সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আরএসএস ও গান্ধী হত্যা
সীতারাম ইয়েচুরি
এবিষয়ে সকলেই একমত যে গান্ধী হত্যার জন্য দায়ী ছিল সাভারকারের নেতৃত্বাধীন হিন্দু মহাসভার একটা উগ্রপন্থী শাখা। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে যখন গান্ধীজিকে হত্যা করা হল, তখন এই ষড়যন্ত্রের মাথা হিসাবে সাভারকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ঘটনাচক্রে গান্ধী হত্যার বিচারে তিনি রেহাই পেয়েছিলেন। সেটাও হতে পেরেছিল এই মামলার রাজসাক্ষীর বিবৃতির সঙ্গে অন্যান্য প্রমাণাদির অসঙ্গতির কারণে, যদিও সেটা ছিল ফৌজদারি দণ্ডবিধির একটা টেকনিক্যাল পয়েন্ট মাত্র। সর্দার প্যাটেল ছিলেন অত্যন্ত উচ্চমানের ফৌজদারি আইনজীবী। তবে তিনিও ব্যক্তিগতভাবে সাভারকারের অপরাধ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। না হলে তিনি নিজেই সাভারকারকে বিচারের কাঠগড়ায় তুলতে দিতেন না। সর্দার প্যাটেল খুব স্পষ্টভাষায় জওহরলাল নেহরুকে বলেছিলেন, ‘সরাসরিভাবে সাভারকারের অধীনে থাকা হিন্দু মহাসভার একটা উগ্রপন্থী শাখা এই ষড়যন্ত্রের সলতে পাকিয়েছিল এবং ষড়যন্ত্র যাতে শেষ পর্যন্ত সফল হয় সেজন্য তৎপর ছিল।

আরএসএস ও স্বাধীনতা সংগ্রাম
কমিউনিস্ট মতবাদে বিশ্বাসী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ভূমিকা খুব ভালোভাবেই নথিবদ্ধ করা আছে। সিপিআই(এম) পলিটব্যুরোর ৯ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যই ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, যাঁরা ব্রিটিশের জেলে বহু বছর কাটিয়েছেন এবং পরে কংগ্রেসী শাসনেও জেল খেটেছেন। ভেল্লোর জেলে ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন কমরেড এ কে গোপালন। ব্রিটিশরা তাঁকে সেই জেলে বন্দি করে রেখেছিল। ছাত্রাবস্থায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কারণে হরকিষেণ সিং সুরজিৎকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আন্দামানের সেলুলার জেলের মার্বেল ফলকে যাঁদের নাম লেখা রয়েছে তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই কমিউনিস্ট এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিপরীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল আরএসএস। বস্তুত, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে সরে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও দাঙ্গা লাগানোর কাজে ব্যস্ত ছিল তারা। স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একটাই যোগাযোগের দাবি করতে পারে আরএসএস। এবং সেটি হল ভি ডি সাভারকার। এমনকি এটাও মিথ্যা তথ্য মিশিয়ে উদ্ভাবন করা। এবং ছক কষা।
জাতীয় আন্দোলনের বিশিষ্ট ইতিহাসকার, হিন্দুত্বের প্রবণতার প্রতি যিনি দরদী ছিলেন, সেই আর সি মজুমদার নথিবদ্ধ করে গিয়েছেন, ১৯১৩ সালের ১৪ নভেম্বর সাভারকার ব্রিটিশের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে একটি আর্জি পেশ করেছিলেন এবং তাতে তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে ছেড়ে দেওয়ার আবেদন জানান। ব্রিটিশের নীতি ছিল ভাগ করে শাসন করো। সাভারকারকে আত্মসমর্পণ করার দাম মেটাতে হয়েছিল ব্রিটিশের এই নীতির প্রকাশ্য মিত্র হয়ে।
তাঁর সেই আর্জিতে ব্রিটিশকে তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন: ‘যে কোনও ব্যক্তি যিনি অন্তর থেকে ভারতের ও মানবজাতির মঙ্গল চান, তিনি কখনই অন্ধভাবে সেই কাঁটা বিছানো পথে পা দেবেন না যে পথ ১৯০৬-০৭ সালে উত্তেজনায় ভরা ও আশাহীন পরিস্থিতিতে শান্তি ও প্রগতির পথ থেকে আমাদের প্রতারিত করে ভুলপথে নিয়ে গিয়েছিল। সুতরাং, যদি সরকার তাদের বহুবিধ বদান্যতা দেখিয়ে এবং ক্ষমা প্রদর্শন করে আমাকে মুক্তি দেয়, তাহলে আমি ইংরেজ সরকারের সাংবিধানিক প্রগতি ও আনুগত্যের সবচেয়ে জোরালো প্রবক্তা ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারব না এবং সেটাই হল সাংবিধানিক প্রগতির প্রাথমিক শর্ত’ (আর সি মজুমদার, পেনাল সেটলমেন্টস ইন আন্দামানস, পৃষ্ঠা ২১১–১৩)।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে লেখা আরও একটি চিঠিতে সাভারকার লিখেছিলেন: ‘আমি একথা স্বীকার করছি যে আমার বিচার নিরপেক্ষ হয়েছে এবং ন্যায্য শাস্তিই আমি পেয়েছি। ফেলে আসা দিনে যেসব হিংসাত্মক পদ্ধতি আমি অবলম্বন করেছিলাম, আমি সেগুলিকে অন্তর থেকে তীব্রভাবে ঘৃণা করি, এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে আইন ও সংবিধানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার কাজে আমি নিজেকে কর্তব্যে আবদ্ধ বলে মনে করি এবং এব্যাপারে কাজ করার জন্য যতদূর পর্যন্ত আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে, ততদূর পর্যন্ত ভবিষ্যতে সংস্কারকে সফল করে তুলতে আমি আগ্রহী’ (এই চিঠির ফ্যাকসিমিলি প্রকাশিত হয়েছিল ফ্রন্টলাইন, এপ্রিল ৭, ১৯৯৫ সংখ্যার ৯৪ পৃষ্ঠায়)।
ব্রিটিশের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের পর তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সাভারকারের রাজনীতি ছিল ব্রিটিশের বিরোধিতা না করে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের বিরোধিতা করা। হিন্দু মহাসভার নেতা হিসাবে তিনি এটা নিশ্চিত করেছিলেন যে, হিন্দু মহাসভার কোনও সদস্য বা সংগঠনপন্থী কেউ যেন ১৯৪২ এর ভারত ছাড়োর মতো আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করে। একেবারে নির্দিষ্টভাবে তিনি হিন্দুদের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন তাঁরা যেন ওই আন্দোলন সমর্থন না করেন (দেখুন, অম্বা প্রসাদ, দ্য ইন্ডিয়ান রিভল্ট অফ ১৯৪২)।
‘সব হিন্দু সংগঠনপন্থীদের কাছে আমি এই স্পষ্ট নির্দেশ দিচ্ছি, সাধারণভাবে, কেউ সরকারি পরিষেবার সুবিধাজনক কোনও পদে বা অবস্থানে থাকলে, তাঁরা স্ব-স্ব পদে বা অবস্থানে থেকে যাবেন এবং তাঁদের দৈনন্দিন কর্তব্য করে যাবেন’ (নূরানির লেখায় উদ্ধৃত, ফ্রন্টলাইন, ডিসেম্বর ১, ১৯৯৫)।
বস্তুত, ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় বোম্বে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পর্যবেক্ষণ ছিল, ‘সঙ্ঘ একনিষ্ঠভাবে নিজেদেরকে আইনের চৌহদ্দিতে বেঁধে রেখেছিল এবং বিশেষত ১৯৪২-এর আগস্টে শুরু হওয়া অশান্তিতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছিল’ (অ্যান্ডারসন অ্যান্ড ডামলে, শ্রীধর ডি, দ্য ব্রাদারহুড এই স্যাফ্রন: দ্য রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ অ্যান্ড হিন্দু রিভাইভালিজম, ভিস্তার পাবলিকেশনস, নিউ দিল্লি, ১৯৮৭)। এমনকী আরএসএসের অন্যতম শীর্ষনেতা নানাজি দেশমুখ একবার প্রশ্ন তুলেছিলেন, ‘কেন সংগঠন হিসাবে আরএসএস মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়নি?’ (দেশমুখ, নানা, আর এস এস: ভিক্টিম অফ স্ল্যানডার, ভিশন বুকস, নিউদিল্লি, ১৯৭৯)। এছাড়াও পুরো জাতীয় আন্দোলনের পর্ব জুড়ে আরএসএস সবসময় ছোট ছোট দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে সহযোগিতা করে গেছে। এই সব দেশীয় রাজ্যগুলি স্বাধীনতা সংগ্রামের কট্টর বিরোধী ছিল। আরএসএসের অন্যতম ঘনিষ্ঠমিত্র ছিলেন কাশ্মীরের রাজা হরি সিং, যিনি স্বাধীন ভারতে যোগদানে অনিচ্ছুক ছিলেন।
এই সব বাস্তব ঘটনাকে আড়াল করার জন্য আরএসএস কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের ভূমিকা কী ছিল, তার সমৃদ্ধ নথিবদ্ধ ইতিহাস ইতিমধ্যেই গ্রথিত হয়ে আছে। তার খুঁটিনাটিতে যাওয়ার অবশ্য দরকার নেই। এই তথ্য নজরে আনাই যথেষ্ট যে, যখন এই দেশ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ৫০-তম বার্ষিকী পালন করছিল, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডক্টর শঙ্করদয়াল শর্মা, ৯/১০ আগস্টের মধ্যরাতের সংসদের অধিবেশনের ভাষণে বলেছিলেন: ‘‘কানপুর, জামশেদপুর, আহমেদাবাদের মিলগুলিতে ব্যাপকহারে ধর্মঘটের পর, ১৯৪২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনে সেক্রেটারি অফ স্টেটকে দিল্লি থেকে পাঠানো এক বার্তায় কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছিল: ‘এই দলের অনেক সদস্যের আচরণ স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবের উপাদানেই এই দলটি গঠিত’।’’ (জোর আমাদের)
দেশভাগের আতঙ্ক
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছেন যে এখন থেকে ১৪ আগস্ট দিনটিকে দেশভাগের বিভীষিকা স্মরণ দিবস হিসাবে উদযাপন করা হবে।
এই উপমহাদেশের বিভাজনই খুব সম্ভবত বিপুল সংখ্যক জনগণের ছিন্নমূল হয়ে দেশান্তরী হওয়ার একমাত্র উদাহরণ। ঠিক কত মানুষ সেই সময় সীমান্ত পেরিয়েছিলেন তার নিখুঁত হিসাব কষা কার্যত অসম্ভব, তবে সেই সময় আন্দাজ ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ সীমান্ত পেরিয়েছিলেন (ভারত তখন ৭২,৯৫,৮৭০ জন এবং পাকিস্তান ৭২,২৬,৬০০ জন ছিন্নমূল মানুষকে চিহ্নিত করেছিল) এবং সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘর্ষে ১০ থেকে ২০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। সেটা ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা যা আজকের দিনেও ক্ষত এবং কুসংস্কারকে বিষিয়ে তুলছে। এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল হিন্দু, মুসলিম ও শিখ সকলকেই।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসকে দেশভাগের বিভীষিকা স্মরণ দিবস হিসাবে উদযাপনের জন্য বেছে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এমন একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন যার মধ্যে সাম্প্রদায়িক গন্ধ রয়েছে। স্পষ্টতই, তিনি চান এখনকার প্রজন্ম শুধু দেশভাগের আতঙ্ককেই স্মরণ করবে না বরং, বাস্তবে সেই আতঙ্ক যেন তাদের স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। না হলে, তিনি সহজেই ৩ জুন তারিখটিকে স্মরণের জন্য বেছে নিতে পারতেন কারণ ওই দিনেই ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন দেশভাগের দিন-তারিখ ঘোষণা করেছিলেন।
এধরনের পদক্ষেপের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলা যাতে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে বদলে দিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় অসহিষ্ণু, ধর্মতাত্ত্বিক, ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে সহজসাধ্য করে তোলা যায়।
দ্বিজাতিতত্ত্ব
‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ই দেশভাগের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। ভি ডি সাভারকারই সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থে দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশ করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে আমেদাবাদের কর্ণাবতীতে অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভার সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে সাভারকার বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে এটা ধরে নেওয়া যায় না যে ভারত একটি একেশ্বরবাদী এবং সমসত্ত্ববিশিষ্ট জাতি। বরং এর ঠিক উল্টোটাই সত্যি। ভারতে এখন প্রধানত দুটি জাতি রয়েছে— হিন্দু ও মুসলিম’ (সমগ্র সাভারকার বাদমে, ভল্যুম ৬, মহারাষ্ট্র প্রান্তিক হিন্দুস্তান পাবলিকেশন,১৯৬৩–৬৫, পৃষ্ঠা ২৯৬)।
পরে ১৯৩৯-এর মার্চে আবারও হিন্দু মহাসভার সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে সাভারকার ঘোষণা করেন: ‘আমরা হিন্দুরা নিজেরাই একটা জাতি... আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে এক চিরস্থায়ী জাতি হিসাবে চিহ্নিত করেছি’ (দ্রষ্টব্য, ইন্ডিয়ান অ্যানুয়াল রেজিস্টার, ১৯৩৯, ভল্যুম ২)।
এর ২ বছর পর ১৯৪০ সালের ২২ মার্চ লাহোরে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের সম্মেলনে দেওয়া সভাপতির ভাষণে মহম্মদ আলি জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘একটি একক রাষ্ট্রের অধীনে এই ধরনের দুটি জাতিকে একই জোয়ালে জুতে দেওয়া হলে, যার মধ্যে এক পক্ষ সংখ্যাগত বিবেচনায় সংখ্যালঘু এবং অন্য পক্ষ সংখ্যাগুরু, অবশ্যই তার পরিণামে অসন্তোষ ক্রমশ বাড়তে থাকবে এবং এই ধরনের একটি রাষ্ট্রের সরকারের যে কোন কাঠামোই তৈরি করা হোক না কেন তা চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হবে।’
পরে দেখা গেল জিন্নাহর মতকে মেনে নিয়ে সাভারকারও ফের বললেন, ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে মিস্টার জিন্নাহর সঙ্গে আমার কোনও বিবাদ নেই। আমরা হিন্দুরা নিজেরাই একটা জাতি এবং এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে, হিন্দু ও মুসলিমরা দুটি জাতি।’ (দ্রষ্টব্য, ইন্ডিয়ান অ্যানুয়াল রেজিস্টার, ১৯৪৩, ভল্যুম ২)।
সঙ্ঘ পরিবার ও মোদির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা সাভারকার দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশ করার ক্ষেত্রে জিন্নাহর চেয়ে এগিয়েই ছিলেন। সেই দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশের কারণেই দেশভাগ হয়েছিল। এবং একাজে ব্রিটিশ দারুণভাবে মদত ও উস্কানি দিয়েছিল।
গান্ধী হত্যা
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মৃদুলা মুখার্জি ২০১১ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের মালদহে অনুষ্ঠিত ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেসে সভাপতির ভাষণে বলেন: ‘১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দুটি জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। বলা যায়, এর মধ্যে সাভারকারের পেশ করা জাতির সংজ্ঞাকে সত্যি প্রমাণ করেছিল পাকিস্তান। কিন্তু সাভারকার যেখানে রয়ে গেলেন, সেই ভারত কোনওভাবেই এই সংজ্ঞাকে মেনে নেয়নি। মনে হয়, এব্যাপারে সবচেয়ে বড় বাঁধা হিসাবে দাঁড়িয়েছিলেন মহাত্মা নিজেই। তাই তাঁকে সরিয়ে দেওয়াটা আবশ্যিক হয়ে পড়ে। মহাত্মা বেঁচে থাকলে, হিন্দু রাষ্ট্র কিংবা অখণ্ড ভারত এইদুয়ের কোনওটাকেই বাস্তবায়িত করা যেত না।
‘এবিষয়ে সকলেই একমত যে গান্ধী হত্যার জন্য দায়ী ছিল সাভারকারের নেতৃত্বাধীন হিন্দু মহাসভার একটা উগ্রপন্থী শাখা। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে যখন গান্ধীজিকে হত্যা করা হল, তখন এই ষড়যন্ত্রের মাথা হিসাবে সাভারকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ঘটনাচক্রে গান্ধী হত্যার বিচারে তিনি রেহাই পেয়েছিলেন। সেটাও হতে পেরেছিল এই মামলার রাজসাক্ষীর বিবৃতির সঙ্গে অন্যান্য প্রমাণাদির অসঙ্গতির কারণে, যদিও সেটা ছিল ফৌজদারি দণ্ডবিধির একটা টেকনিক্যাল পয়েন্ট মাত্র। সর্দার প্যাটেল ছিলেন অত্যন্ত উচ্চমানের ফৌজদারি আইনজীবী। তবে তিনিও ব্যক্তিগতভাবে সাভারকারের অপরাধ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। না হলে তিনি নিজেই সাভারকারকে বিচারের কাঠগড়ায় তুলতে দিতেন না। সর্দার প্যাটেল খুব স্পষ্টভাষায় জওহরলাল নেহরুকে বলেছিলেন, ‘সরাসরিভাবে সাভারকারের অধীনে থাকা হিন্দু মহাসভার একটা উগ্রপন্থী শাখা এই ষড়যন্ত্রের সলতে পাকিয়েছিল এবং ষড়যন্ত্র যাতে শেষ পর্যন্ত সফল হয় সেজন্য তৎপর ছিল।
‘ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি জীবন লাল কাপুরের অধীনে ১৯৬৫ সালে এবিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন তাদের রিপোর্টে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল তা এরকম:
‘এই সব তথ্য একসঙ্গে গ্রথিত করলে তা স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে সাভারকার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীই এই হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল এবং বাকি অন্য সব তত্ত্ব পুরোপুরি খারিজ হয়ে যায়।’
নিষিদ্ধ হল আরএসএস
আরএসএস ও মোদি সরকার আজকের দিনে যে সর্দার প্যাটেলকে তাদের নিজেদের ছকের মধ্যে আত্মসাৎ করে ফেলতে চাইছে, মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর সেই সর্দার প্যাটেলই আরএসএসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সর্দার প্যাটেলের নিজের মুসাবিদা করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আরএসএসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই বিজ্ঞপ্তিতে লেখা হয়েছিল: ‘সঙ্ঘের আপত্তিকর ও ক্ষতিকর কার্যকলাপ নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে জারি রয়েছে। সঙ্ঘের কার্যকলাপই হিংসার রাজনীতির উদ্গাতা এবং হিংসার প্রেরণাদাতা। হিংসাত্মক এই কার্যকলাপের বলি হয়েছেন অনেকেই। এই হিংসার রাজনীতির হামলায় সর্বশেষ এবং সবচেয়ে মূল্যবান ক্ষতি হল এই যে, গান্ধীজি নিজেও এই হিংসার রাজনীতির কারবারীদের হাতেই নিহত হলেন।’
মহাত্মার ব্যক্তিগত সচিব প্যারেলাল তাঁর বই মহাত্মা গান্ধী: দ্য লাস্ট ফেজ-এ লিখেছেন: ‘গান্ধী হত্যার পর এক তরুণের কাছ থেকে সর্দার প্যাটেল একটা চিঠি পেয়েছিলেন। চিঠির বয়ান অনুয়ায়ী সেই তরুণকে ভুল বুঝিয়ে আরএসএস-এর সংগঠনে শামিল করা হয়েছিল কিন্তু পরে তাঁর মোহভঙ্গ হয়। চিঠিতে সেই তরুণ লিখেছেন, কীভাবে কয়েকটি এলাকায় আরএসএসের সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যাতে একটা সুসংবাদ শোনার জন্য তারা যেন সেই ভয়ঙ্কর শুক্রবারে তদের রেডিও সেট চালু রাখে। গান্ধী হত্যার খবরটা জানার পর দিল্লিসহ বেশ কিছু জায়গায় আরএসএসের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে মিষ্টি বিলি করা হয়েছিল।’ (পৃ ৭৫৬)।
কার্যত ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৪৯ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল আরএসএস। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আলোচনার জন্য ব্যগ্র হয়েছিল আরএসএস। এর জেরেই ভারত সরকারের সঙ্গে তারা একটা প্রতারণামূলক সমঝোতা করে। আরএসএস নেতারা সর্দার প্যাটেলের সঙ্গে আলোচনায় এই মর্মে রাজি হয়েছিল যে, আরএসএস টিকে থাকবে সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবে এবং রাজনীতিতে জড়াবে না। সেকারণে আরএসএসের দরকার ছিল তাদের নেতৃত্বাধীন ও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি রাজনৈতিক শাখার, যাতে তারা রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে পারে। নেহেরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার পর হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি হিন্দু কোড বিল সংশোধনের বিরোধিতা করেছিলেন। তখন তিনি পৃথক একটি রাজনৈতিক দল গড়তে চেয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে ভারতীয় জনসঙ্ঘ-এর প্রতিষ্ঠার কাজে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে সহযোগিতা করার জন্য ক্যাডারদের পাঠিয়েছিল আরএসএস। সেই সংঠনেরই এখনকার মূর্তিমান রূপ হল বিজেপি (বাসু, তপন; দত্ত প্রদীপ; সরকার,সুমিত;সরকার, তনিকা; সেন, সম্বুদ্ধ; খাকি শর্টস:স্যাফ্রন ফ্ল্যাগস, ট্র্যাক্টস ফর দ্য টাইম/ওরিয়েন্ট লংম্যান, নিউ দিল্লি, ১৯৯৩)।
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
—মার্কসবাদী পথের আগস্ট’ ২০২২ সংখ্যায় সীতারাম ইয়েচুরির লেখা ‘ভারত @ ৭৫’র একাংশ। এই শিরোনাম মার্কসবাদী পথের
প্রকাশের তারিখ: ৩০-জানুয়ারি-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
