সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আরপিডি, স্তালিনের ব্রিটিশ মুখপাত্র
সৌভিক ঘোষ
আমাদের দেশে রজনী পাম দত্ত প্রসঙ্গে যে কোনও আলোচনায় তার লেখা ‘ইন্ডিয়া টুডে’ বইটির উল্লেখ থাকেই। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতের ইতিহাস চর্চার ধারায় অনেকেই সেই বইটিকে প্রথম লেখা বই বলেও চিহ্নিত করেন। ১৮৯৯ সালে লিখিত ভি আই লেনিনের অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত রচনা ‘ডেভেলপমেন্ট অফ ক্যাপিটালিজম ইন রাশিয়া’র ধারা মেনেই দত্তের লেখা ‘ইন্ডিয়া টুডে’ (১৯৪০) অবশ্যই মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি সন্দেহ নেই, কিন্তু ওটাই প্রথম কাজ এমনটা বলা উচিত না। সেই কাজ করেছিলেন এম এন রায়’ই। রায়ের লেখাটি অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ, বেশ কিছু সিদ্ধান্ত সঠিক নয় বলে পরে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন, কিন্তু সন-তারিখের বিচারে সেই লেখাই প্রথম।

১
সিক্স পেনি। কেমব্রিজের একজন চিকিৎসক হিসাবে সেটাই ছিল তার ভিজিট। অনেকেই বলতেন পুওর ম্যান’স ডক্টর। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হলে হয়ত ছ-পয়সার ডাক্তার বা ওরকম একটা কিছু লিখে যেতেন। উপেন্দ্র কৃষ্ণ দত্তের জন্ম হয় কলকাতায়, ১৮৫৭ সালে। চিকিৎসাশাস্ত্র পড়তে ইংলন্ডে যান, পাশ করে সেখানেই পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন। তার স্ত্রী অ্যানা পাম। তাদেরই দ্বিতীয় সন্তান, রজনী পাম দত্তের জন্ম হয় ১৮৯৬ সালের ১৯শে জুন।
১৯০৭ সাল। সুরাটে জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন চলার সময়েই প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা কেমব্রিজের এক ডাক্তারখানা অনেক রাত অবধি খোলা রইত। ভিতরে ফায়ারপ্লেসের কাছেই রাখা একটি টেবিলের চারপাশে এসে বসতেন অনেকেই। সুরাটে আলোচনার প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ভিত্তি করে আরেক দফার আলোচনা শুরু হত। এখানে যারা ছিলেন তারা সকলেই প্রবাসী ভারতীয়। তাদের একটি অংশ মধ্যপন্থী- তারা চাইতেন দেশের আন্দোলন সংগ্রাম যতদূর সম্ভব শান্তির পথে এগিয়ে চলুক। আরেকদিকে ছিলেন চরমপন্থীরা- ইংরেজ শাসনকে উৎখাত করতে যেকোনো বাধা পেরিয়ে যেতেই যাদের উৎসাহ। এহেন আলোচনা সভা অবশ্যই গোপনে আয়োজিত হত, উপেন্দ্র কৃষ্ণই এসবের উদ্যোক্তা ছিলেন। বড়দের সান্ধ্য আলোচনায় এক কিশোরও বসে থাকত, কিছুটা চুপচাপ কিন্তু সজাগ। পরে নিজের ছোটবেলার স্মৃতিচাণ করতে গিয়ে রজনী পাম দত্ত বলেছিলেন- ‘ঐ সময়ই রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি হয়’। পিতা উপেন্দ্র কৃষ্ণই তার প্রথম রাজনৈতিক শিক্ষক- তিনিই শিখিয়েছিলেন নিজের দেশের মানুষকে- বিশেষ করে গরীব মানুষকে ভালবাসতে হয়।
২
বিখ্যাত পারসি স্কুলে পাঠ শেষে কৃতি ছাত্র হিসাবেই প্রথমে কেমব্রিজ পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মেধাবী হিসাবে সুপরিচিতি স্বত্বেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিরোধিতায় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রচারের অপরাধে তাকে বহিস্কার করা হয়। ফাইনাল পরীক্ষায় বসার সুযোগ দেওয়া হলে ‘ফার্স্ট ক্লাস’ সহ পাশ করেন। ইতিমধ্যেই জড়িয়ে পড়েছেন ব্রিটেনের শ্রমিক আন্দোলনে। রাশিয়ায় বিপ্লব সফল হওয়ার আগেই নিজেকে মার্কসবাদী হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেন রজনী পাম দত্ত। লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করেন ১৯১৭ সালে, ৩১ শে জুলাই-১৯২০ কমিউনিস্ট পার্টি অফ গ্রেট ব্রিটেন’র প্রতিষ্ঠা হয়। সেই পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম একজন তিনি নিজে। সময়টা গুরুত্বপূর্ণ, ঐ একই বছর তাসখন্দে এম এন রায়’রা গড়ে তুলছেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি।
১৯২১, ‘লেবর মান্থলি’র প্রকাশনা শুরু হয়। মনে রাখতে হবে, ইংলন্ডে শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস অনেক পুরানো, শ্রমিক পার্টিও বহুদিনের। তাদের নিজস্ব প্রকাশনা ছিলই। তা স্বত্বেও ‘লেবর মন্থলি’র গুরুত্ব এই যে কাগজের সম্পাদক হিসাবে রজনী পাম দত্ত বিভিন্ন কলকারখানায় কর্মরত বা কাজ হারানো শ্রমিকদের পাঠানো চিঠিপত্রগুলি সরাসরি প্রকাশ করতে শুরু করলেন। এরই সাথে কাগজের নিয়মিত কলাম লেখক হিসাবে তৎকালীন ইংলন্ডের বহু বুদ্ধিজীবীদের লেখাও বেরোনো শুরু হয়- জর্জ বার্নার্ড শ’ তাদেরই একজন। সিপিজিবি’র সাপ্তাহিক মুখপত্র ‘ওয়ার্কার্স উইক্লি’র সম্পাদকীয় কলামে তার ধারাবাহিক লেখা ‘নোটস অফ দ্য মন্থ’ আজও ইংলন্ড সহ গোটা পৃথিবীতে উল্লেখযোগ্য কমিউনিস্ট সাহিত্যের অন্যতম।
৩
১৯২৩ সালে এক্সিকিউটিভ কমিটি অফ দ্য কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল (ইসিসিআই)-র আলোচনায় ব্রিটেনের নির্দিষ্ট পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আলোচনা করতে সোভিয়েত ইউনিয়নে যান। আরও পরে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের পক্ষে ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হন। রজনী পাম দত্ত আগাগোড়া কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের পক্ষে থেকেছেন। যেকোনো ঘটনার ব্যখ্যায় তার আলোচনার ভিত্তিই ছিল সেই দৃষ্টিভঙ্গী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইংলন্ড তাতে যুক্ত হয়, সিপিজিবি’র তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক হ্যারি পলিট এমন সিদ্ধান্তে সমর্থন জানালে তার বিরোধিতা করলেন রজনী পাম দত্ত। হ্যারি’কে সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকেও সরে যেতে হয়। পরে জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বদল ঘটেছে বলে পলিট পুরানো জায়গায় ফেরত এলেন। দুটি ঘটনাকেই সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিবেচনা করা ও দত্ত’কে সরাসরি সোভিয়েতপন্থী বলে দাগিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। আসলে অনেকেই ভুলে যান কমিউনিস্টদের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনও একটি দেশমাত্র ছিল না, ছিল বিশ্ববিপ্লবের পথপ্রদর্শক। যারা নিজেদের বিশ্বনাগরিক বলে (আজকের পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের যুক্তিতে না, যে অনুভবে বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদের নামের সাথে ‘অফ’ শব্দটি ব্যবহার করে তার জোরেই) স্বীকার করছেন আর পাঁচজনের মতো করে ‘জাতীয়তাবাদ’ তাদের চেতনায় সক্রিয় হয় না। এই বোধ সহজ নয়, জনপ্রিয় তো নয়ই। হাজার কুৎসার মুখোমুখি হয়েও রজনী পাম দত্তেরা সেই কঠিন কাজই সারাজীবন করে গেছেন- কার্যত অনায়াসে। এমন সাহসের ভিত্তি একটাই- মতাদর্শ।
এহেন সচেতন মতাদর্শ চর্চাই উদারবাদী বুদ্ধিজীবীদের চোখে তাকে ঈষৎ কর্কশ বলে চিহ্নিত করেছে। যেমন তার জীবনীকারদের অন্যতম জন ক্যালাঘান অত্যন্ত বিরক্তির সাথে নিজের লেখা শুরুই করেছেন একটি বাংলা প্রবাদের ইংরেজি ভাষান্তর দিয়ে-
The Ghoshes are high caste,
The Boses are generous,
The Mitras are cunning
But the Dutts are scoundrels.
জনের লেখা সেই বইটির শিরোনাম দেখলেই বোঝা যায় এমন বিরক্তির কারন আসলে কি! Rajani Palme Dutt: A Study of British Stalinism- অর্থাৎ, স্তালিন সম্পর্কে লেখকের কষ্টার্জিত ঘৃণাই রজনী পাম দত্তের কথা বলতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে। মেধার আড়ালে ঘৃণা প্রচারের সেই ধারা শেষ হয়নি, এখনও চলছে।
৪
১৯২০ সালে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা হলেও ভারতে তখনও অবধি কমিউনিস্টরা মূলত একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই সক্রিয় ছিলেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন প্রদেশে গড়ে ওঠা কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলি একে অন্যের সাথে যোগাযোগ সুদৃঢ় করে ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ব্রিটিশ শাসক বলশেভিক বিপ্লবের বিপদ সম্পর্কে সজাগ ছিল, তাই তারা আর অপেক্ষা করতে রাজী হল না।
১৯২৩-২৪ সালে নর্থ-ওয়েস্ট ফ্রন্টিয়ার এলাকায় পেশোয়ার কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলা এবং ১৯২৪ সালে কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের হয়। ১৯২৮ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অনেকগুলি গোষ্ঠী একত্রে ওয়ার্কার্স অ্যান্ড পিজ্যান্টস পার্টি গড়ে তোলে। অল ইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসেও ততদিনে কমিউনিস্টদের প্রভাব অনেকটাই বেড়েছে। এই বিপদ প্রতিরোধেই ১৯২৯ সালে মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের হল।
ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে ধ্বংস করতে চেয়েই এই মামলা হয়েছিল, কিন্তু ফল হল একশো আশি ডিগ্রি বিপরীত। এই মামলায় অভিযুক্ত কমিউনিস্ট নেতৃত্ব আদালতের কাঠগড়াকেই পার্টির কাজের প্রচার এবং প্রসারের মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করেন। তারা সিদ্ধান্ত নেন পার্টির পক্ষে কেউ নিজের বক্তব্য আলাদা করে না জানিয়ে সম্মিলিত একটি সাধারণ বক্তব্য তুলে ধরা হবে। সেই বক্তব্যই হবে আদালতের সামনে তাদের জবাব, দেশবাসীর সামনে তাদের কর্মসূচী। গোটা দেশে কমিউনিস্টদের খবর ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারের কাজ, বিস্তারের কাজ সরকারী বিধিনিষেধের কারনেই বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিল, ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছিল - সরকারী প্রাঙ্গণকে সেই উদ্দেশ্যেই অসাধারণভাবে ব্যবহার করলেন কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা। ফ্যাসিস্ত বাহিনীর হাতে বন্দী হয়ে একই কায়দায় জর্জি দিমিত্রভ নিজের বক্তব্য প্রচার করেছিলেন। বিচারাধীন বন্দী হিসাবে আদালতে দাঁড়িয়ে জর্জি দিমিত্রভ, ফিদেল কাস্ত্রো’রাও এই পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালীন কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা আদালতের সামনে যে সাধারণ বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন তাকেই ‘Communists Challenge Imperialism From The Dock’ শিরোনামে একটি ইংরেজি বই প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ছিল ন্যাশনাল বুক এজেন্সি। বইটিতে মুখবন্ধ লেখেন কাকাবাবু, কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদ - যিনি নিজেই মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় অন্যতম একজন অভিযুক্ত ছিলেন।
তাঁর সেই লেখায় উল্লেখ রয়েছে- ‘এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি ডঃ স্যার শাহ সুলেইমান এবং বিচারপতি জে ইয়ং-এর রায়ের ভিত্তিতে ১৯৩৩ সালের ৩রা অগাস্ট ভারতের প্রধান বিচারপতি মিরাট ষড়যন্ত্র মামলার রায় ঘোষণা করেন। এই মামলার রায়ে মুজফ্ফর আহ্মদকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের শাস্তি ঘোষণা করা হয়। এস এ ডাঙ্গে, ফিলিপ স্প্রাট, এস ভি ঘাটে, কে এন যোগলেকর এবং আর এস নিম্বকরের ১২ বছরের জন্য দ্বীপান্তরের শাস্তি হয়। বি এফ ব্রাডলে, এস এস মিরজকর, শওকত উসমানীর ১০ বছরের জন্য দ্বীপান্তর, মির আবদুল মজিদ, সোহন সিংহ যশ, ধরনীকান্ত গোস্বামীর ৭ বছরের জন্য দ্বীপান্তর, অযোধ্যা প্রসাদ, গঙ্গাধর অধিকারী, পূরণ চাঁদ যোশী এবং এম জি দেশাইয়ের ৫ বছর দ্বীপান্তর ঘোষিত হয়। গোপেন্দ্র চক্রবর্তী, গোপাল চন্দ্র বসাক, এইচ এল হাচিনসন, রাধা রমণ মিত্র, এস এইচ ঝাবওয়ালা এবং কেদার নাথ সেহগলকে ৪ বছরের জন্য সশ্রম কারাদন্ড দেওয়া হয়, শামসুল হুদা, এ এ আলভে, জি আর কাসলে, গৌরি শংকর এবং লক্ষণ রাও কদমকে ৩ বছরের জন্য সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ দেওয়া হয়।’
আসামীদের মধ্যে দুয়েকটি নাম এই প্রবন্ধের জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফিলিপ স্প্র্যাট ও বি এফ ব্র্যাডলে- বেঞ্জামিন ফ্রান্সিস ব্র্যাডলে। ইংলন্ড থেকে সিপিজিবি তাদের ভারতে পাঠায় এদেশে বিপ্লবের কাজে সহযোগী হতে- এবং তারা সেই দায়িত্ব মাথায় নিয়ে চলেও আসেন। মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় আসামীও হন। সেই মামলায় ব্র্যাডলে জেল থেকে ছাড়া পান ঠিকই, তবে শর্ত এই যে তাকে পত্রপাথ নিজের দেশে ফেরত যেতে হবে। দুমাস পরে ইংলন্ডের ভিক্টোরিয়া স্টেশনে নামতেই উষ্ণ অভ্যর্থনায় তার সাথে হাত মেলালেন সাপুরজি সাক্লাতওয়ালা। মিরাট মামলায় খরচ যোগাতে সাপুরজি ব্রিটেনে বিশেষ তহবিল অবধি গড়েছিলেন। রজনী পাম দত্তের সমসাময়িক যাদের বিশেষ উদ্যোগে সিপিজিবি’র সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্য চেহারায় পৌঁছেছিল বেন ব্র্যাডলে ছিলেন তাদেরই একজন।
মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বিশেষ বদল ঘটে যায়। দুনিয়াজুড়ে যুদ্ধের মহড়া শুরু হচ্ছে, এবার প্রবল শক্তি হিসাবে উপস্থিত ফ্যাসিবাদ। সেই অবস্থায় ভারত ছাড় আন্দোলন সম্পর্কে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য জনমানসে বিরুপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। অশোক মিত্রের লেখায় রয়েছে, একদিকে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে জাতীয় মুক্তির উন্মাদনা যাকে অস্বীকার করা যায় না, আরেকদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত বলে জনযুদ্ধের যে আহ্বান তাও তো ভুল নয়, কিন্তু লোককে কিছুতেই সেকথা বোঝানো যায় না। সিপিআই(এম)-র প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক হরকিষেন সিংহ সুরজিত লিখছেন- ‘Basing themselves on exaggerated evaluations of the readiness of the masses for a democratic revolution, they gave the slogan of workers and peasants government, which was considered to be the beginning of the development of socialist revolution. The draft platform of the Communist Party of India demanded the "establishment of a Soviet government", the "creation of an Indian Federal Workers' a Peasants' Soviet Republic", while rejecting the possibility of the participation of the national bourgeoisie in the anti-imperialist struggle.
This was a period when faced with the rise of fascist forces in Germany and other countries the demand was being raised for the formation of popular front against fascism and appeals were made to the working class and other forces of social democracy to join hands. The French and German Communist parties had taken initiative in this direction. In India, though the platform of action contained the sectarian approach, practically after the withdrawal of the civil disobedience movement discontent was growing among the Left inside the Congress and the Congress Socialist Party came into existence in 1935 and in many places communists in tune with the mass mood started working inside the Congress. It was during this period that the All India Kisan Sabha, the All India Trade Union Congress and the All India Students Federation were formed. Communists and socialists had gained considerable influence and they were also working inside the Congress, though they were yet to come forward with a clear cut analysis of the political situation prevailing then and the class alliance to be built for achieving the goal of complete independence and the importance of various means to mobilise the people. It was against this background when the Congress decided on the Constitution in 1935 which had very limited powers that this thesis came.’
এই থিসিস আসলে ভারতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন প্রসঙ্গে কমিউনিস্টদের বোঝাপড়া সংক্রান্ত দলীল। রজনী পাম দত্ত এবং বেন ব্র্যাডলে একসাথে সেই দলীল লেখেন। ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে সেই দলীল দত্ত-ব্র্যাডলে থিসিস বলে বিখ্যাত। এই দলীলে ভারতের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে জাতীয়মুক্তির প্রশ্নকে কমিউনিস্টদের সাধারণ লক্ষ্যের সাথে একাত্ম করা হল। সেই পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব আরও এই কারণে যে পূর্ণ স্বরাজের দাবী প্রথম কমিউনিস্টরাই তোলে, তখন মহাত্মা গান্ধী তাকে অগ্রাহ্য করলেন। পরে যখন তিনি নিজে ভারত ছাড় আন্দোলনের ডাক দিলেন তখন কমিউনিস্টরা আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে প্রাসঙ্গিক ও জরুরী বিষয় বলে তুলে ধরলে তাদের বলা হল ব্রিটিশদের দালাল। এই অবস্থায় পার্টির জনভিত্তি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সঠিক রণকৌশল নির্ধারণের প্রসঙ্গে দত্ত-ব্র্যাডলে থিসিস কার্যত সমস্যার সমাধান করেছিল। এর জোরে জাতীয় বুর্জোয়াদের একাংশ যারা সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী নয়, তাদেরকেও জাতীয় মুক্তির লড়াইতে মিত্র বলে চিহ্নিত করা হল। সুরজিতের সেই লেখাতেই পরে বলা হয়েছে- ‘To make the anti-imperialist front effective and broad based drawing in the overwhelming majority of the people, it calls for combining the struggles of the mass organisations of the workers, peasants and other such organisations and the Congress. While stating that a clear cut programme of complete independence has to be there, it criticises the tactics of "non-violence" as a dogma being at variance with ground realities. It also points out to the ideological struggle that has to be carried on simultaneously and for the consolidation of the unity of Left in the Congress, while at the same time not forgetting the leading role to be achieved by the Party in the struggle for the united front.
This document played a very important part in the working out of the strategy and tactics of the struggle for independence at that stage. The Communist Party working on the basis of this document came to the forefront of the national struggle, influencing it. The resolutions adopted at the subsequent Congress sessions vindicates this position. Many Congress committees came into the hands of the communists, contributing to radicalising the whole movement. This document had played a big role in giving a correct orientation to the Communist movement in India enabling it to radicalising the Congress led movement as well as in developing independent class organisations of the peasantry and other sections of the toiling masses.’
দত্ত-ব্র্যাডলে থিসিস’কে কেউ কেউ মোটা দাগের কনশিলিয়েশন কর্মসূচি বলে চিহ্নিত করেন। আসলে এই দলীল ঔপনিবেশিক দেশগুলিতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের পথ প্রসঙ্গে কমিন্টার্নের ঐতিহাসিক বোঝাপড়াকেই তুলে ধরে। ভারতে বিপ্লবের রণকৌশল প্রসঙ্গে এম এন রায় কমিন্টার্নের সভায় লেনিনের সাথে বিতর্ক করেছিলেন। রায়ের মতামতে বেশ কিছু সংশোধন সহ সেই বিতর্কের সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করেন লেনিন নিজে। পরবর্তীকালে পার্টির সাথে রায়ের যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যায়, তিনি এদেশে পৌঁছেও লেনিনের সাথে বিতর্কে নির্ধারিত সিদ্ধান্তের বদলে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে নিজের মতামতকেই প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি আন্তর্জাতিকের অ্যাফিলিয়েশন পেল অনেক পরে, ১৯৩৩ সালে। তার আগে অবধি ভারতে রণনীতি-রণকৌশল প্রসঙ্গে পার্টি কর্মসূচি বলতে সেরকম কিছু ছিল না। তাসখন্দে অবনী মুখার্জিরা একটি খসড়া করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাতে কি লেখা রয়েছে এদেশে কারোর কাছে সেই খবর ছিল না। স্তালিন ব্যক্তিগতভাবে সেটির একটি কপি সংগ্রহে রেখেছিলেন, অনেক বছর পরে গবেষক দেবেন্দ্র কৌশিক সেই খসড়া কর্মসূচিটি আবিষ্কার করেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সহযোদ্ধা হিসাবে রজনী পাম দত্ত ও বেন ব্র্যাডলে সেই নির্ধারিত কর্তব্যই পালন করলেন। অতীতের সেই বিতর্কই নতুন পরিস্থিতিতে সমাধা হল- সেটাই দত্ত-ব্র্যাডলে থিসিস। তারা দুজনেই লেনিনবাদী ছিলেন, কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি একনিষ্ঠ ছিলেন। আর তাই নির্দিষ্ট পরিস্থিতির সুনির্দিষ্ট পর্যালোচনা করেছিলেন।
৫
আমাদের দেশে রজনী পাম দত্ত প্রসঙ্গে যে কোনও আলোচনায় তার লেখা ‘ইন্ডিয়া টুডে’ বইটির উল্লেখ থাকেই। মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে ভারতের ইতিহাস চর্চার ধারায় অনেকেই সেই বইটিকে প্রথম লেখা বই বলেও চিহ্নিত করেন। ১৮৯৯ সালে লিখিত ভি আই লেনিনের অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত রচনা ‘ডেভেলপমেন্ট অফ ক্যাপিটালিজম ইন রাশিয়া’র ধারা মেনেই দত্তের লেখা ‘ইন্ডিয়া টুডে’ (১৯৪০) অবশ্যই মার্কসবাদী ইতিহাস চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি সন্দেহ নেই, কিন্তু ওটাই প্রথম কাজ এমনটা বলা উচিত না। সেই কাজ করেছিলেন এম এন রায়’ই। রায়ের লেখাটি অনেক ক্ষেত্রেই অসম্পূর্ণ, বেশ কিছু সিদ্ধান্ত সঠিক নয় বলে পরে তিনি নিজেই উল্লেখ করেছেন, কিন্তু সন-তারিখের বিচারে সেই লেখাই প্রথম।
মেক্সিকোতে থাকাকালীনই রায় সেখানকার থিওজফিক্যাল সোসাইটিতে ধারাবাহিক বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই আলোচনার বিষয় ছিল ভারতের অতীত অবস্থা। রায়ের স্মৃতিচারণায় রয়েছে- ‘তখনকার থিওজফিস্টরা প্রায় সকলেই ভারতের ইতিহাসকে বৈদিক ধর্মের ইতিহাস কিংবা মুনি ঋষিদের বিষয় বলে বিবেচনা করতেন। এমন কিছু ভাবা যে একেবারেই একটি ভ্রান্ত ধারণা, সেটা প্রতিষ্ঠা করাই ছিল আমার লক্ষ্য। ভারতে ধর্মের নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, আমি তাকে অস্বীকার করছি না, কিন্তু আমার বক্তব্য ছিল এই যে ভারতে বসবাসকারী মানুষদেরও মনে রাখতে হবে। তাদের ইতিহাসই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ’। সেই বই প্রথমে মেক্সিকো থেকে স্পানিশ ভাষায় ছেপে বেরোয়, শিরোনামের ইংরেজি ভাষান্তর ‘ইন্ডিয়াস পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’।
রজনী পাম দত্তের লেখা বইয়ের পাতায় নজর দিলে বোঝা যাবে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের অর্থনৈতিক প্রভাব, কৃষিক্ষেত্রে নয়া বন্দোবস্তের জোরে কৃষকসমাজের দুরবস্থা এবং সমসাময়িক পৃথিবীতে সাম্রাজ্যবাদের অপদার্থতাকে একসাথে পর্যালোচনা করে তিনি এদেশে কমিউনিস্ট বিপ্লবের সম্ভাবনাকেই তুলে ধরেছেন। রায় মনযোগী হয়েছিলেন ভারতের ইতিহাসের নামে প্রচলিত ধর্মীয় একদেশদর্শীতা দুষ্ট মনোভাবের বিরুদ্ধে। সেই কাজ করতে গিয়ে তিনি দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর ইতিহাসকে টেনে এনেছেন, নৃতত্ত্বের বিচারে আর্য সভ্যতার সাথে ভারতীয় আদিবাসীদের পার্থক্য নিরুপন করেছেন এবং দেখাতে চেয়েছেন যুদ্ধ করে ক্ষমতা দখল করতে সফল হয়েছে বলেই আর্যদের ভারতীয় সভ্যতার আদি গোষ্ঠী বলে চালিয়ে দেওয়ার রেওয়াজ হয়েছে। অর্থনৈতিক তথ্য ব্যবহার করে জাতীয় বুর্জোয়ারা কেন জাতীয় মুক্তির আন্দোলনে মিত্র হতে পারে না সেই ব্যখ্যাও রায়ের সেই লেখায় রয়েছে। যদিও সেইসব তথ্য সংগ্রহে বিশেষ ত্রুটি ছিল বলে তিনি পরে স্বীকার করেছেন। অবনী মুখার্জি তার হয়ে সেই তথ্য সংগ্রহের কাজ করেছিলেন, রায় সেসব তথ্য নিজে যাচাই করে দেখেননি বলেই এমন ভুলভ্রান্তি ঘটেছে- এই হল রায়ের বক্তব্য।
মনে রাখা উচিত ভারতে বিপ্লবের পথে জাতীয় বুর্জোয়াদের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক কেমন হবে সেই প্রসঙ্গেই এম এন রায় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের সভায় লেনিনের সাথে বিতর্ক করেছিলেন, অর্থাৎ তখনও রায় ঐ বইতে উল্লিখিত নিজস্ব মতামতেই স্থিত ছিলেন।
এখানেই রায়ের সাথে রজনী পাম দত্তের ফারাক।
দুজনেই ভারতের ইতিহাসকে মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে পর্যালোচনা করেছেন। একথা ঠিকই যে রায় তথ্য সংগ্রহে খুব একটা সুযোগসুবিধা পাননি, কিন্তু সেকথা মনের মধ্যে রেখে নিজের মতামতকেই চূড়ান্ত বলে নির্ধারিত করেছেন। এমনকি অনেকদিন অবধি সেই নিয়ে তর্ক-বিতর্কও চালিয়েছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, বিপ্লবী আন্দোলনে এও এক ধারা। এর বিপরীতে এগিয়েছেন রজনী পাম দত্ত, ইতিহাস রচনায় প্রাপ্ত তথ্যের এতটুকু বাইরে যাননি, অযথা বিপ্লবী আবেগে ভর করে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি। বৈজ্ঞানিক মনোভাবের পরিচয় এমনই, মার্কসবাদী হিসাবেও তাই। বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে এও আরেক ধারা।
রজনী পাম দত্ত’রা বিশ্বাস করতেন সোভিয়েত ইউনিয়ন হল সেই দেশ যারা অন্য সবার কাছে বিশ্ববিপ্লবের প্রেরণা। বিশ্বাস আর কাজের মধ্যে যেটুকু ফারাক তাও তারা মিটিয়ে দিয়েছিলেন- শেষ অবধি নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে। সেই অনড়, অবিচল মেজাজই উদারবাদী মেধার চোখে বিশেষ অপছন্দের ব্যপার। কারন ওরকম অনড়, অটল বিশ্বাসে নিজেকে একনিষ্ঠ রাখা- যাকে দেখে কমিউনিস্টরা শিখেছেন তার নামই জোসেফ স্তালিন।
আমরা, যারা ইতিহাসের বিবেচনায় রজনী পাম দত্তদের চিনতে, জানতে, বুঝতে চাইব- আমাদের মনে রাখতেই হবে এরা আসলে কারা?
এরা হলেন ভিন্ন ধাতুতে গড়া সেইসব মানুষ যারা মনে করতেন ‘উই আর দ্য চিলড্রেন অফ স্তালিন’।
তথ্যসুত্রঃ
১) জন ক্যালাঘান, রজনী পাম দত্ত : আ স্টাডি ইন ব্রিটিশ স্তালিনিজম
২) রজনী পাম দত্ত, ইন্ডিয়া টুডে
৩) ড: পঞ্চানন সাহা, রজনী পাম দত্ত - অ্যান আনএপলোজেটিক মার্ক্সিস্ট
৪) এম এন রায়, ইন্ডিয়া ইন ট্রানজিশন
৫) হরকিষন সিং সুরজিৎ, ইম্পর্টেনস অফ দত্ত ব্র্যাডলে ডক্যুমেন্ট, দ্য মার্ক্সিস্ট
৬) অশোক মিত্র, আপিলা চাপিলা
প্রকাশের তারিখ: ১৯-জুন-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
