সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ট্রাম্পের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ নস্যাৎ করে টিকে রয়েছে ভেনেজুয়েলার বিপ্লব
মানোলো ডে লস স্যান্টোস
আজ ভেনেজুয়েলা ‘ব্রেস্ট-লিস্টভস্ক’ মুহূর্তের মুখোমুখি। একদিকে দক্ষিণপন্থী সরকারগুলির মধ্যে ভেনেজুয়েলা একা হয়ে পড়েছে। এই দেশ প্রায় সর্বাত্মক অবরোধের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবের মূল নেতৃত্ব গুরুত্ব দিচ্ছেন ভবিষ্যতের সংগ্রামের বাহিনীর পশ্চাদভাগের ঘাঁটি হিসাবে এই রাষ্ট্র যেন টিকে থাকতে পারে। এই প্রেক্ষিতে পিএসইউভি ও ভেনেজুয়েলা সরকার যে বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে তা হল, বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতাকে রক্ষা করা। ১৯৯২-এর বিদ্রোহের ব্যর্থতার পর কমান্দান্তে হুগো শাভেজ যেমনটা বলেছিলেন, ‘আজ আমাদের অবশ্যই পশ্চাদপসরণ করতে হবে আগামী দিনের অগ্রগতির স্বার্থে।’

ভেনেজুয়েলার বলিভারীয় বিপ্লবের বিরোধিতায় গত ২৫ বছর ধরে শাসন বদলের যে চেষ্টা করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার, গুণগত বদল হয়েছে সেখানে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন অ্যাবসলিউট রিসলভ’ অভিযান ‘কার্যকর করেছে’। একেবার পরিকল্পনা মাফিক হামলা চালিয়ে বোমাবর্ষণ করেছে এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অবৈধভাবে অপহরণ করে নিয়ে গেছে। এটা যেমন একদিকে গভীর সঙ্কটের মুহূর্ত সৃষ্টি করেছে, তেমনই পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীর স্পষ্টতাও এনে দিয়েছে। সারা বিশ্বের বিপ্লবী শক্তিগুলির এখন দরকার পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট বিশ্লেষণ করা যাতে প্রচারের বিভ্রান্তি এড়ানো যায়, শক্তির ভারসাম্যকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বোঝা যায় এবং সামনে এগোনোর রাস্তা তৈরি করা যায়।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের পিছনে বাস্তব পরিস্থিতি
অভিযানের আগে মার্কিন সাম্রাজ্যের বিপুল সামরিক ক্ষমতার বিষয়ে প্রচুর কথাবার্তা হচ্ছিল। তবে মার্কসবাদীদের উচিত বিভিন্ন শক্তিগুলির মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে, একেবারে গোড়ায় সেই আলোচনা করা। খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, ট্রাম্প প্রশাসনকে এই অভিযান যেভাবে চালাতে হয়েছে তাতেই স্পষ্ট সাম্রাজ্যবাদের দুর্বলতা কোথায়। ভেনেজুয়েলায় তাদের দুর্বলতা কোথায়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা কোথায়, নিজেদের দেশে তাদের দুর্বলতা কোথায়।
পুরোপুরি আগ্রাসন চালানোর বদলে ট্রাম্প শিবির যে ভাবে এই অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা আসলে সংগঠিত গণ প্রতিরোধের প্রমাণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দুটি বিষয়:
ভেনজুয়েলায় গণ জমায়েত: প্রেসিডেন্ট মাদুরো বলিভারিয় মিলিশিয়ার শক্তিবৃদ্ধির জন্য তাদের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর জেরে ৮০ লক্ষাধিক নাগরিকের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছে। এদের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার পেশাদার সেনাবাহিনীকে যুক্ত করার ফলে, যে বাহিনী পুরোপুরি অটুট রয়েছে, এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে যদি মার্কিন স্থলসেনা অভিযান শুরু করে তাহলে প্রতিরোধের বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধে পরিণত হবে। সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যে রাজনৈতিক ও বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি সইতে হবে সেটা তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না। শাভজের দর্শন ও বলিভারীয় বিপ্লবের পক্ষে একটা বিরাট শক্তির সমর্থন রয়েছে। সেই বিষয়টা কৌশলে ট্রাম্প প্রশাসন স্বীকার করে নিয়েছে এ কথা বলে যে, ‘বাস্তববাদ’কে অবশ্যই মানতে হবে। ওরা আসলে মেনে নিয়েছে যে, দেশ চালানোর মতো সমর্থন ভেনেজুয়েলার দক্ষিণপন্থীদের নেই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিরোধিতা: সামরিক এই আগ্রাসনের তীব্র বিরোধিতা করেছেন ব্যাপক সংখ্যক মানুষ। এদের মধ্যে রয়েছেন নানান রাজনৈতিক ধারার লোকজন। এমনকি ট্রাম্পের যারা সমর্থক তাদেরও একটা উল্লেখযোগ্য অংশ রয়েছেন। ফলে ব্যাপক হারে সেনা অভিযান রাজনৈতিক সমর্থন আদায় করতে পারত না।
🔍︎ আরও পড়ুন— আজ ভেনেজুয়েলা, কাল কে?
এই সব বাধার সামনে পড়ে হোয়াইট হাউস যে স্ট্র্যাটেজি নিয়েছে সেটা হল মাথাকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল: নিজেদের বিপুল সামরিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বকে কাজে লাগিয়ে ওরা বিপ্লবী রাষ্ট্রের মাথাকে ছিন্ন করার কৌশল নিয়েছে। একইসঙ্গে পাঁকে পড়ার ফাঁদ এড়িয়েছে। ‘সার্জিক্যাল’ স্ট্রাইক-এর কৌশল কাজে লাগানোর সিদ্ধান্তে নিয়ে তারা নামিয়েছিল ১৫০টির বেশি বিমান এবং এলিট ডেল্টা বাহিনীর ইউনিটকে। তবে যুদ্ধ ঘোষণা করে ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার রাস্তা ওরা এড়িয়ে গেছে। ওরা ঘুরিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছে যে, ভেনেজুয়লা রাষ্ট্র থাকছে, থাকবে। এর আগে ইরাক ও আফগানিস্তানে চড়া দামের বিনিময়ে দুটি ব্যর্থ মার্কিন অভিযানের পর তারা বেছে নিয়েছে সবচেয়ে কম প্রতিরোধের পথ। তাদের পছন্দ বোমাবর্ষণ ও অপহরণ, যেটা তাদের রাজনৈতিক ‘ট্রফি’র কাজে লাগতে পারে। তবে ট্রাম্পের চড়া আবেগতাড়িত স্টাইল এবং রীতিমতো আগ্রাসী সামরিক কৌশলের আড়ালে— যা মনে করিয়ে দিচ্ছে লাতিন আমেরিকায় আগের যুগের ‘গানবোট কূটনীতি’র কথা— যা রয়েছে তা হল জমানা বদলের জন্য সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার অনীহা। এ হল উনিশ শতকের গ্যাংস্টার সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যাবর্তন যেখানে বন্দুকের মুখে সুবিধা আদায় করা হত। ভেলেজুয়েলা আমরাই ‘চালাব’— একথা যখন বলছেন ট্রাম্প তখন তিনি এই কথাটাই বোঝাতে চাইছেন।
ক্ষমতার অসমতা ও ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ প্রশ্ন
ভেনেজুয়েলার জনগণ, পার্টি ও রাষ্ট্র পুরোদমের মার্কিন আগ্রাসন প্রতিরোধে বিকেন্দ্রীভূত প্রতিরোধের জনযুদ্ধের জন্য তৈরি ছিল। তবে এটাও ঠিক যে বর্তমানে এই গ্রহের কোনও দেশের এমন প্রস্তুতি কিংবা ক্ষমতা নেই বিশেষ মার্কিন অভিযানের বিরুদ্ধে, যে ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে আমাদের দেশে, সেই অভিযানের বিপুল ও নিষ্ঠুর শক্তিকে প্রতিহত করতে পারে। যতই নৈতিকভাবে ন্যায়ের পথে থাকুক, যতই সাধারণ জনগণ সমাবেশিত থাকুক, কিংবা যতই সামরিকভাবে সক্ষম হোক, মার্কিন যুদ্ধ মেশিনের কেন্দ্রীভূত, উচ্চ প্রযুক্তির বিধ্বংসী ক্ষমতার তুল্যমূল্য হতে এখন কোনও দেশই পারবে না। গণহারে বোমা বর্ষণ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংসা করা, বিদ্যুৎ সংযোগ ও বিমান হানা প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে অকেজো করে দেওয়া— এসব প্রয়াস চালানো হয়েছে সমন্বিতভাবে। তারপরেই মাদুরোর নিরাপত্তা বেষ্টিত বাসভবনে হামলা করা হয়েছে। এটাই হল সেই অসম ক্ষমতার প্রয়োগ। যে বীরত্বের সঙ্গে এই হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা হয়েছে, যার মধ্যে ছিল ভেনেজুয়েলার বাহিনী ও কিউবার আন্তর্জাতিকতাবাদীরা, এবং যার ফলে ৫০ জন মৃত্যুবরণ করেছেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটা ছিল যুদ্ধ, ‘আত্মসমর্পণ’ নয়। যদিও এই ঘটনা সম্পর্কে এমনই দাবি করা হয়েছে।
🔍︎ আরও পড়ুন— ভেনেজুয়েলায় একতরফা মার্কিন আগ্রাসন
এই ঘটনা থেকে আরও প্রমাণিত হয় যে, বর্তমান পর্বে বহুপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থা দক্ষিণ গোলার্ধের দেশগুলির সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটা হাতিয়ার হতে পারে— এই ধারণা ভুল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সামরিক বাজেট। সারা বিশ্বে ছড়িয়ে রয়েছে তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলি। প্রযুক্তিগতভাবেও তারা শ্রেষ্ঠ। ফলে সামরিক ক্ষমতার ক্ষেত্রটিতে তারা তাদের একমেরু বিশ্বের আধিপত্য ফের প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।
একই সঙ্গে বিপ্লবী নেতৃত্বের মধ্যে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’র অভিযোগ এনে, বিশেষ করে ডেলসি রডরিগেজকে নিশানা করে, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালিয়ে বিপ্লবী শক্তির মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। তবে এমন ভাষ্যের কোনও সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই। এটা সর্বৈব মিথ্যা। এটা মার্কিন সামরিক বাহিনীর রণনীতির মধ্যে একটা ক্ল্যাসিক কৌশল এবং মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
রডরিগেজ পরিবারের বিপ্লবী পরিচয় সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তৈরি হয়েছে। তাদের বাবা, জর্জ আন্তনিও রডরিগেজ ছিলেন মার্কসবাদী-লেনিনবাদী সংগঠন সোশালিস্ট লিগের নেতা। ১৯৭৬ সালে পিন্টো ফিজো জমানায় তাঁর ওপর অত্যাচার চালিয়ে তাঁকে হত্যা করা হয়। ডেলসি ও তাঁর ভাই জর্জ (ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লির প্রেসিডেন্ট) সেই ঐতিহ্যে বড়ো হয়ে উঠেছেন এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গোপন ও গণ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছেন। প্রেসিডেন্ট মাদুরো ছিলেন ওই সংগঠনেরই সদস্য। এখন যদি একথা বলা হয় যে তাঁরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, কিংবা ভয় পেয়ে আত্মসমর্পণ করেছেন, তাহলে চার দশকের রাজনৈতিক সংগঠন করা, নিপীড়ন সহ্য করা এবং ধারাবাহিক সাম্রাজ্যবাদী হামলার বিরুদ্ধে তাদের নেতৃত্ব এবং তাদের বিপ্লবী নেতৃত্বের শ্রেণি চরিত্র— এ সবকিছুকেই প্রশ্ন করা হয়।
বলিভারীয় রাষ্ট্রের স্থিতিস্থাপকতা, এবং ঘটনার পর পরই পিছু হঠার কৌশল —তাতে একথা স্পষ্ট হয় যে ভেনেজুয়েলা রাষ্ট্র দেখিয়ে দিয়েছে তাদের শিকড় অনেক গভীরে এবং এই রাষ্ট্র অনেক বেশি স্থায়ী। গত কয়েক দশক ধরে আমেরিকা প্রচার করে আসছে যে, সামরিক অভিযান হলেই ভেনেজুয়েলা ধসে পড়বে। তবে তেমনটা ঘটেনি। বরং রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কমান্ডের শৃঙ্খল অটুট রয়েছে। অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রডরিগেজ, অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী ডায়োসডাডো ক্যাবেল্লো, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো, পিএসইউভির মূল নেতৃত্ব এবং সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্থায়িত্ব আনার চেষ্টা করছেন, প্রতিবাদে জনগণকে জমায়েতে সামিল হওয়ার ডাক দিয়ে আস্থা ফেরাচ্ছেন এবং মাদুরো যে বেঁচে রয়েছেন তার প্রমাণ দাবি করেছেন। প্রথম দিকে ট্রাম্প বলেছিলেন, আমেরিকাই ভেনেজুয়েলা চালাবে। তবে তার উল্টো কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন মার্কো রুবিও। পিএসইউভি তাদের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারার কারণেই এ সব বাগাড়ম্বর গিলে ফেলতে বাধ্য হয়েছে ওরা।
🔍︎ আরও পড়ুন— কারাকাসে অপহরণ
অন্তর্বর্তী নেতা হিসাবে ডেলসি রডরিগেজ মার্কিন ভাষ্যের বিরোধিতা করে বলেছেন, ‘দেশে এখন একজনই প্রেসিডেন্ট। এবং তিনি হলেন নিকোলাস মাদুরো মোরো। আমরা আর কখনই কোনও সাম্রাজ্যের উপনিবেশ হবো না।’ এর উত্তরে রুবিও দ্রুত তাদের বাছাই করা প্রার্থী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন এবং তার মধ্যে দিয়ে কার্যত বলিভারীয় রাষ্ট্রকেই একমাত্র শাসক বলে মেনে নিয়েছেন। বরং চাপের মুখে পশ্চাদপসরণ হিসাবেই দেখতে হবে।
এরপর কারাকাসের তরফে আমেরিকার সঙ্গে আলোচনা ও বৈঠকের যে সব কথা বলা হয়েছে সেগুলোকে আত্মসমর্পণ হিসাবে দেখলে চলবে না। বাস্তব পরিস্থিতি খুবই কঠোর। আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, ইকোয়োডর, এল সালভাদোর, পেরু, বলিভিয়া — সর্বত্র এখন মাথাচাড়া দিচ্ছে দক্ষিণপন্থীরা। ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও মেক্সিকোয় প্রগতিশীল সরকারগুলি দোদুল্যামান। এর মানে লাতিন আমেরিকায় ভেনেজুয়েলা রাজনৈতিকভাবে একা। রাশিয়া ও চীনের সরকারের কাছ থেকে ভেনেজুয়েলা যে বস্তুগত ও রাজনৈতিক সমর্থন পেয়েছে তা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আরও আগ্রাসন ঠেকানোর পক্ষে যথেষ্ট নয়। নৌবহর দিয়ে টানা অবরোধ এবং আরও মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের হুমকিই এখনকার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ।
৩ জানুয়ারি প্রথম বিবৃতিতে ট্রাম্প বোঝাতে চেয়েছিলেন যে ডেলসি রডরিগেজ ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবেন এবং তাদের দাবি মেনে নেবেন। বামেদের একাংশ একথা বিশ্বাস করেছিল। ধরে নিয়েছিল যে ডেলসি আত্মসমর্পণ করছেন। সেই দিনেই প্রেস কনফারেন্সে ডেলসি বললেন ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখবেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তাঁর পাল্টা দাবি পেশ করলেন। যার মধ্যে ছিল প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে মুক্তি দিতে হবে। পরদিন পার্টি নেতৃত্ব ও সরকারের মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠক করলেন ডেলসি। সেখানে পার্টি, জনগণ এবং সামরিক বাহিনীর ঐক্য অটুট রাখার কাজে জোর দেওয়া হল। সারা বিশ্বের কাছে একটা বার্তা দেওয়া হল। সেই বার্তা স্পষ্টতই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারকে। ডেলসি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বললেন, তারা শান্তি ও উন্নয়নের লক্ষ্যে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে কাজ করুক। তবে শর্ত হবে সার্বভৌমত্ব ও সমতা। এটাকে বিশ্বাসঘাতকতা বা আত্মসর্পণ বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আসলে গত তিন মাসে এবং উত্তেজনার বছরগুলিতে মাদুরো যত বিবৃতি দিয়েছেন ডেলসির বিবৃতি তারই প্রতিধ্বনি। মাদুরো নিজে ধারাবাহিকভাবে বলে গেছেন কূটনীতি ও আলোচনার কথা। এড়িয়ে চলতে চেয়েছেন সর্বাত্মক যুদ্ধ। ইতিমধ্যেই তিনি ভেনেজুয়েলার তেল ও খনিজ সম্পদ নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চুক্তির বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এখন মাদুরো অপহৃত। যদি সামনের দিকে এগোতে গিয়ে ভেনেজুয়েলা এমন চুক্তিতে সই করে সেটা আদৌ বিশ্বাশঘাতকতা হবে না। 
১৯১৮ সালে লেনিন ও বলশেভিকরা সই করেছিলেন বিখ্যাত ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তিতে। শিশু সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে সাম্রাজ্যবাদী জার্মানির হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন রাশিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা। পার্টির মধ্যে ‘বাম কমিউনিস্টরা’ অভিযোগ করেছিল তিনি বিপ্লবকে বিক্রি করে দিচ্ছেন। তবে তিনি ঘটনাটিকে ব্যাখ্যা করেছিলেন একটা সমঝোতা হিসাবে যখন ‘সশস্ত্র দস্যুদের’ হাত থেকে জীবন বাঁচাতে মানিব্যাগ তাদের হাতে তুলে দিতে হয়। এই ছাড় দেওয়ার কারণে বাম সোশালিস্ট বিপ্লবীদের সঙ্গে জোট ভেঙে যায়। তারা লেনিনের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ আনে। তারা বলশেভিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে এবং ‘বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতক’ বলে তাঁকে হত্যার চেষ্টা করে। এর জেরে ১৯১৮ সালে লেনিন গুরুতর আহত হন। দু-মাস বাদে জার্মানি আত্মসমর্পণ করে এবং সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ব্রেস্ট-লিস্টভস্ক চুক্তিতে হারানো সব এলাকা ফিরে পেয়েছিল।
আজ ভেনেজুয়েলা একই রকম ‘ব্রেস্ট-লিস্টভস্ক’ মুহূর্তের মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে দক্ষিণপন্থী সরকারগুলির মধ্যে ভেনেজুয়েলা একা হয়ে পড়েছে। এই দেশ প্রায় সর্বাত্মক অবরোধের মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিপ্লবের মূল নেতৃত্ব গুরুত্ব দিচ্ছেন ভবিষ্যতের সংগ্রামের বাহিনীর পশ্চাদভাগের ঘাঁটি হিসাবে এই রাষ্ট্র যেন টিকে থাকতে পারে। এই প্রেক্ষিতে পিএসইউভি ও ভেনেজুয়েলা সরকার যে বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে তা হল, বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতাকে রক্ষা করা। ১৯৯২-এর বিদ্রোহের ব্যর্থতার পর কমান্দান্তে হুগো শাভেজ যেমনটা বলেছিলেন, ‘আজ আমাদের অবশ্যই পশ্চিদপসরণ করতে হবে আগামী দিনের অগ্রগতির স্বার্থে।’ এর মানে হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যা মার্কিন কর্পোরেশনগুলিকে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদনের ওপর আরও বেশি অংশীদারির সুযোগ দিতে পারে। দিতে পারে এমন সব শর্তাধীনে যা দারুণভাবে মার্কিন স্বার্থেরই সহায়ক হবে। এর জেরে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অন্যান্য অস্থায়ী ধরনের ছাড় দেওয়া হতে পারে। তবে এ সবের লক্ষ্য হবে রাজনৈতিক পরিসরকে নিরাপদ করা এবং নিজেদেরকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা। এ সবের লক্ষ্য হল কিউবা ও ভেনেজুয়েলাকে পশ্চাদভূমির অপরিহার্য ঘাঁটি হিসাবে টিকিয়ে রাখা যা আসলে টিকে থাকবে সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার ঘাঁটি হিসাবে। এই দুই দেশ সেই ভূমিকায় টিকে থাকবে এমন একটা সময়ে যখন দক্ষিণ গোলার্ধে সমাজতান্ত্রিক শক্তির প্রভাব হ্রাস হওয়ার একটা পর্ব চলছে।
ট্রাম্প দাবি করছেন তিনি জয়ী। বলছেন ‘আমরাই ক্ষমতায়।’ নিজের দেশের ভেতরকার রাজনৈতিক লক্ষ্যের দিকে তাকিয়ে তাঁকে এ সব কথা বলতে হচ্ছে। তবে এর মানে এটা নয় তিনি যা বলছেন সেটাই সত্যি। তিনি আসলে শাসক বদল করতে ব্যর্থ হয়েছেন। মূলত তিনি যে সব শব্দ ব্যবহার করছেন তাতে তিনি এই মিথ্যা ঘোষণা করছেন যে, ‘শাসক বদল হয়ে গেছে’। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং অন্য কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া বিভ্রান্তিকর শিরোনাম ও নিবন্ধ ছাপছে যা ট্রাম্পের ভাষ্যকে প্রতিষ্ঠা করছে। ট্রাম্পের সেই ভাষ্য হল, তিনি ডেলসি রডরিগেজকে ‘বেছে নিয়েছেন’ কারণ ডেলসি ‘নম্র’ স্বভাবের। এই সব বুর্জোয়া প্রচারে কোনও সোশালিস্টের বিচলিত হওয়া উচিত নয়।
বিপ্লব বড়োসড়ো ধাক্কা খেয়েছে। তবে রাষ্ট্রক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ এখনও বজায় রয়েছে। আগামী দিন যা আসছে সেখানেই বিপ্লবের সংহতি ও রণনীতিগত সৃজনশীলতার পরীক্ষা হবে। বিপ্লব ধারাবাহিকভাবে নিজের একটা ক্ষমতার নজির রেখেছে। তা হল অস্থিররতার মধ্যে দিয়ে পথ কেটে বড়ো বড়ো সঙ্কট পেরিয়ে যাওয়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে থেকে আমাদের ভূমিকা হবে এই সাম্রাজ্যের পরিকল্পনা যাতে সফল হতে না-পারে সেজন্য বিরোধিতা তীব্রতর করা, ভুয়ো প্রচারের বিরোধিতা করা, যাতে দক্ষিণ গোলার্ধের বিপ্লবীরা হুমকি ও বলপ্রয়োগ থেকে মুক্ত হয়ে তাদের নিজেদের পথ তৈরি করতে পারে তার উপযোগী পরিসর তৈরি করা। বিপ্লব কোনও ব্যক্তি নয়। এটা একটা সামাজিক প্রক্রিয়া এবং এমন বিষয় যাতে বহু মানুষ অংশগ্রহণ করেন। প্রেসিডেন্ট মাদুরো নিউ ইয়র্কের জেলের কুঠুরিতে বন্দি। তবে বলিভারীয় প্রকল্প বেঁচে রয়েছে কারাকাসের রাস্তা এবং মিরাফ্লোরেসের প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে।
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
ঋণ: পিপলস ডিসপ্যাচ
🔍︎ আরও পড়ুন—গুন্ডাবাজির পর্বে সাম্রাজ্যবাদ
প্রকাশের তারিখ: ১৫-জানুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
