Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

রোজা লুক্সেমবার্গের জীবন ও চিন্তা- প্রথম পর্ব

ইরফান হাবিব
মার্কসের মতে – পুঁজি দুটি ভাগে বিকশিত হয় – ধ্রুবক পুঁজি (কনস্ট্যান্ট ক্যাপিটাল) এবং পরিবর্তনশীল পুঁজি (ভ্যারিয়েবল্‌ ক্যাপিটাল)। পরিবর্তনশীল পুঁজি হল সেই পুঁজি, যা শ্রমের জন্য ব্যয় করা হয়, অন্যান্য অর্থনীতিবিদেরা যাকে মজুরি ফান্ড বলেন। অতএব, মজুরি ফান্ড শ্রমিকদের মধ্যে বন্টন করা হলে, শ্রমিক কেবল যতটুকু তাঁর মজুরি ততটুকুর সমপরিমাণ কিনতে পারেন – তার বেশি কিনতে পারেন না কারণ তাঁরা কেবল শ্রমিক।
The Life and Thoughts of Rosa Luxemburg - Part I

রোজা লুক্সেমবার্গ-এর শাহাদতের শততম বছরে তাঁর জীবনের স্মৃতিচারণে বক্তৃতা করার সুযোগ পাওয়া আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের।  

জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি এবং স্পার্টাকাস লীগ-এর নেতা রোজা লুক্সেমবার্গ সহ কার্ল লিবকনেশ্‌ট-কে ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে হত্যা করা হয়েছিল। ফ্রেডরিখ এবার্ট-এর সমাজ-গণতান্ত্রিক (সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক) সরকার কর্তৃক বার্লিন-এর এক বামপন্থী পুলিশ প্রধানকে অপসারণের সূত্র ধরে জার্মানিতে একটি বিদ্রোহ সুচনা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর ১৯১৮ সালে সমাজ-গণতন্ত্রীরা (সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট) ক্ষমতা লাভ করেছিল।  

এবার্ট জানুয়ারি-র এই বিপ্লবকে গুঁড়িয়ে দিতে জার্মান সেনাবাহিনীকে ডাকলেন। ১৫ জানুয়ারি বার্লিনের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এই বিদ্রোহের নেতা রোজা লুক্সেমবার্গ ও লিবকনেশ্‌ট-কে; এরপর নির্যাতন এবং হত্যা করা হয় দুজনকেই। রোজা-র লাশ ফেলে দেওয়া হয় একটি খালে, তাঁর মৃতদেহ কয়েক মাস পরে পাওয়া যায়। লিবকনেশ্‌ট-কে মাথায় গুলি করে তাঁর দেহ ফেলে রাখা হয় জঙ্গলে। রোজা লুক্সেমবার্গের দীর্ঘদিনের কমরেড, সঙ্গী ও বন্ধু, জোগিচেস, প্রথমে গ্রেপ্তারি থেকে রক্ষা পেয়ে, রোজা-র হত্যাকারীদের খুঁজে বার করার ও তাদের প্রকাশ্যে আনার চেষ্টা করে চলেন, তারপর সেই বছরেরই মার্চ মাসে তিনি নিজেও গ্রেপ্তার ও খুন হন। 

মার্কসবাদের ইতিহাসে সর্বাধিক পরিচিত মহিলা তাত্ত্বিক রোজা লুক্সেমবার্গ। তিনি মূলত জার্মান ভাষায় লিখতেন। তাঁর রচনাভাণ্ডারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ 'দি অ্যাকুমুলেশন অফ ক্যাপিটাল' ১৯১৩ সালের গোড়ায় প্রথম প্রকাশিত হয়। এর পর পরই সমালোচকদের উত্তরে তিনি লেখেন 'অ্যাকুমুলেশন অফ ক্যাপিটাল: অ্যান অ্যান্টি-ক্রিটিক'। ইংরেজি অনুবাদে ক্যাপিটাল সংগ্রহের ভূমিকা রয়েছে আরেক নারী অর্থনীতিবিদ জোয়ান রবিনসন। অধ্যাপক পিটার হুডিস ও কেভিন অ্যান্ডারসন কর্তৃক সংকলিত তাঁর নির্বাচিত লেখা বই 'দি রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার', শোভনলাল দত্তগুপ্তের সম্পাদনায় ‘রিডিংস ইন রেভলিউশন অ্যান্ড অর্গানাইজেশন: রোজা লুক্সেমবার্গ অ্যান্ড হার ক্রিটিকস’ এবং অপর একটি সম্পাদিত কাজ ‘দি ন্যাশনাল কোয়েশ্চেন: সিলেক্টেড রাইটিংস বাই রোজা লুক্সেমবার্গ’ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলি এখন ইংরেজিতে পাওয়া যায় এবং রোজা লুক্সেমবার্গ সম্পর্কে আমার জ্ঞান কার্যত তাঁর এই রচনাগুলিতেই সীমাবদ্ধ। 

রোজা লুক্সেমবার্গ সম্পর্কে কিছু তথ্য দিয়ে শুরু করি। তিনি ছিলেন একজন পোলিশ ইহুদি, রাশিয়া অধিকৃত পোল্যান্ড সীমান্তের তৎকালীন জামোস্ক-এ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ১৮৮৭ সালে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে (রোজা লুক্সেমবার্গ ১৮৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন), তিনি প্রলেতারিয়েত নামে পরিচিত সোশ্যালিস্ট পার্টি অফ পোল্যান্ড-এ যোগদান করেছিলেন। এরপর তাঁর রাজনৈতিক কার্যকলাপ জারপন্থী পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শুরু করায় ১৮৮৯ সালে তিনি জার্মানি চলে যান। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় লিও জোগিচেসের সঙ্গে। জোগিচেস এরপর তাঁর উপদেষ্টা ছিলেন। তিনি রাজনৈতিক দলের একজন উল্লেখযোগ্য সংগঠকও ছিলেন। জোগিচেস আজীবন এমনকী মৃত্যুর পরও রোজা লুক্সেমবার্গ-এর সহায়ক ছিলেন। রোজা লুক্সেমবার্গ-এর লক্ষ্যে তিনিও মৃত্যু বরণ করেন। 

১৮৯৩ সালে রোজা লুক্সেমবার্গ জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে যোগ দেন। অর্থাৎ, তিনি ছিলেন একজন পোলিশ ইহুদি, যিনি যোগ দিয়েছিলেন জার্মান পার্টিতে। তবে তিনি পোলিশ পার্টি এবং পরবর্তীকালে পোল্যান্ডের সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টির পোলিশ বিষয়বস্তু নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। এক্ষেত্রে একটি কথা মনে রাখতে হবে যে, জার্মান পার্টি ছিল সে সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম মার্কসবাদী দল। এই অতি সুসংগঠিত পার্টি বহু নির্বাচনে জয়লাভ করেছিল এবং ফেডারেল পার্লামেন্ট-এর (রাইখস্ট্যাগ) এক তৃতীয়াংশ গঠন করেছিল। শুধু পার্টিই নয়, বিপুল সংখ্যক ট্রেড ইউনিয়ন এবং রোজা লুক্সেমবার্গের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে নারী সংগঠনসহ গণসংগঠনও ছিল। এই জার্মান পার্টি এবং পোলিশ পার্টিতে রোজা লুক্সেমবার্গ প্রচুর সমস্যা ও প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তাঁর উত্তরগুলি জার্মানির সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের থেকে ভিন্ন ছিল।

আমি কালানুক্রমিক পদ্ধতিতে শুরু করব না, বরং এমন একটি ক্রম বজায় রেখে আমার কথা বলব, যাতে করে, সম্ভবত ভারতীয় হিসাবে, আমরা আরও বেশি আগ্রহী হব। প্রথম প্রশ্নটি হল উপনিবেশবাদ এবং শ্রমজীবী শ্রেণির আন্দোলন নিয়ে। অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ইউরোপের শ্রমজীবী শ্রেণির আন্দোলন বহুদিন পর্যন্ত রাজনৈতিক পদক্ষেপের অন্যতম বিষয়বস্তু হিসাবে উপনিবেশবাদকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করেনি। এমনকী রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টি অর্থাৎ বলশেভিকরাও ১৯১৯ সাল থেকে উপনিবেশবাদের প্রসঙ্গটিকে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ হিসাবে দেখতে শুরু করেছিলেন। এক্ষেত্রে ইউরোপে শ্রমজীবী শ্রেণির আন্দোলনগুলি এই অর্থে অন্তরায় ছিল যে, সেগুলি কেবল নিজের দেশের শ্রমজীবী শ্রেণির সমস্যা নিয়ে ভাবিত ছিল - তাদের মজুরি, সমাজে তাদের গুরুত্ব, নিজেদের দেশের মধ্যে সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াই। উপনিবেশবাদের প্রতি সেগুলির আগ্রহ ছিল ক্ষীণ। 

তাই, উপনিবেশবাদকে না বুঝলে যে পুঁজিবাদকে বোঝা যায় না, তা উপলব্ধি করা রোজা লুক্সেমবার্গ-এর একটি অত্যোৎকৃষ্ট অবদান। এই দুটি বিষয় গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তাঁর ১৯১৩ সালের বই, ‘দি অ্যাকুমুলেশান অফ ক্যাপিটাল’-এ এ প্রসঙ্গ ছিল। রোজা লুক্সেমবার্গ তাঁর পাঠকদের সামনে একটি নির্দিষ্ট ধাঁধা রেখেছিলেন, একে আমি 'লুক্সেমবার্গ ধাঁধা' বলি। পুঁজির বৃদ্ধি, যাকে মার্কস বর্ধিত পুনরুৎপাদন (এক্সটেন্ডেড রিপ্রোডাকশন) বলেছেন, এবং যাকে রোজা লুক্সেমবার্গ সংক্ষিপ্তভাবে বলেছেন সঞ্চয় (অ্যাকুমুলেশন), কেবলমাত্র উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদনের মাধ্যমেই ঘটতে পারে। এবার তিনি বলছেন - একটি বদ্ধ পুঁজিবাদী সমাজ নিন (মার্কস ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ড এবং তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময়কালের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড যেমনটার উল্লেখ ছিল) - এমন একটি সমাজ যেখানে কেবল দুটি শ্রেণি – পুঁজিপতি এবং শ্রমিক (ইউরোপের সমস্ত দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে বদ্ধ পুঁজিবাদী সমাজ হয়ে ওঠার প্রবণতা তৈরি হচ্ছিল)। এবারে ভাবুন, এরকম একটি বদ্ধ পুঁজিবাদী সমাজে, উদ্বৃত্ত উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যাবে? এইটাই তো সমস্যা। 
মার্কসের মতে – পুঁজি দুটি ভাগে বিকশিত হয় – ধ্রুবক পুঁজি (কনস্ট্যান্ট ক্যাপিটাল) এবং পরিবর্তনশীল পুঁজি (ভ্যারিয়েবল্‌ ক্যাপিটাল)। পরিবর্তনশীল পুঁজি হল সেই পুঁজি, যা শ্রমের জন্য ব্যয় করা হয়, অন্যান্য অর্থনীতিবিদেরা যাকে মজুরি ফান্ড বলেন। অতএব, মজুরি ফান্ড শ্রমিকদের মধ্যে বন্টন করা হলে, শ্রমিক কেবল যতটুকু তাঁর মজুরি ততটুকুর সমপরিমাণ কিনতে পারেন – তার বেশি কিনতে পারেন না কারণ তাঁরা কেবল শ্রমিক। তাঁরা পুঁজিবাদী সমাজে মজুরির উপর নির্ভর করে জীবনযাপন করেন। তাই পুঁজিপতিরা শ্রমিকদের যা বেতন দেয়, তাঁরা সেই মজুরি দিয়ে কেনেন। অতএব, উৎপাদনের একটি অংশ - মজুরি পণ্য (ওয়েজ গুডস্‌) - বা মার্কস যাকে ডিপার্টমেন্ট ২ বলেছেন তা শ্রমিকেরা কী কেনেন ও পুঁজিপতিরা নিজস্ব উদ্বৃত্ত থেকে ভোগ্য পণ্য হিসাবে যা কেনেন তার উপর নির্ভরশীল। 

উদ্বৃত্ত কেবল পুঁজিপতিদের কাছে বিক্রি করা যেতে পারে কারণ শ্রমিকেরা তাঁদের মজুরির বাইরে কিনতে পারেন না। তাই কেবলমাত্র পুঁজিপতিরা ডিপার্টমেন্ট ১-এর পণ্য অর্থাৎ মূলধনের পণ্য কিনতে পারে। কিন্তু কীভাবে তারা কিনতে পারে? তারা তাদের নিজস্ব সম্পদ, নিজস্ব উদ্বৃত্ত দিয়ে কেনে। তাহলে এটি কীভাবে বাড়ানো যায়? তাদের উদ্বৃত্ত দিয়ে তারা তাদের নিজস্ব পণ্য কেনে। তারা যা পেয়েছে তা এমনিতেই উদ্বৃত্ত। ফলত, রোজা লুক্সেমবার্গ বলেন যে, একটি বদ্ধ পুঁজিবাদী সমাজে কোন বর্ধিত পুনরুৎপাদন হতে পারে না। তাই মার্কস এ প্রসঙ্গে ভুল নয়, অসম্পূর্ণ ছিলেন। তিনি এক পুঁজিপতির ক্ষেত্রে বর্ধিত পুনরুৎপাদনের উদাহরণ দিয়েছেন। কিন্তু একজন পুঁজিপতির ক্ষেত্রে যা সত্য হতে পারে, গোটা অর্থনীতির ক্ষেত্রে তা সত্য হবে না কারণ একে অপরের কাছ থেকে ক্রয়-বিক্রয় করে পুঁজিপতিরা বাড়তি উদ্বৃত্ত তৈরি করতে পারে না। তাহলে এই বাড়তি উদ্বৃত্ত কীভাবে তৈরি হয়? রোজা লুক্সেমবার্গের যুক্তিতে, বাড়তি উদ্বৃত্ত তৈরি হয়েছে কারণ পুঁজিবাদী অর্থনীতি অ-পুঁজিবাদী ক্ষেত্রগুলিকে শোষণ করে – যেমন, কৃষক, উপনিবেশ।

‘নিউইয়র্ক ট্রিবিউন’-এ প্রকাশিত কার্ল মার্কস-এর নিবন্ধগুলি রোজা লুক্সেমবার্গ-এর কাছে ছিল না – সেগুলির পুনর্মুদ্রণ হয়নি। এগুলি কেবলমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন-এই ছিল ছাপা অবস্থায় পাওয়া যায়। তাই তিনি জানতেন না যে উপনিবেশবাদের উপর কার্ল মার্কসের একটি বিরাট কাজ পাওয়া যায়। ফলত, কীভাবে উপনিবেশগুলি পুঁজিবাদী শক্তি দ্বারা শোষিত হয়, তিনি তার বর্ণনা দিয়েছেন নিজের লেখা দুটি অধ্যায়ে। এগুলি প্রায় মার্কস-এর লেখার মতো ছিল – উপনিবেশবাদী শোষণের বিরুদ্ধে অত্যন্ত শক্তিশালী অভিযোগ। দুটি অধ্যায় হল, জাতীয় অর্থনীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং পণ্য অর্থনীতির সূচনা। এই দুটি অধ্যায়ে তিনি বর্ণনা করেছেন কীভাবে - সামরিক উপায়ে – উপনিবেশবাদী শক্তি, পুঁজিবাদী শক্তি, চীন, ভারত এবং আরব দেশগুলিকে শোষণ করছিল। তাই তিনি যুক্তি দেন যে, সম্প্রসারণের জন্য পুঁজিবাদকে উপনিবেশ দেশগুলিকে শোষণ করতে হবে, সেখানে পুঁজি তৈরি করতে হবে। অন্যথায় সেই দেশগুলিকে বাধ্যতামূলক বাজারে (ক্যাপ্টিভ মার্কেট) পরিণত করতে হবে, ও শোষণের মাধ্যমে তথাকথিত মুক্ত বাণিজ্যের মাধ্যমে নয়, চাপিয়ে দেওয়া বাণিজ্যের মাধ্যমে - অতিরিক্ত পুঁজির জন্য সংস্থান তৈরি করতে হবে। দেখা গেছে যে, (এবং এই কৃতিত্ব বুখারিনের, যিনি দুর্ভাগ্যবশত রোজা লুক্সেমবার্গ-এর একটি কঠোর সমালোচনা লিখেছিলেন, কিন্তু বুখারিনই কার্ল মার্কস-এর উদ্ধৃতিটি পেয়েছিলেন) উপনিবেশবাদী বাণিজ্যে পুঁজিবাদী দেশগুলি থেকে কম মূল্যের পণ্য উপনিবেশ দেশগুলিতে বেশি মূল্যে বিনিময় করা হয়। ফলে এ জাতীয় বাণিজ্যে এক অসম বিনিময় চলে। এখন আমরা জানি যে, উপনিবেশ দেশগুলি থেকে পুঁজিবাদী দেশগুলিতে প্রচুর কিছু প্রবাহিত হয়েছিল। 

ফলে, রোজা লুক্সেমবার্গ-এর প্রথম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য ছিল সম্পূর্ণ তাত্ত্বিক কাজের মাধ্যমে উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংগ্রামকে এজেন্ডা হিসাবে তুলে আনা। যদি কেউ পুঁজিবাদের বিরোধিতা করতে চান তবে তাকে অবশ্যই উপনিবেশবাদের বিরোধিতা করতে হবে। এর ভিত্তিতে তিনি জার্মান সরকারের উপনিবেশবাদী নীতি এবং আফ্রিকা ও অন্যান্য আফ্রিকান উপনিবেশগুলিতে গণহত্যার যথেষ্ট আক্রমণ না করার জন্য জার্মান সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বের সমালোচনা করেছিলেন। 

অতএব, রোজা লুক্সেমবার্গ-এর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল, একটি তাত্ত্বিক কাজের মাধ্যমে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের রণকৌশলে সমগ্র উপনিবেশ প্রসঙ্গটিকে তুলে আনা। দুঃখের কথা হল যে, এই নির্দিষ্ট দিকটি কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল এবং অন্যরা গ্রহণ করেনি। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধের লড়াইকে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধের লড়াইয়ের থেকে আলাদা করা যায় না – এই রকম অত্যন্ত গুরুতর বিষয় যে তিনি উত্থাপন করছেন, সে কথা বিচার না করে বুখারিন, সুইজি এবং অন্যান্যরা রোজা লুক্সেমবার্গ-এর নিবন্ধগুলি নিয়ে সমস্যা তৈরিতে উৎসাহ দিতেন।

১৯১৯ সালে লেনিন যখন কমিউনিস্ট আন্দোলনে ঔপনিবেশিক ও জাতীয় প্রশ্নে তাঁর থিসিস পেশ করেন, তখন এই নির্দিষ্ট বার্তাটি স্পষ্ট করে বলেন। কিন্তু এটি ছিল তাত্ত্বিক ভিত্তি ছাড়াই, যা কি না রোজা লুক্সেমবার্গ দিয়েছিলেন। আমি আর এই বিষয়ে ঢুকছি না। অসম বিনিময় নিয়ে আরঘিরি ইমানুয়েল-এর লেখা রোজা লুক্সেমবার্গ-এর থিসিসের প্রতি আগ্রহ পুনরুজ্জীবিত করেছে। এবং বর্ধিত পুনরুৎপাদন নিয়ে রোজা লুক্সেমবার্গ-এর সমালোচনাকে, অটো বাওয়র, বুখারিন ও সুইজি-র কোনোক্রমে বাতিল করে দেওয়ার চেয়ে উৎকৃষ্ট উপায়ে বিচার করে খতিয়ে দেখতে হবে।

রোজা লুক্সেমবার্গ-এর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল জাতির প্রশ্নে। ইউরোপ তখন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে বিভক্ত ছিল, বিশেষ করে মধ্য এবং পূর্ব ইউরোপ যেখানে ভাষাগত অঞ্চলের ভিত্তিতে সীমানা ছিল না। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বিপুল সংখ্যক অ-জার্মান এবং অ-হাঙ্গেরীয় জাতীয়তা, বিশেষ করে ইসলামদের গ্রহণ করেছে। পোল্যান্ড তিন অংশে বিভক্ত ছিল - জার্মানি, রাশিয়া এবং অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি। সুতরাং, ‘জাতীয়’ প্রসঙ্গটি ইউরোপে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটি সম্পর্কে দুটি মতামত ছিল। লেনিনের মত ছিল যে, জাতীয় আত্ম-নির্ধারণ কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি বিষয় হওয়া উচিত। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য সংগ্রামের প্রশ্ন ব্যাতিরেকেও, কমিউনিস্টদের, বা সমাজ-গণতন্ত্রীদের প্রতিটি জাতির ভবিষ্যত নির্ধারণের অধিকার সম্পর্কে অন্তত একমত হওয়া উচিত - এটি পৃথক হতে চায় কি না – তা আত্ম-নির্ধারণের বিষয় হিসাবে উল্লেখ করা হয়।

তাত্ত্বিকভাবে শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলন যখন আন্তর্জাতিক হয়ে উঠেছিল, তখন পুঁজিপতি এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণি যাদের একত্রে বুর্জোয়া বলা হত - তারা ছিল জাতীয়তাবাদী। জাতীয় আত্ম-নির্ধারণের বিষয়টি বিপ্লবের আগে না কি পরে প্রকট হয়েছিল, তা লেনিনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। রোজা লুক্সেমবার্গ-এর অবস্থান ছিল ভিন্ন। আমি মনে করি, এই নির্দিষ্ট প্রসঙ্গটিতে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি বোঝা প্রয়োজন। রোজা লুক্সেমবার্গ জাতীয় আত্ম-নির্ধারণের বিরুদ্ধে ছিলেন না। তিনি বলছিলেন, শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য - আন্তর্জাতিক ঐক্য – মুখ্য ভাবনার বিষয় হওয়া দরকার। এবং সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের উচিত প্রথমে পুঁজিবাদীদের উৎখাত করার চেষ্টা করা, তারপর স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা করা এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে জাতির স্বাধীনতার ব্যবস্থা করা।

অন্যভাবে বলতে হলে, প্রশ্ন নীতি নিয়ে নয়, বরং আত্ম-নির্ধারণকে কোন পর্যায়ে সংঘটিত করা উচিত ছিল তার নিয়ে। রোজা লুক্সেমবার্গ-এর যুক্তি ছিল, জাতীয় স্তরে বিভিন্নতার পরিবর্তে শ্রমিক শ্রেণির আন্তর্জাতিক ঐক্য সংগঠিত করার প্রতি নজর দেওয়া উচিত। জাতীয় বিভিন্নতার প্রশ্নে - ক্ষমতা দখল করার পর - সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় যে, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, বসনিয়া, ক্রোয়েশিয়া এবং অন্যেরা ভিন্ন ভিন্ন দেশ হবে কি না। লেনিন যুক্তি দিয়েছিলেন যে, দুটি বিষয় সম্পর্কযুক্ত নয়, এবং কমিউনিস্টদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা প্রথমে জাতীয় মুক্তি, জাতীয় আত্ম-নির্ধারণ চায় কি না। আমার মনে হয়, রোজা লুক্সেমবার্গ-এর এক্ষেত্রে কিছু বিষয় নজর করা প্রয়োজন, বিশেষ করে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে।

এ কথা সত্য যে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ একটি আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ছিল, কিন্তু তা কীভাবে হয়েছিল? জনসমর্থন না থাকলে আন্তঃসাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ সংঘটিত হয় না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য জনসমর্থন কীভাবে এসেছিল? অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি নিয়ন্ত্রিত - বসনিয়া দখলে। সার্বিয়া তখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল এবং সার্বিয়ানরা দাবি করত যে, বসনিয়ানরা যেহেতু সার্ব ভাষায় কথা বলে, সেহেতু সার্বিয়ার অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। ধর্মীয় প্রশ্নও ছিল - এটি আমাদের জন্য একটি পরিচিত বিষয় হতে পারে। বহু বসনিয়ান ছিল গ্রীক অর্থোডক্স আর অস্ট্রিয়ান এবং হাঙ্গেরিয়ানরা ছিল ক্যাথলিক। অস্ট্রো-হাঙ্গেরির ক্রাউন প্রিন্স বসনিয়ার রাজধানী সারাজেভো যাওয়ার সময়ে এক সার্ব জাতীয়তাবাদী দ্বারা নিহত হন (বর্তমানকালের বয়ানে যা সন্ত্রাস। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি দাবি করেছিল যে সার্বিয়াকে এর জন্য শাস্তি দেওয়া উচিত (আমরাও একই রকম কিছু দাবি করছি। সার্বিয়ার সহকর্মী স্লাভিক দেশ, রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ালে রাশিয়া সার্বিয়াকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেয়। জার্মানির সঙ্গে অস্ট্রিয়ার একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট ছিল, ফলত জার্মানি রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়। যে সমাজ গনতন্ত্রীরা কখনই যুদ্ধে যোগ দেবে না বলে চলছিল (দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সিদ্ধান্ত ছিল যে, তাদের কেউই যুদ্ধে যোগ দেবে না), তাদেরও জাতীয় অনুভূতি এতটাই প্রবল ছিল যে, তারাও যুদ্ধের পক্ষে মতদান করে। জার্মানি এবং অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রান্স যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল কারণ রাশিয়ার সঙ্গে তাদের গোপন চুক্তি ছিল। এবং ইংল্যান্ডের ফ্রান্সের সঙ্গে ও ফ্রান্সে পৌঁছানোর জন্য জার্মানির বেলজিয়াম আক্রমণের প্রশ্নে একটি গোপন বোঝাপড়া ছিল। অর্থাৎ ইংল্যান্ডও বেলজিয়ামের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেয়। এসব কারণেই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ হল।

এখন সম্পূর্ণ প্রশ্নটিই হল জাতীয়তাবাদ নিয়ে। এটা কি জার্মান সমাজ-গণতন্ত্রীদের জন্য ঠিক ছিল - জার্মান সমাজতন্ত্রী বা ফরাসি সমাজতন্ত্রীদের জন্য ঠিক ছিল (যাকে ফ্রান্সে হত্যা করা হয়েছিল সেই জঁহেস বাদে) - রাশিয়ার মেনশেভিকদের পক্ষে যুদ্ধকে সমর্থন করা কি ঠিক ছিল? জাতি দাবি করেছে, কিন্তু আমরা কি জাতির এই দাবি শুনব? জাতির এই দাবিতে কান দেওয়া উচিত নয়। এমন দাবির বিরুদ্ধে গিয়ে রোজা লুক্সেমবার্গ কারাবন্দী হন। কার্ল লিবকনেশ্‌ট যিনি যুদ্ধের কৃতিত্বের বিরুদ্ধে মতদান করেন, তিনিও কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। আমাদের জন্য এটি ছিল রোজা লুক্সেমবার্গ দ্বিতীয় বার্তা।

রোজা লুক্সেমবার্গের চিন্তাধারার তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিকটি ছিল পার্টি সংগঠন। কমিউনিস্ট আন্দোলনে আমরা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার কথা শুনেছি (এবং আমি আশা করছি এমনও আমরা এ ব্যাপারে অনুগত)। আপনি নেতৃত্ব নির্বাচন করেন এবং তারপর নেতৃত্ব যা বলে – আপনি আপনি তাতে হ্যাঁ বলেন। তা না হলে পার্টি ও আন্দোলন চলতে পারে না। রোজা লুক্সেমবার্গ এতে “না” বললেন। জার্মান সমাজ-গণতন্ত্র একটি বিরাট সাফল্য ছিল। সব ধরনের পেশা ছিল সংগঠিত- নারী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি, শ্রমিক ইত্যাদি। সবকিছুই জার্মান ঘরানার দক্ষতার সঙ্গে সংগঠিত হত। তারা গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা অনুসরণ করত। তাত্ত্বিকভাবে নেতৃত্ব কঠোরভাবে মার্ক্সবাদী ছিল – বেবেল,কাউটস্কি ও হিলফার্ডিং-এর মতো তাত্ত্বিক নেতাসহ - কিন্তু প্রায়োগিক ধরনে ছিল ব্রিটেনের লেবার পার্টির মতো। অর্থাৎ যতক্ষণ ধর্মঘট হয়েছে, কিছু মজুরি বাড়ানো হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত পার্টি জার্মান সরকারের সঙ্গে মানিয়ে চলত। কিন্তু কলোনিগুলি অনেক দূরে হওয়ায় সেখানে জনবিরোধী কাজ চলছিল। রোজা লুক্সেমবার্গ-এর মতে এটি গর্হিত কাজ ছিল।

লেনিন বলতেন আপনি পার্টির সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করুন এবং নিজের পার্টি গঠন করুন। যেমন তিনি করেছেন। কিন্তু রাশিয়ান ও জার্মান সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে তফাত ছিল। পার্থক্যটি ছিল যে রাশিয়ান সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টিতে বলশেভিক এবং মেনশেভিক তখনও ছিল, আর যখন জার্মান সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (জার্মানিতে এক তৃতীয়াংশের বেশি ভোটপ্রাপ্ত) ছিল একটি গণ পার্টি। আর তাই সেই আন্দোলন ভাঙা - সেই সাফল্যের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা - রোজা লুক্সেমবার্গের পক্ষে সম্ভবপর ছিল। তাঁর বক্তব্য ছিল যে, দলের মধ্যে চিন্তার স্বাধীনতা থাকা উচিত, দলের মধ্যে গণতন্ত্র থাকা উচিত। রোজা লুক্সেমবার্গ যা বলতে চাইছিলেন তা যেন বলতে পারেন। তিনি বার্নস্টেইনের সমালোচনা দিয়ে শুরু করেছিলেন এবং শেষতক গোটা জার্মান সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্ব তাঁর সঙ্গে একমত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতাটি ছিল যে, জার্মানির সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি তাত্ত্বিকভাবে খুবই মার্কসবাদী হলেও, ইংল্যান্ডের লেবার পার্টির মতোই প্রায়োগিক ব্যাপারে ছিল খুবই সংস্কারবাদী। স্বভাবতই, ১৯১৪ সালে যখন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হল, জার্মান সোশাল ডেমোক্র্যাটদের বেশিরভাগই যুদ্ধের এবং যুদ্ধের কৃতিত্বের পক্ষে ভোট দিয়েছিল (এটি এমন এক অতি পরিচিত পরিস্থিতি যা আপনি ভারতেও দেখতে পাবেন), এবং রোজা লুক্সেমবার্গকে এক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, চিন্তার স্বাধীনতা, আলোচনার স্বাধীনতা একটি মার্কসবাদী দলের অপরিহার্য উপাদান। এবং এখানেও লেনিন এবং রোজা লুক্সেমবার্গের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য ছিল।

অবশেষে, নারীদের প্রসঙ্গে আসি। একথা অবশ্যই বলা দরকার যে, কমিউনিস্ট আন্দোলন, সাধারণভাবে, নারী আন্দোলনের প্রতি খুব কম মনোযোগ দিয়েছে। কেবলমাত্র কমিউনিস্টই নয়, পূর্ববর্তী সোশাল ডেমোক্র্যাটরাও তা-ই। বেশ কিছু সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, তাদের কর্মসূচিতে নারীদের ভোটাধিকারের উল্লেখ করলেও ও সেই অধিকার প্রদান করলেও, এই বিষয়টিকে সত্যিই গুরুত্বের সঙ্গে নেয়নি বা এটিকে আসল ইস্যুতে পরিণত করেনি। জার্মানির ক্ষেত্রে একথা সত্য ছিল; ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রেও একথা সত্য ছিল, সেখানে নারীরা ১৯১৯ সাল ইস্তক ভোট দেওয়ার অধিকার পাননি। ভারতে যেটা ঘটেছিল তা ছিল ব্রিটিশ দপ্তরীর ভুলে – ভোটাধিকারের ধারা লেখার সময় লেখা হয়েছিল “অ্যাডাল্টস”, তবে এই “অ্যাডাল্টস” বলতে বোঝানো হয়েছিল কেবল পুরুষ প্রাপ্তবয়স্কদের। পরবর্তীকালে মাদ্রাজ হাই কোর্ট এর ভিত্তিতেই রায় দিয়ে দেয় যে, নারী-পুরুষ সকল প্রাপ্তবয়স্কই ভোটদান করতে পারবে।

রোজা লুক্সেমবার্গ এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসাবে গণ্য করেছিলেন। নারীদের ভোটাধিকার প্রাপ্য এবং সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিগুলির অবিলম্বে, স্বল্পমেয়াদী কর্মসূচিতে এই অধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, এবং এই প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ায় বেলজিয়ান পার্টির তীব্র সমালোচনা করেছিলেন তিনি। তবে তাঁর এই বক্তব্যও ছিল যে, নারীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা চাওয়া উচিত নয়। আমি পড়ছিলাম যে, তিনি নারীদের রাতের ডিউটি ​​থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি বলেন, এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা নারীদের জন্য মূল্যহীন। তাঁদের এ জাতীয় সুযোগ-সুবিধা থাকা উচিত নয়। তাঁদের সম্পূর্ণ সমান অধিকার থাকা উচিত। এ কথা সত্য যে, নারীদের নিয়ে তাঁর লেখা কম, কারণ তিনি এই কাজটি ক্লারা জেটকিনের উপর ছেড়ে দিয়েছেন। ক্লারা জেটকিন - যিনি ১৯১৯ সালের হত্যাকাণ্ড থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন এবং জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়েছিলেন – তিনি নারীদের অধিকারের জন্য ক্রমাগত লিখেছেন এবং লড়াই করেছেন।

রোজা লুক্সেমবার্গ-এর মৃত্যু সম্পর্কে কিছু কথা বলে আমি আমার বক্তব্য শেষ করব। তিনি অবশেষে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিলেন যে, জার্মানির সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সংশোধনবাদী পথে, জাতি-রাষ্ট্রের সহযোগে থাকা পথে বহু দূর চলে গেছে। তাই কার্ল লিবকনেশ্‌ট, ক্লারা জেটকিন এবং অন্যান্যদের সাথে মিলে তিনি ১৯১৮ সালে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। ১৯১৮ সালের নভেম্বর মাসে, জার্মান সেনাবাহিনীতে যে সোশাল ডেমোক্র্যাটরা ছিলেন তাঁদের সহকারে একটি বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল - তথাকথিত নভেম্বর বিপ্লব।

ক্ষমতায় থাকাকালীন, এবার্ট-এর অধীনে থাকা সোশাল ডেমোক্র্যাটরা জার্মান জাতীয়তাবাদী দলগুলির সঙ্গে সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছিল এবং সেই কারণে কার্ল লিবকনেশ্‌ট সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি সে সময়েই বিপ্লব ঘটাবে (যতদূর আমরা জানি, রোজা লুক্সেমবার্গ এই সিদ্ধান্তগ্রহণের অংশীদার ছিলেন না, তবে সিদ্ধান্তটি তাঁকে জানানো হলে, তিনি সম্মত হন)।  দুর্ভাগ্যবশত সৈন্যরা এবার্টের বিরুদ্ধে গিয়ে তাঁদের সমর্থন করেনি। সোশাল ডেমোক্র্যাটদের অবস্থান খুব শক্তিশালী ছিল, সোভিয়েতদের মধ্যে তাদের প্রবল প্রভাব ছিল। কিন্তু সেখানে একদল জাতীয়তাবাদী ফ্যাসিবাদী ছিল যাদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত ১৯৩৩ সালে নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। তারা - রোজা লুক্সেমবার্গ এবং কার্ল লিবকনেশ্‌ট - দুজনের উপর সমস্ত ধরণের বর্বরতা চালানোর পর হত্যা করেছিল।

রোজা লুক্সেমবার্গকে ১৫ জানুয়ারি খুন করা হয়েছিল, কিন্তু তাঁর মৃতদেহ সেই বছরের মে মাসে একটি ভূগর্ভস্থ ড্রেন-এ পাওয়া যায়। এভাবেই তাঁকে শহীদ করা হল। আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে আমরা তাঁর শাহাদতের শতবার্ষিকী পালনের কর্তব্যটি পালন করছি। ধন্যবাদ।

  

সূত্র— রোজা লুক্সেমবার্গ-এর মৃত্যু শততম বছরে রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশন, সাউথ এশিয়া-র সহায়তায়, সেন্টার ফর উইমেন'স ডেভলপমেন্ট স্টাডিস ২০১৯ সালের মার্চ মাসে একটি প্যানেল ডিসকাশান-এর আয়োজন করে। এই প্যানেল ডিসকাশানে বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ইরফান হাবিব, অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়ক ও অধ্যাপক চিরশ্রী দাশগুপ্ত। তাঁদের বক্তব্য এরপর সেন্টার ফর উইমেন'স ডেভলপমেন্ট স্টাডিস থেকে পুস্তিকা আকারে ইংরেজিতে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। আজকের নিবন্ধ অধ্যাপক ইরফান হাবিব-এর বক্তব্যের লিখিত (অনূদিত) রূপ। 

ভাষান্তর: উর্বা চৌধুরী 


প্রকাশের তারিখ: ১৫-জানুয়ারি-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৫১ টি নিবন্ধ
২৫-মে-২০২৬

২২-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬