সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
মুক্তিযুদ্ধ এবং সিপিআই(এম)
শান্তনু দে
বস্তুত, শুরু থেকেই বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম আর পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে একাত্ম করে দেখেছিল সিপিআই(এম)। একদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে শোষিত, বঞ্চিত বাংলার মুক্তিকামী মানুষের সমর্থনে শুরু থেকেই দৃঢ় অবস্থান, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে পুলিশ, সিআরপিএফ, মিলিটারির দাপটের মুখে গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম– একইসঙ্গে দুই লড়াই। উদ্বাস্তু কলোনি, মহল্লায় তখন তুমুল উত্তেজনা। দিনভর রেডিওতে কান পেতে থাকা। চা-দোকানের আড্ডায় একটাই আলোচনা। এক-একটা মুক্তাঞ্চলের লড়াই, এক-একটা জয়ের খবরে পাড়ার গলিঘুঁজিতে মুহূর্তে মিছিল। নরসিংদীর শিবপুর রণাঙ্গন– বাংলার স্তালিনগ্রাদ। এক লড়াই। একই উদ্দীপনা।

একাত্তরের ২৬ মার্চ, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরদিনই সিপিআই(এম) তাকে সর্বাত্মক সমর্থন করে ভারতের সব অংশের জনগণকে বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়। পার্টির সাধারণ সম্পাদক পি সুন্দরাইয়া ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ঘোষণাকে সমর্থন জানান, এবং পাক সেনাবাহিনীর বর্বর গণহত্যার তীব্র নিন্দা করেন।
সেদিন সিপিআই(এম)-ই ছিল ভারতের প্রথম রাজনৈতিক দল, যারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সমর্থন জানায় বাংলাদেশের জনগণের মুক্তিযুদ্ধকে। সমর্থন জানায় স্বাধীনতা সংগ্রামকে। আর এই সমর্থন ছিল সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদের অবস্থান থেকে।
সেদিনই ত্রিপুরায় পার্টির রাজ্য সম্পাদক নৃপেন চক্রবর্তীর নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল দেখা করে রাজ্যের মুখ্যসচিবের সঙ্গে। প্রতিনিধিদলে ছিলেন পার্টির দুই সাংসদ। দশরথ দেব আর বীরেন দত্ত। তাঁরা খুলে দিতে বলেন ত্রিপুরার সীমান্ত, যাতে পাক সেনার বর্বর আক্রমণে আক্রান্ত মানুষ সহজে প্রবেশ করতে পারেন। তাঁদের জন্য খুলতে বলেন ত্রাণশিবির। পাশাপাশি, পার্টির কর্মী-সমর্থকরা ঝাঁপিয়ে পড়েন অর্থ, খাবার আর ওষুধ সংগ্রহে। সেদিনই ভারতের ছাত্র ফেডারেশনের ত্রিপুরা রাজ্য কমিটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সমর্থন করে সারা ত্রিপুরায় হরতালের ডাক দেয়। বিকেলে আগরতলায় বের হয় বিরাট গণমিছিল। মিছিল থেকে স্লোগান ওঠে ‘ইন্দিরা-সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দাও।’
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর চারদিনের মধ্যেই ২৯ মার্চ, কলকাতার শহীদ মিনারে বিরাট সমাবেশ। সিপিআই(এম)-র নেতৃত্বে সংযুক্ত বামপন্থী ফ্রন্টের ডাকে। আর সেই সমাবেশ থেকেই (বাংলাদেশের) অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ভারত সরকারের কাছে দাবি তোলেন জ্যোতি বসু। যে সরকারকে স্বীকৃতি দিতে দিল্লির সময় লেগেছিল আটমাস।
কে গণতন্ত্রের পক্ষে, আর কে চায় স্বৈরশাসন– এই প্রশ্নে যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরে দল ও রাষ্ট্রের দিক থেকে ছিল দুর্বলতা, দোলাচল, অস্পষ্টতা আর নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া– তখন তার অবস্থান নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি সিপিআই(এম)। দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করে ‘বাংলাদেশের সংগ্রাম পাক সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত সংগ্রাম।’
শহীদ মিনারের সমাবেশে জ্যোতি বসু বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। তাঁরা এই সংগ্রামে রক্ত ঢালছেন। আত্মত্যাগ করছেন। তাঁদের আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই এই সভা থেকে। তাঁদের কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শিখবার আছে।’ কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের মুখোশ উন্মোচন করে তিনি বলেন, ‘দূর থেকে শুধু প্রশংসা নয়। কতোগুলো ভালো ভালো শব্দ ব্যবহার করা নয়। সমস্ত বাধা ডিঙিয়ে তাঁদের কাছে আমাদের পৌঁছতে হবে। আমাদের দেশে যে সরকার আছে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে। যাতে ওরা (বাংলাদেশের) অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। এটাই এই মুহূর্তের কাজ।’ সেদিন আগরতলায় বের হয় দশ হাজার মানুষের মিছিল। ৩০ মার্চ, ফের ত্রিপুরা বনধের ডাক।
মুক্তিযুদ্ধকে শুধু প্রথম সমর্থন দেওয়া নয়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের মদতপুষ্ট পাকিস্তানের স্বৈরাচারী সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সংগ্রামকে শুরু থেকেই সিপিআই(এম) ধারাবাহিকভাবে সমর্থন দিয়ে আসছিল। পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর তখন কলকাতায় ৪৯ লেক প্লেসে। সাধারণ সম্পাদক সুন্দরাইয়া ছাড়াও পলিট ব্যুরোর সদস্য বি টি রণদিভে, ইএমএস নাম্বুদিরিপাদ, এ কে গোপালন, এম বাসবপুন্নাইয়া, হরকিষাণ সিং সুরজিৎ, জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত, পি রামমূর্তিরা প্রতিনিয়ত পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলীর ওপর নজর রাখতেন। পরিস্থিতির পর্যালোচনা করতেন।
একাত্তরের ৭ মার্চ। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে) শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক জ্বালাময়ী বক্তৃতা। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের সর্বস্ব পণ করে স্বাধীনতার লড়াইয়ে নামার ডাক। এবারের সংগ্রাম– মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম– স্বাধীনতার সংগ্রাম। পাক প্রশাসনের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের আহ্বান। শুরু হয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তানের স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালতে অনির্দিষ্টকালের সাধারণ ধর্মঘট।
১৬ মার্চ, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র পলিট ব্যুরো প্রথম এই আন্দোলনকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বিবৃতি দেয়। স্বশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য পূর্ব বাংলার সাহসী জনগণের দুরন্ত সংগ্রামে তাঁদের পাশে দাঁড়ায়। পলিট ব্যুরো এক বিবৃতিতে বলে: ‘পূর্ব বাংলার বীর জনগণ পাকিস্তানি সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসনের অধিকার এবং গণতন্ত্রের জন্য যে অসীম সাহসী ও গৌরবজনক সংগ্রাম চালাচ্ছেন, সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো তাঁদের উষ্ণ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ অভিনন্দন জানাচ্ছে।... পূর্ববঙ্গের জনগণের মরণপণ, সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামকে অভিনন্দিত করে পলিট ব্যুরো এই আস্থা প্রকাশ করছে, খুব শীঘ্রই তাঁদের সংগ্রাম সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হবে।’
এদিকে আগ্রাসী মেজাজে পাক প্রশাসন। ২৫ মার্চ, ঢাকায় মধ্যরাতে পাক সামরিক জুন্টার অপারেশন সার্চলাইট। এক কালরাত। নিরপরাধ, ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালিকে গণহত্যা। ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার শেখ মুজিবুর রহমান। নিরস্ত্র অসহায় মানুষ পালাতে শুরু করেন ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলিতে। পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম এবং মেঘালয়ে। একইসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা।
বস্তুত, শুরু থেকেই বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম আর পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রামকে একাত্ম করে দেখেছিল সিপিআই(এম)। একদিকে মহান মুক্তিযুদ্ধে শোষিত, বঞ্চিত বাংলার মুক্তিকামী মানুষের সমর্থনে শুরু থেকেই দৃঢ় অবস্থান, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে পুলিশ, সিআরপিএফ, মিলিটারির দাপটের মুখে গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম– একইসঙ্গে দুই লড়াই। উদ্বাস্তু কলোনি, মহল্লায় তখন তুমুল উত্তেজনা। দিনভর রেডিওতে কান পেতে থাকা। চা-দোকানের আড্ডায় একটাই আলোচনা। এক-একটা মুক্তাঞ্চলের লড়াই, এক-একটা জয়ের খবরে পাড়ার গলিঘুঁজিতে মুহূর্তে মিছিল। নরসিংদীর শিবপুর রণাঙ্গন– বাংলার স্তালিনগ্রাদ। এক লড়াই। একই উদ্দীপনা।
পশ্চিমবঙ্গবাসীর উদ্দেশে সেদিন জ্যোতি বসু বলেন, ‘আমাদের বসে থাকলে চলবে না। ওষুধপত্র, টাকা-পয়সা আমাদের তুলতে হবে। রসদ আমাদের যোগাড় করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রামে সাহায্যের জন্য ডাক আসবে। একদিনের মাইনে দান করে লক্ষ লক্ষ টাকা তুলে দিন, যাতে সাহায্য করা যেতে পারে।’
জ্যোতি বসুকে সভাপতি করে ২ এপ্রিল গঠিত হয় একুশ জনের বাংলাদেশের সংহতি ও সাহায্য কমিটি। শুধু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ এই সাহায্য কমিটির আহ্বানে সাড়া দেননি, সাড়া দিয়েছিল গোটা দেশ। এই কমিটির আহ্বানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সাধ্যমতো বিভিন্ন সামগ্রী, ওষুধ ও অর্থ-সাহায্য পাঠায় কমিটির দপ্তরে। ৮-১২ এপ্রিল কলকাতায় হয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক। ২৫ এপ্রিল পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ডাকে দেশজুড়ে পালিত হয় ‘বাংলাদেশ সংহতি দিবস’। একইসঙ্গে, অর্থ সংগ্রহ করে বাংলাদেশের সংহতি ও সাহায্য কমিটি-র কাছে পাঠানোর আবেদন জানানো হয়।
জ্যোতি বসুর অনুরোধে সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ বাহিনীর ঝাঁসি ব্রিগেডের প্রধান লক্ষী সায়গল, ‘চট্টগ্রামের বিপ্লবী কন্যা’ কল্পনা দত্ত (যোশী) দিল্লির রাস্তায় নামেন ত্রাণ সংগ্রহে। ১৮ এপ্রিল, দিল্লির বিঠলভাই হাউসে এক সভায় জ্যোতি বসু বলেন, ‘বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দিতে হবে। অস্ত্রসহ সবরকম সহযোগিতা দিতে হবে। ভারত সরকার যদি এই ব্যবস্থা না করে, তবে গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে।’
ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মুজফ্ফর আহ্মদ বলেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের অত্যাচার থেকে মুক্ত হবার জন্য বাংলাদেশের মানুষরা যেভাবে সংগ্রাম চালিয়েছেন, তার তুলনা দুনিয়ার ইতিহাসে কম। আমি বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমি একজন অক্ষম অসমর্থ বৃদ্ধ। যদি আমার শরীরে শক্তি থাকতো, তাহলে আমিও বাংলাদেশের মুক্তি ফৌজে যোগ দিতাম।’ তখন তাঁর বয়েস ৮২।
এপ্রিলে পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য ও লোকসভায় সিপিআই(এম) গ্রুপের নেতা এ কে গোপালনের নেতৃত্বে পার্টির সাংসদরা দেখা করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে। বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানান। ইন্দিরা গান্ধী পালটা প্রশ্ন করেন: ‘বাংলাদেশে সরকার কোথায়? কাকে স্বীকৃতি দেব?’
১০ এপ্রিল আগরতলার সার্কিট হাউসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সদস্য ও প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যেরা এক সভায় মিলিত হয়ে শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে (তিনি তখন পশ্চিম পাকিস্তানের জেলে বন্দি) সৈয়দ নজরুল ইসলামকে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদকে প্রধানমন্ত্রী করে অস্থায়ী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে সেদিন আগরতলায় তা ঘোষণা করা হয়নি। ১৪ এপ্রিল, বাংলাদেরশের ভূখণ্ডে অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীরা শপথ নেন। এখবর প্রচার পেতেই কলকাতা, আগরতলায় সিপিআই(এম)-র ডাকে বের হয় মিছিল।
১-২ জুন, চরম গোপনীয়তায় কলকাতার বেলেঘাটার একটি স্কুলে মিলিত হন যুদ্ধরত কমিউনিস্টসহ বামপন্থী দল এবং গণসংগঠনগুলির নেতৃবৃন্দ। খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে সেই বৈঠকের নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল সিপিআই(এম)। কারণ একদিকে তখন ভারত সরকার বামপন্থী-কমিউনিস্টদের ‘মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা’ নিয়ে সন্দিহান, তাই তাঁরা সবসময় তাঁদের রাখছিলেন নজরদারিতে। অন্যদিকে নকশালপন্থীরা, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধকে ‘দুই কুকুরের কামড়াকামড়ি’ বলে অভিহিত করে কার্যত নিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধী অবস্থান। সেই বৈঠকে মওলানা ভাসানী উপস্থিত থাকতে না পারলেও, তাঁকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ সমন্বয় কমিটি। সিদ্ধান্ত হয়, প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকার করেই এই সমন্বয় কমিটি যেমন সেই সরকারকে সহযোগিতা করবে, তেমনি স্বতন্ত্রভাবেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবে। এই সমন্বয় কমিটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দল ছিল ন্যাপ (ভাসানী) এবং রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনোর কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটি, যার নেতৃত্বে তখন সারাদেশে ছিল ১৪টি সশস্ত্র ঘাঁটি এলাকা।
সেদিন জনসঙ্ঘ (আজকের বিজেপি)-সহ কয়েকটি দল পাকিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপের জন্য ভারতের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। ১৬ জুন, সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলে, পাকিস্তানের উপর ভারত সরকারের কোনওরকম সশস্ত্র হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের মধ্যে চলতে থাকা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে পরিণত করবে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সংঘাতে। যেমন চাইছেন ইয়াহিয়া খানের সামরিক জোট ও তার মদতদাতারা। আর যার মারাত্মক বিপর্যয়কর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের প্রতিরোধ সংগ্রামে।
চীন ও সোভিয়েতের ভূমিকার সেদিন নির্মোহ বিশ্লেষণ করেছিল সিপিআই(এম)। ১৯৬৪-তে সিপিআই(এম) প্রতিষ্ঠার পর চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে কোনও ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক ছিল না। সিপিআই(এম) স্বাধীনভাবেই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের বৈজ্ঞানিক মতাদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করত। ১৯৭১ সালে একমাত্র ভিয়েতনামের সঙ্গে সিপিআই(এম)-র বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। বাংলাদেশের জনগণের মুক্তি সংগ্রাম সম্পর্কে তাঁদের সঙ্গে একাধিকবার মতবিনিময় হয়।
চীনের মূলত দু’টি বক্তব্য ছিল: এক) বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ভারত সরকারের তৈরি সংগ্রাম। দুই) এটা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। এর প্রতিক্রিয়ায় স্বাধীন পার্টি হিসেবে সিপিআই(এম) বলে চীনের বক্তব্য শুধু ভ্রান্ত নয়, অসত্যও। চীনের বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে অতীত অভিজ্ঞতার কোনও মিল নেই। শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক কর্তব্যের সঙ্গেও তা সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
পাশাপাশি, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ভারত-সোভিয়েত যে যৌথ বিবৃতি দেয়, পার্টি তারও প্রতিবাদ করে। এই বিবৃতিতে পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যেই বাংলাদেশের সমস্যার সমাধানের ইঙ্গিত ছিল। প্রতিবাদে পার্টির পলিট ব্যুরো বলে, ‘জঙ্গীশাহীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের কঠোর সংগ্রাম, প্রচণ্ড বাধা-বিপদের বিরুদ্ধে গেরিলাদের সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই এবং স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের জনগণের ক্রমবর্ধমান ঐক্য ও দৃঢ় সঙ্কল্প– এই পটভূমিতে ভারত-সোভিয়েতের যৌথ বিবৃতি অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক।’ আবার সোভিয়েতের ইতিবাচক ভূমিকার প্রতিও ছিল তার দৃঢ় সমর্থন।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে পর্যবেক্ষক পাঠানোর জন্য রাষ্ট্রসঙ্ঘে দাবি জানায় মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। সিপিআই(এম) সতর্ক করে দিয়ে বলে, এটি আসলে ইয়াহিয়া খানের সামরিক জমানাকে সাহায্য করা এবং বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে খতম করার লক্ষ্যে এক ষড়যন্ত্র।
শেষে ৪ ডিসেম্বর, ১৯৭১। পাকিস্তানের সামরিক জুন্টা ভারতের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ওইদিন এক বিবৃতিতে জ্যোতি বসু বলেন, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী যে বিরাট আকারে হামলা চালিয়েছে, তার থেকে ভারতের জনগণ এবং ভূখণ্ডকে রক্ষা করতে হবে। আর সেদিনই ভারত সরকারের কাছে আরজি জানিয়ে এক বিবৃতিতে সুন্দরাইয়া বলেন, প্রতিরোধ করা হোক পাক সরকারের আক্রমণকে, আর সাহায্য করা হোক বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রামকে।
অবশেষে ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে ৬ ডিসেম্বর জরুরি ভিত্তিতে বৈঠকে বসে সিপিআই(এম) পলিট ব্যুরো। স্বাগত জানায় ভারত সরকারের স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্তকে। ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাক সেনারা আত্মসমর্পণ করলে পলিট ব্যুরো দখলদারি জমানার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের জয়কে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে।
স্বীকৃতি দিতে বিলম্ব প্রসঙ্গে সেসময় পশ্চিমবঙ্গে পার্টির সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত লিখছেন, সেই ‘২৯ মার্চ আমরা দাবি জানালাম বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। অস্ত্রসহ সবরকম সাহায্য দিতে হবে। তখন ইন্দিরা গান্ধী সরকার যুক্তি তুললো– কাকে স্বীকার করব? সরকার কোথায়? কাকে অস্ত্র দেব? সেদিন যদি ইন্দিরা গান্ধী আমাদের দাবি মেনে চলতেন– তবে, ৯০ লাখ শরনার্থী ভারতে আসত না, ৯৩ হাজার সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যে সাড়ে ছ’ কোটি মানুষ অকুতোভয় সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের দশ লাখ প্রাণ দিতেন না। এই সরকারের আট মাস সময় লেগেছে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি জানাতে। তাঁদের সংগ্রামের তাৎপর্য বুঝতে।’
আরও পড়ুন: বাংলাদেশ, ‘হিন্দু চশমা’ ও ভারতের বিদেশনীতি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম
বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতি
একুশের চেতনা নিরপেক্ষ নয়
প্রকাশের তারিখ: ১৬-ডিসেম্বর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
