সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সাংবাদিকতার এক অধ্যায়
মুজফ্ফর আহ্মদ
১৯২৯ সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখে কমিউনিস্টদের ওপরে প্রচণ্ড আঘাত এল। এই তারিখে সারা ভারতে কমিউনিস্ট নেতৃত্বগণ গ্রেফতার হলেন মিরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার সংস্রবে। মোকদ্দমা চলতে থাকল। পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম রাজকীয় মোকদ্দমা (State trial) কিন্তু কমিউনিস্টদের কাজ বন্ধ হল না। কিছু কিছু কাগজও তাঁরা চালাতে থাকলেন। হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি যে, ওয়াসে মজদুর (মজুরের বাণী) নামক একখানা উর্দু কাগজও কিছুদিন বোম্বে হতে বার হয়েছিল। ১৯২৯ সালের ২৬শে জানুয়ারি তারিখে, অর্থাৎ প্রথম স্বাধীনতা দিবসে বোম্বে হতে ওয়ার্কার্স উইকলি (Workers' Weekly) নাম দিয়ে একখানা সাপ্তাহিক ইংরেজি কাগজ বার হয়েছিল। কাগজের নামের ওপরে লেখা থাকত ‘দুনিয়ার মজুর এক হও’, আর নামের নিচে লেখা থাকত ‘সংগ্রামী মজুরশ্রেণির মুখপত্র’ (The Organ of Militant Working Class)। অন্য সব কমিউনিস্ট কাগজের মতো এ-কাগজখানাও দীর্ঘকাল চালু থাকেনি, তবে অনেক সপ্তাহ চলেছে।

“That in the year 1921 the said Communist International determined to establish a branch organisation in British India, and the accused Sripad Amrit Dange, Shaukat Usmani and Muzaffar Ahmad entered into a Conspiracy with certain other persons to establish such branch Organisations with a view to deprive the King Emperor of his sovereignty of British India.”
১৯২৯ সালের মার্চ মাসে মিরাটের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ভারত গভর্নমেন্ট মিরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা দায়ের করতে গিয়ে যে দরখাস্ত দাখিল করেছিল ওপরের উদ্ধৃতি তা থেকে নেওয়া হয়েছে। ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে কানপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা দায়ের করতে গিয়েও ভারত গভর্নমেন্ট অনুরূপ ভাষায় নালিশ জানিয়েছিল। সত্যই ১৯২১ সালেই ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়েছিল এবং তৃতীয় কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের কার্যাবলী হতে উদ্যোক্তারা প্রেরণাও লাভ করেছিলেন। পার্টি গড়ার কাজে শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে, শওকত উসমানী, মুজফ্ফর আহ্মদ এবং অন্যরা যে যোগ দিয়েছিলেন একথাও মিথ্যা নয়।১
কমিউনিস্ট পার্টির মতো একটি বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা এদেশের জনগণের আন্দোলনের ভিতর দিয়ে অবশ্যই সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তবু কমিউনিস্ট মতবাদের তত্ত্ব ও ভাবধারা প্রচারের জন্য মুখপত্রের প্রয়োজন অপরিহার্য। তাই, শুরু হতেই কমিউনিস্টদের মুখপত্র প্রকাশের চেষ্টা করতে হয়েছে। সে চেষ্টায় তাঁরা বারে বারে বাধা পেয়েছেন, কিন্তু চেষ্টা কখনো ছাড়েন নি।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম মুখপত্র বার হয়েছিল ইংরেজি ভাষায় ১৯২২ সালে। এ-কাগজখানা ভারতের বাইরে জার্মানির বার্লিন নগরে ছাপা হত। নানান গোপন ঠিকানায় ডাকযোগে কাগজ আসত। এই কাগজের নাম ছিল ভারতীয় স্বাধীনতার অগ্রদূত (The Vanguard of the Indian Independence)। কিন্তু গোপনীয়তা বেশিদিন টিকিয়ে রাখা যায়নি, পোস্ট অফিসেই পুলিস খোঁজ পেয়ে গেছে যে বিদেশ থেকে কাগজখানা আসছে। তাই নিয়ে পুলিসের ছোটাছুটি বড়ো বেড়ে গেল। তখন কাগজের নাম পালটে দিয়ে শুধুই অগ্রসৈনিক (Advanced Guard) করা হল। কিন্তু পুলিসের হাঙ্গামা বেড়েই চলল। অবস্থা যখন এই রকম দাঁড়াল তখন স্থির করা হল যে প্রথম নামেই ফিরে যাওয়া যাক। তাতেও বাধার সৃষ্টি হলো। কারণ, ইতোমধ্যে অ-কমিউনিস্ট ভারতীয় নির্বাসিতেরা অধ্যাপক বিনয়কুমার সরকারের সম্পাদনায় ইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেস (Indian Independence) নাম দিয়ে একখানা কাগজ বার করে ফেলেছিলেন। অগত্যা আমাদের কাগজ শুধু ভ্যানগার্ড নামেই প্রকাশিত হতে থাকল। অনেক পরে বিদেশে ছাপা আমাদের শেষ কাগজের নাম হয়েছিল মাসেস অফ ইন্ডিয়া (Masses of India)। আমাদের এই প্রাথমিক কাগজগুলির পরিচালনা করতেন মানবেন্দ্রনাথ রায়। তবে মাসেস অফ ইন্ডিয়া-র পরিচালনার সাথে সবসময় তাঁর যোগ ছিল না। রায়ের আসল নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তিনি কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পার্টি বিরোধী কাজ করার জন্য ১৯২৯ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি হতে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন।
১৯২২ সালে দেশের ভিতরেও কয়েকখানা কাগজ বার হয়েছিল। তার মধ্যে এস.এ. ডাঙ্গের (শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গের) সম্পাদনায় প্রকাশিত সোস্যালিস্ট-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখানা ইংরেজি ভাষায় সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। দুর্ভাগ্যবশত এ-কাগজের একখানা সংখ্যাও আজ আর পাওয়া যাচ্ছে না। ডাঙ্গের সম্পাদিত সোস্যালিস্ট-এর আগে সোস্যালিস্ট নাম দিয়ে ভারতবর্ষে আর কেউ কখনও কাগজ বা বই বার করেননি।
১৯২২ সালে লাহোর হতে উর্দু ভাষায় একখানা মাসিক পত্রিকা বার হয়েছিল। তার নাম ছিল ইনকিলাব (বিপ্লব)। গোলাম হোসায়ন এ-কাগজ [কাগজখানা] সম্পাদনা করতেন। তিনি একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। সে চাকুরি ছেড়ে দিয়ে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার কাজে লেগে যান। মজুর আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি তখনকার দিনের বিখ্যাত এম ডবলিউ রেলওয়ে মজুর ইউনিয়নের সম্পাদক হন। ১৯২৩ সালে ১৮১৮ সালের তিন নম্বর রেগুলেশন অনুসারে গ্রেফতার হয়ে তিনি রাজবন্দী হলেন। পরে ১৯২৪ সালে কানপুর কমিউনিস্ট যড়যন্ত্র মোকদ্দমায় আমাদের সঙ্গে তাঁকেও যখন অভিযুক্ত করা হল তখন তিনি ভেঙে পড়লেন। শেষ পর্যন্ত মোকদ্দমা তাঁর বিরুদ্ধে চলেনি। কারণ, গভর্নমেন্টের নিকট ক্ষমা চেয়ে তিনি জেল হতে ছাড়া পেয়েছিলেন। বাংলাদেশে কবি নজরুল ইসলামের সম্পাদনায় ধূমকেতু নামক কাগজও ১৯২২ সালেই প্রকাশিত হয়েছিল। ধূমকেতু সপ্তাহে দু-বার বার হত। এর প্রথম অফিস ছিল ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে। পরে অফিস ৭ নম্বর প্রতাপ চাটুজ্যে লেনে স্থানান্তরিত হয়। ধূমকেতু সত্যই বাংলাদেশে একটা চমক লাগিয়ে দিয়েছিল। তবে, ধূমকেতু-কে কমিউনিস্ট কাগজ বলা চলে না। কার্যত সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের প্রতিই এর বেশি আবেদন ছিল। মুজফ্ফর আহ্মদ দ্বৈপায়ন জন্মনামে এই কাগজে লিখতেন এবং তাঁর লেখার আবেদন ছিল গণ-আন্দোলনের দিকে। ধূমকেতু-র লেখার জন্যই কবি নজরুল ইসলাম রাজদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন।
১৯২৫ সালে কুতবুদ্দীন আহমদ সাহেবের সম্পাদনায় একখানা উর্দু সাপ্তাহিক কাগজ কলকাতা হতে বার হয়। এ-কাগজখানার নাম ছিল মজদুর। নাম হতেই বোঝা যায় যে এখানা মজুর আন্দোলনের মুখপত্র ছিল। মজদুর ১৪-১৫ সংখ্যার বেশি প্রকাশিত হয়নি। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজে যাঁরা প্রাথমিক কাজ শুরু করেছিলেন কুতবুদ্দীন আহমদ ছিলেন তাঁদের বন্ধু। প্রথম যুগের কমিউনিস্টদের তাঁর বাড়িতে যাতায়াত ছিল। ১৯২৩ সালে তাঁর ৭ নম্বর মৌলবী লেনের বাড়ি হতেই মুজফ্ফর আহ্মদ প্রথম গ্রেফতার হয়ে ১৮১৮ সালের ৩ নম্বর রেগুলেশন (বেশাল স্টেট প্রিজনার্স অ্যাল্ট, ১৮১৮) অনুসারে রাজবন্দী হয়েছিলেন। মজদুর ছিল বাংলাদেশ হতে প্রকাশিত আমাদের প্রথম কাগজ।
বাংলাদেশ হতে প্রকাশিত আমাদের দ্বিতীয় কাগজ ছিল বাংলা ভাষায় সাপ্তাহিক লাঙল। এই কাগজের নাম বদলে পরে গণবাণী হয়েছিল। গণবাণী ও সাপ্তাহিক কাগজ ছিল। লাঙল কিংবা গণবাণী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ছিল না। সে-যুগে কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র নাম দিয়ে কোনও কাগজ বার করা সম্ভবও ছিল না। তবে দু-খানা কাগজের পরিচালনাতেই কমিউনিস্টদের হাত ছিল। লাঙল প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে। কাগজখানা শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দলের সাপ্তাহিক মুখপত্র ছিল। পরে এই দলের নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘কৃষক ও শ্রমিক দল’ (Worker s' and Peasants' Party) হয়েছিল। লাঙল-এর প্রধান পরিচালক হিসাবে নাম ছাপা হতো কাজি নজরুল ইসলামের, আর সম্পাদক হিসাবে নাম থাকত মণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের। গোড়ায় কাজি নজরুল ইসলাম সত্যই কাগজের প্রধান পরিচালক ছিলেন। বিভিন্ন উপ-শিরোনামে বিভক্ত তাঁর ‘সাম্যবাদী’ নামক বিরাট কবিতা বুকে নিয়েই লাঙল প্রথম বার হয়েছিল। তাঁর বিখ্যাত ‘সব্যসাচী’ নামক কবিতা ছাপা হয়েছিল লাঙল-এর তৃতীয় সংখ্যায় (৭ই জানুয়ারি, ১৯২৬ সাল)। কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার সাজা হতে মুক্তি পেয়ে ওই জানুয়ারি মাসেই মুজফ্ফর আহ্মদ কলকাতায় ফিরে আসেন। তারপরে ধীরে ধীরে লাঙল-এর সম্পাদনার ভার তাঁর হাতে এসে যায় এবং অন্য সব ব্যবস্থার দিকটা দেখতে লাগলেন আবদুল হালিম। আবদুল হালিমের বড়ো ভাই শামসুদ্দীন হোসায়ন সাহেবও তখন এ-কাগজে ছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত ক-মাসের ভিতরেই তিনি মারা যান।
লাঙল-এ নানান রকম লেখা বার হয়েছে, কৃষকের দাবি ও প্রজাস্বত্ব আইন প্রভৃতির ওপরে লেখা তো বার হয়েছেই, কার্ল মার্কসের শিক্ষার ওপরেও তাতে লেখা বার হয়েছে। ভারতবর্ষের ওপরেও মার্কসের লেখা পত্রাবলীরও কিছু কিছু অনুবাদ লাঙল-এ ছাপা হয়েছে। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের ম্যাক্সিম গোর্কির মা-এর অনুবাদও প্রথমটায় লাঙল-এ ছাপিয়েছিলেন। হেমন্তকুমার সরকারের (তিনি ‘কৃষক ও শ্রমিক দলের’ প্রতিষ্ঠাতাদের একজন ছিলেন) প্রেরণায় সুভাষচন্দ্র বসুর কোষ্ঠী পর্যন্ত লাঙল-এ ছাপা হয়েছে। দেশে তখন একটা সাম্প্রদায়িক আবহাওয়া বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল। হিন্দু মহাসভা, হিন্দু সংগঠন ও তন্জীম প্রভৃতি নানান রকম সাম্প্রদায়িক সংগঠন তখন গড়ে উঠেছিল দেশে। তার প্রকাশ পেল ১৯২৭ সালে কলকাতার হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায়। এই বিষাক্ত হাওয়ার মধ্যেই কৃষ্ণনগরে প্রাদেশিক রাজনীতিক সম্মেলনের অধিবেশন হয়েছিল। তার জন্যে নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন তাঁর ‘দুর্গম গিরি কাতার মরু…’ নামের গান। লাঙল-এর মূল সুর তাই হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রচার করা। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নানান দিক থেকে নানানভাবে লাঙল ওই কথাই বারে বারে বলেছে। মজুর ও কৃষকদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা তো হয়েছেই।
লাঙল কৃষকদের প্রতীক। কাগজের লাঙল নাম হওয়াতে অনেকে ভাবতেন যে কাগজখানা কৃষকদেরই মুখপত্র। কাগজখানাকে যেভাবে পরিচালনা করা হত তাতে তা মেহনতী জনসাধারণের মুখপত্রেরই রূপ নিয়েছিল। তাই ঠিক করা হল যে লাঙল-এর নাম পরির্বতন করে গণবাণী করা হবে।
১৯২৬ সালের ১২ই আগস্ট তারিখে গণবাণী-র প্রথম সংখ্যা বার হয়েছিল। লাঙল-এর সম্পাদক হিসাবে শ্রীমণিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের নাম ছাপা হত অথচ সম্পাদনা তিনি করতেন না। একবার তিনি তাতে আপত্তিও তুললেন। তখন তাঁর নাম বাদ দিয়ে আমাদের এক বন্ধু শ্রীগঙ্গাধর বিশ্বাসের নাম মুদ্রক ও প্রকাশকরূপে ডিক্লারেশন নেওয়া হয়েছিল এবং সম্পাদক হিসাবেও তাঁর নামই ছাপা হত। এইভাবে গোঁজামিল দিয়ে কাজ চালানোতে অসুবিধা আছে বুঝতে পেরে গণবাণী-র ডিক্লারেশন মুজফ্ফর আহ্মদের নামেই নেওয়া হল, আর তিনিই যখন কাগজের সম্পাদনা করছিলেন তখন সম্পাদক রূপেও তাঁরই নাম ছাপা হতে থাকল। ১৯২৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেশের আবহাওয়া বিষিয়ে দিয়েছিল। সম্পাদকের মুসলিম নাম হওয়ায় অনেকেই কাগজখানা ছুঁতে চাইতেন না। তখন মুজফ্ফর আহ্মদের সঙ্গে সম্পাদকরূপে শ্রীপ্যারীমোহন দাস নামক এক বন্ধুর নাম জুড়ে দেওয়া হল। পরে শ্রীপ্যারীমোহন দাসের স্থলে শ্রীকালীকুমার সেনের নাম যোগ করা হয়েছিল। বন্ধ হয়েছে, বার হয়েছে, আবার বন্ধ হয়েছে, আবার বার হয়েছে, এইভাবে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত গণবাণী চলেছিল। ১৯২৭ ও ১৯২৮ সাল মজুর সংগ্রামের যুগ ছিল। সে সম্বন্ধে গণবাণী-তে যথেষ্ট লেখা বার হত। কৃষকদের সম্বন্ধেও গণবাণী-তে যথেষ্ট আলোচনা হত। মার্কস-এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট ইস্তেহার-এর বাংলা তরজমা গণবাণী-তে ছাপা হয়েছিল। রজনীপাম দত্তের মডার্ন ইন্ডিয়া নামক পুস্তকের বাংলা তরজমা ‘বর্তমান ভারত’ নাম দিয়ে গণবাণী-তে ছাপা হচ্ছিল। এই রকম আরও অনেক লেখা গণবাণী-তে ছাপা হয়েছে। তার মধ্যে এলিসনের ‘মজুর-সংঘবাদ’ (Trade Unionism) লেখাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ব্রিটেনের খনি-শ্রমিক ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন; ভারতের কমিউনিস্টদের সাহায্য করতে এসে দেড় বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তিনি এখন আর বেঁচে নেই। কাগজের সম্পাদকীয়গুলিতে বেশিরভাগ জোর দেওয়া হত ভারতের পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ওপরে। কারণ, ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতরে ভারতের ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন লাভের দাবি ধরেই বসেছিল।
সন্তোষ সিং নামক একজন পাঞ্জাবি কমরেড আমেরিকা হতে মস্কো এসে ওখানকার প্রাচ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন শিক্ষালাভ করেন। দেশে ফিরে এসে তিনি গুরুমুখী হরফে পাঞ্জাবি ভাষায় একখানা মাসিক কাগজ বার করেছিলেন। এই কাগজের নাম ছিল কির্তি। আমাদের পাঞ্জাবি-ভাষী কমরেডরা মজুরের প্রতিশব্দ রূপে কির্তি কথা ব্যবহার করতেন। যতটা মনে পরে ১৯২৫ সালের শেষাশেষিতে কিংবা ১৯২৬ সালের শুরুতে এই কাগজখানা বার হয়েছিল। যক্ষ্যা রোগাক্রান্ত হয়ে সন্তোষ সিং মারা যান। তারপরে কাগজখানা সম্পাদনার ভার পড়ে সোহন সিং জোসের ওপরে। কির্তি পরে পাঞ্জাবি ও উর্দু ভাষাতেই বার হত। পাঞ্জাবে শ্রমিক কৃষক দলের নাম হয়েছিল ‘কিরতি কিসান পার্টি’।
১৯২৭ সালে লাহোর হতে উর্দুভাষায় মেহনত্কশ (মেহনতকারী) নাম দিয়ে একখানা সাপ্তাহিক কাগজ বার হয়েছিল। মীর আবদুল মজীদ ও গওহর রহমান এই কাগজের পরিচালনা করতেন। দুজনই মস্কোতে শিক্ষালাভ করেছিলেন এবং ১৯২৩ সালে পেশোয়ার কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় সাজা পেয়েছিলেন। মীর আবদুল মজীদ পরে মিরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায়ও অভিযুক্ত ও দণ্ডিত হয়েছিলেন।
১৯২৭ সালে বোম্বেতে ‘ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পেজান্টস্ পার্টি’ গঠিত হয়। পার্টির প্রথম সেক্রেটারি হলেন এস এস মিরাজকর। এই পার্টির মুখপত্র রূপে মিরাজকরের সম্পাদনায় ত্রান্তি বার হল। ক্রান্তি ছিল মারাঠি ভাষায় সাপ্তাহিক পত্রিকা। পরে কিছুদিন ডাঙ্গেও এই কাগজের সম্পাদনা করেছিলেন।
সিঙ্গারাবেলু চেট্টিয়ার মাদ্রাজ হতে মাঝে মাঝে একখানা ইংরেজি সাপ্তাহিক বার করতেন। এই কাগজের নাম এখন কিছুতেই আমার মনে পড়ছে না।
১৯২৯ সালের মার্চ মাসের ২০ তারিখে কমিউনিস্টদের ওপরে প্রচণ্ড আঘাত এল। এই তারিখে সারা ভারতে কমিউনিস্ট নেতৃত্বগণ গ্রেফতার হলেন মিরাট কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার সংস্রবে। মোকদ্দমা চলতে থাকল। পৃথিবীর ইতিহাসে দীর্ঘতম রাজকীয় মোকদ্দমা (State trial) কিন্তু কমিউনিস্টদের কাজ বন্ধ হল না। কিছু কিছু কাগজও তাঁরা চালাতে থাকলেন। হ্যাঁ, বলতে ভুলে গেছি যে, ওয়াসে মজদুর (মজুরের বাণী) নামক একখানা উর্দু কাগজও কিছুদিন বোম্বে হতে বার হয়েছিল। ১৯২৯ সালের ২৬শে জানুয়ারি তারিখে, অর্থাৎ প্রথম স্বাধীনতা দিবসে বোম্বে হতে ওয়ার্কার্স উইকলি (Workers' Weekly) নাম দিয়ে একখানা সাপ্তাহিক ইংরেজি কাগজ বার হয়েছিল। কাগজের নামের ওপরে লেখা থাকত ‘দুনিয়ার মজুর এক হও’, আর নামের নিচে লেখা থাকত ‘সংগ্রামী মজুরশ্রেণির মুখপত্র’ (The Organ of Militant Working Class)। অন্য সব কমিউনিস্ট কাগজের মতো এ-কাগজখানাও দীর্ঘকাল চালু থাকেনি, তবে অনেক সপ্তাহ চলেছে।
১৯৩১ সালের ২৪শে ডিসেম্বর তারিখে কলকাতার ৪১ নম্বর জাকারিয়া স্ট্রিট হতে একখানা ক্ষুদ্রায়তনের সাপ্তাহিক কাগজ বার হয়। এ-কাগজখানার নাম ছিল চাষী-মজুর। সম্পাদকের নাম ছিল বৈদ্যনাথ মুখার্জি। তিনি কাগজে তেমন কিছু লিখতেন না, তবে তাঁকে এই কাগজের জন্য জেল খাটতে হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত তাঁর খাদ্য বিষাক্ত হওয়ায় তিনি মারা যান। এ-কাগজের সম্পাদনা ও পরিচালনায় ছিলেন আবদুল হালিম, সোমনাথ লাহিড়ী, ডাক্তার নূর মোহম্মদ ও ডাক্তার অতুলচন্দ্র প্রমুখ। চাষী-মজুর-এর একটি বৈশিষ্ট্য এই ছিল যে কলকাতার ৪১ নম্বর জাকারিয়া স্ট্রিটের ২৫ নম্বর ঘর হতে কাগজখানা বার হত। এই ২৫ নম্বর ঘরের কথা কেউ হয়তো একদিন লিখবেন। এখানে তার স্থানাভাব।
বাংলা ১৩৪০ সনের কার্তিক মাসে মার্কসবাদী নামে একখানা মাসিক পত্রিকা বার হয়েছিল। প্রথম সংখ্যা বার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিন হাজার টাকার জামিন তলব করা হয়। কমিউনিস্টদের পক্ষে এত টাকা জামিন দেওয়া অসম্ভব ছিল। কাজেই, প্রথম সংখ্যার পরেই কাগজ বন্ধ হয়ে গেল। তারপরে বাংলা ১৩৪০ সালের অগ্রহায়ণ মাসেই আবদুল হালিমের সম্পাদনায় মার্কসপন্থী নামে আর একখানা মাসিক পত্রিকা বার করা হয়। মার্কসপন্থী পরে পরে ছয় সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। ১৩৪১ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যাটিই ছিল এর শেষ সংখ্যা। এই সংখ্যাটি ছিল ১৯৩৪ সালের বিশেষ ‘মে-দিবস সংখ্যা’। সরকার এই ‘মে-দিবস সংখ্যা’-কে বরদাস্ত করতে পারল না। তাই, মার্কসপন্থী-র নিকট হতেও দু-হাজার টাকার জামিন তলব করা হল। কাগজ বন্ধ হয়ে গেল।
১৩৪১ (খ্রী: ১৯৩৪ সাল) বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাসে প্রকাশিত হল মাসিক গণশক্তি। গণশক্তি-র মুদ্রক ও প্রকাশক ছিলেন মনোরঞ্জন রায়, আর সম্পাদক ছিলেন সরোজ মুখার্জি। এই কাগজেরও পাঁচ সংখ্যার বেশি বার হয়নি। গভর্নমেন্ট সম্পাদক এবং মুদ্রাকর-প্রকাশকের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা চালাল। বিচারে সরোজ মুখার্জির আঠারো মাসের সশ্রম কারাদণ্ড হল, আর মনোরঞ্জন রায়ের হল এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। কাগজ যে বন্ধ হয়ে গেল একথা বলাই বাহুল্য। হ্যাঁ, মনোরঞ্জন রায় কিন্তু আজকার ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের মনোরঞ্জন রায় নন, তিনি দর্শনের ইতিবৃত্ত নামক গ্রন্থের লেখক মনোরঞ্জন রায়। ১৯৩৭ সালে কলকাতা হতে কমিউনিস্টরা উর্দু ও হিন্দিতে দু-খানা মজুর আন্দোলনের কাগজ বার করেন, উর্দু কাগজখানার নাম ছিল রফীক, আর হিন্দি কাগজের নাম সাথী। কিছুদিন চলার পরে কাগজ দু-খানা বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৩৮ সালের আগস্ট মাসে নব পর্যায়ের গণশক্তি প্রকাশিত হল। এর মুদ্রক, প্রকাশক ও সম্পাদক আগেকার মতো মনোরঞ্জন রায়ই হলেন। নব পর্যায়ের গণশক্তি-ও কয়েক সংখ্যা মাত্র বার হয়েছিল। বাংলাদেশে গণশক্তি-র পরের কাগজ ছিল সাপ্তাহিক আগে চলো। আগে চলো-র নমুনা সংখ্যা বার হয়েছিল ১৯৩৯ সালের ২৯শে এপ্রিল তারিখে। সম্পাদক ছিলেন আবদুল হালিম। কয়েক সংখ্যা বার হওয়ার পরে সরকারি অস্ত্র মাথার উপরে উদ্যত হওয়ায় আগে চলো বন্ধ হয়ে যায়। বলা বাহুল্য, কমিউনিস্টদের বেশিরভাগ কাগজই সরকারি জুলুমে বন্ধ হয়েছে।
বাংলায় আগে চলো-র পরের কাগজ হল সাপ্তাহিক জনযুদ্ধ যুদ্ধের সময়ে বার হয়েছিল। তারও পরের কাগজ হচ্ছে দৈনিক স্বাধীনতা। ১৯৪৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর তারিখে প্রথম প্রকাশিত হয়। ১৯৪৮-৪৯ সালে আরও কী-সব কাগজ বার হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালিত কাগজগুলির মধ্যে সম্ভবত স্বাধীনতা-ই দীর্ঘতম আয়ু লাভ করেছে। ১৯৩৬ সালে আমরা মাদ্রাজে ইংরেজি মাসিক নিউ এজ-এর পরিচালনার ভার গ্রহণ করি। অনেকদিন চলার পর কাগজখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার বের হচ্ছে। ১৯৩৭ সালে বোম্বে থেকে বার হয় ইংরেজি সাপ্তাহিক ন্যাশনাল ফ্রন্ট (National Front)। যুদ্ধের শুরুতে ন্যাশনাল ফ্রন্ট বন্ধ হয়ে যায়। তারপরে বার হয় সাপ্তাহিক পিপলস্ ওয়ার (People's War)। সাপ্তাহিক পিপলস্ ওয়ার-এর নাম পরে পিপলস্ এজ (People's Age) হয়ে যায়। এখন বার হচ্ছে ইংরেজিতে সাপ্তাহিক নিউ এজ। ওপরে যে কাগজগুলির নামোল্লেখ করেছি সেগুলি ছাড়াও ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ হতে বিভিন্ন ভাষায় আমাদের আরও অনেক কাগজ বার হয়েছে। সব কাগজের নাম এখানে দিতে পারা গেল না। এখনও প্রায় সব রাজ্য হতেই আমাদের কোনও-না-কোনও কাগজ বার হচ্ছে। বেজওয়াদা [বিজয়ওয়াদা] থেকে তেলুগু দৈনিক বিশাল অন্ধ্র প্রকাশিত হচ্ছে। আমাদের তামিল কাগজ জনশক্তি এখন মাদ্রাজ থেকে দৈনিক বার হচ্ছে। কেরালা দৈনিক— দেশাভিমানী, নবযুগম ও লোকমুগম।
বোম্বে থেকে বার হচ্ছে মারাঠি সাপ্তাহিক যুগান্তর। পাঞ্জাব (ভারত) হতে উর্দু দৈনিক নয়া জমানা বার হচ্ছিল। এখন তার জায়গায় একখানা পাঞ্জাবি দৈনিক (গুরুমুখী হরফে) বার হচ্ছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। ১৯২১ পর থেকে যে-সব কাগজ আমরা বার করেছি সে-সবের অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিতে গিয়েই অনেক জায়গা লেগে গেল। পুরোনো কাগজগুলি বারে বারে পুলিস তল্লাশির ফলে দুষ্প্রাপ্য হয়ে গেছে। কিছু কিছু কাগজ জোগাড় হয়েছিল। সে-সব থেকে কিছু কিছু উদ্ধৃতি দিতে পারলে বুঝতে পারতেন কী ধরনের লেখা তখনকার দিনে বার হতো। কিন্তু কোনও উপায় নেই। এমনিতেই এই লেখাটি অত্যন্ত দীর্ঘ হয়ে গেছে।
অশেষ দুঃখকষ্টের ভিতর দিয়ে কমিউনিস্টদের কাজ করতে হয়েছে। তাঁদের না-ছিল থাকার জায়গা, না-ছিল খাওয়া-পরার ব্যবস্থা, তবু তাঁরা দুঃসাহসে ভর করে এত সব কাগজ বার করতে পেরেছিলেন। জানি, তাঁদের সম্পাদনা ও পরিচালনায় ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল, কিন্তু তাঁদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার অভাব ছিল না। তাই, তাঁরা ভারতের ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট এবং দেশিয় জমিদার ও ধনিকশ্রেণির প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও টিকে থাকতে পেরেছিলেন এবং আজও টিকে আছেন।
টীকা-
১। শওকং উসমানী পরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি হতে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন—লেখক
সূত্র- মুজফ্ফর আহ্মদ, সমকালের কথা, এনবিএ প্রাঃ লিঃ, কলকাতা।
প্রকাশের তারিখ: ০২-আগস্ট-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
