সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সফদার হাসমি: আঙ্গিকের সন্ধান
সৈকত ব্যানার্জী
ব্রেখটিও যে ভাবনা নাটককে ক্রিটিকাল করে তুলতে আগ্রহী, সাফদার নিজেও যে ভাবনায় রেখেছিলেন আস্থা, তার মৃত্যুর পরেও জন নাট্য মঞ্চ সেই ভাবনাকে বয়ে নিয়ে গিয়েছে। আর বয়ে নিয়ে গিয়েছে অজস্র নাটক তথা পথনাটকের দল। যারা পথে, ঘাটে, বাজারে, ট্রেনে, বাসে নানা আঙ্গিকে অভিনয় করে চলেছে, আর বলে চলেছে সমাজ বদলের কথা।

রাস্তার ধার ঘেঁষে জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে একদল মানুষ। নানান উদ্দেশ্য নিয়ে রাস্তায় বেরিয়েছিল তারা। কেউ অফিস যাওয়ার পথে, কেউ বা বাজার-দোকান করতে, কেউ চাকরির খোঁজে, কেউ পরের বাড়িতে কাজ করতে, কেউ কারখানার গেটের দিকে, কেউ বা হকারি করতে নিজের পসরা। এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ার কথা ছিল না তাদের। কপালের ভাঁজে টিকে থাকার দুশ্চিন্তাগুলো সঙ্গে নিয়ে কোথাওই দাঁড়িয়ে পড়ার কথা নয় তাদের। কিন্তু দাঁড়িয়ে পড়েছে। কারণ কয়েকটা মানুষ ওই রাস্তার ধারটাতে দাঁড়িয়ে তাদেরই যন্ত্রণার দৃশ্য অভিনয় করছে। তাদেরই বেঁচে থাকার লড়াই আর বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস। কোনো বাড়তি সাজপোশাক নেই। ঝলমলে মঞ্চ নেই। আলোর কারসাজি নেই। শুধু কতকগুলো মানব শরীর। শরীর জুড়ে ঘামের চিহ্ন। কখনো সেই শরীরগুলো হয়ে উঠছে কারখানার একদল শ্রমিক। কখনো একসাথে মিলেমিশে গিয়ে হয়ে উঠছে বিশাল এক যন্ত্র। কখনো রূপ নিচ্ছে ফসল লুঠ হওয়া কৃষকে কিংবা অফিসের দরজায় দরজায় ঠোক্কর খাওয়া বেকার যুবকে। আর পথচলতি মানুষ নিজের জীবনের দেখতে পাচ্ছে প্রতিচ্ছবি। একক মানুষের যন্ত্রণা পরিণতি পাচ্ছে সমষ্টির রাগে।
নাটক। পথনাটক। সমাজের 'আলোকিত', 'সংস্কৃতিবান' পরিমন্ডল থেকে বেরিয়ে যে অভিনয়ের ফর্ম পৌঁছে যায় সাধারণের কাছে। তাকে ভাবায়। খেপিয়ে তোলে। জোট বাঁধতে সাহায্য করে। প্রেক্ষাগৃহ-নির্দিষ্ট দর্শক নয় কেবল, হঠাৎ-ই একঝলক কোনো দৃশ্য দেখে ফেলে থমকে যায় যে পথচারী তাকেও টেনে আনে এক বিরুদ্ধতার চৌহদ্দিতে। পথনাটক তাই যেমন নাটকের অভিনেতা-দর্শকের বাইনারিকেও ভেঙে দেয় বহুসময়েই, ভেঙে দেয় ব্যাকরণের রীতি-পদ্ধতি, ঠিক তেমনই তার বক্তব্য-বিষয়েও রেখে দেয় রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক শক্তি-কাঠামোকে ভেঙে দেওয়ার ইশারা। তাই শাসকের কাছে পথনাটক চিরকালই পথের কাঁটা। বিরুদ্ধতার অশনিসংকেত।
১৯১৮ সালে সদ্যজাত সোভিয়েত রাশিয়ায় মায়াকভস্কির 'Mystery-Bouffe' নাটকের মাধ্যমে যখন পথনাটক আলাদা একটা নাট্যমাধ্যম হিসেবে হাজির হয়েছে, সেই শুরু থেকেই পথনাটক রাষ্ট্রের শোষণের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষের বাঁচার লড়াইকে করে তুলেছে মুখ্য। শুরুর সেই ধারা বহতা থেকে হয়ে উঠেছে নানা দেশের সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের হাতিয়ার। পথনাটকের এই রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধাচারণ তাত্ত্বিক কাঠামো পেয়ে যায় যখন ব্রেটল্ড ব্রেখট বলেন, “The bare wish, if nothing else, to evolve an art fit for the times must drive our theatre of the scientific age straight out into the suburbs, where it can stand as it were, wide open, at the disposal of those who live hard and produce much, so that they can be entertained there with their great problems.” মঞ্চ-আলোর কারসাজিতে, কল্পনার বহুতল বুনোটে দর্শকের মধ্যে ইলিউশন তৈরি নয়, বরং বাস্তব পৃথিবীতে যে ইলিউশনের মধ্যে বেঁচে রয়েছে মানুষ তাকেও ভেঙে নাটক দেখাবে মানুষের শোষণ আর বঞ্চনার ইতিবৃত্ত। কাহিনী ও চরিত্রদের সঙ্গে দর্শক একাত্ম হবে না। থেকে থেকে বিচ্ছিন্ন হবে। আবেগমুখর আনন্দে ভেসে যাবে না, যুক্তি দিয়ে ভাববে। চিনতে আরম্ভ করবে বৈষম্যের শেকলগুলোকে। পথনাটক তাই ক্যাথারসিসের জায়গা নয়। দর্শকের চিন্তাগুলোকে ধাক্কা মেরে নতুন করে ভাবানোর জায়গা। শিল্পের কাছে শুধু নয়, পথনাটকের দায় তাই থেকে যায় ক্ষতবিক্ষত মানুষের কাছেও।
গ্রামের নাম ঝান্ডাপুর। জানুয়ারির ঠান্ডায় রাজধানী তখন মেতে আছে উৎসবের আলোয়। নতুন বছরের প্রথম দিন। আর দিল্লি থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে, অথচ অন্যই একটা পৃথিবী যেন ঝান্ডাপুর। শ্রমিকদের ডাকে সারা দিয়ে সফদার হাসমির নেতৃত্বে জন নাট্য মঞ্চ পৌঁছে গিয়েছে পথনাটক করতে। নাটকের নাম 'হাল্লা বোল'। শোষণ আর বঞ্চনার সেই ভাষ্য যখন বুনে চলেছে কুশীলবরা তখনই নেমে আসে আততায়ীর আক্রমণ। সরকারি মদতপুষ্ট আততায়ী। ১৯৮৯ সাল। মাথায় ২৩বার ঘা মারা হয় ৩৪ বছর বয়সী সফদারের। আক্রমণকারীদের হিংস্রতাই প্রমাণ করে রাষ্ট্র তথা সরকারকে কতখানি ভয় পাইয়েছিল সফদার আর সফদারের নাটক। 'আওরাত' (নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে নাটক), 'মেশিন' (যন্ত্রসভ্যতা, পুঁজিবাদ ও মজদুরদের শোষণের বিরুদ্ধে নাটক), 'ডিটিসি কি ধান্দালি' (মুদ্রাস্ফীতি ও তার থেকে উৎপন্ন হওয়া সমস্যা বিষয়ক নাটক), 'হত্যায়ারে অউর অপহরণ ভায়চারে কে' (করণিক ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নাটক), 'গাঁও সে শহর তক' (ক্ষেতমজুরদের যন্ত্রণা নিয়ে নাটক), 'কুর্সি কুর্সি কুর্সি' (সরকারের ক্ষমতার রসায়নকে সমালোচনা করা নাটক), 'দুনিয়া সবকি' (আকবর-বীরবল কথোপথনে বৈষম্য বিরোধী অবস্থান নেওয়া নাটক), 'বাঁশুরিওয়ালা' (একজন সাধারণ মানুষের গণতন্ত্রে অংশ নেওয়া নিয়ে নাটক) —এইরকম অজস্র নাটকে সরকার তথা রাষ্ট্রকে সমালোচনা করেছেন সফদার। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)—এর সদস্য ও সাংস্কৃতিক যোদ্ধা সফদার তার পথনাটককে করে তুলতে চেয়েছিলেন সমাজ বদলের হাতিয়ার। বাড়তি আড়ম্বর নয়। খুব সামান্য খরচে অভিনেতাদের পারদর্শিতা আর বিষয়ের গভীরতাকে সম্বল করেই সাফদার ভাবিয়ে তুলেছিলেন দর্শকদের। সফদর বলেছিলেন, “I am temperamentally opposed to any kind of theatre, cinema or act that manipulates the consciousness of the people or which gives them an experience by proxy. It is like taking someone by his collar and shaking him until he accepts your viewpoint. In that sense, I’m more a Brechtian. I would rather appeal to the people with reasonable arguments and make them reflect about what is going on.” বোঝা যায়, তার বক্তব্য আর তার নাটকের পরিকল্পনা ও উপস্থাপন তার রাজনৈতিক বোধ থেকেই উঠে আসা। ইলিউশনের যে শেকল ভাঙতে চেয়েছিলেন ব্রেখট, নাটকের প্রথাগত আবেগমুখী গতিকে ভেঙে, যুক্তি আর তর্ককে প্রাধান্য দিয়ে সেই ব্রেখটিয় প্রকরণকেই গুরুত্ব দিতে চেয়েছেন সফদার।
নাটকের মানুষকে আলোড়িত করার শক্তি কি কমেছে তাতে? সফদারের মৃত্যুকালের ঘটনাটি স্মরণ করা যাক। ঝান্ডাপুরে অভিনীত হচ্ছে 'হল্লাবোল' নাটক। কারখানার মজুরদের মাইনে বাড়ানোর লড়াই আর ঠিকে মজদুরদের অনিশ্চয়তার যন্ত্রণা সেই নাটকের বিষয়বস্তু। খুনিরা চড়াও হয় যখন সেই সফদার প্রাথমিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে এই নাটক কেন এবং কাদের জন্য কী করছেন। কিন্তু ক্ষমতার ভাষায় অভ্যস্ত হত্যাকারীরা স্বাভাবিকভাবেই সেই যুক্তি শুনতে চায়নি। আক্রমণ ঘনিয়ে আসে যখন, দেখা যায় সফদারের সঙ্গে আততায়ীদের হাতে খুন হয় আরেকজন ব্যক্তি। রাম বাহাদুর। কারখানার মজুর। যে শ্রমিকদের জীবনের যন্ত্রণা আর লড়াই নিয়ে নাটক করছিলেন সফদাররা, আক্রান্ত হওয়ার সময় সেই শ্রমিকদেরই প্রতিনিধি পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছে সফদারের। সফদারের নাটক সেই শ্রমিকদের মধ্যে আলোড়ন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল কিনা তার উত্তর সহজেই মিলে যায়। শুধু তাই নয়, শিল্প-সংস্কৃতির আভিজাত্য, কেতাদুরস্ত নাট্যচর্চার অহমিকা আর মেহনতি মানুষের জীবন যাপনের যে দুর্লঙ্ঘ দূরত্ব থেকে যায় সচরাচর, তাকে অনায়াসে মুছে ফেলেছিল তার নাটক। 'দুনিয়া সবকি' নামের নাটক লিখেছিলেন সফদার। আর শ্রমিক ও নাট্যকর্মীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই লড়াই, মৃত্যুবরণ নাটকও যে 'সবকি' সেকথাও জানান দিয়ে যায়।
১ জানুয়ারি আক্রান্ত হন সফদার। ২ জানুয়ারি হাসপাতালে তাকে মৃত ঘোষণা করা হলে সেখানে দাঁড়িয়েই সফদারের স্ত্রী ও সহযোদ্ধা মলয়শ্রী হাসমি ঘোষণা করেন, যেখানে আততায়ীরা খুন করেছে সফদারকে, যে নাটক মঞ্চস্থ করার জন্য খুন করেছে সেই জায়গায় সেই একই নাটক আবার মঞ্চস্থ হবে। সেটাই হবে সফদারের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন। মাত্র দুদিন পর ঝান্ডাপুরেই জন নাট্য মঞ্চ আবার অভিনয় করে 'হল্লাবোল'। ১জানুয়ারি সফদার যখন অভিনয় করছিলেন তখন সেখানে দর্শক সংখ্যা ছিল দেড়শো জনের মতো। আর ৪ জানুয়ারি যখন আবার 'হল্লাবোল' অভিনীত হলো তখন সেখানে দর্শক সংখ্যা পঁচিশ হাজার। ছাত্র-শ্রমিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভিড়ে উপচে গিয়েছিল ঝান্ডাপুর৷ এখনো প্রতি বছর ১লা জানুয়ারিতে জন নাট্য মঞ্চ ঝান্ডাপুরে উপস্থিত হয় নাটক নিয়ে। সাফদারকে শ্রদ্ধা জানাতে মেহনতি মানুষের মধ্যে পৌঁছে তাদের নাটক করে তারা।
গুজরাট গণহত্যার প্রতিবাদে দুটি নাটক করেছিল জন নাট্য মঞ্চ— 'ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর' আর 'গুরুজি'। গণহত্যা ও দাঙ্গা বিরোধী নাটক। কিন্তু নাটকের মধ্যে কোথাও অভিনেতারা হত্যা-হিংস্রতা-নিষ্ঠুরতার কোনো রগরগে বর্ণনা বা উপস্থাপন ঘটাননি, যা প্রায়শই নানা নাটকে দেখা যায়। তাদের যুক্তি, এই হিংসার নিটোল দৃশ্যায়ন সাধারণ মানুষকে ক্রিটিকাল করে তোলার বদলে ওই হিংসার প্রতিই অনুরক্ত করে তুলতে পারে বেশি। ব্রেখটিও যে ভাবনা নাটককে ক্রিটিকাল করে তুলতে আগ্রহী, সাফদার নিজেও যে ভাবনায় রেখেছিলেন আস্থা, তার মৃত্যুর পরেও জন নাট্য মঞ্চ সেই ভাবনাকে বয়ে নিয়ে গিয়েছে। আর বয়ে নিয়ে গিয়েছে অজস্র নাটক তথা পথনাটকের দল। যারা পথে, ঘাটে, বাজারে, ট্রেনে, বাসে নানা আঙ্গিকে অভিনয় করে চলেছে, আর বলে চলেছে সমাজ বদলের কথা।
সফদারের মৃত্যুর পঁয়ত্রিশ বছর পেরোচ্ছি আমরা। টিভি-কেবল লাইন-ইন্টারনেট-ওটিটি পেরিয়ে এখন ইনস্টা রিলের যুগ। ১৮ থেকে ৩০ বছরের যুবক-যুবতীদের অধিকাংশই বুঁদ হয়ে থাকে ৩০ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের রিল দেখায়। অনায়াসে ৩০ সেকেন্ড পরেই আবার লাফ দিয়ে চলে যায় সম্পূর্ণ আলাদা ও অপ্রাসঙ্গিক কোনো রিলে। টুকরো টুকরো দৃশ্যের মুখোমুখি করা হয় তাদের কেবল। আর চেতনা হতে থাকে খন্ডিত। সফদারের মৃত্যুর পঁয়ত্রিশ বছর পরে, যে সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা সেখানে সব থেকে বেশি যা ভেঙে ফেলার চেষ্টা চলছে তার নাম কমিটমেন্ট। সেই কমিটমেন্ট রাজনৈতিক হোক কিংবা সামাজিক। অতীতের কাছেও কমিটমেন্ট থাকবে না। ভবিষ্যতের প্রতিও না। শুধু থাকবে টুকরো শতচ্ছিন্ন বর্তমানের ইলিউশনে বেঁচে থাকা। যাতে শোষণের যন্ত্র ঘোরার পথে কোনো বাধা না তৈরি হয়। বাঁকাচোরা প্রশ্ন যাতে না ওঠে মনে। ভুলিয়ে রাখার তাই এই ঢালাও আয়োজন। আর সফদার আমাদের শিখিয়েছিলেন কমিটমেন্ট কাকে বলে। শিল্প আর অভিনয়ের প্রতি নয় কেবল, মানুষের প্রতি, মানুষের যন্ত্রণার প্রতি কমিটমেন্ট। তাই ভিন্ন সেই ক্রিটিকের স্বর মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার নতুন রাস্তা, নতুন আঙ্গিক খোঁজাই হতে পারে সফদারের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য, যেমনটা খুঁজেছিলেন সফদার নিজে।
প্রকাশের তারিখ: ০১-জানুয়ারি-২০২৫
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
