Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

রোজা লুক্সেমবার্গের জীবন ও চিন্তা- দ্বিতীয় পর্ব

উৎসা পট্টনায়েক
এমন নয় যে মার্কস তাঁর পুঁজিবাদী সঞ্চয়নের মডেলটি শুধুমাত্র শ্রমিক এবং পুঁজিপতিদের নিয়ে একটি বদ্ধ সমাজে সংঘটিত করতে চেয়েছিলেন। কারণ যদি আমরা মার্ক্সের নিজের কাজের পরিকল্পনা পড়ি - যা তিনি ১৮৫৯ সালে ‘আ কন্ট্রিবিউশান টু দি ক্রিটিক অফ পোলিটিকাল ইকোনমি’ বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছিলেন - তাহলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মার্কস কখনই তাঁর বিশ্লেষণকে একটি বদ্ধ অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। পুঁজিবাদের বিশ্বব্যাপী কর্মকাণ্ড অধ্যয়ন করারই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর।
The Life and Thoughts of Rosa Luxemburg - Part II

এক মহান বিপ্লবী, রোজা লুক্সেমবার্গ সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই অনুষ্ঠানে কিছু কথা বলার সুযোগ পাওয়ার জন্য প্রথমেই আপনাদের অনেক ধন্যবাদ জানাই।

অধ্যাপক হাবিব তার নিজের অননুকরণীয় ভঙ্গিতে আমাদের একটি বিশাল পরিসরে ধারণা দিয়েছেন যা নিয়ে রোজা লুক্সেমবার্গ চিন্তা করেছিলেন ও যুক্ত ছিলেন ( ১৫ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে মার্কসবাদী পথ-এর ওয়েবসাইট-এ প্রকাশিত অধ্যাপক ইরফান হাবিবের বক্তব্যের অনূদিত নিবন্ধরূপ দ্রষ্টব্য)। আমি আরো সীমিত পরিসরে দৃষ্টিনিবদ্ধ করব, কারণ, লুক্সেমবার্গের জীবনের মত অমন বৈচিত্রময় ও সমৃদ্ধ এক জীবন সম্পর্কে সামগ্রিক আলোচনা করার যোগ্যতা আমার নেই। আমি প্রধানত অর্থনীতি, বিশেষত উপনিবেশবাদ এবং পুঁজিবাদ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য ও কাজ নিয়ে কথা বলব।

আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি, রোজা লুক্সেমবার্গ রাশিয়া অধিকৃত পোল্যান্ডের একটি ছোট শহরে ১৮৭১ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মার্কসের মৃত্যুর ১৩ বছর আগে। অর্থাৎ, মার্কস তাঁর কাছে অতীতের কোনো ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, তাঁর জীবিতকালেরই উপস্থিত এমন এক মানুষ ছিলেন। তিনি কেইনসের জন্মের ১৩ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অধ্যাপক হাবিব ইতিমধ্যে যা বলেছেন তার সঙ্গে কয়েকটি শব্দ যোগ করে বলতে চাই, গোড়া থেকেই মেধাবী ছাত্র হিসাবে পরিচিত লুক্সেমবার্গ মার্কসের মত দর্শন অধ্যয়নের মাধ্যমে নিজের বিদ্যাচর্চা শুরু করেছিলেন এবং তারপরে তিনি অর্থনীতি অধ্যয়ন করেন। পোল্যান্ডের শিল্পোন্নয়নের উপর তাঁর যে ডক্টরাল থিসিস, তার কাজ তিনি সম্পন্ন করেছিলেন জুরিখে। এরপরই তিনি জার্মানিতে স্থানান্তরিত হন, এবং জার্মানি থেকে বিতাড়িত হওয়ার সম্ভাবনা এড়াতে একজন জার্মান নাগরিককে বিয়ে করেন। তিনি হয়ে ওঠেন জার্মান সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টির খুব বিখ্যাত সদস্য এবং কর্মী। 

তার প্রাজ্ঞ মনন মার্কসের পুঁজিবাদী সঞ্চয়নের বিশ্লেষণে একটি মৌলিক সমস্যা ধরতে পেরেছিল, যা অধ্যাপক হাবিব ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছেন। স্পষ্টত এই বিশ্লেষণ করা হয়েছিল পুঁজিবাদের একটি প্রথাগত ধাঁচের মধ্যে যা ছিল সম্পূর্ণ আবদ্ধ - এতে পুঁজিপতি এবং শ্রমিক ছাড়া অন্য কোনও বাণিজ্য, তৃতীয় কোনো স্তর বা শ্রেণি ছিল না। রোজা লুক্সেমবার্গ তখন পার্টি কর্মীদের জন্য এক ধরনের তথ্যবহুল পাঠ্যপুস্তক তৈরি করছিলেন। এবং যখন তিনি আবার মার্কস পড়ছিলেন তখন মার্কসের বিশ্লেষণে একটি নির্দিষ্ট দ্বন্দ্ব তাকে বিস্মিত করেছিল।

এমন নয় যে মার্কস তাঁর পুঁজিবাদী সঞ্চয়নের মডেলটি শুধুমাত্র শ্রমিক এবং পুঁজিপতিদের নিয়ে একটি বদ্ধ সমাজে সংঘটিত করতে চেয়েছিলেন। কারণ যদি আমরা মার্ক্সের নিজের কাজের পরিকল্পনা পড়ি - যা তিনি ১৮৫৯ সালে ‘আ কন্ট্রিবিউশান টু দি ক্রিটিক অফ পোলিটিকাল ইকোনমি’ বইয়ে লিপিবদ্ধ করেছিলেন - তাহলে খুব স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মার্কস কখনই তাঁর বিশ্লেষণকে একটি বদ্ধ অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ রাখতে চাননি। পুঁজিবাদের বিশ্বব্যাপী কর্মকাণ্ড অধ্যয়ন করারই উদ্দেশ্য ছিল তাঁর। তিনি বলেন:

“আমি নিম্নোক্ত ক্রম মেনে বুর্জোয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা করি: পুঁজি, ভূমি সম্পত্তি, মজুরি-শ্রম; রাষ্ট্র, বৈদেশিক বাণিজ্য, বিশ্ব বাজার।  যে তিনটি বড় শ্রেণিতে আধুনিক বুর্জোয়া সমাজ বিভক্ত, তাদের টিঁকে থাকার অর্থনৈতিক শর্তগুলি প্রথম তিনটির শিরোনামের আধারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে (পুঁজি, ভূমি সম্পত্তি এবং মজুরি শ্রম); অন্য তিনটি শিরোনামের আন্তঃযোগাযোগ স্পষ্টতই বোধগম্য।" 

যদিও প্রয়োগের ক্ষেত্রে, মার্কস তাঁর উল্লেখিত এই বৌদ্ধিক প্রকল্প সম্পূর্ণ করতে পারেননি। তাঁর অকাল মৃত্যু অবধি এক শতকের এক চতুর্থাংশ বা তার সামান্য বেশি সময় জুড়ে থাকা অবশিষ্ট কর্মজীবন ব্যয়িত হয়েছে প্রথম তিনটি প্রকল্প, অর্থাৎ পুঁজি, ভূমি সম্পত্তি এবং মজুরি শ্রমের বিশ্লেষণই। এবং এই বিশ্লেষণটি বাইরের কোনো বাণিজ্য এবং অন্য কোনও সামাজিক শ্রেণির অস্তিত্বহীন একটি আবদ্ধ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যে করা হয়েছিল। অধ্যাপক হাবিব যথার্থই উল্লেখ করেছেন যে, নিউইয়র্ক ট্রিবিউন-এ মার্কসের লেখা লুক্সেমবার্গের সময়ে সাধারণত পাওয়া যেত না। কিন্তু সেগুলি পাওয়ার পরেও, বিদ্বজ্জনেরা - বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়ের – বিশেষত অর্থনীতিবিদেরা, এই লেখাগুলিকে খুব গুরুত্ব সহকারে নেননি, যদিও এই লেখাগুলি সবিশেষ অন্তর্দৃষ্টিতে ভরা ও এবং সেখান ডিইনডাস্ট্রিয়ালাইজেশান বা অবশিল্পায়ন ও সম্পদের নিষ্কাশন ইত্যাদি বিষয়ের স্বীকৃতি রয়েছে এবং একে ক্যাপিটাল-এর পুঁজিবাদী সঞ্চয়ন প্রক্রিয়ার কঠোর গবেষণালব্ধ প্রতিষ্ঠিত মডেলের মধ্যে যুক্ত করে দেখা হয়নি। এর পরিণাম অত্যন্ত গুরুতর ছিল কারণ আমরা দেখতে পাই যে উত্তরাঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যারা নিজেদেরকে মার্কসবাদী বলেন, তাঁদের অনেকেই উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদকে কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসাবে বিবেচনা করেন না। তাঁদের জন্য সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্বই নেই – এমনকী পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতেও উপনিবেশবাদ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।  

লেনিন এবং লুক্সেমবার্গ দুজনেই এই পরিপ্রেক্ষিতে যে মহৎ কাজটি করেছিলেন তা হল, মার্কসবাদী বিশ্লেষণকে সেই সকল ক্ষেত্রে বিস্তারিত করার কাজ, যা মার্কস নিজে করেননি। লেনিন, সমস্ত বিপ্লবী সংগ্রামে কৃষক ও উপনিবেশের ভূমিকাকে সমন্বিত করেছেন, এবং লুক্সেমবার্গ অবশ্যই মার্কসের মত মহান ব্যক্তিত্বেরও সমালোচনা করার দুঃসাহস রাখতেন।

কিন্তু তাঁর সমালোচনা ছিল অন্তর থেকে করা। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলা। সুতরাং আমরা সেই প্রেক্ষাপটে একে বুঝতে চাই, এবং অধ্যাপক হাবিব ইতিমধ্যেই ব্যাখ্যা করেছেন যে, সমস্যার মূলে কী ছিল; অর্থাৎ লুক্সেমবার্গের মতে একটি বদ্ধ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত আদায় অসম্ভব ছিল। এবং সত্যি কথা বলতে, আমি মনে করি যে, তিনি যথার্থই ছিলেন, কারণ এক্ষেত্রে লেনিনের পক্ষ সমর্থন খুব যথাযোগ্য মনে হয়নি - কারো কাছে আরও বেশি পুঁজি-নিবিড় উৎপাদন পদ্ধতি থাকতে পারে, যা উদ্বৃত্ত সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করবে।

যখন রোজা লুক্সেমবার্গের ‘দি অ্যাকুমুলেশন অফ ক্যাপিটাল’ (বিশেষ করে তরুণদের এটি পড়ার পরামর্শ দেব) পড়বেন –প্রথম কয়েকটি অধ্যায় কঠিন মনে হবে। কারণ সেখানে তিনি যে ধারণা এবং বিতর্কগুলির উত্থাপন করছেন তা সেসময়ের অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু তারপর বইটির বাকি অংশ চমৎকার রচনাশৈলীতে লেখা হয়েছে – যা খুবই আকর্ষক  এবং শ্লেষাত্মকও বটে। তিনি কেবল মার্কসের সমালোচনা করছেন না, সেই সমস্ত তত্ত্বের সমালোচনা করছেন, যা মার্কসের আগেও ছিল, এবং যেগুলি কার্যকর চাহিদার সমস্যাকে বিবেচনায় নেয়নি। জোয়ান রবিনসন যখন একটি সংস্করণে ‘দি অ্যাকুমুলেশন অফ ক্যাপিটাল’-এর ভূমিকা লিখেছিলেন (রবিনসন আরও বলেছেন যে, মার্কসবাদী শব্দচয়ন তাঁর পক্ষে কঠিন ছিল, কারণ তিনি সেগুলির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না), আসলেই যা রোজা লুক্সেমবার্গ করছিলেন। এবং তিনি এই কাজের গোড়ার দিকের একজন ছিলেন। তিনি চাহিদার সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, যা রিকার্ডো-র কাজে ছিল না।

কেউ অযৌক্তিক তর্ক করলে, রোজা লুক্সেমবার্গ কেমন শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে তার মোকাবিলা করেছেন তার একটি উদাহরণ দেব। সিসমন্ডির সঙ্গে রিকার্ডোর বিতর্ক নিয়ে যখন তিনি আলোচনা করছেন সে সময়ের কথা, আমি লুক্সেমবার্গ থেকে উদ্ধৃত করছি (তিনি এখানে রিকার্ডোকে উদ্ধৃত করছেন): 

“ধরা যাক, ১০০ জন শ্রমিক ১০০০ বস্তা ভুট্টা এবং ১০০ জন তাঁতি ১০০০ গজ উলের কাপড় উৎপাদন করে। এবার আমরা, মানুষের জন্য উপযোগী সকল পণ্যকে ও এই দুইয়ের মধ্যকার সকল মধ্যস্থতাকারীকে উপেক্ষা করব, এবং বিশ্বে এদের একমাত্র পণ্য হিসাবে বিবেচনা করব। তাঁরা ১০০০ বস্তার সঙ্গে ১০০০ গজ কাপড় বিনিময় করেন। ধরা যাক, শিল্পের ক্রমশ অগ্রগতির কারণে শ্রমের উৎপাদন ক্ষমতা দশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, ফলে একই লোকেরা ১১০০ বস্তার সঙ্গে ১১০০ গজ কাপড় বিনিময় করবে এবং প্রত্যেককে আরও ভাল পোশাক দেওয়া হবে এবং খাওয়ানো হবে; আরো অগ্রগতিতে তাঁদের ১২০০ বস্তার সঙ্গে ১২০০ গজ কাপড় বিনিময় করবে। পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি সবসময় কেবলমাত্র যাঁরা উৎপাদন করেন, তাঁদের আনন্দ বাড়ায়।"

এর মূল কথা হল, সরবরাহ তার নিজস্ব চাহিদা তৈরি করে। এতে রোজা লুক্সেমবার্গ মন্তব্য করেছেন-

"মহান রিকার্ডোর যুক্তির মান, অবশ্যই আফসোস করে বলতে হবে, স্কটিশ আর্চ হামবাগ, ম্যাককালকের চেয়েও কম কিছু থেকে থাকলে সেরকম। আবারও আমাদের একটি সুরেলা ও সুন্দর বস্তা ও গজ কাপড়ের নৃত্য প্রত্যক্ষ করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে - যে প্রস্তাবটিকে প্রমাণ করতে হবে, তাকে আবারও সহজে গ্রহণযোগ্য করা হল। তার উপর, সমস্যাটির সব প্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রগুলিকে স্রেফ বাদ দেওয়া হয়েছে। আসল সমস্যা - মনে করতে পারবেন - বিতর্কের উদ্দেশ্যটিই ছিল প্রশ্ন: পুঁজিপতিরা নিজেদের এবং তাদের শ্রমিকদের ভোগের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে বেশি পণ্য উৎপাদন করলে উদ্বৃত্ত সেই পণ্যের ক্রেতা এবং ভোক্তা কারা; যদি প্রশ্ন করা হয়, তারা তাদের উদ্বৃত্ত মূল্যের কিছু অংশকে পুঁজি হিসাবে ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়াতে, পুঁজি বাড়াতে ব্যাবহার করে? রিকার্ডো পুঁজির বৃদ্ধিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এর উত্তর দেয়।"

তিনি যারা চাহিদার প্রশ্নটিকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করেন সেরকম অন্যান্য লেখকদেরও সমালোচনা করেন ।

এরপর তিনি মার্কসের বর্ধিত পুনরুৎপাদনের রেখাচিত্র নিয়ে আলোচনা করছেন। তিনি বলেন যে, মার্কসের বর্ধিত পুনরুৎপাদনের রেখাচিত্রটি সঞ্চয়নের প্রকৃত এবং ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে পারে না। এবং কেন? কারণ রেখাচিত্রের ভিত্তি। এবং ভিত্তি কী? পুঁজিপতি এবং শ্রমিকেরা পুঁজিবাদী ভোগের একমাত্র এজেন্ট এমন ধারণা। এখান থেকে তিনি উপসংহারে আসেন যে, যেমন অধ্যাপক হাবিব উল্লেখ করেছেন, এমনটা অনুমান করার মধ্যে একটি বুনিয়াদি দ্বন্দ্ব রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শুধুমাত্র পুঁজিবাদী এবং শ্রমিকদের বা তাদের সহায়ক - যেমন আপনাদের পেশাদার শ্রেণি, যাজক এবং আরও অনেক, যারা পুঁজিবাদী সমাজের মৌলিক শ্রেণির একটি অংশ হিসাবে বিবেচিত হয়, শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।

মার্কসের সমালোচনা করার যে সাহস তাঁর ছিল তা অনেক মার্কসবাদীকে হতবাক করেছিল। কিন্তু মার্কস নিজে, আমার ধারণা, সেটার প্রশংসাই করতেন। তত্ত্বের ব্যাপারে মার্কসের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির সার্বিক ধরনটিই ছিল নির্মম সমালোচনা। তিনি এমন মানুষ ছিলেন না যিনি কোনো আলগা যুক্তি বা ভিত্তিহীন যুক্তি বা বিতর্কে যুক্তির কোনো অসঙ্গতি সহ্য করতেন না। ব্যক্তিগতভাবে আমি অবশ্যই মনে করি যে, তিনি যদি তাঁর বৌদ্ধিক প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতেন - যদি তিনি বৈদেশিক বাণিজ্য, বিশ্ব বাজার এবং রাষ্ট্র নিয়ে আলোচনা করার জন্য যথেষ্ট দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতেন, যেমনটি তিনি করতে চেয়েছিলেন - তাহলে আমরা খুব সম্ভবত ক্যাপিটাল-এর চতুর্থ ও পঞ্চম খণ্ডও দেখতে পেতাম। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ডের কিছু অনুমান আসলেই সম্পূর্ণরূপে বাদ হয়ে যেত। মার্কস যে তার প্রকল্পটি সম্পূর্ণ করার জন্য বেঁচে ছিলেন না তার মানে এই নয় যে মার্কসবাদীদের সেই প্রকল্পটিকে বাদ দিয়ে দেওয়া উচিত। মার্কসবাদীদের এ কথা অবশ্যই মনে রাখা দরকার যে, মার্কসের লেখাগুলিকে কোনো প্রাপ্ত জ্ঞান হিসাবে বিচার না করা – বাইবেল যেমন - যেমন বহু উত্তরাঞ্চলের মার্কসবাদীর করার প্রবণতা কিন্তু সেই বিশ্লেষণকে এমন দিকেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া দরকার যেমনটা মার্কস বেঁচে থাকলে করতেন। আমি মনে করি, আমাদের (যদি আমরা বর্তমান সময়ে প্রয়োগ করা একটি তত্ত্ব হিসাবে মার্কসবাদ সম্পর্কে ঐকান্তিক হই) বুঝতে হবে যে, আজকের সময়ে আমাদের যে তত্ত্বগুলি শেখানো হয়, বিশেষ করে অর্থনীতির ছাত্রদের, তার মধ্যে অনেকগুলি আসলেই যুক্তিগতভাবে ভুল। আমি রিকার্ডোর ব্যাপারে আমার সমালোচনার প্রসঙ্গে ঢুকতে চাই না; আপনারা অনেকেই সেসব বারবার শুনেছেন, তাই আমি সেটার পুনরাবৃত্তি করতে চাইছি না।

কিন্তু রোজা লুক্সেমবার্গ সমস্যার যে সমাধান খুঁজে পেয়েছিলেন যা তিনি চিহ্নিত করেছেন, তা অত্যন্ত পরিচিত হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, বাস্তবে শূন্যতায় পুঁজিবাদী উৎপাদনের অস্তিত্ব থাকে না। এটি প্রাক-পুঁজিবাদী বা পুঁজিবাদী নয় এমন অন্যান্য ধরনের উৎপাদন দ্বারা বেষ্টিত। তিনি দুটি জিনিসকে চিহ্নিত করেছিলেন। প্রথমত তিনি বলেন, আমি উদ্ধৃত করছি -

“পুঁজিবাদী উৎপাদন তার নিজস্ব প্রয়োজন, তার শ্রমিক এবং পুঁজিপতিদের চাহিদা মাফিক  ভোগ্যপণ্য সরবরাহ করে, এগুলি অ-পুঁজিপতি স্তরে থাকা ক্রেতা এবং দেশগুলি কিনে নেয়। যেমন, ইংরেজ তূলা শিল্প ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই-তৃতীয়াংশ সময়ে এবং এখনও কিছুটা হলেও, ইউরোপ মহাদেশের কৃষক ও পেটি-বুর্জোয়া শহরবাসী এবং ভারত, আমেরিকা, আফ্রিকার কৃষকদের কাছে সুতির বস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। ফলে ইংরেজ তূলা শিল্পের বিশাল সম্প্রসারণ এভাবেই অ-পুঁজিবাদী স্তর এবং দেশগুলির ভোগের উপর দাঁড়িয়ে আছে।"

(তিনি আমাদের সুতির গজ এবং সুতি কাপড়ের রপ্তানি সম্পর্কে প্রচুর পরিসংখ্যান দেন)

এরপরে তিনি অন্য যে উদাহরণটি দিয়েছেন তা সুতিবস্ত্রের মতো পণ্যের নয়, রাবারের। এটি একটি মধ্যবর্তী উৎপাদন। এশিয়া ও আফ্রিকায় অবস্থিত ব্রিটিশ মালিকানাধীন কোম্পানিগুলির দ্বারা বিপুল পরিমাণ রাবার উৎপাদন এবং রপ্তানি করা হয়।

এক্ষেত্রে বলতে চাই যে, লুক্সেমবার্গ উপনিবেশবাদী শোষণের গোটা প্রশ্নটিকে সামনে এনে আমাদের জন্য এক অপরিমেয় উপকার করেছেন বটেই, তবে যেমন অধ্যাপক হাবিব উল্লেখ করেছেন, তাতে এ কথাও সত্য যে তাঁর উপলব্ধি সেই সময়ে লভ্য তথ্যে সীমিত ছিল। তিনি সত্যিই সঞ্চয়নকে অ-পুঁজিবাদী স্তর এবং জাতীয় সীমানার বাইরে (যাকে আমরা তৃতীয় বিশ্ব বলি) অবস্থিত শ্রেণিগুলি অবধি পৌঁছানোর উপর নির্ভরশীল হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

আমি মনে করি একটি আরও শক্তিশালী প্রস্তাব রাখা যেতে পারে- মূল পুঁজিবাদী দেশগুলিতে পুঁজিবাদী উৎপাদনের উত্থান সম্ভবত এই দেশগুলিতে শিল্প বিপ্লবের আগে প্রবেশাধিকার না পেয়ে থাকলে সম্ভব হত না। কারখানার উৎপাদনের আগে তাদের অ-পুঁজিবাদী দেশগুলিতে প্রবেশাধিকার ছিল। এবং ১৮৪৮ সালে লেখা কমিউনিস্ট ইশতেহারের একটি অনুচ্ছেদের সমালোচনা করার সাহসও আমাকে দেখাতে হবে। মনে রাখবেন, ১৮৪৮ সালে জার্মানি বা ইংল্যান্ডে বসবাসকারী যে কারও কাছে উপনিবেশবাদ সম্পর্কে যে ধরনের তথ্য পাওয়া যেত, তা খুবই সীমিত ছিল। এই তথ্যগুলি মূলত ঔপনিবেশিকদের এবং সাম্রাজ্যবাদীদের লেখা থেকে পাওয়া যেত, যারা খুব তির্যক দৃষ্টিভঙ্গিতে গোটা প্রক্রিয়াটির ন্যূনতমটুকু জানাতো।

এখন কমিউনিস্ট ইশতেহারের একটি উদ্ধৃতি দিচ্ছি,

"যোগাযোগের ব্যাপক সুবিধাজনক মাধ্যম দ্বারা, উৎপাদনের সমস্ত উপকরণের উন্নতির মাধ্যমে বুর্জোয়ারা অতি বর্বর জাতিসহ সব জাতিকে সভ্যতার দিকে টেনে আনে।"

এটি হল এমন আরেকটি কথা, যা দুর্ভাগ্যজনকভাবে কানে লাগে যে, কেবলমাত্র মার্কসবাদীই নয়, কেইনস এবং তাদের পরে ভিক্টোরিয়ানরাও - সভ্য জাতি এবং বর্বর জাতি – এই শব্দগুলি ব্যবহার করেন। তাঁরা যে ভাষা ব্যবহার করতেন সেসবের ব্যাপারে তাঁরা খুব একটা সংবেদনশীল ছিলেন না। রোজা লুক্সেমবার্গকে হত্যার প্রায় পঁচিশ বছরের মধ্যেই, গ্যাস চেম্বারে নিজের দেশের ৬০ লাখ নাগরিককে হত্যা করে যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা, তার মধ্যে এত সভ্যতার কিছু আছে বলে আমি দেখতে পাইনি। অথবা কেইনসের কথা যদি বলি, যিনি সভ্য জাতির কথাও বলেছেন, তিনি যে ‘সভ্য দেশ’-এর প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেই দেশ মুনাফা স্ফীতির প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলায় ৩০ লক্ষ নাগরিককে অনাহারে মারছে। তাই সভ্যতা আসলে এরা কেবল নিজেদের দিয়েছে। তারা নিজেদের জন্য যে স্তরবিন্যাস এবং বিশেষণগুলি ব্যবহার করে তা নিয়ে আমাদের সবসময়ে প্রশ্ন করতে হবে। কমিউনিস্ট ইশতেহারের উদ্ধৃতিতে ফিরে যেতে চাই:

"পণ্যের সস্তা দাম হল এক ভারি হাতিয়ার, যার সাহায্যে চীনের সমগ্র প্রাচীরকে ধ্বংস করে দেওয়া যায়, যার সাহায্যে এটি বিদেশীদের প্রতি বর্বরদের তীব্র হঠকারী ঘৃণাকে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে।"

একেবারেই না! ভারতে হোক বা চীন হোক, চীনের দেয়াল ভেঙে ফেলার কারণ পণ্যের সস্তা দাম নয়। কারণ ছিল বন্দুক বোট। শক্তির সহজ ব্যবহার। এটি ছিল পলাশীর যুদ্ধ, পূর্ব ভারতের বক্সারের যুদ্ধ এবং পরে চীনে আফিমের যুদ্ধ। এবং উদ্দেশ্য কী ছিল? সস্তা দাম নয় কারণ তারা সেই সময় অবধিও সস্তায় সুতির টেক্সটাইল উৎপাদন করেনি – ১৭৮৯-৯০ এর দশক পর্যন্ত করেনি। তাহলে সেই সময়ে ভারত ও চীনের মতো দেশের বন্দর খুলে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী ছিল? উদ্দেশ্য ছিল আমাদের উৎপাদিত পণ্য, যেগুলি সেই সময়ে ইউরোপে উৎপাদিত টেক্সটাইলগুলির তুলনায় অনেক সস্তা ছিল। সুতরাং এটি একটি গুরুতর ভুল উপস্থাপনা। এখন আমরা তা ভুলে যেতে পারি কারণ সেই সময়ে মার্কস ও এঙ্গেলসের সম্মিলিত বয়স সম্ভবত পঞ্চাশও ছিল না। তারা খুব অল্পবয়সী ছিল এবং সম্ভবত উপনিবেশবাদী বিজয়ের প্রকৃত ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য তাঁদের জন্য উপলব্ধও  ছিল না।

আমি এই বিষয়টিই বলতে চাইছি যে, উপনিবেশ অঞ্চলগুলিতে বাজার খোঁজার অনেক আগে, তারা এই অঞ্চলগুলিতে গিয়েছিল এবং তাদের পরাধীন করে, রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করেছিল। তাও আক্ষরিকভাবে ভারি কামান ব্যবহার করে - রূপকার্থে ভারি কামান নয় বরং প্রকৃত ভারি কামান – হিংসার মাধ্যমে - এই দেশগুলি থেকে সেইসব পণ্য জোগাড়ের জন্য যা তারা নিজেরা উৎপাদন করতে পারেনি। কারণ তারা সুতির বস্ত্র তৈরির জন্য কাঁচা তূলা উৎপাদন করতে পারেনি। রেশম বস্ত্রের জন্য তাদের রেশম শিল্প ছিল না। তারা গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের ফসল উৎপাদন করতে পারেনি, এখনও করতে পারে না। এই ছিল উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের উৎসাহের ধারাবাহিকতার কারণ। আমাদের অঞ্চলগুলিকে উপনিবেশ করে যে উদ্দেশ্যগুলি সাধন করতে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে সারা বিশ্বের অর্ধেক পথ আসতে হয়েছিল - সেই উদ্দেশ্যগুলি এখনো রয়ে গেছে। সেই উদ্দেশ্যগুলি এখনও আছে, আমরা তাদের চিনতে পারি না। অন্য কথায়, আমরা নব্য-সাম্রাজ্যবাদকে ও তা কীভাবে কাজ করে সেই পদ্ধতিকে চিনতে পারব না, যদি না আমরা বুঝতে পারি যে, তারা আমাদের কাছ থেকে যা চেয়েছিল, প্রথম এবং সবচেয়ে আগে, তা বাজার ছিল না। তারা আমাদের পণ্য চেয়েছিল, আমাদের উৎপাদনশীল গ্রীষ্মমন্ডলীয় জমি এবং পণ্যগুলি অবধি পৌঁছাতে চেয়েছিল, যা তারা নিজেরা তখনও উৎপাদন করতে পারেনি এবং আজও উৎপাদন করতে পারে না।

‘ইমপেরিয়ালিজম ইন দি এরা অফ গ্লোবালাইজেশান’ নামক বইয়ে যৌথ লেখক হিসাবে আমি এবং প্রভাত পট্টনায়ক, এমন একটি বিতর্কের উত্থাপন করেছি, যা আগে কোথাও উপস্থাপিত হয়নি; সেটি হল - মৌলিক বস্তুগত বাস্তবতায় সম্পদের নিরিখে, প্রাথমিক উৎপাদনের নিরিখে ঠাণ্ডা নাতিশীতোষ্ণ উত্তরের সমাজের তুলনায় আমরা ধনী সমাজ ছিলাম। ডব্লিউটিও সংস্থার যাবতীয় বিষয় এই নিয়েই। সেজন্যই মুক্ত বাণিজ্যের যে মন্ত্র আমাদের কানে ক্রমাগত ঢেলে দেওয়া হচ্ছে – ‘নিজের অর্থনীতি খুলে দিন! নিজের কৃষি খুলে দাও!' – তার জেরে উত্তরের দেশগুলি আজকের সময়ে আমাদের কৃষিতে অবাধ প্রবেশাধিকার চাইছে।

আমি একটি সত্যের পুনরাবৃত্তি করি যা ইকোনমিক হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া-তে ১০০০ পৃষ্ঠার  বেশি কোথাও উল্লেখ করা হয়নি -  ১৭০০ সাল থেকে ১৮৪৬ সাল পর্যন্ত, ব্রিটিশ বাজার আইন মারফৎ ভারত ও পারস্য থেকে ব্রিটিশ বাজারে এশিয়ান বস্ত্রের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। ১৭০০ থেকে ১৭৪৪ সাল পর্যন্ত ব্রিটেন সম্পূর্ণ ব্যান করে দিয়েছিল এই প্রবেশ, অর্থাৎ, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত ও পারস্য থেকে আমদানি করা সুতির টেক্সটাইলকে ব্রিটেনেও প্রবেশের অনুমতি দিত না। তাদের কেবল সেই বন্দরে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল যেখানে গুদাম ছিল কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারা তাদের অন্যান্য দেশে পুনরায় রপ্তানি করতে হয়েছিল।

আমাদের টেক্সটাইল ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা ৭৫ বছর ধরে চলেছিল। এই টেক্সটাইলকে দূরে রাখার জন্য খাঁটি তূলা পণ্যের ব্যবহারেও নিষেধাজ্ঞা ছিল। ১৭৭৪ সালের পর, যখন আর্করাইট ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পিটিশন করেছিলেন এবং বলেছিলেন - দেখুন এখন আমরাই এই বিশুদ্ধ টেক্সটাইল/কটন টেক্সটাইলগুলি উৎপাদন করছি, কেন আমাদের নিষেধাজ্ঞা থাকবে – তখন সংসদ নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে শুল্ক চালু করা হয়। ১৭৭৪ থেকে ১৮৬৪ সাল অবধি ব্রিটিশ বাজারে আমাদের টেক্সটাইলকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি।

১৫০ বছরের রক্ষণবাদের এই দীর্ঘ সময়কালের উল্লেখ কেমব্রিজ ইকোনমিক হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়া-তে কোথাও পাওয়া যায় না। এটি ডেভিড ল্যান্ডস-এর মতো কারও কাজের মধ্যে এর নাই, ডেভিস-এর থিসিস এবং বই ব্রিটেনের প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং তুলা-বস্ত্রশিল্পের উপরেই ছিল। এরিক হবস্‌বমের মধ্যে এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। তাই আমাদেরই ইতিহাস লিখতে হবে। আমরা সেসব জায়গায় লেখা ইতিহাসের উপর নির্ভর করতে পারি না। 

একটি প্রসঙ্গে চর্চা করে আমি আমার আলোচনা শেষ করব, আমার মতে এটি নিয়ে যথেষ্ট তাত্ত্বিক আলোচনা হয়নি - শ্রমের স্বাধীনতা ও দাসত্বের প্রসঙ্গ। প্রথাগতভাবে আমাদের শেখানো হয়েছে যে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থা শ্রমকে সব ধরনের প্রাক-পুঁজিবাদী বাধা থেকে, সমস্ত ধরনের বন্ধন থেকে মুক্ত করে এবং একটি মুক্ত মজুরি-শ্রমিক শ্রেণি তৈরি করে। এইগুলিই হল পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ইতিবাচক সাফল্য। কিন্তু আমি যতদূর জানি, উত্তরের প্রধান দেশগুলিতে শ্রমের যে স্বাধীনতা এসেছিল, তা ছিল অন্যান্য দেশের মানুষের উপর দাসত্ব আরোপ করার বাস্তবতার সহকারী - এই সত্যের কোনও সুসম্বদ্ধ বিশ্লেষণ নেই। ঠিক যখন ইংল্যান্ডে, ফ্রান্সে বা জার্মানিতে শ্রম বেশি  বেশি করে স্বাধীন হয়ে উঠছিল, তখন এখানে দাসত্বের সূচনা হচ্ছে, বা অন্ততপক্ষে ১৫০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে দাসত্বের ধারাবাহিকতা টিঁকে থাকছে। মূল দেশগুলিতে পুঁজিবাদী বিকাশের গোটা প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর, উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে দাসপ্রথা অব্যাহত ছিল, তারপর তার চূড়ান্ত বিলুপ্তি ঘটে। এই দাসপ্রথা আগের ব্যবস্থা থেকে বয়ে আনা হয়নি; এই দাসপ্রথা মূল দেশগুলির সীমানার বাইরে পুঁজিবাদী সম্প্রসারণবাদের বাস্তবতার কারণে শুরু হয়েছিল। এটি ছিল ১০০০ বছর পর দাসপ্রথার পুনরুত্থান। প্রাচীনকালের দাসত্ব থেকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অন্তস্তলে থাকা দাসপ্রথা এবং বাঁধা-শ্রম যেখানে সরাসরি “দাসত্ব” ছিল না। কীভাবে এর বিশ্লেষণ করবেন? কোন মার্কসবাদী এই জাতীয় তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছেন বলে আমি নিশ্চিত নই। 

রোজা লুক্সেমবার্গ যে প্রবল উৎকর্ষময় একজন ব্যক্তি ছিলেন তা নিয়ে এখন দীর্ঘ সময়ের জন্য আলোচনা চলবে। কিন্তু, আমার মনে হয়, তাঁর উৎকর্ষের দুটি বৈশিষ্ট্য ছিল। তিনি তাঁর তত্ত্বচর্চায় ছিলেন একেবারে আপসহীন, এবং একই সঙ্গে তিনি তাঁর রাজনীতিতেও সম্পূর্ণ আপসহীন ছিলেন। পাণ্ডিত্য এবং রাজনীতির এই সমন্বয়ের কারণে তাঁকে একজন অসামান্য ব্যক্তিত্ব হিসাবে - একজন অসামান্য বিপ্লবী হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। ৫০ বছর বয়স পেরোনোর আগেই তাঁকে খুন করা হয়। অর্থাৎ তিনি যদি আরও বেশি দিন বেঁচে থাকতেন তবে তাঁর অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের আরও কত কীই দিতে পারতেন। ‘দি অ্যাকুমুলেশন অফ ক্যাপিটাল’ হল তাঁর করা অর্থনীতির একমাত্র কাজ, কিন্তু এটি একটি ক্লাসিক হয়ে উঠেছে এবং আজ অবধিও একটি ক্লাসিক হিসাবে রয়ে গেছে। আমরা এই বই পড়ার মাধ্যমে তাঁকে শ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধাটুকু জানাতে পারি। তাই আমি আপনাদের এটি পড়ার জন্য অনুরোধ করব। ধন্যবাদ। 

উৎস: রোজা লুক্সেমবার্গ-এর শাহাদতের শততম বছরে রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশন, সাউথ এশিয়া-র সহায়তায়, সেন্টার ফর উইমেন'স ডেভলপমেন্ট স্টাডিস ২০১৯ সালের মার্চ মাসে একটি প্যানেল ডিসকাশান-এর আয়োজন করে। এই প্যানেল ডিসকাশানে বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ইরফান হাবিব, অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়ক ও অধ্যাপক চিরশ্রী দাশগুপ্ত। তাঁদের বক্তব্য এরপর সেন্টার ফর উইমেন'স ডেভলপমেন্ট স্টাডিস থেকে একটি বুকলেট আকারে ইংরেজিতে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। আজকের নিবন্ধ অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়ক-এর বক্তব্যের লিখিত (অনূদিত) রূপ। 

ভাষান্তর: উর্বা চৌধুরী



প্রথম পর্ব পড়ুন
শেষ পর্ব পড়ুন 

 


প্রকাশের তারিখ: ১৬-জানুয়ারি-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫