সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
রফীক আহ্মদের ভ্রমণ বৃত্তান্ত (শেষ পর্ব)
মুজফ্ফর আহ্মদ
১৯২৩ সালের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কানপুরে শওকৎ উস্মানী, কলকাতায় মুজফ্ফর আহ্মদ ও লাহোরে গোলাম হোসায়ন গিরেফ্তার হন। ভারত গবর্নমেন্ট তাঁদেরও পেশোয়ারের মোকদ্দমায় শামিল করতে চেয়েছিল। শওকৎ উস্মানী আর গোলাম হোসায়নকে তো পেশোয়ার জেলে নিয়েও যাওয়া হয়েছিল।

পেশোয়ার কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা : ১৯২২-১৯২৩
চিত্রলে যাঁর দোকান থেকে আমরা পোশাকের কাপড় কিনেছিলাম তাঁরও নাম ছিল আকবর খান, পেশোয়ারের লোক। তাঁর সঙ্গে আলাপ করে জেনেছিলাম যে তিনি আমাদের মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহের আত্মীয়। তিনি আমাদের খাওয়ার নিমন্ত্রণ করেছিলেন ৷ পলিটিক্যাল এজেন্টের ওখান থেকে ফিরে এসে আমরা তাঁর বাড়ীতেই খেলাম এবং রাত্রেও সেখানেই থাকলাম । সরাইতে আর ফিরে গেলাম না। পরের দিন তাঁর বাড়ী হতেই আমরা পেশোয়ারের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম । সকলের জন্যেই গাধা ভাড়া করা হলো। একজন সিপাহীও সঙ্গে সঙ্গে চলল। পথে প্রত্যেক চৌকিতে সিপাহী বদল হচ্ছিল। এইভাবে চতুর্থ দিনে আমরা দরগাহী পৌঁছলাম। এখান হতে যাত্রা শুরু হবে ট্রেনে। সিপাহী আমাদের থানায় পৌঁছিয়ে দিয়ে চলে গেল। থানাদার বললেন পেশোয়ার হতে আমাদের নেওয়ার জন্যে গার্ড আসবে। ততক্ষণ আমাদের ওই থানাতেই থাকতে হবে ৷ আমাদের সঙ্গে খারাব ব্যবহার তিনি কিছু করলেন না, এদিক-ওদিক বেড়াতে দিলেন, রাত্রে হাজত-ঘরে বন্ধ পর্যন্ত করলেন না ৷ তারপরে পেশোয়ার হতে অনেক সিপাহী আসায় আমরা যাত্রা করলাম ৷ এবারে আমাদের হাতকড়ি পরানো হল । অবশ্য ট্রেন চলার পরে হাতকড়ি খুলে দেওয়া হয়েছিল । সকাল বেলা আমরা রওয়ানা হয়েছিলাম, আর রাত্রি ৮/৯ টার সময়ে আমরা পেশোয়ার পৌঁছালাম । পুলিসের লোকেরা প্রথমেই আমাদের একটি হোটেলে খাওয়াতে নিয়ে গেল ৷ এই হোটেলকে হাজীর হোটেল বলা হত ৷ কাবুলে যাওয়ার সময়ে আমি এই হোটেলে খেয়েছিলাম। হোটেলের মালিক আমায় চিনতে পারলেন। খুব যত্নের সহিত তিনি আমাদের খাওয়ালেন। পুলিসের চোখ ও কান এড়িয়ে তিনি আমাদের প্রত্যেকের প্রত্যেকের বাড়ীর ঠিকানাও নিলেন। পরে জেনেছিলাম যে তিনি আমাদের আসার ও গিরেফ্তার হওয়ার খবর লিখে দিয়েছিলেন।
রাত্রে আমাদের থানার হাজতে বন্ধ ক'রে রাখা হল । পরের দিন সি. আই. ডি'র সুপারিন্টেণ্ডেন্ট আবদুল আজীজের নিকটে আমাদের প্রত্যেককে পৃথকভাবে হাজির করা হলো। প্রত্যেকের তলাশী নেওয়া হল। অবশ্য কারুর নিকটে কিছুই পাওয়া যায় নি। ছোট ছোট কাগজের টুকরায় আমরা ঠিকানা ইত্যাদি যা কিছু আনতে পেরেছিলাম তার সব কিছুই ট্রেনের পায়খানায় গিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। আমাদের একত্রে না রেখে আবদুল আজীজ চার বিভিন্ন থানায় পাঠিয়ে দিলেন ৷ পরের দিন সকালে আবদুল আজীজের বাড়ীতে আমাদের আলাদা আলাদা নিয়ে গিয়ে প্রত্যেকের বিবৃতি নেওয়া হয়। সেদিনই এক জন ইংরেজ পুলিস অফিসারের নিকট আমাদের নিয়ে যাওয়া হয় ৷ তিনি পুলিসের ইন্স্পেক্টর জেনেরেল কিংবা ডেপুটি ইন্স্পেক্টর জেনেরেল ছিলেন ৷ একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সামনেও আমরা সেদিন পেশ হলাম । তিনি আমাদের থানার হাজতে পৃথক পৃথক আবদ্ধ থাকার হুকুম দিলেন ৷ কয়েকদিন আমাদের এভাবেই কাটল, কারুর খবর কেউ জানতাম না ৷ তার পরে এক দিন আমাদের জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হল । এখানেও আমরা দূরে দূরে কুঠরিতে বদ্ধ থাকলাম। রাত দিন কুঠরিতেই বদ্ধ থাকতাম ৷ যে দিন আমি প্রথম জেলে গেলাম তার পরের দিন ভোরে একজন ওয়ার্ডার এসে আমার কুঠরির দুয়ার খুলল । তার সঙ্গে দেখলাম কয়েদীর পোশাকে ডাণ্ডা বেড়ি পরিহিত মুহম্মদ আকবর খান রয়েছেন। তাঁকে ওই অবস্থায় ওখানে দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। তিনি একটি পুটুলির ভিতরে কিছু তামাক, কাগজ ও চকমকি আমাকে দিয়ে ব'লে গেলেন—“আমি এই জেলেই আছি, ঘাবড়িও না।” কে জানত আমাদের কাফেলার নেতা মুহম্মদ আকবর খানকে জেলেও আমাদের সুখ-সুবিধার দিকে নজর রাখতে হবে । কি ভাবে তাঁকে জেলে আসতে হয়েছিল সে কথা পরে বলব । যতদিন আমি কুঠরিতে আবদ্ধ থেকেছি ততদিন কেউ না কেউ পেছনের ভেন্টিলেটরের ভিতর দিয়ে আমায় তামাক ছুঁড়ে মেরেছে। অন্য বন্ধুদের বেলায়ও তাই ঘটেছে। মুহম্মদ আকবর খানের ব্যবস্থা ! দু'মাস আমরা আঁধার কুঠরিতে কাটালাম। ইতোমধ্যে পেছনের লোকেরা পৌঁছে গিয়েছিল। আমাদের গিরেফ্তারের পরে তাদের গিরেফ্তার করা সহজ ছিল। ফৌজদারি দণ্ডবিধি আইনের ( ইণ্ডিয়ান পেনাল কোডের ) ১২১-এ ধারা অনুসারে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হতে যাচ্ছিল। রাজ-সম্রাটকে (King-Emperor) ভারতের আধিপত্য (Sovereignty) হতে বঞ্চিত করার জন্যে ষড়যন্ত্র করা ছিল আইনের এই ধারার অপরাধ । এই ধারায় ও আরও কয়েকটি ধারায় কারুর বিরুদ্ধে মোকদ্দমা চালাতে হলে প্রাদেশিক কিংবা কেন্দ্রীয় সরকারের নিকট হতে আগে মঞ্জুরী নিতে হত। মোকদ্দমার বিচার দায়রা আদালতে হতেই হবে, ম্যাজিস্ট্রেটের কাজ অনুসন্ধান করা । আমাদের মোকদ্দমায় পেছনের লোকদের এসে পৌঁছানোর যেমন দরকার ছিল তেমনই দরকার ছিল মোকদ্দমা রুজু করার জন্যে ভারত সরকারের মঞ্জুরী গ্রহণ করা । এই দু'টি কাজ সম্পন্ন হওয়ার পরে যেদিন আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করানো হল সেদিন আমরা ম্যাজিস্ট্রেটকে অনুরোধ করলাম যে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুবিধার জন্যে জেলে আমাদের এক সঙ্গে রাখা হোক । ম্যজিস্ট্রেট আমাদের অনুরোধ মেনে নিয়ে হুকুম পাস করলেন। সেদিন থেকে জেলে আমাদের একত্রে রাখার ব্যবস্থা করা হলো। এর তারিখটা আমার ঠিক মনে নেই। তবে যতটা মনে পড়ে তা ১৯২৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শুরু ছিল ।
যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হল : ১। মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহ্, ( নৌশহরা, পেশোয়ারের অধিবাসী ), ২। গওহর রহমান খান (হাজারা জিলার হরিপুরের সংলগ্ন দরবেশ গ্রামের অধিবাসী), ৩। মীর আবদুল মজীদ ( লাহোর শহরের বাশিন্দা ), ৪। ফিরোজুদ্দীন মন্সুর (শেখুপুরা শহরের বাশিন্দা), ৫। হবীব আহ্মদ নসীম ( যুক্ত প্রদেশের শাহ্জাহানপুরের বাশিন্দা ), ৬। রফীক আহ্মদ ( ভোপাল রাজ্যের ভোপাল শহরের বাশিন্দা), ৭। সুলতান মাহ্মুদ (হরিপুর, হাজারা ), ৮। আবদুল কাদির সেহ্রাই ( পেশোয়ার ), ৯ । ফিদা আলী জাহিদ ( পেশোয়ার ), ১০। গোলাম মুহম্মদ (হাজারা জিলা )।
প্রথম হতে নবম নম্বরের অভিযুক্তরা ভারতের প্রবাসী কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য ছিল। দশম নম্বরের অভিযুক্ত গোলাম মুহম্মদ বহু পূর্বে তাসকন্দ হতে দেশে ফিরে এসেছিল। সে কখনও কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়নি । ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে মোকদ্দমা আরম্ভ হওয়ার ক'দিন পরে তার নাম আসামীর তালিকায় যোগ করা হয়। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল তাকে রাজসাক্ষী করা। কমিউনিস্টদের ভিতর হতে ফিদা আলী জাহিদ রাজসাক্ষী হয়েছিল।
মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহ্ ও গওহর রহমান খান ভালোয় ভালোয় দেশে ফিরে স্বাধীন উপজাতিদের এলাকায় চলে গিয়েছিল । ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যখানে স্বাধীন উপজাতিদের বসতি ছিল । তারা না ছিল আফগানিস্তানের প্রজা, না ছিল ভারতের। আমরা গিরেফ্তার হওয়ার পরে গওহর রহমান ও আকবর শাহ্ দেশে ফিরে এসে গিরেফ্তার হয় ।
হাঁ, সেই যে হোটেলের মালিক আমাদের বাড়ীর ঠিকানা নিয়েছিলেন সেই অনুসারে সব জায়গায় তিনি পত্রও লিখেছিলেন। বেশীর ভাগ লোকের বাড়ী হতে আত্মীয়রা এসেও গিয়েছিলেন। পেশোয়ার আর হাজারার অভিযুক্তদের আত্মীয়রা তো অমনিতেই খবর পেয়েছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আমরা আত্মপক্ষ সমর্থন করি নি । ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা সরকার পক্ষ কায়দা-কানুনের খেলাফ কিছু করছেন কিনা তার ওপরে নজর রাখার জন্যে একজন উকীল মাত্র নিযুক্ত করা হয়েছিল।
গোলাম মুহম্মদকে আসলে রাজসাক্ষী করার জন্যে মোকদ্দমায় শামিল করা হয়েছিল । কিন্তু আমাদের সঙ্গে থাকার সুবিধার জন্যে সম্ভবত সে নীচের আদালতে আমাদের পক্ষেই সাক্ষ্য দিল ৷ সাক্ষ্য পক্ষেই দিক, আর বিপক্ষেই দিক, একজন আসামী যখন সাক্ষ্য দিচ্ছিল তখন তাকে সঙ্গে রাখা আমাদের উচিত হয় নি। সেশন আদালতে মোকদ্দমা যখন শুরু হল তখন তাকে আমাদের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় । সেশন কোর্টে সে চুটিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিল । ফিদা আলী জাহিদ গোড়া থেকেই আলাদা ছিল। নীচের আদালতে সাক্ষ্য সে আমাদের বিরুদ্ধে দিয়েছিল। কিন্তু দায়রার আদালতে গিয়ে সে তার নীচের আদালতের সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করে ৷ সরকার পক্ষের কি চাল এটা ছিল তা জানি না, তবে এরা দু'জনেই রাজসাক্ষী হিসাবে ক্ষমা ও ছাড়া পেয়েছিল ।
সেশন কোর্টে মোকদ্দমার তদবীর ভালোই হয়েছিল । আমাদের কোনো কোনো বন্ধুর বাড়ীর লোকেরা টাকা খরচ করেছিলেন । বিখ্যাত উর্দু সাহিত্যিক ও আইনজীবী (পরে লাহোর হাইকোর্টের জজ) সার আবদুল কাদির আমাদের পক্ষে এসেছিলেন। শুনেছিলাম তিনি ফিস কম নিয়েছিলেন। আমার মনে হয় তাঁর মতো আইনজীবী আমাদের পক্ষে থাকার ফলে আমাদের সাজা কম হয়েছিল। সেশন কোর্টে দু'জন এসেসর ছিলেন । তাঁরা আমাদের নিরপরাধ বলেছিলেন। তবে, এসেসরদের কথা জজ মানতে বাধ্য নন ।
১৯২৩ সালের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ( দুর্ভাগ্য যে তারিখ মনে নেই ) জজ মোকদ্দমার রায় শোনালেন। রাজসাক্ষী দু'জন তো ছাড়া পেলই, আর ছাড়া গেল পরবর্তী কালে কমিউনিস্টদের শত্রু আবদুল কাদির সেহ্রাই ।
যারা দণ্ডিত হয়েছিল: ১। মিঞা মুহম্মদ আকবর শাহ্ ও ২ । গওহর রহমান খান, প্রত্যেকের দু'বছরের সশ্রম কারাদণ্ড । ৩। মীর আবদুল মজীদ, ৪ । ফিরোজুদ্দীন মনসুর, ৫। রফীক আহ্মদ, ৬। হবীব আহ্মদ নসীম, ও ৭। সুলতান মাহ্মুদ, এই পাঁচ জনের প্রত্যেকের এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড।
এইভাবে ভারতের প্রথম কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমার পরিসমাপ্তি ঘটল । আমরা আমাদের সাজার বিরুদ্ধে আপীল করি নি। [ ১৯২৩ সালের মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কানপুরে শওকৎ উস্মানী, কলকাতায় মুজফ্ফর আহ্মদ ও লাহোরে গোলাম হোসায়ন গিরেফ্তার হন। ভারত গবর্নমেন্ট তাঁদেরও পেশোয়ারের মোকদ্দমায় শামিল করতে চেয়েছিল। শওকৎ উস্মানী আর গোলাম হোসায়নকে তো পেশোয়ার জেলে নিয়েও যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পেশোয়ার ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা তখন শেষ হয় । বোধ হয় সেই জন্যেই এই তিন জনকে ওই মোকদ্দমায় আসামী না করে ১৮১৮ সালের ৩ নম্বর রেগুলেশন অনুসারে বন্দী করা হয় । অবশ্য পরের বছরের মার্চ মাসে তিন জনকেই কানপুর কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল। ক্ষমা চেয়ে গোলাম হোসায়ন ছাড়া পেয়ে যায় । কানপুর মোকদ্দমায় শ্রীপাদ অমৃত ডাঙ্গে আর নলিনী গুপ্তেরও বিচার হয়েছিল। ডাঙ্গেকে মোকদ্দমা শুরু হওয়ার আগে বোম্বেতে গিরেফ্তার করা হয়েছিল। নলিনী গুপ্ত ১৮১৮ সালের তিন নম্বর রেগুলেশন অনুসারে কলকাতার জেলে স্টেট্ প্রিজনার ছিলেন।]
এখন আমাদের ওপরে ব্যবহার সম্বন্ধে কিছু বলি। ম্যাজিস্ট্রেটের কোর্টে মোকদ্দমার অনুসন্ধান আরম্ভ হওয়ার আগে আমাদের বেড়ি পরানো হয় নি। যেদিন এই কোর্টে অনুসন্ধান শুরু হল সেদিনই আমাদের বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হল । সেশন কোর্টে রায় শোনানোর দিন পর্যন্ত এই বেড়ি আর খোলা হয় নি ৷ সাজা হওয়ার দিন আমাদের বেড়ি খুলে দেওয়া হয় । উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে যাদের তিন বছরের সাজা হতো তাদের বেড়ি পরিয়ে দেওয়া হতো । তার কম সাজা হলে বেড়ি পরানো হতো না । কয়েদী হিসাবে আমরা কোনও বিশেষ ব্যবহার পাই নি । সাধারণ মামুলি কয়েদীর ব্যবহার আমরা পেয়েছি। আমাদের সাজার দিনগুলি পেশোয়ার সেন্ট্রাল জেলে কেটেছে। একটি কথা বলা দরকার । ভারতের প্রথম কমিউনিস্ট ষড়যন্ত্র মোকদ্দমা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে চলেছিল। এই প্রদেশটি ব্রিটিশ আমলে একটি নিষিদ্ধ স্থান ছাড়া আর কিছু ছিল না । এই জন্যে আমাদের মোকদ্দমার খবর বিশ্বময় তো দূরের কথা, ভারতময়ও প্রচারিত হয় নি ।
মুহম্মদ আকবর খান
মুহম্মদ আকবর খানের কথা আমি বারে বারে বলেছি । তাসকন্দ পর্যন্ত আমরা একত্রে গিয়েছি। সেখানে তিনি বেশী দিন থাকেন নি, যদিও তিনি আমাদের সঙ্গে মিলিটারি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টিতেও তিনি যোগ দেন নি। ইংরেজের কবল হতে ভারতবর্ষকে স্বাধীন করা ছিল তাঁর জীবনের স্বপ্ন। ধর্মোন্মাদনার বশে কিংবা আনাতোলিয়া গিয়ে তুর্কির হয়ে লড়াই করার জন্যে তিনি ভারত ছাড়েন নি। পার্টির নির্দেশে তিনি গোপনে দেশে ফিরেছিলেন। স্বাধীন উপজাতির এলাকায় একটি প্রেস বসিয়ে তা থেকে ইশ্তেহার ছাপানো ও বিতরণের ব্যবস্থা করা ছিল তাঁর কাজ। প্রেস কিনে তিনি স্বাধীন এলাকায় পাঠাতেও পেরেছিলেন। প্রেসের কিছু জিনিস পাঠাতে বাকী ছিল। এই বাকী জিনিসগুলি পাঠানোর আগে তিনি খবর পান যে তাঁর দেশে ফেরার খবর পুলিস পেয়ে গেছে। বন্ধুরা উপদেশ দিলেন, আপাতত তাঁর স্বাধীন উপজাতীয় এলাকায় গিয়ে কিছুদিন থাকা উচিত। তাই তিনি ডাক্তারের বেশে উপজাতির এলাকায় যাচ্ছিলেন, সীমানায় ধরা পড়ে যান। তাঁর নামেও ইণ্ডিয়ান পেনাল কোডের ১২১-এ ধারা অনুসারে মকদ্দমা চলে। সেশন আদালত তাঁকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন। জেল হতে গোপন পথে তিনি তাঁর একজন সহকর্মীকে একখানা পত্র লিখেছিলেন। সহকর্মীটি নিরাপদে এই পত্র পেয়েও গিয়েছিলেন। পত্রে উপদেশ ছিল যে প্রেসের বাকী জিনিসগুলি যেন স্বাধীন উপজাতীয় এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। দ্বিতীয় উপদেশ ছিল তিনি যে ধরা পড়েছেন সে-খবর যেন সোনালী দাঁতওয়ালাকে পাঠানো হয় । মুহম্মদ আকবর খানের সহকর্মী প্রেসের বাকী জিনিস নিয়ে যখন সীমানা পার হতে যাচ্ছিলেন তখন ধরা পড়েন । তার পরে তাঁর বাড়ী তলাশী হয় । সেখানে মুহম্মদ আকবর খানের গোপন পথে পাঠানো পত্রখানা পুলিস পেয়ে যায় । এই বোকা সহকর্মীটি সযত্নে আকবর খানের পত্র বাড়ীতে রেখে দিয়েছিলেন। এই পত্র পাওয়ার পরে মুহম্মদ আকবর খানের বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১২১-এ ধারা অনুসারে দ্বিতীয় ষড়যন্ত্রের মোকদ্দমা চলে। তাঁর সহকর্মীটিও তাতে অভিযুক্ত হন। পুলিসের মতে সোনালী দাঁতওয়ালা মুহম্মদ আলী ছাড়া আর কেউ নন । মুহম্মদ আলীর কথা আমি আগে বলেছি। দ্বিতীয় মোকদ্দমায় মুহম্মদ আকবর খানের ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়, আর তাঁর সহকর্মীর হয়েছিল ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড । মুহম্মদ আকবর খানের দু'টি সাজা পরে পরে চলেছে। জেল হতে গোপন পথে পাঠানো একখানা পত্রের জন্যে যে কারুর বিরুদ্ধে পেনাল কোডের ১২১-এ ধারা অনুসারে মোকদ্দমা চলতে পারে এটা কেউ কোনো দিন কল্পনাও করতে পারে নি। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সত্যই তা ঘটেছিল।
যাঁরা আনাতোলিয়ায় গেলেন
আনাতোলিয়ায় যাঁরা গিয়েছিলেন শুনেছি তাঁদের যুদ্ধ করতে হয় নি । তাঁদের ভাগ্যে জুটেছিল কারাগার।* অন্তত বেশ কিছু দিন তাঁরা কারাবন্দী ছিলেন। তাঁদের আনাতোলিয়া যাওয়ার আগে মুস্তফা নামে একজন ভারতীয় গুপ্তচর ওই দেশে ধরা পড়ে। এই লোকটি মুস্তফা সগীর নামে কুখ্যাত হয়েছিল। ‘সগীর’ মানে ছোট। অর্থাৎ, মুস্তফা কামাল ছিলেন বড় মুস্তফা। শুনেছি, কিছু কাল পরে এই ভারতীয়দের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল, তাঁরা দেশে ফিরে আসতেও পেরেছিলেন। আশা করি শেষ পর্যন্ত তাঁদের জ্ঞানোদয় হয়েছিল । এই লোকদের মধ্য হতেই কেউ কেউ তুর্কমেনদের হাতে মার খেয়েও তুর্কমেন মৌলবীদের হাতে তাঁদের টাকা তুলে দিয়েছিলেন। আবার তুর্কমেনদের নিকট হতে মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা পেয়ে বেঁচে যাওয়ার পরেও এঁরাই কির্কিতে তুর্কমেনরা মুসলিম ছিল বলে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করলেন না । এসব বুঝেও লালফৌজরা তাদের কত আদর যত্ন ও সাহায্য করেছিলেন !
[*পণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন হিন্দী ভাষায় “নয়ে ভারত কে নয়ে নেতা” নাম দিয়ে একখানা পুস্তক রচনা করেছেন। এই পুস্তকে তিনি ফজলে ইলাহী কুর্বানেরও একটি বিবৃতি ছেপেছেন। আমি যেমন রফীক আহ্মদের মুখে শুনে তাঁর কথা লিখেছি রাহুলজী ও তেমন কুর্বানের মুখে শুনে নিজের ভাষায় কুর্বানের বৃত্তান্ত লিখেছেন। কুর্বান বলছেন, তিনিও চারজও ( রাহুলজীর কথায় চারাজুই ) হতে অন্যদের সঙ্গে তুর্কির পথ ধরেছিলেন। তাঁরা আশ্কাবাদ হয়ে ক্রাসনোদার যান। সেখানে হতে স্বীমার যোগে যান বাকু । এই সময়ে তুরস্কের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে মুস্তফা কামালের অধিনায়কত্বে তুর্কিরা জীবনপণ রেখে গ্রীসের বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন। সোবিয়েৎ তুর্কিদের সব রকমের সাহায্য করছিলেন। বাকুতেই তুর্কি ফৌজ গঠিত হচ্ছিল। সোবিয়েতের তরফ হতে রাশিয়ার বন্দী তুর্কি সৈন্যদের অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করে বাকুতে পাঠানো হতো ৷ তুর্কি অফিসাররা এখানে পল্টন গঠন ক'রে সেই পণ্টনকে স্মার্নায় পাঠিয়ে দিতেন।
মুহাজিররা বাকুতেই তুর্কি সৈন্যদলে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন। তাঁদের কিছু কিছু লোকের নামও লিখে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পল্টনের পর পল্টন স্মার্নায় চলে গেল, মুহাজিররা বাকুতেই পড়ে থাকলেন। তাঁরা যখন বুঝলেন যে তাঁদের বিশ্বাস করা হচ্ছেনা তখন তাঁরা তাসকন্দে ফিরে গেলেন। সেখান হতে এই দলের লোকেরা ভারতে ফিরে যান। ইলাহী কুর্বান তাঁর আগেকার সাথীদের সঙ্গে যোগ দেন। আনাতোলিয়ায় ভারতীয় মুহাজিরদের কারাগারে নিক্ষিপ্ত হওয়ার কথা কুর্বানের বিবৃতির দ্বারা সমর্থিত হচ্ছেনা৷]
প্রথম প্রকাশ— পরিচয়, ভাদ্র-আশ্বিন, ১৩৬৭ বঙ্গাব্দ; সেপ্টেম্বর, ১৯৬০। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বর, ১৯৬১ তে সুরেন দত্ত কর্তৃক কলকাতার ন্যাশনাল বুক এজেন্সি মারফত প্রকাশিত মুজফ্ফর আহ্মদের প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গঠন বইটিতে এই লেখাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। লেখার মূল বানান এখানে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেবল ‘কি’ এবং ‘কী’ এই দুটি ক্ষেত্রেই সম্পাদনা করা হয়েছে। ছবি: পেশোয়ার (১৯২০) ছবি ঋণ: https://vikalp.ind.in/2020/07/the-muhajir-exodus-of-1920-remembering-the-largest-voluntary-migration-from-colonial-india/ –মার্কসবাদী পথ
প্রকাশের তারিখ: ১৯-অক্টোবর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
