সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
একটি প্রতিবেদন: চিত্তপ্রসাদ
শিবাদিত্য দাশগুপ্ত
‘দেশের নানা অংশে কৃষক সম্মেলনগুলিতে সে-সময়ে কৃষকেরা তাদের সর্বভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতোই চিত্তপ্রসাদকে দেখবার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকতেন। একবার মহারাষ্ট্রের কোনও এক কৃষক সম্মেলনে ছবি আঁকতে গিয়ে শিল্পী তাঁদের হাতে আটক হয়ে গেলেন। প্রায় মাস দুয়েক ধরে গ্রামের পর গ্রামের দরিদ্র কৃষকেরা তাঁকে ভালবাসার বন্ধনে বেঁধে সমস্ত দক্ষিণ-পশ্চিম মহারাষ্ট্র ঘুরিয়ে দিয়েছিল।’ এইভাবেই কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে চিত্তপ্রসাদের সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল প্রান্তিক মানুষ ও তার নানা অভিব্যক্তির চিত্রণ।'

‘ওরে রে প্রকাণ্ড-কাণ্ড প্রমত্ত মাতাল,
তোমার বিচিত্র পত্রে হৃদয়-চাতাল
স্নেহ-লিপ্ত, পিচ্ছিল প্রণয় নির্যাসে।
অনুরাগ-রক্তছটা বিচ্ছুরিত প্রাণের আকাশে।
তোমার বেদনা বুঝি উজ্জীবিত শিল্পের গভীরে
আমারও বেদনা জেনো পুঞ্জীভূত চেতনার তীরে...’
(শতবর্ষীয়ান: জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র)
এই কবিতাংশটি চিঠির বয়ানে গণনাট্য সংঘের প্রতীক দুন্দুভি-নিনাদরত বলিষ্ঠ অবয়বটির চিত্রী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যকে লিখেছিলেন সংঘ-সঙ্গীতকার জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। গণনাট্য সংঘের অস্তিত্বের সঙ্গে চল্লিশ দশকের (বামপন্থী আদর্শের সূত্র ধরে বাংলার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে যে উজ্জীবন ঘটেছিল) এই শিল্পীদ্বয়ের সৃজনকর্মের উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সামগ্রিক সৃষ্টি ও জীবনযাপন নিয়ে চর্চার পরিধি খুবই সীমিত। ফলে বর্তমান প্রজন্মের কাছে সাংস্কৃতিক বামপন্থার কোন্ উত্তরাধিকার তারা বহন করছেন, সে সম্পর্কে তাদের ধারণা স্পষ্ট তো নয়ই, বরং অনৈতিহাসিক, নানা বিভ্রান্তিকর ভাবনার প্রভাবে কিছুটা দিকশূন্য। তার ওপর গত শতাব্দীর শেষ দশক থেকে নয়া উদারবাদী ভুবনায়নের রাজনৈতিক বিস্তার মানুষের সমাজগত নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ধ্যানধারণাকে তার মতো করে প্রভাবিত করতে শুরু করল। অন্যদিকে প্রায় সমসময়েই সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়, পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের ভাঙন, বার্লিনের দেওয়াল ভাঙা প্রভৃতি ঘটনা প্রায় নির্বিরোধ করে দিল এক আদলে বিশ্ব ব্যবস্থার উত্থান। যে বিশ্বব্যবস্থার উন্মেষ হল তার নির্ধারকরা মনোজগতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে শ্বাশত ভাবনার জগতকে বিশৃঙ্খল করার ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকল। যার ফলে দেশকাল-সমাজবিচ্ছিন্ন, শিকড়হীন, জীবন- বিযুক্ত ‘সংস্কৃতি’হীন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ক্রমশ বিস্তার লাভ করল। ইতিহাসকে স্মৃতিচারিতার ছাপ মেরে ব্যক্তিস্মৃতি চারণকে ইতিহাসের সমান্তরাল করে নাটক, চলচ্চিত্র, গান কবিতা তৈরি করে ঐতিহাসিকতাকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেবার চেষ্টা হচ্ছে আজ। এমতাবস্থায় বিগত দিনের বিকল্প সাংস্কৃতিক স্রষ্টা ও তাদের সৃষ্টিকে ঘিরে পুনরালোচনা একান্ত জরুরি নতুন এই বিশ্বব্যবস্থায় সেই উত্তরাধিকারকে বয়ে নিয়ে যাওয়ার পথ নির্ধারণের জন্য। অতীতকে বা ঐতিহ্যকে অবজ্ঞা বা অবহেলা করে বাম সাংস্কৃতিক সংগঠনের সময়ানুগ পুর্ণবিন্যাসকে কোনও প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা প্রকারান্তরে নয়া উদারবাদ নির্ধারকদের পরিকল্পনার ভাবধারারই স্রোতের টানে ভেসে যাওয়া। এই দ্বিধান্বিত সংকটময় পরিস্থিতিতে বিকল্প ভাবধারাকে প্রসারিত করার দায়বোধ থেকে, বিকল্প ধারায় সাংস্কৃতিক সৃজনকে ব্যাপ্ত করার লক্ষ্যে শতবর্ষ উত্তীর্ণ চিত্তপ্রসাদের ৬৩ বছরের জীবনযাপন ও তার সৃষ্টির বিস্তারকে এই স্বল্প পরিসরে বুঝে নেবার চেষ্টা করা শুধু অতীতচারণা নয়। বরং বিষয়, আঙ্গিক ও শিল্প-ভাবনার তীক্ষ্ণতা আমাদের ভাবনাকে হয়তো আলোড়িত করতে পারে। ১৯১৫ সালের ১৫ মে নৈহাটিতে জন্ম চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের। আদি নিবাস হুগলি জেলার চুঁচুড়ায়। বাবা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য সরকারি চাকুরিজীবী ও মা ইন্দুমতী দেবী শিল্প-সাহিত্য-সংগীতে আগ্রহী ও মহিলাদের সমাজ সংস্কারমূলক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন। ১৯২০ সালে বাবার চাকুরির সূত্রে বাঁকুড়ায় পরিবারের সঙ্গে চলে যান চিত্তপ্রসাদ। সেখানে ভট্টাচার্য পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে বাংলাভাষা, জ্যোর্তিবিদ্যা ও দেশীয় কলাচর্চার বিশিষ্ট অধ্যাপক যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধির (২০.১০.১৮৫৯-৩০.০৭.১৯৫৬) পরিবারের সঙ্গে। তাঁর কাছেই চিত্তপ্রসাদের হাতেখড়ি হয়, তিনি নাম রাখেন ‘চক্রপাণি’। বাঁকুড়াতেই ১৯২৭ পর্যন্ত প্রথমে স্কুলডাঙার ‘বঙ্গবিদ্যালয়’-এ ও পরে ‘বাঁকুড়া মিউসিপ্যাল স্কুল'-এ পড়াশোনা করেন। এর পাশাপাশি যোগেশচন্দ্র রায়ের শিল্পকলা সংক্রান্ত বিপুল গ্রন্থের সংগ্রহ বালক চিত্তপ্রসাদের অভিক্রমের ভিত্তি গড়ে তোলে, যার প্রভাবে ১৩ বছর বয়সেই শিল্পের প্রতি তার ঐকান্তিক আকর্ষণ তৈরি হয়। মুরারি গুপ্তকে ১৯.১.৬৯ তারিখের এক চিঠিতে চিত্তপ্রসাদ লিখছেন ‘... আমার বই সংগ্রহের ব্যাধির স্বপক্ষে কিছু কথা মনে এল, তোমায় বলি। ব্যাধি বলেই শুরু করছি, কারণ ওটা সত্যি গরিবের ঘোড়া রোগ শ্রেণির এবং আমি গরিব সে বিষয়ে আমার নিজেরই কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু রোগটা পেয়েছিলাম অতি শৈশবে — মায়ের কিছুটা ছিল, যদিও রোগের পর্যায়ে নয়। তার চেয়েও বেশি করে বোধ হয় ছোঁয়াচ লেগেছিল বাংলার সেরা পণ্ডিতদের একজন, অধ্যাপক যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধির কাছ থেকে। অতি বাল্যকালে বাঁকুড়ায় নতুন চটি পাড়ায় তাঁর বাগানে ঘেরা সুন্দর বাড়িতে তিনি আমায় তাঁর কাছে রেখেছিলেন। মায়ের সই ছিলেন তাঁর ছেলের বউ, সেই হিসেবে তিনি আমায় তাঁর নাতি করে নিয়ে কাছে রেখেছিলেন মাস ছয়েক। সারাদিন আমি তাঁর লাইব্রেরির বইয়ের ধুলো ঝাড়তাম আর পত্রিকার ছবি দেখতাম। ‘প্রবাসী’র অনেক ছবি আর তখনকার ‘ভারতবর্ষ’-এর মলাটের ‘খ্যাতনামাদের’ portraits সব কেটে আমায় দিয়েছিলেন— ধুলোঝাড়া আর পত্রিকা গোছানোর বকশিস হিসেবে। আর এক বাক্স water colours-ও একদিন এনে দিলেন।
১৯২৮-এ চট্টগ্রামে চলে যান চিত্তপ্রসাদ সপরিবারে, ভর্তি হন চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলে। সেখান থেকেই ১৯৩১-এ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে আই.এ. ক্লাসে ভর্তি হন। চট্টগ্রাম নিবাসী তথা মুম্বই-প্রবাসী বাঙালি চিত্রশিল্পী সমর দাশগুপ্ত ‘চিত্ত’ স্মৃতিচারণামূলক রচনায় লিখছেন: “কৈশোর ছাড়িয়ে যৌবনে পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে চিত্ত একরূপ নিঃসঙ্গ। Creative mind সাধারণত যে কোনো লোকের সঙ্গলাভ করে তৃপ্ত হতে পারে না। চিত্তও পারেনি। তাই চাটগাঁয়ে যদ্দূর দেখেছি মাত্র কয়েকজন ছাড়া সে কারও সঙ্গে মিশত না। লেখাপড়াটা ছেড়ে দিল— মানে কলেজ যাওয়া বন্ধ করল। কিন্তু ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬-১৭ ঘণ্টা বই ও সংগীত অনুশীলনে ডুবে থাকত।
ইংরেজি ১৯৩১ সালে চিত্তর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। কেবল দেখে দেখে এবং বই পড়ে সে ছবি আঁকা আরম্ভ করল। অতি কাঁচা হাতের সাবলীল সৃষ্টি আমার বেশ লাগত। আমি খুব উৎসাহ দিতাম। ১৯৩২ সালে মাত্র ১৫ দিন আগে, আমার ছোট ভাইয়ের কাছ থেকে গরমের ছুটিতে আমার দেশে যাওয়ার খবর পেয়ে, সে ১২টি পটের টেকনিকে ছবি আঁকে- যাতে আমি চাটগাঁ পৌঁছলে আমাকে দেখাতে পারে— কী নতুন কাজ সে করেছে। চাটগাঁ পৌঁছে সেগুলি দেখে আমি তো ‘থ’– একেবারে ‘থ’। অশিক্ষিত অপটু হাতে আঁকা এই যদি তার কাজ হয়, তবে আর্ট স্কুলে পড়লে এই ছেলে কী করত ভাবা যায় না। তা থেকে কয়েকখানি ছবি আমি মুম্বই ফেরার সময় নিয়ে এসেছিলাম, রমেনবাবু (রমেন চক্রবর্তী) ও অতুলবাবুকে (অতুল বসু) দেখাব বলে। তাঁদের দেখিয়েও ছিলাম। ওঁরা তো অবাক। রমেনবাবু বলেছিলেন যে—‘এই standard-এর পট বাঙলাদেশে এখনও এক নন্দবাবু ছাড়া কেউ আঁকতে পারবে না।’ রমেনবাবু তাঁর গুরু নন্দলালকে—চিত্তকে introduce করে একটা চিঠি দিয়েছিলেন, যা নিয়ে চিত্ত শান্তিনিকেতনে গিয়ে নন্দবাবুর সঙ্গে দেখা করে। নন্দবাবু এছাড়াও চিত্তের অন্যান্য কাজগুলি দেখে বলেছিলেন, ‘তোমার তো শেখা হয়ে গেছে— নতুন করে আর শিখবে কী?’ এই কথায় সে নন্দবাবুকে ভুল বুঝে এত বিক্ষুব্ধ হয়েছিল যে তক্ষুনি শান্তিনিকেতন ত্যাগ করে আসে। This is what Chitta was’। যদিও এরপর শান্তিনিকেতনে সোমনাথ হোড়ের কাছে চিত্তপ্রসাদের করা linocut দেখে নন্দলাল বসু তাকে উৎসাহিত করে চিঠি লেখেন। সে চিঠি সম্পর্কে চিত্তপ্রসাদ ৩১ অক্টোবর ১৯৫২ সোমনাথ হোড়কে লেখেন : ‘নন্দবাবুর আশীর্বাদী যে চিঠিখানি পাঠিয়েছ তা পেয়ে যেমন অসীম আনন্দ হল তেমনি অবাক হলাম। অতটুকু কাজের অত বড় পুরস্কার আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না কাল সারাদিন। অনেকের প্রশংসা স্নেহ পেয়েছি জীবনে, কিন্তু নন্দবাবুর স্নেহ আশীর্বাদ যেন আমার কাছে স্বপ্নাতীত রকমের অপ্রত্যাশিত। আর কত বড় মূল্যবান আমার কাছে ওই চিঠিটুকু তা তোমায় বলে বোঝাতে পারব না। ভাই সোমনাথ, তুমি আমার বুকভরা ভালবাসা জেনো। আমার সকল শুভেচ্ছা তোমার উদ্দেশ্যে, তুমি আমায় আমার জীবনের এক অমূল্য পুরস্কার পাঠিয়েছো। একেক সময় মনে হচ্ছে অত বড় পুরস্কারের যোগ্য কাজ আমি আজো কিছুই করিনি। নন্দবাবুর হাতে খাতাটি সত্যি পৌঁছবে জানলে আরো যত্ন নিয়ে কাজটি করতাম। শুনেছি লোকের কাছে যে, নন্দবাবু সহজে চিঠিপত্র লেখেন না ভক্তদেরও। আর সেই নন্দবাবু নিজে থেকে ওই চিঠি লিখেছেন আমায়। বুঝতে পারি যে কাজকে তিনি কত ভালবাসেন। আমি তাঁকে নিশ্চয় লিখব আজকালের মধ্যেই। আনন্দের নেশাটা একটু থিতিয়ে নিই, এখন কিছু লিখতে নার্ভাস লাগছে আমার। তুমি যদি আজ আমার কাছে থাকতে তবে পাগলের মতো তোমায় বুকে ধরে নাচতাম ভাই, কিন্তু এমন কপাল আমার, আমার ঘরে আমি সম্পূর্ণ একা। একা একা দুঃখ ভোগ করা যায়, বোধহয় উচিতও তাই, কিন্তু আনন্দভোগ করা যায় না, কেমন তাই না? নন্দবাবুর চিঠির খবরে সবচেয়ে খুশি হবেন আমার মা, কারণ তাঁর কাছে ‘সবার উপরে শান্তিনিকেতন সত্য তাহার উপরে নাই।' আর খুশি হবেন দাদা — যোশী— আমার সমরদা। কিন্তু কেই বা খুশি হবেন না বলো।
নন্দবাবুর চিঠি পড়ে তাঁকে যেন নতুন করে দেখলাম এবার। তিনি ‘হাতের কায়দা’র চেয়ে ‘যাহা বলতে চাচ্ছি'-কে ‘ভালো কাজের মাপকাঠি করেছেন চিঠিতে, মানে ফর্মের উর্ধ্বে Contentকে। তাঁর নিজের কাজ থেকে এটি আমি বুঝতে পারিনি কখনো।’
জানা যায় নন্দলাল বসুর কথায় রাগত হয়ে শান্তিনিকেতন ত্যাগের পরবর্তী সময় কলকাতায় সরকারি আর্ট স্কুল ও জয়পুর আর্ট স্কুলে ভর্তি হয়েও প্রথাগত শিক্ষায় মন না ভরায় ছেড়ে দেন। স্বশিক্ষিত শিল্পী হিসেবেই নিজেকে গড়ে তুলতে থাকেন। ১৯৫৫ সালে আত্মজৈবনিক এক লেখায় লিখলেন : ‘There was a time when I used to dream of growing into a gigantic sculptor, even as much as all my great ancestors were, those who sculptured the glorious ancient Indian temples and built up temple-cities all over this land centuries and centuries ago. It took me a great deal of time and greater hardship of our times to knock the big dream off my head and heart. I used to dobble in clay modelling while at home, after seeing the village clay-image makers work all my boyhood; and I used to fashion out things in imitation of temple-sculptures as well as the painted clay-idols which has a rich long tradition of Bengal. I worked hard and for long in this craft till there was no more room in our house to store more wares. But I had early earned quite an admiration of the town-middle class as to earn a silver medal from a ‘Zamindar’ in a village education.’
ছবি আঁকার অনুশীলনে বিভোর হয়ে থাকলেও চিত্তপ্রসাদ ১৯৩৩-এ আই.এ. ও ১৯৩৫-এ চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বি.এ. পাশ করেন। বি.এ. পাশ করার পর শিল্পকলার পাশাপাশি চলতে থাকে নাচ, গান বাদ্যযন্ত্রের অনুশীলন। ধ্রুপদী ও লোকনৃত্যের প্রাথমিক পাঠ নেন মণি বর্ধনের কাছে। চট্টগ্রাম আর্যসংগীত সমিতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠাতা সুরেন্দ্রনাথ দাসের সংস্পর্শে আসেন। এই সমিতিকে ঘিরে নিখিল ভারত সংগীত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ভারতের বহু গুণী শিল্পীদের যাতায়াতের সুবাদে আলাউদ্দিন খাঁ প্রমুখ সংগীত গুরুদেরও সাহচর্য পান চিত্তপ্রসাদ। শিল্পের বিভিন্ন আঙ্গিকের চর্চা চলতে থাকলেও স্বপ্ন চিত্রশিল্পী হওয়ার। ১৯৪২ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে জাপানি বোমা পড়লে বাবা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য মেদিনীপুরে জজ কোর্ট রোডে একটি বাড়ি লিজ নিয়ে সপরিবারে সেখানে চলে যান। চিত্তপ্রসাদ চলে গেলেন চট্টগ্রাম শহর থেকে দূরে ডেঙ্গাপাড়া গ্রামে। উঠলেন গিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থক সুধীন দত্তের বাড়িতে। ১৯৩৯-এ ঢাকায় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’ গড়ে ওঠার পর ১৯৪০ থেকেই সংগঠনিক তৎপরতা পূর্ববঙ্গের (বর্তমানের বাংলাদেশে) বিভিন্ন জেলায় বিস্তার লাভ করে। ৮ মার্চ ১৯৪২ ঢাকার সুত্রাপুরে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’-র সম্মেলনে যাবার পথে মিছিলে ফ্যাসিস্ট শক্তির আক্রমণে সোমেন চন্দ নিহত হন। এর প্রতিবাদে ২৮ মার্চ ১৯৪২ ছাত্র ও শিল্পীরা কলকাতার ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটটিউট লাইব্রেরি হলের সভা থেকে গঠন করেন ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’। সিলেট, চট্টগ্রাম, ময়মনসিং, ঢাকা বরিশাল প্রভৃতি জেলার ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘে’র সাংস্কৃতিক কার্যবিধি সংগ্রামের রূপ নিয়ে দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এই সন্ধিক্ষণে হঠাৎই এক ঘটনার অভিঘাতে চিত্তপ্রসাদ অন্তর্মুখীনতা থেকে বেরিয়ে এসে জীবনের মূলস্রোতে মিশে যাবার যেন দিশা পেলেন।
পূর্বে উল্লেখিত আত্মজৈবনিক লেখটির একটি অংশে লিখছেন— ‘It will remain a red-letter day in whole of my life the day, rather the night, when a Chittagong young man with a peasant's face and hands walked into the room of a thatched mud-house where I was staying as a refugee from the town. It was a fateful evening for me not only because the young man made believe him when he claimed that the Chittagong peasantry could and would certainly resist the Japanese, but also, and chiefly because, for the first time in my life, he demanded of me primarily as an artist and in the name of my country and my people as well as in the name of freedom and progress, an active support in rousing and uniting the people against the Jap invasion…
…And it was during that very evening I heard, for the first time, the name of the Communist Party of India, in a cautious but soulful whisper because the Party was yet unlawful under the British rule and haunted by it.
And a new life began for me the very next morning, a morning of May, when I started to work on a series of anti-fascist posters which the young man with a peasant-face wanted me to "Write" for a future meeting of the peasant. But I did not "write" the posters, painted them all instead of words and letters playing all insignificant or even no role in some cases. These were paintings in every sense, in tempera and in wash; and I had experimented freely in form and style as the themes of horrors of war and fascism and of valour and heroism of our people were a new theme for my 'Indian Art.' And it was a joy to see with what delight and excitement and inspiration my young friend with a peasant-face welcomed these paintings several nights later when he came to take delivery of the posters. He was the first of a new fresh audience for a new fresh Indian Art who were yet to appear in my Art-world.’
কৈশোর যৌবনের অনুশীলিত পঞ্চ-অঙ্গুলি কোনও শব্দ বা অক্ষরের আশ্রয় না নিয়ে শুধু রেখার টানেই নয়, টেম্পেরা ও ওয়াশের সম্পূর্ণত দৃশ্যগতভাবে যুদ্ধের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পোস্টার তৈরি করার মধ্যে দিয়েই তার স্বকীয় চিত্রভাষার গঠনবিন্যাস ও শৈলি তৈরি হতে থাকল। সামাজিক দায়বোধের তাড়নায় সৃজনকর্মে যে জোয়ার এল তার প্রতিক্রিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও বাড়তে থাকলো। ১৯৪২-এর ২৩ জুলাই কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে সরকারি নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবার পরবর্তী সময়ই পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করেন চিত্তপ্রসাদ। চিত্তপ্রসাদ তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখায় নিজের উপলব্ধিকে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করে লিখছেন— ‘Today it may be a truism to observe that if anyone is in a position to learn anything from life, it is against the background of death, on the face of a devastating war, that one discovers for oneself some of the profoundest of truths about and most of worthwhile values of humanity; and one learns it in briefest time and directly, obviously of course, if one at all survives physically the monstrous contacts of a war to remain fit to learn a thing. It was against the background of last world war, that I, like many others from all walks of life and from all parts of the world, could grasp fully the simple fact that Art, above all, is one of the many other means of most effective human communications and as dynamic as human ideas and sentiments and as much involved with life as human beings themselves, and as ever changing...
... I was forced by circumstances to turn my brush into as sharp a weapon as I could make it. At the same time, I realised fully still another fact in a new light, that an artist stands in equal footing with the scientists in the society and in human history in his fundamental capacity of uniting and leading his fellow beings for an active denial of Death and destruction and barbarism, and for a doubly active and conscious assertion of creative and progressive rights and talents of his fellow-beings as well as his own. This realisation merged me and my artistic ambition completely with my contemporary world, that is, I not only began to see that Art was not only my weapon or not only artist's self-expression, but fundamentally Art is a weapon of his whole society, which includes himself, self-expression of his fellow beings to whom he belongs.’
১৯৪২-এর নভেম্বর-ডিসেম্বরে চট্টগ্রাম কমিউনিস্ট পার্টি সমগ্র জেলাজুড়ে সংগঠিত করে ‘একতা সপ্তাহ’ ফ্যাসিবিরোধী একতা প্রচারের নামে। তৈরি হয় পোস্টার, লিফলেট ও দেওয়াল পত্রিকা । এই কর্মকাণ্ডের সঙ্গে চিত্তপ্রসাদ গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যান। ক্রমশ তার কাজের পরিধি প্রসারিত হতে থাকে— শুধু ছবি আঁকা নয়, ছবির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, বিশেষত কমিউনিস্ট পার্টি মুখপত্র জনযুদ্ধ ও পিপলস ওয়ারে সংবাদদাতার ভূমিকাও পালন করতে থাকেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয় নিয়ে আয়োজিত যৌথ চিত্র প্রদর্শনীতে চিত্তপ্রসাদের আঁকা ছবি ছাপোষা মানুষজন থেকে সাংস্কৃতিক চেতনাসম্পন্ন চিন্তাবিদদের সঙ্গে সঙ্গে সংবাদপত্রের চিত্র সমালোচকদেরও ও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ১৯৪৩-এর নভেম্বরে ‘দুর্ভিক্ষ, অনাহার ও মৃত্যুমিছিলের মেদিনীপুর’ জেলা ঘুরে রেখায় ও লেখায় সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রকাশিত হয় চিত্তপ্রসাদের হাংরি বেঙ্গল। এইভাবে ভারতবর্ষে বিভিন্ন গ্রাম শহরে ঘুরে ঘুরে দৃশ্যগত দলিল তৈরি তাঁর ছবির অন্যতম বিশিষ্টতা। ভাস্কর প্রভাস সেন এই প্রসঙ্গে ‘চিত্তপ্রসাদ কিছু স্মৃতিচারণ’ লেখায় লিখছেন, ‘চিত্তপ্রসাদ গ্রাম-ভারতকে বিশেষ ভালবেসেছিলেন এবং গ্রামের শিশু ও মা, কর্মঠ কৃষক, ভূমিহীন চাষি শ্রমিকদের জীবনের সংগ্রাম তিনি তাঁর শিল্প মাধ্যমে মমতা মাখা যত্নে ও ক্রোধে প্রকাশ করেছেন।’
‘দেশের নানা অংশে কৃষক সম্মেলনগুলিতে সে-সময়ে কৃষকেরা তাদের সর্বভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের মতোই চিত্তপ্রসাদকে দেখবার জন্য প্রতীক্ষা করে থাকতেন। একবার মহারাষ্ট্রের কোনও এক কৃষক সম্মেলনে ছবি আঁকতে গিয়ে শিল্পী তাঁদের হাতে আটক হয়ে গেলেন। প্রায় মাস দুয়েক ধরে গ্রামের পর গ্রামের দরিদ্র কৃষকেরা তাঁকে ভালবাসার বন্ধনে বেঁধে সমস্ত দক্ষিণ-পশ্চিম মহারাষ্ট্র ঘুরিয়ে দিয়েছিল।’ এইভাবেই কমিউনিস্ট পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হিসেবে চিত্তপ্রসাদের সমগ্র অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল প্রান্তিক মানুষ ও তার নানা অভিব্যক্তির চিত্রণ। সেই সময় একশ্রেণির চিত্রবোদ্ধা তার এই শিল্পোত্তীর্ণ সৃষ্টিকে প্রোপাগাণ্ডা'র ছাপ মেরে নানা সমালোচনা করলে ১৯৪৩-এ ‘ছবির সংকট’ প্রবন্ধে তিনি লেখেন :
‘প্রোপাগান্ডা? — কোন ছবি একটা-না-একটা আদর্শের প্রোপাগান্ডা নয়! আর্ট?— আদর্শকে বা বক্তব্যকে প্রবল করে তোলার অবসর কোন বিষয়বস্তুর মধ্যে নেই! শিল্পীর স্বাধীনতা? – নিজের গণ্ডিতে বদ্ধ হয়ে বাইরের হাতে মার খাওয়াটাই কি স্বাধীনতা, না সমাজের ইতিহাস তৈরির কাজে সচেতনভাবে দায়িত্বগ্রহণ ও বীর্যের সঙ্গে সে দায়িত্ব পালন করে সমগ্র মানবসমাজের সঙ্গে মিলে এগিয়ে চলাই স্বাধীনতা! নতুন যুগকে বুঝতে হবে, নতুন যুগের আদর্শকেই সমাজে প্রতিষ্ঠিত করবার ভার নিতে হবে, তবেই চিত্রের সংকট দূর হবে, নইলে নয়। আর ছবি যদি একটা সৃজনশীল শক্তি হয় তবে তা শুধু আত্মকেন্দ্রিক হয়ে থাকতে পারে না, বিস্তৃতির তাগিদেই সে এগিয়ে আসবে আপন জীবনের পরিচয় দেবার ক্ষেত্রে। সে-ক্ষেত্রটাই হল সমাজ, সেই সমাজকে ভালো না বাসলে যেমন শিল্পীর বাঁচার উপায় নেই, আবার সেই সমাজের ভালবাসা অর্জন করতে না পারলেও ছবির বাঁচার উপায় নেই।
‘শুধু এ যুগের নয়, যুগযুগান্তের শিল্পের ফসল সবই শুধু একমাত্র শিল্পীসমাজের সম্পদ নয়, সকল নরনারীর ভালবাসা না পেলে তাদের অস্তিত্ব ব্যর্থ; আজ সেই ব্যর্থতার চেয়েও বড় বিপদ দেখা দিয়েছে— যে শিল্পকলা সমাজকে আপন স্বাধীনতা সম্বন্ধে সচেতন ও উদ্দীপ্ত করে তারই বিরুদ্ধে ফ্যাসিজম পাশবিক অভিযান চালিয়েছে। সেই অভিযানের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারে সকল নরনারীর সংঘবদ্ধ ও সচেতন প্রত্যাভিযান— একা কোনো শিল্পীর বা কোনো এক শিল্পীসম্প্রদায়ের সমাজসংস্পর্শহীন চেষ্টায় শিল্পসংস্কৃতির স্বাধীনতাকে ফ্যাসিজমের হাত থেকে বাঁচানো যাবে না।’
১৯৪২ থেকে ১৯৪৯ চিত্তপ্রসাদের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য থেকে সক্রিয় রাজনীতির পর্ব। ১৯৪৮-এ কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় সম্মেলনে রাজনৈতিক ভাবনাচিন্তার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়। তার প্রতিক্রিয়ায় সর্বভারতীয় সম্পাদকের পদ থেকে পি. সি. যোশী অপসারিত হয়ে সম্পাদক হন বি.টি. রণদিভে। পার্টির ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায়’ শ্লোগান যদিও পরবর্তী সময় ‘বাম বিচ্যুতি’ হিসেবেই চিহ্নিত হয়। পি.সি. যোশীর অপসারণ বেশ কিছু সাংস্কৃতিক মানুষজনকে পার্টি থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য করে। চিত্তপ্রসাদও সেই সময় সদস্য পদ প্রত্যাহার করেন। তবে তিনি কোনো প্রতিষ্ঠান-এর সঙ্গে যোগ দিয়ে আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ নেননি। এ প্রসঙ্গে রবিশঙ্কর তাঁর আত্মকথা ‘রাগ-অনুরাগ’-এ লিখছেন, ‘ওদের ভাল জিনিসগুলোকে সেই সময় মনের একটা বিশেষ কোণে জায়গা দিয়েছিলাম। অথচ স্কোয়াডের ওপর পার্টির অত্যন্ত কট্টর শাসন কেন জানি না আমাকে খুব ব্যতিব্যস্ত করে তুলছিল। তারপর একদিন, তা প্রায় বছর খানেক পর, আমি দলটা ছেড়ে দিলাম। আমরা ক'জন তখন—শান্তি এবং অবনী এবং হ্যাঁ আরও দুজন— নাচেতে দাদার দুই পট্ট-শিষ্য বলতে পার... আমার খুড়তুতো ভাই শচীনশঙ্কর এবং নরেন্দ্র শর্মা ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল থিয়েটারে যোগ দিলাম। তখন পেছনে কংগ্রেস। ... পণ্ডিত নেহরুর কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তখন আমরা দাঁড় করালাম পণ্ডিতজির ‘ডিসকভারি অব ইন্ডিয়া’র ভিত্তিতে করা ব্যালে।’ কিন্তু চিত্তপ্রসাদ যে দর্শন, যে বিশ্বাস নিয়ে শিল্পচেতনার তার যে সুরে বেঁধেছিলেন, তার সঙ্গে কোনোদিন আপস করেননি। শ্রী পান্থের কথায় তিনি ছিলেন ‘আমজনতার চিত্রদাস’।
হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ‘চিত্তপ্রসাদ স্মরণে’ রচনায় তাই লিখছেন, ‘চিত্তপ্রসাদের মতো প্রতিভাধর কমিউনিস্ট কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ায় বুক ভরা উদ্দীপনা নিয়ে আসা সত্ত্বেও এবং শেষ পর্যন্ত পার্টি সঙ্গ পরিহারের কথা বললেও, তিনি ছিলেন মনে প্রাণে একান্ত অবিচল সাম্যবাদী— মার্কস যাকে বলেছিলেন ‘The party in the grand historical sense of the term’। সেখানে তাঁর গৌরবময় অধিষ্ঠান। সুধী প্রধানও তার ‘চিত্তপ্রসাদ ও চল্লিশের মার্কসবাদী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে চিত্রকলার ভূমিকা’ নামক দীর্ঘ প্রবন্ধের শেষে লিখছেন, ‘যোশী পার্টি ছেড়ে চলে যাবার পর চিত্তপ্রসাদও পার্টির সদস্যপদ প্রত্যাহার করে নেন। বেরিয়ে গেলেন। It does not matter, they were not enemy of the Communist Party এবং They never went against the Communist Party।’ চিত্তপ্রসাদ বা সুনীল জানা, এঁরা কেউই কোনোদিন কমিউনিস্ট পার্টির বিরোধিতা করেননি। ১৯৫২তে আই.পি.টি.এ. কনফারেন্সে শম্ভু মিত্র যাননি। চিত্তপ্রসাদ বলছেন : এঁরা এখন তর্ক করছে art for life আর art for art’s sake নিয়ে। এর আর কী প্রয়োজন আছে?’ তাই ৩০ মে ১৯৫২ মুরারি গুপ্তকে লিখতে পারছেন:
‘প্রথম খবর CR-এ [Crossroad, মুম্বই থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক] আবার কাজ শুরু করেছি মাস দেড়েক হতে চলল। গোবিন্দ ( গোবিন্দ বিদ্যার্থী) একদিন কাঁচুমাচু মুখ করে ঢোক গিলে বললে, CR-এর ওরা তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায় ইত্যাদি। আমিও দেখলাম যে বাইরের লোকের ধারণা আমি নাকি পার্টি-বিরোধী প্রকারান্তরে, তাই নাকি CR-এ কাজ করি না, এটা ঘোচানো দরকার। তা ছাড়া কাগজটি এখন officially পার্টির মুখপত্র। আমার মতামতের ওপর কেউ ‘হস্তক্ষেপ’ করবেন না, তথাকথিত unity রক্ষার জন্যে— এটাই অকথিত বাণী হিসেবে এখনকার পার্টি নেতৃত্বের ‘নীতি আর সেই অনুসারে আমায় অপরের এবং অপরের আমার কেঁচো খুঁড়তে হবে না’—অন্তত অপরে সেই ভরসায় আছে। আমি জানি CR-এ কাজ করলে আমার যে ‘অধিকার’ বর্তাবে তা নিয়ে আমার সমালোচনার ‘দাম’ হবে। তারপর শত্রু হাসিয়ে তো লাভ নেই। বন্ধুদের confuse করেও বহু ক্ষতি। বিদেশেও নাকি কথা হয়েছে CR-এ কাজ করি না বলে। BTR-এর অনুচরদের কল্যাণে রটেছে যে আমার CR ছাড়ার মধ্যে Joshite দলাদলির প্রমাণ স্পষ্ট। এবং এই সূত্র ধরে বহু বন্ধুজনের ধারণা আমি পার্টি থেকে বেরিয়ে গেছি— এসব মিলিয়ে CR-এ ফিরে যাওয়ার হিত আছে বলা যায়। নিজের মতামত নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা যদি করি কর্মক্ষেত্রে তবেই opportunism হবে না।’
যে বোধ, যে চেতনা থেকে একদিন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন ঘটনার প্রতিঘাতে সদস্য না থাকলেও, সেই জীবনবোধ, সেই দায়বোধ, সেই বিশ্বাস থেকে কখনও নিজেকে সরিয়ে নেবার চেষ্টা করেননি। তাই কত সহজে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়কে চিঠিতে লিখতে পারেন—
‘But, Devi, you had no obligation to me. Why do you always mention it? It is our birth right to help each other, and you have helped beyond measure to let me do a piece of work worthy of both of us. This is comradeship, so it is much beyond any sense of obligation between us, isn't it?’
চিত্তপ্রসাদের মনের, তার চিত্রভাবনার রসায়ন বোঝাতে গেলে মনে পড়ছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূজা পর্বের সেই গানের কলি—
‘একমনে তোর একতারাতে একটি যে তার সেইটি বাজা,…………
……ফিরিস নে আর হাজার টানে,
যেন রে তোর হৃদয় জানে হৃদয়ে তোর আছেন রাজা,
একতারাতে একটি যে তার আন-মনে সেইটি বাজা।’
একতারার একটা তারের মতো চিত্তপ্রসাদের অন্তরতম প্রদেশ জুড়ে ছিল প্রান্তিক মানুষ। সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ‘ভাগ্যিস! চিত্ত আজ আর বেঁচে নেই’ লেখাতে লিখছেন : ‘চিত্তর ছবিতে, আমার মনে হয়েছে, মার্ক্সিজমের প্রশ্ন যত না উঠেছে, তার চেয়ে আর একটু বেশি অর্থাৎ মার্ক্সিজমের মূল কথাটা যে মানুষ, সেই মানুষের কথাই ঘুরে ফিরে এসেছে তাঁর ছবিতে। মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে আমরা পীড়িত হয়েছি, এই সমস্যাগুলো থেকে যখন বেরোবার পথ খুঁজেছি তখন মার্ক্সিজম এসেছে। মার্ক্সিজমের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আদর্শগত প্রশ্নগুলোর ভিতর চিত্ত খুব একটা জড়িত ছিল বলে আমার মনে হয় না। তার কোনও প্রমাণও পাইনি। কিন্তু মার্ক্সিজমের ওই যে মূল কথাটা, যেটা মানুষ, এটা প্রথম থেকেই চিত্তর ছবিতে প্রকাশ পেয়েছে। যখন সে প্রেমের ছবি এঁকেছে, তার ভিতরেও কিন্তু মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখা, প্রকৃতির সব থেকে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসাবে দেখা, সেইটাই প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর সব ছবিই যে রিয়ালিস্টিক তা মোটেই নয়। তার ভিতরেও যথেষ্ট অ্যাবস্ট্রাকশন আছে। কিন্তু সেখানে যেটা বড় শক্তি হিসাবে কাজ করেছে তা হল মানুষকে মানুষ হিসাবে দেখা হয়েছে। তাঁর ছবির যে জোরালো রেখা, যে শক্তিশালী গাঠনিকতা সেটাও আমার কাছে খুবই প্রতীকি বলেই মনে হয়েছে। মনে হয়েছে এগুলোর মধ্যে দিয়ে সে বলতে চেয়েছে দেখো, মানুষ কত শক্তিমান। সেগুলো হয়তো ডিস্টর্টেড, কিন্তু এই ডিস্টরশনের ভিতর দিয়েই মানুষের শক্তিটাকেই সে বড় করে দেখাতে চেয়েছে। জয়নুল আবেদিনকে আমি যখন শেষ দেখি তার কয়েক বছর পর তিনি মারা যান। এই সময় তিনি আমাকে তাঁর যে সমস্ত ছবি দেখান সেখানেও সবসময়ই মানুষকে খুঁজে পেয়েছি। সেই একই ট্র্যাডিশন। সেই একই জিনিস। এটা এখনকার কাজের মধ্যে পাওয়া যায় না। খুব সফিস্টিকেটেড কাজ দেখে ভাল লাগে। কিন্তু সেখানে মানুষকে খুঁজে পাই না। সোমনাথের (হোড়) কাজের ভিতরে সে আভাস পাওয়া যায়। মীরা মুখার্জীর কাজের মধ্যে সে জিনিস খুব ভালভাবেই পাওয়া যায়। যেজন্য তাঁর কাজ আমার ভীষণ ভাল লাগে। এরকম ব্যতিক্রম তো নিশ্চয়ই আছে।
তুলুজ লোত্রেক খুব পাওয়ারফুল পোস্টার আঁকতেন। এবং সে পোস্টারগুলো কিন্তু শিল্পই। চিত্তপ্রসাদও খুব পাওয়ারফুল ছবি আঁকতেন। সে ছবিগুলোও কিন্তু মানুষকে মুভ করে। একটা নাটক, একটা কবিতা, একটা ভাল গান, একটা নাচ, যে নাচ মানুষের কথা বলে, সেই নাচ যেমন মানুষকে মুভ করে, চিত্তর ছবিও সেইভাবেই মানুষকে মুভ করে। কোনও তফাত নেই। সিনেমাও মুভ করে। সিনেমা যদি মুভ না করত তাহলে আইজেনস্টাইনের ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন'-এর ওইরকম ইমপ্যাক্ট হত না।
চিত্তপ্রসাদ সারা জীবন ধরে চারপাশের বহমান সময়কে নিয়ে নিজের অনুভবকে ছবির মধ্য দিয়ে মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার চেষ্টাই করে গেছেন। ক্রমান্বয়ে ব্যাপকতর মানুষের কাছে পৌঁছনোর আর্তিই তাকে লিনোকাট, উডকাট মাধ্যমের ব্যবহারে অনন্যতা দিয়েছে। এই সম্পর্কে শ্রীপান্থ (নিখিল সরকার) তার ‘দায়’ গ্রন্থের ‘পঞ্চাশের মন্বন্তর : শিল্পীর দায়’ প্রবন্ধে চিত্তপ্রসাদ সম্পর্কে লিখছেন, ... ‘চিত্তপ্রসাদের তাড়না ছিল দ্রুত অধিক সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছনো। তিনি কোনও চিত্রশালা বা কোনও সম্পন্ন চিত্ররসিকের কথা ভেবে ছবি আঁকেননি। ছবিকে তিনি ব্যবহার করতে চেয়েছেন তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাস প্রচারের বাহন হিসাবে। কখনও তিনি যেমন তাঁদের দুঃখদৈন্য এবং যন্ত্রণার প্রতি অবশিষ্ট সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চান, কখনও আবার চান সহযোদ্ধা হিসাবে সাধারণ মানুষকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে। আর সে কারণেই দেখি লিনোকাট, উডকাট, সাদা-কালো ড্রয়িং তাঁর প্রিয় চিত্রভাষা। উনিশ শতকের শেষ দিকে ছাপাই ছবির একটা ধারা গড়ে উঠেছিল কলকাতায়। পাথর ছাপ, কাঠ খোদাই, ধাতু খোদাই ইত্যাদি। সস্তার ছবি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে। কালীঘাটের পটের মতো সে সব ছবি একদিকে যেমন সাধারণের আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মেটাত, তেমনি তাঁদের সৌন্দর্যবোধকেও কিছু পরিমাণে তৃপ্ত করত। চিত্তপ্রসাদের ছবি সে ধারার হয়েও সম্পূর্ণ অন্যরকম। কখনও তা অস্বস্তিকর প্রশ্ন জাগায়, কখনও প্ররোচনামূলক, কখনও বা সরাসরি বিদ্রোহের সমর্থক, তবে যে কোনও দর্শকই মানবেন, রাজনৈতিক শিল্পী হলেও চিত্তপ্রসাদ শিল্পের নান্দনিক শর্ত লঙ্ঘন করেননি কখনও।’ চিত্তপ্রসাদ ছাপাই ছবি ছাড়া জল রং, তেল রং, প্যাস্টেল, স্ক্র্যাপার বোর্ড মাধ্যমে কাজ করলেও তার অধিকাংশ ছবি লিনোকাট, উডকাট-এর ও সাদা-কালোর নিজস্ব শৈলির বলিষ্ঠ রেখার। যে কোন শিল্পীই যখন কোনও মাধ্যমে স্বচ্ছন্দ্য বোধ করেন তখন পাশাপাশি দুটি বিষয় কাজ করে। নিজের অঙ্কন বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী মাধ্যমটির সম্ভাবনা ও শিল্পীর ঈন্সিত চিত্ররূপকে মানসচক্ষে কল্পনা করা। চিত্তপ্রসাদ এই দুয়ের মেলবন্ধন পেয়েছিলেন ছাপচিত্রের মধ্যে। এই সম্পর্কে কলাভবনের শিল্প ইতিহাসের অধ্যাপক ডঃ সঞ্জয় মল্লিক লিখছেন : ‘চিত্তপ্রসাদের ছবিতে দৃঢ় রৈখিক গঠন এবং সাদা-কালোর শক্তিশালী বিন্যাস থেকে ছাপচিত্রের প্রতি তাঁর স্বাভাবিক আকর্ষণ উপলব্ধি করা যায়। আবার একদিকে যেমন লিনোকাট-চিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে চিত্তপ্রসাদের মানস-চিত্রের সঙ্গে মেলানো যায়, অন্যদিকে লিনোকাট বা উডকাট-এর মতো প্রকাশমাধ্যমের যে গণতান্ত্রিক প্রয়োগের ইতিহাস সাক্ষী, চিত্তপ্রসাদের মতো শিল্পীর সহজ সরল ছাপচিত্রের সে চরিত্রগত আবেদনও নিশ্চয় মাধ্যম নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক ছিল। ছাপচিত্রে কাঠের ব্যবহারে যে উডকাট পদ্ধতিতে ছবি সৃষ্টি হয় তার থেকে লিনোলিয়ামে প্রস্তুত ছবির কিছু মূল পার্থক্য এই যে, নরম ও আঁশ-তন্তুহীন সমজাতীয় বস্তু হওয়ার ফলে তাতে তৈরি ছাপচিত্রের ব্লকে রেখা ও আকৃতির গতি অবারিত থাকে, আকারের বহিঃরেখায় এক ধরনের তারল্য স্নিগ্ধতা সেই ছবির চরিত্র হয়ে ওঠে, আর বর্ণে অভিন্ন ও সমান ছাপ আসে। সাঙ্গীতিক তারল্য লিনোলিয়াম ছাপ-চিত্রের সম্ভাবনা হলেও, শিল্পী কীভাবে সেই সম্ভাবনাকে নিজের প্রকাশের প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ করবেন তা ব্যক্তিগত রুচি-প্রবৃত্তি নির্ভর।’
চিত্তপ্রসাদ ছবির বিষয় অনুযায়ী এই লিনোকাট ব্যবহার করেছেন। চিত্তপ্রসাদের লিনোকাট মাধ্যম নিয়ে প্রকাশিত Angels without Fairy Tales (দেবশিশুদের অ-রূপকথা) গ্রন্থের (ধ্রুবপদ প্রকাশনী) চার নম্বর ছবিতে আমরা দেখতে পাই ‘ভারত ছাড়ো’ অন্দোলনের রণাঙ্গনে সামিল হওয়া ছেলেমেয়েদের সবে শৈশবে পা দেওয়া। ছবির বাঁ দিকে একটি ছেলে Quit India লিখছে, নীচে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে রঙের পাত্র দুহাতে উঁচু করে ধরে। ছেলের পেছনে ছবির মধ্যভাগে একটি মেয়ে তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। ছবির ডান দিকজোড়া সেই রাস্তায় একটি শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে আছে, দূরেই দেখা যাচ্ছে উদ্ধত মিলিটারি জিপ ধাক্কা মেরে ভেঙে দিচ্ছে রাস্তার ল্যাম্পপোস্ট। মৃত শিশুটির চারপাশে ছেটানো রক্ত। সমস্ত ছবিটি জুড়ে রূঢ় বাস্তবতার হৃদয়বিদারক দৃশ্য, কোথাও কোনও কাব্যিকতার ছোঁয়া নেই। আবার Race ছবিতে অদ্ভূত গতিময়তা, ছন্দোবদ্ধ বেশ কিছু মানুষের দৌড়রত জীবন্ত দৃশ্য। অন্য দিকে Child at Paly ছবিতে দুটি শিশু খেলনা নিয়ে খেলা করছে— দৃশ্যপট জুড়ে কোমলতা, চোখে মুখে স্নিগ্ধতা, তন্ময় হয়ে তারা খেলছে। এই ভাবেই বিষয় ও মুহূর্তকে মূর্ত করে তুলেছেন তার অগুনতি লিনোকাটে।
ছাপচিত্রের পাশাপাশি রেখাচিত্র সম্পর্কেও চিত্তপ্রসাদের নিজস্ব স্বচ্ছ ভাবনা ছিল। তাকেও তিনি বিষয়ানুযায়ী ভিন্নতর মাধ্যম হিসেবে খুব গুরুত্ব দিয়েছেন, পেলব মাধ্যমকে কোথাও যেন প্রত্যাখ্যানও করছেন। আত্মজীবনীমূলক লেখায় লিখেছেন—
‘I saw the advantages of Graphic techniques and I was fairly intimate with the medium of pen and ink, and with the swiftness of pencil sketches. I did not go to generalise famine in my works and did not get lost in moral or formal abstractions, nor did I go for any ineffective "theatrical hysterics", to mention the very unhappy weaknesses which overcame many important artists of the country those day, particularly those who could afford to avoid any direct contact with the famine-victims. I remember here a tempera- composition by one of the very leading painters of Bengal and which was reproduced in some of the leading journals and well eulogized, and which showed famine deified as Rudra (Siva), the Hindu god of destruction, dancing through fire, which, I was told symbolised social or political revolution!, while his goddess consort held up world's all food in a tiny but heavenly bowl and this goddess symbolised Mother Earth and Destiny rolled into one! The incredible grotesqueness of the very 'idea' of the painting would have been enough to let it pass unnoticed by any serious or sane mind; but the important and influential artist from whom it came and the technical mastery he had demonstrated in it, together with the serious attention that was demanded for it by some of the important art-critics and influential journals of Bengal, compelled us to take note of gaping hollowness of the contemporary.’
চিত্তপ্রসাদের তেল রং, জল রং, প্যাস্টেল, নিসর্গ দৃশ্য ও পুতুল নাচ নিয়ে আলোচনার আর পরিসর নেই। তবু এ কথা বলা যায় ওইসব মাধ্যমেও নিজস্বতা ও বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। তাঁর পুতুল নাচ সম্পর্কে প্রভাস সেন লিখছেন:
‘An interesting chapter in Chittaprosad's artistic career was his experiments with puppets. He was a fine story-teller and children of the slums around his Andheri residence would gather round him in the evenings to hear him tell them stories of hope and laughter. The puppets were original, attractive and capable of most unusual movements from the magic pull of string from the fingers of Chitta.'
চিত্তপ্রসাদের ‘নিসর্গ দৃশ্য’, ফুল ও স্টিল লাইফ নিয়ে ড. সঞ্জয় মল্লিক লিখছেন, ‘বেশ কিছু নিসর্গ দৃশ্য কেবলই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ভণিতাহীন স্তবগাথা, গ্রামের একগুচ্ছ লাল-ছাদ গৃহ চারপাশের ঘন সবুজের মধ্যে আশ্রয় নেয়, নারী-পুরুষ তাদের দৈনন্দিন কাজ করে যায় নিঃশব্দে, গৃহপালিত পশু অলসভাবে ইতস্তত বসে থাকে— এই চিত্রণে যেমন সরাসরি রাজনৈতিক বার্তার চিৎকৃত ঘোষণা নেই, তেমনিই অকারণে আদর্শায়িত পরিপূর্ণতার অতি-সুমিষ্টতাও সযত্নে পরিহার করা হয়েছে।
চিত্তপ্রসাদের আঁকা ফুলের ছবিগুলিও বিনয়-নম্র সরল গতির উদাহরণ— এরা পশ্চিমি পরিভাষার ‘স্টিল-লাইফ'-এর মহান আভিজাত্যে রঞ্জিত নয়, এদের উপাদানে বিন্যাসে আড়ম্বর নেই— এরা প্রকৃতির নিরহঙ্কার অধ্যয়ন, শিল্পীর প্রকৃতিপ্রেমের নিবিড় আন্তরিক প্রকাশ । অত্যন্ত সাধারণ কাপ-বাটি ইত্যাদিতে সাজিয়ে ঘরের নিভৃত কোণে এদের স্থান নির্ধারণ করায় তারা শিল্পীর নিরাভরণ জীবনের সুন্দরের প্রতি অনুরক্ত মুগ্ধতার সাক্ষ্য বহন করে।’
চিত্তপ্রসাদ শিল্পচর্চার গভীরে ফল্গুধারার মতো যে স্বপ্নকে লালন করে গেছেন— তাঁর নিজের কথায় তাঁর সেই ইউটোপিয়া দিয়েই তাঁকে নিয়ে লেখাটি শেষ করি।
“সে জগতে মানুষ দৈহিক খাদ্যাদির প্রয়োজনে দৈহিক পরিশ্রম করবে— সে পরিশ্রম দেহের স্বাস্থ্যের পক্ষে একান্ত প্রয়োজন, সে পরিশ্রম এড়াবার জন্যে যন্ত্রাদির সৃষ্টি করে আলস্য বাড়াবে না, আলস্যকে গৌরবান্বিত করবার জন্যে তাকে সভ্যতা নাম দেবে না। সে জগতে মানুষ দৈহিক প্রয়োজনকে সংযমের দ্বারা সরল এবং স্বল্পে তুষ্টির সীমায় নির্দিষ্ট রাখবে— লোভ উচ্ছৃঙ্খলতার বশে বিলাসের অহংকারের জঞ্জাল-সামগ্রীতে জীবন ভারাক্রান্ত করবে না, সৌন্দর্যবোধের প্রেরণায় সানন্দ উপভোগের বিচিত্র সম্পদ সৃষ্টি দিয়ে জীবনকে কাব্যময় করে তুলবে। সে সব সম্পদ মানুষের সঙ্গে বাঁচবে, মানুষের সঙ্গেই মরবে, অমরত্বের দম্ভ যে সম্পদকে স্পর্শ করবে না। আদি অন্তহীন বিশ্বের অনন্ত মহিমাবোধকে কল্পিত অমরত্বের দম্ভে অসাড় অন্ধ বধির করে দেবে না। মানুষের নৃত্যগীত অলঙ্কার সমগ্র বিশ্বের রহস্যের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য বিস্ময়ার্থ রূপে রচিত হবে। নিজের জীবনের সরল সহজ উপভোগ ও পূর্ণতা সম্বন্ধে সানন্দ চেতনা থেকে মানুষের উৎসব সৃষ্টি হবে।”
সহায়ক গ্রন্থ
Chittaprosad: A Doyen of Art-world, Prodyat Ghosh Kolkata Shilpayan Artists’ Society 1st October 1995
Chittaprosad, New Delhi. Lalit Kala Akademi. 1993
দায়, শ্রীপান্থ, কলকাতা, পুনশ্চ, জানুয়ারি ১৯৯৪
চিত্তপ্রসাদ, প্রকাশ দাস (সম্পা), কলকাতা, গাঙচিল, জানুয়ারি ২০১১
ক্ষুধার্ত বাংলা, চিত্তপ্রসাদ, কলকাতা, কথাবার্তা, ২৭ জানুয়ারি ২০০২
দেবশিশুদের অ-রূপকথা, কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত, নদিয়া, ধ্রুবপদ প্রকাশনী, কলকাতা বইমেলা ২০১৫
আজকাল, শারদ সংখ্যা, ১৪২২
রাগ-অনুরাগ, রবিশঙ্কর, কলকাতা, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. জুলাই, ১৯৯৪
সূত্র- প্রথম প্রকাশ গণনাট্য পত্রিকা, ২০১৬।
প্রকাশের তারিখ: ২১-জুন-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
