সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
জিতেছে বাংলাদেশ, হেরেছে মৌলবাদ
শান্তনু দে
বাংলাদেশ আরও একবার প্রমাণ করেছে তারা ধার্মিক হতে পারেন, ধর্মান্ধ নন। জামাতের তৈরি করা ভাষ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে প্রকৃত বাংলাদেশ। আরেকটা আফগানিস্তান, বা পাকিস্তান হতে দেননি। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচনে কোন্ দল বা জোট জিতেছে, কাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়া হয়নি— তার চেয়েও বড় কথা হলো উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি জিততে পারেনি। ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়েছে। জামাতের ছত্রছায়া থেকে বেরতে না পারার জন্য এনসিপি-কেও বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষ রেয়াত করেননি।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। গণ-অভ্যুত্থানের আঠারো মাস পর অবশেষে বাংলাদেশে নির্বাচন। মানুষ দিয়েছেন নির্ণায়ক রায়। মৌলবাদকে রুখে দিয়ে এসেছে স্বস্তির জয়।
দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয়ী হয়েছে বিএনপি (বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি)-র জোট। ৩০০-সদস্যের সংসদে ২১২টি আসন। বিএনপি একাই ২০৯টি, দলের ইতিহাসে বৃহত্তম জয়। পেয়েছে ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট। দ্বিতীয় বৃহত্তম দল একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী, উগ্র মৌলবাদী শক্তি জামাত। জামাতের নেতৃত্বে ১১-দলের জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। জামাত একাই ৬৮, স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে তাদের সবচেয়ে ভালো ফল ছিল ১৯৯১-তে, আসন সংখ্যা ছিল ১৮। জামাত পেয়েছে ৩১.৭৬ শতাংশের সমর্থন। ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে সবচেয়ে ভালো ছিল ১৯৯১-তে, ১২.২ শতাংশ। জামাতের জোট-সঙ্গী গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-নেতাদের তৈরি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)-কেও মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন। পেয়েছে মাত্র ৩.০৫ শতাংশ। তিরিশটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হয়েছে মাত্র ৬টি আসনে। নির্দল প্রার্থীরা জিতেছেন সাতটি আসনে, যাঁদের প্রত্যেকেই বিএনপি-র বিক্ষুব্ধ প্রার্থী। ইসলামি আন্দোলন পেয়েছে একটি আসন। প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে একটি আসনে নির্বাচন হয়নি। দু’টি আসনে (চট্টগ্রাম-২ এবং চট্টগ্রাম-৪) ফলাফল এখনও জানানো হয়নি। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বাধীন সাত-দলের গণতান্ত্রিক জোট আশানুরূপ ফল না করতে পারলেও, উগ্র মৌলবাদী শক্তিকে পরাস্ত করার ভাষ্য নির্মাণে নিয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ভোট বয়কটের ডাক দিয়েছিল। যদিও নির্বাচন শেষে এক বিবৃতিতে বলেছে: এই নির্বাচনে ‘শত প্রতিকুলতা ষড়যন্ত্রের মধ্যে জনগণ— স্বস্তি ও সুস্থ গণতান্ত্রিক ধারার আকাঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন।’ বিএনপি-র এই জয়কে অভিনন্দন জানিয়েছে ওয়ার্কার্স পার্টি।
পাশাপাশি, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে যে গণভোট হয়েছে, তাতে জয়ী হয়েছে ‘হ্যাঁ’ ভোট। তা আপাতভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও, যেহেতু ক্ষমতাসীন পক্ষের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল, তাই মুক্তিযুদ্ধের ধারাটি একেবারে খারিজ হওয়ার আশঙ্কা কম। যদিও, শুরুতেই এনিয়ে সুর চড়িয়েছেন জামাতের শীর্ষ নেতারা।
এবারে মহিলা, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব দু’দশকে সবচেয়ে কম। মাত্র সাতজন মহিলা প্রার্থী সরাসরি নির্বাচিত হয়েছেন। যেখানে ২০২৪, ২০১৮ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনে ছিল যথাক্রমে ১৯, ২২ এবং ১৮ জন। এবারে সাতজনের মধ্যে ৬ জনই বিএনপি-র। বাকি একজনও ছিলেন বিএনপি-তে। নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন মাত্র ৮৪ জন, মোট প্রার্থী সংখ্যার ৪.০৮ শতাংশ। গণতন্ত্রের জন্য যা শুভ লক্ষণ নয়। ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু জিতেছেন মাত্র ৪ জন। সকলেই ছিলেন বিএনপি-র প্রার্থী।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
গত দেড়বছরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশে নৈরাজ্য পৌঁছেছিল চরমে। আইনশৃঙ্খলা বলে কিছুই ছিল না। তৌহিদী জনতার নামে চলেছে মব-সন্ত্রাস। বেপরোয়া হত্যা আর নির্যাতনের ঘটনা। বাংলাদেশ প্রতিদিন পুড়ছে বিদ্বেষের আগুনে। উগ্র ধর্মান্ধ হিংসা তৈরি করে চলেছিল একের পর এক দৃষ্টান্ত। পাল্লা দিয়ে চড়ছে চরম ভারত-বিদ্বেষী জিগির। উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদীদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন পীর দরবেশরা। ভাঙচুর হয়েছে মাজার। নিগৃহীত হয়েছেন বাউলরা। রোষের আগুনে পুডেছে রবীন্দ্র-নজরুল থেকে লালন। সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার থেকে হামলা হয়েছে সাংবাদিক ও সংবাদ-মাধ্যমের উপর। পুড়েছে প্রথম আলো, ডেইলি স্টার পত্রিকার মতো দাপুটে সংবাদপত্র। তাণ্ডবে বাদ যায়নি ছায়ানট, উদীচী-র মতো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান। খতম করার চেষ্টা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে। শেষ করার চেষ্টা হয়েছে বাংলাভাষা-ভিত্তিক সংস্কৃতিকে। এমনকি উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ বদলে দেওয়ার দাবি। চেষ্টা হয়েছে ইসলামিক রাষ্ট্র তৈরির। বাংলাদেশকে ‘বাঙালি পাকিস্তান’ করা। নির্বাচনের মাত্র দু’দিন আগে, অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য বিপদজনক।
এই প্রথম জামাত মনে করছিল তারা ক্ষমতায় আসবে। নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়ায়— জামাত, কি জামাত নয়— বাংলাদেশকে একাত্তরের আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া, না মুক্তিযুদ্ধের ভাবধারা রক্ষা করা।
বিএনপি-র এই জয়ে অনেকই তাই স্বস্তিতে। বাংলাদেশ আরও একবার প্রমাণ করেছে তারা ধার্মিক হতে পারেন, ধর্মান্ধ নন। জামাতের তৈরি করা ভাষ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে প্রকৃত বাংলাদেশ। আরেকটা আফগানিস্তান, বা পাকিস্তান হতে দেননি। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ নির্বাচনে কোন্ দল বা জোট জিতেছে, কাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়া হয়নি— তার চেয়েও বড় কথা হলো উগ্র সাম্প্রদায়িক শক্তি জিততে পারেনি। ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়েছে। জামাতের ছত্রছায়া থেকে বেরতে না পারার জন্য এনসিপি-কেও বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষ রেয়াত করেননি।
যদিও জামাতকে ছোট করে দেখা হবে এক বড় ভ্রান্তি। জামাত-জোট জিতেছে এক-চতুর্থাংশের বেশি আসনে। তাদের সঙ্গে এখন ৭৭-জন সাংসদ। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী— উত্তর থেকে দক্ষিণ— রংপুর, রাজশাহী, খুলনায় ভালো ফল করেছে জামাত। এই প্রথম রাজধানী ঢাকায় জয় পেয়েছে জামাত। অতীতে কখনও একটি আসনও পায়নি। এবারে ১৫ আসনের মধ্যে জিতেছে ৬টি আসনে। এছাড়াও জোটের প্রার্থী, জুলাই আন্দোলনে তৈরি এনসিপি নেতা জিতেছেন একটি আসনে। কম ব্যাবধাণে হেরেছে পাঁচটি আসনে। জামাত এখন সংসদে। দলের শীর্ষ নেতারা মুক্ত। এবং সক্রিয়। এই সময়ে ঢাকা, জাহাঙ্গিরনগর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পর সর্বশেষে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্রশিবির। জামাত নেতাদের দাবি তাদের সঙ্গে রয়েছে ২ কোটি মানুষের সমর্থন, যার মধ্যে রয়েছে প্রায় ২,৫০,০০০ সর্বক্ষণের কর্মী, দলের ভাষায় রুকন (খুঁটি)।
এই নির্বাচন উন্মুক্ত করেছে একটি গণতান্ত্রিক পরিসর। এক নতুন যাত্রা শুরু। এক নতুন রাজনৈতিক মুহূর্তের মুখোমুখি বাংলাদেশ। ঠিকই, প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি আওয়ামি লিগ। তবে জনাদেশের বার্তা স্পষ্ট: একটি স্থায়ী গণতান্ত্রিক সরকার। নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছে, অব্যাহত থাকুক তার ধারাবাহিকতা। তা আরও সুদৃঢ় হোক। ডেইলি স্টার পত্রিকায় শিরোনাম: নতুন বাংলাদেশ চায় নতুন অভিমুখ।
বাংলাদেশ পিছনে ফিরে যেতে পারে না। অতীতেও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক উত্তরণ ঘটিয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক উপাদানগুলির সুস্থ অনুশীলনে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে নতুন করে পড়তে হয়েছে গণতান্ত্রিক সংকটে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের সামনে আবারও এনে দিয়েছে একটি সম্ভাবনাময় সুযোগ। এবারের এই নির্বাচন তাই কেবল ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া নয়, এটি গণতান্ত্রিক ভিত্তি পুনর্গঠনের একটা পরীক্ষাও।
নির্বাচন কমিশনের দেওয়া তথ্যে ভোটদানের হার ছিল ৫৯.৪৪ শতাংশ। যেখানে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ছিল সাকুল্যে ৪২.০৪ শতাংশ। ঠিকই, এবারেও প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ ভোট দেননি। তাই জনাদেশের পূর্ণ প্রতিফলন উঠে আসেনি। এই ফলাফলকে একমাত্রিকভাবে বিশ্লেষণ করার সুযোগও তাই কম।
তবে তারপরেও বলতে হবে, যাঁরা ভোট দিয়েছেন, তাঁরা তাঁদের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় আনার সুযোগ পেয়েছেন। এটিও একধরনের গণ-অনুমোদন। আবার এও মনে রাখা দরকার, এই নির্বাচনে যে বিরাট অংশের মানুষ ভোটকেন্দ্রে গেলেন না, তাঁদের আকাঙ্ক্ষাও পূরণ করতে হবে। বলাবাহুল্য, তাঁদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতভাবেই শক্তিশালী করত গণতন্ত্রকে। তা হয়নি। নতুন বাংলাদেশে সেই মানুষদের গণতন্ত্রের পরিসরে ফেরানোও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলে সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নির্বাচন করাই শেষ কথা নয়। নির্বাচন-উত্তর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষাও বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজিলা পরিষদ, জিলা পরিষদ-সহ স্থানীয় সংস্থাগুলির ক্ষেত্রেও জরুরি সুষ্ঠু নির্বাচন। কৃষকরা ভালো নেই। দুর্দশা বাড়ছে। দারিদ্র বাড়ছে। সেইসঙ্গেই বাড়ছে বেকারত্ব। জিনিসের দাম নাগালের বাইরে। মানুষ চান দুর্নীতি-মুক্ত পুলিশ, রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত পুলিশ।
মানুষ চান অস্থিরতা-নৈরাজ্য থেকে স্থিরতা। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র। সকলকে নিয়ে, সকলের জন্য দৃষ্টিভঙ্গি। ইনক্লুসিভ অ্যাপ্রোচ। সমাজজীবন থেকে অর্থনীতি— সর্বত্র। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে নেওয়া হোক কঠোর অবস্থান। ফিরে আসুক শান্তি। সম্প্রীতির পরিবেশ। বন্ধ হোক বিরোধীদের ধরপাকড়, ভুয়ো মামলা থেকে নির্যাতন। অবিলম্বে জামিন, মুক্তি দেওয়া হোক বুদ্ধিজীবি, শিল্পী, লেখক, সাহিত্যিক, সাংবাদিকদের। গড়ে উঠুক একটি গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। যা ভিন্নমত, বৈচিত্র্য-বহুত্বকে সম্মান করবে।
প্রতিবেশী দেশের মানুষ চান, মজবুত হোক দিল্লি-ঢাকার সম্পর্ক।
এই নির্ণায়ক জনাদেশের অর্থ: এক বিশাল দায়িত্ব। সন্ধিক্ষণের এই মুহূর্তটি কি গণতান্ত্রিক রূপান্তরের দিকে মোড় নেবে— না কি আরেকটি মহার্ঘ সুযোগকে হাতছাড়া করবে— নির্ভর করছে বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, সরকার এবং বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষের উপর।
প্রকাশের তারিখ: ২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay









