সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
অভ্যুত্থানের ৫০ বছরে চিলি
টিম মার্কসবাদী পথ
চিলির কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে আক্রমণ নতুন নয়। ১৯১২-তে ওয়ার্কার্স পার্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর ১৯২২ সালে নাম পরিবর্তন করে কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯২৭-৩১ প্রথম নিষিদ্ধ করা হয়। তারপর আবার। ১৯৪৮-৫৮। ১৯৭৩, সামরিক অভ্যুত্থানের এগারো দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর দেশের সমস্ত মার্কসবাদী পার্টিকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সামরিক বাহিনী হত্যা করে কমিউনিস্ট পার্টির ৬ জন সদস্যকে। ১১ জন এখনও নিখোঁজ। যেমন অভ্যুত্থানের পর বেশ কয়েকবছর কারগারে বন্দি রেখে গুয়েলার্মো টিলিয়ারকে অকথ্য অত্যাচার করা হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তখনও কমিউনিস্ট পার্টি ছিল নিষিদ্ধ।

বিপদের মুখে চিলির গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ। সতর্ক করে দিয়েছে চিলির কমিউনিস্ট পার্টি। পার্টির সাধারণ সম্পাদক লাউতারো কারমোনা বলেছেন, জটিল-কঠিন এই সময়ে এখন ‘কমিউনিস্ট পার্টিকে দরকার চিলির’।
১১ সেপ্টেম্বর চিলিতে সেনা অভ্যুত্থানের ৫০ বছর। পঞ্চাশ বছর আগে এই দিনে মার্কিন মদতে সেনা অভ্যুত্থানে অপসারিত করা হয় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সোস্যালিস্ট রাষ্ট্রপতি সালভাদোর আলেন্দেকে। তারপর দুনিয়া দেখে স্বৈরাচারী সামরিক শাসক জেনারেল অগাস্তো পিনোচেতের জমানা। ১৯৮০, চিলির ওপর নতুন সংবিধান চাপিয়ে দেন তিনি। ওই সংবিধানই ঠিক করে দেয়: দেশ চলবে নয়া উদারনীতিতে। ১৯৯০, স্বৈরতন্ত্রের অবসান হলেও, তারপর আট-বছর তিনি ছিলেন সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ। অবসর নেওয়ার পর আরও বারো-বছর ছিলেন চিলির সংসদের উচ্চকক্ষ সেনেটের দাপুটে সদস্য। এই সময়ে ৩৩-বার সংবিধান সংশোধন হয়েছে। কিন্তু বেসরকারিকরণের সঙ্গে জড়িত নয়া উদার কাঠামো থেকে গিয়েছে জীবন্ত। অটুট থেকে গিয়েছে নয়া উদারবাদের মডেল। এই বিশ্বের সবচেয়ে অসাম্যের দেশগুলির অন্যতম চিলি। ন্যাশনাল স্ট্যাটিসটিক্স ইনস্টিটিউটের হিসেবে চিলির শ্রমজীবীদের অর্ধেকের মাসিক আয় ৫৫০ ডলারের কম। ২০১৮ সালের সরকারি হিসেবে ধনীশ্রেষ্ঠদের আয় হতদরিদ্রদের চেয়ে ১৩.৬ শতাংশ বেশি।
গত তিরিশ বছরে লাতিন আমেরিকা ৫৬টির বেশি অভ্যুত্থানের সাক্ষী। চিলি যখন অভ্যুত্থানের ৫০ বছর পালন করবে, তখন পেরুর অভ্যুত্থানের একবছর। বলিভিয়ার সাম্প্রতিকতম অভ্যুত্থানের তিনবছর। হুন্ডুরাসের ১৪ বছর। ভেনেজুয়েলার ২২ বছর। অভ্যুত্থানের ৫০ বছরে ‘চিলির ও বিশ্বের জনগণের কাছে’ চিলির কমিউনিস্ট পার্টির ইশ্তেহারে দৃপ্ত ঘোষণা: ‘আলেন্দে দীর্ঘজীবী হোক! আমরা জিতব হাজারো বার!’
অক্টোবর, ২০২০। নেরুদা, ভিক্টর হারা, আলেন্দের চিলিতে ইতিহাসের নতুন পাতা। পিনোচেতের সংবিধান বদলে নতুন সংবিধান চেয়ে বিপুল জনাদেশ। মেকিস্কোর বামপন্থী দৈনিক ‘লা জর্নাদা’র ভাষায়, ‘নয়া উদারবাদের অবসান’। গণভোটে ৭৮ শতাংশ মানুষ রায় দেন নতুন সংবিধানের পক্ষে। কমিউনিস্ট-সহ প্রগতিশীলদের ডাকে সাড়া দিয়ে নতুন সংবিধান তৈরিতে সরাসরি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মঞ্চকেই বেছে নেন ৭৯ শতাংশ (প্রেনসা লাতিনা)। জয়ের আনন্দে রাতভর রাস্তায় মানুষ। সান্তিয়াগোর প্রাণকেন্দ্রের ঢাউস ব্যানার: ‘বিদায় জেনারেল! আমি নতুন সংবিধান চেয়েছি আমার শ্রেণির জন্য।’ পিনোচেতের সংবিধানের বদল চেয়ে এই ছিল প্রতিবাদীদের ব্যানারের প্রত্যয়ী বার্তা। তারই রেশ ধরে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে নির্বাচিত হন মধ্য-বাম জোটের রাষ্ট্রপতি ৩৫-বছরের গ্যাব্রিয়েল বোরিক।
সেই চিলি আজ কোথায় দাঁড়িয়ে?
পিনোচেত-জমানার সংবিধান নতুন করে লেখার জন্য এই মে মাসের শুরুতে ছিল সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন। ৫০-সদস্যের সেই সাংবিধানিক পরিষদের ২৩টি আসনেই জিতেছে ‘চিলির বোলসোনারো’ নয়া নাৎসী প্রার্থী আন্তোনিও কাস্তের উগ্র দক্ষিণপন্থী দল রিপাবলিকান পার্টি। সমর্থনের হার ৩৫ শতাংশ। যে কাস্ত বরাবর সংবিধান পরিবর্তনের বিরোধিতা করে এসেছেন, যিনি মনে করেন ‘চিলির জন্য এর কোনও প্রয়োজন নেই’! রিপাবলিকানদের হাতে ২৩টি আসনের অর্থ তাঁরা যেমন খুশি সংবিধানের খসড়া তৈরি করতে পারবেন। কারো সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, বোঝাপড়ার দরকার নেই। সঙ্গে আছে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা।
আরেকটি দক্ষিণপন্থী জোট সেফ চিলি ইউনাইট জিতেছে ১১টি আসনে, সমর্থনের হার ২০ শতাংশ। সবমিলিয়ে দক্ষিণপন্থীদের আসন সংখ্যা ৩৪, সমর্থনের হার ৫৫ শতাংশ।
বিপরীতে, সরকারে থাকা মধ্য-বাম জোট (যাতে রয়েছে চিলির কমিউনিস্ট পার্টি) পেয়েছে ১৬টি আসন। সমর্থনের হার ২৮.৬ শতাংশ। কমিউনিস্ট পার্টি জিতেছে ২টি আসনে, সমর্থনের (৮ শতাংশ) নিরিখে তৃতীয় বৃহত্তম দল। ১১১-বছরের কমিউনিস্ট পার্টি সরকারের অংশ। এই নিয়ে চারবার তারা সরকারের অংশ। যেমন ছিল সালভাদোর আলেন্দের পপুলার ইউনিটি সরকারের (১৯৭০-৭৩) সময়ে। ৭ মে ফলাফল ঘোষণার পর চিলির কমিউনিস্ট পার্টির সদ্য প্রয়াত সভাপতি গুয়েলার্মো টিলিয়ার বলেছিলেন, ‘তুমুল কমিউনিস্ট-বিরোধী প্রচারাভিযান, ব্যাপক কর্পোরেট সহায়তা, আর কর্পোরেট মিডিয়ার প্রচারের তুফানের মুখে এই জয় রীতিমতো তাৎপর্যপূর্ণ।’
চিলির কমিউনিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে আক্রমণ নতুন নয়। ১৯১২-তে ওয়ার্কার্স পার্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর ১৯২২ সালে নাম পরিবর্তন করে কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯২৭-৩১ প্রথম নিষিদ্ধ করা হয়। তারপর আবার। ১৯৪৮-৫৮। ১৯৭৩, সামরিক অভ্যুত্থানের এগারো দিন পর ২২ সেপ্টেম্বর দেশের সমস্ত মার্কসবাদী পার্টিকেই নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সামরিক বাহিনী হত্যা করে কমিউনিস্ট পার্টির ৬ জন সদস্যকে। ১১ জন এখনও নিখোঁজ। যেমন অভ্যুত্থানের পর বেশ কয়েকবছর কারগারে বন্দি রেখে গুয়েলার্মো টিলিয়ারকে অকথ্য অত্যাচার করা হয়। মুক্তি পেয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করেন। তখনও কমিউনিস্ট পার্টি ছিল নিষিদ্ধ। পার্টির সশস্ত্র শাখা (এল ফ্রেন্তে পাতরিওতিকো ম্যানুয়েল রডরিগুয়েজ) এবং বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্বে শেষে ১৯৯০-তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ২৯ আগস্ট ৭৯-বছর বয়েসে সান্তিয়াগোতে তিনি প্রয়াত হয়েছেন। তার আগে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে পার্টির মুখপত্র এল সিগলো’র জন্য লিখেছিলেন ‘পঞ্চাশ বছর পর, গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম’। গত রবিবার তা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ৩১ আগস্ট তাঁকে সমাধিস্ত করা হয় রিকোলেতার ঐতিহাসিক কবরস্থানে, যেখানে সমাধিস্থ করা হয়েছে সালভাদোর আলেন্দে, ভিক্টর হারার মতো মানুষদের।
নির্বাচনে প্রায় ১৭ শতাংশ ভোট বাতিল হয়, যে দেশে ভোটদান বাধ্যতামূলক! টিলিয়ার সেদিন বলেছিলেন, ‘যদি এইসব তথাকথিত বামপন্থী শক্তি বামপন্থীদের ভোট দিতেন, তবে ফলাফল অন্যরকম হতো।’ সেইসঙ্গেই তিনি জানিয়েছিলেন, ‘দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ ঘোর বিপদের মুখে। আমরা আমাদের সর্বোত চেষ্টা করব। হবে কঠিন লড়াই। পরিস্থিতি কোন দিকে গড়ায়, সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব।’ এই মুহূর্তে কমিউনিস্টদের কর্তব্য হল ‘এই কঠিন সময়ে সরকারের সঙ্গে থাকা, সরকারের কাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কোনও সন্দেহ নেই খুবই জটিল পরিস্থিতির মধ্যে সরকার রয়েছে। তবে সরকারের কাজগুলি রূপায়িত করতে হবে দলগুলির যৌথ প্রচেষ্টায়।’
আন্তোনিও কাস্ত আকাশ থেকে পড়েননি। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ছিলেন চিলির সংসদের সদস্য। উগ্র দক্ষিণপন্থী ইন্ডিপেনডেন্ট ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের (ইউডিআই) নেতা, যে দল ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ছিল পিনোচেতের ফ্যাসিস্ত-সামরিক স্বৈরাচারের সঙ্গে। তাঁর বাবা মাইকেল কাস্ত ছিলেন হিটলারের নাৎসী দলের দলের সদস্য। নাৎসী বাহিনীর লেফটেন্যান্ট। জার্মান বাহিনীর হয়ে ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ইতালিতে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে পালিয়ে এসেছিলেন চিলিতে। তাঁর এক ছেলে মিগুয়েলকে পিনোচেত প্রথমে শ্রমমন্ত্রী করেন। পরে তাঁকে সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট করেন। মিগুয়েল ছিলেন মিলটন ফ্রিডম্যানের তথাকথিত ‘শিকাগো বয়েজে’র একজন। আরেক ছেলে ক্রিস্টান কাস্ত ছিলেন পিনোচেত জমানায় কৃষক গণহত্যার সঙ্গে জড়িত। আর আন্তোনিও বরাবর ছিলেন চিলির নতুন সংবিধান লেখার জন্য গণভোটের বিরুদ্ধে।
এহেন কাস্তকে হারিয়েই ২০২১ সালের ডিসেম্বরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন মধ্য-বাম জোটের প্রার্থী গ্যাব্রিয়েল বোরিক। যে নির্বাচনের প্রচারেও কাস্ত অকপটে বলেছিলেন, ‘আমি পিনোচেতবাদী নই, তবে উনি যা করেছেন, তাঁর মূল্য দিই।’ তাঁর মতে, পিনোচেতের স্বৈরতন্ত্র ‘আধুনিক চিলির ভিত তৈরি করেছে।’
মধ্য-বাম জোটের রাষ্ট্রপতি বোরিক ক্ষমতায় আসার পরেই সংবিধানের নতুন খসড়া তৈরির কাজ শুরু করেন। গতবছর ৪ সেপ্টেম্বরের গণভোটে ৬২ শতাংশ মানুষ সেই খসড়া প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে। পরিস্থিতি নতুন করে জটিল হয়। যার ফলে এবছর মে মাসে একটি নতুন সাংবিধানিক পরিষদের নির্বাচন করতে হয়। এখন পরিষদের তৈরি নতুন খসড়া নিয়ে গণভোট হবে এবছর ১৭ ডিসেম্বর। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নতুন খসড়াটি হতে চলেছে আরও দক্ষিণপন্থী, যেমন রিপাবলিকানরা নিষিদ্ধ করতে পারেন গর্ভপাতকে।
কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির দৈনিক মুখপত্র গ্রানমা’য় শিরোনাম ‘চিলি, সবচেয়ে জটিল পথে’।
তবে সাংবিধানিক পরিষদের তৈরি খসড়া যেমনই হোক, তাকে অনুমোদন করাতে হবে গণভোটে। ডিসেম্বরের জনাদেশ সেকারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যেই চিলির সংসদের দুই কক্ষই সাপ্তাহিক শ্রমঘণ্টা কমানোর বিলকে অনুমোদন করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থার সংস্থার সুপারিশ মেনে ৪৫ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে করা হয়েছে ৪০ ঘণ্টা। সংসদের নিম্মকক্ষ চেম্বার অব ডেপুটিজে পক্ষে ভোট পড়েছে ১২৭। বিপক্ষে ১৪, ভোটদানে বিরত ছিলেন ৩ জন। ২০১৭-তে এই বিল প্রথম উত্থাপন করেছিলেন কমিউনিস্ট প্রতিনিধিরা। গত মার্চে সংসদের উচ্চকক্ষ সেনেটে তা পাস হয়ে গিয়েছে। এখন রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের অপেক্ষায়। নতুন আইনে ওভারটাইমের সময়সীমাও কমানো হয়েছে।
কমিউনিস্ট-সহ বামপন্থীরা লড়াইয়ে রয়েছেন। সংসদের ভিতরে, সংসদের বাইরে লড়াই-সংগ্রামকে তীব্র করছেন। আলেন্দে হত্যার পঞ্চাশ বছরে গণতন্ত্রের সামনে সমূহ বিপদকে মানুষের কাছে তুলে ধরছেন।
প্রকাশের তারিখ: ১১-সেপ্টেম্বর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
