Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

মার্কসবাদ ও নন্দনতত্ত্ব

ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ
মার্কসবাদ আর নন্দনতত্ত্বের সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনায় আমাদের প্রতিবন্ধকতা হলো মার্কস-এঙ্গেলস অথবা লেনিন-স্তালিনের মতো অনুগামী এবং এঁদের উত্তরসূরিদের কেউই নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁদের উপলব্ধির কোনো সংকলনগ্রন্থ নির্মাণ করেননি। যদিও, যেমনটি আগে বলা হয়েছে, মার্কস-এঙ্গেলস এবং তাঁদের উত্তরসূরিরা দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দর্শনের যে বিকাশ ঘটিয়েছেন তা শিল্প-সাহিত্যের মতো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ধর্ম, দর্শন ইত্যাদিরও উৎস নির্দেশ করে। এই মার্কসবাদী দর্শনের ওপরে ভিত্তি করেই গোর্কি তাঁর 'ব্যক্তিত্বের বিভাজন' রচনায় মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।
marxbad o nandantotto

মার্কসবাদ আর নন্দনতত্ত্বের মধ্যে কোনো মিলের দিক আছে কি? মার্কসবাদ কি প্রধানত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি সামাজিক-রাজনৈতিক দর্শন নয়? নন্দনতত্ত্বের আলোচনায় সেই দর্শনের কি কোনো ভূমিকা আছে?

এসব প্রশ্ন যাঁরা তোলেন, তাঁরা মার্কসবাদ কী তা বোঝেন না। নিঃসন্দেহে মার্কসবাদ একটি সামাজিক-রাজনৈতিক দর্শন। পুঁজিবাদী সমাজের অর্থনীতি সম্পর্কে অবশ্যই মার্কসবাদের অন্তর্ভেদী বিশ্লেষণ রয়েছে, ভবিষ্যতের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উজ্জ্বল রূপরেখার সঙ্গেও তা যুক্ত। যদিও এই সামাজিক-রাজনৈতিক দর্শন আর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ হাওয়ায় দাঁড়িয়ে নেই। 'ক্যাপিটাল'-এ মার্কসের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে – যে বইতে তাঁর প্রতিভাবান সহকর্মী ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের অসামান্য অবদান সুপরিচিত - মহাবিশ্ব আর সমাজের প্রতি একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি যেন লালচে যোগসূত্রের আকারে প্রবাহমান।

বিদ্যাচর্চার এমন কোনো শাখা নেই, এই পণ্ডিত মানুষ দু'টি যা ছুঁয়ে যাননি। আলোচনার জন্য নির্বাচিত প্রতিটি বিষয়েই তাঁরা বিরল অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের যাবতীয় রচনায়, এমনকি মার্কসের ‘ক্যাপিটাল'-এর মতো 'নীরস' বইতেও প্রায় সবকটি ইউরোপীয় ভাষার চিরায়ত সাহিত্যের উল্লেখ এবং উদ্ধৃতি ছড়ানো রয়েছে। নামী দামী মানুষদের সঙ্গে পত্রালাপের ক্ষেত্রেও সৃষ্টিশীল সাহিত্য আর শিল্প সম্পর্কে তাঁদের গভীর আগ্রহ ফুটে উঠেছে। এইটে কিছু আশ্চর্যের নয়। যৌবনে দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তি স্থাপন করবার পর সারা জীবনব্যাপী তাকে বিকশিত করে তোলার যে কাজ তাঁরা করেছেন, তার মূল আলোচ্য বিষয়ই হলো মানুষ।

মার্কসের 'ক্যাপিটাল' বা মার্কস ও এঙ্গেলসের অন্যান্য রচনা – যেমন ‘জার্মান আইডিওলজি’, ‘অ্যান্টি-ড্যুরিঙ’, ‘অরিজিন অব ফ্যামিলি’ ইত্যাদি, আর তাছাড়া পরস্পরের মধ্যে এবং বিভিন্ন দেশের বহু মানুষের সঙ্গে তাঁদের ব্যক্তিগত অসংখ্য চিঠিপত্র - এইসব কিছু ইঙ্গিত করে যে মানবসমাজের বিবর্তন বিষয়েই তাঁরা উৎসুক ছিলেন। সমাজ বিবর্তনের ক্ষেত্রে শেষ বিচারে অর্থনৈতিক যাপন হলো প্রধান নির্ধারক শক্তি, একথা তাঁরা আবিষ্কার করার পর মানব-ইতিহাসের যে নির্দিষ্ট পর্যায়ে তাঁদের কাজ করতে হচ্ছিল - অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের পূর্বসূরি পুঁজিবাদের উদ্ভব আর বিকাশের পর্যায় - তার অর্থনৈতিক বিকাশের বিশ্লেষণেই তাদের মনোযোগ ছিল সবচাইতে বেশি। তাঁদের সময়ের বুর্জোয়া চিন্তানায়করা যখন ‘অর্থনৈতিক মানুষ’-এর ধারণায় মশগুল, মার্কস আর এঙ্গেলস কিন্তু জানতেন যে মানবসমাজের অংশ একজন ব্যক্তিমানুষ একটা জটিল ব্যাপার। অর্থনীতি, রাজনীতি, দর্শন, কলাবিদ্যা, বিজ্ঞান যা কিছু ব্যক্তিমানুষ এবং যৌথভাবে মানবসমাজের সৃষ্টি, মানুষের ব্যক্তিত্ব তার সবকিছুরই সমন্বিত রূপ।

এর মধ্যে অর্থনীতির অবশ্যই একটি অদ্বিতীয় ভূমিকা আছে, যেহেতু শেষ বিশ্লেষণে সামাজিক পরিবর্তনের প্রকৃতি এবং রূপ নির্ধারণ করে অর্থনীতি। কিন্তু এঙ্গেলস যেমন বলেছিলেন, ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হচ্ছে ভিত্তি, কিন্তু উপরিকাঠামোর বিভিন্ন উপাদান — শ্রেণীসংগ্রামের রাজনৈতিক রূপ ও পরিণতি, যেমন কোনো একটি যুদ্ধ বা অনুরূপ সাফল্যের পরবর্তী সময়ে বিজয়ী শ্রেণীর দ্বারা গঠিত শাসনতন্ত্র, আইনগত কাঠামো, এবং এমনকি সংগ্রামে অংশগ্রহণকারীদের চেতনায় এই সমস্ত সংগ্রামের প্রতিফলন; রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, দার্শনিক তত্ত্ব, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মীয় আচারের মধ্যে তার পরিণতি – ঐতিহাসিক সংগ্রামের পর্যায়ে এসব কিছুরই প্রভাব পড়ে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংগ্রামের রূপটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। এই সমস্ত উপাদানের পারস্পরিক ক্রিয়ার মধ্যে অসংখ্য আকস্মিক (অর্থাৎ এমন কতকগুলো বস্তু এবং ঘটনা যাদের অন্তর্বর্তী ক্রিয়া এতটাই দুর্নিরীক্ষ্য বা অপ্রমেয় যে তাদের উপস্থিতি অগ্রাহ্য করা যেতে পারে) ঘটনাবলীর ধারক ও বাহক অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতিই মুখ্য হয়ে ওঠে।’

'ক্যাপিটাল'-এর মতো 'নীরস' বইয়ের পাতায় পাতায় ইউরোপীয় ভাষার প্রধান লেখকদের চিরায়ত সাহিত্যের উল্লেখ এবং উদ্ধৃতি, কোনও আকস্মিক ব্যাপার নয়। 'ক্যাপিটাল' ছাড়া মার্কসের অন্যান্য রচনায় এবং এঙ্গেলসের রচনার ক্ষেত্রেও এগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল একটি বৈজ্ঞানিক সত্যকে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য, যে বিপ্লবী রাজনীতির যা ভিত্তি – সেই রাজনৈতিক অর্থনীতি, মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ ফসলগুলোর সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। 'বানর থেকে মানুষ'-এ (এঙ্গেলস) বিবর্তনের ধারায় হাজার হাজার বছরের সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাবলী, শিল্পকলার প্রতিটি শাখার সৃষ্টিকাজ, এবং প্রাচীন বর্বর অবস্থা থেকে বর্তমান সভ্যতায় ধারাবাহিক উত্তরণের সময় জুড়ে মানুষের যাবতীয় পরিশীলন – সবকিছুই সামগ্রিকভাবে মানবসমাজের ফসল। সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, মার্কসবাদী দর্শনের একান্ত অনুরাগী ম্যাক্সিম গোর্কি কীভাবে এই গোটা প্রক্রিয়ার চরিত্রলক্ষণগুলো ধরিয়ে দিচ্ছেন তা কৌতূহলের বিষয় এবং অবশ্যই ব্যবহারযোগ্য :

‘জনগণ এমন একটা শক্তি যা শুধুমাত্র বস্তুগত মূল্যই সৃষ্টি করেনি; তারা হলো আধ্যাত্মিক মূল্যের স্বতন্ত্র এবং অনিঃশেষ উৎস; কালের বিচারে, সৌন্দর্যের বিচারে এবং প্রতিভার বিচারে সামগ্রিকভাবে তারা প্রথমসারির ও প্রবীণতম দার্শনিক ও কবি, যাবতীয় মহান কাব্য আর পৃথিবীর সমস্ত ট্র্যাজেডির স্রষ্টা, এবং শ্রেষ্ঠতম ট্র্যাজেডি অর্থাৎ পৃথিবীর সাংস্কৃতিক ইতিহাসের স্রষ্টাও বটে।'

গোর্কির যে রচনা থেকে উদ্ধৃতিটি নেওয়া তার তাৎপর্যপূর্ণ শিরোনাম হলো ‘ব্যক্তিত্বের বিভাজন'। সমস্ত ভারতীয় ভাষার মার্কসবাদী লেখকের প্রতি আমার বিনীত পরামর্শ, গোর্কির এই অসামান্য রচনাটি তাঁরা যেন নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করেন। এর ফলে লেখক, সমালোচক এবং সাহিত্যের সাধারণ পাঠক যাঁরা সাংস্কৃতিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গভীর আগ্রহী - অর্থাৎ ক্রমবর্ধমান মার্কসবাদী প্রজন্ম – তারা বুঝতে পারবেন মার্কসবাদী বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে শিল্পসৃষ্টি আর সমালোচনা কীভাবে সম্পর্কযুক্ত। মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্ব বলতে আমরা এইটেই বুঝি।

মার্কসবাদ আর নন্দনতত্ত্বের সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনায় আমাদের প্রতিবন্ধকতা হলো মার্কস-এঙ্গেলস অথবা লেনিন-স্তালিনের মতো অনুগামী এবং এঁদের উত্তরসূরিদের কেউই নন্দনতত্ত্ব সম্পর্কে তাঁদের উপলব্ধির কোনো সংকলনগ্রন্থ নির্মাণ করেননি। যদিও, যেমনটি আগে বলা হয়েছে, মার্কস-এঙ্গেলস এবং তাঁদের উত্তরসূরিরা দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদী দর্শনের যে বিকাশ ঘটিয়েছেন তা শিল্প-সাহিত্যের মতো বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ধর্ম, দর্শন ইত্যাদিরও উৎস নির্দেশ করে। এই মার্কসবাদী দর্শনের ওপরে ভিত্তি করেই গোর্কি তাঁর 'ব্যক্তিত্বের বিভাজন' রচনায় মার্কসবাদী নন্দনতত্ত্বের কিছু বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন।

১. প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রামের মধ্যে থেকেই, মানবসমাজের ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে ধর্মের উদ্ভব হয়। একেবারে শুরুতে মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামে ভয়, বিস্ময় আর মুগ্ধতার মুখোমুখি খালি হাতে দাঁড়িয়ে আত্মরক্ষার তাগিদে ধর্মের সৃষ্টি করেছিল। ধর্মই মানুষের কাব্য; প্রাকৃতিক শক্তি সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের এবং পরিবেশের প্রতিকূল উপাদানগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের অভিজ্ঞতার সারাৎসার। প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধে প্রথম জয় মানুষের মধ্যে যে স্থায়িত্বের অনুভূতি, আত্মবিশ্বাস এবং জয়ের তাগিদ তৈরি করেছিল তারই ফলে সৃষ্টি হয় মহাকাব্যসুলভ বীরগাথা; মানুষের আত্মজ্ঞান এবং চাহিদার আকর হিসেবে যার পরিণতি। এইভাবেই পুরাণ এবং মহাকাব্যিক রচনা ক্রমশ মিলেমিশে যেতে থাকে, কেননা বীরগাথার নায়কের মধ্যে তার সামগ্রিক চেতনার সমস্ত শক্তি অর্পণ করে মানুষ হয় তাকে দেবতার প্রতিস্পর্ধী করে তুলেছিল অথবা তাকে দেবতাদের মধ্যে স্থান দিয়েছিল।

২. যদিও ধর্ম আর তার সৃষ্টি ঈশ্বর, শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয় এবং তার বিরুদ্ধে মানুষকে লড়াই করতে হয়। তাই মানুষকে আবার তার সঙ্গে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়, যেহেতু ধর্মের কল্পনার মধ্যে মানুষের সঙ্গে ঈশ্বরের প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি ছবি মানবসমাজকে যৌথভাবে সৃষ্টি করতে হয়েছিল। 'মানুষের সঙ্গে দেবতাদের যুদ্ধ', গোর্কি বলছেন, ‘প্রমিথিয়ুসের মতো বিস্ময়কর কল্পনাকে অবলম্বন করে প্রতিভা এবং সৃষ্টিশীলতায় বিশ্বাসের সর্বোচ্চ প্রতীকে আরোহণ করেছিল, যেহেতু এই প্রতীকই মনুষ্যত্বের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ এবং ঈশ্বরের সঙ্গে সমানানুভূতি লাভের উপায়।

৩. যদিও অবশেষে ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ে গোষ্ঠীগতভাবে মানুষের মধ্যে অথবা মানবসমাজের মধ্যে একটি নতুন ঘটনার সূত্রপাত হলো, যাকে বলা হয় ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এর ফলেই – গোর্কির মতে – ‘ব্যক্তি আর সমাজের মধ্যে এক নৈরাজ্যমূলক সংগ্রামের উৎপত্তি, বিশ্বের ইতিহাস থেকে যার ছবি আমরা পেতে পারি, এবং যে সংগ্রাম আজকের বিধ্বস্ত ও ব্যর্থ ব্যক্তিমানুষের ক্ষমতার বাইরে।

ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে, তাদের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে এবং অমীমাংসাযোগ্য এক বিরোধ জন্ম নেয়। দারিদ্র্য থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তার সর্বশক্তি নিয়োগ করতে বাধ্য হয়। ব্যক্তিগত স্বার্থ সুরক্ষিত করতে গিয়ে জনগোষ্ঠী, রাষ্ট্র এবং সমাজের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষ তার সমস্ত যোগসূত্র হারিয়ে ফেলে; আজকের ব্যক্তিমানুষ অত্যন্ত কষ্টকরভাবেই দলগত শৃঙ্খলার অনুবর্তী হয়ে থাকে এবং পারিবারিক বন্ধনও তার পক্ষে সমান উদ্বেগের কারণ।

সমষ্টির বিভাজন এবং এক স্বনির্ভর 'আমি'-র সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভূমিকা বিষয়ে সবাই অবহিত; যদিও মানুষের শারীরিক এবং নৈতিক দাসবৃত্তির পাশাপাশি জনগণের কর্মচাঞ্চল্যের ক্ষয়প্রাপ্তি, সমষ্টির মহত্তম, কাব্যময় এবং স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিশীল মানসিকতা যা অসংখ্য অসামান্য শিল্পের জন্ম দিয়ে পৃথিবীকে সম্পদশালী করে তুলেছে, সেই সৃষ্টিশীলতার ধারাবাহিক পতন সম্পর্কে আমাদের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

সাহিত্যে এই ঘটনার প্রভাব কীভাবে পড়েছে তা প্রাচীন যুগের নায়ক প্রমিথিয়ুস আর উনিশ শতকের ম্যানফ্রেডের মধ্যে গোর্কির তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যেতে পারে। 'বহু ম্যানফ্রেড সৃষ্টি করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি করে - ব্যক্তি জীবনের রহস্যময়তা, পৃথিবীর বুকে মানুষের একাকীত্বের যন্ত্রণা, কখনো বা মহাবিশ্বে নিঃসঙ্গ পৃথিবীকে আশ্রয় করে এক বেদনাময় অনুভবে যার উত্তরণ – অত্যন্ত সমবেদনাপূর্ণ শোনালেও আদৌ প্রতিভাশালী নয়। ম্যানফ্রেড হচ্ছে প্রমিথিয়ুসের এক উনিশ শতকীয় হাস্যকর অনুকরণ, একজন সূক্ষ্মবোধহীন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীর সুন্দর প্রতিকৃতি, যে কিনা নিজেকে এবং অব্যবহিত মৃত্যুকে ছাড়া বিশ্বের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে অনুভূতি চিরকালের জন্য হারিয়ে ফেলেছে। এই ‘আমি’-টির একমাত্র সুখ অক্লান্তভাবে নিজের অসুখ এবং নিশ্চিত মৃত্যুর কথা আবৃত্তি করা : ম্যানফ্রেড থেকে শুরু করে তার মতো নিঃসঙ্গ খাটো মাপের মানুষদের সবার ক্ষেত্রেই শোকগাথা কীর্তনে যার অভিরুচি।

৪. ‘ব্যক্তিত্বের বিভাজন'-এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিকাশ, পুঁজিবাদী সমাজে যার চূড়ান্ত পরিণতি, তার বিপরীতেই রয়েছে নতুন সমন্বয় - আধুনিক শ্রমিকশ্রেণী, সমস্ত শ্রেণীর শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধিরা যাদের সঙ্গে একই সারিতে পা মিলিয়েছে।

‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ যখন মৃত্যুশয্যায়, পুঁজিবাদ তার নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেই নির্মম হাতে সমষ্টিকে নতুনভাবে সৃষ্টি করছিল, প্রোলেতারিয়েতকে যূথবদ্ধ করে একটি দৃঢ় নৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে। এই নতুন শক্তি ক্রমশই দ্রুত উপলব্ধি করতে পারছিল যে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সমষ্টির প্রতিভূ হিসেবে জীবনকে স্বাধীনভাবে সৃজন করে নেওয়ার মহান দায়িত্ব তাদের ওপরেই ন্যস্ত হয়েছে।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীর প্রতিক্রিয়া এ ক্ষেত্রে কীরকম? গোর্কি বলছেন, 'নতুন এই শক্তির উত্থান (ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের চোখে) দিগন্তে ঝোড়ো মেঘের মতো। শরীরের পক্ষে যেমন মৃত্যু, প্রোলেতারিয়েতও তাদের পক্ষে সমান আতঙ্কের কারণ, কেননা প্রোলেতারিয়েত তাদের সামাজিক মৃত্যুর পূর্বাভাস। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদীদের প্রত্যেকেরই ধারণা তাদের 'আমি'-টি বিশেষ গুরুত্ব এবং উচ্চ প্রশংসার দাবি রাখে অথচ পৃথিবীতে নতুন জীবনের সন্ধান যারা দেবে সেই প্রোলেতারিয়েতরা এসব ‘অভিজাত মননশীল লোক' বাবদে বেশি সৌজন্য দেখাতে নারাজ। ভদ্রমহোদয়েরা সে বিষয়ে ওয়াকিবহাল বলেই প্রোলেতারিয়েতের প্রতি তাঁদের আন্তরিক ঘৃণা।

মননগত দেউলেপনা, স্ববিরোধিতায় বিপর্যস্ত অবস্থা আর সুবিধেমাফিক মাথা গোঁজার সমস্ত হাস্যকর প্রচেষ্টার মধ্যেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের ক্ষয় শুরু হয়ে গেছে এবং ক্রমেই তার মানসিক দৈন্য ফুটে উঠছে। এইটে বুঝেই হতাশা (যা উপলব্ধির মধ্যে আসতেও পারে অথবা লুকিয়ে রাখাও সম্ভব) কাটিয়ে ওঠার তাগিদে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ আশ্রয়ের খোঁজে বিক্ষিপ্তভাবে ছোটাছুটি করে অধিবিদ্যার চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে, অথবা উলটোটা, ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেও শয়তানের ওপর আস্থা রাখতে প্রস্তুত হচ্ছে। সমস্ত প্রার্থনা আর যন্ত্রণাই প্রমাণ করছে তার আসন্ন মৃত্যুর পূর্বাভাস, অপ্রতিরোধ্য ভবিষ্যতের আতঙ্ক; সচেতনভাবে উপলব্ধির মধ্যে যদি নাও আসে, এই আতঙ্ক নিশ্চিতভাবেই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ অনুভব করতে পেরেছে।

‘আজকের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী’, গোর্কি বলে চলেন, 'সংশয় আর অবসাদের কবলে পড়েছে। সে আশ্রয়হীন, জীবনকে আঁকড়ে ধরে থাকার সমস্ত চেষ্টা করে চলেছে অথচ শক্তি নেই, এবং একমাত্র সহায় তার চাতুর্য, যাকে কেউ কেউ 'নির্বোধের বিচক্ষণতা' বলে থাকেন। সে নিজের অতীতের ধ্বংসাবশেষ, মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত এবং আত্মবিক্ষোভে দীর্ণ, কখনো সমাজতন্ত্রের চাটুকার কখনো বা পুঁজিবাদের মোসাহেব, তার দুর্বল ও অসুস্থ 'আমি'- টি যতই ক্ষয়ে যেতে থাকে নিজের আসন্ন সামাজিক মৃত্যু সম্পর্কে সে ততই সচেতন হয়ে ওঠে। হতাশা তাকে প্রায়শই ছিদ্রান্বেষী করে তোলে, যার ধ্যানে কাল পর্যন্তও বুঁদ হয়েছিল সেসব কিছুই উন্মাদের মতো অস্বীকার করতে থাকে এবং ধ্বংস করতে চায়, সবকিছু অস্বীকার করবার এই প্রবণতা বাধ্যতামূলকভাবেই তাকে মাস্তানের মানসিকতার কাছাকাছি ঠেলে নিয়ে যায়।

মাস্তান শব্দটি, গোর্কি স্পষ্ট করেই বলছেন, অপমান করবার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়নি। বরং এইটে এক ধরনের প্রবণতাকে নির্দেশ করে, যে প্রবণতা, 'ব্যক্তিত্বের শারীরিক ও মানসিক অবনতির ফল এবং তার চূড়ান্ত ক্ষয়ের নির্ভুল প্রমাণ। এইটে খুব সম্ভব সামাজিক অপুষ্টিজনিত কারণে সেরিব্রাল কর্টেক্সের এক দুরারোগ্য ব্যাধি ; ইন্দ্রিয়গুলোর পক্ষে যন্ত্রণাদায়ক, সেগুলো ক্রমশ বোধশক্তিহীন আর মন্থর হয়ে পড়ে এবং পরিবেশের প্রতিফলনও নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে না, ফলে বুদ্ধিবৃত্তি তার অনুভূতি হারিয়ে ফেলতে থাকে।’

সুতরাং অর্থনীতি এবং রাজনীতির মতোই শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রেও পুঁজিবাদের অভিঘাত দুটো সামাজিক শক্তিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—নবগঠিত সমষ্টির আকারে সঙ্ঘবদ্ধ শ্রমিকশ্রেণী এবং বিভাজিত ব্যক্তিত্বের রূপে সমাজের প্রোলেতারিয়েতবিরোধী অংশ। মানবসমাজের বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই দুটো শক্তির বিরোধ এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে যখন গোটা বিশ্বের কাছে ধ্বংসের আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় মুসোলিনি-হিটলারের ফ্যাসিবাদ। বুর্জোয়া পৃথিবীর ব্যক্তিত্বের বিভাজনের চেহারা ফুটে উঠেছিল ফ্যুয়েরার আর ডিউসের হিংসায় উন্মত্ত আচরণে, সেদিন নবগঠিত সমষ্টি আত্মপ্রকাশ করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের মাধ্যমে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল পুঁজিবাদী দুনিয়ার সঙ্ঘবদ্ধ শ্রমিকশ্রেণী, গোটা ঔপনিবেশিক দুনিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এবং প্রতিটি দেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী মানুষ।

অন্যান্য চিন্তানায়কদের সঙ্গে সঙ্গে গোর্কিও একটি সোজা সরল প্রশ্ন তুলেছেন : 'দুনিয়ার সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব, আপনারা কোন দিকে?’ এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো ভারতের সাংস্কৃতিক জগতেও একটি আন্দোলনের সূত্রপাত হয়, প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘ, ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ প্রভৃতি সংগঠনগুলি তাতে শামিল হয়েছিল। এই আন্দোলনের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্যকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে কেরালার দেশাভিমানী পাঠচক্র সচেষ্ট।

ভারতের স্বাধীনতার পরবর্তী কিছু বছরে এই আন্দোলন অত্যন্ত কঠিন সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। যে রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে এই সঙ্কটের উদ্ভব, অন্যত্র সে বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, তখন কেউ কেউ মনে করেছিলেন যে রাজনৈতিক স্বাধীনতালাভের সঙ্গে সঙ্গেই সাম্রাজ্যবাদ এবং দেশের অভ্যন্তরে তার প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে সংগ্রাম শেষ হয়ে গেছে, আবার কেউ রাজনৈতিক স্বাধীনতালাভকে কোনো গুরুত্বই দিতে চাননি। সেই সঙ্কটের পরবর্তী তিন দশকেরও বেশি সময় প্রমাণ করেছে এই দু'ধরনের উপলব্ধিই কতটা ভিত্তিহীন ছিল এবং সেগুলোর সংশোধনও ঘটেছে। এই বিতর্কের আর একটি দিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত : বিপ্লবী সাহিত্য নাকি নান্দনিক বিচারে উৎকৃষ্ট সহিত্য ? শিল্পসৃষ্টি সম্পর্কে গোর্কির উপলব্ধি ('ব্যক্তিত্বের বিভাজন' ছাড়াও অন্যান্য রচনায় তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন) এক্ষেত্রে আমাদের পক্ষে সহায়ক হবে।

বিজ্ঞানের সঙ্গে শিল্পের তুলনা করতে গিয়ে গোর্কি বলছেন : প্রথমটি হলো 'মননের কাব্য' আর দ্বিতীয়টি ‘হৃদয়ের কাব্য'। তিনি ব্যাখ্যা করছেন : ‘বিজ্ঞান আর ভাষাশিল্পের মধ্যে অনেক মিলের দিক রয়েছে। দুটোর ক্ষেত্রেই পর্যবেক্ষণ, তুলনা আর বিশ্লেষণ প্রধান ভূমিকা পালন করে থাকে; লেখক এবং বৈজ্ঞানিক উভয়ের পক্ষেই কল্পনাশক্তি আর প্রজ্ঞা এই দুটো জিনিস বাধ্যতামূলক।

কল্পনাশক্তি আর প্রজ্ঞা তথ্য-শৃঙ্খলের ফাঁকগুলো ভরাট করতে সাহায্য করে, বৈজ্ঞানিক যার সাহায্যে প্রকল্প এবং তত্ত্ব নির্মাণ করেন, এবং এটি প্রাকৃতিক শক্তি এবং ঘটনাবলী সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসাকে মোটামুটিভাবে সাফল্যের সঙ্গে চালনা করে থাকে। প্রাকৃতিক ঘটনাবলীকে ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে মানুষের চেতনা, মানব সংস্কৃতির নির্মাণ করে যা কিনা আমাদের ‘দ্বিতীয় প্রকৃতি'।

সাহিত্যিক সৃষ্টিশীলতার শিল্প, বিভিন্ন চরিত্র এবং তাদের কিছু বিশেষ 'টাইপ' সৃষ্টি করার সময় কল্পনাশক্তি এবং উদ্ভাবনীশক্তি দাবি করে। ধরা যাক একজন দোকানদার, সরকারী কর্মচারী বা শ্রমিকের চরিত্র নির্মাণের সময় লেখক যদি তাঁর পরিচিতির মধ্যে থেকে একজন ব্যক্তির মোটামুটি নির্ভরযোগ্য ফটোগ্রাফ তুলে থাকেন, ন্যূনতম সামাজিক বা শিক্ষণীয় কোনো গুরুত্ব ব্যতিরেকে সেইটে একটা ফটোগ্রাফের চাইতে বেশি কিছুই হবে না এবং মানুষ বা তার জীবন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানভাণ্ডারকে বাড়িয়ে তোলার ব্যাপারে আদৌ কোনো কাজে লাগবে না।

কিন্তু যদি বিশ, পঞ্চাশ বা এমনকি একশো জন দোকানদার, সরকারী কর্মচারী বা শ্রমিকের বিশেষ চরিত্রগত শ্রেণীলক্ষণ, অভ্যাস, রুচি, হাবভাব, বিশ্বাস এবং বাগধারা ইত্যাদির সারটুকু ছেঁকে নিয়ে একজন নির্দিষ্ট দোকানদার, সরকারী কর্মচারী বা শ্রমিকের চরিত্রে সংহত এবং মূর্ত করে তোলার কাজে লেখক সক্ষম হন তখনই তিনি একটা বিশেষ ‘টাইপ' সৃষ্টি করেন এবং সেইটেই শিল্প হয়ে ওঠে। তাঁর পর্যবেক্ষণের বিস্তার এবং জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা প্রায়শই লেখককে এমন একটি ক্ষমতা দান করে যার ফলে তথ্যের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত মনোভঙ্গি, বা অন্যভাবে বলতে গেলে ব্যক্তিগত প্রবণতাকেও নস্যাৎ করে দেয়...

বেঁচে থাকার সংগ্রামে আত্মরক্ষার প্রবণতা মানুষের মধ্যে দুটো মূল্যবান সৃষ্টিশীল ক্ষমতার জন্ম দিয়েছে — জ্ঞান আর কল্পনাশক্তি। জ্ঞান, অর্থাৎ বোধশক্তির ক্ষমতার দরুন প্রাকৃতিক ঘটনাবলী আর সমাজজীবন সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ, তুলনা আর বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় ; সংক্ষেপে বলতে গেলে জ্ঞান মানে চিন্তা করার সামর্থ্য। কল্পনাশক্তি বলতেও পৃথিবী সম্পর্কে এক ধরনের চিন্তা পদ্ধতি বোঝায়, কিন্তু ব্যাপারটা হলো চিন্তাকে ছবির আকারে ফুটিয়ে তোলা। বলা যেতে পারে কল্পনাশক্তি হচ্ছে বস্তু সম্পর্কে এবং প্রকৃতির মৌলিক শক্তিসমূহ, মানুষের গুণাবলী, অনুভূতি ও এমনকি প্রবণতা সম্পর্কে বৈশিষ্ট্য আরোপ করবার ক্ষমতা।’

সুতরাং প্রতিভাবান মানুষ, যাঁরা নান্দনিক বিচারে অনবদ্য শিল্প সৃষ্টি করেছেন, আর মানবসমাজের সমষ্টির মধ্যে গোর্কি কোনো বিরোধ খুঁজে পাননি। তাঁর চোখে দুটো পরস্পরের পরিপূরক। তিনি বলছেন, 'সমস্ত দেশের মহান কবিদের শ্রেষ্ঠ রচনা মানুষের সঙ্ঘবদ্ধ সৃষ্টিশীল কাজের ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে, প্রাচীন সময় থেকে সমস্ত সর্বজনীন কাব্য, সমস্ত বিখ্যাত ছবি এবং বিশিষ্ট চরিত্র এই উৎস থেকেই আহরণ করা হয়েছে।

ঈর্ষাপরায়ণ ওথেলো, দ্বিধাভক্ত হ্যামলেট এবং লালসাময় ডন জুয়ানের মতো বিশিষ্ট চরিত্র শেক্‌সপিয়র আর বায়রনেরও আগে মানুষই সৃষ্টি করেছে... এদের বিখ্যাত করে তোলার পেছনে কবিদের কৃতিত্ব আমি কোনোভাবেই অস্বীকার করতে চাই না এবং তাঁদের খাটো করে দেখানোর কোনো উদ্দেশ্যও আমার নেই, কিন্তু জোর দিয়েই বলতে চাই যে যদি ব্যক্তিগত সৃষ্টিশীলতার শ্রেষ্ঠ নমুনাগুলো আমাদের আশ্চর্যসুন্দর পল-কাটা রত্ন উপহার দিয়ে থাকে, এবড়ো-খেবড়ো হীরেগুলো কিন্তু অবশ্যই সমষ্টিভুক্ত জনসাধারণের মধ্যে থেকে পাওয়া গিয়েছিল। ব্যক্তিমানুষেরই শিল্পসত্তা থাকে, কিন্তু সৃষ্টিশীলতা শুধুমাত্র সমষ্টির। মানুষই জিউসকে সৃষ্টি করেছিল, ফিদিয়াস তাকে মার্বেল পাথরে রূপ দিয়েছিলেন মাত্র।’

আত্মসমালোচনার খাতিরে আমাদের স্বীকার করা উচিত - বৈপ্লবিক বিষয়বস্তু নাকি নান্দনিক বিচারে উৎকৃষ্ট নির্মাণ, কোনটি গুরুত্বপূর্ণ - আমাদের (প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘের) এই প্রশ্নটিই ভুল ছিল। বৈপ্লবিক বিষয়বস্তু এবং নান্দনিক বিচারে উৎকৃষ্ট নির্মাণ - দুটোই জনগণের সৃষ্টি : প্রথমে প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম, তারপরে সমাজের শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়েই বৈপ্লবিক বিষয়বস্তুর ভিত্তিতে নান্দনিক বিচারে উৎকৃষ্ট শিল্প সৃষ্টি হয়েছে। এই কারণেই, পুঁজিবাদী যুগের অর্থনীতি আর রাজনীতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রেও দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের স্রষ্টাদের মানব সমাজের সংস্কৃতির সমস্ত ধারার গভীরে প্রবেশ করতে হয়েছিল, শুধুমাত্র প্রাচীন ইতিহাসের সময় থেকে বিচার করেই নয়, প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। এর ফলেই প্রোলেতারীয় নন্দনতত্ত্বের মূল সূত্রগুলো তাঁরা নির্দেশ করতে পেরেছিলেন, যেগুলো তখন খসড়ার আকারে ছিল। রাশিয়ায় প্লেখানভ, গোর্কি আর লুনাচারস্কি এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আরো অনেক মানুষ তাকে বিকশিত করে তুলেছেন। 


লেখাটি নেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড কর্তৃক প্রকাশিত ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ নির্বাচিত রচনা সংকলনের প্রথম খণ্ড (২০১০) থেকে। লেখাটি অনুবাদ করেছেন কৌস্তুভ বন্দ্যোপাধ্যায়।


প্রকাশের তারিখ: ১৩-জুন-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৫১ টি নিবন্ধ
২৫-মে-২০২৬

২২-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬