সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
যখন ওরা প্রথমে মুঘলদের জন্য এসেছিল
অর্কপ্রভ সেনগুপ্ত
যাকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা অনেকের চোখেই সঙ্গত ভাবেই ধরা দিয়েছে রাজনৈতিক ভাবে ইতিহাসের পাঠ্যক্রমকে প্রভাবিত করারই আরেক প্রচেষ্টা রূপে। এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে যেটুকু সন্দেহ এরপরেও পড়ে থাকে, তাও মুছে যায় যখন আমরা দেখি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মুখপত্র অর্গানাইজার-এ খবর প্রকাশিত হয়েছে ইতিহাসের এই ব্যবচ্ছেদকে সোৎসাহে সমর্থন জানিয়ে।

সরকার মহোদয় যখন বিপজ্জনক বইগুলোকে
প্রকাশ্যে দগ্ধ করার দিলেন আদেশ, সর্বত্র যখন
বলদটানা গাড়ি বোঝাই বই-এর স্তূপ
চলল চিতার দিকে ; নির্বাসিত এক কবি,
সাহিত্যকূলচুড়ামণি, জেনে ক্রুদ্ধ হলেন
যে তাঁর বইগুলো গেছে বাদ।
উষ্মায় পাখায় ভেসে গেলেন লেখার টেবিলে,
ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশ্যে লিখলেন এক পত্র।
পোড়াও আমায়, ছুটন্ত কলম লিখলেন কবি, আমায় পোড়াও।
এমন করে না, ছিঃ, আমায় বাদ দিতে নেই।
আমার বইয়ে সদাসর্বদা বলেছি সত্য কথা,
আর কিনা আজ আমায় মিথ্যাবাদী বলো ?
আদেশ দিচ্ছি : পোড়াও আমায়।
বই-পোড়ানো উৎসব, বের্টোল্ট ব্রেখট
এই প্রবন্ধের শিরোনাম যে বিষয়ে, সেই বিষয়ে লেখা শুরু করার পূর্বে মনে হলো উৎপল দত্তের অনুবাদে বের্টোল্ট বেখটের এই কবিতাটি একবার ঝালিয়ে নেওয়া জরুরি। শাসকরা যখন কবিতার বইয়ের বহ্ন্যুৎসব করেন তখন কবিতার দেবী ক্যালিওপির সাধকদের, সে তিনি ব্রেখটের কবিতার ‘সাহিত্যকূলচূড়ামণি’-ই হোন, কি একান্তে নিজের ডায়েরির পাতায় কাব্যসাধনা করা কবিই হোন, তাঁদের নৈতিক দায়িত্ব থাকে প্রতিবাদ করার। তিনি যদি মৌন থাকেন, তাহলে তিনি চান বা না চান, শাসক তাকে ধরে নেয় সম্মতির লক্ষণ হিসেবেই। একই যুক্তি ইতিহাসের দেবী ক্লিও-এর সাধকদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। অন্য কোনও সময় হলে, যে কালপর্বের ইতিহাস নিয়ে এই প্রবন্ধে কিছু কথা লেখার প্রয়াস করছি, সেই মুঘল যুগ নিয়ে কথা বলার ধৃষ্টতা আমার কাছে ছিল কল্পনার অতীত। নিজের সম্পূর্ণ অধিগত নয় এমন বিষয়ে মন্তব্য করা ইতিহাসের ছাত্রের কাছে মহাপাপ। কিন্তু বর্তমানে চলা পাঠ্যপুস্তক বিতর্কের প্রেক্ষিতে মৌন থেকে ‘মিথ্যাবাদী’-দের দলে নাম লেখানোর ভয় এতোই চেপে ধরেছে, এই পাপ তুচ্ছ বোধ হল। তাই এই লেখার অবতারণা।
বিতর্কের সূত্রপাত ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশানাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেইনিং (এন.সি.ই.আর.টি) কর্তৃক নতুন শিক্ষাবর্ষের জন্য পাঠ্যপুস্তক সংশোধনের মধ্যে দিয়ে। কোভিড-১৯ মহামারীর প্রেক্ষিতে ছাত্রদের উপর পড়াশোনার চাপ হ্রাস এবং ২০২০-এর জাতীয় শিক্ষা নীতি অনুসারে ছাত্রদের উপর তথ্যের ‘বোঝা’ কমানো – এই দুই জোড়া অজুহাতকে ঢাল করে ইতিহাস এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বেশ কিছু ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ বিষয় ছেঁটে ফেলাই সঠিক মনে করেছেন এন.সি.ই.আর.টি-এর কর্তাব্যক্তিরা। পাঠ্যক্রমের ‘র্যাশনালাইজেশন’-এর নামে এই গোটা পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, অন্ততঃ ইতিহাসের ক্ষেত্রে গান্ধী হত্যা, গুজরাট দাঙ্গা বা ইসলামের উত্থানের পর খলিফাতন্ত্রের ইতিহাস – প্রভৃতি বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর অপছন্দের বিষয়গুলিকেই শুধু বোঝা কমাতে কোতল করার জন্য পাওয়া গেল কোন যুক্তিতে তা দেশের অধিকাংশ ঐতিহাসিকেরই বোধের অতীত। অতীত কার্যকলাপের প্রেক্ষিতে ইতিহাস রচনায় হস্তক্ষেপ বিষয়ে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর বিশ্বাসযোগ্যতা দেশের ঐতিহাসিক মহলে এমনিতেই তলানিতে। এই ঘটনা সেই বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও ধাক্কা দিয়েছে। জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত অধ্যায়-এর যে অপসারণকে কুমীর ছানা বানিয়ে এই বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক ভাবে নিরপেক্ষ (“দেখেছো, আমরা কংগ্রেসেরও অপকর্ম বাদ দিয়েছি, অতএব আমরা নিরপেক্ষ”) দেখানোর যে প্রচেষ্টা চলছে, দেশের অধিকাংশ ঐতিহাসিকের চোখে তাও ধরা দিয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই। ভুলে যাওয়া উচিৎ নয়, সাম্প্রতিক কালে বর্তমান রাজনৈতিক আবহাওয়ার বারংবার তুলনা উঠে এসেছে ভূতপূর্ব জরুরি অবস্থার সঙ্গে। ‘অলিখিত জরুরি অবস্থা’-র অভিযোগ বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর কাছেও যথেষ্ট স্পর্শকাতর বিষয়। তাই যাকে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তা অনেকের চোখেই সঙ্গত ভাবেই ধরা দিয়েছে রাজনৈতিক ভাবে ইতিহাসের পাঠ্যক্রমকে প্রভাবিত করারই আরেক প্রচেষ্টা রূপে। এই পদক্ষেপের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে যেটুকু সন্দেহ এরপরেও পড়ে থাকে, তাও মুছে যায় যখন আমরা দেখি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’-এ খবর প্রকাশিত হয়েছে ইতিহাসের এই ব্যবচ্ছেদকে সোৎসাহে সমর্থন জানিয়ে।
যে বিষয়গুলি পাঠ্যপুস্তক থেকে ছেঁটে ফেলা হলো, তার প্রত্যেকটিই আলাদা আলাদা ভাবে আলোচনার দাবী রাখে। ইতিহাস আমরা পাঠ করি শুধু অতীতকে বুঝতে নয়, আমাদের আকাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যতের সন্ধানে বর্তমানের সঠিক পথের হদিস জানতেও। তাই শাসকগোষ্ঠী কোন কোন অংশ বাদ দিতে ইচ্ছুক, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে কোন পথগুলিকে তাঁরা বন্ধ করে দিতে চান তার নীল নকশাও। বাদ দেওয়া এই বিষয়গুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সম্ভবতঃ মুঘল আমলের ইতিহাসের বিপুল পরিমাণ পাঠ্যবস্তুর উপর কোপ। সপ্তম শ্রেণী-এর ‘আওয়ার পাস্ট – II’ পাঠ্যপুস্তক থেকে মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে একটা বড়ো অংশ বাদ দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুঘল সম্রাটদের কৃতিত্ব আলোচনা, দ্বাদশ শ্রেণী-এর পাঠ্যপুস্তক ‘থিমস ইন ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি – II’ থেকে বাদ পড়েছে ‘কিংস অ্যান্ড ক্রনিকলস : দ্য মুঘল কোর্টস’ নামক অধ্যায়টি। উল্লেখযোগ্য, এই একই পাঠ্যপুস্তকে তার আগের একটি অধ্যায় – ‘পিজেন্টস, জামিন্দার্স অ্যান্ড দ্য স্টেট : এগ্রেরিয়ান সোসাইটি অ্যান্ড দ্য মুঘল এম্পায়ার’ কিন্তু বাদ পড়েনি। এই অধ্যায়টির বাদ না পড়াকে ‘মোটেই মুঘলদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বাদ দেওয়া হয়নি, এই তো একটা অধ্যায় আছে’ এই ভাষ্যের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে যাঁরা এই অধ্যায়টি পড়ে দেখেছেন, তাঁদের কাছে খুব সহজেই এই ভাষ্যের ফাঁকিবাজি ধরা পড়ে যাবে। মুঘল আমলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও সমাজ নিয়ে আলোচনাই এই অধ্যায়ের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক কাঠামোর আলোচনা যেটুকু হয়েছে, তা সেই প্রসঙ্গ ধরেই তৃণমূল স্তরের শাসনকাঠামো নিয়ে। এই অধ্যায়টিতে নিচ থেকে যে মুঘল ভারতের সমাজকে দেখা হয়েছে তারই পরিপূরক ছিল উপর থেকে মুঘল ইতিহাসকে দেখা ‘কিংস অ্যান্ড ক্রনিকলস : দ্য মুঘল কোর্টস’ নামক বাদ পড়া অধ্যায়টি। সুতরাং কার্যক্ষেত্রে শিরোনামে একটি ‘মুঘল’ উল্লেখ আছে এমন একটি অধ্যায় থাকলেও মুঘল রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে এই পাঠ্যপুস্তক পড়ে শিক্ষার্থীরা অন্ধকারেই থাকবে।
প্রশ্ন হলো, মুঘল ইতিহাসে এতো অনীহা কেন ? কারণ বর্তমান শাসক গোষ্ঠী জানে তাঁরা যে হিন্দু বনাম মুসলিম দ্বন্দ্ব-কে ভিত্তি প্রস্তর করে মধ্যযুগের, বিশেষ করে মুঘল যুগের ভারতের ইতিহাস নির্মাণে আগ্রহী তা কোনও পেশাদারী ঐতিহাসিকের সমালোচনার সামনে দাঁড়াতে পারবে না। তাঁদের প্রতি সহানুভূতি রাখেন, এমন কোনও ঐতিহাসিকও তাজমহল আদতে তেজোমহালয়া নামক শিবমন্দির অথবা হলদিঘাটে রাণা প্রতাপই যুদ্ধে জিতেছিলেন অথবা সম্রাট আকবর ধর্মান্ধ মৌলবাদী ছিলেন – এই সব তত্ত্বে সীলমোহর সহজে দেবেন না। সুতরাং এমতাবস্থায় সবথেকে সহজ পন্থা হলো হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে যে ‘বিকল্প ইতিহাস’ ছড়ানো হয় তার বিরুদ্ধে ইতিহাসের ছাত্রদের ভাবতে শেখায়, এমন শিক্ষার উপাদানগুলো যতটা সম্ভব দুর্বল করা যায় তার ব্যবস্থা করা। মুঘলদের রাজরোষের মুখে পড়ার ‘র্যাশনালাইজেশন’ যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে তা হল এই।
এই মুঘলভীতির বিষয়ে ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা সত্যিই অনন্য। তাঁদের মুঘল শাসন নিয়ে সাধারণতঃ দুটি আপত্তি থাকে। এক, মুঘলরা বিদেশী আর দুই, মুঘলরা বিধর্মী। এর ভিত্তিতে তাঁরা মুঘল আমলকে ভারতের ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে বাদ দিতে চান। মজার বিষয় হলো, এই একই কথা চৈনিক মোঙ্গল ইউয়ান আর মাঞ্চু চিং রাজবংশের ক্ষেত্রেও খাটে। দুটি রাজবংশই বিদেশী, যাদের সংস্কৃতি, শাসনভাবনা, রীতি রেওয়াজ সবের সঙ্গেই শাসিতদের যথেষ্ট পার্থক্য ছিল। অথচ ভয়ংকর জাতীয়তাবাদী কোনও হান চৈনিক কখনও বলবে না যে এই দুই রাজবংশ তাদের ইতিহাসের অংশ নয়। ইংল্যান্ড দীর্ঘদিন শাসন করেছে নর্ম্যান রাজারা, যাঁরা সংস্কৃতি দূরে থাক, শাসিতদের ভাষাও জানতেন না। কিন্তু কোনও ইংরেজ জাতীয়তাবাদী কখনও এমন প্রস্তাব করেননি যে নর্ম্যান রাজবংশকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে হবে অথবা নর্ম্যান শাসন ইংল্যান্ডের পরাধীনতার যুগ। ইন্দোনেশিয়া, যে দেশ মুসলিম জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের বৃহত্তম, সেখানকার ইতিহাসে বিধর্মী অভিযোগে মাজাপাহিত অথবা শ্রীবিজয় সাম্রাজ্যের ইতিহাস মুছে ফেলতে হবে, এমন দাবী করার কথা কোনও জাতীয়তাবাদী স্বপ্নেও ভাবতে পারেন না। মাজাপাহিতের প্রবাদপ্রতিম মন্ত্রী ও সেনাপতি মহাপতি গজঃমদ বরং ইন্দোনেশিয়ার জাতীয়তাবাদের সর্বপ্রধান প্রতীক। এই বিষয়গুলি অস্বাভাবিক নয়। জাতীয়তাবাদী মতাদর্শের (এবং ইতিহাসচর্চারও) প্রবণতাই হলো অতীতের গৌরবের আলোকে বর্তমানকে গৌরবান্বিত করা এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমান জাতি রাষ্ট্রের একটি সেতু বন্ধন করা। জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার উদ্দেশ্যই থাকে আধুনিক জাতি রাষ্ট্রের ‘কল্পিত সমাজ’-এর বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা। অবশ্যই এই প্রবণতার মার্কসবাদী ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিভঙ্গিতে বিস্তর সমালোচনা আছে। কিন্তু মোট কথা এই যে, হিন্দু ‘জাতীয়তাবাদী’-রা এই বিষয়ে বিশ্বের আর
সকল জাতীয়তাবাদীদের থেকে অনেকটা আলাদা। তাঁদের ইতিহাসচেতনা বড়ই অদ্ভুত, যার সঙ্গে পৃথিবীর খুব কম স্থানের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার প্রবণতার মিল আছে।
মনে রাখতে হবে মুঘলরা মধ্য়যুগে এমন একটি কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্র গঠন করেছিল যা বিস্তীর্ণ ভারতভূমির এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দীর্ঘ রাজনৈতিক ডামাডোলের পর প্রতিষ্ঠা করেছিল একটি সুসংগঠিত শাসনকাঠামো (যার প্রভাব আজও দেখা যায়) ও আইনব্যবস্থা। রাজনৈতিক এই স্থিতাবস্থা এবং মুঘল সাম্রাজ্যের কেন্দ্রভূমিতে এই দীর্ঘকালীন শান্তি জন্ম দিয়েছিল তুলনামূলক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির। একথা ঠিক, অতীতের আর সবযুগের মতই, এই সমৃদ্ধি থেকে সর্বাপেক্ষা লাভবান হয়েছিল সমাজের উচ্চকোটির কিছু মানুষ। কিন্তু এই মুঘল ভারতের নতুন বৈভবশালী অভিজাত শ্রেণী কোনও বিশেষ ধর্মের ছিল না। সাম্রাজ্যের হিন্দু অভিজাতরা মুসলিম অভিজাতদের মতোই লাভবান হয়েছিলেন। বিশেষ করে সাম্রাজ্যের নিচের স্তরে, অধিকাংশ জমিদারী তাঁদেরই হাতে ছিল। মুঘল রাজদরবারেও হিন্দু অভিজাতদের প্রভাব প্রভাব মুসলমানদের থেকে কোনও অংশে কম ছিল না। মুঘল রাজনৈতিক কাঠামোর তাঁরা ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। রাজস্ব থেকে সেনাবাহিনী – সর্বত্র তাঁদের জন্য দ্বার উন্মুক্ত ছিল।
অন্য আর যে কোনও আধুনিক জাতি রাষ্ট্র নির্মাতা এমন এক অতীতকে লুফে নিত রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী ‘জাতীয়তাবাদী’-রা এই ইতিহাস মুছে ফেলতেই আগ্রহী। কিন্তু কেন ? কারণ আধুনিক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি দাঁড়িয়ে আছে হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে বৈরীভাবই স্বাভাবিক ও সাধারণ অবস্থা এবং মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাস তাঁদের নিরন্তর দ্বন্দ্বের ইতিহাস এই ভাষ্যের উপর। হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ‘জাতীয়তাবাদী’ অংশের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী তার ‘হিন্দুত্ব’ অংশটি। তাই তাঁদের ইতিহাসচেতনার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসচর্চার ধারা মেলে না। বরং মিল পাওয়া যায় মিশরের ইখওয়ান (মুসলিম ব্রাদারহুড)-এর মতো সংগঠনের ইতিহাসবোধের সঙ্গে। খাতায় কলমে নিজেদের একই সঙ্গে ইসলামিস্ট ও জাতীয়তাবাদী দাবী করলেও মুসলিম ব্রাদারহুড কার্যত মিশরের ইসলাম পূর্ব ইতিহাস ‘জেহলিয়া’ বলে মুছে ফেলতেই আগ্রহী। একই প্রকার ভাবে আমরা দেখি ভারতের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ ও তার অনুগামীরাও ‘মুঘল যুগের বিধর্মী পরাধীনতা’-কে ভুলিয়ে দিতে উৎসাহী।
আসলে তাঁরা জানেন মুছে ফেলার প্রচেষ্টা ছাড়া উপায়ও নেই। কোনও পেশাদারী ঐতিহাসিক তাঁদের এই ‘বিধর্মী পরাধীনতা’-এর ভাষ্যে সীলমোহর দেবেন না। মুঘল আমল অবশ্যই আধুনিক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ ছিল না। কিন্তু মুঘল রাজশক্তির বিরোধিতা না করলে সম্রাটরা প্রজাদের ধর্মে হস্তক্ষেপ করতেন না। গুরকানী রাজবংশ (মুঘলরা নিজেদের এই নামেই চিহ্নিত করতেন) জাতিগত ভাবে তুর্ক-মোঙ্গল হলেও, সংস্কৃতিতে ছিলেন পারসিক। পারসিক রাজতান্ত্রের ধারণার সঙ্গে অতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিল ধর্ম দ্বারা রাজনীতিকে প্রভাবিত না হতে দেওয়ার আদর্শ (অবশ্য ধর্মকে রাজনীতির কাছে ব্যবহার করার কোনও বাধা ছিল না, এবং মুঘল সম্রাটরা তা করতেনও)। সাধারণ নাগরিকের যে রাজরোষে ধর্ম খোয়ানোর ভয় ছিল না তার অন্যতম সাক্ষ্য বহন করে সম্রাট আকবরের সমসাময়িক ব্যবসায়ী বনারসী দাসের রচিত আত্নজীবনী ‘অর্ধকথানক’। এ ব্যতীত ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই সময় ‘হয় ধর্মান্তর নয় মৃত্যু’-এর নয়, মোটের উপর ছিল ধর্মীয় সহনশীলতা এবং আদানপ্রদানের যুগ। ধর্মীয় বিবাদ অবশ্যই ছিল, কিন্তু যৌথ ধর্মীয় সাধনার প্রবণতা তার তুলনায় এতটাই অধিক ছিল, যে রাষ্ট্রব্যবস্থার একেবারে উপর মহলে তার আঁচ গিয়ে পৌঁছেছিল – বাদশাহ আকবরের আমলে ইবাদতখানার বিতর্ক এবং সুল-ই কুল এর আদর্শ বা শাহজাদা দারা শুকোর ‘মাজমা-উল বাহারাইন’-এ ভারতের দুই ধর্মীয় মহাসিন্ধুকে মেলানোর প্রচেষ্টা তার সাক্ষ্য বহন করে। বাদশাহ আলমগীরকে লেখা ছত্রপতি শিবাজীর পত্রেও মুঘল সাম্রাজ্যের এই রীতির সাক্ষ্য মেলে। এই পত্রে শিবাজী লিখেছেন – “এই সাম্রাজ্যের সৌধের নির্মাতা আকবর বাদশাহ পূর্ণ গৌরবে ৫২ (চান্দ্র) বৎসর রাজত্ব করেন। তিনি সকল ধর্ম সম্প্রদায় - যেমন খৃষ্টান, ইহুদী, মুসলমান, দাদুপন্থী, নক্ষত্রবাদী ( ফলকিয়া = গগন - পূজক ?), পরী-পূজক ( মালাকিয়া), বিষয়বাদী ( আনসরিয়া ), নাস্তিক, ব্রাহ্মণ ও শ্বেতাম্বরদিগের প্রতি সার্বজনীন মৈত্রী ( সুলহ - ই - কুল = সকলের সহিত শান্তি ) ও সুনীতি অবলম্বন করেন। তাঁহার উদার হৃদয়ের উদ্দেশ্য ছিল সকল লোককে রক্ষা ও পোষণ করা। ঐজন্যেই তিনি 'জগৎগুরু' নামে অমর খ্যাতি লাভ করেন।তাহার পর বাদশাহ জহাঙ্গীর ২২ বৎসর ধরিয়া তাঁহার দয়ার ছায়া জগৎ ও জগৎবাসীর মস্তকের উপর বিস্তার করলেন। তাঁহার হৃদয় বন্ধুদিগকে দিলেন এবং হস্ত কার্য্যেতে দিলেন এবং এইরূপে মনের বাসনাগুলি পূর্ণ করিলেন। বাদশাহ শাহজাহানও ৩২ বৎসর রাজত্ব করিয়া সুখী পার্থিব জীবনের ফল স্বরূপ অমরতা - অর্থাৎ সজ্জনতা ও সুনাম অর্জন করেন। (পদ্য) যে জন জীবনে সুনাম অর্জন করে / সে অক্ষয় ধন পায়, / কারণ, মৃত্যুর পর তাহার পুন্য চরিতের কথা তাহার / নাম জীবিত রাখে” (মূল ফার্সী থেকে বাংলায় অনুবাদ স্যার যদুনাথ সরকারের)
হায়, শিবাজী। পত্রে তিনি যাঁদের এতো গুণগান করেছিলেন, সেই মুঘল সম্রাটদের সুনাম আর কই ? বরং সেই ‘অক্ষয় ধন’ তো ছত্রপতিরই স্বঘোষিত ভক্তের দল মানুষের স্মৃতি থেকেই মুছে দিতে উৎসাহী। ভুলিয়ে দেওয়ার এই রাজনৈতিক প্রবণতার বিরুদ্ধে শেষ অবধি রুখে দাঁড়াতে হবে ভারতের নাগরিকদেরই। নতুবা, ভারতীয় ইতিহাসচর্চার শুধু দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিই হবে না, অবমাননা করা হবে ভারতীয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশকেও। অন্তিমে, যাঁরা এখনও নিশ্চুপ আছেন, ভাবছেন মুঘলদের বলি দিয়েই ভারত ইতিহাসচর্চার ধ্বংসলীলার ইতি ঘটবে, তাঁদের জন্য কবি মার্টিন নেইমোলারের বিখ্যাত কবিতার একটি লাইন অদল বদল করে রাখা যেতে পারে –
যখন ওরা প্রথমে মুঘলদের জন্য এসেছিল,…
প্রকাশের তারিখ: ১২-এপ্রিল-২০২৩
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬
০১-মে-২০২৬
২২-এপ্রিল-২০২৬
১০-মার্চ-২০২৬
১০-মার্চ-২০২৬
২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
২৩-জানুয়ারি-২০২৬
১৭-জানুয়ারি-২০২৬
৩০-ডিসেম্বর-২০২৫
০৬-ডিসেম্বর-২০২৫
