সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
উদারনৈতিক গণতন্ত্র বনাম রোজা
গৌতম গাঙ্গুলী
লুক্সেমবার্গের মার্কসবাদীদের সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন তিনি। জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে সমালোচনার ভিত্তি হল, উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নীতি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র আটকে থাকে রাজনৈতিক রাষ্ট্র ও সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে। আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকদের সমানাধিকার ঘোষণা করা হলেও উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে বিবেচনা করতে হবে উৎপাদক হিসাবে নাগরিকদের জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে। অর্থাৎ সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহে, বিশেষ করে উৎপাদনের জায়গায়। লুক্সেমবার্গ সমাজের আরো গণতান্ত্রিকীকরণ দাবি করেন যাতে মূল সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেগুলিতে পু্ঁজিপতিরা তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, সেগুলি গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

আজ রোজা লুক্সেমবার্গের জন্মদিন। ১৮৭১ সালের ৫ মার্চ তাঁর জন্ম। তৎকালীন জার-শাসিত রাশিয়া অধিকৃত পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করলেও, রাজনীতিতে হাতেখড়ি রাশিয়া অধিকৃত পোল্যান্ডের প্রোলেতারিয়েত পার্টিতে। তাঁকে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের তাত্ত্বিক নেতৃত্বের অন্যতম অংশ হিসাবেই গোটা সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মীরা চেনেন। দর্শন,অর্থনীতি, সংগ্রামের রণনীতি ও কৌশল সম্পর্কে মার্কসবাদকে অনুসরণ করেই নিজস্ব অবস্থান নিতে সক্ষম ছিলেন রোজা। তাঁর সময়ে নিজের মত যাচাই ও প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অন্যতম।
উদারনৈতিক গণতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর সমালোচনা ও অবস্থান এই লেখার মূল উপজীব্য। লুক্সেমবার্গের মার্কসবাদীদের সঙ্গে বিতর্কে অবতীর্ণ হয়েছেন তিনি। জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে সমালোচনার ভিত্তি হল, উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নীতি ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র আটকে থাকে রাজনৈতিক রাষ্ট্র ও সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে। আনুষ্ঠানিকভাবে নাগরিকদের সমানাধিকার ঘোষণা করা হলেও উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে বিবেচনা করতে হবে উৎপাদক হিসাবে নাগরিকদের জীবনের পরিপ্রেক্ষিতে। অর্থাৎ সব ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহে, বিশেষ করে উৎপাদনের জায়গায়। লুক্সেমবার্গ সমাজের আরো গণতান্ত্রিকীকরণ দাবি করেন যাতে মূল সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ, যেগুলিতে পু্ঁজিপতিরা তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, সেগুলি গণতান্ত্রিক নাগরিক সমাজই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
লুক্সেমবার্গের মতে, বুর্জোয়া গণতন্ত্র হল পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের গাঁটছড়া। এরা নাগরিকদের সমানাধিকার দেয় নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার, মত প্রকাশের স্বাধীনতা,অ্যাসোশিয়েশন গড়ার ক্ষেত্রে। অন্যদিকে সম্পত্তির অধিকার ও তাতে বংশানুক্রমিক অধিকার চাপিয়ে দেয়। এতে তৈরি হয় বৈষম্যের দুস্তর পারাবার। লুক্সেমবার্গের কাছে অর্থনীতি মুক্ত বা অবাধ বিনিময়ের এক স্বাভাবিক রাজত্ব নয়। তা হ'ল দুটি অসম শ্রেণির মধ্যেকার সামাজিক সম্পর্ক, যে সম্পর্ক পুঁজিপতিকে সাহায্য করে শ্রমকে সংগঠিত ও নিয়ন্ত্রণ করতে। একদিকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমানাধিকার। অন্যদিকে ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও মজুরি শ্রমের ব্যবস্থাপনায় জবরদস্তি ও আধিপত্য বজায় রাখা। এই কাজ করতে গিয়ে অর্থাৎ লুঠ ও আধিপত্য বজায় রাখতে পুঁজিবাদকে রাজনৈতিক ও বিচার ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হয় না। মজুরি শ্রমের ব্যবস্থাই শ্রমিক ও পুঁজিপতিদের মধ্যেকার অর্থনৈতিক সম্পর্কে তাদের মধ্যেকার আধিপত্যের প্রশ্নটি সুনিশ্চিত করে দেয়।
রোজার যুক্তি হল, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুঁজিপতিদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য সুবিধা প্রদান করে। ফলে যে কোনও গণতান্ত্রিক সরকারের ক্ষমতা পুঁজিপতিদের ক্ষমতার দ্বারা বাধা প্রাপ্ত হয়। গণতান্ত্রিক নির্বাচন এইরকম একটা ধারণা দেয় যে সব অংশের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার গোটা সমাজেরই স্বার্থবাহী। আসলে পুঁজিপতিদের স্বার্থই সেখানে আধিপত্যকারী। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী আধিপত্যের এই ধরণের সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার এই দ্বন্দ্বকেই লুক্সেমবার্গ অ্যাখ্যা দিয়েছেন ‘সংসদসর্বস্বতা’ হিসাবে।
লুক্সেমবার্গ এই ধারণাকে প্রত্যাখান করেন যে পুঁজিবাদ ও গণতন্ত্র ঐতিহাসিক বিকাশের পথে একে অন্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। তিনি গণতান্ত্রিক জীবনের বিকাশের এক অ-পুঁজিপতি ধরণের পক্ষে সওয়াল করেছেন। তিনি গণতন্ত্রকে দেখেছেন এক বিকাশমান শক্তি হিসাবে যা সমাজতন্ত্রে উত্তরণের জন্য এক মূল্যবান ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি তিনি এই ধারণাও খারিজ করেছেন যে , সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য গণতন্ত্র। তিনি খারিজ করেছেন এই ধারণাও যে গণতন্ত্রের প্রসার এক অবশ্যম্ভাবী সামাজিক শক্তি যা আসলে শ্রমিক আন্দোলনের সমাজতান্ত্রিক দাবিসমূহকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়। কিন্তু গণতন্ত্রের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান সমূহ প্রায়োগিক ও গণতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের পূর্বশর্তকে পূরণ করার লক্ষ্যে প্রায়োগিক ক্ষেত্রে তা জরুরি। পূর্ব শর্তগুলি হ'ল সর্বজনীন ভোটাধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা, সীমাবদ্ধ মাত্রায় হলেও আঞ্চলিক স্বশাসন ইত্যাদি। সমবেত হওয়া,সমাবেশ সংগঠিত করা, আইনি ভাবেই রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়া—এই সব বিষয়গুলি সমাজতন্ত্রীদের গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে ও রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য লড়তে সাহায্য করে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারলে শ্রমিকরা আরও বেশি করে তাদের শ্রেণিস্বার্থ বুঝতে পারেন। সচেতন হন আরও ন্যায়সঙ্গত ও সমান অধিকার সম্পন্ন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে। লুক্সেমবার্গের এই অবস্থান কিন্তু নির্দিষ্টভাবে পুঁজিবাদী অর্থনীতির সেই সংসদ সম্পর্কে যেখানে আসল বা মূল ক্ষমতা কুক্ষিগত থাকে সামরিক বাহিনী, জমির মালিক ও সরকারের প্রশাসনিক অধিকর্তাদের হাতে।
বুর্জোয়া উদারনৈতিক গণতন্ত্র সম্পর্কে রোজা লুক্সেমবার্গের এই সমালোচনায় যা স্পষ্ট তা হ'ল,গণতন্ত্রের মূল নীতিসমূহ খুবই সংকীর্ণ ও সীমাবদ্ধ ভাবে প্রয়োগ করা হয়। এর ফলাফল হল, সমাজে অগণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে যাওয়ার কারণে দ্বন্দ্বের সৃজন। উদারনৈতিক বুর্জোয়া গণতন্ত্রের যে গণতান্ত্রিক সমালোচনা রোজা হাজির করেছেন,তার ভিত্তি হ'ল তাঁর একটি যুক্তিযুক্ত অবস্থান। উদারনৈতিক গণতন্ত্র সমতা ও স্বাধীনতার যে প্রতিশ্রুতি দেয়, সে সর্বদাই তা রক্ষা করতে অক্ষম। কারণ আধিপত্য ও শোষণের সংরক্ষণ এই ব্যবস্থাতে থাকবেই। তিনি যে কথার উপর জোর দিয়েছেন তা হল, ‘সামাজিক অসাম্যের কঠোর মর্মবস্তু ও সুমিষ্ট খোলসে ঢাকা আনুষ্ঠানিক সমতা ও স্বাধীনতা’কে উন্মোচিত করেই কেবলমাত্র গণতন্ত্রের এক পূর্ণাঙ্গ ছবি বিকশিত হতে পারে।
প্রকাশের তারিখ: ০৫-মার্চ-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
