সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
রফীক আহ্মদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত (প্রথম পর্ব)
মুজফ্ফর আহ্মদ
হিন্দুকুশ অতিক্রম করা কিছু সুখের পথচলা নয়। যদি প্রতিদিনের ডায়েরী লিখে রাখতাম তবে বিস্তৃতভাবে বলতে পারতাম কী দুঃখের পথ তা ছিল। তখনও স্থানে স্থানে বরফ গলে নি। ঠান্ডা ছিল খুবই। হিন্দুকুশের মতো পাহাড়ের পথের দুর্গমতা সহজেই অনুমেয়। এই পথেরও একদিন শেষ হল। আমরা নীচে নামলাম। আমুদরিয়া সেখানে পাহাড় হতে নেমে খুবই চওড়া হয়েছে। পার হতে পারলেই তির্মিজ— সোবিয়েৎ দেশের এলাকা।

[মুখবন্ধ— ভুপালের রফিক আহ্মদ (জন্ম ১৮৯৯) ছিলেন ভারতীয় মুহাজিরদের কাফিলার একজন সদস্য। তিনি ১৯১৯-২০ সালের ভারতে খিলাফত আন্দোলনের একটি শাখা, হিজরত আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পরাধীন ভারতবর্ষ ত্যাগ করে কাবুলে গিয়েছিলেন। জার শাসিত রাশিয়া অধিকৃত তুর্কিস্তানে পৌঁছেছিলেন। রফিক আহ্মদের বাবা ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। তাঁর সামান্য অবসরকালীন ভাতাতেই তাঁদের সংসার চলত যখন রফীক কাবুল চলে যান। রফিক ভাষার ছাত্র ছিলেন। তিনি মুন্সি-ফজল অবধি পড়াশোনা করেছিলেন। তাঁকে চাকরি দিয়েছিলেন ভুপালের নবাব ওবাইদুল্লাহ খান। রফিক ছিলেন খিলাফত নেতৃত্বের ১৯২০ সালের দিল্লী সম্মেলন প্রসূত হিজরত আন্দোলনে যোগদানকারীদের প্রথমদিকের সমর্থক। ‘মুহাজিরিন’ শব্দটি আসলে ‘মুহাজির’ শব্দের বহুবচন, যার অর্থ ‘যারা হিজরত (পলায়ন/দেশান্তর) পালন করেছেন’। এই আরবি শব্দটি ব্যবহৃত হয় ধর্মীয় নিপীড়নের জন্য দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া বোঝাতে। প্রসঙ্গত, হিজরতের ঐতিহাসিক উদাহরণ দেওয়া যায় ৬২২ খ্রিস্টাব্দে নবী মুহাম্মদের মক্কা থেকে মদিনায় যাত্রা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালের ভারতবর্ষে প্রবল অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা আর রাজনৈতিক নিপীড়নের মুহূর্তে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের নিস্পেষণ থেকে মুক্তি পেতে ভারতীয় মুসলমান সমাজের একাংশের প্রতিরোধ ছিল এই হিজরত আন্দোলন। পরবর্তীকালে মধ্য এশিয়ায় তাঁর অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়েছিলেন রফিক আহ্মদ। তিনি জানিয়েছেন ১৯২০ সালে তুর্কিস্তানে শ্বেত বাহিনীর সঙ্গে বলশেভিকদের লড়াই চলছিল। ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের ব্রিটিশ সাহায্যপুষ্ট প্রতিবিপ্লবীদের হাত থেকে উদ্ধার করে কির্কি শহরে আশ্রয় দেয় লাল ফৌজ। তিনি তাসখন্দে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন এবং সেই শহরে ভারতীয় সামরিক বিদ্যালয়ে (ইন্ডিয়ান মিলিটারি স্কুল) পদাতিক সৈন্যের প্রশিক্ষণ নেন। মধ্য এশিয়ায় থাকাকালীন এম. এন. রায় তাঁকে দায়িত্ব দেন আন্তর্জাতিক সংহতির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তুর্কিস্তানের আন্দিজান শহরে গিয়ে তাঁদের মতো কাসগর থেকে আসা নির্বাসিত রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে কাজ করতে, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে। এরপর ১৯২১ সালে তিনি যোগদান করেন মস্কোর প্রাচ্যের শ্রমজীবী বিশ্ববিদ্যালয়ে (কে.ইউ.টি.ভি)। সেখানে তিনি কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবে মার্কসবাদী রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করেন। ভারতে ফিরে আসার পর তাঁকে এবং তাঁর সঙ্গীদের ১৯২২-২৩ সালের পেশোয়ার বলশেভিক ষড়যন্ত্র মামলার আসামী সাব্যস্ত করে বিচার করা হয়। ১৮ মে ১৯২৩ সালে একবছরের কঠোর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন রফিক আহ্মদ। তিনি ছিলেন মস্কো ফেরৎ প্রাক্তন মুহাজির তরুণদের সেই দলে, যাঁদের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকর্তারা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের আফগানিস্তান-ভারত সীমান্ত অঞ্চলের চিত্রাল শহরে গ্রেপ্তার করেছিল। তাঁরা ভারতে ফেরার জন্য ঘোড়ার পিঠে, পায়ে হেঁটে, বরফে ঢাকা পামির পার হয়েছিলেন। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের কড়া নিয়মানুসারে তাঁদের রিপোর্ট করতে হয়েছিল আফগানিস্তানের মাজার-ই-শরীফ ফেরৎ তীর্থযাত্রীর ছদ্মবেশে। তখনকার দিনে বিদেশ থেকে প্রত্যাবর্তন করলেই যাত্রীদের জন্য এই নিয়ম বাধ্যতামূলক ছিল। যদিও সীমান্তে তাঁরা স্থানীয় পোশাক পরে নিয়েছিলেন, তাঁদের হাবভাবে সব ফাঁস হয়ে যায়। একবছর জেল খাটার পর ১৯২৪ সালে তিনি ছাড়া পান। তারপর তিনি দিল্লীতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠক হিসেবে কাজ করেছিলেন। তিনি ভুপালে ফিরে যান। ভুপালের দেশীয় রাজ্যের অধীনে চাকরি নেন। তাঁকে নজরদারির আওতায় রাখা হয়। দেশভাগের পর তিনি আফগানিস্তান আর সোভিয়েত দেশের অভিজ্ঞতার কথা মুজফ্ফর আহ্মদকে একটি সাক্ষাৎকারে বিবৃত করেন। ১৯৬০র দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাঁকে সম্মান জানায়। সারাজীবন সাম্যবাদের প্রতি তিনি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
১৯৬০ সালের জুলাই মাসে রফিক আহ্মদের উর্দু বিবরণ মুজফ্ফর আহ্মদ লিপিবদ্ধ করেন এবং বাংলায় টীকা সহ অনুবাদ করেন। তাঁর এই আশ্চর্য সফরের অভিজ্ঞতা ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মুজফ্ফর আহ্মদ (১৮৮৯-১৯৭৩) প্রথম ১৯২০ সালের অক্টোবরে তাসখন্দে প্রবাসী ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠায় প্রাক্তন মুহাজির যুবকদের অবদান বিষয়ে লেখেন। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে তিনি তাঁদের ইতিহাস নিয়ে লেখাপড়া শুরু করেন। পরবর্তীকালে এই প্রচেষ্টা থেকেই তাঁর রাজনৈতিক স্মৃতিকথা, আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (১৯৬৮) আত্মপ্রকাশ করে। মুজফ্ফর আহ্মদের প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন (১৯৬১) কলকাতার ন্যাশনাল বুক এজেন্সি মারফৎ প্রকাশিত হয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভাজন পর্বে লেখা এই গ্রন্থে পার্টি প্রতিষ্ঠার সময় প্রাক্তন মুহাজির যুবকদের গুরুত্বপূর্ণ কথা স্থান পায়। রফিক আহ্মদের সাক্ষাৎকার (‘রফিক আহ্মদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত’) পুনরায় এই বইটিতে ছাপা হয়। আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বইটিতেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। –সুচেতনা চট্টোপাধ্যায়]
লেখকের নোট
১৯২০ সালে তেইশ বছর বয়সে রফীক আহ্মদ ভ্রমণে বা’র হয়েছিলেন। এখন তাঁর বয়স তেষট্টি বছর। চল্লিশ বছর পরে তাঁর মুখে তাঁর ভ্রমণের কথা শুনে আমি তা বাঙলায় টুকেছি, তিনি বলেছেন উর্দুতে। এটা অবশ্য পুরোপুরি অনুলিখন নয়। এমনভাবে তার কথাগুলি টুকেছি যেন দরকার হলে আমার নিজের ভাষায় আমি একটি লেখা দাঁড় করাতে পারি । আমার পক্ষে এই বিষয়ে কিছু লেখার অন্য একটি সুবিধাও আছে। রফীক আহ্মদের ভ্রমণের সাথীদের অনেকে পরে কমিউনিস্ট পার্টিতে আমার সহকর্মী ছিলেন। তাঁদের দু'জনের সঙ্গে আমি জেলও খেটেছি। তাঁদের মুখে একাধিক বার তাঁদের ভ্রমণের কথা আমি শুনেছি। তখন অবশ্য কোনও লিখিত নোট আমি রাখিনি। তাই, রফীক আহ্মদের মুখে আবারও কথাগুলি শুনে নিয়ে আমি লিখে রাখার চেষ্টা করেছি। আগে যা ক'বার শুনেছি তা আবার নূতন করে শোনার জন্যে আমি তাঁকে কষ্ট দিয়ে গত জুলাই মাসে (১৯৬০) কলকাতায় আনিয়েছিলাম।
রফীক আহ্মদের ভ্রমণের সাথীদের মধ্যে কেউ কেউ মারা গেছেন, কেউ কেউ রাজনীতি ছেড়েছেন, আবার দেশ ভাগ হওয়ার সময়ে প্রায় সকলেই পাকিস্তানের ভাগে পড়েছেন। একমাত্র রফীক আহ্মদ বর্তমান ভারতের ভাগে পড়েছেন। তার বাড়ী ভোপাল শহরে।
চলিশ বছর পরে স্মৃতিচারণ করলে তারিখের ভুল হওয়া অনিবার্য। বিদেশের দুর্গম এলাকার পথঘাট মনে রাখা প্রায় অসম্ভব। সোবিয়েৎ ভূমির মধ্য এশীয় অঞ্চলে আজ যে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে তাতে পুরানো জায়গাগুলি চেনাও মুশ্কিল। এই সব দিক থেকে ভ্রমণ বৃত্তান্তে কিছু ত্রুটি থাকবে। তবুও এই ভ্রমণ বৃত্তান্ত অত্যন্ত মূল্যবান। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম উদ্ভবের খবর এই ভ্রমণ বৃত্তান্ত হতে জানা যাবে।
ব্যক্তির মূল্যায়নে কোথাও রফীক আহ্মদের সঙ্গে আমার মতের গরমিল হলে, কিংবা তিনি কোনও কথা বলেননি মনে হলে আমি নিজের কথা এই বন্ধনীর [ ] ভিতরে বলেছি। ভ্রমণ বৃত্তান্ত লিখতে গিয়ে আমি রফীক আহ্মদকে উত্তমপুরুষরূপে ব্যবহার করেছি। –মুজফ্ফর আহ্মদ
যাত্রার শুরু
১৯২০ সালের ১৮ই এপ্রিল তারিখে দিল্লীতে একটা খিলাফত কন্ফারেন্সের অধিবেশন হয়। আমার বড় ভাই কবীর আহ্মদ আর আমি এই কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্যে ভোপাল হতে দিল্লী যাই। আমাদের বাড়ী ভোপাল শহরে। এই সম্মেলনে হিজরতের ওপরেই বেশী বক্তৃতা হল। পাঞ্জাবের মাওলানা সানাউল্লা (আতাউল্লা?) বক্তৃতা দিয়েছিলেন। আরও কে কে বক্তৃতা দিয়েছিলেন তা এখন ভালো মনে নেই। হিজরত আন্দোলনের বড় প্রবক্তা ছিলেন গোলাম মুহম্মদ নামে একজন। তিনি সম্ভবত অমৃতসরের বাশিন্দা ছিলেন। শুনেছি এই আন্দোলনে তলে তলে মাওলানা আবুল কালাম আজাদেরও সমর্থন ছিল।
হিজরত শব্দের অর্থ ক্রমাগত অত্যাচারের হাত হতে দেশত্যাগ করে পলায়ন। যাঁরা হিজরতের প্রচার করছিলেন তাঁরা বলছিলেন ইংরেজের অত্যাচার অসহনীয় হয়ে উঠেছে। এ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া গতি নেই। তুরস্কের ব্যাপারে ব্রিটিশ যত ওয়াদা করেছিল তার কোনো ওয়াদাই পালিত হয় নি। এই হতাশা হতেই হিজরত আন্দোলনের শুরু হয়। এই সময়ে আফগানিস্তানের বাদশাহ্ আমানুল্লা ঘোষণা করলেন যে যাঁরা ভারতবর্ষ হতে হিজরত করবেন আফগানিস্তানে তাঁদের স্বাগত জানানো হবে। বাদশাহের মনে ধারণা জন্মেছিল যে বড় বড় মগজওয়ালা লোকেরা হিজরত করবেন। তাঁর দেশে মগজওয়ালা লোকের দরকার ছিল।
আমরা দু'ভাই স্থির করে ফেললাম, আর বাড়ী ফেরা নয়, - দিল্লী হতেই আমরা আফগানিস্তানের দিকে রওয়ানা হয়ে যাব। কন্ফারেন্সে মালিক লাল মুহম্মদ নামে গুজরানওয়ালার একজনের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়। তিনি বললেন, আমাদের যাওয়ার সব ব্যবস্থা তিনি করে দিবেন। প্রথমে আমরা তাঁর সঙ্গে তাঁর বাড়ী গেলাম। পেশোয়ারের একজনের নামে একখানা পত্র দিয়ে তিনি আমাদের বিদায় দিলেন। কিন্তু পেশোয়ারে পৌঁছে ওই ঠিকানায় ওই নামের কোনও লোকের পাত্তাই পাওয়া গেল না। ওই নামের কোনও লোক ওখানে কোনও সময়ে ছিলেন বলেও স্থানীয় লোকেরা খবর দিতে পারলেন না। সৌভাগ্যক্রমে হাজী জান মুহম্মদ নামে একজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়ে যায়। তিনি আমাদের সব রকমের সাহায্য করলেন। পথঘাট সম্বন্ধেও উপদেশ দিলেন। আমরা আবার রওয়ানা হলাম। জমরুদে পৌঁছানোর পরে ব্রিটিশ সরকারের তহ্সীলদার আমাদের নানান রকমের প্রশ্ন করলেন। আমার বড় ভাই কবীর আহ্মদ যখন জানালেন যে তিনি ভোপাল রাজ্য সরকারের একজন কর্মচারী তখন তাঁকে আর যেতে দেওয়া হল না। আমায় এগিয়ে যাওয়ার হুকুম তিনি দিলেন। একলাই যাত্রা করলাম আমি। আমার পকেটে তখন মাত্র ছয় টাকা ছিল। পায়ে হেঁটেই যাচ্ছিলাম। লান্ডিকোটাল হয়ে প্রথম আফগান এলাকা ডাক্কায় পৌঁছাই। এখানে কোনও রকম বাধার সম্মুখীন আমায় হতে হল না। এগিয়ে গেলাম জালালাবাদের পথে। জেনারেল নাদির খান তখন জালালাবাদের ভার নিয়ে ছিলেন। [পরে তিনি বাচ্চা-ই-সক্কাকে পরাজিত ক'রে আফগানিস্তানের বাদশাহ্ হয়েছিলেন। তাঁর পুত্র মুহম্মদ জহীর শাহ্ এখন আফগানিস্তানের বাদশাহ্।] জালালাবাদে পৌঁছানোর পরে জেনারেল নাদির খানের সঙ্গে আমি সাক্ষাৎ করলাম। তিনি আমার খাওয়া ও বিশ্রামের ব্যবস্থা ক'রে দিলেন। পরে যখন কাবুলের পথে রওয়ানা হলাম তিনি আমার জন্যে ঘোড়ারও ব্যবস্থা ক’রে দিলেন।
কাবুলে
মে মাস ছিল। একদিন অপরাহ্ণ চারটার সময় আমি কাবুলে পৌঁছে গেলাম। আমি যে কাবুলের পথে রওয়ানা হয়েছিলাম এ খবর নিশ্চয়ই বাদশাহ্ আমানুল্লার জানা ছিল। আমার কাবুলে পৌঁছানোর পরক্ষণেই তাঁর সামনে আমায় হাজির করা হল। বেশী কিছু কথা হল না। হিজরতকারীদের ভিতরে আমিই প্রথম কাবুলে পৌঁছেছিলাম। আমার মনে হয় কি ধরনের লোক আফগানিস্তানে আসছেন তিনি তা বুঝতে চেয়েছিলেন। যাক, আমার জন্যে সব ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্যে তিনি হুকুম দিলেন।
সে দিনই সন্ধ্যার পরে আরও চার জন কাবুলে পৌঁছে গেলেন। সকলেই শিক্ষিত যুবক। তাঁদের নাম ১) মুহম্মদ আকবর খান; তিনি ছিলেন উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের হাজারা জিলার বাশিন্দা, পেশাওয়ার ইস্লামীয়া কলেজে বি. এ. পড়ছিলেন। ২) গওহর রহমান খান; হাজারা জিলার হরিপুরের নিকটবর্তী দরবেশ গ্রামের বাশিন্দা। ৩) সুলতান মাহ্মুদ; হাজারা জিলার হরিপুরের বাশিন্দা । ৪) মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহ্; পেশাওর জিলার নৌ-শহ্রার বাশিন্দা। এই চার জন বন্ধুকেও বাদশাহের সামনে হাজির করা হয়েছিল কিনা তা আমি জানতে চাইনি। আমি ছিলাম ভোপাল রাজ্যের লোক, আর তাঁরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের। ঘনিষ্ঠতা হতে সময় লেগেছিল। শুরুর দিকে আমরা খানিকটা ষড়যন্ত্রকারীর পদ্ধতি মেনে চলতাম। কার মনে কী আছে, কে জানে?
আমাদের ক'জনের নির্বিঘ্নে কাবুলে পৌঁছানোর খবর ভারতের কাগজে ছাপা হতেই দেশ হতে দলে দলে লোক আফগানিস্তানের দিকে রওয়ানা হলেন। তাঁদের অনেকে ডাককা পৌঁছেছেন এই খবর পেয়েই আফগান সরকার আমাদের জব্লুস্ সিরাজে পাঠিয়ে দিলেন,- বললেন, নূতন লোকদের জন্যে জায়গা চাই। জব্লুস্ সিরাজ কাবুল হতে ক'মাইল দূরে তা জানিনে, তবে হেঁটে যেতে প্রায় দুদিন লাগে। একটি কথা বলতে ভুলে গেছি। কাবুলে কয়েক জন নির্বাসিত ভারতীয়ের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছিল। তাঁরা আমাদের চা খেতে নিমন্ত্রণও করেছিলেন। এই নির্বাসিতদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ওবায়দুল্লা সিন্ধী ও আরও কয়েক জন। তা ছাড়া ছিলেন আবদুর রব পেশোয়ারী ও ত্রিমূল আচারিয়া (আচার্য)। আবদুর রব আমাদের রুশ দেশে যাওয়ার জন্যে বিশেষভাবে উপদেশ দিলেন। বললেন, সেদেশে বিপ্লব হয়ে গেছে, ক্ষমতা দখল করেছে শ্রমজীবী জনগণ। আমরা সেদেশে গেলে অনেক কিছু দেখতে ও শিখতে পারব। আমরা ক'জন তো তখনই রাজী হয়ে গেলাম। সেই থেকে আমাদের ক'জনের চিন্তা হয়ে দাঁড়াল কখন আমরা সেই বিপ্লবের দেশে পৌঁছাব।
হিজরতকারীদের ভিতরে নানান ধরনের লোক ছিলেন। বেশ কিছু লোক তো সত্য সত্যই ধর্মোন্মাদনার বশে দেশত্যাগ করেছিলেন। তাঁরা প্রচারকারীদের প্রচারে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। যুবকদের ভিতরে বেশীরভাগ ভেবেছিলেন ইংরেজরা যখন ওয়াদা রাখলেন না তখন তাঁরাই আফগানিস্তানের ভিতর দিয়ে তুর্কিতে গিয়ে তুর্কির হয়ে লড়াই করবেন। আর অল্প সংখ্যক যুবকের চিন্তায় ছিল যে তাঁরা দেশের বাইরে চলে গিয়ে বাইরে থেকে পন্থা বা’র করবেন কী করে ভারতে ইংরেজের ওপরে আঘাত হানা যায়। হিজরতকারীদের সঙ্গ নেওয়া ছিল তাদের পক্ষে পরম সুযোগ ।
ক্রমে জব্লুস্ সিরাজে ১৮০ জন হিজরতকারী জমায়েৎ হলেন। আবদুর রব আফগান সরকারের নিকট হতে অনুমতি চেয়েছিলেন যে কয়েক জন হিজরতকারীকে সঙ্গে নিয়ে তিনি সোবিয়েৎ দেশে যেতে চান। সেই অনুমতি পাওয়া গেল না। অবশ্য, আবদুর রব ও তাঁর সাথীদের যাওয়ার পথে কোনও বাধা ছিল না। এদিকে জব্লুস্ সিরাজে আমাদের ভিতরে একটি আলোচনা শুরু হয়ে গেল। সেই আলোচনা এই ধরনেরঃ বাদশাহ্ আমানুল্লা লড়াই করার কোনও সুযোগ আমাদের দিবেন না। আমাদের আফগানিস্তানে আসার সুযোগ নিয়ে তিনি ভারতের ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের ওপরে একটি চাপ সৃষ্টি করতে চান মাত্র। তাঁর উদ্দেশ্য, খুব ভালো শর্তে ইংরেজের সহিত সন্ধি করে নেওয়া। ১৯১৯ সালের আফগান যুদ্ধের পরে এই সময়ে মসৌরিতে সন্ধির শর্ত নিয়ে আলোচনা চলেছিল।
জব্লুস্ সিরাজে আমাদের ভিতরে যে এই জাতীয় আলোচনা চলেছিল সে-খবর আফগান সরকার পেয়ে গিয়েছিলেন। তাই, এরপরে ওখানে লোক পাঠানো সরকার বন্ধ করে দিলেন। আমরা কয়েকজন সোবিয়েৎ দেশে যাওয়ার জন্যে বিচলিত হয়ে উঠেছিলাম। আমাদের সম্বন্ধে আবদুর রবের দরখাস্ত আফগান সরকার না-মঞ্জুর করেছিলেন। এই কারণে অন্যদের সঙ্গে আমরাও বাদশাহের নিকটে দরখাস্ত করলাম যে আমাদের অবিলম্বে আনাতোলিয়া (তুরস্কে) যেতে দেওয়া হোক। আমাদের দরখাস্ত নিয়ে গড়িমসি করা হচ্ছিল। তখন আমরা লিখলাম বাদশাহ্ যদি আমাদের অনুমতি না দেন তবে আমরা বিনা-অনুমতিতেই রওয়ানা হয়ে যাব। রাস্তার পাশে তোপ বসিয়ে আমাদের ভয় দেখানো হল। কিন্তু আমরা কিছুতেই বাগ মানলাম না। শেষ পর্যন্ত আমরা যাওয়ার অনুমতি পেলাম ।
তির্মিজের পথে
জব্লুস্ সিরাজে যে আমরা ২৮০ জন হিজরতকারী ছিলাম তাকে দু'টি কাফেলায় (যাত্রীদলে) ভাগ করা হল। প্রথম কাফেলায় ছিলাম আমরা ৮০ জন। হাজরা জিলার মুহম্মদ আকবর খান আমাদের নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁর নাম আমি আগে উল্লেখ করেছি। দ্বিতীয় কাফেলায় শেষ পর্যন্ত ক'জন ছিলেন তা জানিনে, তবে তার নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন পেশোয়ারের মুহম্মদ আকবর জান। তিনি লোক তেমন ভালো ছিলেন না। যা’ক, আমাদের কাফেলার নেতা মুহম্মদ আকবর খানের অধিনায়কত্বে আমরা ৮০ জন একদিন রওয়ানা হলাম। আমাদের মধ্যে মীর আবদুল মজীদ, ফিরোজুদ্দীন মনসুর, শওকত উস্মানী, মস্উদ আলী শাহ্, গওহর রহমান খান, মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহ্, আবদুল কাদির সেহ্রাই, ফেদা আলী ও গোলাম মুহম্মদ প্রভৃতি ছিলেন। পথের একটি ঘটনার কথা এখানে বলব। মজার-ই-শরীফে পৌঁছে একদিন রাত্রে আমরা একটা সরাইতে ছিলাম। সেই সময়ে একজন তুর্কি এসে আমাদের নিকটে প্রস্তাব করেন যে তিনিও আমাদের কাফেলার সঙ্গে যেতে চান। সেদিন আমাদের সঙ্গের সরফরাজ নামক একজনকে পাওয়া যাচ্ছিল না। তার জায়গায় এই তুর্কিকেই সরফরাজ নাম দিয়ে আমরা সঙ্গে নিয়ে নিলাম। তাঁকে সঙ্গে নেওয়াতে যে আমাদের উপকার হয়েছিল সে-কথা পরে বলা হবে। তাঁকে আমরা আমাদের মতো পোশাকও পরিয়ে দিয়েছিলাম। তিনি তাঁর নিজের সম্বন্ধে যা বলেছিলেন তা হচ্ছে এইঃ তিনি এক সময়ে তুরষ্কের সৈন্য ছিলেন। জারের আমলে কখন কীভাবে রুশ এলাকায় ধরা পড়ে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হন। বিপ্লবের পরে তিনি মুক্তি পান। তবে তুরস্কে ফিরে যেতে তখন তাঁর সাহসে কুলায় নি, কিংবা যাওয়ার সুযোগ পাননি। তারপরে তিনি আফগানিস্তানের মজার-ই-শরীফে এসে থাকছিলেন। তুর্কি তাঁর মাতৃভাষা। দীর্ঘকাল সাইবেরিয়ায় থাকার কারণে রুশ ভাষাও তিনি শিখেছিলেন, আর আফগানিস্তানে বাস করে পারসী ভাষাও আয়ত্ত করে নিয়েছিলেন।
হিন্দুকুশ অতিক্রম করা কিছু সুখের পথচলা নয়। যদি প্রতিদিনের ডায়েরী লিখে রাখতাম তবে বিস্তৃতভাবে বলতে পারতাম কী দুঃখের পথ তা ছিল। তখনও স্থানে স্থানে বরফ গলে নি। ঠান্ডা ছিল খুবই। হিন্দুকুশের মতো পাহাড়ের পথের দুর্গমতা সহজেই অনুমেয়। এই পথেরও একদিন শেষ হল। আমরা নীচে নামলাম। আমুদরিয়া সেখানে পাহাড় হতে নেমে খুবই চওড়া হয়েছে। পার হতে পারলেই তির্মিজ— সোবিয়েৎ দেশের এলাকা। অনেক বালি ও কাদা ডিঙিয়ে আমরা নৌকায় নদী পার হলাম। আমাদের অনেকের জুতো হারাল, অনেকের ছিঁড়ল পরনের পায়জামা। জারের আমলে মধ্য এশিয়ার শহরগুলি দুটি এলাকায় বিভক্ত ছিল— রুশীয় এলাকা ও দেশীয় এলাকা। তির্মিজের দুর্গ ছিল রুশীয় এলাকায়। আমরা দেশীয় এলাকায় একটি সরাইতে গিয়ে উঠলাম। আমাদের পৌঁছানোর খবর পেয়ে দুর্গ হতে দু'জন এলেন, তার মধ্যে একজন ছিলেন অনুবাদক। রুশ ভাষার কথা আমাদের পারসীতে বোঝানো হচ্ছিল। আমাদের জন্যে ব্যবস্থা হচ্ছে, তখন আমরা যেন ওখানেই থাকি, এই কথা জানিয়ে তাঁরা চলে গেলেন। তার কিছু সময় পরে ব্যান্ড বাজিয়ে দুর্গ হতে লাল সৈনিক ও অফিসাররা আমাদের স্বাগত জানাতে এলেন। তাঁরা আমাদের সঙ্গে করে দুর্গে নিয়ে গেলেন, ধরে নিয়েছিলেন যে আমরা ভারতীয় বিপ্লবী। যতটা মনে পড়ে সময়টা ১৯২০ সালের জুলাই মাস ছিল। হিন্দুকুশ অতিক্রম করতে গিয়ে আমাদের শরীরে বড় ক্লান্তি এসেছিল। তির্মিজের দুর্গে কয়েকদিন বিশ্রাম করে আমরা এই ক্লান্তি দূর করলাম। তারপরে আমরা এগিয়ে যাওয়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠি। দুর্গাধ্যক্ষ বললেন, স্টীমার আসার পরে আমরা যেন নাই। তিনি আমাদের বিপ্লবের পরের সোবিয়েৎ দেশ দেখার জন্যেও অনুরোধ করলেন। স্টীমার কোন দিন যে এসে পৌঁছুবে তা তিনি বলতে পারলেন না। আমাদের সঙ্গীরা আর বেশী দিন অপেক্ষা করতে চাইছিলেন না। তাঁদের বেশির ভাগই আনাতোলিয়ায় গিয়ে তুর্কির হয়ে লড়াই করার জন্যে উদ্গ্রীব ছিলেন।
প্রথম প্রকাশ— পরিচয়, ভাদ্র-আশ্বিন, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ; সেপ্টেম্বর, ১৯৬০। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর, ১৯৬১ তে সুরেন দত্ত কর্তৃক কলকাতার ন্যাশনাল বুক এজেন্সি মারফত প্রকাশিত মুজফ্ফর আহ্মদের প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন বইটিতে এই লেখাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। লেখার মূল বানান এখানে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেবল ‘কি’ এবং ‘কী’ এই দুটি ক্ষেত্রেই সম্পাদনা করা হয়েছে। লেখার সাথে ব্যবহৃত ছবিটি [পেশোয়ার থেকে কাবুলের পথে মুহাজিররা (১৯২০)]- vikalp.ind.in (https://vikalp.ind.in/2020/07/the-muhajir-exodus-of-1920-remembering-the-largest-voluntary-migration-from-colonial-india/) -থেকে নেওয়া হয়েছে –মার্কসবাদী পথ
প্রকাশের তারিখ: ১৬-অক্টোবর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
