Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

অ্যান্টি ড্যুরিং - মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষার সম্পদ (২য় পর্ব)

রথীন সেন
'এঙ্গেলস বললেন, শ্রমের মূল্য কথাটি স্ব-বিরোধী। একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে শ্রম শুধুমাত্র দ্রব্য উৎপাদন করে না, মূল্যও সৃষ্টি করে। শ্রমের দ্বারা এই মূল্য পরিমাণ করা হয়, তাই শ্রমের কোন আলাদা মূল্য থাকতে পারে না। ঠিক যেমন ওজনের কোন আলাদা ওজন বা তাপের কোনো পৃথক তাপমাত্রা থাকতে পারে না।' - আজ, ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের ২০২-তম জন্মবার্ষিকী।
Anti-duhring (2)
মানুষের চেতনা ও জগৎ অবিরাম গতিতে বিকশিত হচ্ছে, কারণ চেতনা জগৎকেই প্রতিফলিত করে। এঙ্গেলস দ্বান্দ্বিক বিরোধের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করে দেখালেন যে এই বিরোধই প্রকৃতপক্ষে অনন্ত গতির সূত্র হিসাবে কাজ করছে। জগৎ সম্পর্কে বিস্তারিত ও পরিপূর্ণ জ্ঞানলাভের প্রচেষ্টা মানুষের চিন্তার স্বভাব। কিন্তু যা অবিরাম বিকাশলাভ করে। এবং মানুষের জ্ঞানলাভের সামর্থ্যও ক্রমাগত প্রসার লাভ করে চলে। তাই পূর্ণ সত্যের উপলব্ধির ধারাও অন্তহীন। প্রতিটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে মানুষের জ্ঞান আপেক্ষিক, অসম্পূর্ণ। আংশিক, আপেক্ষিক সভাগুলিকে একত্রিত করেই পরিপূর্ণ সত্য সৃষ্টি হয়, প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট আপেক্ষিক সত্যের মধ্যেই রয়েছে পরিপূর্ণ সত্যের উপাদান।

দর্শনের ক্ষেত্রে ড্যুরিং-এর বক্তব্যের যুক্তিহীনতা প্রমাণ করে এঙ্গেলস প্রতিষ্ঠিত করেছেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের তত্ত্ব। অর্থনীতি সম্পর্কে এক উদ্ভট তত্ত্ব উপস্থাপিত করে ড্যুরিং বলেন— ‘দাসপ্রথা ও মজুরি দাসত্বের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যমজ ভাইয়ের মতো যুক্ত বলপ্রয়োগ ভিত্তিক সম্পত্তিকে বিশুদ্ধ রাজনৈতিক চরিত্রসম্পন্ন সামাজিক আর্থনীতিক সাংবিধানিক রূপ হিসাবে গণ্য করতে হবে এবং এতদিন পর্যন্ত এইগুলি এমন একটা কাঠামো গঠন করেছে, একমাত্র যার মধ্যেই প্রাকৃতিক আর্থনীতিক নিয়মাবলীর ফলাফল নিজেদের ব্যক্ত করতে পেরেছে।’ ড্যুরিং আরও বললেন যে আর্থনীতিক প্রশ্নে দু'টি প্রক্রিয়া উৎপাদন ও বণ্টন। আর বিনিময় উৎপাদনেরই একটা বিভাগ। ড্যুরিং-এর মত অনুসারে পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি বেশ ভালো, আর সেটা টিকেও থাকবে। তবে পুঁজিবাদী বণ্টন পদ্ধতি অত্যন্ত খারাপ আর সেটার অস্তিত্ব কিছুতেই থাকবে না। প্রকৃতপক্ষে, পুঁজিবাদী সমাজের উৎপাদন পদ্ধতি সম্বন্ধে ড্যুরিং-এর আপত্তি করার কিছুই ছিল না। ড্যুরিং এটাও দাবি করলেন যে তিনিই শ্রমের মূল্য আবিষ্কারক।

ড্যুরিং-এর অজ্ঞতার তীব্র সমালোচনা করে তাঁর বিচিত্র বক্তব্যের উত্তরে এঙ্গেলস বললেন, অর্থনীতিতে একমাত্র পণ্যের মূলোর কথাই জানা আছে। ব্যক্তিগত উৎপাদকরা পৃথক পৃথকভাবে সমাজে দ্রব্য সামগ্রী উৎপাদন করে। প্রথমত এগুলি ব্যক্তিগত উৎপাদকদের উৎপন্ন জিনিস। কিন্তু এইসব দ্রব্যগুলি কেবলমাত্র তখনই পণ্যে পরিণত হয়, যখন সেগুলি উৎপন্ন হয় সমাজের ভোগের জন্যে। বিনিময়ের মাধ্যমে সেগুলি সমাজের প্রয়োজনে লাগে। এইসব ব্যক্তিগত উৎপাদকরা পরস্পর সামাজিক সম্পর্কে যুক্ত। এদের নিয়েই গড়ে ওঠে সমাজ। সুতরাং, যখন বলা হয়। পণ্যের একটা নির্দিষ্ট মূল্য আছে তখন (১) এটা সামাজিকভাবে প্রয়োজনীয় জিনিস। (২) এটা তৈরি করেছে একজন ব্যক্তি, ব্যক্তিগত ব্যবহারের কারণে (৩) ব্যক্তিগত শ্রমের সৃষ্টি হলেও এর পেছনে সামাজিক শ্রমও আছে এবং বিনিময়ের মাধ্যমে সামাজিকভাবে স্থির করা নির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রম এই পণ্য সৃষ্টি করেছে (৪) শ্রম বা শ্রম-ঘণ্টার হিসাবে এই পরিমাণকে বিচার না করে বিচার করা হচ্ছে আরেকটি পণ্যের মধ্য দিয়ে।

এঙ্গেলস বললেন, শ্রমের মূল্য কথাটি স্ব-বিরোধী। একটি নির্দিষ্ট সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে শ্রম শুধুমাত্র দ্রব্য উৎপাদন করে না, মূল্যও সৃষ্টি করে। শ্রমের দ্বারা এই মূল্য পরিমাণ করা হয়, তাই শ্রমের কোন আলাদা মূল্য থাকতে পারে না। ঠিক যেমন ওজনের কোন আলাদা ওজন বা তাপের কোনো পৃথক তাপমাত্রা থাকতে পারে না। ‘প্রচলিত শ্রমকে, সক্রিয় শ্রমশক্তিতে বিনিময় করতে হবে শ্রমজাত দ্রব্যের সঙ্গে। শ্রমজাত দ্রব্যের মতো শ্রম-শক্তিও একটা পণ্য, শ্রমজাত দ্রব্যের সঙ্গে এর বিনিময় ঘটবে। কিন্তু এই শ্রম-শক্তির মূল্য কোনভাবেই শ্রমজাত দ্রব্যের সাহায্যে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় শ্রম-শক্তির মধ্যে মূর্ত সামাজিক শ্রমের দ্বারা, মজুরি সংক্রান্ত বর্তমান আইন অনুযায়ী

‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’-এর অর্থনৈতিক অংশে এঙ্গেলস মার্কসের অর্থনৈতিক মতবাদের প্রধান বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করেছেন। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির সংজ্ঞা নিরূপণ করে এঙ্গেলস বললেন— ব্যাপকতম অর্থে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি হচ্ছে মানব সমাজে জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বৈষয়িক উপকরণগুলি উৎপাদন ও বিনিময়ের নির্ধারক নিয়মগুলির বিজ্ঞান।

এই অংশে এঙ্গেলস দেখালেন, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যে সামাজিক সঙ্কটের জন্ম দিচ্ছে তার কারণই উৎপাদন ও বণ্টনের মধ্যে অভ্যন্তরীণ বৈরিতা। এই বৈরিতাই আরও স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেয় যে ব্যবস্থাটি সমাধানের অযোগ্য। এই বাস্তবতার উপর ভিত্তি করেই শ্রমিকশ্রেণিকে সংঘর্ষের পদ্ধতি স্থির করতে হবে, নির্ধারিত করতে হবে সংগ্রামের কৌশল ।

উৎপাদন, বিনিময় ও বন্টনের দ্বান্দ্বিক ক্রিয়াশীলতা সম্বন্ধে মার্কসের ধারণাগুলি উপস্থিত করে এঙ্গেলস সামাজিক উৎপাদনের প্রাধান্যের বস্তুবাদী নীতি গ্রহণ করলেন। তিনি দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করলেন যে যদিও শেষ পর্যন্ত বণ্টনের পদ্ধতি উৎপাদন ও বিনিময়ের পদ্ধতি দ্বারা নির্ধারিত হয়, তবু উৎপাদন ও বিনিময়ের উপর বণ্টনও যথেষ্ট পরিমাণে প্রভাব বিস্তার করে।

বলপ্রয়োগ, ইতিহাসের সব ক'টি স্তরেই অর্থনৈতিক প্রক্রিয়াগুলির পরিণতি হিসাবে থেকেছে, কারণ হিসাবে নয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তি সৃষ্টির কারণগুলি পরীক্ষা করে এঙ্গেলস সিদ্ধান্তে এসেছিলেন যে উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্ম হয়েছিল। বর্ধিত উৎপাদনের স্বার্থে সামাজিক আদান প্রদান সহজতর করে নেবার জন্য উৎপাদন ও বিনিময়ের পরিবর্তিত সম্পর্কগুলিরই ফল হিসাবে ব্যক্তিগত সম্পত্তির জন্ম।

এঙ্গেলস বললেন, রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক বলপ্রয়োগের প্রধান হাতিয়ার হলো সেনাবাহিনী, সমস্ত যুগে এর সংগঠন এবং যুদ্ধ পদ্ধতি অর্থনৈতিক অবস্থার উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। অর্থাৎ ‘জনসংখ্যার গুণ ও পরিমাণ এবং কারিগরী বিকাশের’ উপর তা নির্ভরশীল। অবশ্য একথা বলা যায় না যে অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার উপর বলপ্রয়োগের কোন প্রভাবই নেই। সমস্ত রাজনৈতিক ক্ষমতা মূলতঃ সূচনায় নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সমাজ থেকে কিছুটা খাতা অর্জনের পর রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্থনৈতিক বিকাশের অনুকূল বা প্রতিকূল হতে পারে। প্রতিকূল হলে অর্থনৈতিক বিকাশ অনিবার্যভাবেই বলপ্রয়োগেই তার পথ করে নেবে। রাজনৈতিক ক্ষমতার পতনেই এই সংঘাতের পরিসমাপ্তি। এ প্রসঙ্গে মার্কস বলেছিলেন ‘বলপ্রয়োগ প্রতিটি পুরনো সমাজে গর্ভস্থ ভ্রুণের ক্ষেত্রে ধাত্রী’-র কাজ করে।

ইউজেন ড্যুরিং মার্কসকে ঘৃণভাবে আক্রমণ করে লিখেছিলেন— ‘পুঁজির ধারণা সংক্রান্ত মার্কসের সংজ্ঞা জাতীয় অর্থনীতির সঠিক তত্ত্বের ক্ষেত্রে নিছক বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করবে... বাচালতাকে গভীর যুক্তিসঙ্গত সত্য রূপে উপস্থিত করা হয়েছে... এর ভিত্তি খুবই নড়বড়ে’ ইত্যাদি। মার্কসের বক্তব্য দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে এঙ্গেলস বললেন যে ড্যুরিং-এর মতে মার্কস বলেছেন— পুঁজি সৃষ্টি হয়েছে অর্থ থেকে। প্রকৃতপক্ষে মার্কস বলেছিলেন— যে সব অর্থনীতির রূপের মধ্য দিয়ে পণ্যের আদান-প্রদান পদ্ধতি বিকাশ লাভ করেছিল মুদ্রা তার একেবারে শেষ পর্যায়ে আবির্ভূত হয়েছে। পণ্য আদান-প্রদানের এই চূড়ান্ত উৎপন্নটি হচ্ছে প্রাথমিক রূপ, যার মধ্য দিয়ো পুঁজির উদ্ভব ঘটে। ইতিহাসের দিক থেকে পুঁজি হচ্ছে জমিজমা সম্পত্তির বিপরীত রূপ, যা অনিবার্যভাবেই প্রথমে অর্থের রূপ নেয়, আর্থিক সম্পদ, বণিক ও মহাজনের পুঁজি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। আজকের দিনেও যে সমস্ত খুঁজি, তা পণ্য, শ্রম বা অর্থ যাই হোক না কেন, প্রথমে বাজারে এসে উপস্থিত হয় অর্থের রূপ নিয়ে, একটা নির্দিষ্ট পথেই এই অর্থ পুঁজিতে পরিণত হয়।

রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির অংশেই মুনাফা সম্পর্কীয় ড্যুরিং-এর অবৈজ্ঞানিক ধারণাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করে মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেন এঙ্গেলস। তিনি উল্লেখ করেন যে মার্কস ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি পুঁজিবাদী মুনাফা যন্ত্রের প্রকৃত রূপ উন্মোচন করে উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপত্তি আবিষ্কার করেন। এটাই ছিল মার্কসের সবচেয়ে যুগান্তকারী সাফল্য এবং উদ্বৃত্ত মূল্যের উৎপত্তি আবিষ্কারের দিন থেকেই বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের সুত্রপাত।

‘অ্যান্টি-ড্যুরিং'-এর তৃতীয় অধ্যায়ে এঙ্গেলস সুনির্দিষ্ট যুক্তি বিন্যাসে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রকে বিশ্লেষণ করেন। ইতিপূর্বে দীর্ঘকাল ইউটোপীয় বা কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের ধারণা বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল। ইউটোপীয় বা কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিকদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন সাঁ-সিমো, ফুরিয়ের ও ওয়েন। ড্যুরিং এঁদের বিরুদ্ধে অশোভনভাবে কটাক্ষ করলেন। সাঁ-সিমো সম্পর্কে ড্যুরিং-এর অভিমত যে তিনি ধর্মীয় বাতিকে ভুগছেন। ফুরিয়ের হচ্ছেন এক ধরনের নির্বোধ এবং ওয়েনের পর্যবেক্ষণের পদ্ধতি বুদ্ধিহীন ও অমার্জিত। রবার্ট ওয়েন প্রসঙ্গে ড্যুরিং লিখেছিলেন, ‘সাম্যবাদ সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা ওয়েনের ছিল তা আমরা মনে করতে পারি না।’ এই মূল্যায়নকে নির্বোধ ও উদ্ভট আখ্যা দিয়ে এঙ্গেলস বললেন যে, ওয়েনের 'বুক অফ নিউ মরাল ওয়ার্ল্ড'-এ শ্রমের প্রতি সমান দায় দায়িত্ব ও ব্যবহার্য দ্রব্যের উপর সমান অধিকার সমন্বিত সাম্যবাদের ধারণা শুধু স্পষ্টভাবে প্রকাশই পায়নি, ভাবী সাম্যবাদী সমাজের ভিত্তি ও রূপরেখা স্বচ্ছভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ওয়েন সুস্পষ্ট সাম্যবাদ শুধু প্রচারই করেননি, পাঁচবছর ধরে তিনি হ্যাম্পশায়ারের হারমনি হল উপনিবেশে এই তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগ করেছিলেন। ওয়েনের উদ্যোগে ১৮৩২ সালে লন্ডনে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমিক সমবায়গুলির দ্বারা শ্রমজাত দ্রব্যের সম-বিনিময় বাজার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সাঁ-সিমোর মধ্যে আমরা যেমন পরবর্তীকালের সমাজতন্ত্রীদের যাবতীয় ধ্যান ধারণার উৎস খুঁজে পাই, ফুরিয়েরের মধ্যে তেমনই দেখতে পাই প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থার সমালোচনা। সাঁ-সিমো ছিলেন মহান ফরাসি বিপ্লবের সন্তান। এই বিপ্লবে সুবিধাভোগী অলস শ্রেণিগুলি, অভিজাত ও পুরোহিতদের বিরুদ্ধে 'থার্ড-এস্টেট'-এর অর্থাৎ উৎপাদন ও বাণিজ্যে সক্রিয় জাতির বিপুল সংখ্যক জনগণের বিজয় ঘটে। কিন্তু থার্ড-এস্টেটের বিজয় দ্রুত এই এস্টেট-এর একটা ক্ষুদ্রাংশের বিজয় হিসাবে দেখা দেয়। অর্থাৎ, সমাজের একটা সুবিধাভোগী অংশ হিসাবে সম্পত্তিবান বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে। এই জন্যে সাঁ-সিমোর কাছে থার্ড-এস্টেট ও সুবিধাভোগী শ্রেণিগুলির মধ্যেকার দ্বন্দ্বটি 'শ্রমিক' ও 'অলস' দের মধ্যেকার দ্বন্দ্ব হিসাবে প্রতিভাত হয়। ফুরিয়ের বুর্জোয়া বিপ্লব-পূর্ব তাদের অনুপ্রাণিত প্রভুদের এবং বিপ্লবোত্তর তাদের স্তাবক গোষ্ঠীকে প্রাপ্য মূল্যেই গ্রহণ করেছিলেন। বুর্জোয়া জগতের বৈষয়িক ও নৈতিক দৈন্যকে তিনি নির্মমভাবে উদ্ঘাটন করে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ড্যুরিং অত্যন্ত কুৎসিতভাবে ইউটোপীয়দের চরিত্র চিত্রণ করেছিলেন তাঁদের সংক্ষিপ্ত নাম দিয়ে। যেমন সাঁ-সিমো— সাঁ (পুণ্যাত্মা), ফুরিয়ের— ফু (পাগল) এবং ওয়েন— ও (Woet) অর্থাৎ, ওয়েন—হায় রে কপাল! আর ড্যুরিং-এর এই অভিমত সম্বন্ধে কোন পাঠক যদি সহমত পোষণ না করেন তাহলে তিনিও, ড্যুরিং-এর মতে, কোন না কোন গণ্ডমূর্খ শ্রেণির অন্তর্গত। এঙ্গেলস-এর মতে এই ধরনের মানুষদের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রকাশের মূল কারণ ইতিহাস বিশ্লেষণ বোধের অভাব এবং এই তিনজন চিন্তানায়কের রচনাবলী সম্বন্ধে ‘ভয়াবহ অজ্ঞতা।’ তিনি ড্যুরিংকে চিহ্নিত করলেন ইউটোপীয় চিন্তাবিদদের একজন নিকৃষ্ট উত্তরসূরী রূপে। এঙ্গেলস এই তিন চিন্তানায়কের বুর্জোয়া সমাজের চমৎকার সমালোচনাকে প্রশংসা করতেন এবং পুঁজিবাদী শোষণের প্রতিবাদ হিসাবে তাঁদের অনেকগুলি ধারণাকে এঙ্গেলস মূল্যবান বলে গণ্য করেছিলেন। পরবর্তীকালে এঁদের কয়েকটি ধারণাকে মার্কসবাদে বিস্তারিত: রূপ দেওয়া হয়েছিল। এঁদের ধারণাগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য দূর হবে। রাষ্ট্রের একদিন বিলোপ ঘটবে এবং মানুষের উপর রাজনৈতিক শাসনের রূপান্তর ঘটবে।

এঙ্গেলস অবশ্য এইসব মহান ইউটোপীয় সমাজতন্ত্রীদের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধেও সচেতন ছিলেন। তাঁরা তাঁদের সময়কালে, নতুন সমাজ ব্যবস্থায় পৌঁছনোর জন্য বাস্তববাদী পথ দেখাতে পারেননি। এঙ্গেলস লিখেছিলেন যে পুঁজিবাদী উৎপাদনের অপরিণত অবস্থা এবং অপরিণত শ্রেণি অবস্থার সঙ্গে অপরিণত তত্ত্ব সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।

ইউটোপীয়রা মনে করতেন যে নতুন সামাজিক ব্যবস্থা নির্মাণ যুক্তির কাজ। এ বিষয়ে সরাসরি ভিন্নমত ঘোষণা করে এঙ্গেলস সমাজতন্ত্রের বিষয়গত পূর্বশর্তের উপর চূড়ান্ত গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি ব্যাখ্যা করে দেখান যে, বৈজ্ঞানিক সমাজবাদ গড়ে উঠেছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিরোধগুলির উৎপাদিকা শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান তীব্র সংঘাতের ভিত্তিতে। এই সংঘাত পুঁজিবাদী সমাজকে অবশ্যম্ভাবী ধ্বংসের পথে পরিচালিত করে। তিনি এইভাবে পুঁজিবাদের প্রধান বিরোধের শ্রেষ্ঠ সংজ্ঞা সুত্রায়িত করেন: সামাজিকৃত উৎপাদন এবং পুজিবাদীদের দ্বারা উৎপাদনের ফল আত্মসাৎ করার মধ্যে বিরোধ প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়ার মধ্যে বৈরি বিরোধ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

এঙ্গেলস বলেন শ্রেণি হিসাবে পরজীবীতে পরিণত বুর্জোয়াকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিচ্যুত করা প্রয়োজন। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক সংস্কার ও উদ্যোগ অথবা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যেই উৎপাদিকা শক্তির পরিবর্তন পুজিবাদী ব্যবস্থার শোষণমূলক মর্মবস্তুকে কিছুতেই শেষ করতে পারে না। পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতি বিকাশলাভ করার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ ব্যক্তিগত উৎপাদন রূপ নিতে থাকে যৌথ উৎপাদনে। এর ফলে, পুঁজিবাদীদের জয়েন্ট স্টক কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। পুঁজিবাদী সমাজের সরকারি প্রতিনিধি হিসাবে রাষ্ট্রও কিছু সংখ্যক শিল্প প্রতিষ্ঠান অথবা শ্রম শিল্পের কোন সমগ্র শাখার পরিচালনভার গ্রহণে বাধ্য হয়। এঙ্গেলস পরিষ্কার করে দিলেন— ‘জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে অথবা রাষ্ট্রীয় মালিকানায় রূপান্তর, উৎপাদিকা শক্তিগুলির পুঁজিবাদী ধরনের অবসান ঘটায় না। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন না করা পর্যন্ত পুঁজিবাদী উৎপাদন পদ্ধতির বিলোপ, শোষণের বিলোপ এবং সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এই পর্যায়ে, প্রলেতারিয়েত রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করবে এবং উৎপাদনের উপকরণগুলিকে প্রথমেই রাষ্ট্রের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত করবে।’

পুঁজিবাদকে আকর্ষণীয় করে তোলার সমস্ত প্রচেষ্টা ও ধারণাকে এই মত বাতিল করে দেয়। উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র শ্রমিকশ্রেণী ও মেহনতী মানুষকে শোষণ ও লুণ্ঠনের জন্য সমাজে আধিপত্যকারী বুর্জোয়াদের একটি হাতিয়ার ছাড়া কিছুই নয়। এই ধরনের রাষ্ট্র সম্পর্কে এঙ্গেলস লিখেছিলেন যে উৎপাদিকা শক্তিকে অধিগ্রহণ করতে এই রাষ্ট্র যত বেশি অগ্রসর হয়, ততই জাতীয় পুঁজিপতিতে পরিণত হয়ে নাগরিকদের শোষণ করে। শ্রমিকরা মজুরি-শ্রমিক অর্থাৎ প্রলেতারিয়েতই থেকে যায়। এখানেই এঙ্গেলস এমন সব প্রবণতার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যা অনেক পরে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া পুঁজিবাদের আওতায় সুস্পষ্ট আকার নিয়েছে।

মার্কসীয় তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন শ্রেণিগুলির উদ্ভব, রাষ্ট্র, পরিবার, ধর্ম ইত্যাদি নিয়েও ‘অ্যান্টি-ড্যুরিং’-এ এঙ্গেলস সামগ্রিক আলোচনা করেছেন।

ইউজেন ড্যুরিং-এর বিরুদ্ধে এঙ্গেলস বিজ্ঞানসম্মত দূরদৃষ্টির সাহায্যে কমিউনিস্ট সমাজের রূপরেখা রচনা করেছিলেন। পুরনো শ্রমবিভাগ যা গ্রামীণ জনতাকে মানসিক জড়তায় এবং শহরের জনগণকে একঘেয়ে, বৈচিত্রহীন কর্মব্যস্ততায় আমৃত্যু অবসাদগ্রস্ত করে রাখে, যে শ্রমবিভাগ মানুষকে জড়বুদ্ধি ও হীনবল করে, তার শারীরিক ও মানসিক গুণগুলিকে কেবলই দুর্বল করে দেয়। তার বিপরীতে কমিউনিজম মানুষের ব্যক্তিত্বের সর্বাঙ্গীণ বিকাশের ব্যাপকতম সুযোগ তৈরি করে। এক নতুন শ্রম সংগঠন গড়ে তোলে। কমিউনিস্ট ব্যবস্থায় উৎপাদনশীল শ্রম বোঝা হয়ে থাকে না। পরিবর্তিত হয় আনন্দে ।

সমানাধিকারের ধারণা সম্পর্কেও এঙ্গেলসের ব্যাখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণি বৈষম্য বিলোপ করার সময় কমিউনিস্টরা জনগণের রুচি ও গুণাবলীকে মোটেই গায়ের জোরে সমান করে না, অথবা তাদের স্বাতন্ত্র্যকে দমন করে না। এঙ্গেলস লিখেছিলেন। সমানাধিকারের প্রলেতারীয় দাবির প্রকৃত মর্মবস্তু হলো শ্রেণি বিভক্ত সমাজ ব্যবস্থার বিলোপ।

এঙ্গেলস আরও উল্লেখ করেন যে জীবনধারণের যে পরিবেশ এতদিন মানুষকে ঘিরে রেখেছে এবং শাসন করেছে, কমিউনিজম গড়ে উঠলে এই পরিবেশ মানুষের আয়ত্তে আসবে। মানুষ এই প্রথম হবে প্রকৃতির প্রকৃত, সচেতন প্রভু, সামাজিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রক ও পরিচালক।

অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অসাধারণ স্ফুরণ শেষ পর্যন্ত ধর্মীয় অথবা কু-সংস্কারের অবসান ঘটাবে। এঙ্গেলস ধর্মকে, যে সব বাইরের শক্তি মানুষের প্রতিদিনের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, মানুষের মনে সেগুলির কল্পনাপ্রসূত প্রতিচ্ছবি হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি ধর্মীয় ধারণাগুলির বিকাশের কারণ অনুসন্ধান করে তাদের সামাজিক উৎসগুলি ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছিলেন। ড্যুরিং ভবিষ্যৎ সমাজে ধর্মকে সোজাসুজি বেআইনী করা হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন। এই মতকে তীব্রভাবে বিদ্রুপ করে এঙ্গেলস বললেন, যে কারণগুলি ধর্মকে পুষ্ট করে, সেগুলির অস্তিত্বের বিলুপ্তি ঘটলেই ধর্ম স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করবে। ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’-এর বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অধ্যায়ে এঙ্গেলস এই মত প্রকাশ করেন যে কমিউনিজম না গড়ে ওঠা পর্যন্ত জনগণ তাদের সামাজিক জীবনের সচেতন নির্মাতা হবে না, প্রকৃত মুক্তি অর্জন করতে পারবে না। তিনি একে মানুষের বাধ্যবাধকতার জগৎ থেকে মুক্তির জগতে উত্তরণ হিসাবে অভিহিত করেন। এঙ্গেলস দৃপ্ত বলিষ্ঠতায় ঘোষণা করলেন মানব সমাজের এই মৌলিক পরিবর্তন ঘটানো প্রলেতারিয়েতের ঐতিহাসিক দায়িত্ব। এই কাজের যথার্থ অবস্থা ও প্রকৃতি অনুধাবন করা, শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের ভাবধারা সঞ্চার করা, শ্রমিকদের সমাজ বিকাশের নিয়মগুলি বোঝার জন্য শিক্ষিত করার দায়িত্ব তিনি সমাজতন্ত্রীদের উপর অর্পণ করেছিলেন।

এঙ্গেলস রচিত ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ বিপুল প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। সমাজতন্ত্রীদের উপর ড্যুরিং-এর প্রভাবকে এঙ্গেলস বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলনে প্রাক-মার্কসীয় ধারণাগুলিকে তাত্ত্বিকভাবে নস্যাৎ করার কাজটি সম্পূর্ণ করেছিলেন। জার্মান সোসাল ডেমোক্রাটরা এরপর থেকে মার্কসবাদকে একটি অর্থও বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি হিসাবে বুঝতে শুরু করেন।

‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণির আন্দোলন মার্কসীয় বিশ্ববীক্ষায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। লেনিন যথার্থভাবেই বলেছিলেন যে ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ হচ্ছে, প্রত্যেকটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন শ্রমিকের কাছে মার্কসবাদের সারগ্রন্থ। শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির সংগ্রামে এই বইটি বিরাট ভূমিকা পালন করছে। ‘অ্যান্টি ড্যুরিং’ অল্প কয়েকটি বই-এর অন্যতম যা কখনো পুরনো হয় না এবং ইতিহাসের প্রত্যেকটি মোড় পরিবর্তনে এই বইটির অফুরন্ত সম্পদ নতুনতর দিক উন্মোচন করে।

মূল বইয়ের বানান অপরিবর্তিত রয়েছে।


প্রকাশের তারিখ: ২৮-নভেম্বর-২০২২
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০১ টি নিবন্ধ
১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

১৩-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

২০-অক্টোবর-২০২৫

১৬-অক্টোবর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫

০৫-ডিসেম্বর-২০২৪