সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
একুশের চেতনা নিরপেক্ষ নয়
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
মাতৃভাষার মর্যাদা আমরা তখনি প্রতিষ্ঠা করতে পারবো যখন আমাদের এই রাষ্ট্র পুরোপুরি গণতান্ত্রিক হবে। পুঁজিবাদী বিশ্ব আমাদেরকে গণতান্ত্রিক হতে দেয় না। আমাদের শাসক শ্রেণির সঙ্গে যোগসাজস করে তারা কখনো নির্বাচিত কখনো অনির্বাচিত অগণতান্ত্রিক শাসন চাপিয়ে দেয়, যাতে করে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে যেতে পারে, এবং দেশকে একটি বৃহৎ বাজারে পরিণত করা সম্ভব হয়। পুঁজিবাদী বিশ্ব এ রাষ্ট্রকে স্বাধীন হতে দিচ্ছে না, তাঁবেদার করে রাখছে। অথচ একুশের আন্দোলনের মূল প্রেরণাটাই ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব সেদিন বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নেবার ভয়ঙ্কর অপচেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল। আমরা রুখে দাঁড়িয়েছিলাম।

১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কি ঘটেছিল আমরা সবাই তা জানি। সেদিন যে আন্দোলন হয়েছিল সে আন্দোলনকে আমরা ভাষা আন্দোলন বলি। এবং সেই যে আন্দোলন হয়েছিল তা কোন দুর্ঘটনার জন্য হয়নি, কারো ব্যক্তিগত ভুলের জন্য ঘটেনি। কেননা আন্দোলন অনিবার্য ছিল, আন্দোলন শাসক এবং শাসিতের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সেই দ্বন্দ্বের একটা প্রকাশ। এও আমরা জানি। কিন্তু আমরা যখন একে ভাষা আন্দোলন বলি তখন এ কথা তো ভুলি না যে, ভাষার যতই মূল্য থাকুক ভাষা শেষ পর্যন্ত চিহ্ন মাত্র এবং যারা ভাষা ব্যবহার করে তাদের উপরই ভাষার উৎকর্ষ নির্ভর করে। বরং ভাষার জন্য আন্দোলন তো আসলে জীবনের বিকাশের জন্যই আন্দোলন ছিল। রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষা যখন আনুষ্ঠানিকভাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি লাভ করেছে তখনও এ আন্দোলন থেমে যায়নি। আমরা এও জানি যে, যখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস ও ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, তখনও এ আন্দোলন থেমে যায়নি। এও আমরা জানি যে, এ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত বাঙালি জাতিসত্তার উপরে যে নিপীড়ন চলছিল, সে নিপীড়ন থেকে মুক্তির আন্দোলনে পর্যবসিত হয়েছিল। এবং সেই আন্দোলনের পথ ধরেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং প্রতিষ্ঠা ঘটেছে।
কিন্তু আজকেও, স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে একটা নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পরেও, একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ, একুশে ফেব্রুয়ারি আজকেও আমাদের কাছে আবেদন জানায়, আজকেও আমাদেরকে ডাকে, আমাদের মনে এক অনুভূতির সৃষ্টি করে। কেন করে? সে কি শুধু এই কারণেই করে যে, বাংলা ভাষা শিক্ষার সর্বস্তরে প্রযুক্ত হয়নি? সে কি শুধু এই কারণেই করে যে বাংলা ভাষা সরকারী সকল কার্যে ব্যবহৃত হচ্ছে না? না, সেটা নয়, তার চাইতেও বড় তাৎপর্য এখানে আছে। সে হচ্ছে একুশে ফেব্রুয়ারির যে আন্দোলন ছিল শাসক শ্রেণির নিপীড়নের বিরুদ্ধে এবং সে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ দেশের মানুষের নিপীড়ন-বিরোধী যে চেতনা তার প্রকাশ লাভ করেছিল। সে জন্যই নিপীড়ন যত দিন আছে, নিষ্পেষণ যত দিন থাকছে, অন্যায় যতদিন চলবে, ততদিন তো মনে হয় একুশে ফেব্রুয়ারি তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে থাকবে।
একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন মধ্যবিত্ত তরুণেরা করেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের মূল শক্তি কোথা থেকে এসেছিল? আন্দোলন যতদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, যতদিন রমনা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল, ততদিন প্রবল ছিল না। একুশে ফেব্রুয়ারির সেই গুলিচালনার দিনে যখন এই আন্দোলন রমনা পার হয়ে পুরাতন ঢাকায় এসে পৌঁছেছিল, যখন পুরাতন ঢাকা পার হয়ে সমগ্র বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে পৌঁছে গেল, যখন এই আন্দোলনে কৃষকের বিক্ষোভ যুক্ত হলো, শ্রমিক অসন্তোষ এর সঙ্গে মিশে গেল, যখন রিক্সাওয়ালা এসে যোগ দিলো, যখন নিম্নমধ্যবিত্ত এর সঙ্গে যুক্ত হলো তখনই সে অত্যন্ত প্রবল হলো, তখন সে দুর্দমনীয় হয়ে উঠল। এর আগে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা একবার আন্দোলন করেছিলেন বেতনের জন্য, ৫২ সালের আগেই, কিন্তু সে আন্দোলন সামাজিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি এবং সমস্ত বাংলাদেশে ছড়িয়েও যায়নি। কেন যায়নি? পুলিশদের উপর কম নির্যাতন হয়নি, পুলিশদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। আন্দোলন বিস্তৃত হলো না এই জন্য যে তা সীমাবদ্ধ ছিল সরকারি কর্মচারীর একাংশের মধ্যে। এবং এই যে একুশের আন্দোলন এত প্রবল হলো, দুর্দমনীয় হলো সে যে এতদুর এগিয়ে এলো তার কারণ হচ্ছে- এর সঙ্গে পূর্ববঙ্গের সব মানুষের বিক্ষোভ জড়িত ছিল।
আমরা যদি আজকে একুশে ফেব্রুয়ারিতে দাঁড়িয়ে আমাদের পুরানো ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখব একুশে ফেব্রুয়ারির এই যাত্রাপথ ধরে নতুন সংগঠন গড়ে উঠেছে। নতুন সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, সে আমরা জানি। এর সামাজিক প্রতিক্রিয়া প্রবল হয়েছে, সেও আমরা জানি। কিন্তু এককভাবে এদের কোনটাই একুশের একক অবদান নয়।
একুশের মূল সৃষ্টি যদি চিহ্নিত করতে হয় তাহলে বলতে হবে, একুশে ফেব্রুয়ারি একটি চেতনার নাম। এবং সে চেতনাকে যদি চিহ্নিত করতে চাই, তবে তার পরিচয় দিতে হবে কতগুলো লক্ষণ দ্বারা - সে ছিল ইহজাগতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক, সে চেতনা ছিল অন্যায়বিরোধী, বিদ্রোহী। এবং সর্বোপরি সে ছিল সৃজনশীল। এই যে ইহজাগিকতা, গণতান্ত্রিকতার, এই যে বিদ্রোহের চেতনা, এই যে সৃজনশীলতা এর সমস্ত কিছুকে একত্র করেই একুশের পরিচয়। এতকাল আমাদের অনুভূতিগুলো নানা প্রকার আধ্যাত্মিক ও ভাববাদী পথে বিচারণ করত। ধর্ম ছিল আমাদের একটা বড় সাংস্কৃতিক উপাদান। সেইখানে ভাষা এসে আমাদেরকে বস্তুজগৎ ও চারিদিকের পরিবেশ পরিস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন করলো। এবং যে গণতান্ত্রিক চেতনা এলো সেটা অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা। আগে সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ভাগাভাগি ছিল। হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের অনুষ্ঠানগুলো আলাদা, প্রতিষ্ঠানগুলো আলাদা এবং তারা আলাদা আলাদা থাকতেন। একুশে ফেব্রুয়ারি সম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ভেঙে দিল । সকল মানুষের গণতান্ত্রিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করল। একুশে ফেব্রুয়ারি অন্যায়ের, শোষণের এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানালো! এই সমস্ত কিছুকে, এই ইহজাগতিকতাকে, গণতান্ত্রিকতাকে, বিদ্রোহকে সম্মিলিত করে সে একটা নতুন সৃজনশীলতার জন্ম দিল। সেই সৃজনশীলতার পথ ধরেই আমরা দেখেছি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়েছে। ওই পথেই আমরা দেখেছি যে আমরা আরও এগুতে পারছি, একটা নতুন সমাজব্যবস্থা চাইছি, একটা নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে যাচ্ছি। কাজেই একুশের প্রধান সৃষ্টি কোন সংগঠন নয়, কোন প্রতিষ্ঠান নয়। কোন একটা প্রক্রিয়ার মধ্যে আমরা তাকে দেখব না। সে একটা নতুন চেতনার সৃষ্টি করেছিল। সেই চেতনা সৃষ্টিমুখর। একুশে ফেব্রুয়ারি আরও একটা কাজ করেছে, সে হচ্ছে এই যে, সে একটা বিভাজনের রেখা আমাদের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। বিভাজনটা হচ্ছে আলোর সঙ্গে অন্ধকারের বিভাজন। এ হচ্ছে তারুণ্যের সঙ্গে বার্ধক্যের প্রগতির, সাথে প্রতিক্রিয়ার বিভাজন। এবং সেইখানে দাঁড়িয়ে আলো এবং অন্ধকার, তারুণ্য এবং বার্ধক্য, প্রগতি এবং প্রতিক্রিয়া আলাদা হয়ে গেছে-একুশের মানদণ্ডে।
একুশে ফেব্রুয়ারি তারুণ্য এবং বার্ধক্যকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। তারুণ্য এখানে বয়সের নাম নয়, তারুণ্য এখানে একটি শক্তির নাম। আর তারুণ্যের গুণ যে সৃজনশীলতা, একুশে ফেব্রুয়ারিতে সেই গুণে গুণান্বিত। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা দুঃসাহস দেখেছি মানুষের, দুঃসাহস দেখেছি তারুণ্যের। একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমরা সৃজনশীলতা দেখেছি তারুণ্যের। সেইজন্য তারুণ্যের চিহ্নে একে চিহ্নিত করতে চাই। এবং আমরা তখনই দুঃসাহসী হই, যখন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই, যেমন আমরা '৭১ সালের যুদ্ধের সময় দেখেছি। আমরা যখন আলাদা, বিচ্ছিন্ন, যখন পরস্পর পরস্পরের শত্রু, তখন আমরা সকলই ভীরু, তখন সকলই সন্ত্রস্ত। যখন আমরা সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারি, যখন আমরা এক হতে পারি, যখন আমাদের চেতনা এক সঙ্গে গ্রথিত হয়, তখনই আমরা দুঃসাহসী হয়ে উঠি। একুশে ফেব্রুয়ারিতে সেই দুঃসাহসকে আমরা দেখেছি। কাজেই আবার আমরা দুঃসাহসী হতে পারব, যখন আমরা সমস্ত মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পাবর।
একুশে ফেব্রুয়ারি একটা প্রশ্ন রাখে আমাদের সকলের সামনে। সেটা হলো আমরা কে কোন পক্ষে। আলোর, নাকি অন্ধকারের? যদি আলোর পক্ষ হই তাহলে কি আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি? দায়িত্ব পালন না করলে দেশ কেমন করে এগুবে। প্রশ্নটা শুরুতে ছিল, এখনো আছে, থাকবে আগামীকালও ।
একুশের আন্দোলন যে শেষ হয়ে যায়নি তার প্রমাণ একুশে লক্ষ্য আজো অর্জিত হয়েছে। হ্যাঁ, রাষ্ট্রভাষা বাংলা হয়েছে বৈকি, কিন্তু সর্বত্র সে প্রযুক্ত হচ্ছে না। ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পরিণতিতে আমরা নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি ঠিকই, কিন্তু এই রাষ্ট্রে ধর্মনিরপেক্ষতা এখন অত্যন্ত বিপন্ন, গণতন্ত্র গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের মতো, আছে বলা হয়, কিন্তু আসলে নেই।
মাতৃভাষার মর্যাদা আমরা তখনি প্রতিষ্ঠা করতে পারবো যখন আমাদের এই রাষ্ট্র পুরোপুরি গণতান্ত্রিক হবে। পুঁজিবাদী বিশ্ব আমাদেরকে গণতান্ত্রিক হতে দেয় না। আমাদের শাসক শ্রেণির সঙ্গে যোগসাজস করে তারা কখনো নির্বাচিত কখনো অনির্বাচিত অগণতান্ত্রিক শাসন চাপিয়ে দেয়, যাতে করে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে নিয়ে যেতে পারে, এবং দেশকে একটি বৃহৎ বাজারে পরিণত করা সম্ভব হয়। পুঁজিবাদী বিশ্ব এ রাষ্ট্রকে স্বাধীন হতে দিচ্ছে না, তাঁবেদার করে রাখছে। অথচ একুশের আন্দোলনের মূল প্রেরণাটাই ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী। সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব সেদিন বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নেবার ভয়ঙ্কর অপচেষ্টার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল। আমরা রুখে দাঁড়িয়েছিলাম।
আন্দোলন চলছে এবং চলবে। নদীতে যেমন ঢেউয়ের পরে ঢেউ ওঠে এখানেও তেমনটা ঘটা চাই। ঢেউ যদি না থাকে তবে তো বুঝতে হবে নদী নেই, সে মারা গেছে।
এই আন্দোলনে নিরপেক্ষতার কোনো স্থান নেই। সেদিনও ছিল না, আজও নেই। আবারো তাই বলতে হয় এই আন্দোলনে আমরা কে কি ভূমিকা নিচ্ছি সেই প্রশ্নটা নিজেকে জিজ্ঞাসা করতে হয়। এটিই একুশের প্রধান দাবি।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশের তারিখ: ২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
