সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
শ্রমিকের জন্য খরচে টান, পুজোর ভাণ্ডার উপচে পড়ে
চন্দন দাস
গত তিন বছরের রাজ্য বাজেট পর্যালোচনা করলেই দেখা যাচ্ছে শ্রম দপ্তরের বরাদ্দ এবং খরচের ফারাক থাকছে। অর্থাৎ বছরের গোড়ায় যত টাকা বরাদ্দ বলে ঘোষণা করা হচ্ছে বছর শেষে দেখা যাচ্ছে খরচের পরিমাণ বরাদ্দের থেকে কম। কিন্তু দুর্গোপুজার খাতে খরচ বরাদ্দকে ছাপিয়ে গেছে। যেমন ২০২৫-’২৬। দুর্গাপুজোয় বরাদ্দ ছিল ৪৪৭কোটি ৫০লক্ষ টাকা। সরকার বাজেট নথিতে জানিয়েছে তাদের এখনও পর্যন্ত ধারনা এই খাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫২৪ কোটি।

শ্রমিকদের জন্য সারা বছরের বরাদ্দ ৭৫৬ কোটি টাকা। দুর্গাপুজো সারা বছরের নয়, চার দিনের। সেই পুজো আয়োজনে মমতা ব্যানার্জির সরকার ক্লাবগুলিকে দেবে ৫৫০কোটি টাকা।
ক্লাবের থেকে রাজ্যে শ্রমিক পরিবারের সংখ্যা অনেক বেশি। কিন্তু ক্লাবের চার দিনের পুজোর গুরুত্ব সরকারের কাছে তুলনামূলক বেশি।
রাজ্য সরকার এ’ কথা জানিয়েছে তাদের সর্বশেষ বাজেটে। গত ৫ই ফেব্রুয়ারি রাজ্যের বাজেট পেশ হয়েছে বিধানসভায়। সামনে বিধানসভা নির্বাচন। যদি তৃণমূল ফের জয়ী হয় তাহলে তারা এই বাজেট অনুসারে দপ্তর, প্রশাসন, সরকার চালাবে। কোনও রাখঢাক নেই। হিন্দুত্বর আবাহনের সামনে শ্রমিক স্বার্থ তুচ্ছ। শ্রম দপ্তরের উন্নয়নমূলক খাতে যে ৭৫৬কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব দেখানো হয়েছে তার মধ্যে ১৮০কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে ‘যুবশ্রী’ প্রকল্পে। যে প্রকল্প হলো এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম তুলে থাকা কর্মহীন যুবকদের প্রতি মাসে দেড় হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার প্রকল্প। কিন্তু সেই এমপ্লয়মেন্ট ব্যাঙ্কে নাম আছে ৪২লক্ষের বেশি কর্মপ্রার্থীর। সরকারের আর্থিক সমীক্ষাই তা জানাচ্ছে। তাঁদের কতজন কাজ পেয়েছেন গত এক বছরে? নাহ্, তার কোনও তথ্য সরকার দেয়নি।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
ভাতার হিসাব আছে। কাজের হিসাব নেই।
রাজ্যে কাজের হাহাকার। ফলে যে কর্মপ্রার্থী শ্রমিক, কর্মচারী হিসাবে উপার্জনের চেষ্টা করছেন, তাঁদের জন্য কোনও আলোর দিশা নেই। ভাতার বিরোধিতার প্রশ্ন নেই। ভাতা কোনও দান নয়। খয়রাতি নয়। এটি সরকারের উদারতাও নয়, মানুষের প্রাপ্য। যে রাষ্ট্র কাজ দিতে পারছে না, সে সামাজিক সুরক্ষার দায়িত্ব নেবে, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাতার অঙ্ক যেখানে ভোটের নৌকার মাস্তুল বলে বিবেচ্য, সেখানেও মাসে দেড় হাজার টাকা সরকারি ভাতা কোনও কর্মপ্রার্থীর লক্ষ্য নয়।
একটু নাটকীয় শোনালো? ঠিকই এমনটি এই প্রথম ঘটলো তা নয়। কোনও ঘটনা যখন বারবার ঘটে তখন তা মঞ্চের বিষয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না। হকিকৎ হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে তাই হয়েছে। সাধারনের কাছে বাজেট, অর্থনীতিকে বিদ্বান, বিশেষজ্ঞদের বিষয় হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে রাখা হয়েছে। বরং রাজনীতি এবং তার আলোচনা সাধারনের বহুল চর্চার বিষয়। কিন্তু রাজনীতি মানে শুধু মাত্র দলবদল, বক্তৃতার কনটেন্ট, রাজনৈতিক নেতাদের ভাবভঙ্গি নয়। অর্থনীতিই রাজনীতির ওয়ার্কশপ, বিধানসভায় কোনও শাসক দলের পেশ করা বাজেট রাজনীতির মহড়াকক্ষ।
তাই যখন দেখা যাচ্ছে, ২০২৬-’২৭-এ রাজ্যের মোট বাজেট বরাদ্দের ০.৩১% বরাদ্দ হয়েছে শ্রম দপ্তরের জন্য, বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না তৃণমূলের অভিমুখ কী। তখন বাজেট আর শুধু তথ্য, পরিসংখ্যান নয়। বাজেট তখন আরশি—সরকারের। যা বলে দিচ্ছে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি এবং রাজ্যের শাসক দল তৃণমূলের মধ্যে মৌলিক কোনও তফাৎ নেই। সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করার মাত্রায় যে ন্যূনতম ফারাকটুকু আছে, তা একই অর্থনীতি প্রয়োগের কৌশলের পার্থক্য। রাজ্য বাজেটের কয়েকদিন আগে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার তাদের ২০২৬-’২৭ আর্থিক বছরের বাজেট পেশ করেছে। সেখানেও দেখা যাচ্ছে মোট বাজেটের ০.৬১%, অর্থাৎ ১%’র কম বরাদ্দ হয়েছে শ্রম দপ্তরের জন্য।
শ্রম দপ্তর মানে শুধু বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের ভাতা দেওয়ার দপ্তর নয়। সেই খাতেও বরাদ্দে কোনও বৃদ্ধি নেই। কোনও নতুন ঘোষণা নেই। নতুন কারখানা নেই। তাই নতুন কর্মসংস্থান নেই শিল্পে। আবার বড়, মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়েছে অনেক। ২০১১-র ২৩ ডিসেম্বর বিধানসভায় এক বিধায়ক জানতে চেয়েছিলেন যে, রাজ্যে বন্ধ বড় ও মাঝারি কারখানা কত? সেদিন রাজ্য সরকারের শ্রম মন্ত্রী মলয় ঘটক জানিয়েছিলেন যে, ২০১১-র ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যে বন্ধ কারখানার সংখ্যা ছিল ৮৩। তার মধ্যে ২৫টি বড় কারখানা। এখন? সরকারের সর্বশেষ আর্থিক সমীক্ষা জানাচ্ছে রাজ্যে বড়, মাঝারি বন্ধ কারখানা অন্তত ১৪৬।
অর্থাৎ গত ১৫ বছরে বন্ধ কারখানার সংখ্যা বেড়েছে। অথচ বহু আকাঙ্খিত মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে পৌঁছোনর জন্য মমতা ব্যানার্জি এবং তাঁর দল কী প্রচার করেছিল? তৃণমূলের ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনের ইশ্তেহারের ২৫নং পাতায় লেখা হয়েছিল,‘‘পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের সময়ে ৫৬ হাজার কারখানা বন্ধ। তার জমির পরিমাণ ৪৪হাজার একর।’’ পুরোটাই ছিল ভাঁওতা। ৫৬হাজার বন্ধ কারখানা নয়। কখনও ছিল না। অন্তত বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে তো নয়ই।
🔍 আরও পড়ুন: —যাত্রাপথে বিকল্পের অনুশীলন, —মেলায় টাকা ওড়ে, ফেরে না পরিযায়ীরা, —মাইক্রোফাইনান্স, সমস্যার স্বরূপ
শুধু কী বরাদ্দে অবহেলা? গত তিন বছরের রাজ্য বাজেট পর্যালোচনা করলেই দেখা যাচ্ছে শ্রম দপ্তরের বরাদ্দ এবং খরচের ফারাক থাকছে। অর্থাৎ বছরের গোড়ায় যত টাকা বরাদ্দ বলে ঘোষণা করা হচ্ছে বছর শেষে দেখা যাচ্ছে খরচের পরিমাণ বরাদ্দের থেকে কম। কিন্তু দুর্গোপুজার খাতে খরচ বরাদ্দকে ছাপিয়ে গেছে। যেমন ২০২৫-’২৬। দুর্গাপুজোয় বরাদ্দ ছিল ৪৪৭কোটি ৫০লক্ষ টাকা। সরকার বাজেট নথিতে জানিয়েছে তাদের এখনও পর্যন্ত ধারনা এই খাতে খরচ হয়েছে প্রায় ৫২৪ কোটি। (এই ধারনাকে ‘রিভাইজড বাজেট’ বলে চিহ্নিত করা হয়)। আগামী বাজেটে তারা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারবে ঠিক কত টাকা খরচ হয়েছে। একইভাবে ওই ২০২৫-২৬-এ শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ ছিল ৭২০ কোটি টাকা। খরচ? রিভাইজড বাজেট বা সংশোধিত বাজেট বলছে সেই পরিমাণ ৬৯৪ কোটি ৫৯লক্ষের কিছু বেশি।
গত পাঁচ বছর রাজ্য বিধানসভা ছিল বামপন্থী প্রতিনিধিহীন। ‘বামশূণ্য’ বিধানসভা কী হতে পারে, গত পাঁচ বছরে তা বারবার বোঝা গেছে। হিন্দু-মুসলমান, শিব-দুর্গা, বেদ-উপনিষদ, ধর্মীয় স্থানে সরকারি বরাদ্দ নিয়ে যত হট্টগোল হয়েছে, তার সিকি আনাও হয়নি রাজ্যের শ্রমিক, পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে আলোচনা। ২০২২-এর নভেম্বরের পরে লিখিত প্রশ্ন নেওয়া এবং তার লিখিত উত্তর দেওয়া বন্ধ করে দেয় সরকার পক্ষ, মমতা ব্যানার্জির নির্দেশে। ফলে শ্রমিকদের সমস্যা এই বিধানসভার সরকার পক্ষ এবং বিরোধী পক্ষের কাছে কতটা গুরুত্বহীন, তা পরিসংখ্যানে প্রমাণ করা কঠিন।
কিন্তু বিধানসভার বাইরে এক বিরাট বাংলা রয়েছে। মানুষের বাংলা। মূলত শ্রমজীবীদের বাংলা। সেখানে বাজেট নথি, আর্থিক সমীক্ষার পাতায় লেখা শব্দ, বাক্য কথা বলে ঘাম আর উৎকন্ঠার ভাষায়। সেই বাংলা কী বলছে?
আরিফুল লস্করের বাড়ি সুন্দরবনের এক দ্বীপাঞ্চলে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কাজ করেন তিনি। থাকেন যাদবপুর এবং ভাঙড় লাগোয়া একটি এলাকাব। তাঁর কথায়,‘‘মাঝে মাঝে রিকশাও চালাই। মালিকের রিকশা। তবে এখন মালিকের রিকশা কমে গেছে। আগে মালিকদের দশ-বারোটা রিকশা থাকতো। সেই রিকশা চালাতে দিয়ে মালিক দিনের শেষে কিছু টাকা নিত। এখন রিকশা মূলত মহাজনের।’’ সেটা কেমন? আরিফুলের কথায়,‘‘এখনকার মোটরের রিকশা বানাতে খরচ হয় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। সেই টাকা আমার মতো একজন কোথায় পাবে? ব্যাঙ্ক দেবে না। সেখানে হাজারো ফ্যাকড়া। সেই টাকা দেয় মহাজন। যেখানে এমন রিকশা বানানো হয় সেখানেই যোগাযোগ মহাজনের। সে টাকা ধার দেবে। মোটা সুদ নেবে। টাকা, সুদ দিতে না পারলে রিকশা কেড়ে নেবে। ফলে আমার মতো মালিকের থেকে ভাড়ায় রিকশা চালানো লোক কমছে। আর শুধু রিকশা চালিয়ে কত আয় হয়? তাই আরও নানা কাজ, যেখানে যেমন পাই তাই করি।’’
অর্থাৎ এদের জন্য ব্যাঙ্ক নেই। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলো স্টেট লেবেল ব্যাঙ্কার্স কমিটি(এসএলবিসি)’র তিন মাস অন্তরের বৈঠকগুলিতে হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন, ঋণ, অগ্রগতির হিসাব পেশ হয়। মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান আর্থিক উপদেষ্টা, যৌবনে এবিভিপি’র নেতা অমিত মিত্র সহ রাজ্যের অনেক মন্ত্রী, আমলা ভাষণ দেন। চলতি মাসেই সেই কমিটির একটি বৈঠক আছে। কিন্তু সেই বৈঠকের অ্যাজেন্ডা নোটেও রয়েছে প্রকৃত বাংলার এক নিদারুণ ছবি।

💬আপনার মতামত, আমাদের ইস্তেহার।
প্রকাশের তারিখ: ১৫-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay







