সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
‘মরণ সাগর পারে তোমরা অমর’ | সেদিন কি ঘটেছিল, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়
অতীতের পাতা থেকে
ছোট একটা জায়গা বেরিয়ে যাবার সব পথ বন্ধ করে যে অমানুষিক লাঠি চার্জ হল তার কোন নজির ইতিহাসে নেই। জালিয়ানওয়ালাবাগে ইংরেজ পুঙ্গব মাইকেল ও ডায়ার রাইফেল আর মেশিন গানের গুলিতে খুন করেছিল অনেক মানুষ। কিন্তু স্বাধীন ভারতে তদানীন্তন সরকারের পুলিশ শুধু লাঠি পেটা করে কয়েক মিনিটের মধ্যে খুন করল ৮০ জন মানুষকে।

১৯৫৯ সাল। ৩১ অগাস্ট। সকাল থেকেই সূর্যের মুখ ঘন মেঘে ঢাকা। দুপুর নাগাত বৃষ্টি নামল। মুষল ধারার বৃষ্টি। খেত খামার মাঠ পাথার ডুবু ডুবু। এমন দিনে মানুষ কি ঘরের বাইরে পা বাড়ায়?
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় তখন বিদেশে। দায়িত্বে রয়েছেন খাদ্যমন্ত্রী শ্রীপ্রফুল্লচন্দ্র সেন। তাঁর মুখেও উদ্বেগের কালো মেঘ । জমাট উদ্বেগ। রাজ্যি ভাসানো ঝড় বাদলেও সে মেঘ কাটছে না। লালবাজারের কর্তারা অভয় দিলেন: কিছু ভাববেন না স্যার, যা জল ঝড় শুরু হয়েছে, তাতে ওদের সব প্ল্যান-প্রোগ্রাম ধুয়ে মুছে একেবারে সাফ হয়ে যাবে। আর তবু যদি ওরা এই দুর্যোগের মধ্যেও আসে তাহলে আমরা তো সব দিক থেকেই প্রস্তুত হয়ে আছি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী কালীপদ মুখোপাধ্যায়ও টেবিল ঠুকে বললেন, পিটিয়ে ঠাণ্ডা করে দেব। আমার পুলিস জবরদস্ত।
কালীপদ মুখোপাধ্যায়ের “জবরদস্ত পুলিস” সেদিন একেবারে মহাসমরের জমকালো সাজে সুসজ্জিত। লাঠি বন্দুক রাইফেল রিভলবার গ্যাসগুলি কিছুরই অভাব নেই। অভাব নেই বন্দী-গাড়ির, অ্যাম্বুলেন্সের। হাজারে হাজারে পুলিস জালের মতো ছড়িয়ে পড়ল গোটা শহরে। শহরের দুই তোরণ হাওড়া শিয়ালদহ স্টেশনকে ঘিরেও পুলিসের পাকাপোক্ত অবরোধ।
কিন্তু ৩১ অগাস্টের ভোর থেকে মহানগরী যুদ্ধ নগরীতে পরিণত হল কেন ? সেদিন কি কোন বিদেশী শক্তির আক্রমণ হানার সম্ভাবনা ছিল কলকাতার ওপর ?
না। মোটেই নয়। সেদিন কলকাতা হাওড়া হুগলি ২৪-পরগনার নিরন্ন মানুষের আসার কথা ছিল মহাকরণে। একমুঠো খাদ্যের সন্ধানে। তারা মহাকরণ দখল করার জন্যে আসছিল না। আসছিল না রাজ্য সরকারকে গায়ের জোরে উল্টে দিতে। আসছিল শুধু বাঁচার দাবি নিয়ে, শুধু খাবার দাবি নিয়ে।
ভয়াবহ এক খাদ্য সংকটে গোটা পশ্চিমবঙ্গ তখন জর্জরিত। গ্রামে গ্রামে হাহাকার। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, মাটির বুকে লাঙল চালিয়ে যে কৃষক সোনার ফসল তুলে এনেছে সেই তখন বউ-বাচ্চার হাত ধরে এসে দাঁড়িয়েছে রাস্তায়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের রাজপথে শোনা যায় নিঃসীম বেদনা আর ক্লান্তিতে দীর্ণ কণ্ঠ: “একটু ফ্যান দিন গো। একটু নুন।" গ্রামের সর্বস্বান্ত মানুষগুলো বাঁচার তাগিদে শাকপাতা গেঁড়ি গুগলি থেকে শুরু করে অখাদ্য কুখাদ্য সব কিছুই খেতে শুরু করল। কলেরা উদরাময় শুরু হয়ে গেল গ্রামে গ্রামে। গ্রাম বাংলা থেকে রোজই একটা দুটো করে অনাহারে মৃত্যুর খবর এসে পৌঁছতে লাগল শহরে। গোটা রাজ্য জুড়ে অমঙ্গলের চিহ্ন, নিদারুণ অশনি সংকেত।
এই অশনি সংকেতের সর্বনাশা ভবিতব্যকে উপলব্ধি করেছিল ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। ৫৯ সালের গোড়ার দিকে—১৬ ফেব্রুয়ারি তারা রাজ্য সরকারের উদ্দেশ্যে সতর্ক বাণী পাঠিয়েছিল। তারা বলেছিল : এখনও সময় আছে। এখনও ঠেকানো যায় সর্বনাশ। বাজারে বিক্রয়যোগ্য উদ্বৃত্ত ধান চাল এখনও বড় বড় মিল মালিকদের হাতে পুরোপুরি চলে যায় নি। কমিউনিস্ট পার্টির সুপারিশ ছিল : ৫ লক্ষ টন খাদ্য মজুত করা দরকার। কেন্দ্র থেকেই পূরণ করতে হবে রাজ্যের ঘাটতি। সর্বত্র খুলতে হবে ন্যায্য মূল্যের দোকান। ওই সব দোকান থেকে সরবরাহ করতে হবে চাল। তবে সে চাল যেন খাবার যোগ্য হয়। তাদের আরও সুপারিশ ছিল : যারা খুচরো চাল বিক্রি করে তাদের জন্যে চালের ব্যবস্থা করে দিতে হবে। মিল মালিক ও পাইকারদের খুচরো চাল বিক্রির লাইসেন্স বাতিল করতে হবে। তারা যাতে খুচরো দোকানদারদের চাল সরবরাহ করতে বাধ্য হয় সে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় কিংবা খাদ্য মন্ত্রী শ্রীপ্রফুল্লচন্দ্র সেন সেই সুপারিশে কর্ণপাত করেন নি। ডাঃ রায় তো ক্ষুধিত পাষাণের মেহের আলির মতো বললেন : "সব ঝুট হ্যায়।" শ্রীপ্রফুল্ল সেন বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে সংখ্যাতত্ত্বের গোলোকে ধাঁধা তৈরি করে বোঝাবার চেষ্টা করলেন : সংকট-ফংকট কিছু নয়। আসলে ওসব কমিউনিস্টদের প্রচার।
ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের 'ডোন্টকেয়ার' ভাব কিংবা শ্রীপ্রফুল্লচন্দ্র সেনের কুহকিনী সংখ্যাতত্ত্ব কোন কিছুই সংকটকে চাপা দিতে পারল না। সংকটের আবর্ত জটিল আকার ধারণ করল। সেই করাল আবর্তে নিমজ্জিত হল লক্ষ লক্ষ মানুষ। এদিকে কংগ্রেস সরকার যে খাদ্য নীতি ঘোষণা করল তাতে লাভবান হল মিল মালিক ও মজুতদাররা। তারা সাধারণ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে মুনাফার আকাশ ছোঁয়া পাহাড় জমাতে শুরু করল।
এ হেন পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থী দল এবং গণ-সংগঠনগুলি গড়ে তুলল পশ্চিমবঙ্গ মূল্য বৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি। বামপন্থীরা বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন আলাপ আলোচনা সভা সমাবেশে বারে বারে সরকারকে কৃত্রিম ভাবে তৈরি করা শোচনীয় খাদ্য সমস্যা দূর করার ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেবার অনুরোধ জানান। কিন্তু তাঁদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যায়। অবশেষে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস থেকে বাঁচাবার জন্য বাধ্য হয়েই তাঁরা শুরু করেন বিরাট, বিশাল গণসংগ্রাম। এই সংগ্রামের নেতৃত্বে ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ মূল্য বৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি। ঐতিহাসিক এই খাদ্য সংগ্রাম শুরু হল জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে। এই অভূতপূর্ব বিপুল গণআন্দোলন শেষ হয় সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতের বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গৌরবময় সুদীর্ঘ ইতিহাসে ৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলন রক্তের অক্ষরে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
দুর্ভিক্ষ পীড়িত, শোষণে জর্জরিত পশ্চিমবঙ্গের মরা গাঙে বান ডাকল ১৪ অগাস্ট। পশ্চিমবঙ্গ মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি ডাক দিল প্রত্যক্ষ গণ সংগ্রামের। সে ডাকে সাড়া দিয়ে গ্রাম শহরের লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত, ছাত্র, যুব, মহিলাসহ সর্বস্তরের মেহনতি জনগণ ঘর থেকে বেরিয়ে পথে নামলেন। তুষার মৌলি হিমালয়ের কোলে দার্জিলিং থেকে সাগর সৈকত মেদিনীপুর পর্যন্ত উত্তাল। জেলা কোর্টগুলিতে বামপন্থী স্বেচ্ছাসেবকেরা জমায়েত হলেন। জমায়েত হলেন সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষ ভিড় জমালেন সরকারি দপ্তরগুলিতেও। সেদিনের কর্মসূচি ছিল জেলায় জেলায় সীমাবদ্ধ শান্তিপূর্ণ আইন অমান্য। এই কর্মসূচি চলে ২০ অগাস্ট পর্যন্ত। ৭ দিনে ১ হাজার ৬শ ৩১ জন স্বেচ্ছাসেবক। এটিই ছিল ৫৯ সালের অবিস্মরণীয় খাদ্য আন্দোলনের প্রথম পর্যায়।
প্রথম পর্যায়ের সীমিত কর্মসূচিতেই প্রমাদ গুণলেন সেদিনের রাজ্য সরকার। প্রমাদ গুণল গ্রামীণ মুনাফাবাজ মহাজনরা। তারা বুঝেছিলেন এই গণআন্দোলনের লেলিহান শিখা প্রসারিত হবে গোটা রাজ্যে। তাই একদিকে কংগ্রেস সরকার, অন্যদিকে গ্রাম শহরের পুঁজিপতি জোতদার মহাজনরা এককাট্টা হল। গণআন্দোলনকে রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দেবার জঘন্য সব পরিকল্পনাও তৈরি হল।
এদিকে খাদ্য আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের সাফল্যে বামপন্থী নেতারা খুশি হলেন। তাঁরা জরুীর বৈঠকে বসে তৈরি করলেন দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি। দ্বিতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি ছিল আরও ব্যাপক, আরও বিস্তৃত। সারা রাজ্যের সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হল সেই কর্মসূচি। গ্রাম শহর মাঠ প্রান্তর বন্দরে দিন রাত ঘুরে ঘুরে বামপন্থী নেতারা ছড়িয়ে দিলেন গণ আন্দোলনের উদাত্ত বাণী : "খাদ্য চাই, খাদ্য দাও। বাঁচতে চাই বাঁচতে দাও।" অনাহারে, বঞ্চনায়, শোষণে, নির্যাতনে মানুষের মন ছিল শুকনো খড়ের মতই দাহ্য শক্তিকে ভরপুর। আন্দোলনের উদ্দীপ্ত কর্মসূচি মানুষের মনে আগুন জ্বালিয়ে দিল। শুরু হল খাদ্য আন্দোলনের দ্বিতীয় তথা চরম পর্যায়। ২০ অগাস্ট থেকে এই পর্যায়ের সূত্রপাত । দ্বিতীয় পর্যায়ে আইন অমান্য আন্দোলনকে কলকাতাসহ সমস্ত জেলায় সম্প্রসারিত করা হল। ঠিক হল ৩১ অগাস্ট কলকাতাতে কেন্দ্রীয় গণঅভিযান হবে। আইন অমান্য হবে। গণঅভিযান ও আইন অমান্য হবে সমস্ত জেলাসদরে। ৩ সেপ্টেম্বর হবে রাজ্যব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট ও হরতাল। দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে মানুষ অংশ নিলেন আরও বেশি বেশি করে। দৈনন্দিন জীবনের কঠিন মূল্যে তাঁরা এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছিলেন যে : নিষ্ঠুর হৃদয়হীন শাসক শ্রেণীর হাত থেকে বাঁচবার ন্যূনতম অধিকারটুকুও আদায় করতে গেলে আন্দোলন করতে হবে, সংগ্রাম করতে হবে, ঢালতে হবে অনেক বুকের রক্ত। এবং রক্ত ঢালার জন্যে মানুষ প্রস্তুত ছিল, অবিচলিত ও সংঘবদ্ধ। দ্বিতীয় পর্যায়ের আন্দোলনে জেলায় জেলায় শান্তিপূর্ণ ভাবে আইন অমান্য করে গ্রেপ্তার বরণ করেন ১৪ হাজার ২শ ৩২ জন বামপন্থী স্বেচ্ছাসেবক।
এল ৩১ অগাস্ট। রক্তে রাঙা ৩১ অগাস্ট। তদানীন্তন রাজ্য সরকার ও পুঁজিপতি জোতদারদের নারকীয় বীভৎসতায় কলঙ্কিত দিন। গ্রাম শহরের সাধারণ মানুষের সুমহান আত্মত্যাগের গৌরবমণ্ডিত দিন।
সকাল থেকেই আকাশে ঘন মেঘের আনা গোনা। বৃষ্টি নামল দুপুরে। প্রথমে ইলশে গুঁড়ি। তারপর মুষল ধারায়। কিন্তু বিরূপ প্রকৃতির প্রতিরোধ ছিন্ন ভিন্ন করে মানুষ পথে নামল। মহানগরী কলকাতার রাজপথে গলিপথে জনতার উত্তাল জোয়ার। পশ্চিমবঙ্গ মূল্যবৃদ্ধি ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধ কমিটি ময়দানে মনুমেন্টের পাদদেশে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সমাবেশের পর একটি সুবিশাল গণ মিছিল যাবে মহাকরণের দিকে। এই মিছিল থেকে লক্ষ কন্ঠে সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হবে : "খাদ্য চাই খাদ্য দাও। নইলে গদি ছেড়ে দাও।” এদিন কলকাতায় ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে আইন অমান্যের কর্মসূচিও ছিল। শুধু কলকাতা নয়, ৩১ অগাস্ট অন্যান্য জেলা সদরেও বিশাল বিশাল সমাবেশের আয়োজন হয়েছিল। আয়োজন হয়েছিল আইন অমান্যের। তবে কলকাতার সমাবেশ ও আইন অমান্যের কর্মসূচিও ছিল। শুধু কলকাতা নয়, ৩১ অগাস্ট অন্যান্য জেলা সদরেও বিশাল বিশাল সমাবেশের আয়োজন হয়েছিল। আয়োজন হয়েছিল আইন অমান্যের। তবে কলকাতার সমাবেশ ও আইন অমান্যের কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন হাওড়া, হুগলি, ২৪ পরগনার মানুষ।
৩১ অগাস্ট। মহানগরীর বুকে সুবিপুল প্রাণবন্যা। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম সব পথই মনুমেন্টমুখী। শহরের পথে পথে সশস্ত্র পুলিশের শক্ত ব্যারিকেড। ব্যারিকেড রেল স্টেশনগুলিতে, বিশাল ব্যূহ রচনা করে বিরাট পুলিস বাহিনী তৈরি হয়ে আছে হাওড়া ও শিয়ালদহ স্টেশনের প্রবেশ মুখে।
একদিকে নিরবচ্ছিন্ন বৃষ্টিপাত অন্যদিকে পুলিসের জাঁদরেল বেষ্টনী। কিন্তু সব প্রতিরোধ অতিক্রম করে মনুমেন্ট ময়দান লক্ষ প্রাণের জোয়ারে উত্তাল উদ্দাম। সে এক অভূতপূর্ব সমাবেশ। শোনা যায় ৩ লক্ষ মানুষ সেদিন সমবেত হয়েছিলেন কলকাতায়।
মনুমেন্ট ময়দানের সমাবেশ ছিল খুবই স্বল্পকালীন। বক্তারা একে একে আন্দোলনের তাৎপর্য ব্যাখা করলেন। ঘোষণা করা হল সেদিনের কর্মসূচি। নেতারা বললেন : কংগ্রেস সরকার প্ররোচনার কুশলী জাল ছড়িয়ে রেখেছে গোটা শহরে। পা ফেলতে হবে খুব সাবধানে। আমাদের সংযত হতে হবে। হতে হবে ধীর স্থির সাবধান।
তারপর মিছিল। বিরাট, বিশাল গণমিছিল। 'মিছিল নগরী' কলকাতাও তার আগে কখনও দেখেনি লক্ষ প্রাণের এমন দীপ্ত অভিযান। মিছিলের সারিতে শামিল সবাই - গ্রামের নিরন্ন কৃষক, কল কারখানার শ্রমিক মজুর, স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, অধ্যাপক কৃষক বধূ, শিশু, বৃদ্ধ। “ম্যায় ভুখা হু", ধ্বনিতে ঝলমলে সাজে সজ্জিত রূপসী কলকাতা হতচকিত ও বিহ্বল। ভুখা মিছিলের বজ্র নির্ঘোষ মনুমেন্ট ময়দান থেকে বারে বারে ছুটে গিয়ে হানা দিয়েছে রাজভবনের শ্বেত পাথরের সোপানে, মহাকরণের রক্ত রঙিন প্রাকারে, লাল বাজারের লৌহ বেষ্টনীতে ঘেরা কন্ট্রোল রুমের রহস্যময় চৌহদ্দিতে।
মিছিল এগোতে থাকে। সেই সব জীবনের জোয়ারে ভাসা লক্ষ মানুষকে দু হাত তুলে স্বাগত জানান পথ চলতি মানুষজন। মনুমেন্ট ময়দান থেকে মিছিল এল এসপ্ল্যানেড ইস্টে। রাজভবনের দিকে তখন পরপর অনেকগুলো পুলিস বেষ্টনী। মিছিলের মুখ তখন ১৪৪ ধারা এলাকার অনেক বাইরে। পুলিস বাহিনী এগিয়ে এসে মিছিলের পথ রোধ করে দাঁড়ায়। এসপ্ল্যানেড ইস্ট তখন জনসমুদ্র। জনসমুদ্র চৌরঙ্গি এলাকা। মানুষের জমাট ভিড় ভেঙে পড়েছে কার্জন পার্কে, ময়দানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। গোটা ময়দান এলাকা পুলিস দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে ঘেরা। লাঠিধারি পুলিসতো ছিলই, সঙ্গে ছিল টিয়ারগ্যাস স্কোয়াড, রাইফেলধারী পুলিস, সাদা পোশাকের পুলিস। গোটা ময়দান এলাকা তখন যেন বিরাট একটা যুদ্ধক্ষেত্র।
দিনের আলো নিভে গেছে। টিপ টিপ বৃষ্টিও শেষ। শহরের বুকে রঙিন আলোর বন্যা। ডেকার্স লেনের মুখে হেলমেট পরা, ভারী রেনকোটে শরীর ঢাকা পুলিস বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে। দেখে মনে হয় যে হিংস্র স্বাপদের দল শিকারের সন্ধানে ওৎ পেতে আছে
মিছিলের শরিকরা তখন বসে পড়েছেন রাজপথে। শ্লোগান শোনা যাচ্ছে ঘন ঘন। দেখতে দেখতে দেড় ঘণ্টা কেটে গেছে। তবু সকলেই ধীরস্থির অচঞ্চল। হঠাৎ সামনের দিকে স্বেচ্ছা সেবকদের একটি দল পুলিস বেষ্টনী ভেদ করে আইন অমান্য করেন। সঙ্গে সঙ্গে বিরাট বিশাল পুলিস বাহিনী হিংস্র নেকড়ের মত ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ সেই জনতার ওপর। তারপর শুরু হয়ে যায় নারকীয়, জঘন্য লাঠি চার্জ। সঙ্গে ফাটতে থাকে টিয়ারগাসের সেল। স্তম্ভিত, হতচকিত মানুষ পালাবার পথ পায় না। সব পথই পুলিশ বন্ধ করে দিয়েছে। ময়দানের লোহার বেড়া টপকে যারা প্রাণ ভয়ে কার্জন পার্কে আশ্রয় নিয়েছিল তারাও শিকার হল পুলিসী হানায়। ছোট একটা জায়গা বেরিয়ে যাবার সব পথ বন্ধ করে যে অমানুষিক লাঠি চার্জ হল তার কোন নজির ইতিহাসে নেই। জালিয়ানওয়ালাবাগে ইংরেজ পুঙ্গব মাইকেল ও ডায়ার রাইফেল আর মেশিন গানের গুলিতে খুন করেছিল অনেক মানুষ। কিন্তু স্বাধীন ভারতে তদানীন্তন সরকারের পুলিশ শুধু লাঠি পেটা করে কয়েক মিনিটের মধ্যে খুন করল ৮০ জন মানুষকে। পুলিসের নির্মম লাঠি থেকে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, যুবক, কেউই রেহাই পায়নি। সেদিন গোটা এসপ্ল্যানেড ইস্ট অঞ্চল তরতাজা মানুষের রক্তে লাল হয়ে গিয়েছিল। হাজারেরও বেশি মানুষ হয়েছিলেন আহত। অনেকেই চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে গিয়েছিলেন। নিখোঁজ হয়েছিলেন বেশ কিছু মানুষ। শোনা যায় রাতের অন্ধকারে পুলিস লরির ওপর ত্রিপল চাপা দিয়ে অনেক মৃতদেহ সরিয়ে ফেলেছিল।
মহানগরীর রাজপথে যখন নির্বিচারে গণহত্যা চলছে ঠিক তখনই মেদিনীপুর জেলার সদরে, তমলুকে ও ঘাটালে শান্তিপূর্ণ মিছিলের ওপর লাঠিচার্জ হয়। লাঠিচার্জ হয় বর্ধমানে, বহরমপুরে ও পশ্চিম দিনাজপুরের গঙ্গারামপুরে। লাঠিচার্জ হয় কোচবিহারে। বহু মানুষ জখম হয় গুরুতরভাবে।
৩১ অগাস্ট রাতে মহাকরণ থেকে একটি ছোট প্রেস নোট দেওয়া হয়। ওই প্রেস নোটে বলা হয় 'জনতা সামনের দিকে এগিয়ে আসে। তাদের মধ্য থেকে কিছু লোক ইট, সোডার বোতল ও হাত বোমা ছুড়তে থাকে। ফলে পুলিস লাঠি চার্জ করতে বাধ্য হয়।" প্রেস নোটে আরও বলা হয়েছিল : ১২ জনকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদের সকলেই পুলিসের লাঠিতে আহত হয়নি। কেউ কেউ আহত হয়েছে ভিড়ের চাপে বা জনতার নিক্ষিপ্ত ইঁটে।
কিন্তু স্টেটসম্যান পত্রিকায় বলা হয়েছিল ৩১ অগাস্ট রাত সাড়ে ১১টা পর্যন্ত প্রায় ৩৪০ জন আহতকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। যুগান্তর অমৃতবাজারের হিসেবে আহতের সংখ্যা প্রায় ৪০০, আনন্দবাজার হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ডের হিসেবে আহত ৩৫০।
মিছিল থেকে পুলিসের ওপর ইট পাটকেল ছোঁড়ার যে গল্প সরকার থেকে ফাঁদা হয়েছিল তার কোন সমর্থন কিন্তু কোন খবর কাগজেই মেলেনি। স্টেটসম্যানের ভাষ্য : আন্দাজ ৭-২০ মিনিটের সময় প্রায় ১২ জন শোভাযাত্রী পুলিস বেষ্টনীর ফাঁক দিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে এগিয়ে আসে। মনে হয় পুলিস ইচ্ছে করেই বেষ্টনীর মধ্যে ওই ফাঁকটি রেখেছিল, যাতে যারা আইন অমান্য করতে চায় তারা এগিয়ে এসে গ্রেপ্তার বরণ করতে পারে। কিন্তু বিরাট জনতা এগিয়ে আসতে থাকলে পুলিসকে লাঠিচার্জের হুকুম দেওয়া হয়।
যুগান্তর জানাচ্ছে : কয়েকটি দলে বিভক্ত হইয়া আইন অমান্য আন্দোলনকারীরা পুলিস বেষ্টনী ভাঙ্গিয়া অগ্রসর হইতে শুরু করিবেন বলিয়া কথা ছিল। প্রথম দল কর্ডন ভাঙিয়া সামনে আগাইয়া আসিলে তাঁহাদিগকে গ্রেপ্তার করা হয়। বেষ্টনীর একাংশে যেখানে জনগণের প্রবল চাপ পড়িতেছিল সেখানে একটা ঠেলাঠেলির সৃষ্টি হয়। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আবহাওয়া বদলাইয়া যায়। কর্ডনের ভিতরের দিকে যেখানে সাংবাদিকরা দাঁড়াইয়া ছিলেন সেখান হইতে পুলিসের হাতের লাঠি শূন্যে উঠিতে দেখা যায় এবং আওয়াজ শুনিতে পাওয়া যায়। পুলিস জনতাকে হটাইয়া লইয়া যায়...... তাহাদের পিছনে পিছনে মুখে জালের মুখোস লাগানো লাঠিধারী পুলিসের আর একটি বাহিনী প্রবলভাবে লাঠি চালনা করিতে করিতে অগ্রসর হইয়া যায়।
হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড বলছে: প্রথম দল সত্যাগ্রহীর গ্রেপ্তারের পর জনতা পুলিস বেষ্টনীর ফাঁক দিয়ে প্রবেশ করলে পুলিস লাঠিচার্জ করে। স্টেটসম্যান, যুগান্তর, হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড কোন কাগজেরই বামপন্থীদের প্রতি বা খাদ্য আন্দোলনের প্রতি অনুরাগ থাকার কথা নয়। তবু, কোন কাগজই বলেনি মিছিলকারীরা পুলিসকে আক্রমণ করেছিল।
৩১ আগস্টের নারকীয় ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ল সারা পশ্চিমবঙ্গে। ৮০ জন মানুষের মর্মান্তিক হত্যায় সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে নেমে এল একদিকে সীমাহীন শোক, অন্যদিকে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও ক্ষোভ। সাধারণ মানুষের মধ্যে তখনও যাঁরা কংগ্রেসকে মনে মনে পছন্দ করতেন তাঁদেরও একটি বিরাট অংশের মোহমুক্তি ঘটল। কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণরোষ উত্তাল হয়ে উঠল। গ্রাম শহরে বামপন্থী কর্মীরা শহীদ স্মরণে আপন মরণে রক্তঋণ শোধ করার আগ্নেয় শপথে উদ্দীপ্ত হয়ে উঠলেন।
পরের দিন। ১ সেপ্টেম্বর। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় লনে বিরাট বিশাল ছাত্র জমায়েত। শুধু কলকাতায় নয়, গোটা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্কুল কলেজ থেকে হাজার হাজার ছাত্র এসে ভরিয়ে দিল বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর। ৮০ জন শহীদের আত্মত্যাগ ছাত্রদের শিরায় শিরায় জ্বালিয়ে দিয়েছে উদ্দীপনার লাভা স্রোত। চোখের জল পরিণত হয়েছে ক্রোধের আগুনে।
আগুন রাঙা ছাত্র মিছিল বেরোল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। মাথার ওপর ভাদ্র মাসের আগুন ঝরা সূর্য। নিচে উত্তপ্ত রাজপথ। এ মিছিল ক্রোধের মিছিল, ক্ষোভের মিছিল। কিন্তু কোথাও কোন উত্তেজনা ছিল না, ছিল না উচ্ছৃঙ্খলতা। ১০ হাজার ছাত্রছাত্রীর দীপ্ত, প্রাণচঞ্চল মিছিল পুলিসী বর্বরতার বিরুদ্ধে ধিক্কার জানাতে জানাতে এগিয়ে চলে সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারের দিকে। মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের বাস ভবনের উদ্দেশে। মিছিলটি ডাঃ রায়ের বাড়ির সামনে পৌঁছনোর সঙ্গে সঙ্গে বিরাট এক পুলিস বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে শান্তিপূর্ণ নিরস্ত্র ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর। তারপর শুরু হয়ে যায় নৃশংস লাঠিচার্জ। অন্ধকার গাঢ় হবার সঙ্গে সঙ্গে পুলিসী হামলা ছড়িয়ে পড়ে কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকায়। লাঠি, গুলি, টিয়ারগ্যাসে গোটা কলকাতা পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। বহু মানুষ মারা যায়, অসংখ্য মানুষ হয় আহত। ২ সেপ্টেম্বরও সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় মারাত্মক পুলিসী হানাদারি। সেদিনও লাঠি, টিয়ারগ্যাস, গুলিতে মারা যান বেশ কয়েকজন।
৩ সেপ্টেম্বর শোকে ক্ষোভে স্তব্ধ হয়ে গেল গোটা পশ্চিমবঙ্গ। সরকারি দমন নীতিকে অগ্রাহ্য করে সারা রাজ্যের সর্বস্তরের মেহনতী মানুষ সর্বাত্মক ধর্মঘট ও হরতাল পালন করলেন। এই ধর্মঘট ও হরতালকে বানচাল করার জন্য মিলিটারি নামান হল, নামান হল সশস্ত্র পুলিস। তাদের নির্মম গুলি চালনায় কলকাতা ও হাওড়ায় অনেক মানুষ প্রাণ দিলেন। আহত হলেন অনেকে। সরকারি প্রেস নোটে বলা হল নিহতের সংখ্যা ৬, আহত ১১০। কিন্তু বিভিন্ন সংবাদপত্রের হিসেবে সাধারণ ধর্মঘট ও হরতালের দিন পুলিস ও মিলিটারির গুলিতে মারা গেছেন ১২ জন। আহত ১৭২ জনের মত।
৮ সেপ্টেম্বর মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় সাংবাদিকদের বলেন : ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মারা গেছেন ৩৯ জন। কিন্তু মৃতের সংখ্যা যে ১০০ জনেরও বেশি ছিল তা সকলেই জানেন।
খাদ্য আন্দোলনকে স্তব্ধ করার জন্য সেদিন পুলিস ৪ দিন ধরে যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল তার বলি হয়েছিলেন ১৪ বছরের কিশোর সরোজকুমার দাস, ২৫ বছরের যুবক গোবর্ধন দাস, ৭৫ বছরের বৃদ্ধ চুনিলাল দত্ত। পুলিসের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দেবেন্দ মণ্ডল (২০), অভিমন্যু সাহা (২৯), বিভূতিভূষণ রায়চৌধুরী (২৬), ধীরেন দাসগুপ্ত (২৫), কানন ঘোষ (২০), পূর্ণচন্দ্র প্রামাণিক (২৭), বনমালি সরকার (২২), প্রতাপ চন্দ্র রায় (২০), অংশু শেখর সামস্ত (২৬), বলরাম দাস (২৬), হরিপদ গুপ্ত (২০), ধীরাজ গুপ্ত (২০) প্রমুখ। কলকাতা ও হাওড়ায় পুলিস সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে ঢুকে গুলি চালিয়েছে। ঘরের মধ্যে ঘুমন্ত মানুষকে গুলি করে খুন করেছে। মিলিটারিরা গ্রামে ঢুকে মহিলাদের শ্লীলতাহানিও করেছে।
কিন্তু এত রক্তপাত, এত নির্যাতনেও পশ্চিমবঙ্গের সংগ্রামী মানুষের ইস্পাত, কঠিন মেরুদণ্ডকে নোয়ানো যায়নি। ৩১ অগাস্টের মৃত্যুঞ্জয়ী শহীদদের পবিত্র রক্ত পরবর্তীকালের গণসংগ্রামের পথকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। আজকের পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সেইসব বীর সেনানীদের গভীরভাবে স্মরণ করার প্রয়োজন আছে, যাঁরা 'মরণ সাগর পারে' আজও অমর।
তথ্যসুত্রঃ
আগস্ট, ২০০৬, মালদহ জেলা বামফ্রন্ট কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকা
প্রকাশের তারিখ: ৩১-আগস্ট-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
