সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভারত ভাবনার উৎস সন্ধানে (১ম পর্ব)
ইরফান হাবিব
আর একটা বিপজ্জনক দিক হলো যে আমাদের বিজেপির বন্ধুরা ও তাদের নিয়ন্ত্রণকর্তা আর.এস.এস দাবি করছে যে ঋক্ বেদের যুগ থেকেই ভারত একটি জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ঘটনা হলো যে, 'ঋক্ বেদ তো দূরের কথা পরবর্তী তিনটি বেদ বা আরো পরের 'ব্রাহ্মণ' এমনকী তুলনামূলকভাবে অনেক নবীন উপনিষদগুলির যুগেও 'ভারত' বলে কোনো দেশের উল্লেখ পাওয়া যায় না। ঋক বেদে কোনো সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের কথাও নেই, উল্লেখ আছে কেবল নদী এবং আদিবাসীদের। এমন কী সপ্তসিন্ধুর বা সাতটি নদীবিধৌত অঞ্চল বলতে তখন পাঞ্জাবকে বোঝাত না। বোঝাত সাতটি নদীর কালধারার কথা যার থেকে সিন্ধুনদীর উৎপত্তি। এটা অনেক পরবর্তীকালের সংযোজন। পাঞ্জাব এবং আফগানিস্তানের কয়েকটি অংশে বসে বেদ মন্ত্র বা শ্লোক লিখিত হয়েছিল। তখন সেখানে বসবাস করতেন ভ্রাম্যমাণ আদিবাসীরা। কাজেই কোনো অঞ্চল বা ন্যূনপক্ষে 'দেশ'-এর ধারণাই তখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।

"ভারত" নামক অভিধাটির উৎস, তার ক্রমপ্রসারণ এবং কীভাবে তা একটি জাতিতে পরিণত হলো ও বর্তমান সময়ে তাকে কী কী বিপদের সামনে পড়তে হচ্ছে তা নিয়েই আমার আজকের আলোচনা। আমরা আমাদের ইতিহাসের এক চরম দুঃখময় সময়ের মধ্য দিয়ে পথ চলছি। সাম্প্রতিক দাভোলকার, পানসারে এবং কালবুর্গির মতো যুক্তিবাদী, বিজ্ঞাননির্ভর মানুষকে নৃশংস হত্যার শিকার হতে হয়েছে আমাদের দেশে। গো-রক্ষার নামে খুন হয়েছেন মহম্মদ আখলাক। এইভাবে আমাদের দেশকে অন্ধকারের অতলে টেনে নামানো হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সকলকে আজ গভীরভাবে দেশের কথা ভাবতে হবে; জানতে হবে আমাদের দেশের প্রাণভোমরাটা কোথায় এবং তার জন্য নিজেদের আমরা কতটা উজাড় করে দিতে পারি।
আর একটা বিপজ্জনক দিক হলো যে আমাদের বিজেপির বন্ধুরা ও তাদের নিয়ন্ত্রণকর্তা আর.এস.এস দাবি করছে যে ঋক্ বেদের যুগ থেকেই ভারত একটি জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু ঘটনা হলো যে, 'ঋক্ বেদ তো দূরের কথা পরবর্তী তিনটি বেদ বা আরো পরের 'ব্রাহ্মণ' এমনকী তুলনামূলকভাবে অনেক নবীন উপনিষদগুলির যুগেও 'ভারত' বলে কোনো দেশের উল্লেখ পাওয়া যায় না। ঋক বেদে কোনো সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলের কথাও নেই, উল্লেখ আছে কেবল নদী এবং আদিবাসীদের। এমন কী সপ্তসিন্ধুর বা সাতটি নদীবিধৌত অঞ্চল বলতে তখন পাঞ্জাবকে বোঝাত না। বোঝাত সাতটি নদীর কালধারার কথা যার থেকে সিন্ধুনদীর উৎপত্তি। এটা অনেক পরবর্তীকালের সংযোজন। পাঞ্জাব এবং আফগানিস্তানের কয়েকটি অংশে বসে বেদ মন্ত্র বা শ্লোক লিখিত হয়েছিল। তখন সেখানে বসবাস করতেন ভ্রাম্যমাণ আদিবাসীরা। কাজেই কোনো অঞ্চল বা ন্যূনপক্ষে 'দেশ'-এর ধারণাই তখন পর্যন্ত গড়ে ওঠেনি।
সংস্কৃতির বিকাশের হাত ধরে রাজনৈতিক সত্তার চেতনা জাগ্রত হয়। খ্রিস্ট জন্মের পাঁচশো বছর আগে প্রাকৃত ভাষার 'ষোল মহাজনপদ' (ষোলটি বৃহৎ রাজ্য) নামক গ্রন্থে প্রথম আমাদের দেশের উল্লেখ পাওয়া যায়। মনে রাখতে হবে যে 'ষোল' শব্দটি একটি প্রকৃত শব্দ এবং হিন্দি, উর্দু সহ আমাদের অনেক ভাষারই উৎসস্থল এই প্রাকৃত ভাষা। এই মহাজনপদগুলি উত্তর ভারতের কম্বোজা বা কাবুল থেকে পূর্ব বিহারের "অঙ্গ" পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। এখন আমরা ভারত বলতে যা বুঝি অথবা মনে করি তখন পর্যন্ত সে সম্পর্কে কোনো ধারণারই সূত্রপাত হয়নি। কেবলমাত্র কয়েকটি ধর্মসূত্রে আর্যাবর্ত' বা 'পবিত্রভূমির' উল্লেখ পাওয়া যায়। এবং মনুস্মৃতিতে এই আর্যাবর্তের সীমানা হিসেবে হিমালয় থেকে বিন্ধ্যপর্বতমালা পর্যন্ত বিস্তৃত অঞ্চলকেই বোঝানো হয়েছে। এটি নিশ্চয়ই একটি বৃহৎ এলাকা, কিন্তু, আজকের দিনে ভারত বলতে যে বৃহৎ দেশকে বুঝে থাকি এই আর্যাবর্ত তার একটি অংশমাত্র— পূর্ণাঙ্গ ভারত নয়।
"ভারত" নামক একটি পূর্ণাঙ্গ দেশের ভাবনা আমরা প্রথম পাই মৌর্য সাম্রাজ্যের শাসনকালে ভারতীয় ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই অবগত আছেন যে, মৌর্য সম্রাট অশোকের সময়ে কান্দাহার এবং কাবুলের উত্তরাঞ্চল থেকে কনটিক হয়ে অন্ত পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় যেসব খোদাই করা লিপি উদ্ধার করা গিয়েছে তার সবটাই হয় প্রাকৃত, গ্রিক কিংবা প্রাচীন অ্যারাবেইক ভাষায় লিখিত। এমনি এক আশ্চর্য রাজনৈতিক রাখিবন্ধনের ভিতর দিয়ে আমাদের ভারত নামক ভাবনাটি গড়ে উঠেছে। এই দেশের প্রথম নাম ছিল "জম্বুদ্বীপ"। সম্রাট অশোক এই নামটি ব্যবহার করতেন। যার অর্থ হলো 'জাম ফলের দেশ। খ্রিস্টজন্ম পূর্ববর্তী প্রথম শতকেও ওড়িশার হাতিগুম্ফার কলিঙ্গ রাজা খাড়াভেলা প্রাকৃত ভাষায় লিখিত শিলালিপিতে ভারত শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। রাজা খারাতেলা ভারত বলতে সম্পূর্ণ ভারতকেই বোঝাতে চেয়েছিলেন। এইভাবেই ধীরে ধীরে 'ভারত' নামক একটি দেশের ভাবনাটিও গড়ে ওঠে এবং দেশময় ছড়ানো বৌদ্ধ ধর্ম, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও জৈন ধর্মের পাশাপাশি একটা সাংস্কৃতিক ঐক্যের চেহারাটাও স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে। সবাই মোটামুটি কথ্য প্রাকৃত ভাষাই ব্যবহার করতেন। আর শুদ্ধ প্রাকৃত ভাষাই ছিল সারা দেশের সংযোগরক্ষাকারী ভাষা। এইভাবেই নানা সূত্রধরের আমাদের মধ্যে একটা ঐক্যের আবহাওয়া তৈরি হয়।
যে সমস্ত বিদেশি নানা কাজে এদেশে আসতেন তাদের চোখেও এদেশবাসীর একটা পৃথক সাংস্কৃতিক চরিত্র ধরা পড়ত এবং আরও মজার বিষয় হলো যে বিদেশিরা যত সহজে এদেশের পৃথক সত্তাকে চিহ্নিত করতে পারত, এদেশবাসীরা কিন্তু তা তত সহজে পারত না। বিদেশিরা জানত যে ভারতীয় এবং পারস্যবাসীদের মধ্যে নানা বিষয়ে পার্থক্য রয়েছে। অন্যদিকে পাঞ্জাব থেকে দক্ষিণ ভারত পর্যন্ত সর্বত্রই প্রাকৃত ছিল সাহিত্যের ভাষা, আর সংস্কৃতি ছিল ধর্মকর্মের ভাষা। ইরানিরাই প্রথম আমাদের ভারতবাসীদের 'হিন্দু' নামে উল্লেখ করে। এ নামের স্রষ্টাও তারাই। সিন্ধুনদ থেকেই হিন্দু শব্দের উৎপত্তি। প্রাচীন পারসিক ভাষায় সিন্ধু নদীকে এঁরা হিন্দু বলেই উল্লেখ করতেন। তাই সিন্ধু নদীর পূর্বদিকের সমস্ত এলাকাকেই এঁরা 'হিন্দু' বলতেন। সেই থেকেই Indus বা ইন্ডিয়া' নামটি এসেছে। গ্রিকরা শব্দের প্রথম H অক্ষরটি উচ্চারণ করতেন না বলে তাদের কাছেও হিন্দু হয়ে গিয়েছিল 'ইন্দু'। চৈনিক ভাষাতেও India কে Intu বলা হতো। এটির উৎস সেই একই। এরও অনেক পরে সৃষ্টি হয়। পারসিক শব্দ "হিন্দুস্তান'। একথাটা ভুললে চলবে না যে সংস্কৃত ভাষায় "হিন্দুস্থান' বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব নেই। সংস্কৃত ভাষায় স্থান বলতে সুনির্দিষ্ট একটি স্থান বা জায়গাকে বোঝায়। কিন্তু, পারসিক ভাষায় 'স্তান' বলতে অক্ষম বা এলাকাকে বুঝিয়ে থাকে। যেমন, সীস্থান, ওজস্থান, হিন্দুস্তান ইত্যাদি। চতুর্থ খ্রিস্টাব্দে Sasanaid শিলালিপিতে এর দুরান্ত পাওয়া যায়। সুতরাং 'হিন্দু'-সহ এইসব শব্দের সৃষ্টি কিন্তু ভারতের বাইরে এবং অভারতীয়দের হাতে। আজ যারা হিন্দুত্ব নিয়ে সর্বদাই সরব এবং অন্য সবকিছুকেই বিদেশি বলে নস্যাৎ করতে চান তারা হয়তো ভুলে যান যে "হিন্দু' শব্দের উৎপত্তি কিন্তু ইরান থেকে এবং চতুর্দশ শতাব্দীর আগে সংস্কৃত ভাষায় এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। বিজয়নগর সাম্রাজ্যের সংস্কৃত শিলালিপিতে প্রথম বিজয়নগরের শাসকেরা "হিন্দু" শব্দ ব্যবহার করেন। তারা নিজেদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলতেন। হিন্দু রাজা সুখটানা অর্থাৎ হিন্দু রাজাদের উপর প্রভুত্বকারী সুলতান। বিজয়নগরের রাজারা সুলতান হিসেবে হিন্দুদের তাদের অধীনস্থ বলেই গণ্য করতেন। সুতরাং আমাদের সংস্কৃতি বরাবরই বহুত্ববাদী। ইরানি ও আরব মুসলমানরা সর্বপ্রথম হিন্দু, হিন্দুস্থান শব্দগুলি ব্যবহার করতেন এবং প্রাচীন ইরানি ভাষা থেকেই 'হিন্দু' শব্দের উৎপত্তি। সংস্কৃত ভাষায় হিন্দু শব্দের ব্যবহার মাত্র চতুর্দশ শতাব্দী থেকে। এসব কথা বলছি এই কারণে যে, কেউ কেউ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে প্রচার করেছেন যে ভারত নামে একটি দেশের ভাবনা খুব প্রাচীন নয়। পেরী অ্যান্ডারসন তাঁর বই The Indian Ideology- তে জোরের সঙ্গে দাবি করেছেন যে আধুনিককালে India এই নামটি বিদেশি, বিশেষ করে ইউরোপীয়দের দেওয়া। এ দাবি সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর এবং অসত্য। আর একটি বিশেষ কারণেও বিষয়টি বিভ্রান্তিকর। কেননা এর আড়ালে রয়েছে আর একটি রহস্য। খ্রিস্টের জন্মের অনেক আগে থেকেই ভারত নিয়ে একটি ভাবনার অস্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু, দেশপ্রেম বা দেশকে নিয়ে ভালোবাসা, আবেগ তখনও তৈরি হয়নি। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো এই যে প্রাচীন ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ সময় পর্বে সংস্কৃত ভাষায় রচিত একটিও দেশাত্মবোধক গান আমরা খুঁজে পাই না। নেই ভারতকে ভালোবাসার কোনো আন্তরিক আহ্বান।
ভারতে প্রথম যে দেশপ্রেমমূলক কবিতাটির সন্ধান পাই তার রচয়িতা বিখ্যাত কবি আমীর খসরু। ১৩১৮ খ্রিস্টাব্দে তাঁর রচিত 'নূহ সিও আইহির (Nuh Siaihar) নামের দীর্ঘ কবিতার বইটিতে এর সন্ধান পাওয়া যায়। দুঃখের কথা হলো এই যে, আজকের দিনে আমরা আমাদের সেই গৌরবময় ঐতিহ্যকে হারাতে বসেছি। আজকের দিনে কতজন আর আমীর খসরুর নাম জানেন, কতজনই বা তাঁর অমর কবিতাগুলি পাঠ করতে পারেন। কাজেই খুব কম লোকেই জানেন যে, আমীর খসরুই প্রথম লেখক যাঁর কলমে প্রথম উঠে এসেছিল ভারত বন্দনার কথা। ভারতের প্রতি তাঁর আন্তরিক ভালোবাসার কথা খসরু নানাভাবে প্রকাশ করেছেন। ভারতকে কেন ভালো লাগে সে কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে অনেক কথার ভিড়ে প্রথমেই বলেছেন যে ভারতের আবহাওয়া অতি চমৎকার। আমার কাছে অবশ্য কথাটার বিশেষ গুরুত্ব নেই। খসরুর ভালো লেগেছে এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, আকাশ-বাতাস, পশুপাখি, সুন্দরী নারীদের মাধুর্য এবং তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা। ভারতের ব্রাহ্মণ সমাজেরও তিনি অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। এদের বিদ্যাচর্চা, তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত সংস্কৃত ভাষা। আমীর খসরু শুধু ব্রাহ্মণ সমাজের নয় এখানে বসবাসকারী মুসলমানদেরও লক্ষ্য করেছেন। যারা পারসিক ভাষা অথবা তুর্কি ভাষায় কথা বলেন এবং ভারতের সর্বত্র তাঁরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। বস্তুত তিনি কাশ্মীরি থেকে মাজরি (তামিল) ভারতীয় সব ভাষারই প্রশংসা করেছেন। এই ভাষাগুলি শুধু উত্তর ভারতে নয় দক্ষিণ ভারতেও প্রচলিত ছিল। খসরু এইসব ভাষার একটি সাধারণ নাম দিয়েছিলেন হিন্দভী' ভাষা। তিনি আরও লিখেছেন যে, এসব ভাষা ছাড়াও ছিল সংস্কৃত ভাষা, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানও পড়া যেত। আরবি ভাষা যদি কোরানের ভাষা না হতো তাহলে আমীর খসরু সংস্কৃত ভাষাকেই বেশি পছন্দ করতেন। তাঁর মতে, ভারত নিখিল বিশ্বকে অনেক দিয়েছে, বিশ্ব সভ্যতায় তার অবদান ও কম নয়। পঞ্চতন্ত্রের গল্প, দাবা এবং আশ্চর্যজনকভাবে দশমিক আবিষ্কারের কৃতিত্বও তিনি ভারতকেই দিয়েছেন। আমরা এতকাল জানতাম যে দশমিক আবিষ্কার আরব দেশের অবদান। সারা বিশ্বও তাই জেনে এসেছে। কিন্তু সেসব নস্যাৎ করে দিয়ে আমীর খসরু দশমিক, দাবা এবং পঞ্চতন্ত্রের গল্প—এই তিনটিরই কৃতিত্ব ভারতকে দিয়েছেন এবং সঠিকভাবেই নিয়েছেন। চতুর্থ শতাব্দীতেই দশমিকের তত্ত্বগত ব্যবহারের কথা স্বয়ং আর্যভট্ট উল্লেখ করেছেন।
অন্যান্য অনেক কবি, ইতিহাসবিদ, লেখক বিশ্বসভ্যতায় ভারতের বিপুল অবদানের সপ্রশংস উল্লেখ করলেও তারা কেউ আমীর খসরুর মতো এত সবিস্তারে, এত গভীরভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে এবং অপূর্বভাষায় তা ব্যক্ত করতে সক্ষম হননি। ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দে কবি ইসামি ভারতের প্রশংসা করে একটি কবিতায় লেখেন 'হিন্দুস্থান নামক এই অপরূপ দেশটির প্রশংসা না করে পারা যাবে না, কারণ এই ফুলের বাগানটির সৌন্দর্যকে স্বর্গও ঈর্ষা করে।” আমি এ বিষয়ে আর বিস্তৃত আলোচনায় প্রবেশ করতে চাই না। এবার পারসিক ভাষায় দেশাত্মবোধক কবিতা তোমরা খুঁজতে শুরু করো। সে পথে আমি যাব না। কারণ, ভারতের প্রশংসাসূচক সব কবিতাই পারসিক ভাষায় রচিত, আর ভারতীয়দের কাছে এই ভাষা এখন প্রায় এক মৃত ভাষা।
মুঘল আমলে বিশেষ করে আকবর ও আবুল ফজলের সময়ে দেশাত্মবোধ বা দেশপ্রেমের ভাবনা আরও স্পষ্ট এবং প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। তাঁরা যুক্তি দিয়েছিলেন যে ভারত এমন একটা দেশ যেখানে বহু ধর্মের মানুষ বাস করেন। কাজেই এখানে সহিঞ্চুতা থাকতেই হবে। পরিপূর্ণ শান্তির আবহাওয়ায় এক ছাতার তলায় সবাইকে নিয়ে মিলেমিশে থাকাটা এখানে একান্ত জরুরি। এখানে মনে করা হয় যে ঈশ্বরের মতই রাজা সবাইকে সমান চোখে দেখবেন, কোনো বৈষম্য করবেন না। শুধু আকবর বা আবুল ফজলই এই মনোভাব নিয়ে চলতেন না, যখন রাজকুমার ছিলেন তখন স্বয়ং আওরঙ্গজেব ও ১৬৫৮ সালে এই একই নীতি অনুসরণ করে রাজপুতদের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছিলেন। ঈশ্বর যখন বারিবর্ষণে বিশ্বকেও ধৌত করেন বা আলোকধারায় বিশ্বের সকল অন্ধকারকে দূর করেন তখনও কি তিনি হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে প্রভেদ করেন? সূর্যকিরণ কি শুধুমাত্র মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত? এই কিরণের কণা থেকে কি হিন্দুরা বঞ্চিত থাকেন? বৃষ্টি এক কেবল মুসলমানদের উপর বর্ষিত হয়, আর অমুসলিমরা তার অংশভাগী হন না? যেখানে ঈশ্বর সর্বদা সততা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক, সেখানে ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসাবে সম্রাটরা কী করে অন্যরকম আচরণ করতে পারেন? এভাবে রাষ্ট্রশাসনের ক্ষেত্রে এমন একটা অলিখিত ভাবনা গড়ে ওঠে যাকে ঠিক 'ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র' বলা না গেলেও ভারতীয় পরিস্থিতিতে নিঃসন্দেহে তাকে সহিষ্ণুতাই' বলা যায়। একথা বারবার বলা হয়েছে যে ভারতে সব ধর্মের সহাবস্থান। জাহাঙ্গীর নিজেই উদাহরণ দিয়ে বলেছেন ভুরানে শুধুমাত্র 'সুন্নী' মুসলমানদের এবং ইরানে কেবলমাত্র "শিয়া' মুসলমানদের বরদাস্ত করা হয়ে থাকে, কিন্তু, একমাত্র ভারতেই সব ধর্মকে মান্যতা দেওয়া হয়ে থাকে। এইভাবে মুঘল রাজত্বে একটা নতুন মৈত্রীর আবহাওয়া তৈরি হয় এবং রাজনীতির ক্ষেত্রেও এটা বিকাশের বার্তা বহন করে আনে।
ডঃ তারাচাঁদ ১৯২৮ সালে প্রকাশিত এবং ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট কর্তৃক পুনর্মুদ্রিত The Influence of Islam on Indian Culture' (ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের প্রভাব) শীর্ষক বিখ্যাত গ্রন্থটিতে উল্লেখ করেছেন যে পরপর দুটি সাম্রাজ্য অর্থাৎ দিল্লির সুলতানি শাসন এবং মুঘল সাম্রাজ্য ভারতের সমস্ত টুকরো বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলিকে এক ছাতার তলায় নিয়ে এসে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ভাবনা সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীকালে ডঃ তারাচাঁদ তাঁর এই মত ভারতীয় মুক্তি আন্দোলনের সরকারি ইতিহাসেও অব্যাহত রেখেছেন— যার একটা অংশ তিনি লিখেছেন এবং বাকিটা সম্পাদনা করেছেন। ভারতের আধুনিক ইতিহাস যাঁরা পাঠ করেছেন তারাই জানেন যে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ শুরু হয় বেঙ্গল আর্মির হাত ধরে। এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ১৩০ হাজার- যা সেই সময়ে বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তম। এই এক লক্ষ তিরিশ হাজার সৈন্যের মধ্যে এক লক্ষ সৈন্যই ব্রিটিশ বিরোধী বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন এবং তাদের অধিকাংশই ছিলেন ব্রাহ্মণ সিপাহী। কেউ কি জানেন দোকানিদের কণ্ঠে সেদিন আওয়াজ উঠেছিল, 'চলো দিল্লি ভারতের সিংহাসনে বাহাদুর শাহ জাফরকে বসাও।" যারা উর্দু জানেন তাদের সবাইকে অনুরোধ করব বিদ্রোহীদের প্রধান মুখপত্র 'দিল্লি উর্দু খবর পাঠ করতে। পাঁচ মাস ধরে এটাই ছিল বিদ্রোহীদের মুখ্য বার্তা এবং এতে ভারত বলতে সর্বদা হিন্দুস্থান' শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। বিখ্যাত উর্দু কবি সাদি যিনি বলেছিলেন, সমস্ত মানুষই এক ('আইজা-ই-এক দিগর') তাঁর কবিতা থেকে বিদ্রোহীরা উদ্ধৃতি দিতেন হামেশা। তারা মনে করতেন একে অপরের মুখপাত্র, একজন আঘাত পেলে অপরজনও আহত হন। তাই বিদ্রোহীরা আওয়াজ তুলেছিলেন যে, ইংরেজের বিরুদ্ধে হিন্দু মুসলমানদের একতাবদ্ধ হতেই হবে। 'দিল্লি উর্দু আখবর' এর ঘোষণায় ওয়াহাবি মুসলিমদের সতর্ক করে দেয় তাদের ঐক্যবিরোধী ভূমিকার জন্য। কারণ, ওয়াহাবিরা বলেছিল যে, ইংরেজদের বিরুদ্ধে হিন্দু এবং মুসলমানরা কখনোই একত্রে বিদ্রোহ করতে পারে না। বস্তুত ওয়াহাবিরা ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে যোগ দেয়নি। তারা ইদুজ্জোহার সময়ে দিল্লির জামা মসজিদ দখল করে নিয়ে দাবি জানায় যে এখানেই গো-হত্যা করতে হবে। এতে বিদ্রোহীদের কমান্ডার বখত মান ওয়াহাবিদের মসজিদ থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এই বলে হুঁশিয়ারি দেন যে ওয়াহাবিরা যদি তাদের দাবি নিয়ে চাপাচাপি চালিয়ে যায় তাহলে তাদের ভুগতে হবে।
সৈয়দ আহমদ তাঁর সরকামি-ই জিলাবিজনৌর'-এ লেখেন যে, ১৮৫৭ সালের বিপর্যয়ের জন্য সমগ্র ভারতবাসীই দায়ী এবং সঠিকভাবেই তারা শাস্তি পেয়েছেন। আমাদের ভুললে চলবে না যে, ঠিক করেই হোক, কিংবা ভুল করেই হোক যাঁদের শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে তাঁরা সবাই কিন্তু মনে করতেন যে ভারতের মুক্তির জন্যই তারা বিদ্রোহে যোগ দিয়েছিলেন। আমার মনে পড়ছে বন্দিদশায় বাহাদুর শাহ জাফরের ঊর্দু কবিতার দুটি লাইন যা তিনি লিখেছিলেন বিদ্রোহে যোগ দিয়ে যাঁরা শহিদ হয়েছেন তাদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েঃ
ইয়ে জাফর কায়ম রহেগি যব তালক ইকলীম-ই-হিন্দ,
আখতার-ই ইকবাল ইস গুল কা চমকতা জায়েগা।
যতদিন এই ভারতের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন এই আত্মদানকারী ফুলগুলির (শহিদদের) উজ্জ্বলতাও অব্যাহত থাকবে।
সুতরাং ১৮৫৭ সালেই ভারত নামক রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন একটি দেশের ভাবনার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু এটাই কি যথেষ্ট? ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ যে সফল হয়নি তার অন্যতম এক কারণ হলো দেশের একটা বিরাট অংশে এর পক্ষে কোনো সমর্থন ছিল না। 'বেঙ্গল আর্মি' যখন বিদ্রোহ করছে তখন মাদ্রাজ ও বোম্বের সেনারা চুপ করে বসেছিল। ১৮৫৮ সালে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার রাজকীয় ঘোষণার জবাবে বিদ্রোহীরা সারা দেশের মানুষের পক্ষ থেকে বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ব্রিটিশ শাসকেরা মহীশূরের টিপু সুলতান থেকে আরম্ভ করে পাঞ্জাবের দলীপ সিং-এর সঙ্গে কী ধরনের জঘন্য আচরণ করেছিল। যদিও বিদ্রোহী নেতারা সারা দেশের এক ছবি বুকে ধরে বিদ্রোহে নেমেছিলেন, তবু একথা স্বীকার করতেই হবে যে হিন্দুস্থানী ভাষায় কথা বলেন এমন অঞ্চলের বাইরে বিদ্রোহের আগুন তেমনভাবে ছড়িয়ে পড়েনি।
একথা সত্য যে ভারতকে একটা 'দেশ থেকে জাতিতে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে আরও কিছুর প্রয়োজন ছিল। আমার মতে এর জন্য দুটি স্তরের বিশেষ প্রয়োজন। প্রথমত, এটা উপলব্ধির প্রয়োজন আছে যে, স্বাধীন ভারত হবে সব দিক থেকে মুক্ত একটি ভিন্ন ধরনের দেশ। ব্রিটিশরা যে দেশ শাসন করেছে এই দেশ হবে তার থেকে স্বতন্ত্র এবং উন্নত। রাজা রামমোহন রায় এবং সৈয়দ আহমদ খানের মতো অতি বিশিষ্ট ব্যক্তিরাও যে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সমর্থক ছিলেন তার মূলে ছিল এই ধারণা যে, ভারতের পক্ষে ব্রিটিশ শাসনই সবচেয়ে কল্যাণকর। কিন্তু ভারতীয় জনগণকে এটা বুঝতে হবে যে, ব্রিটিশ শাসনের জোয়ালমুক্ত ভারতবর্ষই হবে এ-দেশবাসীর পক্ষে সবচেয়ে উপযুক্ত। এই কারণে এ-ব্যাপারে দাদাভাই নওরোজি, রমেশ দত্ত, বিচারপতি বানাতে এবং অন্যান্য আরও কয়েক জনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা দেখিয়েছেন যে ব্রিটিশ কীভাবে শোষণ করে চলেছে। ১৮৭৪ থেকে ১৯০১ পর্যন্ত ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রবাদ পুরুষ দাদাভাই নওরোজি অজস্র লেখার মাধ্যমে কীভাবে ভারতকে নির্মম ব্রিটিশের শোষণের শিকার হতে হচ্ছে তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। ১৯০১ সালে দাদাভাই লিখিত বিখ্যাত 'Poverty and the Un-British Rule in India' নামের বইটিতে এ বিষয়ে খোলাখুলি আলোচনা রয়েছে। ব্রিটিশ শোষণ এবং মুক্ত বাণিজ্যের নামে শিল্পায়ন বিরোধী ভূমিকাই এই পর্বে ভারতের দারিদ্র্যের মূল কারণ। নিজে পার্সি হলেও এই সম্প্রদায় নিয়ে তিনি মোটেই ভাবিত ছিলেন না, বরং হিন্দু, মুসলিম, বাঙালি, পাঞ্জাবি ইত্যাদি ধর্ম ও সম্প্রদায় এবং সকল ভাষাভাষী মানুষের মঙ্গল চিন্তাই ছিল তাঁর হৃদয়জুড়ে। রমেশচন্দ্র দত্ত-সহ অন্যান্য এই ধরনের লেখকরা সকলেই ছিলেন একই ভাবনার শরিক। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোথাও সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়ামাত্র ছিল না। তাঁরা সবসময়েই সমগ্র ভারতবাসীর কথা ভেবেছেন। যদিও তাঁরা খুবই স্বল্পসংখ্যক ইংরেজি জানা মানুষের কাছে তাঁদের বক্তব্য বলেছেন, তবু তাঁরা কিন্তু বিরাট সংখ্যক কৃষক, গরিব মানুষ, বেকার, তাঁতি প্রমুখের জীবন যন্ত্রণার কথাই তুলে ধরেছেন। তাঁদের কথার লেখার ভাষা ইংরেজি, শ্রোতা বা পাঠকের সংখ্যাও খুবই কম, যে গোষ্ঠীর মানুষের কাছে বৃহত্তর মানুষের বেদনার কথা বলছেন তাদের সংখ্যা আরও কম। কীভাবে এদের সংখ্যা বাড়ানো যায়? একটি পথ হলো সমাজ সংস্কারমূলক আন্দোলনসমূহকে সমর্থন করা। গোড়ার দিকে প্রথম সরব হন রাজা রামমোহন রায়। তিনি পারসিক, আরবি, সংস্কৃত, ইংরেজি, ফরাসি এবং হিব্রু ভাষা জানতেন। জ্ঞানের বহু বিচিত্র বিভাগে তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল। তাঁর লিখিত প্রথম বইটির নাম 'তুই খাতুন মুয়াহিদ্দিন'। এটি পারসিক ভাষায় লিখিত। ১৮২৮ সালেই তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, ভারতীয়দের পক্ষে কোনক্রমেই দেশপ্রেমিক হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, তারা নিজেরাই বহু জাতপাতে বিভক্ত। এই অবস্থা যদি চলতেই থাকে তবে দেশাত্মবোধ জেগে উঠবে কীভাবে? সেই কারণে কেশবচন্দ্র সেনের (১৮৩৮-৬৪) এবং অন্যান্যদের সমাজ সংস্কারমূলক কর্মসূচি ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই কেশবচন্দ্র সেনের মতো মানুষকেও কার্যত আমরা ভুলতে বসেছি; কিন্তু, এই মানুষটি মাত্র ১৮/২০ বছর বয়সে লিখছেন অস্পৃশ্যতার অবসান করতে হবে, বিবাহের ক্ষেত্রে জাতপাতের বেড়া ভাঙতে হবে, সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে আরম্ভ করে জীবনের সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমানাধিকার দিতে হবে, মেয়েদের জন্য আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করতে হবে। কেশবচন্দ্র সেন একটি নতুন ব্রাহ্মসমাজের পত্তন করেন এবং এই সমাজের কোনো কোনো সদস্য গোমাংস খেতেন। এর দ্বারা তাঁরা প্রমাণ করতে চাইলেন যে ভারতে এমন মানুষও আছেন যাঁরা ধর্মীয় গোঁড়ামির বেড়াজাল ছিন্ন করার হিম্মত রাখেন। কিন্তু, এটাই সবচেয়ে বড়ো ব্যাপার নয়, আসল ব্যাপার হলো এঁরা সমাজসংস্কার আন্দোলনকে সম্ভব করে তুলেছেন। অস্পৃশ্যতার অবসান, নারীদের জন্য সমান অধিকার এবং আধুনিক শিক্ষার দাবিতে তাঁরা সর্বত্র আওয়াজ তুলেছেন। ১৮৭০ সালে কেশবচন্দ্র সেন দেশবাসীর কাছে আহ্বান জানিয়ে বলেছেন যে, সমাজসংস্কারের কাজের অগ্রগতির মধ্য দিয়ে ভারত একটি জাতিতে পরিণত হবে এবং এ কাজ তখনই সম্ভব হবে যখন ভারতে বিভিন্ন জাতি ধর্মের মধ্যে বিভেদের অবসান ঘটবে।
জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ের কথা এবং এই পর্যায়ে যারা আন্দোলন করেছেন তাদের বিষয়ে এখানে আলোচনায় যাচ্ছি না। আমি শুধুমাত্র গদর আন্দোলন (যাতে প্রাক্ আই.এন.এ. পর্বে সর্বাধিক মানুষ শহিদ হয়েছেন), মহারাষ্ট্রবাসীদের আন্দোলন এবং বাংলার জাতীয়তাবাদী বিপ্লবীদের কথা উল্লেখ করব। ১৯১৩ থেকে ১৯১৫ সালের মধ্যে পাঞ্জাবে এবং কানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী পাঞ্জাবিদের মধ্যে এই গদর আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। হিন্দু, মুসলমান এবং বিশেষ করে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষজন এতে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন। এইসময় সবচেয়ে বড়ো অভ্যুত্থান ঘটে সিঙ্গাপুরে। সেখানে অবস্থানরত ফিফথ লাইট ইনফ্যানট্রির মুসলিম সিপাহিরা গদর আন্দোলনের অনুপ্রেরণায় বিরাট সংখ্যায় এই বিদ্রোহে যোগ দেন। এই বিদ্রোহ দমনের পর সিঙ্গাপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে ৪৫ জন সিপাহিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। যে দুর্জয় দুঃসাহসের সঙ্গে দৃপ্তভঙ্গিতে এঁরা মৃত্যুর মুখোমুখি হন তাতে করে তাঁরা মানুষকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখার ব্রিটিশ পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দেন। ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের পরে এটাই ছিল সেনাবাহিনীর মধ্যে সবচেয়ে বড়ো বিদ্রোহ এবং এতে বহু সংখ্যক সেনা শহিদ হন। শিখ, হিন্দু, মুসলিম-সহ পঞ্চাশ জনেরও বেশি সৈনিক পাঞ্জাব ও দেশের অন্যত্র ১৯১৪-১৫ সালের এই বিদ্রোহে যোগ দিয়ে আত্মদান করেন। কিন্তু গদর বিপ্লবীরা যে সমস্ত কাগজপত্র রেখে গেছেন তা পাঠ করলে হৃদয়বিদারক এই তথ্যই প্রকাশ পায় যে সেসময়ে খুব অল্পসংখ্যক মানুষ এই বিদ্রোহীদের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন। বিদ্রোহীরা যেসব মানুষের আশ্রয় চেয়েছিলেন তারাই গোপনে পুলিসকে খবর দিয়ে দেয়। লোকচক্ষুর অন্তরালে এইসব আশ্রয়প্রার্থীর মৃত্যু হয়। কেউ তাঁদের খবরও জানে না। এর কারণ হলো সেই সময়ে জাতীয় আন্দোলন খুব অল্পসংখ্যক মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আশা করি একটা ব্যাপারে সবাই দ্বিধাহীন চিত্তে একমত হবেন যে মহাত্মা গান্ধীই হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ভারতীয় জনগণকে জাতীয় আন্দোলনের দিকে টেনে আনার মাধ্যমে ভারতকে প্রকৃত অর্থে একটি জাতিতে পরিণত করার কাজটিতে গতি সঞ্চার করতে সক্ষম হন। ১৯১৩ সালের পূর্ববর্তী সমগ্র সময়পর্বে এমন একটা দৃষ্টান্ত কি আছে যেখানে হিন্দু-মুসলমান মিলে ২০০ জন নারী ভারতীয়দের প্রতি অসদাচরণের প্রতিবাদে জেলে যাওয়ার জন্য নিজেরাই এগিয়ে এসেছিল। যেমনটা ঘটেছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে এমন ধারা প্রতিবাদের নিদর্শন ভারতের মাটিতে নেই। নির্লজ্জ অবিচারের বিরুদ্ধে ভারতে এর আগে আর কেউ কি কখনো ২০০ জন মানুষকে সমবেত করতে পেরেছিলেন। বৈষম্যের বিরুদ্ধে ১৯১৩ সালে ২০০০ ভারতীয় খনিশ্রমিক একত্রিত হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রান্সভালে মহামিছিলে মিলিত হন। এর আগে ভারতীয় ইতিহাসে এমন মিছিলের কোনো নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় না। এই ঘটনার পিছনে কে ছিলেন? ছিলেন এম. কে. গান্ধী এবং এই বিক্ষোভের পর ১৯১৫ সালে তিনি ভারতে চলে আসেন। কারণ, এই মিছিলের পর দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রী স্মাটস্ আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে নিয়ে Native Poll Tax-এর বিলুপ্তি ঘটান, ভারতীয়দের বিবাহকে আইনসিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং সেই সাথে অন্যান্য কিছু অধিকারও দেওয়া হয়। বৃহত্তর কর্তব্যের ডাকে এবার গান্ধীজি ফিরে এলেন ভারতে। ১৯১৭ সালে গান্ধীজির নেতৃত্বে বিহারের চম্পারন জেলায় অনুষ্ঠিত হল ঐতিহাসিক চম্পারন কৃষক সত্যাগ্রহ। এই প্রথম ভারতে রাজনৈতিক বিক্ষোভের সঙ্গে কৃষক সমাজের সংযোগ স্থাপিত হলো। গান্ধীজি বললেন, “আমি যখন কৃষকদের সামনে উপস্থিত হলাম তখন মনে হলো, আমি যেন ভগবানকে দেখতে পাচ্ছি।” তিনি বুঝেছিলেন যে ভারতের জাতীয় আন্দোলন তখনই একমাত্র সফল হতে পারে যখন কৃষক এবং গরিব জনতা এই আন্দোলনে যোগ দিতে এগিয়ে আসবেন। এই পথ ধরেই ১৯১৯ সালে এপ্রিল সত্যাগ্রহ এবং ১৯২০ সালে খিলাফত এবং অসহযোগ আন্দোলন সংঘটিত হলো। এখানে আমি একটি উর্দু কবিতা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি। আকবর ইলাহাবাদী একবার বলেছিলেন যে, এদেশের মানুষজন ইংরেজদের প্রতি এমন একটা ভয়মিশ্রিত শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে যে তা দেখে তিনি তাঁর বিখ্যাত মিশ্রা'তে লেখেন যে,
আমি তো আল্লাহকে একজন কালেক্টার মনে করেছিলাম। (ম্যায় তো আল্লাহকো কালেক্টার সমঝা)। কারণ ইংরেজ কালেক্টারের চেয়ে বেশি শক্তিশালী, চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী কাউকে নজরে পড়ে না। কিন্তু, গান্ধীজি যখন অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন তখন হঠাৎ করে সবকিছুর পরিবর্তন হয়ে গেল। তখন আকবর ইলাহাবাদী লেখেন—
বুদ্ধুমিঞা ভি হজরতে গান্ধীকে সাথ হ্যায়,
এক মুশাত-ই-খাক হ্যাঁয় মগর আন্ধিকে সাথ হ্যাঁয়।
ভারতের ইতিহাসে আগে বুদ্ধুমিঞা অর্থাৎ সাধারণ মানুষের ভূমিকা কী ছিল? কিছুই না। তার অস্তিত্ব কোথাও খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু, এখন তাকে ইতিহাসের আলোয় নিয়ে আসা হয়েছে। এখন যেহেতু সাধারণ কৃষক সমাজ, নারীসমাজ জাতীয় আন্দোলনের শরিক হয়েছেন তাই ভারতও আরো বেশি বেশি করে 'জাতি' বা 'নেশন' হয়ে ওঠার পথে অগ্রসর হচ্ছে। যতক্ষণ না অধিকাংশ সাধারণ মানুষ বা জনগণ মনে মনে অনুভব করছেন যে তারা অবশ্যই পরনির্ভরতা দূর করে স্বাধীন হয়ে নিজেরাই নিজেদের শাসন করবেন ততক্ষণ কোনো 'নেশন' বা 'জাতি'র অস্তিত্ব থাকা সম্ভব নয়। গরিব মানুষেরা আন্দোলনের সাথী হলে তাদের দেবার জন্য আমাদের কী আছে? তাদের ভবিষ্যতের রূপরেখা কেমন হবে? এইখানে জওহরলাল নেহরুর ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। গত শতাব্দীর বিশের দশকের শেষভাগ থেকে তিনি ক্রমাগত দাবি জানিয়ে এসেছেন যে, জাতীয় আন্দোলনের মধ্যে কৃষক, শ্রমিক, নারী ইত্যাদিদের জন্য স্বাধীন দেশে কী করা হবে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষণা থাকতে হবে। জাতীয় আন্দোলনে গান্ধী, নেহরু ছাড়াও আরো অনেকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আমি একথা বলতে চাইছি না যে, পূর্বোক্ত দুজন মিলেই জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, শুধু বলতে চাই যে, এঁদের দুজনের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সাধারণ মানুষকে গান্ধীজির দেবার কী ছিল? এটা একটা কঠিন প্রশ্ন। এর উত্তর পেতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে ১৯০৯ সালে প্রকাশিত গান্ধীজির লেখা "হিন্দস্বরাজ" বইটির দিকে। মুসলিমরা জেনে আনন্দিত হবেন যে, যখন অন্য কংগ্রেস নেতারা বিরোধিতা করছেন তখন গান্ধীজি ১৯০৯ সালের ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্টকে এবং এতে মুসলমানদের যেসব সুবিধাদানের প্রস্তাব করা হয়েছে তার সমর্থনে এগিয়ে এসেছেন। তিনি "হিন্দস্বরাজ' বইটিতে লিখছেন, যেসব হিন্দু নেতা মুসলিমদের সুবিধাদানের বিরোধিতা করছেন তারা মস্ত ভুল করছেন। আমাদের মুসলিম ভাইরা যদি কিছু বাড়তি সুবিধা পান তাতে দোষ কোথায়? ভাই কিছু পেলে তোমার তো খুশি হবার কথা, তার বদলে গৌদা কেন? হিন্দস্বরাজ' বইটিতে গান্ধীজি এরকমটাই বলেছেন। গান্ধীজির মতে, ভারতের অতীতটা শুধু হিন্দু বা মুসলমানের নয়, বরং দুজনেরই। মহারাজা কিংবা বাদশার আমলে ভারতবর্ষের অবস্থা ভালোই ছিল। তখন মহারাজা এবং বাদশাহরা পরিচালিত হতেন যথাক্রমে পণ্ডিত ও মৌলবীদের পরামর্শমত। আমি অবশ্য এটাকে মোটেই গান্ধীজির মতো আদর্শ ব্যবস্থা বলে মানতে রাজি নই। আমি বরং সেটাকে আতঙ্কজনক অবস্থা বলেই মনে করি। কিন্তু, হিন্দ- স্বরাজ' বইটিতে গান্ধীজি এই মতই ব্যক্ত করেছেন যে ব্রিটিশ সরকারের তুলনায় রাজা-বাদশাহের আমল নাকি অনেক ভালো ছিল। তিনি এমনকি জাতপাত প্রথার নিন্দা করেননি, যদিও তিনি অস্পৃশ্যতার প্রবল বিরোধী ছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকাতেও করেছেন। বিরোধিতা করেছেন ১৯১৫ সালে ভারতে আসার পরবর্তী পর্যায়েও । কিন্তু, হিন্দ-স্বরাজ-এ অস্পৃশ্যতার বিরোধিতা নেই। তিনি মনে করতেন এসব সরকারের কাজ নয়, বেসরকারি ক্ষেত্রকে এ-ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। তাদের মাধ্যমেই এসব সামাজিক সংস্কারের কাজকর্ম সম্পন্ন করতে হবে। কৃষকদের ভালোমন্দের দায় নিতে হবে জমিদার-জোতদারদের, তারাই হবেন বৃহতদের রক্ষাকর্তা। কারখানায় সব ব্যাপারে শ্রমিকদের সাহায্য করবেন মালিকরা, তাদের স্বার্থের প্রহরী হবেন মালিকরাই। কিন্তু, বাস্তবজীবনে এটাই যথেষ্ট নয়। শুধু এইটুকুতেই জনগণ সন্তুষ্ট হবে না বা তাদের জাতীয় আন্দোলনের দিকে টেনে আনা যাবে না। এখানেই বামপন্থীদের বিশেষ করে জওহরলাল নেহরুর গুরুত্ব। ১৯২৮ সাল থেকে তিনি একদিকে যেমন পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি করেছেন, অন্যদিকে তেমনি আওয়াজ তুলেছেন স্বাধীন ভারতে কৃষকদের জমি দিতে হবে। শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা দিতে হবে, নারীদের পুরুষের সমান অধিকার থাকবে এবং জনগণের ভোটাধিকার-সহ পূর্ণ গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটাতে হবে।
২০১৫ সালের ৭ই অক্টোবর অধ্যাপক ইরফান হাবিব আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে কেনেডি অডিটোরিয়ামে 'ভারত ভাবনার উৎস সন্ধানে' শীর্ষক ভাষণটি দেন।
অনুবাদ শ্যামল সেনগুপ্ত
প্রকাশের তারিখ: ১৫-আগস্ট-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
