সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
যুব সমস্যা আর্থ-সামাজিক পটভূমি
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
যুব জীবনে সংকটের প্রশ্নে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যাঁতাকলে আমরা পিষ্ট হচ্ছি, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী এবং আশু সংগ্রামের গুরুত্ব সর্বাধিক। বেকারীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, জমির জন্য আন্দোলন, শিল্পায়নের জন্য আন্দোলন— এইগুলির পাশাপাশি বর্তমান কাঠামোটিকে পরিবর্তন করে মৌলিক সংগ্রামের ব্যাপক ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য বেশি বেশি করে উদ্যোগ নিতে হবে। এই আন্দোলনের প্রক্রিয়াটি নিরন্তর চলবে। সামন্তবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্রটিকে চেনাতে এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ব্যাপক যুব সমাজের স্থির বিশ্বাস সৃষ্টি করার কাজ নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। কিন্তু আমরা বাস্তবে সেই আন্দোলনকে গড়ে তুলতে না পারলে সমস্যার সমাধানের পথে অগ্রসর হতে পারবো না।

বর্তমান দুনিয়ায় যুব সমাজের ভূমিকা নিয়ে বির্তকিত আলোচনা চলছে। সকলেই স্বীকার করছেন একজন মানুষের গোটা জীবনকালের মধ্যে যৌবনের সময়টুকু, বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ শারীরিক ও মানসিক কারণেই। ফলতঃ এই সময়ে তার সামাজিক ভূমিকা গোটা সমাজের কাছেই খুবই বাস্তব অর্থবহ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমাজবিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, যুব সমস্যা নিয়ে বহু আলোচনা করেছেন। সকলেই স্বীকার করছেন একটা অস্থির এবং বিস্ফোরণমূলক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, যদিও সমস্যাটিকে সাধারণীকরণ করা খুবই কঠিন। উন্নত পুঁজিবাদী দেশে এক ধরনের সমস্যা, তৃতীয় দুনিয়ার পেছিয়ে পড়া দেশে আর এক ধরনের সমস্যা, আবার সমাজতান্ত্রিক দুনিয়ায় সেই অর্থে সমস্যা ভিন্নতর।
সমাজতান্ত্রিক দুনিয়াতে যুবকদের অর্থনৈতিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক, জীবনমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার চেয়ে নিঃসন্দেহে উন্নততর কিন্তু একটা কথা স্বীকার করতেই হবে যে, সেখানেও সমস্যা আছে। সমস্যার জটিল অভিব্যক্তিও দেখা যাচ্ছে বিভিম্ন সমাজতান্ত্রিক দেশে। কিন্তু তার মূল বৈশিষ্ট্য হলো নতুন সমাজব্যবস্থা, নতুন মানবিকতা, নতুন মানুষ সৃষ্টির সমস্যা। সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের সাংস্কৃতিক ও আদর্শ'গত প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার সমস্যা। এখানেও বিচ্যুতি আছে কিন্তু তা বিচারের মানদণ্ডও পৃথক। তা মূলতঃ সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার অগ্রগতির সমস্যার সঙ্গেই যুক্ত। বর্তমান প্রবন্ধে তা আলোচ্য বিষয় নয়।
কিন্তু উন্নত পুঁজিবাদী দেশে যে সমস্যা খুব জীবনকে তছনছ করছে তা খানিকটা আমাদের দেশের সঙ্গে মিল আছে বৈকি। সেখানে সমস্যা মানসিক জগতেই মুখ্য, যদিও উৎপাদন ব্যবস্থার চরিত্রগত কারণই সমস্যার উৎস মুখ। বিগত শতাব্দীর শেষভাগ থেকেই সাম্রাজ্যবাদী স্তরে উন্নত হয়ে পুঁজিবাদ মৃত্যুপথগামী। অবিশ্বাস, হতাশা, নৈরাজ্যই শুধু তার সম্বল। মানুষ সেখানে বিচ্ছিন্ন, একক, সামাজিক সম্পর্কগুলিও বিরোধমূলক। পুঁজিবাদী যন্ত্রের কাছে তার শরীর ও মন দুই-ই আক্রান্ত ও বিপর্যন্ত। এই দেশগুলির যুব মানসে উন্নত পুঁজিবাদী বিকাশের ফলে, পুঁজিবাদের আর্থিক নৈরাজ্যের চেয়েও মন ও মনন জগতের নৈরাজ্যই বেশি শক্তিশালী। পুঁজিবাদী সমাজে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতার (alienation) সমস্যা পুঁজিবাদের অমানবিক চরিত্র থেকেই উদ্ভূত। কিন্তু এর পাশপাশি কে অস্বীকার করবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন বা ফ্রান্সের মত পুঁজিবাদী দেশেও বেকারী, মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও দারিদ্র্য জনসংখ্যার একটি অংশকে ক্রমশই গ্রাস করতে চাইছে? একটি অন্ধকার অর্থনীতির ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে পুঁজিবাদী দেশগুলির তথাকথিত আর এক অংশের মানুষের উন্নত জীবনমান বা "স্বচ্ছল সমাজ"। তথাকথিত 'স্বচ্ছল সমাজ' জন্ম দিচ্ছে সামাজিক আর্থিক জগতে অজস্র অপরাধের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যে জঙ্গীবাদ, ফ্যাসিবাদ, নৃশংসতা, তীব্র প্রতিযোগিতা, খুন, জখম, লুঠ, ধর্ষণ, নেশা ও আত্মহত্যার শিখরে আরোহণ করেছে তা তো সর্বজনস্বীকৃত। দশ বছর আগের একটি হিসাবে দেখা যাচ্ছে প্রতি মিনিটে একটি গাড়ি চুরি, তিন মিনিটে একটি যারামারি, পাঁচ মিনিটে একটি ডাকাতি, চাবিশ মিনিটে একটি ধর্ষণ প্রভৃতি অপরাধ বর্তমানে অন্ততঃ দ্বিগুণ শক্তিবৃদ্ধি করেছে। বিগত কয়েক বছর উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলির সংবাদপত্র এবং পত্রিকা- গুলিতে চোখ বোলালেই কয়েকটি সাধারণ ঘটনা খুবই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে সামাজিক জীবনে, বিশেষত যুব জীবনে, যে ঘটনাগুলি প্রাধান্য পাচ্ছে, তা নিম্নরূপ:
১) বেকারী ও অন্যান্য অর্থনৈতিক সমস্যার বিরুদ্ধে যুবকদের বিক্ষোভ। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
২) যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির সপক্ষে সমাবেশ। এটিও ইতিবাচক।
৩) বর্ণবৈষম্যবাদ-ভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের হাঙ্গামা আবার মাথা চাড়া দিচ্ছে।
৪) যুবকদের বিভিন্ন অতিবামপন্থী ও নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন—খানিকটা সংগঠিত, খানিকটা অসংগঠিত। এরা কেউ প্রকৃতিতে ফিরে যাওয়ার পক্ষে। নাগরিক সভ্যতার বিভিন্ন কেন্দ্রে অট্টালিকা, ব্যাঙ্ক ও সওদাগরী অফিসে এরা বিক্ষোভ জানাচ্ছে, আক্রমণও চালাচ্ছে। কেউ দলবদ্ধভাবে নেশাগ্রস্ত বা অন্য ধর্মের আশ্রয় নিচ্ছে। দলে দলে বিদেশে আধ্যাত্মিক শান্তির জন্য পাড়ি জমাচ্ছে। শহর ছেড়ে পোড়ো বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া বা গণ-আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটছে।
৫) নিছক সামাজিক অপরাধ সংগঠিত করেই আনন্দ পাচ্ছে এবং এদের জীবনদৃষ্টি ও কর্মপন্থা সবই ব্যক্তিকেন্দ্রিক। আত্মহত্যার সংখ্যাও বাড়ছে। কেউ স্রোতে গা ভাসিয়ে বাঁচতে চাইছে নেশা ও যৌনতা নিয়ে। কিন্তু সামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্যার মধ্যে নামতে রাজী নয়।
৬০-এর দশকে ফ্রান্স ও জার্মানিতে (পশ্চিম) ‘যুব বিদ্রোহে’ এই বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্রোত একই সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। সেই শক্তি স্থিতাবস্থাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল সন্দেহ নেই কিন্তু শোষণের কেন্দ্রে স্বাভাবিক কারণেই আঘাত করতে পারেনি।
তৃতীয় দুনিয়ার সমস্যাটি একটু ভিন্ন। এখানে মানসজগতের চেয়ে সমাজ কাঠামোই সমস্যার মুখ্য উৎস। আর্থিক কাঠামো অনেক পিছিয়ে পড়া, বিশেষতঃ কৃষি অর্থনীতি প্রাক্ পুঁজিবাদী। ফলতঃ অশিক্ষা, নিরক্ষরতা, কুপমন্ডুকতার জগদ্দল গোদের ওপর বিষফোঁড়ার মত পুঁজিবাদ ক্রমশঃ বিস্তারলাভ করছে এবং এই সমস্ত দেশে আবার সাম্রাজ্যবাদীদের অর্থনৈতিক অনুপ্রবেশ নতুন বিপদ সৃষ্টি করছে। কয়েকটি দেশের উদাহরণ লক্ষ্য করা যেতে পারে। যেমন ব্রেজিল, চিলি, ফিলিপাইনস, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি। এখানে সংগঠিত বামপন্থী যুব আন্দোলনের পাশাপাশি দেখা যাবে দেশে অধিকাংশ যুবকই এখনও সামন্তবাদী, পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শেই জর্জ'রিত। এখানে দারিদ্র্যের সঙ্গে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিও যেমন আছে তেমনি মার্কিনী সমাজের বিষাক্ত সংস্কৃতিকে আমদানি করেছে সেই দেশের শাসকগোষ্ঠী। ফলে এক জটিল সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান তো হয়নি উপরন্ত নয়া উপনিবেশবাদের আদর্শগত বেড়া জালে যুব সমাজ আবদ্ধ হয়েছে। মার্কিনী চলচ্চিত্র, মাদক দ্রব্য ও কোকাকোলা সংস্কৃতিতেই নেশাগ্রস্ত হয়ে আছে। এই ইতিহাস তৃতীর দুনিয়ায় সমস্ত দেশেই কম বেশি, যেখানে নয়া-উপনিবেশবাদের ফেরিওয়ালারা তাদের পসরা সাজিয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আর তার প্রথম শিকার হচ্ছে সেই দেশের যুব সমাজ এবং তারা এলে এই যুব-সমাজ যে প্রতিবিপ্লবী বাহিনীতেও নাম লেখাতে পারে ক্ষেত্রবিশেষে তার প্রমাণ ইন্দোনেশিয়ার কামি এবং কাফি সংগঠন দুটি, দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার সমর্থক যুবসংগঠনগুলি।
অপরদিকে সিংহলের ‘যুববিদ্রোহ’-এর তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাটি ছিল দীর্ঘস্থায়ী আর্থ-সামাজিক অবক্ষয় ও জাতীর বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে যুবসমাজের একটি বলিষ্ঠ প্রতিবাদ। কিন্তু আন্তরিকতা ও স্বার্থত্যাগ সত্ত্বেও ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে এই বিদ্রোহ ব্যর্থ হলো। কারণ শ্রেণী রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রশ্নগুলি অমীমাংসিত রেখেই সেখানে আগুন জ্বলেছিল, তাই সে আগুন নিভতেও দেরি হয়নি।
আমাদের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী যুগে আর স্বাধীনতার পরবর্তী যুগে যুব জীবনে অর্থনৈতিক বাস্তবতার কোন মৌলিক তারতম্য ঘটেনি। এটি যেমন ঠিক, তেমনি অন্যদিকে মানসিকতার ক্ষেত্রে কিন্তু বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে। স্বাধীনতার আগে দেশে দারিদ্র্য ছিল, বেকারী ছিল—বর্তমানের তুলনায় তা কম থাকলেও ছিল। কিন্তু তখন সারা দেশব্যাপী সমস্ত জনসাধারণের সাধারণ শত্রু ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। ব্রিটিশ শক্তিকে দূর করতে পারলে দেশে সামগ্রিক অর্থে মুক্তি আসবে এই বিশ্বাস বিভিন্ন মতাবলম্বী চেতনাসম্পন্ন যুবকদের সাধারণ ধারণার মধ্যে ছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পরবর্তীকালে পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন হলো। দেশ স্বাধীন হলো কিন্তু মুক্তি এল না। স্বাধীনতার পর তিন দশক পেরিয়ে গেল। পেরিয়ে যাচ্ছে ছ'টি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। কিন্তু অর্থনৈতিক সামাজিক এবং আদর্শবাদের জগৎ ক্রমশঃই নৈরাজ্যে ভরে উঠছে। একথা আজ বিতর্কের অতীত যে, ভারতের অর্থনীতির পরিকল্পনা ঠিকভাবেই পরিচালিত হচ্ছে—একথা যত যুক্তি দিয়েই বলা হোক, তার পরিণতি সম্পর্কে কেউই আশাবাদী হতে পারছে না। ফলতঃ স্বাধীনোত্তর যুব সমাজের অধিকাংশের সামনে ভবিষ্যৎ অগ্রগতির সাধারণ কোন চিত্র সুস্পষ্ট নয়। বর্তমান ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখাও সম্ভব নয়। শাসকদল এই ব্যবস্থার পক্ষে যুবকদের সমর্থন পাওয়ার জন্য সঞ্জয়/রাজীব গান্ধীর পথের (?) কথা বলছে। সাম্প্রদায়িক পথও দেখানো হচ্ছে আর এস এস, জামাত-ই-ইসলাম প্রভৃতির মাধ্যমে। বিচ্ছিন্নতাবাদও মাথা তুলছে বিভিন্নভাবে। এরা সবাই স্ব স্ব পথে সমাধানের পথ খুঁজতে চাইছে। বলা বাহুল্য, এরই পাশাপাশি যুব জীবনে সংকট বাড়ছে, অস্থিরতা বাড়ছে এবং তা বিস্ফোরণের আকার নিচ্ছে। বিভিন্ন বুর্জোয়া ভাবাদর্শ অনুসরণকারী রাজনৈতিক দল যুব সমাজের মধ্যে যে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে তাতে সর্বভারতীয় ভিত্তিতে খানিকটা সাফল্য যে তারা অর্জন করেননি তা নয়। আসামে দুটি বছর ধরে যে তথাকথিত বিদেশী বিতাড়নের আন্দোলন চলছে বা গুজরাটে জাত-ভিত্তিক যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক তথাকথিত ছাত্র বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে একটি অন্তর্নিহিত সূত্র বেরিয়ে আসছে তা হলো বর্তমান ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা এবং দ্বন্দ্বটি কমছে না বরং বাড়ছে। সামন্তবাদী কুসংস্কার তথা ছত্রিশ কোটি দেবতার আধিপত্য হিন্দু ধর্মান্ধতার প্রভাবও যুবকদের মধ্যে কম নয়। বর্ণ, জাতের বিভেদ আজও সামাজিক এবং রাজনৈতিক জীবনে বাস্তব শক্তি। এরই ওপরে আবার দেশীয় পুঁজিবাদী ও পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী ভাবধারা যুব চেতনায় তরঙ্গ সৃষ্টি করছে। ভারতের সমস্ত শহরগুলিতে দ্রুত এই পাশ্চাত্যমুখী তথাকথিত নাগরিক আভিজাত্যের জন্ম নিচ্ছে। এখানে মূল্যবোধহীন, লক্ষ্যহীন টি ভি, ফ্রিজ, স্টিরিও-র ঝংকার। আর ঠিক তারই পাশাপাশি হাতদেখা, মাথা মুড়োনোর মত সামন্তবাদী কুসংস্কারও লোপ পায়নি। সামন্তবাদী মূল্যবোধ ও পুঁজিবাদী মূল্যবোধ হাত ধরাধরি করে সহাবস্থান করছে।
তবুও আমাদের যত দেশে যুব সমস্যা মূলতঃ পেছিয়ে পড়া অর্থনীতির সমস্যা। দুটি পরিসংখ্যান দেখা যেতে পারে।

সূত্র: ভারত সরকারের শ্রমদপ্তরের অধীন নিয়োগ এবং শিক্ষণ বিভাগ।

সূত্র: আদমসুমারী ১৯৮১
এই দুটি পরিসংখ্যান সম্পর্কে কয়েকটি সাধারণ মন্তব্য করা যেতে পারে। প্রথমতঃ বেকার সংখ্যার অর্ধেকও আমাদের মত দেশে রেজেস্ট্রিভুক্ত হন না এবং উল্লিখিত সরকারী হিসেবও তিন বছর আগের এবং অসম্পূর্ণ। তাহলে সমস্যার ভয়াবহতা যেমন লক্ষ্যণীয় তেমনি সমস্যাটি যে ক্রমবর্ধমান এটিও স্বীকার করতে হবে। দ্বিতীয়তঃ শিক্ষাগত প্রশ্নে শিক্ষিতের স্তর ভাগ না করেও স্বাধীনতার তিন দশক পেরিয়ে এসেও আমরা বলতে বাধ্য জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নিরক্ষর। এই হলো ভারতের যুব সমস্যার উৎসমুখ। এর ওপরে রয়েছে উপরিতলের মূল্যবোধ, সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত সমস্যার দিকটি। এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্ত'ন ছাড়া যুব জীবনে নৈরাজ্যমুক্তির পথ অবাস্তব এবং অলীক কল্পনা।
দেশ বিভাগের পর পশ্চিমবাংলাও ভাগ হলো। অনেকগুলি ঐতিহাসিক কারণে এই রাজ্যে যুব চেতনায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও প্রগতির ঐতিহ্য সুদূরপ্রসারী ছিল। স্বাধীনতার বিভিন্ন ধারার আন্দোলনে যুবকদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল। স্বাধীনতার পরবর্তীতেও সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি ও জাতপাতের বিভেদ, সামাজিক অবক্ষয় এবং রাজনৈতিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে বলিষ্ঠ ভূমিকা এ রাজ্যের মানুষ গ্রহণ করেছিলেন এ রাজ্যের যুব সমাজেও নেই প্রশ্নে নিঃসন্দেহে একটা বৈশিষ্ঠতা আছে। কিন্তু স্বাধীনতার জন্মলগ্নে এ রাজ্যের অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে দেশভাগ এক নতুন সমস্যার সৃষ্টি করলো। ছিন্নমূল উদ্বাস্তু সমস্যা শুধু অর্থনীতিকেই বিপর্যস্ত করেনি অনেক সযত্ন লালিত মূল্যবোধকেও পদদলিত করে গেল। দিন যত এগিয়েছে এ রাজ্যের সমস্যাও বেড়েছে। একদিকে যেমন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বামপন্থী আন্দোলন যুব সমাজকে পথ দেখিয়েছে তেমনি বিপরীত প্রক্রিয়াটিও অনিবার্যভাবে জন্ম নিয়েছে। এরাজ্যে শিল্পসৃষ্টির সমস্যা, জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ, পরিকল্পনার ব্যর্থতা, দীর্ঘ কংগ্রেসী শাসনের কুকীর্তি সমাজ জীবনে উত্তেজনা বাড়িয়েছে, অস্থিরতা বেড়েছে যুবমানসে। সমস্যার অর্থনৈতিক রূপটি একটু দেখা যাক।
১৯৮১ সালের আদমসুমারীর রিপোর্ট অনুযায়ী পশ্চিমবাংলার জনসংখ্যা ৪৪, ৩১২, ০১১ (১৯৭১) থেকে বেড়ে ১৯৮১-তে হয়েছে ৫৪, ৪৮৫, ৫৬০। এর মধ্যে ২২ লক্ষ রেজিস্ট্রিকৃত বেকার আর শতকরা ৬০ ভাগ নিরক্ষর মানুষ। চিত্রটি স্বভাবতই ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় উন্নত তো নয়ই বরং আরও বেশি অভিশপ্ত।
আর কলকাতা মহানগরী? এই শহরে নাগরিক জীবন তথা যুব-জীবন যেন সংকটের একটি প্রতীকি প্রতিচ্ছবি। এই শহরের বর্তমান জনসংখ্যা: — আদমসুমারি ১৯৮১— অনুযায়ী ৩, ২৯১, ৬৫৫। সাম্প্রতিক আদমসুমারীর রিপোর্টে এও বলা হয়েছে প্রায় ৩১ ভাগ মানুষ এই শহরে নিরক্ষর। শ্রমিকশ্রেণীর সংখ্যা নিম্নরূপ: পুরুষ ১০, ৯৬,২৪৮, মহিলা ৬৯,২১৪। কিন্তু কোন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত নয় এই সংখ্যা নিম্নরূপ: পুরুষ ৮২৮, ২৫৭, মহিলা ১, ১৫৪, ৯৪৭।
কিছুদিন আগে সি এম ডি এ কর্তৃপক্ষ কলকাতা শহরে কয়েকটি বস্তীতে সমীক্ষা চালান। এই সমীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল বস্তিবাসী নাগরিকদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবস্থার মূল্যায়ন। একটি রিপোর্ট এই রকম -
লোকসংখ্যা এবং তার শতকরা হার এবং পেশাগত ভিত্তিতে লোকসংখ্যর বণ্টন
এই ধরনের একটি নমুনা সমীক্ষা থেকে যে নিদারুণ চিত্রটি বেরিয়ে আসে তা হল এই — যে অর্থনৈতিক নীতি আমাদের দেশে অনুসৃত হচ্ছে তার অনিবার্য ফল হিসেবে জনসংখ্যার একটি অংশ ক্রমশই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে বেকারীতে ভুগছে এবং এই সমস্যা বাড়ছেই। প্রক্রিয়াটি কোন অংশেই কমে আসার নয়। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকায় জনসংখ্যার ৭০ ভাগ মানুষই প্রকৃত অর্থে কর্মহীন। এদের মধ্যে মহিলা এবং বৃদ্ধদের বাদ দিলেও মূলতঃ যারা কর্মহীনতায় ভুগছে তারা সক্ষম মানুষ, তারা কাজ চাইছে। সংগঠিত শিল্প বা অফিস দপ্তরে (অর্গানাইজড সেকটর) নয়। অথবা স্ব স্ব পন্থায় বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাল্ডে (আনঅর্গানাইজড সেকটর) যুক্তও নয়। অধিকাংশই এখনও সমস্ত অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের বাইরে রয়ে গেছে এবং এদের বেশির ভাগই নিরুপায় হয়ে বেপরোয়া পন্থায় বাঁচতে হচ্ছে। এরা বাঁচতে চায় বেঁচে থাকতে গিয়ে কোন না কোন পন্থা অবলম্বন করতেই হচ্ছে। দারিদ্র্য সীমার নিচে তো বটেই এরা সমস্ত অর্থে এক অমানবিক জীবনযাপন করছে। নিচের তলায় এই জমে থাকা অন্ধকার সবচেয়ে বেশী বিপর্যস্ত করছে যুব সমাজকে, সহস্র অপরাধ প্রবণতার জন্ম দিচ্ছে, কারণ কোন সুস্থ অর্থনীতির পথ এদের সামনে খোলা নেই, যে পথ ধরে এই বিপুল সংখ্যক পরিবারগুলি বাঁচতে পারে। নিম্নতম জীবনের চাহিদাগুলি যেটাতে পারে।
কলকাতা মহানগরীতে সংগঠিত অপরাধের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা এক নজরে দেখলেই দেখা যাবে সংখ্যার হারে খানিকটা তারতম্য হলেও এই মহানগরীতে অপরাধের একটি নিজস্ব জগৎ গড়ে উঠেছে সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এই অজস্র অপরাধ সংগঠিত করছে কারা? অতীতে অপরাধ মনস্তত্ব সম্পর্কে একটি সাধারণ ধারণা ছিল যে, কিছু মুষ্টিমেয় কট্টর অপরাধী তারাই সমাজে অপরাধ সংগঠিত করে এবং সমাজকে তার ফল ভোগ করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে বাস্তবতা ক্রমশই এই সত্য প্রমাণিত করছে যে সামাজিক অবস্থাই জন্য দেয় অপরাধের এবং অপরাধীর। কলকাতা শহরে এই সংগঠিত অপরাধগুলির ক্ষেত্রে অপরাধীদের একটি সামাজিক সমীক্ষা চালালে দেখা যাবে যে কীভাবে এক অনিবার্য আর্থ-সামাজিক প্রক্রিয়ার পরিণতিতে কত অজস্র অপরাধী পরিবারের সৃষ্টি হয়েছে, কত অজস্র যুবক অপরাধীদের এই নিচের মহলে ক্রমশই নাম লেখাচ্ছে। অপরাধপ্রবণতা এক সামাজিক চরিত্র অর্জন করছে। নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত এমনকি শ্রমিক পরিবারের ছেলেরাও সামাজিক সংঘাত, হতাশা, প্রতিযোগিতার সামনে দাঁড়িয়ে প্রকৃত জীবনের থেকে সরে এসে অপরাধীদের তালিকায় নাম লেখাচ্ছে। সমস্যার গভীরতা এখানেই।
বলা বাহুল্য যে শ্রেণীগুলি ক্ষমতায় আছে সাংস্কৃতিক জগতেও তারা আধিপত্য করতে চায়। এদেশে সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলো পণ্য হিসাবে পুঁজিবাদীদেরই করায়ত্ত। ফলে সিনেমায় যাত্রায় পত্রপত্রিকার কবিতা উপন্যাসে নাচে গানে বিজ্ঞাপনে পোশাকে সর্বত্র যে যৌনসর্বস্বতার বিচিত্র রঙের পসরা সাঙ্গানো হয়েছে তার একদিকের উদ্দেশ্য যেমন মুনাফা, অন্যদিকে যুবমানসকে অন্ধকারে হাতছানি দেওয়া হচ্ছে। এই অর্থনৈতিক সামাজিক পরিবেশে পশ্চিমবাংলার নাগরিক যুবজীবনের সমস্যাগুলিকে নিম্নলিখিতভাবে দেখা যেতে পারে:
১) সমাজের সবচেয়ে তলার দিকে যারা ক্রমশঃই অর্থনৈতিক কর্মকান্ড থেকে বিচ্যুত হচ্ছে সেখানে সংগঠিত অপরাধ প্রবণতার হার বৃদ্ধি হচ্ছে। এ এক ভয়ংকর অশুভ শক্তি হিসেবে সামাজিক মূল্যবোধকে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে আঘাত করতে চাইছে। এই অপরাধপ্রবণতা ব্যাপকভাবেই সমাজ-বিরোধিতার স্তরে গিয়ে উঠেছে। নিম্নবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত পর্যন্ত একটা বড় অংশের যুব সমাজ এর শিকার।
২) যুবকদের একটি অংশ হতাশাগ্রস্ত। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈরাজ্য এবং ভবিষ্যতহীনতা, সামাজিক সুস্থ মূল্যবোধের পচন এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ও কোন আদর্শ সম্পর্কে অবিশ্বাস ক্রমশ তার সমাজ-চেতনার অবলুপ্তি ঘটাচ্ছে।
৩) একটি অংশের যুবক যে কোন একটি কিছুকে ধরে উত্তেজনা খুঁজতে চাইছে। সে কোন চিত্রাভিনেতাই হোক, কোন জনপ্রিয় খেলার ক্লাবই হোক বা যে কোন অসামাজিক অসুস্থ ঘটনাকে তারা অবলম্বন করতে চায়।
৪) ধর্মের ও ভাগ্যের উপর বিশ্বাসও যথেষ্ট রয়েছে। এই বিশ্বাসের সঙ্গে যুব জীবনের উচ্ছ্বাস মিলে গিয়ে বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদকে ক্রমশই হারিয়ে ফেলছে।
৫) আর একটি অংশের কথাও বলা যেতে পারে। যারা অপেক্ষাকৃত একটু ওপরের স্তরের যুবক তারা অর্থনৈতিক ভাবে কিছু পেয়েছে এবং জীবনাদর্শের ক্ষেত্রে Dog eat dog (বাংলায় বোধ হয়, কুত্তার মাংস কুত্তায় খায়) প্রতিযোগিতার মতবাদে বিশ্বাসী। এরা আইনী পথে আরও ওপরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে চায়। উঠতে না পারলে বে-আইনী পথে উঠতে এতটুকু দ্বিধা নেই।
পশ্চিমবাংলায় যেহেতু রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রভাব সর্বব্যাপী এবং বামপন্থী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রভাবও সুদূরপ্রসারী সেই প্রভাবের বৃত্তের মধ্যেই বামপন্থী যুব আন্দোলনও (ছাত্র আন্দোলন সহ) গড়ে উঠেছে। এই সংগঠিত আন্দোলন নিঃ- সন্দেহে যুবকদের মধ্যে একটি ইতিবাচক দারিত্ব পালন করছে এবং তার প্রভাবকে অতিক্রম করে অন্য কোন বিপদ মাথা তুলতে পারেনি। বামপন্থী ছাত্র যুব আন্দোলনের সাফল্য ও রাজনৈতিক শক্তির কথা স্মরণ রেখেও বলা যেতে পারে যে সমস্যার গভীরতাকে উপলব্ধি করে বিপদের ইঙ্গিতগুলি স্মরণ করে আরো বেশি সচেতন হওয়া দরকার ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে।
ইতোমধ্যে আমাদের রাজ্যে শাসক শ্রেণী পরিচালিত ছাত্র যুব সংগঠন সম্পর্কে (ছাত্র পরিষদ-ই এবং যুব কংগ্রেস-ই) আমাদের একটি সাধারণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা হলো যে একটি অংশের সমাজ বিরোধীদের জড়ো করে তাদের সংগঠনের প্রধান ভিত্তিকে দাঁড় করানোর পাশাপাশি এরা পেছিয়ে পড়া খুবমানসে পচনশীল বুর্জোয়া অবক্ষয়ী মূল্যবোধগুলিকেই অবলম্বন করতে চাইছে এবং ভারই ভিত্তিতে সাধারণ যুব সমাজের একটি অংশকে সংগঠিত করছে, তাদের সক্রিয় প্রভাব বজায় রাখছে। পুঁজিবাদী অবক্ষয়ী ভাবধারাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।
তাই, আমাদের সামনে দায়িত্বও অনেক। প্রথমতঃ,— যুব জীবনে সংকটের প্রশ্নে যে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার যাঁতাকলে আমরা পিষ্ট হচ্ছি, তার বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী এবং আশু সংগ্রামের গুরুত্ব সর্বাধিক। বেকারীর বিরুদ্ধে আন্দোলন, জমির জন্য আন্দোলন, শিল্পায়নের জন্য আন্দোলন— এইগুলির পাশাপাশি বর্তমান কাঠামোটিকে পরিবর্তন করে মৌলিক সংগ্রামের ব্যাপক ক্ষেত্র প্রস্তুতের জন্য বেশি বেশি করে উদ্যোগ নিতে হবে। এই আন্দোলনের প্রক্রিয়াটি নিরন্তর চলবে। সামন্তবাদী-পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মৌলিক চরিত্রটিকে চেনাতে এবং পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ব্যাপক যুব সমাজের স্থির বিশ্বাস সৃষ্টি করার কাজ নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। কিন্তু আমরা বাস্তবে সেই আন্দোলনকে গড়ে তুলতে না পারলে সমস্যার সমাধানের পথে অগ্রসর হতে পারবো না।
দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সংকট মুক্তির সংগ্রাম রাজনৈতিক সংগ্রাম ব্যতিরেকে নয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তিগুলির অবস্থান কোথায়? রাজনৈতিক দলগুলির শ্রেণীচরিত্র, বামপন্থী গণতান্ত্রিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা এবং সম্ভাবনা এই সমস্ত প্রশ্নই বর্তমানে জরুরী প্রশ্ন। শ্রমিকশ্রেণীর পথই যে যুবসমাজের পথ, শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক দল হিসাবে আমাদের পার্টির ঐতিহাসিক দায়িত্ব এবং সেই কর্মকান্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাবোধে ব্যাপক যুবসমাজকে আকৃষ্ট করতে হবে। রাজনৈতিক সংগ্রাম ছাড়া কোন ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা হতাশা বা নিয়তিবাদ যে সমাধানের পথ নয় এবং বুর্জোয়া রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি বা সুবিধাবাদ যে শেষ কথা নয়, শোষিত শ্রেণীর হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল এবং নতুন দেশ গঠন করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাপক যুব সমাজের কাছে উপস্থিত করতে হবে। বলা বাহুল্য বিগত তিনটি দশকে বুর্জোয়া নেতারা নিজেদের অপরাধের তালিকা নিয়ে যেমন রাজনৈতিক জীবনকে কালিমালিপ্ত করেছে তেমনি রাজনীতি সম্পর্কে যুব সমাজের অনীহা সৃষ্টির জন্য ‘রাজনীতি থেকে দূরে থাক’ মতবাদও তৈরি করেছে। এর বিরুদ্ধে আমাদের কঠিন সংগ্রামের প্রয়োজন।
তৃতীয়তঃ সমস্ত সংগ্রামের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ভাবাদর্শের প্রসঙ্গ। আধুনিক বিশ্বে সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও বৈজ্ঞানিক মানবতাবাদ হলো মার্কসবাদ লেনিনবাদ। বর্তমান দুনিয়ায় এই আদর্শের বাস্তব রূপায়ণে যেমন সৃষ্টি হয়েছে সমাজতান্ত্রিক শিবির, যেখানে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ উন্নততর সমাজে বাস করছে এবং যা ক্রমশই বিকশিত হচ্ছে। পুঁজিবাদের শিকল ভেঙ্গে সমাজতন্ত্রের উত্তরণের প্রক্রিয়াটি আগামী দিনেও অনিবার্য। কিন্তু তার বিরুদ্ধেও রয়েছে শক্তিশালী পুঁজিবাদী দুনিয়া এবং পুঁজিবাদের সপক্ষে মতবাদের নানান রঙীন তত্ত্ব। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে নস্যাৎ করার চেষ্টায় আজও পুঁজিবাদী তাত্ত্বিকেরা কম সক্রিয় নয়। সাম্প্রতিক কালে সমাজতান্ত্রিক শিবিরে অভ্যন্তরীণ সমস্যা ও সমাজতন্ত্রের জন্য সংগ্রামের মতাদর্শ'গত বিরোধ নিয়ে যে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই যেমন সমস্ত দেশের ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে তার থেকে আমাদের দেশের যুবমানসও বাদ যাচ্ছে না।
যুবমানসের বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী আদর্শের প্রতি আকর্ষণ তার স্বভাবজাত। সমাজতন্ত্রের আদর্শে'র প্রতি তার অনিবার্য আকাঙ্ক্ষাকে প্রজ্জলিত রাখার জন্য সাম্প্রতিক জটিলতার বিরুদ্ধে আমাদের আদর্শগত সংগ্রামকে আরও বেশি জোরদার করা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের মৌল শিক্ষাগুলিকে আমরা যত বেশি করে সহজবোধ্যভাবে যুব সমাজের ব্যাপকতর অংশের মধ্যে পৌঁছে দিতে পারবো তত বেশি করে আমরা সাম্প্রতিক সমস্যাগুলি অতিক্রম করতে পারবো। আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী যত জটিলতা সৃষ্টি করুক একজন যুবকের নিজস্ব চিন্তায়, আবেগে যুক্তিতে এবং জীবনদৃষ্টিতে যদি আমরা সমাজতান্ত্রিক ভাবধারাকে সৃষ্টি করতে পারি তবেই আমরা পারবো দেশব্যাপী বুজোয়া ভাবাদর্শে'র বিরুদ্ধে আদর্শগত সংগ্রামের সাফল্য অর্জন করতে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর একদিকে যেমন প্রমাশিত হয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, এমনকি উন্নত মার্কিনী পুঁজিবাদও পরাজিত দৈত্যের মতন ধুঁকছে। সে যুব সমাজকেও কিছুই দিতে পারে না। আর্থিক ও আত্মিক সংকটে পুঁজিবাদের বিশ্বজয়ের রূপকথাও ধুলোয় মিশে গেছে। বিপরীতে যুদ্ধোত্তর দুনিয়ায় অনেক পেছিয়ে পড়া দেশ যেমন চীন, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, কিউবা নিরঙ্কুশভাবেই তাদের সমাজ ব্যবস্থার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত করেছে। সেখানকার যুবজীবনের অভাবনীয় সাফল্য, বিশ্বজোড়া অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করেছে বিশেষতঃ তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলির কাছে।
অপরদিকে স্বাধীনতার তিনটি দশক অতিক্রম করেও অর্থনীতির যে ভয়ংকর বিপর্যয়ের আমরা সম্মুখীন এবং তদ্জনিত প্রক্রিয়ায় সামাজিক, আদর্শগত জীবনে যে নৈরাজ্য আজকে বাস্তব, তার মধ্যে আমাদের নামতেই হবে। সেই স্রোত থেকে দূরে থেকে নয়, সেই স্রোতের মধ্যে অবগাহন করেই আমাদের যুবমনকে জয় করতে হবে। অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক এবং আদর্শগত সংগ্রামের জটিলতাগুলিকে তত্ত্ব এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণে সমাধানও আমাদেরই করতে হবে। তবেই আমরা পারবো এই সমাজের মধ্যে নতুন সমাজের জন্য লড়াইয়ে ‘নতুন মানুষ’ সৃষ্টি করতে।
মার্কসবাদী পথ-এর এই সংখ্যাটি সংগ্রহ করতে পারেন আমাদের ওয়েবসাইটের আর্কাইভ সেকশান থেকে: মার্কসবাদী পথ, ১৯৮১ সাল, অগাস্ট সংখ্যা
প্রকাশের তারিখ: ২১-আগস্ট-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
