সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
আমেরিকার অধীনস্থ মিত্রের মতোই মোদীর বিদেশনীতি
প্রকাশ কারাত
এমনকী ২০০৩ সালেও যখন বাজপেয়ী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছিল, তখনও স্বাধীন বিদেশ নীতি অনুসরণ করার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের পুরোপুরি অবক্ষয় ঘটেনি। সেকারণেই ২০০৩ সালে লোকসভা সার্বভৌম রাষ্ট্র ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল এবং বলেছিল সামরিক হামলার মাধ্যমে শাসক বদল মেনে নেওয়া যায় না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর যে হামলা নামিয়ে এনেছিল সে বিষয়ে তখন লোকসভা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, এখনকার শাসকদের মধ্যে তার লেশমাত্র নেই। কারণ আমরাই আমাদের সার্বভৌমত্বে ভারত-মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক মৈত্রীর যুপকাষ্ঠে বলি দিয়ে বসে আছি। এই আত্মসমর্পণই বুঝিয়ে দিচ্ছে অসম বাণিজ্য চুক্তিতে কেন আমরা সম্মতি জানিয়েছি।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের আগ্রাসনের বিষয়ে মোদী সরকার যে অবস্থান নিয়েছে তাতে এই সরকারের বিদেশ নীতির একেবারে ভেতরের চেহারাটা প্রকাশ হয়ে পড়েছে। গত ১২ বছর ধরে মোদী সরকার এই বিদেশনীতিই অনুসরণ করে চলেছে। স্বাধীন বিদেশ নীতি কিংবা রণনীতিগতভাবে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (strategic autonomy)র আভাসমাত্র অবশিষ্ট নেই এই বিদেশ নীতিতে। বরং, এখন যা রয়েছে সেটা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের সহগামী একটি বিদেশ নীতি। অন্যভাবে বললে, এ হল অধীনতা স্বীকার করে নেওয়া এক মিত্র বা জোটসঙ্গীর বিদেশ নীতি।
২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েল ইরানের ওপর বিপুল বোমাবর্ষণ শুরু করে। এই নগ্ন আগ্রাসন এবং ইরানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনার কোনও নিন্দা করা হয়নি কিংবা সেবিয়য়ে আপত্তিও করা হয়নি। প্রথম দফার হামলায় যখন সে দেশের সর্বোচ্চ নেতা ও রাষ্ট্রপ্রধান আয়াতোল্লা খামেনেইকে হত্যা করা হয়, সেই ঘটনার নিন্দা তো দূরের কথা, এমনকী শোক জানিয়ে কোনও সরকারি বিবৃতিও দেওয়া হয়নি। ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবেই বহু প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে এবং এই সম্পর্ক দুই প্রাচীন সভ্যতার সম্পর্ক। সর্বোপরি ইরান ভারতের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা দেশ সম্পর্কে মোদী সরকারের এমন নীরবতা চোখে পড়ার মতো।
মার্কিন স্বার্থবাহী, দক্ষিণপন্থী বিদেশ নীতি
মোদী সরকারের এই কূটনৈতিক নীরবতার বিরুদ্ধে সমালোচনার বেশির ভাগটাই আসছে একটি অবস্থানের ভিত্তিতে। সেই অবস্থান হল, ভারতের নিজস্ব যে বিদেশনীতি তা থেকে মোদী সরকার গুরুতর ভাবে বিচ্যুত হয়েছে। এই ধারণা যে অনুমান থেকে গড়ে উঠছে তা হল এই সরকারের আমলে এখনও স্বাধীন বিদেশ নীতি গ্রহণের একটা ভিত্তি রয়ে গেছে। এমন ধারণা পুরোপুরি একটি ভুল অবস্থান। যদিও জাতীয় স্বার্থ এবং রণনীতিগতভাবে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা (strategic autonomy)র ভিত্তিতে গৃহীত বিদেশ নীতির সমর্থনে মুখে অনেক কথাই বলে মোদী সরকার, তবে বিজেপি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এসব বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী ও তার সরকারের বিদেশ নীতিকে তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রের নীতিসমূহ থেকে আলাদা করা যায় না। এই সরকারের শ্রেণি চরিত্র থেকেও তাকে আলাদা করা যায় না। সর্বত্রই অতি দক্ষিণপন্থী সরকারগুলি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মিত্র। মোদী সরকারও এই অতি দক্ষিণপন্থী ধারার মধ্যেই পড়ে, এটি আসলে হিন্দুত্ব কর্পোরেট শাসন।
মোদীর বিদেশ নীতির মূল ভিত্তি হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রণনীতিগত মৈত্রী আরও সুদৃঢ় ও গভীর করা। মোদীর শাসনে ভারত-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিরক্ষা ফ্রেমওয়ার্ক এগ্রিমেন্টে সামরিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার যে চারটি ভিত্তিমূলক চুক্তির কথা বলা হয়েছিল তা অবশেষে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর জেরে ভারত হয়ে দাঁড়িয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সহযোগী। এরপরেই ভারত যোগ দেয় কোয়াডে। এই জোটে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়া। বাইডেন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ছিলেন, ভারত পশ্চিম এশিয়ার জন্য I2U2 (আই টু ইউ টু) উদ্যোগে সামিল হয়েছিল। সেই উদ্যোগে ছিল ইজরায়েল, ভারত, ইউএই এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। স্পষ্টতই এটা ছিল ইরানের বিরুদ্ধে এবং ওই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরোধী জোট।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল-ভারত অক্ষ
ইজরায়েলের কাছে হিন্দুত্ব সবসময়ই একটা বিশেষ অনুরাগের বিষয় ছিল এবং আছে। এটার শুরু সেই সাভারকারের সময় থেকে। বাজপেয়ী সরকারের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল-ভারত অক্ষের সমোন্নতি রেখা কতদূর পৌঁছতে পারে তা খতিয়ে দেখা হয়েছিল। মোদীর আমলে এই অক্ষটা একেবারে মূর্ত হয়ে উঠেছে। ইজরায়েল শুধু ভারতের একটা বড় অস্ত্র সরবরাহকারীই নয়, এদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়েও এই দেশটি জড়িত। একইসঙ্গে ইজরায়েল দেয় পেগাসাসের মতো নজরদারি এবং চরবৃত্তির সরঞ্জাম।
পশ্চিম এশিয়ায় ইরান একমাত্র বড় দেশ যারা এই অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট-ইজরায়েলের আধিপত্য মেনে নেয়নি। সে কারণে এই দেশটা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর টার্গেট হয়ে রয়েছে। ২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হন তখন তিনি ইরানের তেল বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। তখন ট্রাম্পের নির্দেশ মেনে ইরানের কাছ থেকে তেল কেনা বন্ধ করেছিল ভারত। অথচ তখন বাণিজ্যিকভাবে ইরানের তেল কেনাটাই ভারতের পক্ষে সবচেয়ে সুবিধাজনক ছিল। যখন ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ওপর কোনও রকম উস্কানি ছাড়াই হামলা করল ইজরায়েল, এবং তারা টানা ১২ দিন বোমাবর্ষণ করে, সেই আগ্রাসনের নিন্দা করেনি মোদী সরকার। এই পর্বে যখন ট্রাম্প ইরানের তিনটি পারমাণবিক ক্ষেত্রে বোমাবর্ষণ করে তখনও একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি ভারত। 
২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি মোদী ইজরায়েলে সরকারি সফর করেন। সেখানকার নেসেট (পার্লামেন্ট) তিনি যে ভাষণ দেন তাতে গাজা সম্পর্কে কোনও রকম সমালোচনামূলক মন্তব্য তিনি করেননি। অথচ গাজায় যুদ্ধের নামে গণহত্যা চালিযে যাচ্ছে ইজরায়েল। অধিকৃত ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক এলাকায় প্যালেস্তিনীয়দের ওপর যে অত্যাচার চলছে সে বিষয়েও কোনও কথা বলেননি তিনি। তার বদলে তিনি ইজরায়েলের সঙ্গে সব রকমের সম্পর্ক জোরদার করার কথা বলেন। ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ করিডর তৈরিতে এবং I2U2 গঠনে উৎসাহ দেন। এই দুটোই মার্কিন মদতপুষ্ট প্রস্তাব যেখানে ইজরায়েলকে রাখা হয়েছে। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু আগাম এই সফরের এমন পরিকল্পনা করেছিলেন যে যাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগসাজশে ইরানের বিরুদ্ধে তিনি যে আসন্ন সামরিক আগ্রাসনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তা আড়ালে রাখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ইরানের ওপর হামলা করার জন্য বিশাল নৌবহর ওই অঞ্চলে জড়ো করে রেখেছিল। তবুও মোদী ভাবলেন এই মুহুর্তটাই ইজরায়েলে যাওয়ার সবচেয়ে সুবিধাজনক মুহুর্ত এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে একেবারে জাঁকজমক করে প্রচার করার সময়। অথচ গাজায় যুদ্ধ অপরাধের জন্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট ইতিমধ্যেই নেতিনিয়াহুকে অভিযুক্ত করেছে।
কুকর্মের নীরব সহযোগী
সুতরাং এ বিষয়ে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপি সরকার তাদের দুই মিত্রদের চাপিয়ে দেওয়া ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ে মুখে একেবারে কুলুপ এঁটেছেন। এই নীরবতা নিছক ভীরুতা থেকে নয়, যদিও কিছু সমালোচক এমন অভিযোগই করেছেন। আসলে এই নীরবতা দুষ্কর্মে মদত দেওয়ার লক্ষ্যে। এই দুষ্কর্মের সাফাই কী ভাবে দিতে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর নেই মোদী রকারের কাছে। এই অস্বস্তিও নীরবতার উৎস। এই অস্বস্তির আরও একটা কারণ ইরানের ফ্রিগেট আইএরআইএস ডেনাকে শ্রীলঙ্কার কাছে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনা। বিশাখাপত্তনমে ভারতীয় নৌসেনা নৌ-কূটনীতির অংশ হিসাবে জাহাজের যে শক্তি প্রদর্শনের আয়োজন করেছিল তাতে ডেনা সহ ইরানের তিনটি জাহাজ অংশ নিয়েছিল। ডেনার নাবিকেরা কয়েকদিন আগেই ছিল ভারতের অতিথি। ডেনার ওপর হামলায় সেই নাবিকদের মধ্যে ১০০ জনেরও বেশি মৃত্যু হয়েছিল। এই ঘটনার পর চাপে পড়ে যায় মোদী সরকার। তারপরেও এই ঘটনা সম্পর্কে দুঃখ প্রকাশ করে কোনওরকম সরকারি বিবৃতি দেওয়া হয়নি কিংবা ইরানের কাছে এবং নিহতদের পরিবারের কাছে শোক জ্ঞাপন করা হয়নি। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি বিষয়ে ৯ মার্চ বিদেশমন্ত্রী সংসদে যে বিবৃতি দিয়েছেন সেটা ছিল পুরোপুরি নির্বিষ একটা ব্যাপার। সেখানে ইরানের নেতৃত্বের ক্ষয়ক্ষতির উল্লেখ করা হয়েছিল (যদিও আয়াতোল্লা খামেনেইয়ের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি) এবং জাহাজ ডুবে যাওয়ার উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের আগ্রাসনের কোনও সমালোচনা করা হয়নি।

মার্কিন মিসাইল হামলায় ইরানের মিনাবে ১৬৫ জন স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে। ভারত থেকে ফেরা ইরানের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং সেই হামলায় শতাধিক নাবিকের মৃত্যু হয়েছে। দেখেশুনে মনে হচ্ছে এ ধরনের কোনও ঘটনাই ভারত সরকারকে বিন্দুমাত্র বিচলিত করতে পারেনি। এমনকী এই সব ভয়ঙ্কর মৃত্যুর জন্য দুঃখপ্রকাশ পর্যন্ত করেনি ভারত সরকার। প্যালেস্তাইনে গণহত্যা এবং গাজায় হাজার নারী ও শিশুহত্যার ঘটনাতেও আমরা একই রকম নির্মম দৃষ্টিভঙ্গীর প্রকাশ দেখেছি। আমেরিকা ও ইজরায়েলের ক্ষমতার লেজুড় হয়ে এবং তাদের সামরিক অপরাধমূলক দুষ্কর্মগুলিকে ক্ষমা করার ফলে ভারতের বিদেশ নীতির সামনে এখন আর কোনও নৈতিক কম্পাস নেই।
সমঝোতা করা হয়েছে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নেও
এক সময়ে আমাদের স্বাধীন বিদেশনীতির কিছু আভাস তবু ছিল। তবে সেই সব দিন আমরা অনেক পিছনে ফেলে চলে এসেছি। এমনকী ২০০৩ সালেও যখন বাজপেয়ী সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছিল, তখনও স্বাধীন বিদেশ নীতি অনুসরণ করার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের পুরোপুরি অবক্ষয় ঘটেনি। সেকারণেই ২০০৩ সালে লোকসভা সার্বভৌম রাষ্ট্র ইরানের ওপর মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরোধিতা করে সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল এবং বলেছিল সামরিক হামলার মাধ্যমে শাসক বদল মেনে নেওয়া যায় না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর যে হামলা নামিয়ে এনেছিল সে বিষয়ে তখন লোকসভা যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, এখনকার শাসকদের মধ্যে তার লেশমাত্র নেই। কারণ আমরাই আমাদের সার্বভৌমত্বে ভারত-মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক মৈত্রীর যুপকাষ্ঠে বলি দিয়ে বসে আছি। এই আত্মসমর্পণই বুঝিয়ে দিচ্ছে অসম বাণিজ্য চুক্তিতে কেন আমরা সম্মতি জানিয়েছি।
প্যালেস্তাইনের সংগ্রামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের নির্মম হামলার মুখে দাঁড়িয়ে ভারত ইরানকে পরিত্যাগ করেছে। ফলে ভারত যে নিজেকে দাবি করে গ্লোবাল সাউথের নেতা হিসাবে, সেই দাবির সততা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গেছে। যখন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করা হল এবং সেদেশের ওপর সামরিক আগ্রাসন নামিয়ে আনা হল, ভারত তার নিন্দা করেনি। অথচ এর বিপরীতে গ্লোবাল সাউথের দুটি বড় দেশ, যারা আবার শুরু থেকেই ব্রিকস-এর পাঁচ সদস্য দেশের মধ্যে পড়ে, সেই ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা এই সব ইস্যুতে দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে — তা সে গাজা বা প্যালেস্তাইন, ভেনেজুয়েলা কিংবা ইরান যে দেশই হোক না কেন। ভারত এবছর ব্রিকস এর চেয়ারপার্সন। ফলে ভারতের এই ভূমিকা গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির কাছে আদৌ ভাল বার্তা দিচ্ছে না।
কংগ্রেসের নিজেদের ভূমিকা নিয়ে ভাবা উচিত
যখন ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসনের বিষয়ে আলোচনা করা হয়, তখন উচিত আগেকার সেই সব ঘটনা ও পর্বের দিকে তাকিয়ে দেখা যখন ইরানকে নিশানা করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটা ভাল যে, এখন ইরান যুদ্ধের বিষয়ে মোদী সরকারের কাপুরুষের মতো অবস্থানের বিরোধিতা করছে কংগ্রেস। তবে কংগ্রেস নেতৃত্বেরও নিজেদের আগেকার অবস্থানের বিষয়গুলো খুঁটিয়ে পর্যালোচনা করা উচিত। ২০০৫ সালে মনমোহন সিং সরকার আমেরিকার সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চেয়েছিল। এজন্য ২০০৫ সালেই মনমোহন সরকার প্রতিরক্ষা কাঠামো চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল এবং তারই পরিণতিতে ভারত-মার্কিন অসামরিক পরমাণু চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়েছিল। সেই সময় বুশ প্রশাসন দাবি করেছিল যে ইরানকে একঘরে করার জন্য আমেরিকার সঙ্গে সহযোগিতা করুক ভারত। তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলি ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি অথরিটি (আইএইএ)তে ইরানের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে। গোড়ায় আইএইএতে ইরানকে নিশানা করার প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছিল ভারত। কিন্তু ২০০৫ এর সেপ্টেম্বরে ভারত অবস্থান বদল করে ইরানের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিল। ২০০৬ এর ফেব্রুয়ারিতে ফের ইরানের বিরুদ্ধে ভোট দেয় ভারত। এই প্রস্তাব পাশ হওয়ার ফলেই ইরানের পরমাণু ইস্যু নিজেদের হাতে নিতে সক্ষম হয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ। এই প্রস্তাবই তখন কাজ করেছিল আগ্রাসনের ভিত্তি হিসাবে। এই প্রস্তাবের ফলশ্রুতিতেই ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। শুরু হয় আমেরিকার নেতৃত্বে ইরানের ওপর বহুমুখী হামলা। সে সবেরই ফলশ্রুতি হচ্ছে এখনকার সামরিক আগ্রাসন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ভিত্তিস্থাপন করেছিল মনমোহন সিং সরকার। সেটাকেই মোদীস সরকার এগিয়ে নিয়ে গেছে যা পরিণত হয়েছে পুরোদমের একটা মার্কিনমুখী বিদেশ নীতিতে এবং ভারত ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে গড়ে তুলেছে একটি অক্ষ। ভারতের শাসক শ্রেণি, নয়া উদারবাদ ক্রমশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এবং হিন্দুত্বের উত্থান হওয়ায় স্বাধীন বিদেশ নীতি বিসর্জন দিয়েছে এবং তারা জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং স্ট্র্যাটেজিক বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার চারপাশে লক্ষ্মণের গণ্ডী টেনে দিতে তৈরি। এই অবস্থানের পূর্ণ অভিব্যক্তি দিয়েছে মোদী সরকার। তারা এমনটা করেছে উগ্রজাতীয়তাবাদ এবং ভুয়ো আত্মনির্ভরতার মোড়ক কাজে লাগিয়ে।
স্বাধীন বিদেশ নীতির জন্য রাজনৈতিক সংগ্রাম
নতুন করে স্বাধীন বিদেশ নীতি রচনা করার সংগ্রাম, যার ভিত্তি হবে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থরক্ষা, সেই সংগ্রামের সূচনা করতে হবে হিন্দুত্ব কর্পোরেট শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের অংশ হিসাবে। সাম্প্রতিক সময় সুযোগ এনে দিয়েছে সেই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। মোদী সরকার হাঁটু গেড়ে বসে আমেরিকার সঙ্গে অসম বাণিজ্য চুক্তি মেনে নিয়েছে। এতে দেশের কৃষক, শ্রমিক ও দেশি শিল্পের স্বার্থে আঘাত লাগবে। এর জেরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যার ফলে লোকেরা বুঝতে পারবেন মোদী সরকারের মার্কিন স্বার্থবাহী নীতি ও ট্রাম্পের চাপের কৌশলের পরিণামে ভারতের মানুষের স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়ার মধ্যে সম্পর্ক কোথায়। এছাড়াও, এমনকী যে সব বিজেপি সমর্থককে জাতীয় গর্বের আরক খাওয়ানো হচ্ছিল তারাও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি তাদের নেতা মোদীর এমন কাপুরুষের মতো মনোভাবের কারণ বুঝতে পারছেন না। এবং একইসঙ্গে তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যে নগ্ন উপায়ে ভারতের অতিথি ইরানের জাহাজকে টর্পেডো মেরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে সেই বিষয়েও।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ইরানের পাল্টা প্রত্যাঘাত তৈরি করেছে বিশ্বজোড়া অর্থনৈতিক সঙ্কট। সেই সঙ্কটের আবার মূলে রয়েছে তেল সঙ্কট। রান্নার গ্যাস, সারের সঙ্কট এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির কারণে ভারতে সাধারণ মানুষের পরিস্থিতি ক্রমশ শোচনীয় হচ্ছে। এটাও আমেরিকার সঙ্গে অধীনতার সম্পর্ক ও ইজরায়েলের প্রতি হিন্দুত্বের প্রেমের ক্ষতিকর প্রভাবের মুখোশ খুলে দেওয়ার আরও একটা সুযোগ।
বাম ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির উচিত এই সব সুযোগ কাজে লাগিয়ে মানুষের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী চেতনাকে জাগিয়ে তোলা এবং এই দাবির পিছনে জনগণকে সমাবেশিত করা যে, মার্কিন স্বার্থবাহী নীতিগুলি পুরোপুরি খারিজ করতে হবে। এরই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে চালাতে হবে নয়া উদারবাদী নীতি সমূহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। সেই নীতিগুলি হল বেসরকারিকরণ, আন্তর্জাতিক লগ্নি পুজির দাবির কাছে মাথা নত করা ও কর্পোরেট লুঠ চলতে দেওয়া। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার যে শ্রেণি ভিত্তি তার শিকড় রয়েছে এ সবের মধ্যেই।
প্রকাশের তারিখ: ২৯-মার্চ-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay









