সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
কৃষকসভা কেন?
মুজফ্ফর আহ্মদ
চোরবাজারের বিরুদ্ধে কৃষক সভাকে জোর লড়াই করতে হবে। চোরবাজারের লোকেরা শকুনেরও অধম। শকুন মরা জানোয়ারের মাংস খায়, কিন্তু চোরবাজারের ব্যবসায়ীরা খায় জ্যান্ত মানুষের মাংস। এই চোরবাজারকে ধ্বংস না করতে পারলে সমাজজীবন কিছুতেই গড়ে তুলতে পারা যাবে না। বাঁধা দরে যাতে সকলে, বিশেষ করে কৃষকরা জিনিস পায় সেই ব্যবস্থা কৃষক সভাকে করতে হবে। চোরা কারবারিদের উপর কড়া নজর না রাখলে, তাদের জীবন বিষময় করে না তুললে কিছুতেই তা সম্ভবপর হবে না।

১৯৩৭ ও ১৯৩৮ সালে কংগ্রেসের ভিতর থেকে অনেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা করতেন যে, আলাদা কৃষক সভা গড়ার আবার কী দরকার আছে? কংগ্রেসই তো কৃষক সভা, কংগ্রেসের দ্বারাই কৃষকদের দাবি-দাওয়ার আন্দোলন ও লড়াই চলতে পারে। কংগ্রেসের ভিতর থেকে কেউ কেউ আমাদের বিরুদ্ধে এই নালিশও করেছেন যে, কৃষক সভা গড়তে গিয়ে আসলে আমরা একটা পাল্টা কংগ্রেস গড়ছি। পরে অবশ্য এই সব আপত্তি কমে যায়। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মতো বড় বড় কংগ্রেস নেতা মেনে নেন যে কৃষকদের আলাদা সংগঠনের, অর্থাৎ, কৃষক সভার দরকার আছে।
বাংলার মুসলিম লীগের অনেকেও ঐ রকম কথাই তুলেছেন। তাঁরা বলছেন, কী দরকার আছে আলাদা কৃষক সমিতির? মুসলিম লীগই তো কৃষকদের দাবি-দাওয়ার জন্যে লড়ে, মুসলিম লীগের মেম্বার হলেই তো কৃষকদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হতে পারে। এ সম্বন্ধে আমার প্রথম কথা এই যে, কলকারখানার এলাকাগুলোতে মজুরদের শ্রেণিগত সংগঠনের রূপে মজুর ইউনিয়নগুলো যেমন আছে, গাঁ-এর অঞ্চলগুলোতেও তেমনই খেত-খামারের কৃষকদের জন্যে গড়ে উঠেছে তাদের শ্রেণিগত সংগঠন হিসাবে কৃষক সমিতিগুলো। কারখানার এলাকাগুলোতে যত সব মজুর ইউনিয়ন আছে সেই সব একত্রে মিলিত হয়েছে ‘সারা ভারতের ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস’ নামক প্রতিষ্ঠানে। কৃষকদের শ্রেণি সংগঠন সারা ভারতের গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠছে। সারা ভারতের আলাদা আলাদা জায়গার কৃষক সভা বা সমিতিগুলো এক হয়ে যে নাম নিয়েছে সে নাম হচ্ছে সারা ভারতের কৃষক সভা। আগেই আমি সে-কথা বলেছি।
সারা ভারত কৃষক সভা কংগ্রেস কিংবা লীগ কারুর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে গড়ে ওঠেনি। তাদের কারুর শক্তি খর্বও করেনি। বরং তাদেরই শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপক গণ-প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে উঠেছে। কৃষকদের স্বতন্ত্র সংগঠনের দরকার যদি না থাকত তবে তা সম্ভব হত না। সরকার, জমিদার এবং মহাজনের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে কৃষক সভার জন্ম। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা জমিদারি প্রথা ভারতবর্ষকে শিল্পে অনুন্নত করে রেখেছে, কৃষির উন্নতিকে ঠেকিয়ে রেখেছে, ভারতের অধিকাংশ লোককে করে রেখেছে গরিব এবং পরনির্ভরশীল। এই প্রথার বিরুদ্ধে মজুর এবং কৃষকেরাই লড়তে পেরেছে। এই লড়াইয়ের ভিতর দিয়েই কৃষক সভার শক্তি বেড়েছে। কৃষক সভা কৃষকদের শিখিয়েছে ফসল বাড়িয়ে সর্বসাধারণের খাদ্যের অভাব দূর করতে। এ বছর কৃষক সভার উদ্যোগে শুধু বাংলা এবং অন্ধ্রপ্রদেশের কৃষকেরা প্রায় ২২ লক্ষ মন চাউল বেশি পয়দা করেছে। যখন দুর্ভিক্ষে দেশময় হাহাকার উঠেছিল তখন কৃষক সভা নেমেছিল খাল কেটে, বাঁধ বেঁধে, বীজ জোগাড় করে জমির চাষ বাড়াবার কাজে, যাতে দেশের সকল লোক সস্তায় পেট ভরে খেতে পায়। কৃষক সভা লড়েছে দাসত্ব ও দমননীতির বিরুদ্ধে, কৃষক সভা লড়েছে কৃষকদের খাজনা, দেনা ও করভার থেকে মুক্ত করবার জন্যে। কৃষক সভার ভিতর কৃষকরা একতাবদ্ধ হয়েছে এবং রাজনীতিক্ষেত্রে ঐক্য আনার জন্যে লড়ে চলেছে। কৃষকদের যেখানে সমস্বার্থ সেখানেই কৃষক সভা বুক পেতে দাঁড়িয়েছে, কৃষকদের শিখিয়েছে তার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে সাহস করে এগিয়ে যেতে। এই কাজের ভিতর দিয়েই কৃষক সভা প্রমাণ করেছে যে তার আলাদা অস্তিত্বের দরকার আছে, বিনা প্রয়োজনে কোনও দলের কল্পনা থেকে এর সৃষ্টি হয় নি। কাগ্রেসপন্থী কৃষক, লীগপন্থী কৃষক, কমিউনিস্ট কৃষক, এবং যে কৃষকরা কোনো পন্থারই নয়— তাদের সকলেই আসবেন কৃষক সভার ভিতরে, যাতে কৃষক সভা সমস্ত যুবকদের একতা ও শক্তি বাড়াতে পারে। কৃষকদের একতা ও শক্তি কংগ্রেস কিংবা লীগ কাউকে দুর্বল করবে না। বরং এ দুইয়েরই জাতীয় দাবি ও জাতীয় সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
এই সত্য উপলব্ধি করে অনেক কংগ্রেসপন্থী ও লীগপন্থী দেশসেবক কৃষক সভাকে সাহায্য করেছেন, কৃষক সভার সঙ্গে সহযোগিতা করে কৃষকের লক্ষ্য পূরণের জন্যে কৃষক সভার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তাতে তাঁরা কংগ্রেস কিংবা লীগের স্বার্থ ও শৃঙ্খলা এতটুকুও ক্ষুণ্ণ করেননি। বরং কংগ্রেস এবং লীগকে কৃষকদের ভিতরে আরও প্রিয় করে তুলতে পেরেছেন, কৃষকসভাকে কংগ্রেস এবং লীগের মিলনের সেতু করে তুলছেন। তাঁরা শুধু কৃষকদের নয়, দেশের সমস্ত স্বদেশভক্তের শ্রদ্ধাভাজন।
কিন্তু কংগ্রেসপন্থীদের মধ্যে অনেকে আবার পাল্টা কৃষক সমিতি গড়তে চাইছেন। কৃষক সভার ভিতরে না এসে কৃষকদের ডাকছেন ভিন্ন একটা কৃষ্ণক সমিতি গড়তে। ভিন্ন কৃষক সমিতি গড়ার চেষ্টা কৃষক আন্দোলনকে দুর্বল করে দেবে, কৃষকদের জমায়েতকে ভেঙে দেবে। যাঁরা পাল্টা কৃষক সভা গড়তে চান কিংবা সারা ভারতের কৃষক সভার সঙ্গে সহযোগিতা করতে চান না, তাঁরা বলেন কৃষক সভা কমিউনিস্টদের দখলে রয়েছে এবং কৃষক সভার ভিতর দিয়ে কমিউনিস্টরা তাদের দলের নীতি চালায়। কমিউনিস্টরা কৃষক সভাকে গড়ে তুলেছেন, কৃষকদের আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্যে প্রাণ দিয়ে তাঁরা খাটেন; তাই তাঁরা আজ কৃষকদের আস্থা ও শ্রদ্ধা অক্ষুণ্ণ রেখে কৃষক সভার নেতৃস্থানে অধিক সংখ্যায় আছেন। কিন্তু তাই বলে কোনো জায়গায় কৃষকদের শুধুমাত্র কমিউনিস্টদেরই দলগত স্বার্থের জন্য পরিচালনা করেছেন কি? কৃষক সভা কৃষকদের বলেছে ফসল বাড়াও, চোরাবাজার দমন কর, জাতীয় গভর্নমেন্ট গড়ার জন্য কংগ্রেস এবং লীগের ঐক্য গড়ো, রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির জন্য আন্দোলন চালাও, জাপ আক্রমণ আরম্ভ হলে আক্রমণকারী জাপ দস্যুদের বিরুদ্ধে দাঁড়াও। এর মধ্যে কোনও জায়গায় এমন কোনও নীতি আছে যা কোনও একজন স্বদেশভক্তের কাছে জাতীয় স্বার্থের বিরোধী বলে মনে হতে পারে? কমিউনিস্টরা কৃষক সভাকে কৃষকদের ব্যাপক গণপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চান, কৃষক সভার মঞ্চ থেকে তাঁরা এমন কোনও নীতি চালাতে চাননি বা চালাননি যা সর্বস্তরের নীতি নয়, যা নিছক কমিউনিস্টদের দলীয় নীতি।
কৃষক সভাকে কৃষকদের স্বার্থের জন্যে, তাদের দাবি-দাওয়ার জন্যে যে লড়াই লড়তে হয় সে-লড়াই মুসলিম লীগ কিংবা কংগ্রেস লড়তে পারে না। মুসলিম লীগ ছোট-বড় সব শ্রেণির মুসলমানদের রাজনীতিক সংগঠন। কংগ্রেসও তেমনি সব শ্রেণির রাজনীতিক প্রতিষ্ঠান। লীগ ও কংগ্রেসের মেম্বার যেমন কৃষকরাও হতে পারেন, তেমনি হতে পারেন কৃষকদের শোষকেরাও। কাজেই কৃষকাদের সব দাবি দাওয়ার লড়াই কংগ্রেস কিংবা লীগের ভিতর থেকে হতে পারে না। কৃষকদের সব রকমের স্বার্থ মুসলিম লীগ কিংবা কংগ্রেসের সকল মেম্বারের স্বার্থ নয়। তারই জন্যে কৃষকদের আলাদা শ্রেণি সংগঠনের, অর্থাৎ কৃষক সমিতির দরকার আছে।
কৃষক সভা মুসলিম লীগ কিংবা কংগ্রেসের বিরোধী নয়
কৃষক সভা মুসলিম লীগ কিংবা কংগ্রেসের বিরোধী নয়। কৃষক সভার যাঁরা মেম্বার তাঁরা মুসলিম লীগ কিংবা কংগ্রেসেরও মেম্বার হতে পারেন। মুসলিম লীগ কিংবা কংগ্রেসের মেম্বার হতে কৃষক সভা তার মেম্বারদের কখনও বারণ তো করেই না, বরঞ্চ উৎসাহও দেয়। এমন কতকগুলো দাবি-দাওয়া আছে যেগুলো মুসলিম লীগ কিংবা কংগ্রেসের ভিতরকার সকল শ্রেণির পক্ষে ও কৃষকদের পক্ষে এক। সেই সব দাবি-দাওয়ার জন্যে কংগ্রেস কিংবা লীগের ভিতরে গিয়ে আর সব শ্রেণির সঙ্গে একজোট হয়ে কৃষকেরাও লড়বেন। ভারতের স্বাধীনতার কথাই ধরা যাক। স্বাধীনতা আর সকলে যেমন পেতে চান তেমনি পেতে চান কৃষকেরাও। স্বাধীনতা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে অধিকার কৃষকদের হাতে আসবে শুধু সেই অধিকারের বলেই কৃষকরা তাদের উপরে যে সব জুলুম-জবরদস্তি হয় সেই সব জুলুম-জবরদস্তির হাত থেকে বাঁচতে পারবেন, তাদের নিজেদের অবস্থা বদলাতে পারবেন। কৃষকদের অবস্থা বদলালে সমাজের চেহারাও বদলে যাবে, কারণ কৃষকেরা হচ্ছেন সমাজের একটা বিরাট অংশ। কৃষকেরা ভারতের স্বাধীনতার জন্যে শুধু যে লড়বেন তা নয়, একান্তভাবেই লড়বেন। কাজেই, কৃষকরা ছাড়া আরো যারা স্বাধীনতার জন্যে লড়বেন কৃষকরা তাদের সঙ্গে এক হয়ে লড়বেন। তারই জন্যে কৃষকেরা কৃষক সমিতির মেম্বার হয়েও লীগ বা কংগ্রেসেরও মেম্বার হতে পারেন এবং হয়েও থাকেন।
আমি শুধু স্বাধীনতার জন্যে লড়াইয়ের কথাই এখানে বললাম। আরও অনেক দাবি আছে যে সবের জন্যে সকলকে একত্রে লড়াই করতে হবে।
কমিউনিস্ট সংগঠকদের প্রতি
আমি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একজন সভ্য। সেই অধিকারের জোরে কৃষক সভার ভিতরে যে সকল কমিউনিস্ট সংগঠক আছেন তাঁদের লক্ষ্য করেও দু’একটি কথা আমি বলব। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সভার ভিতরে যে তফাত আছে সেটা আপনারা এক মিনিটের জন্যেও ভুলে যাবেন না। এই কথাটা যদি আপনারা সব সময়ে মনে রেখে কৃষক সভার কাজ করেন তা হলে সভার ভিতরে যে সকল অ-কমিউনিস্ট আছেন তাদের সঙ্গে আমাদের ঠোকাঠুকি বাধার সম্ভাবনা খুবই কম থাকবে। কৃষক সভাই হোক, আর মজদুর ইউনিয়নই হোক, গণ-সংগঠনকে গণসংগঠন হিসাবে বাঁচিয়ে রাখা ও গড়ে তোলা হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠকদের মস্ত বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য। কারণ, কমিউনিস্ট পার্টির বনিয়াদই নির্ভর করছে গণ-সংগঠনের উপরে। যাঁরা কৃষক সভার কর্মপদ্ধতিতে বিশ্বাসী হবেন এবং কাজ করতে চাইবেন তাঁদের কৃষক সভাতে আসতে দিতে হবে। কোনও একটা বিশিষ্ট কৃষক সমিতিতে কমিউনিস্টরা সংখ্যায় বেশি থাকলেও সেই কৃষক সমিতিকে কৃষক সমিতি হিসাবেই চালাতে হবে। অন্যেরা যেখানে নেই সেখানে কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টি এক হয়ে গেল এই ভুল যেন কমিউনিস্ট কৃষক সংগঠকরা কখনো না করেন। এই রকম ভুল করলে কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টি দুই-এরই লোকসান হবে।
দেশ জোড়া বিরাট কৃষক ঐক্য গড়ে তোলার জন্যে প্রত্যেকটি কৃষককে কৃষক সমিতির ভিতরে নিয়ে আসার জন্যে চেষ্টা করতে হবে। এমন আবহাওয়া যেন কখনো কৃষক সমিতির ভিতরে সৃষ্টি না হয় যাতে একজন রাজনৈতিক চেতনাহীন কৃষক সেখানে এসে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে না পারেন। সব সময়ে মনে রাখতে হবে, যে কোনও কৃষক কৃষক-সমিতির সভ্য হতে পারেন, কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হতে পারেন শুধু সেই কৃষক যাঁর ভিতরে রাজনীতিক বোধ জন্মেছে এবং যিনি কমিউনিস্ট মতবাদ কী তা মোটামুটি বুঝেছেন।
স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী
সারা ভারত কৃষক সভার আজকের এই নবম বার্ষিক অধিবেশনে স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী উপস্থিত নেই। সারা ভারত কৃষক সভার যারা বনিয়াদ পত্তন করেছিলেন স্বামীজিও এদের মধ্যে একজন। কৃষক সভার বড় পদও তিনি অধিকার করে এসেছেন। গত বছরের সভাপতিও ছিলেন তিনি। অসুখে পড়ে যে তিনি আজিকার সভায় হাজির হতে পারলেন না তা নয়, বড় দুঃখ যে তিনি সারা ভারত কৃষক সভার বাইরেই চলে গেলেন এবং তার জন্যে দায়ী তিনি নিজে, আরও পরিষ্কার ভাষায় বলতে গেলে তাঁর একনায়কত্বের, তাঁর ডিক্টেটর-সুলত মনোভাব। কৃষক সভা গণতান্ত্রিক সংগঠন, কৃষক সভার উপরের ও নিচের সব পদের আধিকারিকরাই নির্বাচিত হয়ে থাকেন, কৃষক সভা কোনও নেতার ডিক্টেটরি হুকুমে চলতে রাজি নয়।
আপনাদের মধ্যে সকলে না হলেও, অনেকেই খবরের কাগজে স্বামীজির বিবৃতিগুলো পড়েছেন। কেন্দ্রীয় কৃষক কাউনসিল যে প্রস্তাব পাস করেছে সে প্রস্তাবও আপনাদের মধ্যে অনেকেই পড়ে থাকবেন। স্বামীজি সমস্ত কৃষক সভার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস যে, সমস্ত কৃষক সভাকে তিনি বাতিল করে দিতে পারেন। কোনও একটি গণতান্ত্রিক সংগঠনে ব্যক্তির হুকুম এইভাবে চলতে পারে না। সেই ব্যক্তি যদি সংগঠনের উচ্চতম পদের অধিকারীও হন তা হলেও সমস্ত সংগঠনকে বাতিল করার মতো ক্ষমতা তাঁর থাকতে পারে না। সারা ভারত কৃষক সভার গঠনতন্ত্র (কায়দা-কানুন) এমন ক্ষমতা তার সভাপতিকে দেয়নি, যদি দিত তা হলে কৃষক সভা গণতান্ত্রিক সংগঠন বলে পরিগণিত হতে পারত না।
স্বামীজি কৃষক সভার ভিতরে ভেদ সৃষ্টি করতে চেয়েছেন। তিনি যে নীতি অবলম্বন করেছেন তা সংগঠনকে ভাঙ্গার নীতি। সারা ভারত কৃষক সভার উপরে কিংবা তার কোনও অংশের উপরে শাস্তি দেওয়ার কোনও ক্ষমতাই তার ছিল না। কেন্দ্রীয় কৃষক কাউনসিল ও সারা ভারত কৃষক কমিটিরই শুধু সেই ক্ষমতা আছে। তিনি যা করেছেন তাতে তিনি তাঁর পদের মর্যাদা রাখতে পারেননি। ‘ব্যক্তির চেয়ে সংগঠন বড়’ গণতান্ত্রিক সংগঠনের এই মোদ্দা কথাটাই তিনি একেবারে ভুলে গেছেন। এই কথাটা যদি তাঁর মনে থাকত তাহলে তিনি কখনও এমন কাণ্ড বাধাতে পারতেন না। নিজের কাজের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে তাঁর এখনও কৃষক সভায় ফিরে আসার সময় আছে। আমার অনুরোধ, তিনি তাই করুন।
কৃষক সভার কাজ
ভারতের যে প্রদেশগুলোর উপর দিয়ে দুর্ভিক্ষের ঝড় বয়ে গেছে সে প্রদেশগুলোতে, বিশেষ করে বাংলা দেশের সমাজ জীবনে মস্ত বড় ভাঙন ধরেছে। যা ঘটেছে তা ঘটবে বলে আমরা আগে কখনো ভারতেও পারিনি। কিন্তু তার জন্যে সাহস হারিয়ে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে বসে পড়লে চলবে না। যা ভেঙেছে তাকে আবার নতুন করে গড়ার জন্যে কৃষক সভাকেই এগিয়ে আসতে হবে। আকাল আর মহামারির হামলার সামনে পড়ে কৃষক সভা কখনো হিম্মত হারায়নি। সব রকম দুর্দশার বিরুদ্ধে কৃষক সভা লড়েছে। কৃষক সভা জীবন্ত সংগঠন। যা ভেঙেছে তা গড়ার জন্যে কৃষক সভাকে প্রাণ দিয়ে লড়তে হবে।
দুর্ভিক্ষ আর মহামারির ফলে কৃষকের জমি বেহাত হয়ে গেছে। সেসব জমি ফিরে পাওয়ার জন্যে কৃষক সভাকে লড়তে হবে। জমি না পেলে কৃষকের সমাজ জীবন কিছুতেই গড়ে তুলতে পারা যাবে না। যেখানে যেখানে চাষের উপযোগী জমি আছে সেই জমি বেঁটে দিতে হবে জমিহারা কৃষককে। আইনে যেটুকু সুবিধা দিয়েছে সেটুকু তো আদায় করতেই হবে, যে সুবিধা আইন দেয়নি, সে সুবিধার জন্যেও লড়তে হবে।
তারপরে গ্রামের কারিগরদের কথা। তাঁতীর তাঁতের ব্যবস্থা চাই, সুতো চাই এবং যা দরকার সবই কিছু চাই। জেলেদের জন্যে জাল চাই, নৌকা চাই। অন্য সব কারিগরদের কাজ চালু করার ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্যে যা যা মাল-মসলা দরকার সে সবও পেতে হবে। সকলের জন্যে আবার ঘরবাড়িও চাই। গাঁ-এর কারিগরদের জীবন চালু করার দায়িত্বও কৃষক সভাকেই নিতে হবে। কারণ, কারিগরদের জীবন চালু না হলে কৃষকের জীবনও চালু হবে না।
কৃষক সভা কৃষকদের তাদের পয়দা করা ফসলের ন্যায্য দাম আদায় করে দিতে চায়। মানুষ কিনে খেতে পারবে না এমন ভাবে খাওয়ার ফসলের দাম বাড়ানোর পক্ষপাতী কৃষক সভা নয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কৃষকদের নিত্য ব্যবহারের জিনিসেরও দাম কমানো আবশ্যক। ফসলের সব চাইতে নিচু দর ও সব চাইতে উঁচু দর সরকার বেঁধে দিক। পাটের সব চাইতে নিচু যে দর সরকার বেঁধে দেবে, সেটা হবে পাট যে পয়দা করবে তার কাছ থেকে কেনার দর।
চোরবাজারের বিরুদ্ধে কৃষক সভাকে জোর লড়াই করতে হবে। চোরবাজারের লোকেরা শকুনেরও অধম। শকুন মরা জানোয়ারের মাংস খায়, কিন্তু চোরবাজারের ব্যবসায়ীরা খায় জ্যান্ত মানুষের মাংস। এই চোরবাজারকে ধ্বংস না করতে পারলে সমাজজীবন কিছুতেই গড়ে তুলতে পারা যাবে না। বাঁধা দরে যাতে সকলে, বিশেষ করে কৃষকরা জিনিস পায় সেই ব্যবস্থা কৃষক সভাকে করতে হবে। চোরা কারবারিদের উপর কড়া নজর না রাখলে, তাদের জীবন বিষময় করে না তুললে কিছুতেই তা সম্ভবপর হবে না।
দেশকে খাওয়াবার ভার আছে কৃষকদের উপরে। তার জন্যে কৃষকদের আরো বেশি বেশি ফসল পয়দা করতে হবে। যে সব নদী-নালা বুজে গেছে বলে জল নিকাশ হয় না সে সবের সংস্কার করাতে হবে। যে সব জমি পতিত আছে, খাল কেটে কিংবা বাঁধ বেঁধে সেগুলোকে চাষের উপযোগী করে নিতে হবে। কৃষকদের জন্যে জমি চাই, বীজ চাই, গরু চাই, সার চাই এবং আরো কত কী চাই। খালি হাতে দেশকে বাঁচানো যাবে না। জোর আন্দোলন চালাতে হবে সব কিছু পাওয়ার জন্যে। এই জন্যে সকল দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন চালাতে হবে।
কৃষক সভা জনসাধারণের বিশ্বাসভাজন জাতীয় গভর্নমেন্ট এখনই চায়। কৃষক সভা চায় রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, কৃষক সভা চায় দেশে অবাধ ব্যক্তি স্বাধীনতা। এই দাবিগুলো হাসিল করার জন্যে কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে ঐক্য স্থাপিত হওয়া দরকার। তারই জন্যে কৃষক সভাকে একটানা আন্দোলন চালাতে হবে।
শেষ কথা
কৃষকরা হচ্ছেন দেশের সবচেয়ে বড় অংশ, শতকরা প্রায় ৮০ জন। কৃষক না বাঁচলে, খাওয়ার ফসল পয়দা করে সবাইকে না খাওয়ালে দেশ বাঁচতে পারে না। কৃষক ধ্বংস হলে দেশও ধ্বংস হবে। যিনি যে ভাবেই কামাই রোজগার করুন না কেন তার বেশির ভাগই আসছে কৃষকদের কাছ থেকে। এই কৃষককে বাঁচতে হবে, এবং মানুষের মতো বাঁচতে হবে। তারই জন্যে চাই কৃষকের আপন সংগঠন কৃষক সভা। কৃষক সভার ভিতরে একজোট হয়েই কৃষকরা সব কিছু দেখতে ও বুঝতে শিখবেন। তাই কৃষক সভা হচ্ছে কৃষকের জীবন। এই কৃষক সভাকে কৃষকেরা বাঁচাবেন, সমস্ত শক্তি দিয়েই বাঁচাবেন। কৃষক সভাকে আরো বাড়াতে হবে। কৃষক সভা সকলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়বে।
—নেত্রকোনায় সারা ভারত কৃষক সভার নবম সম্মেলনে সভাপতির ভাষণের সংক্ষিপ্ত অংশ
বাংলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস অনুসন্ধান (তৃতীয় খণ্ড)— সম্পাদনা, মঞ্জুকুমার মজুমদার ও ভানুদেব দত্ত
প্রকাশের তারিখ: ১১-এপ্রিল-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
