সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
রফীক আহ্মদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত (তৃতীয় পর্ব)
মুজফ্ফর আহ্মদ
একদিন আমরা দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার পরে আবার আমরা দেশে ফেরার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে উঠলাম। কারণ, দেশেই তো আমাদের কাজ করতে হবে । দেশে পাঠানোর কথা স্থিরও হয়ে গেল।

মস্কোর ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে
যতটা মনে পড়ে ১৯২১ সালের মে মাস ছিল। তাসকন্দের মিলিটারি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে আমরা মস্কো চলে গেলাম । প্রাচ্য দেশের লোকদের মার্কস্বাদ-লেনিনবাদ শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে মস্কোতে ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি সবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আমরা তাতে ভর্তি হলাম । আমাদের শিক্ষাও আরম্ভ হল। কিছুদিনের ভিতরে আমরা অনেকেই পার্টিতে যোগ দিলাম । মস্কো যাওয়ার পরে প্রথমে শওকৎ উস্মানী পার্টিতে যোগ দিলেন। তার পরে এক সঙ্গে পার্টিতে যোগ দিলেন গওহর রহমান খান, মিঞা মুহম্মদ আকবর সাহ ও সুলতান মাহ্মুদ । তারও পরে মীর আবদুল মজীদ, ফিরোজুদ্দীন মন্সুর ও ফিদা আলী জাহিদ পার্টিতে এলেন। তাঁদের অনুসরণ করলেন রফীক আহ্মদ ও হবীব আহমদ নসীম। তার কিছু পরে পার্টিতে এলেন ফজলে ইলাহী কুরবান ও আবদুল্লা সফদর । আবদুল কাদির সেহরাইয়ের নাম পার্টি সভ্য হওয়ার জন্যে গওহর রহমান খান ও মিঞা আকবর শাহ্ সুপারিশ করেছিলেন, কিন্তু শওকত উস্মানী ও মস্উদ আলী শাহের তীব্র বিরোধিতায় প্রথমে তাকে মেম্বর করা হল না । মস্উদ আলী শাহ্, তাসকন্দেই পার্টিতে যোগ দিয়েছিল। কিছু দিন পরে অবশ্য আবদুল কাদির পার্টি মেম্বর হতে পেরেছিল। আবদুল কাইয়ুমও পার্টি সভ্য হওয়ার জন্যে দরখাস্ত করেছিল, কিন্তু তার নাম কেউ সুপারিশ করে নি । জাকারিয়া আগে হতে পার্টি সভ্য ছিলেন। তিনিও ওই সময়ে মস্কোতে ছিলেন । ১৯১৫ সালে লাহোরে কলেজে অধ্যয়নরত ১৫ জন ছাত্র উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের বাইরে চলে যান ৷ মুহম্মদ আলী ও জাকারিয়া তাঁদের ভিতরে ছিলেন। মুহম্মদ আলীও কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে আমার কোনও যোগ হয় নি। শুনেছিলাম জাকারিয়া পরে ইউরোপের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ডক্টরেট্ পেয়েছিলেন। আজ তিনি কোথায়, বেঁচে আছেন কিনা, আমি তার কিছুই জানি না ।
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি
আগে হতে কয়েক জন ভারতীয় সোবিয়েৎ দেশে থাকার সময়ে নিজেদের কমিউনিস্ট ব’লে ঘোষণা করেছিলেন। হিজরতকারীদের ভিতরে মস্কোর ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে প্রবেশ ও শিক্ষালাভের পরে কয়েক জন যে পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন সে কথা ওপরে বলেছি। এই সকল সভ্য একত্র হয়ে ১৯২১ সালে মস্কোতে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করলেন । সত্য কথা বলতে গেলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তাসকন্দেই ১৯২০ সালের শেষে প্রথম গঠিত হয়েছিল যদিও আমরা কয়েকজন তখন পার্টিতে যোগ দিইনি। প্রবাসেই আমরা পার্টি গঠন করলাম, কারণ আমরা বুঝেছিলাম যে তার প্রয়োজন আছে। [ ১৯২১ সালে ভারতেও কমিউনিস্ট পার্টি গড়ার চেষ্টা শুরু হয়েছিল । ] আমি বাঙলা ভাষা জানি না । জানতে পারলাম ডক্টর ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত বাঙলায় একখানা পুস্তক লিখেছেন । তাতে নাকি তিনি হিজরতকারী যুবকদের নিয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বনিয়াদ পত্তন করার জন্যে খুব কুপিত হয়েছেন। পার্টি নাকি ডক্টর দত্তের মতো পুরনো ‘বিপ্লবী’দের নিয়েই গড়া উচিত ছিল। ডক্টর দত্তরা কমিউনিস্ট মতবাদ গ্রহণ করে থাকলে তাঁদের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়াই তো উচিত ছিল। তাঁরা তা করলেন না কেন ? আমাদের উপস্থিতিতেই তাঁরা মস্কো গিয়েছিলেন। বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের ব্যবহার খুব মিষ্ট ছিল। তার ওপরে তিনি ভালো উর্দু জানতেন ৷ এই জন্য আমি তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছি। তখন তাঁর মত শুনে আমার এই বিশ্বাস হয়েছিল যে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে মস্কো আসেন নি। ডক্টর দত্ত যাই বলুন না কেন, আমরা কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদ অর্জন করেছিলাম, পার্টির সভ্যপদ আমরা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিই নি । দুনিয়ার মজুরশ্রেণীর প্রথম রাষ্ট্রের পক্ষ নিয়ে আমরাই অস্ত্রধারণ করেছিলাম । এটা ডক্টর দত্তের মনে রাখা উচিত ছিল।
মস্কোতে ভারতের প্রবাসী কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হওয়ার পরে তা কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। মুহম্মদ শফীক হয়েছিলেন পার্টির প্রথম সেক্রেটারী। মানবেন্দ্রনাথ রায়, শফীক ও অবনী মুখার্জিকে নিয়ে পার্টির একটি ওয়ার্কিং কমিটিও গঠিত হয়েছিল। মস্কোতে ভারতের প্রবাসী কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হওয়ার ফলেই রায় ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে পারলেন। তা না হলে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের ভিতরেই তিনি শুধু একজন নেতা হয়ে থাকতেন, ভারতের বিশেষ প্রতিনিধিত্ব পেতেন না ৷
একদিন আমরা দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেওয়ার পরে আবার আমরা দেশে ফেরার জন্যে উদ্গ্রীব হয়ে উঠলাম। কারণ, দেশেই তো আমাদের কাজ করতে হবে । দেশে পাঠানোর কথা স্থিরও হয়ে গেল। আমাদের বলা হল আমরা প্রত্যেকেই যেন একজন সাথী বেছে নিই। এক সঙ্গে দুজন পাঠানোই প্রথমে ঠিক ছিল। শওকত উসমানী সাথী বেছে নিলেন মসউদ আলী শাহ্ কে, আর গওহর রহমান খানের সাথী হলেন মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহ্। আবদুল মজীদ সাথী করে নিলেন ফিরোজুদ্দীনকে, আর আমার সাথী হলেন হবীব আহ্মদ । প্রথমে গেলেন শওকৎ উসমানী আর মস্উদ আলী শাহ্, তারপরে গওহর রহমান খান ও মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহ্ । এঁদের দু'পক্ষই বোধ হয় ইরানের ভিতর দিয়ে পথ পেয়ে গিয়েছিলেন। মীর আবদুল মজীদ ও ফিরোজুদ্দীন মন্সুর ইরানের রাস্তা ধরার জন্যে আজরবাইজান পর্যন্ত গিয়েছিলেন। কিন্তু কোনও খোলাসা পথ না পেয়ে তাঁদের আবার মস্কোতে ফিরে আসতে হল।
যে-পথে আমরা এসেছিলাম সে-পথে ফেরার সুবিধা ছিল না । কিন্তু দেশে ফিরতে তো আমাদের হবেই। একটি দুরতিক্রম্য পথের কথাই তখন শুধু আমরা চিন্তা করতে পারছিলাম—পামীরের পথ। আজকার পামীর নয়, ১৯২২ সালের পামীর।
পামীরের পথে
আমরা জীবনের কঠোরতম অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলাম । ১৯২২ সালের মার্চ মাসের শেষভাগে এক দিন আমরা মস্কো ছাড়লাম । আমরা যারা সহযাত্রী ছিলাম তাঁদের নাম নীচে দেওয়া হল :
১। মীর আবদুল মজীদ ২।রফীক আহমদ
৩। ফিরোজুদ্দীন মনসুর ৪। হবীব আহমদ নসীম
৫। সুলতান মাহমুদ ৬। ফেদা আলী জাহিদ
৭। আবদুল কাদির সেহরাই ৮। সঈদ
৯। আবদুল হামীদ ১০। নিজামুদ্দীন
ফজলে ইলাহী কুরবান ও আবদুল্লা সফদরেরও আমাদের সঙ্গে রওয়ানা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা আসেন নি। সঈদ, আবদুল হামীদ ও নিজামুদ্দীন কখনও কমিউনিস্ট পর্টির সভ্য হন নি । আবদুল হামীদ—মাস্টার আবদুল হামীদ নামে খ্যাত ছিলেন। কারণ, তিনি কাবুলে উর্দু পড়াতেন। আমাদের সব ব্যবস্থা করার ভার সোবিয়েৎ দেশের কমিউনিস্ট পার্টির ওপরে ছিল । প্রথমে রেলপথে এক ছুটে আমরা তাসকন্দ গেলাম। সেখানে পৌঁছে আমরা পরের যাত্রা-পথের খবরের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। খবর পেলেই বের হয়ে পড়ব।
রুশীয় বন্ধুরা বললেন তাঁরা খবর পেয়েছেন মরগেলান হতে লালফৌজ পামীরের দিকে যাবেন । তাঁদের সঙ্গে যদি আমাদের পাঠানো যায় তবে আমাদের পক্ষে সুবিধা হবে। যখন খবর পাওয়া গেল, অমুক তারিখে লালফৌজ রওয়ানা হবেন তখন আমাদের ট্রেন যোগে মরগেলান পাঠানো হল। আমরা মরগেলান পৌঁছানোর পরে একজন রুশীয় বন্ধু আমাদের সঙ্গে চললেন। সৈন্যরা ওখান হতে ট্রেনে ওসের পথে যাত্রা করলেন । আমরাও ওই ট্রেনেই গেলাম। ওসের পরে আর কোনও ট্রেন নেই। রসদ ও ভারবাহী পশু জোগাড় করার জন্যে ওখানে সৈন্যদের কয়েক দিন থাকতে হবে। মরগেলানে আমাদের মিলিটারি কমিসারের হাতে সোপর্দ করে রুশীয় কমরেড আমাদের নিকট হতে বিদায় নিয়েছিলেন। লালফৌজের ভিতরে কমিউনিস্ট পার্টির পুরো সংগঠন ছিল। আসলে তাঁদেরই নজর ছিল আমাদের ওপরে। পশু ও রসদ জোগাড়ের পরে আমরা ওস ছাড়লাম ৷ শুরু হল আমাদের দুঃখের পথ যাত্রা । এই পথের ডায়েরী লেখার অনুমতি আমাদের ছিল না। প্রতি ঘণ্টার ও প্রতি দিনের ডায়েরী যদি আমরা লিখে রাখতে পারতাম তবেই আজ বোঝাতে পারতাম কী ধরনের ছিল সেই পথ, আর কীভাবে আমরা তা অতিক্রম করেছিলাম । আজ সব জায়গার নামও আমি ভুলে গেছি। ওস হতে রওয়ানা হওয়ার সময়ে আমাদের প্রত্যেককে পোস্তিন ( চামড়ার পোশাক ) দেওয়া হয় ৷ পামীরের শীত অসহনীয় । এক জায়গায় আমরা আমুদরিয়া পার হলাম ৷ আমুদরিয়া আমরা একবার পার হয়েছিলাম তির্মিজের কাছে। সেখানে নদী পাহাড় হতে সমতল ভূমিতে নেমেছিল। তারপরে আমুদরিয়ার জলপথে রওয়ানা হয়েই আমরা তুর্কমেনদের কবলে পড়েছিলাম। আবার হাতিয়ার হাতে নিয়ে কির্কিতে আমুদরিয়ার কিনারা আমরা রক্ষা করেছিলাম। আমুদরিয়া আমাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছিল। রওয়ানা হওয়ার পর যে নদী আমরা পার হলাম তা ছিল পাহাড়ের ওপরের আমুদরিয়া। চওড়া কম, কিন্তু খরস্রোতা। জল ঘোড়ার পেট পর্যন্ত ছিল। নদী পার হওয়ার পরে দুদিন আমরা কুবাসায় ছিলাম। তার পরে আবার এগুলাম। মুরগাবে পৌঁছুবার আগে পথের কষ্টে অনেক ঘোড়া মরে গেল । এত বেশী চড়াই পশুগুলি কিছুতেই পারছিল না । আমাদের চিনির কিউব দেওয়া হয়েছিল । শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হলে আমরা তা মুখে রাখতাম। আমাদের ঘোড়া মরে গেলে লালফৌজের সৈন্যরা তাঁদের ঘোড়া আমাদের দিয়ে তাঁরা পায়ে হাঁটতেন । রসদ যাচ্ছিল উটের পিঠে। রসদ খরচ হতে হতে উটের পিঠ খালি হচ্ছিল। আমরা উটের পিঠেও যেতে লাগলাম। ঘোড়াগুলি মরছিলই । শেষ পর্যন্ত সৈন্যদের হেঁটেই চলতে হল। উট যখন মরতে লাগল তখন আমরা এক উটের পিঠে দুজন করে চড়লাম । সমস্ত পশু যখন মরে গেল তখন আমরা হাঁটতে লাগলাম। অবশেষে আমরা খরোগে পৌঁছালাম। এটা ছিল সৈন্যদের যাত্রার শেষ জায়গা। খরোগের উচ্চারণ সম্ভবত হরোগ। রুশরা ‘হ’ কে ‘খ’ উচ্চারণ করেন। হরোগে আমরা আট দিন বিশ্রাম নিলাম। আবার নূতন করে আমাদের ( সৈন্যদের নয় ) যাত্রা শুরু হবে ।
আমরা যাত্রার আয়োজন করতে লাগলাম। যে পোশাক পরে এতদিন পথ চলেছি সে পোশাক আর আমাদের ব্যবহার করা চলবে না। ওখানকার স্থানীয় লোকদের মতো পোশাক-পরিচ্ছদ আমাদের ধারণ করতে হবে। আমাদের পোশাকের বদলে স্থানীয় লোকদের পোশাক জোগাড় করে নেওয়া হল। তারা কম্বলের পায়জামা, কম্বলের কোর্তা, আর কম্বলের ফারগুল ( জোব্বা ) পরে ৷ আমরাও তাই পরলাম । প্রত্যেকটি জিনিস হাজার হাজার উকুনে ভর্তি ছিল। স্থানীয় লোকের মতো টুপিও আমরা মাথায় পরলাম। মুশ্কিল হল জুতো নিয়ে । স্থানীয় লোকদের চামুস নামক জুতোও আমাদের পরতে হল । এই জুতায় ‘সোল্’ নেই । পায়ের তলায় কাঁকর পড়লে প্রাণ বের হয়ে যেতে চায়। স্থানীয় লোকেরা এই জুতো পরতে পারত। তাদের কষ্ট- সহিষ্ণুতা অসীম, পায়ের তলাও শক্ত।
হরোগে আমরা নিজেদের আরও ছোট দলে ভাগ করে নিলাম । এক সঙ্গে এত লোকের ওই পথে যাত্রা করা উচিত নয়। প্রথম দলে আমরা চার জন যাত্রা করলাম। (১) মীর আবদুল মজীদ, (২) ফিরোজুদ্দীন মন্সুর (৩) হবীব আহ্মদ নসীম ও (৪) রফীক আহ্মদ ।
আমরা ওখান হতে যাত্রা ক'রে ইসকাশিম দুর্গের (হরোগের দুর্গের নাম ) নীচে নেমে গেলাম। নীচে গ্রাম ছিল। রাত হয়ে গিয়েছিল। আমরা একটি বাড়ীতে রাত কাটাতে চাইলাম ; বাড়ীর মালিক আমাদের সব ব্যবস্থা তো করে দিল, কিন্তু আমরা শুয়ে পড়ার পরে দুর্গে গিয়ে খবর দিল যে গ্রামে গুপ্তচর এসেছে। দুর্গাধ্যক্ষ কয়েকজন সৈনিক সঙ্গে নিয়ে নিজেই ছুটে এলেন এবং এসেই আমাদের বুকের কাছে রাইফেল উঁচিয়ে ধরলেন। আমরা কথা বলতেই তিনি আমাদের চিনলেন । অনেক উপদেশও তিনি দিলেন। বললেন, “এরা লোক ভাল নয়। এদের জানতে দেওয়া উচিত নয় তোমরা কোনদিকে যাচ্ছ। রাত্রেই তোমরা এখান থেকে চলে যাবে ।” তারপরে তিনি দুর্গে ফিরে গিয়ে একটি বাণ্ডিলে বেঁধে কিছু খাওয়ার জিনিস ও সিগারেট নিজেই এসে আমাদের দিয়ে গেলেন । আমরা সেই রাত্রেই ২ টার সময়ে ওই গ্রাম হতে চলে গেলাম। বহু দূরে সুলায়মান নামক এক ব্যক্তির একটি বড় বাড়ী ছিল । তার চারপাশে কোথাও মানুষের বসতি নেই । তাই লোকেরা ওই জায়গাটিকে ‘জায়ে সুলায়মান' অর্থাৎ সুলায়মানের স্থান বলে। দিনের বেলায় দশটার সময় আমরা তাঁর বাড়ীতে পৌঁছালাম । তাঁর নামে পত্র ছিল। আমরা তাঁর হাতে পত্র দিলাম । ঘরে তখন অন্য লোকেরাও ছিল। পত্র পড়ে সুলায়মান বললেন, “হাঁ, সোগনানে সোনারের ব্যবসা ভাল চলবে। ওখানকার লোকেরা সোনার চায়ও।” উপস্থিত লোকগুলিকে ধোঁকায় ফেলার জন্যে তিনি এই কথা বললেন । তারা চলে যাওয়ার পরে তিনি বিস্তৃতভাবে আমাদের সঙ্গে সব বিষয়ে আলোচনা করলেন। অনেক উপদেশ তিনি আমাদের দিলেন। বললেন, “পথের ধারে দু হাজার হতে চার হাজার ফুট নীচু খাদ থাকতে পারে । একবার তাতে পড়ে গেলে সব কিছু শেষ হয়ে যাবে । কোনও দিন আর কারুর পাত্তা পাওয়া যাবে না ৷ এমনও হতে পারে খাদের পাশে বরফ জমে আছে এবং সেই বরফ কিঞ্চিৎ বেড়ে গেছে খাদের দিকে । তোমরা পথ চলার সময়ে পায়ের চাপে বরফ ভেঙে গেল, আর তোমরা পড়ে গেলে খাদের ভিতরে। এই রকম পথে যখন চলবে তখন হাতের লাঠি দিয়ে জোরে জোরে ঠুকে দেখবে বরফ ভেঙে যাচ্ছে কিনা।” আরও নানান কথা তিনি আমাদের বললেন । দু'দিন আমাদের তাঁর বাড়ীতে রাখলেন । এখানে আমাদের আফগান সীমানায় প্রবেশ করতে হবে। পামীর হতে ভারতের ( এখন পাকিস্তানের ) চিত্রল এলাকায় যেতে হলে কিছুটা আফগান এলাকা পার হতে হয়। ম্যাপে দেখলে মনে হয় ছোট্ট এক ফালি জায়গা মাত্র ৷ কিন্তু এর দুর্গমতার কথা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সীমানা এখানে অদ্ভুত। খরস্রোতা অপ্রশস্ত আমুদরিয়ার এপারে সোবিয়েতের পামীর এলাকা, ওপারে আফগানিস্তান ৷ পিতা হয়তো সোবিয়েৎ এলাকায় থাকে, আর পুত্র থাকে আফগান এলাকায় । তাদের পরস্পর কথাবার্তা চলে, এপার থেকে ওপারে জিনিসপত্র ছুঁড়েও দেওয়া যায় । সুলায়মান আমাদের টাকা বদল করে ভারতীয় টাকা দিলেন। একজন গাইডও দিলেন সঙ্গে, তার জন্যে গাইডকে অবশ্য আমাদের চার পাউণ্ড দিতে হয়েছিল ।
ভারতের পথে
একদিন গভীর রাত্রে উটের পিঠে চড়ে আমরা নদী পার হয়ে আফগান সীমানায় প্রবেশ করলাম । শেষবারের মতো আমুদরিয়া পার হলাম । এবার আমাদের নূতন ক'রে দুঃখের সাধনা শুরু হল । হিন্দুকুশ আমরা অতিক্রম করেছিলাম, অতি উচ্চ পামীরও আমরা অতিক্রম ক’রে এসেছি, কিন্তু এখানকার দুর্গমতার নিকটে সব কিছু ম্লান হয়ে যায় । আমরা গাইডকে অনুসরণ করতাম, কিন্তু সে আমাদের কাছাকাছি না থেকে অনেক দূরে দূরে থাকত। তার সঙ্গে কথাবার্তা বলার আমাদের কোনও সুযোগ হত না। আফগান সীমানায় প্রবেশ করেই আমাদের খাড়া পাহাড়ে চড়তে হল । এই পাহাড়ও ছিল হিন্দুকুশেরই বিস্তৃতি। তার চূড়ায় ছিল স্থায়ী বরফ। তাতে না ছিল গাছ, না ছিল ঘাস। চামুস জুতো কি কষ্ট যে দিচ্ছিল তা কেমন করে বোঝাব! নীচের দিকে আফগানদের দুর্গ ছিল। আমরা পাহাড়ে চড়ার সময়ে কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করে দিল। দুর্গের সৈন্যরা ভাবল নিশ্চয় কিছু লোক যাচ্ছে। তারা দুর্গ হ'তে আলো হাতে বের হয়ে পড়ল ৷ আমরা একটা বড় পাথরের তলায় একটি গুম্ফামতো পেয়ে গেলাম এবং তার ভিতরে ঢুকে নির্জীবের মতো পড়ে থাকলাম । “ওদের বাপেরা পুড়ে মরুক, কোথায় গেল লোকগুলি” একথা বলতে বলতে সৈন্যরা আমাদের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল । “বাপ পুড়ে মরুক” আফগানদের একটা গাল। এইভাবে আমরা পথ চলতে লাগলাম। তুষারপাত শুরু হয়েছিল । তুষারের হাত হতে বাঁচার জন্যে পরের রাত্রিও আর এক গুল্ফায় আমরা কাটালাম। অবিশ্রাম তুষারপাতের জন্যে যখন আর চলতে পারতাম না তখন কম্বলের চার কোণে লাঠি বেঁধে সেই কম্বলের তলায় বসে থেকেছি। কম্বল খুব ভারী হয়ে উঠলে তুষার ঝেড়ে ফেলেছি। এমনও ঘটেছে যে খাড়া পাহাড় হতে নামার কোনও পথ না পেয়ে জিনিস-পত্রগুলি মাথায় বেঁধে পাহাড়ের গায়ে পিঠ লাগিয়ে নিজেদের নীচের দিকে ছেড়ে দিয়েছি । প্রথম গুফায় রাত কাটানোর পরে হবীব আহমদ বলে বসল, “আমি আর কিছুতেই চলতে পারব না। আমায় এখানে ফেলেই তোমরা এগিয়ে যাও। আমার যা হবার তা হোক।” মজীদ আর আমি তার বোঝা নিয়ে নিলাম । বললাম, “তোমায় চলতেই হবে।” আরও কিছু পথ চলার পর মন্সুরও জওয়াব দিয়ে বসল যে সে আর এগুতে পারবে না । তখন তার বোঝাও আমরা দুজনে ( মজীদ ও আমি) ভাগাভাগি করে নিলাম ৷ এক জায়গায় এক খাদের পাশ দিয়ে ওপরে চড়ার সময়ে হবীব আর মন্সুরের কোমরে দড়ি বেঁধে আমরা দুজন তাদের দুজনকে টেনে রাখলাম পাছে না ভারসাম্য হারিয়ে তারা খাদের ভিতরে পড়ে যায়। বাস্তবিক মন্সুর আর হবীবের অবস্থা খুবই শোচনীয় হয়ে পড়েছিল । বরফের ওপর দিয়ে পথ চলার ফলে তাদের পা ফুলেছিল, পায়ের নখগুলি খসে পড়ে গিয়েছিল এবং রক্ত পড়ছিল তাদের পা থেকে। সত্যিই তাদের পক্ষে পথ চলা অসহ্য বেদনাদায়ক হয়ে উঠেছিল ।
আফগান সীমানায় তিন দিন পথ চলার পরে এক সন্ধ্যায় আমরা চিত্রল রাজ্যের সীমানায় প্রবেশ করলাম। এই সীমানার নিকটে কোথাও মানুষের বসতি ছিল না । আমাদের রসদও ফুরিয়ে গিয়েছিল । না খেয়েই আমরা একটি গুম্ফার ভিতরে রাত কাটালাম। সুলায়মানের দেওয়া গাইডের দূর থেকে নজর তো আমাদের ওপর ছিলই । সকাল বেলা সে এসে আমাদের সঙ্গে দেখা করল। তার নিকটে কিছু রসদ ছিল। আমরা একটি ছোট্ট নদী পার হলাম । হবীব আহ্মদ ও ফিরোজুদ্দীনকে কাঁধে বসিয়ে পার করতে হয়েছিল । নদী পার হয়ে আমরা কিছু খড়কুটো ও লকড়ির টুকরো কুড়ালাম । একখানা পাথরের তলায় এই সব দিয়ে আগুন জ্বালানো হল । গাইড তার আটা ভিজিয়ে মেখে নিল। তার পরে রুটি তৈয়ার করে গরম পাথরের ওপর সেঁকা হল। আমরা পাঁচ জনে একত্রে বসে পরম তৃপ্তির সহিত এই রুটি খেলাম। তার পরে গাইড আমাদের নিকট হতে বিদায় নিল। যাওয়ার সময়ে সে এমন ভাব দেখিয়ে চলে গেল যেন আমরা কোনো দিনই তাকে চিনতাম না। আমরা গাইডের নাম জিজ্ঞাসা করি নি, সেও আমাদের নাম জানতে চায় নি। আমাদের যে ব্যাপার ছিল সে ব্যাপারে এই রকম শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়। চিত্রল ভারতবর্ষের ভিতরে একটি দেশীয় রাজ্য ছিল। রাজ্যের নাম চিত্রল, আবার তার রাজধানীর নামও চিত্রল । এই রাজ্যের শাসককে বলা হতো মেহ্তর । পাকিস্তান হওয়ার পরেও বোধ হয় এই একই অবস্থা সেখানে আছে । গাইড চলে যাওয়ার পরে আমরা পদযাত্রা শুরু করলাম। সন্ধ্যার সময়ে একটি গ্রাম পেলাম । পয়সা দিয়ে কিছু খাওয়ার ব্যবস্থা ও রাত্রে থাকার ব্যবস্থা করা হল। কম পক্ষে মন্সুর ও হবীবের জন্যে ঘোড়া বা খচ্চর ভাড়া করার চেষ্টা করলাম, কিন্তু পাওয়া গেল না । সকাল বেলা আবার আমরা চার জন হেঁটেই রওয়ানা হলাম । বেলা হতে একটি গ্রামে পয়সা দিয়ে খেতে চাইলাম । যে লোকটিকে খাওয়ার কথা বললাম সে জানতে চাইল আমরা ‘আশ’ খাব কিনা । আমরা খুশী হয়ে রাজী হলাম। বোখারায় দেখেছি এক রকম পলাওকে ‘আশ’ বলে । কিন্তু খাওয়ার সময় দেখলাম আটা জলে সিদ্ধ করে তাতে নুন মিশিয়ে আমাদের খেতে দিয়েছে । কি আর করা যায় ৷ সন্ধ্যার সময় যে-জায়গায় আমরা পৌঁছুলাম সেটা ছিল আগা খানের শিষ্যদের একটি আস্তানা । আগা খানের এক খলিফা (প্রতিনিধি) ওখানে থাকেন। একটি ফ্রি লঙ্গরখানাও ওখানে চালু আছে ৷ যে-ই আসুক তাকে দু'খানা চাপাতি ও কিছু মাসকলাইয়ের দাল খেতে দেওয়া হয় । তাই খেয়ে ওখানকার অতিথিশালায় আমরা দু'দিন থাকলাম । ফিরোজুদ্দীন মন্সুর আর হবীব আহমদকে নিয়ে আর চলতে পারা যাচ্ছিল না। তাদের পা থেকে রক্ত পড়ছিল। এখানে দু'দিন থাকার পরে আবার আমরা রওয়ানা হলাম । এবার ওদের দু'জনার জন্যে ঘোড়া ভাড়ায় পাওয়া গেল। চিত্রল শহরে যখন পৌঁছালাম তখন সন্ধ্যা হতে চলেছে। লোকেরা মনে করল আমরা ফকীর। কেউ কেউ ডেকে ভিক্ষাও দিলেন । মজীদ আর আমি দোকান থেকে জুতো কিনে পরলাম । মন্সুর আর হবীরের জুতো পরার উপায় ছিল না। তার পরে দোকান থেকে কাপড় কিনে আমরা এক দরজীকে আমাদের জন্যে সাধারণ পাঞ্জাবী পোশাক তৈয়ার করতে দিলাম। কথা হল ভোর হওয়ার আগেই তারা পোশাক তৈয়ার করে আমাদের দেবে । এই পোশাক পরে আমরা দশ জনের সঙ্গে মিশে যাব এবং যে-কোনো দিকে চ'লে যাব, এই ছিল আমাদের মনের ইচ্ছা। রাত্রে হোটেলে কবাব-রুটি খেলাম, আর থাকলাম এক সরাইখানায় ।
একটি কথা বলা হয় নি। চিত্রল রাজ্যে প্রবেশ করার পরে যখন আমরা চিত্রল শহরের দিকে এগুচ্ছিলাম তখন পথে এক দল যাত্রীর সঙ্গে আমাদের দেখা হয় । তাঁরা কোথায় যাচ্ছেন জানতে চাইলে বললেন, তাঁরা হজ করতে যাচ্ছেন। যখন জিজ্ঞাসা করা হল এদিকে কোথায় তাঁরা হজ করবেন? জওয়াব পাওয়া গেল, “মজার-ই-শরীফে” । (আমরা মজার-ই-শরীফ হয়েই তির্মিজে গিয়েছিলাম। জায়গাটা তীর্থস্থান বটে।) বুঝে নিলাম ওখান থেকে মজার-ই-শরীফ যাওয়ার পথ আছে এবং দরকার পড়লে আমরাও এই কথা বলতে পারব ।
আমরা যা ভেবেছিলাম তা কাজে পরিণত হলো না। কি করে জানি না, শহরের কোতোয়াল আমাদের আসার খবর পেয়ে গেল । মনে হয় আমাদের ব্যস্ততা দেখে পাঞ্জাবী দর্জিটা খবর দিয়ে থাকবে। তা না হলে ফকীরের পোশাক পরা লোকেদের খবরের জন্যে কোতোয়াল ব্যস্ত হয় না। অতি ভোরে কোতোয়াল এসে জানিয়ে গেল যে আমরা যেন সরাইখানা ছেড়ে কোথাও না যাই । কিছু বেলা হতে আমাদের মেহ্তরের প্রাইভেট সেক্রেটারির নিকটে হাজির করা হলো। আমরা মজার-ই-শরীফ হতে তীর্থ দর্শন করে আসার কথা বললাম । এই কথাই প্রাইভেট সেক্রেটারি মেহ্তরের নিকটে রিপোর্ট করলেন। মেহ্তর হুকুম দিলেন, প্রত্যেককে একটি করে খেলাত ( জোব্বা ) ও রাহা খরচের জন্যে ৫০ টাকা দেওয়া হোক ৷ এ এ পর্যন্ত সব কিছু আমাদের অনুকূলে ঘটছিল। প্রাইভেট সেক্রেটারির টেবিলে ইংরাজি খবরের কাগজ ছিল । সংযম হারিয়ে হবীব আহ্মদ তাতে চোখ বুলিয়ে নিল। তাতেই প্রাইভেট সেক্রেটারির মনে সন্দেহের উদ্রেক হল। তিনি ব্রিটিশের পলিটিক্যাল এজেন্টের নামে একখানা চিঠি লিখে একজন সিপাহীর হাতে দিলেন, আমাদের বললেন, “এর সঙ্গে গিয়ে একবার পলিটিক্যাল এজেন্টের সঙ্গে দেখা করুন।” বুঝলাম আমাদের যা হবার তা হয়ে গেল ! আমরা পোশাক বদলে দর্জির তৈয়ার করা পোশাক পরে নিলাম। তরপরে পলিটিক্যাল এজেন্টের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম । একজন মুস্লিম ভদ্রলোক পলিটিক্যাল এজেণ্ট ছিলেন। তিনি বাহ্যত ভালো কথাই বললেন । আমাদের বললেন, “এখন শহরে গিয়ে থাকুন ৷ তার পরে যে দিকে খুশী চলে যাবেন । কিন্তু সিপাহী একজন সঙ্গে সঙ্গে চলল। আমরা যে গিরেফ্তার হয়ে গেছি তা বুঝতে আর বাকী থাকল না।
প্রথম প্রকাশ— পরিচয়, ভাদ্র-আশ্বিন, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ; সেপ্টেম্বর, ১৯৬০। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর, ১৯৬১ তে সুরেন দত্ত কর্তৃক কলকাতার ন্যাশনাল বুক এজেন্সি মারফত প্রকাশিত মুজফ্ফর আহ্মদের প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন বইটিতে এই লেখাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। লেখার মূল বানান এখানে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেবল ‘কি’ এবং ‘কী’ এই দুটি ক্ষেত্রেই সম্পাদনা করা হয়েছে। ছবি: কমিউনিস্ট ইউনিভার্সিটি ফর দ্য টয়লার্স অফ দ্য ইস্ট (কেইউটিভি) ছবি ঋণ:https://globalsouthstudies.as.virginia.edu/key-moments/communist-university-toilers-east-kutv –মার্কসবাদী পথ
প্রকাশের তারিখ: ১৮-অক্টোবর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
