Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

এদেশে এমন ইতিহাস কেন লেখা হয় না?

তপন মিশ্র
১৬০০ খ্রিস্টাব্দে আমরা জিওর্দানো ব্রুনো-কে পুড়িয়ে মারার কথা জানি। ১৮১৩ সালে পার্সে বিশে শেলির এক বিখ্যাত কবিতায় (Queen Mab, section VII, lines 1 to 14) জিওর্দানো ব্রুনোর মত একজন নাস্তিকের মর্মান্তিক হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ করেন। এই কবিতার শেষ ছত্রে কবি লিখছেন যে, শিশু শেলী যখন মায়ের হাত ধরে ব্রুনোর হত্যা প্রত্যক্ষ করছিলেন (কাল্পনিক) তখন কান্নায় তাঁর চোখ ভরে যায়। তাঁর মা তাঁকে বলেন  'Weep not, child!' cried my mother, 'for that man: Has said, There is no God’।
Why is this history not written in this country

ইউরোপে বিজ্ঞান চেতনার এবং ধর্মীয় মৌলবাদের সম্মুখ সমরের প্রথম ইতিহাস প্রথম লেখেন ইতিহাসবিদ অ্যান্ড্রু ডিকসন হোয়াইট। বইটির নাম ‘A History of the Warfare of Science with Theology in Christiandom’। এটি প্রকাশিত হয় ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে। প্রকাশনাটির কথা এখানে উল্লেখ করা খুবই দরকার মনে করছি কারণ, আমাদের দেশে ইতিহাসবিদের এই ধরনের ইতিহাস চর্চা বিরল। ১৮৯৭ এবং ১৮৯৮ সালে দুটি খণ্ডে আলোচ্য বইটি প্রকাশিত হয়। হোয়াইট ছিলেন আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং পাশাপাশি একজন বিজ্ঞান গবেষক। তিনি প্রায় ২০ বছর গবেষণার পর বইটি প্রকাশ করেন। বইটিতে মূলত বিজ্ঞানের অগ্রগতির সাথে সাথে খ্রিষ্টান ধর্মগুরুদের সঙ্গে যে সংঘাত (লেখকের ভাষায় "battles") বার বার হয়েছে তার বর্ণনা আছে। লেখক বলছেন এই যুদ্ধ ছিল “অত্যন্ত সঙ্কীর্ণমনা, গোঁড়া ধর্মগুরুদের সঙ্গে সত্যসন্ধানী বিজ্ঞান গবেষকদের”। উনি আরও বলছেন যে, এই ইতিহাসকে অনেক ইতিহাসকার গুরুত্ব দেননি। বইটির প্রেক্ষাপট অবশ্যই ১৮৫৯ এবং ১৮৭১ সালে চার্লস ডারউইনের প্রকাশিত দুটি গবেষণার ফল। প্রথমটি সামগ্রিকভাবে জৈব বিবর্তনের ধারণার সূত্রপাত এবং পরেরটা মানব বিবর্তন সম্পর্কে বৈপ্লবিক এক ব্যাখ্যা।           

হোয়াইটের উদ্যোগে কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূলমন্ত্র ছিল যে, কোনো রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ছায়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে পড়তে দেওয়া যাবে না। কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি বইটির সংক্ষিপ্তসার লিখতে গিয়ে বলছেন “Cornell University was established on the principle that education should not be under the control of political parties or religious sects- an idea greeted at the time with hostile accusations of Darwinism and atheism”। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উদ্যোক্তারা বলছেন যে, শিক্ষা কখনোই রাজনৈতিক বা ধর্মীয় গুরুদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। ডারউইনবাদের বিরোধিতায় আমেরিকায় ধর্মীয় ভাবনার কর্মকাণ্ড এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতে না পড়ে তার চেষ্টা উদ্যোক্তাদের করতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসনে আবদ্ধ মানুষও যুক্তিবাদের আশ্রয় নেয়, গোঁড়ামিতে সম্পৃক্ত না থাকা মানুষ যতই ধর্মীয় আবেগের পাঁকে নিমজ্জিত হোক না কেন যুক্তিবোধের স্বাদ তাকে আহ্বান জানাবেই। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ১২৫ বছরের বেশি সময়ের পর কেন বইটির আলোচনা দরকার পড়ছে তা হয়তো পাঠক সহজেই অনুমান করতে পেরেছেন।

বইটির অধ্যায়ের সংখ্যা কুড়ি। সব কটি অধ্যায় স্থানাভাবে সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা যাবে না। প্রথম অধ্যায়টি (From Creation to Evolution) হল সৃষ্টি তত্ত্ব থেকে বিবর্তনবাদে উত্তরণের ইতিহাস এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে চার্চের বিরোধিতার ঘটনাবলীর বিবরণ রয়েছে। লেখক এই অধ্যায়ে উল্লেখ করেন যে, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং বিজ্ঞানের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রায় অর্ধশতক ধরে কার্ল লিনেউস, কুভিয়ার, চার্লস ডারউইন এবং ওয়ালেস বিবর্তনের মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে পিছপা হননি। তিনি আরও বলছেন যে, এই সময়ে ধর্মবিশ্বাস ছিল আরও আগ্রাসী কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজ্ঞান পিছু হটেনি।

দ্বিতীয় অধ্যায়টি ছিল পৃথিবীর ভূগোল সম্পর্কে। লেখক লিখছেন যে, চার্চের সমতল পৃথিবীর (flat-earth) ধারণার সঙ্গে পিথাগোরাস, প্লেটো, আরিস্টটল প্রমুখদের গোলাকার পৃথিবীর লড়াই ছিল দীর্ঘ এক লড়াইয়ের ইতিহাস। পর্তুগিজ অনুসন্ধানকারী ফারদিনান্দ মাগেলান ১৫১৯ থেকে ১৫২২ পর্যন্ত সমুদ্রযাত্রা করে পৃথিবী যে গোলাকার তা হাতেনাতে প্রমাণ করেন। তা সত্ত্বেও চার্চের প্রভুরা গোলাকার পৃথিবীর তত্ত্ব স্বীকার করেননি, অথচ এই ধর্মীয় গোঁড়াদের উদ্যোগে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে স্থলভূমি দখলের জন্য কলম্বাসের মতো অনুসন্ধানকারীদের পাঠিয়ে পৃথিবী জুড়ে উপনিবেশ স্থাপন করে বাজার দখলের উৎসাহ দিয়েছে।    

তৃতীয় অধ্যায়ে (জ্যোতির্বিদ্যা/ Astronomy) টলেমীর পৃথিবী-কেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণার বিরুদ্ধে কোপারনিকাস এবং গালিলিও-র লড়াইয়ের বিস্তৃত বিবরণ রয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে (From "Signs and Wonders" to Law in the Heavens) ধূমকেতু, উল্কা এবং চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ সম্পর্কে ধর্মগুরুদের যে ধারণা সেই ধারণা দিয়ে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে, পঠনপাঠনের বিষয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাগুলির অন্তর্ভুক্তি আটকে রাখা হয়েছিল। এগুলির আবির্ভাবকে অমঙ্গলের সূচনা হিসাবে দেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। From Genesis to Geology অধ্যায়ে লেখক লিখছেন যে,  যদিও লিওনার্ডো দা ভিঞ্চির সময় থেকে ফসিল পাওয়া যেতে শুরু করে, এবং সেই সম্পর্কে ভূবিজ্ঞানীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়, তবু ধর্মগুরুদের প্রতিক্রিয়া ছিল যে - এই সম্পর্কিত গবেষণা অনৈতিক এবং বিধর্মীদের কাজ। চতুর্দশ শতাব্দীতে যখন পদার্থবিদ্যা এবং রসায়নবিদ্যার ধীরে ধীরে বিকাশ ঘটছে এবং আলকেমির চর্চা চলছে সেই সময়ে ১৩১৭ সালে পোপ জন-২২ এক ফতোয়া জারি করে এই সমস্ত গবেষণা বন্ধের নির্দেশ দেন। এই সময়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে একই ধরণের ব্যবস্থা চলতে থাকে। খ্রিষ্টানদের মধ্যে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ এবং অস্ত্রোপচার অপবিত্র কাজ বলে মনে করা হত। কেবল মুসলমান এবং ইহুদি চিকিৎসকরা এই কাজ করতেন। সেই সময়ে মানব অভিব্যক্তির ধারণা, আবহাওয়া-বিদ্যা ইত্যাদি আরও অনেক বিষয়েরই উল্লেখ করেছেন হোয়াইট, যা এই সংঘর্ষের কথা তুলে ধরেন।      

১৬০০ খ্রিস্টাব্দে আমরা জিওর্দানো ব্রুনো-কে পুড়িয়ে মারার কথা জানি। ১৮১৩ সালে পার্সে বিশে শেলির এক বিখ্যাত কবিতায় (Queen Mab, section VII, lines 1 to 14) জিওর্দানো ব্রুনোর মত একজন নাস্তিকের মর্মান্তিক হত্যার ঘটনার প্রতিবাদ করেন। এই কবিতার শেষ ছত্রে কবি লিখছেন যে, শিশু শেলী যখন মায়ের হাত ধরে ব্রুনোর হত্যা প্রত্যক্ষ করছিলেন (কাল্পনিক) তখন কান্নায় তাঁর চোখ ভরে যায়। তাঁর মা তাঁকে বলেন  'Weep not, child!' cried my mother, 'for that man: Has said, There is no God’। অ্যান্ড্রু হোয়াইট নিজে কিন্তু ধর্মবিশ্বাসী ছিলেন। তা সত্ত্বেও তিনি বিজ্ঞান গবেষণার স্বাতন্ত্র্য এবং ধর্মীয় গুরুদের বিজ্ঞান গবেষণার উপর আক্রমণকে ঘৃণা করতেন। বিবর্তনবাদের অন্যতম বহুচর্চিত প্রবক্তা জ্যঁ ব্যাপ্টিস্ট লামার্ক বা জেনেটিক্স এর জনক গ্রিগর জহান মেন্ডেল, এঁরা প্রত্যেকেই চার্চের সঙ্গে ধর্ম প্রচারক হিসাবে যুক্ত ছিলেন। আর্যভট্টও ছিলেন আপাদমস্তক একজন ধার্মিক মানুষ। তবুও তিনি সূর্যগ্রহণ এবং চন্দ্রগ্রহণের হিন্দু পৌরাণিক ধারণার পরিবর্তে প্রকৃত কারণগুলো ব্যাখ্যা করতে পিছপা হননি। আর্যভট্ট এদেশে প্রথমবার বলেন যে, চাঁদের আলো আসলে সূর্যের আলোর প্রতিফলনেরই ফলাফল।  

ভারতে বিজ্ঞান গবেষণার ইতিহাস সুপ্রাচীন। গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা, আয়ুর্বেদ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও প্রাচীন ভারতের অপরিসীম অবদান রয়েছে। এই সমস্তগুলির মধ্যে, ভারতে প্রাচীন যুগে গণিত এবং বিজ্ঞান সর্বাধিক উন্নত এবং সর্বাধিক কৃতিত্ব লাভ করেছিল। অনেক বিখ্যাত প্রাচীন ভারতীয় গণিতবিদ, আর্যভট্ট, বৌধায়ন, ভাস্করাচার্য, নাগার্জুন, কণাদ, বরাহমিহির এবং ব্রহ্মগুপ্ত প্রমুখদের নাম উল্লেখযোগ্য। গুপ্ত যুগ পর্যন্ত (৩২০-৪৮০ খ্রিষ্টাব্দ) বিজ্ঞান গবেষণার বিকাশ ঘটে। তারপর বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তির আক্রমণে এই বিকাশ স্তিমিত হয়ে যায়। সেই আক্রমণ এই সময়ে শক্তিশালী রূপ নিয়েছে। যুক্তি ও মুক্তচিন্তার দর্শন ধর্মীয় গোঁড়ামির সঙ্গে আপসহীন সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে বাধ্য। এই সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের উৎসাহিত করবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা চাই, এদেশে এই সংগ্রাম (অ্যান্ড্রু হোয়াইট-এর ভাষায় “battle”) স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ হোক।    

 

 


প্রকাশের তারিখ: ১৯-জুলাই-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

পড়ে ভালো লাগলো।
- পঙ্কজ ধর চৌধুরী, ১৬-নভেম্বর-২০২৫


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫