সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বহরমপুরে নজরুল
সায়ন্তন সেন
এই বন্দীশালার সীমাবদ্ধ ও শাসন-সংযত পরিবেশেও কত সহজেই না কাজী গান লেখেন, সুরারোপ করেন, লেখেন দীর্ঘ কবিতা। অতি সাধারণ আলাপ আলোচনার মধ্যেও কথায় কথায় কেমন ছন্দ মিলের খেলা দেখান।... কি আলিপুর, কি বহরমপুর জেলে নজরুলের লেখা জমেনি। যা লিখেছেন, তা গুপ্ত পথ দিয়ে বাইরে কোন না কোন কাগজে প্রকাশিত হয়েছে।

উনিশশো বাইশ সাল, সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিক। ওয়ারেন্ট নিয়ে পুলিশ হানা দিল ‘ধূমকেতু'র অফিসে। ব্রিটিশ ভারতে ‘ধূমকেতু’ ছিল একটা সিডিশাস্ পত্রিকা। পুলিশের নজর আগে থেকেই ছিল। তার মধ্যে নজরুল এই পত্রিকার পুজো সংখ্যায় (২৬ সেপ্টেম্বর, ১৯২২) এমন একটা কবিতা লিখে বসলেন, যার মোদ্দা দাবি: দেবী ‘দনুজ-দলন সংহারিনী মূর্ত্তি’ নিয়ে এসে অত্যাচারী ব্রিটিশকে উৎখাত করবে। ব্যাস, এক মাসের কিছুদিনের মধ্যেই নজরুল গ্রেপ্তার হলেন। প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেল, তারপর হুগলী জেল, অবশেষে হুগলী জেল থেকে বদলি হয়ে উনিশশো বাইশের ১৮ই জুন, কাজী নজরুল ইসলামকে বদলি করা হল বহরমপুর জেলে। হুগলীঘাট স্টেশন দিয়ে নৈহাটি পৌঁছে সেখান থেকে নজরুলকে বহরমপুরে আনা হল। পরনে ডোরাকাটা কামিজ, ডোরাকাটা হাফ প্যান্ট, আর হাতে হাতকড়া নিয়ে এই প্রথম নজরুল বহরমপুরে এলেন।
নজরুল যেখানেই যেতেন, সেই জায়গাই হয়ে উঠত ঘটনাপ্রবণ। নজরুল থাকবেন, আর ঘটনা ঘটবে না— এ প্রায় অসম্ভব। বহরমপুর জেলেও নজরুল নতুন একটা খবর নিয়ে এলেন। রাজনৈতিক বন্দিদের একটা বিশেষ শ্রেণিভুক্ত করা, তাদের খবরের কাগজ, বই, লেখালেখির সরঞ্জাম দেওয়া— এসবের জন্য যতীন সেন অনশন ধর্মঘট চালাচ্ছেন। বহরমপুর জেলে রাজবন্দিরা সকলেই যতীন সেনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সকলে আলোচনা করে ঠিক করলেন, যতীন সেনের সমর্থনে এখানেও শুরু হবে অনশন। বাইরে খবর পাচারের যতটুকু সুযোগ ছিল, তা কাজে লাগাতে রাজবন্দিরা যথারীতি কসুর করলেন না। অনশনের প্রস্তাবিত প্রথম দিনে জেলখানায় নজরুলের গানের আসর বসল। অবশ্য অনশন করতে হল না। সন্ধ্যায় টেলিগ্রামে খবর এল— সরকারের প্রতিশ্রুতি পেয়ে যতীন সেন অনশন ভঙ্গ করেছেন।
বহরমপুর জেলে নজরুলের সঙ্গী ছিলেন নরেন্দ্রনারায়ণ চক্রবর্তী। ‘নজরুলের সঙ্গে কারাগারে’ বইয়ে তিনি যে স্মৃতিচারণ করেছেন, তার থেকে নজরুলের কারাযাপনের একটা ছবি পাওয়া যায়—
“এই বন্দীশালার সীমাবদ্ধ ও শাসন-সংযত পরিবেশেও কত সহজেই না কাজী গান লেখেন, সুরারোপ করেন, লেখেন দীর্ঘ কবিতা। অতি সাধারণ আলাপ আলোচনার মধ্যেও কথায় কথায় কেমন ছন্দ মিলের খেলা দেখান।”
জেলের মধ্যেই বালেশ্বর বলিদান দিবস পালন করা হবে স্থির হল, অভিনীত হবে স্বদেশী যাত্রা।
“কাজী পালা গাঁথিবেন গানের সুর দিবেন ও গান গাইবেন আমার উপর থাকিবে অভিনয়ের দায়িত্ব, পরিচালনার ভার থাকিবে পূর্ণবাবুর উপর।” জেলখানার মধ্যেই বাঘাযতীনের স্মরণে বালেশ্বর বলিদানের স্মরণ সভার আয়োজন হইল। … বিকেল পাঁচটায় আরম্ভ হইল অপরাহ্নের অনুষ্ঠান – সভাপতির আসন গ্রহণ করিলেন মৌলানা সুফী। আরম্ভ হইল কাজীর গান দিয়া ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’। সকলের মন বিষাদে ভারাক্রান্ত হইয়া উঠিল। ইহার পর পূর্ণবাবু বালেশ্বর কাহিনী বিবৃত করিলেন। অমরেশ বাবু (কাঞ্জিলাল) মৃত্যুঞ্জয় যতীন্দ্রনাথের (বাঘাযতীন) জীবনী আলোচনা করিলেন।” সভাপতির ভাষণ শেষেও সভা ভঙ্গ হল না। নজরুল নতুন করে সভা শুরু করে জাঁকিয়ে ধরলেন গান— “স্বরচিত গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত, দ্বিজেন্দ্রলালের দেশাত্মবোধক গান।” এর সঙ্গে নরেন্দ্রনারায়ণ লিখছেন, “কি আলিপুর, কি বহরমপুর জেলে নজরুলের লেখা জমেনি। যা লিখেছেন, তা গুপ্ত পথ দিয়ে বাইরে কোন না কোন কাগজে প্রকাশিত হয়েছে।”
এ সময় বহরমপুর জেলের জেল সুপার ছিলেন জনৈক যতীশ মুখার্জি, এবং তিনি নজরুলের এসব কর্মকাণ্ডে মোটেই প্রীত ছিলেন না। বহরমপুর জেলে নজরুল ‘প্রিজন অ্যাক্ট'-এ অভিযুক্ত হলেন। কারাবিধি ভঙ্গের অভিযোগে নজরুলকে হাজির করা হল বহরমপুরের সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট এন কে সেনের এজলাসে। ‘মুর্শিদাবাদ জেলায় নজরুল চরিতের উপাদান’ প্রবন্ধে শক্তিনাথ ঝা লিখেছেন, “বহরমপুর জেলের প্রয়াত ব্রজভূষণ গুপ্ত, জেলা কংগ্রেসের কর্ণধার জ্ঞান সরকার নজরুলের পক্ষ সমর্থন করেন। ব্রজভূষণ গুপ্তের জেরায় জেল সুপার যতীশ মুখার্জির লাঞ্ছনার স্মৃতি জেলার প্রাচীনেরা এখনো স্মরণ করেন।” এর কিছুদিন পরেই, সম্ভবত উনিশশো তেইশ সালের ১৫ই ডিসেম্বর নজরুল বহরমপুর জেল থেকে চূড়ান্তভাবে মুক্তি পান। কারামুক্তির পর বহরমপুরের কৃষ্ণনাথ কলেজের একদল ছাত্র, যাদের মধ্যে বিপ্লবী নিরঞ্জন সেনও ছিলেন, মিছিল করে তাঁদের প্রিয় কবিকে ‘সায়েন্স কটেজ’ নামে পরিচিত তাঁদের আস্তানায় নিয়ে আসেন। এখানেও সমবেত শ্রোতৃমন্ডলীকে হতাশ করেননি নজরুল।

সায়েন্স কটেজ থেকে নজরুল এসেছিলেন প্রথমে নলিনাক্ষ সান্যালের বাড়িতে। নলিনাক্ষ নজরুলের পূর্বপরিচিত ছিলেন। এরপর নজরুল কাদাই ভট্টাচার্য পাড়ার উমাপদ ভট্টাচার্যের বাড়িতে ওঠেন। উনিশশো চব্বিশে হুগলিতে ফিরে যাওয়ার আগে পর্যন্ত এই বাড়িই ছিল নজরুলের অন্যতম আশ্রয়। বহরমপুরে অন্তত দু-বার জাতীয় কংগ্রেসের ডাকে বন্দি মুক্তির দাবিতে আহুত জনসভায় গান গেয়েছিলেন নজরুল— ঘনিষ্ঠদের স্মৃতিচারণা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। শক্তিনাথ ঝা তাঁর প্রবন্ধে লিখেছেন—
“শ্রীচিত্ত দাস ১৯২৪ হরিবাবুর বাঁধাঘাটে কংগ্রেসের ডাকে বন্দীমুক্তির দাবীতে আহুত জন সভায় নজরুলের বক্তৃতা ও গান করার কথা বলেছেন। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন কবিরাজ যতীশ সেনগুপ্ত;বক্তা ছিলেন ব্রজভূষণ গুপ্ত, জ্ঞান সরকার, শশাঙ্ক সান্যাল প্রমুখ।… শ্রী শশাঙ্কশেখর সান্যালের বর্ণনায় দেখা যায় যে জেল আইন ভাঙ্গা সংক্রান্ত মামলার সূত্রে নজরুল বহরমপুরে আবার এসে কয়েকদিন ছিলেন। ব্রজভূষণ গুপ্ত ইত্যাদির সুপরিচালনায় তিনি বেকসুর খালাস পান মামলা থেকে। ব্রজভূষণের অনুরোধে বর্তমান কংগ্রেস ময়দানে এক বিশাল জনসভায় নজরুল গান করেন। এ সভার সভাপতিত্ব করেছিলেন ব্রজভূষণবাবু।… সভাপতির নাম, বক্তা এবং স্থান নিয়ে বিবরণ দুটির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও ১৯২৪ সালের কোন সময় নজরুল বহরমপুর শহরে অনুষ্ঠিত এক জন সভায় ভাষণ দিয়েছিলেন এতে সন্দেহ নেই।”
বহরমপুরের বেশ কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে নজরুলের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। নলিনাক্ষ সান্যাল, উমাপদ ভট্টাচার্য আর ব্রজভূষণ গুপ্তের কথা আগেই বলেছি। এছাড়াও শশাঙ্কশেখর সান্যাল, নিতাই ঘটক, জগদানন্দ বাজপেয়ী, আর খাগড়ার বরাট পরিবারের সঙ্গে তাঁর সখ্য গড়ে ওঠে। তবে এখানে একটা কথা খেয়াল রাখা দরকার। গোঁড়া মুসলমান যেমন নজরুলের উদার অসাম্প্রদায়িক মনোভঙ্গির কারণে তাঁকে 'কাফের' বলে গালি দিয়েছে, তেমনই, হিন্দু সম্প্রদায় থেকেও নজরুল সর্বদাই যে স্নেহের সান্নিধ্য লাভ করেছেন, তা নয়। বহরমপুরে বিবাহ অনুষ্ঠান উপলক্ষ্যে নলিনাক্ষ সান্যালের বাড়িতে নিমন্ত্রিত নজরুলের সাথে গোঁড়া হিন্দুরা এক পংক্তিতে বসে খেতে অস্বীকার করে। চিরঅভিমানী নজরুল সঙ্গে-সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে “জাতের নামে বজ্জাতি সব’ গানটা মুক্তকণ্ঠে গাইতে-গাইতে সে স্থান ত্যাগ করেন। তবে, এই ঘটনার অভিঘাতে নলিনাক্ষ সান্যাল বৌভাতের অনুষ্ঠানে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকলকে একসাথে আহার করান। রক্ষণশীল সমাজ সান্যাল পরিবারকে একঘরে করার চেষ্টা করলেও যুবসমাজের প্রবল সমর্থনে সেই চক্রান্ত ভেস্তে যায়।
নলিনাক্ষ সান্যালের ছোট ভাই শশাঙ্কশেখর সান্যালের সঙ্গেও নজরুলের গভীর প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। একাধিক জনসভায় নজরুল তাঁর নিজের গান শশাঙ্কশেখরকে দিয়ে গাইয়েছেন। শশাঙ্কর ছোট বোনের মৃত্যুর পর শোকসন্তপ্ত বাবা-মাকে সান্ত্বনা দিতে লিখেছেন, “কোন সুদূরের চেনা বাঁশী ডাক দিয়েছে ওরে চখা”, সে গানে সুর দিয়েছেন উমাপদ ভট্টাচার্য। উমাপদর সঙ্গেও নজরুলের সুরের সখ্য ছিল। উমাপদ ভট্টাচার্যকে নজরুল ডাকতেন ফেনুদা বলে। মুর্শিদাবাদ বরাবরই মার্গসঙ্গীতের উর্বর ক্ষেত্র। মুর্শিদাবাদের কেল্লা নিজামতের আতাহুসেনের ঘরওয়ালা ওস্তাদ কাদের বকস্ এবং তাঁর শিষ্য মঞ্জু সাহেবকে কেন্দ্র করে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে একটা গানের ঠেক গড়ে উঠছিল। উমাপদ ভট্টাচার্য ছিলেন এর মধ্যমণি। নজরুলকে পেয়ে এই দলটি নজরুল-গোষ্ঠীতে রূপান্তরিত হল। উমাপদ নজরুলগীতির স্বরলিপি তৈরি, প্রসার ও প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন। নজরুল তাঁর প্রিয় ফেনুদার এই অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর দ্বিতীয় স্বরলিপির বইটি উমাপদ ভট্টাচার্যকে উৎসর্গ করেন। 'দোলন চাঁপা' কাব্যগ্রন্থটিও নজরুল ফেনুদা ও গায়ত্রী বৌদি (উমাপদ ভট্টাচার্যের স্ত্রী)-কে উপহার দিয়েছিলেন জেল থেকে বেরিয়ে এসে (‘দোলন চাঁপা’ প্রকাশ করেন পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, নজরুল জেলে থাকাকালীন)। উপহারের বইটিতে নজরুল নিজে হাতে বেশ কিছু বানান ও পংক্তি সংশোধন ও পরিমার্জন করেছিলেন। বইটির উৎসর্গপত্রে নজরুলের হস্তাক্ষরে লেখা দেখেছি—
“সুর-রসিক গানের বুলবুল আমার ফেনুদাকে আর প্রীতি-সুন্দর মেজবৌদিকে— পুলক পূজাঞ্জলি
স্নেহ-ধন্য — নজরুল ইসলাম”
নজরুলের সঙ্গে বহরমপুরের আরও একটি যোগ আছে, যা পরোক্ষ, কিন্তু গভীরতর। বহরমপুরে রেজাউল করীম সম্পাদিত মাসিক সৌরভ পত্রিকাকে কেন্দ্র করে ১৯২৫-২৬ সালে যে সাহিত্য-সাধনা শুরু হয়েছিল, তার মধ্যে নজরুল-কাব্যের স্পষ্ট প্রভাব ছিল। রেজাউল করীম রচিত একাধিক কবিতায়, এবং সৌরভ-গোষ্ঠীর আরও অনেকের কাব্যেই নজরুলের প্রেরণা ক্রিয়াশীল ছিল। মুর্শিদাবাদে সৌরভ-ই প্রথম পত্রিকা যা সচেতনভাবে নজরুল-চর্চা করেছিল, আর নিজেদের অঙ্গনে নজরুলকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।
সূত্র:
১) প্রসঙ্গ নজরুল — শক্তিনাথ ঝা
২) মুর্শিদাবাদ ও কবি নজরুল ইসলাম — আবুল হাসনাত
৩) চির উন্নত শির (সারা বাংলা নজরুল শতবর্ষ কমিটি)
প্রকাশের তারিখ: ৩০-সেপ্টেম্বর-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
