Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

পল সুইজি, অবিস্মরণীয় মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী

রতন খাসনবিশ
সুইজির পক্ষে জোশেফ শ্যুমপিটার-সহ একদল বুদ্ধিজীবী হার্ভার্ডের ডিন-এর কাছে আবেদন করেন সুইজিকে হার্ভার্ডে ফিরিয়ে আনার জন্য। মার্কিন রাষ্ট্র একেবারেই সেটা চায়নি। সুইজি আর চাকরি করলেন না। বদলে তিনি শুরু করলেন মান্থলি রিভিউ পত্রিকা। সঙ্গে রাখলেন মার্কসীয় বিদ্যাচর্চা। যার দরুন আমরা পেলাম একচেটিয়া পুঁজির ওপর পল ব্যারনের সঙ্গে তাঁর বিস্তৃত গবেষণা। পেলাম হ্যারি ম্যাগডফের সঙ্গে তাঁর কালোত্তীর্ণ গবেষণা, যে গবেষণার কেন্দ্রে আছে স্ট্যাগনেশন বা মন্দা সংক্রান্ত তাঁর মৌলিক চিন্তা, ফিনান্স ক্যাপিটালের যুগে যেটি নতুনতর সমস্যার জন্ম দিয়েছে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে। এই পল সুইজির কাছ থেকে আমরা পেলাম মার্কিন যুদ্ধবাজদের কোরিয়া যুদ্ধ ভিয়েতনাম যুদ্ধের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। পেলাম কিউবার বিপ্লবের মার্কসবাদী বিশ্লেষণ, পেলাম আলন্দেকে করা তাঁর হুঁশিয়ারি যে, সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকায় সশস্ত্র প্রতিবিপ্লবকে রোধ করা যাবে না। সোভিয়েতের পতনে সুইজি বিব্রত বোধ করেননি। নিজের মতাদর্শে স্থির থেকে তিনি লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত কথাগুলি, পুঁজিবাদের ব্যর্থতার ইতিহাস সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার ইতিহাসের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। আজ পল সুইজির ১১৬তম জন্মদিন। 
Paul Sweezy, the unforgettable Marxist intellectual

১৯৬৬-তে প্রকাশিত একচেটিয়া পুঁজির অন‍্যতম লেখক পল ব‍্যারনের (বামদিকে) সঙ্গে সুইজি।

পল মার্লন সুইজি ছিলেন এমন একজন বুদ্ধিজীবী, মার্কিন বুদ্ধিচর্চার জগত কখনও যাকে অস্বীকার করতে পারেনি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মান্থলি রিভিউ পত্রিকা একসময়ে চিহ্নিত হয়েছিল দ্য মোস্ট ফেমাস আননোন ম্যাগাজিন অফ দ্য ইউএসএ হিসবে। সুইজিকে অস্বীকার করতে না পারার অন্যতম কারণ বিদ্যাচর্চার জগতে তাঁর কিছু অবিস্মরণীয় অবদান। তাঁর বিপরীত শিবিরের বুদ্ধিজীবীরাও যা অস্বীকার করতে পারতেন না। সুইজির বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র হার্ভার্ড, মার্কিন প্রশিক্ষার জগতে যেটি একটি উৎকৃষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত। পল সুইজি ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সেরা ছাত্র। পারিবারিক দিক থেকেও সুইজি ছিলেন মার্কিন এলিট সমাজের মানুষ। তাঁর বাবা এভারেট সুইজি ছিলেন আমেরিকার ফার্স্ট ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের প্রেসিডেন্ট। সেই সূত্রে তিনি ছিলেন অগাধ সম্পত্তির মালিক। ১৯২৯ সালের মহামন্দায় তাঁর সম্পত্তির একটা বড় অংশ নষ্ট হয়। এতদসত্ত্বেও তাঁর যা সম্পত্তি ছিল, তাতে তাঁর সন্তানদের অনায়াসে জীবন কাটানোর ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল। বস্তুত, সুইজি যখন রাজনৈতিক কারণে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী চাকরি লাভে বঞ্চিত হলেন, সেসময়ই তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, পাকা চাকরি না পাওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে সুবিধোভোগীদের কৃপাপ্রার্থী হয়ে থাকতে হবে এমন চাকরি তিনি চান না। এই সিদ্ধান্তে যখন তিনি উপনীত হচ্ছেন, সেই সময় তিনি প্রচলিত ধারার অর্থনীতির একজন স্বীকৃত পণ্ডিত। ইতিমধ্যেই যিনি পঁয়ত্রিশটি গবেষণা পত্রের জনক, যে গবেষণা পত্রগুলির মধ্যে একটি হল, ডিমান্ড আন্ডার কন্ডিশনস অফ অলিগোপলি। অলিগোপলি বাজারে দাম নির্ধারণ কীভাবে হয় সেই প্রসঙ্গে সুইজির এই গবেষণাপত্রটি এখনও অর্থনীতির পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যতদিন তিনি প্রচলিত ধারার অর্থনীতির চর্চা করেছেন, ততদিনই তাঁর কাজের মান বিদ্বৎজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। তাঁর সমসাময়িক অর্থনীতিবিদদের মধ্যে যাঁরা নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন, তাঁরা সকলেই একবাক্যে তাঁর মেধার উৎকর্ষ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় কেনেথ অ্যারো এবং পল স্যামুয়েলসনের কথা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই দুই দিকপাল অর্থনীতিবিদ ছিলেন নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত। দুজনেই ছিলেন পল মার্লন সুইজির গুণগ্রাহী। যদিও এঁরা কেউই সুইজির যে মতবাদ– মার্কসবাদী মতবাদ– তার সঙ্গে একমত ছিলেন না। হার্ভার্ডে সুইজির অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন জোশেফ শ্যুমপিটার। নিজগুণে যিনি ছিলেন সে সময়ের একজন প্রথম সারির অর্থনীতিবিদ এবং যাঁর বই এখনও অর্থনীতির উচ্চশিক্ষার অঙ্গ। শ্যুমপিটার নিজে মতবাদের দিক থেকে রক্ষণশীল ছিলেন। কিন্তু ইউরোপে সে সময়ে যে উদারনৈতিক ভাবধারার উত্থান ঘটেছিল, শ্যুমপিটার ছিলেন সেই ভাবধারার অর্থনীতিবিদ। মার্কসের মতবাদ সম্পর্কে ঊনবিংশ শতাব্দির ভিয়েনা স্কুল কিংবা ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদদের যে বিদ্বেষ, প্রচলিত ধারার অর্থনীতির তত্ত্বে যার প্রতিফলন ঘটেছিল তীব্রভাবে, শ্যুমপিটার এবং তাঁর সমসাময়িক একদল অর্থনীতিবিদ সেই বিদ্বেষ কাটিয়ে উঠতে পেরেছিলেন। পল সুইজি যখন হার্ভার্ডের তরুণ গ্র্যাজুয়েট (১৯৩২ সাল), ভিয়েনা স্কুলের শ্যুমপিটার সেসময় এই তরুণ, প্রথা-বিরোধী অর্থনৈতিক তাত্ত্বিকের মধ্যে বহু সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছিলেন। বস্তুত, হার্ভার্ডের শ্যুমপিটারের যে ছোট একটি স্টাডি সার্কেল ছিল, পল সুইজি ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। 

প্রচলিত ধারার অর্থনীতির তত্ত্বের বাইরে এসে চিন্তা করার প্রবণতা সুইজির মধ্যে বিকশিত হয় ১৯৩২-৩৩ সালে, যখন তিনি কিছু সময়ের জন্য লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকস-এ পড়াশোনা করতে আসেন। তখন স্বল্প সময়ের জন্য ভিয়েনাবাসের সুযোগও তাঁর হয়েছিল। সুইজির নিজের ভাষায় লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স-এ হ্যারল্ড ল্যাস্কির লেকচার তাঁকে অন্যভাবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। একইসময়ে তিনি পড়েছিলেন লিও ট্রটস্কির হিস্ট্রি অফ রাশিয়ান রেভলিউশন  ১৯৩৩ সালে তিনি যখন হার্ভার্ডে ফেরত আসেন, তখন তিনি ভিন্ন ধারার অর্থনীতির মতাদর্শের একজন অনুগামী। হার্ভার্ডে এসে তিনি পেলেন জোশেফ শ্যুমপিটার ছাড়াও অস্কার ল্যাঙ্গে এবং ওয়াসিলি লিওনতিয়েভকে। তাঁর মার্কসবাদ চর্চার অনুকূল পরিস্থিতি হার্ভার্ডেই তৈরি হল এভাবে। যেসময়ে সহকারী শিক্ষক হিসাবে পড়াতে শুরু করলেন মার্কসীয় অর্থনীতি, এই পড়ানোর ফলশ্রুতিতেই আমরা পেলাম তাঁর সেই বিখ্যাত বইটি, দ্য থিয়োরি অফ ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্ট: প্রিন্সিপলস অফ মার্কসিয়ান পলিটিক্যাল ইকনমি। বইটির বৈশিষ্ট্য এই যে প্রচলিত ধারার অর্থনীতি, যাকে বলা হয়ে মেইনস্ট্রিম ইকনমিকস, সেটিতে অর্থনীতি সম্পর্কে শিক্ষাদানের যে ধারাটি আছে তার সঙ্গে মার্কসবাদী অর্থনীতিক চিন্তার তফাৎটা কোথায়, কীভাবে মার্কসের অর্থনীতিকে ব্যাখ্যা করা যায়, তার একটি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ পাওয়া যায় এই বইটিতে। বইটি তিনি লিখেছিলেন জাপানি অর্থনীতিবিদ শিগেতো সুরুর সঙ্গে মিলিত ভাবে। বইটিতে সবচেয়ে বেশি জোর যেখানে দেওয়া আছে সেটা হল, মূল্য এবং দামের মধ্যে যে পার্থক্য থাকে সেটির একটি অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। মূল্য থেকে দামে রূপান্তরণে মার্কস এবং মার্কস পরবর্তী অর্থনীতিবিদেরা যা আলোচনা করেছেন, একইসাথে গ্রন্থ রচয়িতারা কীভাবে বিষয়টি দেখছেন– সেসব নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা আছে। পুঁজিবাদী উৎপাদনে যে সঙ্কট দেখা দেয়, তার মার্কসীয় ব্যাখ্যা কী হবে বইটির বড় অংশ জুড়ে সেটি নিয়েও আছে বিস্তৃত আলোচনা। পুঁজিবাদ উৎপাদন ক্ষমতার বৃদ্ধি ঘটায়, কিন্তু বর্ধিত উৎপাদন ক্ষমতাকে কাজে লাগানোর রাস্তা খুঁজে পায় না। বাজার-নির্ভর পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এ থেকে যে সঙ্কটের সম্মুখীন হয় পুঁজিবাদী নিজেই সেটা কাটিয়ে তুলতে পারে কিনা, এনিয়ে সমস্যা আছে। পুঁজিবাদ ১৯২৯ সালের মহামন্দা কাটাবার জন্য নিউ ডিল-এর হাত ধরেছিল, বাজার নিজে থেকেই মন্দা কাটাবার ব্যবস্থা খুঁজে পায়নি। ১৯২৯ সালের মহামন্দা নিউ ডিল-ও পুরোমাত্রায় কাটিয়ে তোলার ব্যবস্থা করতে পারেনি। ১৯৩৭ সালেই মার্কিন অর্থনীততে মন্দার লক্ষণ আবার দেখা দিতে শুরু করে। যুদ্ধ মারফৎ সামাজিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এই মন্দা কাটানোর কোনও উপায় বাজার অর্থনীতি খুঁজে পায়নি। উৎপাদন ক্ষমতার ক্রমাগত অগ্রগতি আর সেই বর্ধিত উৎপাদন ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে না পারার সমস্যা সমাধানের রাস্তা পুঁজিবাদে নেই। সুইজির থিয়োরি অফ ক্যাপিটালিস্ট ডেভেলপমেন্টে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, যে বক্তব্যটি মার্কস থেকেই নেওয়া, কিন্তু একচেটিয়া পুঁজির যুগে যার একটা অন্য মাত্রাও যুক্ত হয়। 

পুঁজিবাদ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেই বর্ধিত উৎপাদন ক্ষমতা কাজে না লাগাতে পারার পরিস্থিতির জন্ম দিয়ে সমাজকে সঙ্কটগ্রস্ত করে তোলে। উক্ত পুস্তকে সুইজির বক্তব্য, পুঁজিবাদ সৃষ্ট এই সঙ্কটের দরুন পুঁজিবাদের পতন ঘটবে এটা আশা করা ঠিক নয়। বাজার ও বাজার বর্হিভূত, মূলত বাজার বর্হিভূত নানাবিধ পলিসি গ্রহণ করে পুঁজিবাদ এই সঙ্কট কাটিয়ে তোলে। ফলত, সঙ্কট থেকে পুঁজিবাদের ধ্বংস আসে না। সুইজি বলছেন, সমস্যাটার এখানেই যতি টানা উচিত হবে না। সঙ্কটগুলি সবচেয়ে বেশি আঘাত করে শ্রমজীবী মানুষকে। এই আঘাতগুলিকে মোকাবিলা করতে গিয়েই শ্রমজীবী মানুষ পুঁজিবাদের অসারতা সম্পর্কে সচেতন হতে থাকে। এই সচেতনতাই শ্রমজীবী মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যেখানে এই অতি উৎপাদনের সঙ্কট থাকবে না। এই সচেতনতা থেকেই গড়ে ওঠে শ্রমজীবীর রাজনৈতিক দল যা ক্ষমতা দখল করে একটি ভিন্ন ধরনের উৎপাদন ব্যবস্থা চালু করতে পারে, যাতে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে উৎপাদন বৃদ্ধি ঘটানোর ব্যবস্থা করা যায়। এটি হবে এমন একটি ব্যবস্থা যাতে শ্রমসহ উৎপাদনের যাবতীয় উপকরণের পর্যাপ্ত প্রয়োগের সুযোগ পাওয়া যায়। এটাই হল মার্কসের সেই বিখ্যাত প্রব্রজ্যা, সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদে উত্তরণের মধ্য দিয়ে যার সমাপ্তি ঘটে।

ফ্যাসিবাদ বিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণের তাগিদে সুইজি হার্ভার্ডের অস্থায়ী চাকরি ছেড়ে মার্কিন সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন।  যুদ্ধফেরত পল সুইজি রাষ্ট্রীয় সম্মানের বদলে তাঁর ঘোষিত মতবাদের জন্য পেলেন রাষ্ট্রীয় নির্যাতন। তিনি কমিউনিস্ট, এই অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়, যে মামলা লড়ে শেষ পর্যন্ত তিনি জয়লাভ করেন। যুদ্ধশেষে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় সুইজিকে সেখানে পাকা চাকরি দিতে অস্বীকার করে। একটি পাকা চাকরির পদ সেসময় খালি ছিল। সুইজির পক্ষে জোশেফ শ্যুমপিটার-সহ একদল বুদ্ধিজীবী হার্ভার্ডের ডিন-এর কাছে আবেদন করেন সুইজিকে হার্ভার্ডে ফিরিয়ে আনার জন্য। মার্কিন রাষ্ট্র একেবারেই সেটা চায়নি। হার্ভার্ডের শূন্যপদে নিয়োগ পেলেন জোশেফ ডানলপ, যিনি ঠাণ্ডা যুদ্ধের সমস্ত পর্যায়টি ছিলেন ম্যাকার্থি মতবাদের সমর্থক। সুইজি আর চাকরি করলেন না। বদলে তিনি শুরু করলেন মান্থলি রিভিউ পত্রিকা। সঙ্গে রাখলেন মার্কসীয় বিদ্যাচর্চা, যার দরুন আমরা পেলাম একচেটিয়া পুঁজির ওপর পল ব্যারনের সঙ্গে তাঁর বিস্তৃত গবেষণা। পেলাম হ্যারি ম্যাগডফের সঙ্গে তাঁর কালোত্তীর্ণ গবেষণা, যে গবেষণার কেন্দ্রে আছে স্ট্যাগনেশন বা মন্দা সংক্রান্ত তাঁর মৌলিক চিন্তা, ফিনান্স ক্যাপিটালের যুগে যেটি নতুনতর সমস্যার জন্ম দিয়েছে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে। এই পল সুইজির কাছ থেকে আমরা পেলাম মার্কিন যুদ্ধবাজদের কোরিয়া যুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ। পেলাম কিউবার বিপ্লবের মার্কসবাদী বিশ্লেষণ, পেলাম আলন্দেকে করা তাঁর হুঁশিয়ারি যে সশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকায় সশস্ত্র প্রতিবিপ্লবকে রোধ করা যাবে না। 

সোভিয়েতের পতনে সুইজি বিব্রত বোধ করেননি। নিজের মতাদর্শে স্থির থেকে তিনি লিখেছিলেন সেই বিখ্যাত কথাগুলি যে, পুঁজিবাদের ব্যর্থতার ইতিহাস সমাজতন্ত্রের ব্যর্থতার ইতিহাসের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত। পল সুইজি সোভিয়েত ব্যবস্থার উৎপাদন সঙ্কটের সমস্যা কেন পুঁজিবাদী সঙ্কট হিসাবে দেখা ঠিক হবে না, সেনিয়ে আলোচনা করেছিলেন। চার্লস বেটেলহেমের সঙ্গে এনিয়ে তিনি বিতর্কে অবতীর্ণ হন, যখন তাঁর বয়স ৭৫ অতিক্রান্ত। মান্থলি রিভিউ প্রেস তাঁর আরেকটি অবদান। অনেক ভাল বই পৃথিবীর আলো দেখতে পেত না, যদি না এই মান্থলি রিভিউ প্রেস-এর জন্ম হত। মান্থলি রিভিউ প্রেসমান্থলি রিভিউ পত্রিকা তিনি একা হাতে করে গেছেন, এটা দাবি করা ঠিক হবে না। তিনি সঙ্গে পেয়েছিলেন লিউ হুবারম্যান, হ্যারি ম্যাগডফ এবং পল ব্যারনের মতো উৎকৃষ্ট মানের বুদ্ধিজীবীদের। ফ্যানশেন-এর মতো বই এম আর প্রেস ছাড়া প্রকাশিত হত না। দু’বছর ধরে এর পাণ্ডুলিপি এখানে সেখানে ঘুরেছে। পলের হাতে আসার পর এই পাণ্ডুলিপি তার প্রকৃত মর্যাদা পেয়েছিল। সুইজির নির্বাচন যে ভুল হয়নি, ফ্যানশেনের জনপ্রিয়তা তার প্রমাণ। বইটি এখনও পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ২ লক্ষ ২০ হাজার কপি। 

আরেকটা কথা সংযোজন না করলে সুইজিকে ঠিকমতো বোঝা যাবে না। ব্রুকলিনে বড় হওয়ায়, কোনও এলিট কলেজে গ্র্যাজু্য়েশন ডিগ্রি না পাওয়ায় এক ট্রেড ইউনিয়নিস্ট ছিলেন হ্যারি ব্রেভারম্যান। পুঁজিবাদ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে শ্রমজীবীর দক্ষতা বাড়ায়, শ্রমজীবীর শ্রম জটিলতর কাজে ক্রমাগত ব্যবহার হতে থেকে তার উৎকর্ষ বাড়ায়– এটা হল প্রচলিত ধারণা। ব্রুকলিন শিক্ষিত ব্রেভারম্যান লিখলেন পুঁজিবাদ আসলে শ্রমের উৎকর্ষ কমায়। এই উল্টো কথাটির তাৎপর্য কত গভীর পল সুইজি তা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। ব্রেভারম্যানের পাণ্ডুলিপিটি মান্থলি রিভিউ প্রেস থেকে বই আকারে প্রকাশিত হয়। সঙ্গে থাকে সুইজির একটি অসাধারণ ভূমিকা। বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে মার্কস উদ্ঘাটিত যে আদি সত্য, একচেটিয়া পুঁজির যুগেও সেটা কেন অভ্রান্ত, অনুপম রচনাশৈলিতে এই রচনায় তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন পল সুইজি।



প্রকাশের তারিখ: ১০-এপ্রিল-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

লেখাটা সময়োপযোগী। লেখক ও পত্রিকাকে ধন্যবাদ।
- শরীফ শমশির , ১১-এপ্রিল-২০২৫


ভাল লেখা। মনে পড়ে, আইনস্টাইনের বিখ্যাত লেখাকে সমাজতন্ত্র " MRএর প্রথম সংখ্যায় বেরিয়েছিল। এই কাগজে সুইজির দীর্ঘ সাক্ষাৎকার অবিস্মরণীয়।
- Syamal Chakrabarti , ১২-এপ্রিল-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫