন সদস্য, যে প্রথম আক্রমণকারী দলের সঙ্গে মনেদা প্রাসাদে ঢুকেছিল, সে মার্কিন সাংবাদিক টমাস হাউসারকে বলেছিল, যে সে রাষ্ট্রপতির দেহটা দেখেছিল ‘মাথাটা খণ্ড-বিখণ্ড, মস্তিষ্কের অংশ ছিটিয়ে পড়েছে মেঝেতে আর দেওয়ালে ।'
সেই কারণেই যখন আলেন্দের বিধবা স্ত্রী কফিনে তার মুখ দেখতে চেয়েছিলেন, তারা খুলে দেখাতে অস্বীকার করেছিল, শুধু চাদর ঢাকা একটা শরীরের গড়ন দেখিয়েছিল। তাঁকে সান্তাইনেস কবরখানায় মারমাদুকো গ্রোভের পরিবারের শবগৃহে কবর দেওয়া হয়েছিল, আর কিছু না, শুধু এক স্তবক ফুল রেখেছিলেন তাঁর বিধবা স্ত্রী, সঙ্গে লেখা ছিল- ‘সালভাদর আলেন্দে, চিলির রাষ্ট্রপতি, এখানে সমাধিস্থ হয়েছেন।‘ স্বৈরতন্ত্রীরা ভেবেছিল আলেন্দেকে তারা সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধার থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে, কিন্তু তা অসম্ভব প্রমাণিত হয়েছিল। যদিও সরকার যতদূর নামা যায় নেমে, গুজবও রটিয়ে দিয়েছিল, তাঁর দেহ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু সশ্রদ্ধ মানুষ প্রতিদিন আসতেই লাগল, কবরের পাথরের উপর অজানা মানুষের ফুল জমতেই লাগল ।
পাবলো নেরুদার উত্তরসূরীরাও ঢেউ তুলেছিল নতুন প্রজন্মের মধ্যে। ইসলা নেগ্রাতে সমুদ্রের ধারে কবির পুরানো বাড়িটি হয়ে উঠেছে এক তীর্থস্থান। এর নাম সত্ত্বেও প্রায় গল্পকথার মতন এই জায়গাটি দ্বীপও নয়, কালোও নয়, শুধু মাছ ধরার একটি গ্রাম। বিশাল বিশাল পাইন গাছের মধ্য দিয়ে হলুদ রংয়ের কাঁচা রাস্তা, সবুজে বন্য সমুদ্রের পাড় ধরে ধরে জায়গাটা ভালপারাইসো থেকে পঁচিশ মাইল দক্ষিণে সান আন্তোনিও সড়কের কাছে। পাবলো নেরুদার বাড়িটি দুনিয়ার প্রেমিক-প্রেমিকাদের মক্কা। আমি আর ফ্রাঙ্কি আগে এগিয়ে গেছি শুটিং-এর সময়সূচি ঠিক করতে। ইতালির দলটি ভালপারাইসোতে তখন শেষের শটগুলি তুলে ফেলছে। কর্মরত একজন নিরাপত্তা রক্ষী আমাদের সেতুটা, সরাইখানাটা দেখিয়ে দিল, আরো সব জায়গা, যেগুলি কবির কবিতায় স্মরণীয় হয়ে আছে, কিন্তু সে আমাকে সতর্ক করে দিল, ও বাড়িতে ঢোকা নিষেধ।
আমরা সরাইখানায় অন্যদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম, বুঝতে পারছি কি ভাবে কবি এই ইসলা নেগ্রার আত্মার মতন ছিলেন। যখনই তিনি সেখানে থাকতেন, এলাকাটা ভর্তি করে রাখত তরুণ-তরুণীরা, হাতে তাঁর ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা’, এটাই তাদের একমাত্র নির্দেশিকা। তারা শুধু চাইত তাঁকে এক পলক দেখতে, হয়ত বা তাঁর স্বাক্ষর নিতে। বেশিরভাগ লোকের কাছে শুধু এই জায়গাটার স্মৃতিটুকু নিয়ে যাওয়াই যথেষ্ট। সেই সময় এই সরাইখানা ছিল আনন্দে সরগরম একটা জায়গা, সেখানে নেরুদা মাঝে মাঝে আসতেন তার রঙচঙে আলখাল্লা আর আন্দিয়ান টুপি পরে, ভারি চেহারায়, আস্তে আস্তে পোপের মতন হেঁটে। তিনি সেখানে আসতেন টেলিফোন করার জন্য, নিজের ফোনটা সরিয়ে দিয়েছিলেন। বাধা-পাওয়া থেকে মুক্তি পেতে, অথবা আসতেন সরাইখানার মালিক ডোনা এলেনার সঙ্গে কথা বলতে, কি করে তাঁর বন্ধুদের জন্য সেই রাত্তিরে তাঁর বাড়িতে রান্না করতে হবে তাই নিয়ে। নেরুদা ছিলেন রান্না করার মজায় বিশেষজ্ঞ, নিজেও পেশাদারী ঢঙে রাঁধতে পারতেন। ভালো খাওয়ার শিল্পকে তিনি এমন উন্নত করেছিলেন যে, টেবিল সাজানোর বিস্তৃত টুকিটাকি ব্যাপারেও নজর দিতেন। নিজেই চাদর, ডিস, রুপোর পাত্র পরিবর্তন করে নিতেন, যতক্ষণ না যে খাবার পরিবেশন হচ্ছে তার সঙ্গে সেগুলি সুরে মিলছে। বারো বছর পরে সবকিছু এক ভয়ঙ্কর ঝড়ে উড়ে গেছে। বেদনাময় স্মৃতির আঘাতে ডোনা এলেনা চলে গেছেন সান্তিয়াগোতে, সরাইখানাটি এখন প্রায় ভেঙ্গে পড়ার মুখে। কবিতার এক টুকরো বেঁচে আছে, শেষ ভূমিকম্পের পর থেকে, ইসলা নেগ্রাতে দশ কি পনের মিনিট সেই কম্পন এখনও অনুভূত হয়, প্রত্যেকদিন, প্রত্যেকরাত।
ইসলা নেগ্রার মাটি কেঁপে ওঠে
নেরুদার বাড়িটি দেখলাম প্রহরীর মতন পাইন গাছের ছায়ায় বেশ কয়েক ফুট উঁচু দেওয়াল দিয়ে ঘেরা, কবির ব্যক্তি জীবনকে আড়ালে রাখার জন্য। জঙ্গলে ফুল ফুটেছে। একটা নির্দেশে লেখা রয়েছে যে বাড়িটিতে পুলিশ তালাচাবি দিয়েছে, সেখানে ঢোকা আর ছবি তোলা নিষেধ। যে নিরাপত্তারক্ষীটি একটা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বারবার ঘুরে আসছে সে আরো খোলাখুলি ভাবে বলল, 'এখানে সবকিছুই নিষেধ'। এটা আগেভাগেই বুঝে, ইতালির ক্যামেরাম্যানটি বিশাল, বেশ ভালো দেখতে যেসব যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছিল, সেটা রক্ষীদের ঘাঁটিতে জমা দিয়ে দিল, অন্য যেটিকে আরেকটি হাতে করে নাড়াচাড়া করা যায় সেটিকে জামার মধ্যে লুকিয়ে রাখল। আমরা তিনটে গাড়ি নিয়েছিলাম, যাতে ব্যবহৃত ফিল্মের রোল তাড়াতাড়ি শুটিং শেষ হলেই সান্তিয়াগোতে নিয়ে ফেলা যায়। শুধু যেটা ক্যামেরায় থাকছে যদি আমরা ধরা পড়ি সেটাই চলে যাবে। যদি তাই-ই হয় দলের লোকেরা ভাগ করে বলবে আমাদের চেনে না আমি আর ফ্রাঙ্কি নিরীহ পর্যটক বনে যাব।
বাড়ির দরজা ভেতর থেকে তালা দেওয়া, জানলা ঢাকা পড়েছে সাদা পরদায়, নেরুদা এখানে থাকলে একটা পোলের সঙ্গে যে পতাকা নেরুদার উপস্থিতির সংকেত জানাত সেটাও নেই। এই বেদনার মধ্যেই অজানা রক্ষাকর্তাদের হাতে বাগানটির শোভা বেড়েই চলেছে। আমাদের ওখানে পৌঁছানোর কিছু দিন আগে নেরুদার বিধবা স্ত্রী মাতিলদে মারা গেছেন। তিনি অভ্যুত্থানের পরেই আসবাবপত্র সব সরিয়ে ফেলেছিলেন, বইপত্র সবকিছু, লৌকিক এবং অলৌকিক নেরুদা তাঁর যাযাবর জীবনে যা যা সংগ্রহ করেছিলেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে তার বাড়িগুলোর বৈশিষ্ট্য শুধু ছিমছাম চেহারার জন্যই নয়, তাদের বৈভবের জন্যও। প্রকৃতিকে পাবার জন্য তাঁর কামনা শুধু তাঁর প্রাণবন্ত কবিতাতেই আটকে থাকেনি, তিনি সংগ্রহ করেছিলেন ভাঙাচোরা সমুদ্রের ঝিনুক, জাহাজের ভাঙা টুকরো, ভয়ংকর আকৃতির মথ আর প্রজাপতি, অদ্ভুত সব কাঁচ আর বড় বড় পাত্র। তাঁর একটি বাড়িতে আগন্তুকরা দেখতে পাবে একটা অফিসের মাঝখানে একটা ঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে, নকল, ভিতরে অন্য কিছু পোরা, কিন্তু মনে হবে জীবন্ত। নেরুদা নিজের খেয়ালে বাড়ির স্থাপত্য পাল্টে নিতেন। মনে রাখার মতো একটা পরিবর্তন হল, খাওয়ার ঘর থেকে থাকার ঘরটাকে আলাদা করে দেওয়া, ফলে উঠোনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে হবে একটা ঘর থেকে আরেকটা ঘরে, বর্ষার সময় সহৃদয়ে মাথায় ছাতা ধরা হবে। নেরুদার ভেনিজুয়েলার বন্ধুরা যারা খারাপ রুচির সঙ্গে খারাপ ভাগ্যের সম্পর্ক আছে মনে করতেন, তাঁরা বলেছিলেন নেরুদার সংগৃহীত জিনিসগুলোই তাঁর ক্ষতি করবে। খুব মজা পেয়ে তিনি বলেছিলেন মন্দভাগ্যের প্রতিষেধক হচ্ছে কবিতা, তাঁর ভয়ংকর সংগ্রহগুলি নিঃসন্দেহে তাই প্রমাণ করেছে।
তাঁর থাকার প্রধান বাড়িটি ছিল সান্তিয়াগোর ক্যালে মারদোয়েজ দ্যলা প্লাতায়। অভ্যুত্থানের কয়েকদিন পরে সেখানেই তিনি মারা গিয়েছিলেন, গভীর দুঃখে তাঁর একটানা লিউকোমিয়া বেড়ে গিয়েছিল। সৈন্যরা তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল, বাগানে তাঁর বইগুলোর বহ্নুৎসব করেছিল। নোবেল উপহারের টাকায় নর্মান্ডিতে একটি প্রাসাদের আস্তাবল কিনে নিয়ে সেটাকে থাকার মতো করে বানিয়ে নিয়েছিলেন, পদ্ম ফুল-ভরা একটা পুকুরের ধার ঘেঁসে। চার্চের খিলানের মতো তাঁর ঘরের লম্বা বাঁকানো সিলিং, ঘসা কাঁচের জানলা দিয়ে আলো ঢুকে কবিকে রঙিন করে দিত, যখন তিনি বিছানায় বসে বন্ধুদের স্বাগত জানাতেন। পুরো একটা বছরও তিনি ঐ বাড়িটি উপভোগ করতে পারেন নি।
ইসলা নেগ্রায় তাঁর বাড়িটির অনুষঙ্গ খোঁজে তাঁর পাঠকরা তাঁর কবিতার সঙ্গে। গুণগ্রাহীদের এক নতুন প্রজন্ম, কবির জীবিত অবস্থায় যাদের বয়স তখন বড়োজোর আট, এখানে তারা এখন রোজ ভীড় জমাচ্ছে। সারা পৃথিবী থেকে তারা আসছে, হরতন চিহ্নের মাঝখানে দুজনের নামের আদ্যাক্ষর লিখে রেখেছে, বাড়িতে ঢোকার মুখ আটকে রেখেছে যে বেড়াটা, সেখানে লিখে রেখেছে ‘ভালোবাসার বার্তা।‘ বেশিরভাগ লেখারই একই বিষয়বস্তু শুধু একটু হেরফের: ‘জুয়ান আর রোসা পাবলোর পথ ধরে ভালোবাসে একে অন্যকে। ধন্যবাদ পাবলো, তুমি আমাদের ভালোবাসতে শিখিয়েছ; তুমি যতটা ভালোবাসতে, আমরা তেমনি ভালোবাসব।‘ কিন্তু কিছু লেখা নিরাপত্তারক্ষীরা ঠেকাতেও পারেনা, মুছে ফেলতেও পারেনা, যেমন: ‘সেনাপতির দল, ভালোবাসা কখনও মরেনা’, ‘এলেন্দে আর নেরুদা বেঁচেই রয়েছে’ ‘এক মিনিটের অন্ধকার আমাদের অন্ধ করতে পারেনা।‘ এইসব লেখা রয়েছে অদ্ভুত সব জায়গায়, পুরো বেড়াটা দেখলে মনে হয়, জায়গার অভাবে বেশ কয়েক প্রজন্মের এই লেখাগুলো একটার ওপর আর একটা চাপা পড়ে আছে। কারো যদি ধৈর্য থাকে বেড়ার ওপর প্রেমিক-প্রেমিকাদের স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে লেখা এই কবিতার টুকরোগুলো নতুন করে সাজিয়ে নিলে নেরুদার সম্পূর্ণ রচনাবলী তৈরি হয়ে যাবে। শব্দগুলি প্রতি দশ-পনের মিনিট অন্তর জীবনকে জাগিয়ে দিচ্ছে, ভয়ংকর কম্পনে পৃথিবীকে ঝাকিয়ে দিয়ে। বেড়াটা মাটি থেকে ভেঙে পড়তে চাইছে, তার জোড়ার জায়গায় কাঠগুলোয় ফাটল ধরেছে, নৌকো ডুবে গেলে যেমন হয়, তেমনি কাঁচ এবং ধাতু ঝলকাচ্ছে, মনে হবে পৃথিবী কেঁপে উঠছে, এই বাড়ির বাগানে বপন করা সবটুকু ভালোবাসায়।
অনুবাদ: বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
প্রকাশের তারিখ: ২১-সেপ্টেম্বর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
