সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
পরিবেশবাদ ও বামপন্থা (২য় পর্ব)
অর্চনা প্রসাদ
এই অধ্যায়ে সেরকমই কিছু বিষয়কে ছুঁয়ে ভূমি সংস্কার, পাট্টা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জবরদখলের মত বিষয় নিয়ে নব্য-গান্ধীবাদী পরিবেশকর্মী ও বামপন্থীদের তুলনামূলক অবস্থানের রূপরেখা তুলে ধরা হবে। এই অধ্যায়ের প্রথম পর্বে থাকবে সেই কৃষিজমি যেখানে ব্যক্তিমালিকানা রয়েছে এবং যেটার অনুমোদনও রয়েছে। দ্বিতীয় পর্ব আলোকপাত করবে সরকারি বনাঞ্চলগুলিতে যেখানে পরম্পরাগত জমির অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আদিবাসীরা লড়ছে।

দ্বিতীয় পর্ব
আদিবাসী সমাজ ও ভূমিপ্রসঙ্গ
দলিত সংগঠনগুলির জাতীয় সম্মেলনে এক বিশিষ্ট আন্দোলনকর্মী আদিবাসী ভারতে জমি সম্পর্কিত প্রশ্নের গুরুত্বের কারণগুলির ওপর আলোকপাত করেছিলেন। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের জীবনে জমির মালিকানা একইসাথে অর্থকরী কর্মসংস্থান, স্থায়ী বাসস্থান, একাত্মতার অনুভূতি, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিরাপত্তার সুনিশ্চয়তা প্রদান করে। আদিবাসী জীবনধারার কেন্দ্রে ভূমি সম্পর্কিত প্রশ্ন নিয়ে করা এই মন্তব্যের আলোয় এই কথাটিও ব্যক্ত হয়ে যায় যে ভারতের আদিবাসী জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি অংশ এখনও ভূমিহীন। ফলে এটা কোনো সমাপতনের বিষয় নয় যে সমস্ত ধরনের গণআন্দোলন সংগঠিত করার ক্ষেত্রে জমির অধিকারের প্রশ্নটিই মূল বিষয়। আদিবাসীদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার সমস্যাটি অবশ্য যতটা সাধারণ বিষয় ভাবা হয়, বাস্তবে ততটা নয় এবং এর সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে নানা জটিল ও বিচিত্র প্রতিবন্ধকতা।
এই অধ্যায়ে সেরকমই কিছু বিষয়কে ছুঁয়ে ভূমি সংস্কার, পাট্টা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জবরদখলের মত বিষয় নিয়ে নব্য-গান্ধীবাদী পরিবেশকর্মী ও বামপন্থীদের তুলনামূলক অবস্থানের রূপরেখা তুলে ধরা হবে। এই অধ্যায়ের প্রথম পর্বে থাকবে সেই কৃষিজমি যেখানে ব্যক্তিমালিকানা রয়েছে এবং যেটার অনুমোদনও রয়েছে। দ্বিতীয় পর্ব আলোকপাত করবে সরকারি বনাঞ্চলগুলিতে যেখানে পরম্পরাগত জমির অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে আদিবাসীরা লড়ছে। যদিও আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে জমি থেকে উচ্ছেদ বন্ধ করা নিয়ে কোনো মতপার্থক্য নেই, কিন্তু মতপার্থক্য রয়েছে কী ধরনের সম্পত্তির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে তা নিয়ে। জমির অধিকার কি গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় ভিত্তিক, না শ্রেণিভিত্তিক হবে সেই প্রশ্নের সমাধান হওয়া জরুরি।
ভূমিতে সম্প্রদায়গত অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা
বামপন্থীদের বাইরে মূখ্যত আদিবাসী অধিকার সংক্রান্ত পরিবেশ আন্দোলনই আদিবাসীদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার স্বপক্ষে সোচ্চার। দু’টি অংশই এ বিষয়ে একমত যে আদিবাসী অর্থনীতিতে ভূমির সাথে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে আধুনিক উন্নয়ন ও কৃষির বাণিজ্যিকীকরণের বিষম প্রভাবেই। ভূমি থেকে বিচ্ছেদের এই প্রক্রিয়ার উৎস খুঁজে পাওয়া যায় ব্রিটিশ শাসনে ভূমিতে ব্যক্তিগত মালিকানা সৃষ্টির ফলে জন্ম নেওয়া ঋণগ্রস্ততায়। নব্য-গান্ধীবাদী পরিবেশবাদীদের অভিমত, প্রাক-ব্রিটিশ সময়ে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায় এবং তাদের প্রতিষ্ঠানগুলির অনেক বেশি স্বনিয়ন্ত্রণ ছিল। এর অর্থ, ব্যক্তিগত সম্পত্তি আদিবাসী প্রতিষ্ঠানগুলিরই নিয়মানাধীন ছিল এবং রাজন্যবর্গের তরফ থেকে জমির যৌথ স্বত্ব তুলে দেওয়া হত গ্রামগুলিকে। এর পর গ্রামের মোড়ল ও আদিবাসী পুরোহিতরা ভূমিখণ্ড ভাগ করে দিত প্রতিটি কর্ষক পরিবারকে। সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীগত স্বত্ত্বই ছিল প্রাক-ব্রিটিশ সময়ের ভূমি ব্যবস্থার মূল নীতি এবং এই ব্যবস্থা উনিশ শতকের ভূমি বন্দোবস্তের ফলে অকিঞ্চিৎকর হয়ে যায়। ব্রিটিশ বন্দোবস্ত কৃষককে সুনির্দিষ্ট ভূমিখণ্ডের বাঁধনে বেঁধে দেয়। নগদ টাকায় চড়া হারে কর ধার্য করে এবং সৃষ্টি করে বড় বড় জমির জোত যাতে মুষ্টিমেয় ভূস্বামী পরিবারগুলি সহজেই কেনা বেচা করতে পারে।
এই চিন্তাধারার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে ‘দিস ফিশারড ল্যান্ড’-এ যাকে ভারতের পরিবেশ সংক্রান্ত ইতিহাসের আকর গ্রন্থ বলা যায়। এই বইয়ের বিশ্লেষণে দেখা যায়, উপনিবেশ-পূর্ব সময়ে রাষ্ট্র ভূমিস্বত্ত্ব প্রদান করত কৃষকদের এবং তারপর আর ওই জমির ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো হস্তক্ষেপ করত না। গোষ্ঠীগত প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে গ্রামের মোড়ল বা পঞ্চায়েতকে একটা নির্দিষ্ট রাজস্ব শাসককে দিতে হত। এই রাজস্বের হার ছিল খুবই সামান্য এবং অবশ্যই উৎপন্ন ফসলের যে অংশ স্থানীয় সমাজের বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজন হত সেই অংশ থেকে দিতে হত না। অন্য ভাবে বললে, রাষ্ট্রের অধিকার ছিল মাত্র জনসমাজের উৎপন্ন ফসলের উদ্বৃত্ত অংশের ওপরই , যা নিঃসন্দেহে সামগ্রিক উৎপন্ন ফসলের এক ক্ষুদ্র অংশই দাঁড়াত। অনুরূপ বিশ্লেষণে এক বিশিষ্ট গান্ধীবাদী সমাজকর্মী দাবি করেছেন, জমিদারী বা ঠিকে প্রথা সনাতন স্বশাসনের সময়পর্বে অজানাই ছিল এবং যাবতীয় আধা-সামন্তবাদী দমন পীড়নের উৎস দেখা যাবে আধুনিক ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার আত্মপ্রকাশের মধ্যেই। এই অনুমান থেকেই তৈরি হয় সেই যুক্তিধারার তাত্ত্বিক ভিত্তি যে ভূমির ওপর জনগোষ্ঠীগত মালিকানা পুনঃপ্রতিষ্ঠা অসমাপ্ত থাকবে যদি শাসনব্যবস্থার সনাতন কাঠামো প্রত্যাবর্তন না হয়।
ওপরে আমি যে যুক্তিগুলি তুলে ধরলাম সেখানে প্রাক-ঔপনিবেশিক সামন্তবাদী ব্যবস্থাকে ন্যায়সঙ্গত ও সমত্ববাদী হিসেবে ধরে নেওয়ার বিপদের ঝুঁকি নিহিত রয়েছে। একতা পরিষদ ও ভারত জন আন্দোলনের মত আদিবাসী ও পরিবেশ সংগঠনের প্রচারণা এভাবেই শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র জমির ওপর জনগোষ্ঠীগত অধিকারের পক্ষেই নয়, মান্ধাতার আমলের প্রবল অন্যায় ও অবিচারে ঠাসা সনাতনী প্রথার পক্ষেও অবস্থান নেয়। বিশিষ্ট নৃতত্ত্ববিদ ও নীতি বিশ্লেষক বি,কে রায় বর্মন সেজন্যেই বলেছেন যে আদিবাসী সমাজে সম্প্রদায়গত ভূমিস্বত্ত্বগুলির ক্ষেত্রে প্রভাবশালী বংশগুলিকে সুবিধা প্রদানের দিকে পক্ষপাতিত্বের প্রবণতা দেখা যায়। ফলেই ভূমি সম্পদের ওপর গণতান্ত্রিক আদিবাসী প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকারকে রক্ষা করার সুনির্দিষ্ট প্রয়োজনীয়তা রয়েছে যাতে ব্যক্তিগত ভূমিস্বত্ত্বগুলি আদিবাসীদের মধ্যেকার সবচেয়ে বঞ্চিত অংশের মধ্যে বন্টন করা যায় এবং এদের চিহ্নিতকরণ করতে হবে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার নিবিড় বিশ্লেষণের মাধ্যমে। অধ্যাপক বর্মনের বিশ্লেষণ আদিবাসী প্রতিষ্ঠানগুলির সাথে মধ্যযুগের ক্ষমতা কাঠামোর অঙ্গ, জমিদারী ব্যবস্থার সাথে সম্পর্কগুলিকেও বিবেচনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছে। আমরা পরে দেখব, বামপন্থীরাও ঠিক এটাই করতে চেয়েছে। সর্বোপরি এই কারণেই বামপন্থীদের বিশ্লেষণ আদিবাসী ভূমির ওপর সম্প্রদায়গত অধিকার পুনরুদ্ধারের চেয়ে শ্রেণিভিত্তিক পুনরুদ্ধারে মনোনিবেশ করে।
ভূমিহীনদের জন্যে ভূমি
আদিবাসী অঞ্চলে বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলন উভয়েরই লড়াইয়ের মূল উপাদান হচ্ছে আদিবাসীদের হাতে ভূমিস্বত্ত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি। পশ্চিমবঙ্গ, কেরল ও ত্রিপুরার বামপন্থী সরকারগুলির ভূমি সংস্কারের ক্ষেত্রে যে বিপুল অভিজ্ঞতা রয়েছে সেখানেও সম্প্রদায় নির্ভর বিবেচনার পরিবর্তে শ্রেণিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গীই অনুসৃত হয়েছে। এই অবস্থানের উৎস খুঁজে পাওয়া যাবে ১৯৪০-এর দশকের ত্রিপুরা জনশিক্ষা সমিতি ও অন্ধ্র মহাসভার মত বামপন্থী সংগঠনগুলির জমির লড়াইয়ে। এটাও উল্লেখযোগ্য, দু’টি সংগঠনেরই কর্মতৎপরতা ছিল রাজন্য শাসিত সামন্তবাদী রাজ্যে যেখানকার শাসকরা ছিল সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের সাথে মৈত্রীবদ্ধ। ব্রিটিশরা আসার আগে যে ধরনের ভূমিস্বত্ত্ব ও সামন্তবাদী নিপীড়নের ব্যবস্থা সেখানে কায়েম ছিল সেটা তখনও ছিল অব্যাহত। সেই সময়পর্বের বামপন্থীদের পরিচালিত গণসংগঠনগুলি ওই রাজ্যগুলিতে যে সুনির্দিষ্ট ধরনের সামন্তবাদী সম্পর্কগুলির অস্তিত্ব ছিল, বিশেষ করে বাধ্যতামূলক শ্রম, ভূমি থেকে বিচ্ছেদ এবং মহাজনী ব্যবস্থা, তার ওপরই প্রধানত আলোকপাত করেছিল। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, পি, সুন্দরাইয়া অন্ধ্রপ্রদেশের চমকে দেওয়ার মত একটি বাস্তবতার উন্মোচন করে বলেছেন যে সেখানে কার্যত কোনো গ্রাম ভিত্তিক বা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অস্তিত্ত্বই ছিল না যেহেতু ব্রিটিশ-পূর্ব বা ব্রিটিশ আমলেও সমগ্র ভূমিস্বত্ত্ব ছিল রাজন্য শাসনের নিয়ন্ত্রণে। এই বিশ্লেষণ সেই ধারণার বিরুদ্ধে যায় যেখানে বলা হয়ে থাকে যে প্রাক-ব্রিটিশ সময়ে ভূমি ছিল জনগোষ্ঠীসমাজের নিয়ন্ত্রণে এবং সেই ব্যবস্থাপনাগুলি চরিত্রের দিক থেকে ছিল সমত্ববাদী ও গণতান্ত্রিক। এই প্রেক্ষিতেই বামপন্থীরা মনে করে, মূল কাজ হচ্ছে, যে কৃষক লাঙল চালায় তাদের মধ্যে ভূমি বন্টন করা এবং ভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া সমস্ত নিপীড়িত মানুষ, যাদের বেশিরভাগ আদিবাসী, তাদের স্বপক্ষে লড়াই সংগঠিত করা। এভাবেই বামপন্থীরা আদিবাসীদের ভূমির অধিকারে জন্যে লড়লেও, তারা এটা বিশ্বাস করেছে যে লড়াই সংগঠিত হতে হবে সমস্ত ভূমিহীন কৃষকের হাতে ভূমি তুলে দেওয়ার স্বার্থে।
এই বৃহত্তর লড়াইয়ের কর্মসূচির মধ্যেই দেখতে পাওয়া যাবে যে ১৯৪০ থেকে শুরু হওয়া গণমুক্তি পরিষদের নেতৃত্বে জুমিয়াদের জমির অধিকারে লড়াইয়ের মধ্যেই নিহিত ছিল আদিবাসীদের ভূমির পুনরুদ্ধার ও ভূমি উচ্ছেদ থেকে সুরক্ষার প্রশ্নও। এই দাবিকে পরবর্তীতে জুমিয়াদের পুনর্বাসন প্রকল্পের সাথে অঙ্গীভূত করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৯ সালে, সারা ভারত কৃষক সভার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্মেলন এই দাবি উত্থাপন করে যে আদিবাসী ও অ-আদিবাসী দরিদ্র কৃষকদের যে সমস্ত জমি জমিদার ও অন্য আত্মসাৎকারীদের হাত থেকে উদ্ধা করে জমির মূল মালিকদের হাতে ফিরিয়ে দিতে হবে। ১৯৯০ সাল নাগাদ সারা ভারত কৃষক সভা আদিবাসীদের সুনির্দিষ্ট দাবিদাওয়া নিয়ে দাবিসনদ রচনার কাজেও হাত দেয়। ‘গরিবদের স্বার্থবাহী কৃষি নীতির লক্ষ্যে’ শিরোনামের এক পুস্তিকাতে কৃষক সভা ডাক দিয়েছিল, কৃষিশ্রমিকদের দাবির ভিত্তিতে আদিবাসীদের জমির অধিকার সংক্রান্ত সমস্ত প্রশ্নে লড়াই গড়ে তোলার। সম্মেলন দাবি তুলেছিল :
-
আদিবাসীদের জমি অ-আদিবাসীদের হস্তান্তর বন্ধ করা। পরম্পরাগত ও গোষ্ঠীগত অধিকারের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে আদিবাসী অঞ্চলেগুলির ভূমির পঞ্জীকরণ সম্পূর্ণ করা।
-
অরণ্যজাত পণ্য ও বনাঞ্চলের জমির ওপর আদিবাসীদের পরম্পরাগত ও গোষ্ঠীগত অধিকারের সুরক্ষা।
-
অরণ্য সুরক্ষার নামে বনাঞ্চলের ভূমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদ বন্ধ করা। নিজেদের দখলে থাকা সমস্ত বনাঞ্চলের ভূমি আদিবাসীদের নামে পঞ্জীকৃত করে তাদের প্রত্যেককে সরকারি সনদ প্রদান। কৃষিবনবিদ্যার প্রয়োগিক কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট প্রজাতির বনসৃজনের অরণ্য আচ্ছাদন প্রকল্পে যুক্ত হতে সহায়তা প্রদান।
-
পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত জুমিয়াদের বনাঞ্চলের জমির অধিকার সুরক্ষিত রাখা।
-
পঞ্চায়েত সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের অধিকার সহ জনগনের পূর্ণ অধিকার প্রদানের মাধ্যমে বনাঞ্চলের গ্রামগুলিকে সাধারণ প্রশাসনিক গ্রামের স্বীকৃতি প্রদান করা।
পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় ভূমি সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির সমস্যা নিয়ে বিশেষ নজর দেওয়ার যে প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়েছিল এই দাবিগুলি ছিল সেই অভিজ্ঞতারই ফসল। ১৯৭৭ সালের প্রথম বামফ্রন্ট সরকার যে ভূমি সংস্কার কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিল তার উদ্দেশ্য ছিল দু’টি। প্রথম, বর্গাদার বা ভাগচাষিদের নিরাপত্তা প্রদানের স্বার্থে তাদের নাম নথিভুক্তকরণ এবং দ্বিতীয়, জমির উর্ধসীমা সংক্রান্ত আইন বলবৎ ও ভূমিহীনদের মধ্যে জমির পুনর্বন্টন করা। সরকারের বিশ্বাস ছিল জমির পুনর্বন্টন কৃষি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গতিবেগ আনবে এবং ফলে দারিদ্র্যের হ্রাস হবে। আশা করা হয়েছিল এভাবে, ভূমি সংস্কার শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের স্থবিরতার পর্ব থেকেই মুক্তি দেবে না, অনুসূচিত জাতি ও জনজাতি সহ সমাজের দুর্বলতর অংশের ক্ষমতায়ন ঘটাবে। ২০০১ সাল অবধি, সরকার জমির মালিকদের হাত থেকে ১৪ লক্ষ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করে এবং এর ৫৬ শতাংশ অনুসূচিত জাতি ও জনজাতিদের মধ্যে বন্টন করে দেয়। হিসেব করে দেখা গেছে, মোট ২৫ লক্ষ উপকৃত পরিবারের মধ্যে ১৮ শতাংশ ছিল অনুসূচিত জনজাতি ও ৩৭ শতাংশ অনুসূচিত জাতি গোষ্ঠীর। তার অর্থ প্রায় ৪৫ লক্ষ হেক্টর জমি বন্টন হয়েছে ৫ লক্ষ আদিবাসী পরিবারের মধ্যে এবং ৯৫ লক্ষ পেয়েছে অনুসূচিত জাতি পরিবারগুলি। এ ছাড়াও, নারী আন্দোলনের তরফ থেকে আসা দাবির প্রতি সাড়া দিয়ে ৪৪.৮ লক্ষ হেক্টর জমি যৌথ পাট্টার মাধ্যমে বন্টন করা হয় যাতে পুরুষদের পাশাপাশি তাদের স্ত্রীরা জমির যৌথ মালিকানা প্রাপ্ত হয়। এই পাট্টাগুলির অর্ধেকেরও বেশি ছিল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর। একইসঙ্গে পাশাপাশি সেচের সুযোগ ও কৃষি বিষয়ক সহায়তাও এই কৃষকদের প্রদান করা হয়। ভূমি সংস্কার কর্মসূচির মূল্যায়নে পশ্চিমবঙ্গ সরকার লক্ষ্য করে যে ১৯৮১ থেকে ১৯৯১-এর সময়পর্বে পশ্চিমবঙ্গে ভূমিহীন মজুরের সংখ্যা ১.৭৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু এই সাফল্য সত্ত্বেও দেখা যায় যে রাজ্যের অনুসূচিত জনজাতিদের মাত্র ১০ শতাংশ এই সরকারি সহায়তার আওতায় আসতে সক্ষেম হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে ভূমি বন্টন জনজাতি সমাজের বাঁচামরার সমস্যার সমাধান একটা নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে বেশি করতে অপারগ। এই বাস্তবতা সম্পর্কে সজাগ হওয়ার পর, নীতি নির্ধারকেরা ভূমিহীন কৃষকদের, যার বড় অংশই হচ্ছে আদিবাসীরা, তাদের সুবিধার্থে আরো নানা ধরনের প্রকল্প রচনা করেন। ১৯৯৮ সালে ভূমিহীন কৃষকদের জন্যে অন্যান্য কর্মসূচির পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিধি বা প্রভিডেন্ট ফান্ড চালু করা হয়। ভূমি সংস্কার পরবর্তী বাস্তবতা থেকে এটাও পরিলক্ষিত হয় যে ভূমি সংস্কার ও আরো নানা অনুসারী কৃষি সংস্কারের ফলে পশ্চিমবঙ্গে কৃষি উৎপাদনে বহুগুণ বৃদ্ধি ঘটেছে।
অভিজ্ঞতা এটাও অঙ্গুলি নির্দেশ করে যে আদিবাসী সমাজের চাহিদার যথাযথ পূরণ করতে হলে কৃষি বহির্ভূত বিকল্পগুলিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। জমির প্রসঙ্গে গাছপালা, উদ্ভিদ, গবাদি পশু ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সামগ্রীকেও অন্তর্ভুক্ত করে দেখতে হবে। অভাবী কৃষক ও অন্যান্য সমগোত্রীয় মানুষদের জন্যে, এতে অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি কাজের অধিকার সহ সেচ, ঋণ, বাজারকৃত করার সুযোগ এবং সর্বাধিক পরিমাণে অন্যান্য সুফলগুলি। তবে এটা দেখা সবচেয়ে জরুরি যে কৃষকেরা যেন তাদের জমির দেখভালের মাধ্যমে তাদের উৎপন্ন ফসলের দ্বারা পরবর্তী কয়েক দশক খেয়ে পরে বেঁচে থাকতে পারে। অনুসারী জীবিকা না থাকলে ছোট জমির মাধ্যমে এমনটা সুনিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য আদিবাসীদের জীবন জীবিকাও চরিত্রগত ভাবেই বহুমুখী হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে এটা ভাবা জরুরি, ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে যদি আদিবাসী সমাজের জন্যে দীর্ঘস্থায়ী ও সমৃদ্ধশালী কৃষি ভিত্তিক সমাধানের কথা বিবেচনা করতে হয়, তবে কৃষি সমাজ এবং নতুন কৃষি ব্যবস্থা সম্পর্কে বামপন্থীদের এতদিনকার ধারণায়ও পরিবর্তন আনতে হবে।
আদিবাসীদের ‘জবরদখলকারী’ মনে করা
বনাঞ্চলের জমির স্বত্ত্ব নিয়মিতকরণের লড়াই চলছে কয়েক দশক ধরে। গান্ধীবাদী ও বামপন্থী আন্দোলন উভয়েই মনে করে, বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে থাকা বাসিন্দাদের অধিকারের স্বীকৃতি এবং তাদের জমির স্বত্বাধিকার পাট্টা প্রদান প্রাপ্তি একটি জরুরি বিষয়। ২০০২ সালের মে মাসে সুপ্রিম কোর্টের তরফে বনাঞ্চলে ‘জবরদখলদার’ হিসেবে থাকা বাসিন্দাদের ছ’মাসের মধ্যে উচ্ছেদ করার আদেশ ঘোষিত হওয়ার পর বন দপ্তর ও এই আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে সংঘাত আরো বৃদ্ধি পায়। কে ‘জবরদখলদার’ এই প্রশ্ন সহ বনাঞ্চলের ভেতরের জমির স্বত্ব সংক্রান্ত সমস্ত বিষয়কেই সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশের প্রেক্ষিতেই দেখতে হবে। বনাঞ্চলে রাষ্ট্রের একচেটিয়া স্বত্ত্বের বিষয়টি একটি ঔপনিবেশিক ধারণার উত্তরাধিকার এবং এটাই রাষ্ট্র ও তৃণমূল স্তরের গণআন্দোলনের মধ্যেকার সংঘাতের প্রধান কারণ। বন দপ্তর গঠিত হয় ১৮৬৫ সালে এবং প্রথম বনাঞ্চল আইনও প্রণয়ন হয় একই বছরে যা ঘোষণা করে যে তখন থেকে বনাঞ্চলের একচেটিয়া মালিকানা একমাত্র রাষ্ট্রের। ফলে বন দপ্তরের হাতেই বনাঞ্চলের জমির উপর অবাধ ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ জারি এবং নিজস্ব রক্ষী বাহিনী, বিচার ব্যবস্থা ও আইন তৈরির দায়িত্ব ন্যস্ত হল। ১৮৭৭ সালে বনাঞ্চলের পরিচালন সম্পর্কে আরো বিশদে আইন প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু বনাঞ্চলের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত এর পরবর্তী মাইলফলক হিসেবে আসে ১৯২৭ সালের ভারতীয় বনাঞ্চল আইন যা এখনও বলবৎ রয়েছে। ১৯২৭ সালের আইনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এই আইনে বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত, সুরক্ষিত ও বনাঞ্চল গ্রামে শ্রেণিবদ্ধ করা। অর্থাৎ বনাঞ্চলের শ্রেণি বিভাজন জৈব বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তে মানুষের অধিকারের সীমার নিরিখে নির্দিষ্ট হল।
এই আইনের সামান্য বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে, এতে রাষ্ট্রের হাতে বনাঞ্চলের জৈব-সম্পদের পূর্ণ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ অর্পিত হয়েছে এবং বন দপ্তরের ভূ-বাসন আধিকারিকের হাতে সংরক্ষিত, সুরক্ষিত এবং বনাঞ্চল গ্রামের অধিকার সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে অবাধ ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় জনগনের অধিকারের সংকোচন ঘটানোর সাথে সাথে এতে অঞ্চলের জৈব-সম্পদের উপর জনগনের নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে ন্যূনতম স্তরে। কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকারগুলি বারবার এই আইন সংশোধন করেছে বনাঞ্চলের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি করার প্রয়োজনে। এই আইনের সুবাদে, স্থানীয় মানুষদের বনাঞ্চলের ওপর কোনো অধিকারই নেই এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদেরকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদ করা হয়ে থাকে। এই আইন স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছে, সংরক্ষিত এবং সুরক্ষিত বনাঞ্চলে কৃষির প্রয়োজনে জমি সাফাইয়ের কাজ নিষিদ্ধ, যতক্ষণ না ভূ-বাসন আধিকারিক সেই জমিকে চিহ্নিতকরণ করে শ্রেণিবদ্ধ এলাকা থেকে অবমুক্ত করার পর সেই অধিকারের অনুমতি দেন। আইন অনুযায়ী এই নিয়মের লঙ্ঘনকারীর জন্যে শাস্তি প্রাপ্য হবে এবং লঙ্ঘনকারী ‘দখলদার’ হিসেবে পরিগণিত হবেন।
উপনিবেশ-উত্তর সময়ের প্রথম প্রতিবেদন, ১৯৫২ সালের জাতীয় অরণ্য আইন এই মতকেই সমর্থন করে যে বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনায় সর্বক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট করে বললে, অগ্রাধিকার পাবে দেশের শিল্পায়ন কর্মসূচি। শিল্পে ব্যবহারের উপযোগী বৃক্ষরোপণ এবং বাণিজ্যিক অরণ্যায়নের জন্যে ৭৫ শতাংশ ব্যয় সুনির্দিষ্ট করাকে সংজ্ঞায়িত করা হল ‘জাতীয় চাহিদা’ হিসেবে। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এক সুবিশাল কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় বিদ্যমান অরণ্য সাফাই করে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী একটি করে সুনির্দিষ্ট প্রজাতির বনসৃজনের। এভাবে পোষিত বাগিচার উদ্ভিদগুলির বেশিরভাগই ছিল বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ইউক্যালিপটাস বা ক্রান্তীয় পাইন জাতীয় প্রজাতির যা অরণ্যনির্ভর শিল্পের জন্যে কাঁচামালের সংস্থান করত। এমনকী বাণিজ্যিক বনসৃজনের জন্যে বনাঞ্চলে পাট্টা পাওয়া কৃষকদের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এ ধরনের নির্বাচিত বৃক্ষ রোপণ। বিকেন্দ্রীকৃত বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনা এবং কৃষকদের হাতে বন সম্পদ নিয়ন্ত্রণের অধিকার জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়- এই যুক্তিগুলি তখনকার সময়পর্বে মানা হত না। ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বা জাতীয় কৃষি কমিশনের প্রতিবেদনের কোথাও-ই এ ধরনের বাণিজ্যিক অরণ্যায়নের সাথে আদিবাসীদের বনাঞ্চল ব্যবহারের সামঞ্জস্য বিধানের সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয় নি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ষষ্ঠ পরিকল্পনায় মধ্যপ্রদেশে এমন কোনো বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয় নি যা ‘আদিবাসী অর্থনীতির উন্নতিকল্পে সরাসরি অবদান রাখতে পারে’। পরিবর্তে, ধরে নেওয়া হয়েছে যে মজুরি বৃদ্ধির মাধ্যমে অপ্রত্যক্ষ ভাবে তারা উপকৃতই হবে যেহেতু বন দপ্তরের মূল শ্রমশক্তি হবে তারাই। আশা করা হয়েছিল যে বনসৃজন কর্মসূচি আদিবাসী সমাজকে একটি বিকল্প জীবিকার সন্ধান দেবে যাতে তারা দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে সমর্থ হয়। এর চেয়েও বড় কথা, এ ধরনের পরিবর্তনের তাৎপর্য দাঁড়াল এটাই যে, এর ফলে আদিবাসী সমাজ ফলপ্রদায়ী সম্পদ থেকে বঞ্চিত হয়ে দিনমজুরে পরিণত হল-আর অন্যদিকে বনাঞ্চল সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হল বাণিজ্যিক ও শিল্পায়নের উদ্দেশ্য পূরণে।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায়, বনাঞ্চলের জমিকে কৃষি ও অন্য উদ্দেশ্যে পরিবর্তিত করার দৃষ্টিকোণ থেকে ১৯৮০ সালের বনাঞ্চল (সংরক্ষন) আইনই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই আইন ১৯৮০-পূর্ব সময়ের বনাঞ্চলের দখলীকৃত জমিগুলির পুরোনো আইনের ধারা অনুযায়ী নিয়মিতকরণের অনুমোদন দিয়েছে- যদিও ১৯৮০-উত্তর দখলীকৃত জমির ক্ষেত্রে তা করে নি। এই আইনকে ভিত্তি করেই ১৯৮৮ সালের জাতীয় বনাঞ্চল নীতির রূপরেখা ঘোষণা করে বলেছে যে, ‘কোনো দখলীকৃত জমির নিয়মিতকরণ’ সম্ভব নয়। বন দপ্তরগুলি নির্দেশিকা জারি করে জানায় যে ১৯৮০ সালের আইন প্রণয়নের আগে রাজ্য সরকারগুলির এই মর্মে সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলেই একমাত্র ১৯৮০ সালের আগেকার দখলীকৃত জমিগুলির নিয়মিতকরণ হবে। সরকারের এই ব্যবস্থাগুলি বাড়তি উৎসাহ পেয়ে গেল যখন প্রথাগত পরিবেশবাদীদের একটি গোষ্ঠী রিট আবেদনের মাধ্যমে আদালতের হস্তক্ষেপ প্রার্থনা করে বলে যে, বিভিন্ন রাজ্যের অরণ্যভূমিতে ব্যাপক হারে জনবসতির ফলে বনাঞ্চলের সংকোচন ঘটছে। ওই আবেদন বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেছে ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, আসাম, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, কেরালা এবং আন্দামান ও নিকোবর দীপপুঞ্জের মত রাজ্য ও কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চলের নাম। সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে ২০০১ সালের নভেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্টের অনুমতি ব্যতিরেকে দখলীকৃত জমির নিয়মিতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়। এই রায়কে ভিত্তি করেই ২০০২ সালের মে মাসে, ১৯৯০ সাল থেকে নিয়মিতকরণের অনুপযুক্ত দখলীকৃত জমিগুলি থেকে অনতিবিলম্বে উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়ে বন দপ্তরের নির্দেশিকা প্রকাশিত হয়। এই আদেশের সরাসরি অর্থ দাঁড়াল- মোট এক কোটি মানুষ তাদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ হয়ে জীবন ধারণের জন্যে সমস্ত উপকরণ খোয়াবে।
মাঝে মাঝেই বলা হয়ে থাকে যে বনাঞ্চলে জবরদখলের জন্যেই বন দপ্তর অরণ্য সংরক্ষণ সম্পর্কিত দায় দায়িত্ব পালনে অপারগ হয়ে পড়ে। বন ও পরিবেশ মন্ত্রক কিছু স্বেচ্চাসেবী সংগঠনের সামনে প্রতিবেদন রাখতে গিয়ে বলেছে যে বনাঞ্চলে দখলীকৃত জমির নিয়মিতকরণ নতুন জবরদখলকে উৎসাহিত করে। এর পরিপূরক হিসেবেই এই মত উঠে আসে যে বনাঞ্চলে যে কোনো কর্ম তৎপরতাই দেশের পরিবেশগত সুরক্ষার জন্যে ক্ষতিকর। ২০০২ সাল অবধি দখলীকৃত জমির পরিমাণ সারণি ১ থেকে অনুমেয়।
সারণি ১ : ২০০২ সালের জবরদখল সম্পর্কিত তথ্য, একক লক্ষ হেক্টর।
|
রাজ্য |
পরিমাণ |
|
অন্ধ্রপ্রদেশ |
৩.৪১৩ |
|
আসাম |
২.৫৪৭ |
|
ছত্তিশগড় |
১.৫০৪ |
|
কর্ণাটক |
১.০৯০ |
|
মহারাষ্ট্র |
০.৯৩৬ |
|
মধ্যপ্রদেশ |
০.৭২৮ |
|
ওড়িশা |
০.৭৫৬ |
|
কেরল |
০.৪৫৯ |
|
ঝাড়খণ্ড |
০.৩৩৯ |
|
উত্তর প্রদেশ |
০.২৫২ |
|
উত্তরাঞ্চল |
০.১০৪ |
বন দপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৮০-র প্রথম দিকে প্রায় ৭ লক্ষ হেক্টর বনাঞ্চল জবরদখলদারীদের কবলে ছিল যা এখন ১২.৫ লক্ষ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। এর চেয়েও তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য হল, ১৯৫০ থেকে ১৯৮০-র মধ্যে যে ৪৩ লক্ষ হেক্টর জমি বিমুক্ত করা হয়েছে তার মাত্র অর্ধেক ব্যবহৃত হয়েছে কৃষি সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে। ২০০১ সাল পর্যন্ত ২.৫ লক্ষ দখলীকৃত জমি নিয়মিতকরণ হয়েছে যার পঞ্চাশ শতাংশ আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায়। এই তথ্য থেকে এটাই বোঝা যায়, সরকার বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে দখলীকরণ ও জীবন জীবিকার প্রয়োজনে দখলীকরণের মধ্যে পার্থক্য করতে অস্বীকার করেছে। এ ছাড়া, এটাও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত যে শিল্পের প্রয়োজনে কিংবা বৃহৎ প্রকল্পের জন্যে যে দখলীকরণ হয়েছে তা আদিবাসী ও সমাজের অন্যান্য দুর্বলতর জনগোষ্ঠীর সমাজে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলেছে।
ফলে এটা বিস্ময়কর নয় যে বেশিরভাগ তৃণমূল স্তরের সংগঠন সহ গণসংগঠনগুলি আশঙ্কা করে যে এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়াগুলি প্রধানত ছোট চাষী ও অন্য কৃষিজীবীদের উপরই কেন্দ্রীভূত হবে যাদের নিজের স্বার্থরক্ষা করার মত রাজনৈতিক অবলম্বন নেই। এর বিপরীতে, বনাঞ্চলের জমি বেদখলের জন্যে বৃহৎ জোত ও শিল্পপতিদের উচ্ছেদের দৃষ্টান্ত খুবই কম। এ ছাড়া ১৯৮০-পূর্ব ও ১৯৮০-উত্তর জবরদখলদারির মধ্যে মুখে যতই পার্থক্য টানা হোক না কেন, তৃণমূল স্তরে এর কোনো গুরুত্ব নেই। দু’ধরনের দখলদারিরই কার্যকারণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি অভিন্ন হলেও অরণ্য (সংরক্ষণ) আইন শুধু ১৯৮০-পূর্ব দখলদারির জন্যেই কিছু আইনী সুরাহা রেখেছে। এই আইন এই গোত্রের দখলদারির নিয়মিতকরণের একটা পদ্ধতির বন্দোবস্ত করেছে। এটা নথিভুক্ত সত্য যে ১৯৮০-পূর্ব সময়ে এক বিপুল সংখ্যক দখলীকৃত জমিরই, যার পরিমাণ প্রায় হাজার হাজার হেক্টর, ২১ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও নিয়মিতকরণ হয় নি। তাছাড়া যতটা হয়েছে তার নথিকরণের সত্যতা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে। পরিশেষে সরকারের ধারণা, বনাঞ্চল থেকে মানুষের উচ্ছেদই জবরদখলের সমস্যার একমাত্র সমাধান। যদিও ১৯৮০-উত্তর সময়পর্বের উচ্ছেদকৃত মানুষদের নিয়ে করণীয় সম্পর্কিত কোনো নীতি বা সুরাহার প্রস্তাব নেই তাদের। বিপরীতে, সরকার বিশেষজ্ঞ সমিতি গঠন করেছে শিল্পায়নের জন্যে বনাঞ্চলের জমির বিমুক্তির আবেদনপত্রগুলির বিবেচনার জন্যে। প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলির পরিবেশে প্রভাব নির্ণয় প্রক্রিয়াগুলি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কঠোরও নয় আবার প্রকল্পগুলির পরিবেশ-বন্ধুতা যাচাইয়ের বিষয়ে যথেষ্ট অনুপুঙ্খও নয়। এখান থেকেই এই উপসংহার টানা যায় যে অরণ্য (সংরক্ষণ) আইন বৃহৎ শিল্প ও বাণিজ্য মহলের দ্বারা প্রভাবিত।
রাষ্ট্রের একচেটিয়া দখলদারির প্রতিরোধ
‘জবরদখল’ নিয়ে রাষ্ট্রের নীতি বন সংরক্ষণ ও আদিবাসীদের জীবন জীবিকার প্রশ্নের মধ্যে এক স্বার্থের সংঘাতের সৃষ্টি করে। গণআন্দোলনগুলির তরফে এই ধারণার বিরোধিতা করার উদ্যোগ হয়েছে। পরিবেশ আন্দোলনের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে আদিবাসীরা স্মরণাতীত কাল থেকে আরণ্যক পরিমণ্ডলে সহজীবন যাপন করেছে এবং ফলেই অরণ্যভূমির উপর প্রাথমিক অধিকার তাদেরই বর্তায়। এই যুক্তিতে, রাষ্ট্র এবং আদিবাসী সমাজের বাইরের মানুষেরা উভয়েই বনাঞ্চলের ভূমিতে দখলদার। বামপন্থীরাও এ কথা স্বীকার করে যে আদিবাসীদের ‘জবরদখলকারী’ হিসেবে দেখা সম্ভবই নয় কারণ তাদের অস্তিত্বই নির্ভর করছে অরণ্যের উপর। তারা মনে করে রাষ্ট্রকে এই পার্থক্য করতে হবে, কারা বাণিজ্যিক কারণ ও শিল্পায়নের জন্যে, আর, কারা জীবন ধারণের প্রয়োজনীয়তায় অরণ্যে ‘অনুপ্রবেশ’ করে সেখানকার জমি দখল করেছে। বেশিরভাগ আন্দোলনের তরফেই মনে করা হয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বনাঞ্চলে জবরদখলকারী হিসেবে চিহ্নিত করা অনুচিত এবং ফলে তারা এই মর্মে দাবি করে চলেছে যে, বনাঞ্চলগুলির নতুন করে শ্রেণিবিভাগ করে বনাঞ্চলের পুনর্বসতি দিতে হবে। তারা মনে করে, বসতিপ্রদানের প্রক্রিয়া যথেষ্ট স্বচ্ছ হতে হবে এবং সেখানে অধিকাংশ মানুষের দাবির বিবেচনা করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গ্রেট হিমালয়ান ন্যাশনাল পার্কের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র অ্যান্ডারসনের ১৮৬০ সালের চুক্তিতে যাদের পারিবারিক স্বত্ত্ব অন্তর্ভুক্ত শুধু তাদের দাবিই সরকারি অধিগ্রহণে মান্যতা পেয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, সেই বন্যপ্রাণী উদ্যানের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর মাত্র এক চতুর্থাংশ ওই অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ও বন্যপ্রাণী বিভাগের দ্বারা অন্যত্র বসতি পাবার মান্যতা পেয়েছে। অঞ্চল নির্বিশেষে সর্বত্র বাস্তব পরিস্থিতির এমন দশাপ্রাপ্তি এবং ভূবাসন প্রক্রিয়ার মজ্জাগত মন্থরতার প্রেক্ষিতে, বামপন্থী ও পরিবেশ আন্দোলন উভয়কেই বনাঞ্চলের জমিতে নিয়ন্ত্রণ কায়েম রাখার জন্যে জমির লড়াইয়ে নামতে হয়েছে।
২০০২ সালে রাঁচীতে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় আদিবাসী সম্মেলনে, সিপিআই(এম) প্রস্তাব গ্রহণ করে দাবি জানিয়েছে ২০০২ সালের মে মাসের নির্দেশিকা প্রত্যাহারের এবং গুরুত্ব প্রদান করেছে বনাঞ্চলের বাণিজ্যিক ও অ-বাণিজ্যিক ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য করায়। গান্ধীবাদী আন্দোলনের সাথে অভিন্নমত হয়ে বামপন্থীরাও অরণ্যাঞ্চলের জমি ও সম্পদের উপর আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবিচ্ছেদ্য অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। এই বিষয়ে বামপন্থীদের অবস্থানের আরেকটি দৃষ্টান্ত পাওয়া যাচ্ছে ১৯৮৯ সালে কৃষক সভার একটি প্রস্তাবে যেখানে বন দপ্তরের কাছে দাবি জানানো হয়েছে ভূমিহীন কৃষকের দখলে থাকা চাষের জমিতে পরিখা খনন বন্ধ করার। এছাড়াও বন দপ্তরের তরফে সুরক্ষিত অঞ্চল তৈরির সময়ে আদিবাসী গ্রামগুলির বলপূর্বক উচ্ছেদ সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবিও জানানো হয়। কৃষক সভা লক্ষ্য করেছে, বন দপ্তরের তরফে হেনস্থার শিকার হওয়া জনগণ এই প্রচারাভিযানে ব্যাপক সাড়া দিয়েছে। এটা বিশেষ ভাবে সত্য মহারাষ্ট্রে যেখানে প্রধান প্রশ্ন ছিল দীর্ঘদিন ধরে চাষবাসরত সরকারি বনাঞ্চলের হাজার হাজার আদিবাসী, দলিত ও দরিদ্র কৃষকদের বিরুদ্ধে সরকারি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। ১৯৭৮-৭৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকারের তরফে দখলীকৃত জমির নিয়মিতকরণের নির্দেশিকা প্রকাশের পরও আধিকারিক স্তরে এর মান্যতা হল না। কারণ ১৯৮৮ সালের জাতীয় অরণ্য নীতি সংক্রান্ত প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর এক সরকারি ঘোষণার মধ্য দিয়ে বন দপ্তর বনাঞ্চল উন্নয়নের জন্যে পরিখা নির্মানের কাজ শুরু করে দেওয়া হয়। ২০০২ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই সমস্যাগুলি ক্রমেই বৃদ্ধি পেয়েছে এবং এর ফলে বিভিন্ন রাজ্যে বন দপ্তর ও আদিবাসী ও কৃষক সংগঠনের কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। আদিবাসী কনভেনশন লক্ষ্য করেছে, এই উচ্ছেদ প্রক্রিয়া কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে অন্ধ্র প্রদেশ, কেরালা ও মহারাষ্ট্রে এবং প্রতিবাদ করতে গিয়ে আদিবাসী আন্দোলনের কর্মীদের প্রতিনিয়ত লাঞ্ছনা ও গ্রেফতারির সম্মুখীন হতে হয়েছে। আদিবাসী ও অ-আদিবাসী সুবিধা-বঞ্চিত শ্রেণির মধ্যে ঐক্য রচনা বামপন্থীদের আন্দোলনের সাফল্যের একটি অনন্য নজির।
গান্ধীবাদী আন্দোলনগুলির মধ্যে একতা পরিষদ এবং এদের সহযোগী সংগঠন সমর্থন, প্রয়োগ এবং নদী ঘাঁটি সংঘর্ষ সমিতি নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর বন দপ্তরের বিরুদ্ধে সমাবেশ ও সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। এর একটি উদাহরণ, ছত্তিশগড়ের অচানকমার্গ অভয়ারণ্য যেখানে সমর্থন সক্রিয়ভাবে কর্মরত রয়েছে অন্তত ৪২ টি গ্রামে। প্রায়ই বিশেষ বিশেষ প্রশ্নে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বনাঞ্চল গ্রাম পঞ্চায়েতের সমন্বয়কারী সংগঠনও গঠিত হয়েছে। যেমন বিজরার নিকটবর্তী (অভয়াঞ্চলের প্রস্তাবিত অবমুক্ত অঞ্চলে) ৫টি গ্রাম মিলিতভাবে ডিসেম্বরের শেষে একটি ‘জঙ্গল পঞ্চায়েত’ আহ্বান করে বনাঞ্চলের অভ্যন্তরে থাকা কৃষি জমিতে গাছ লাগানোর ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ হয়, সমস্ত গাছগুলো উপড়ে ফেলে দেওয়া হবে এবং কোনো অবস্থাতেই জন্মস্থানের জমি ছেড়ে যাওয়া হবে না। জাতীয় উদ্যান হিসেবে পরিবর্তিত হতে যাওয়া অভয়ারণ্যের গ্রামগুলিতে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে যে বিশাল লড়াই গড়ে উঠছিল সে সময় এটা ছিল তারই একটা অংশ। সমর্থন-এর বৈগা পুনর্বাসন কর্মসূচি ছিল গান্ধীবাদী আদর্শের দ্বারা উদ্বুদ্ধ এবং তার ফলে এখন অবধি অভয়ারণ্যের অভ্যন্তরে সরাসোহা ও একতা কী পুর্তি গ্রামের পুনর্বাসন করাতে সম্পূর্ণ হয়েছে। এক্ষেত্রে, এই নীতি অনুসরণ করে এই সংগঠন একইসঙ্গে ভূমি সংস্কার এবং অরণ্য সংরক্ষণের কাজ করেছে। এটা এমন একটা উদ্যাগ যেখানে সনাতনী গ্রামীণ কাঠামো এবং আদিম জনগোষ্ঠীগত পরিচিতির পুনর্নিমানের প্রচেষ্টা করা হয়েছে। বলা বাহুল্য, বামপন্থীরা এই দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে সহমত নয়- তারা চায় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন গণতান্ত্রিক পরিচিতি নির্মান।
মধ্য প্রদেশে জন সংঘর্ষ মোর্চার পতাকার তলায় আরো নানা সংগঠন একত্রিত হয়ে আদিবাসীদের জমির অধিকার পুনরুদ্ধারের লড়াই গড়ে তুলেছিল। ১৯৯৫ সালে রাজ্য সরকার প্রস্তাব রেখেছিল ১.৮৩ লক্ষ হেক্টর দখলীকৃত জমির (১৯৭৬-৮০-র পর্বের দখল) নিয়মিতকরণের। কেন্দ্রীয় সরকার ০.৬৫ লক্ষ হেক্টরের ক্ষেত্রে অনুমোদন ও ০.১২ লক্ষ হেক্টরের ক্ষেত্রে প্রস্তাব প্রত্যাখান করে প্রস্তাবিত এলাকার জন্যে নতুন প্রস্তাব চেয়ে পাঠিয়েছিল। নির্ভুল তথ্য পাওয়া না গেলেও, অনুমান করা হয় ১৯৮০-র পরবর্তী সময়ে মধ্য প্রদেশে মোটামুটিভাবে ১.৫ লক্ষ হেক্টর জমিতে জবরদখল ঘটেছে। নিয়মিতকরণের মন্থর গতি দেখে জন সংঘর্ষ মোর্চার অভিমত ছিল, জবরদখলের সমস্যার গভীরে নিহিত রয়েছে সাধারণ জনগন ও শাসক বর্গের স্বার্থের পারস্পরিক বিরোধ। এই সচেতনতাই বনাঞ্চলে জনগোষ্ঠীগুলির জমির অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতে স্থানীয় স্তরের অসংখ্য লড়াইয়ের জন্ম দিয়েছে। বামপন্থীরা স্থানীয় স্তরে এই লড়াইয়ের অনেকগুলিতেই সমর্থন জানালেও নীতিগত ভাবে বনাঞ্চলে সনাতনী অধিকার ফিরিয়ে আনার সাথে সহমত পোষণ করে না। পরিবর্তে, বামপন্থীরা দাবি তুলেছে জমিতে চাষবাসে রত সমস্ত কৃষকদের পাট্টা প্রদানের স্বপক্ষে। এই পার্থক্যের জন্যেই বামপন্থীদের সংগ্রামকে পরিবেশ আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় না যদিও তাদের দাবিসনদ অন্যান্য পরিবেশ আন্দোলনের চেয়ে আলাদা নয়। তা সত্ত্বেও দুটো ধারার আন্দোলনই এ বিষয়ে একমত যে অরণ্য আইনের মৌলিক পরিবর্তন এবং কাঙ্ক্ষিত আইনী সংশোধনী অনুযায়ী জমির পুনর্বন্দোবস্ত ও নতুন শ্রেণিকরণ ব্যতিরেকে দখলদারির সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত জবরদখলের সমস্যার বিচার হওয়া উচিত আদিবাসী এলাকায় চাষজমি ও অরণ্যভূমির অধিকারের অস্বীকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে। ভারতবর্ষের মোট জমির প্রায় এক তৃতীয়াংশ পতিত জমি এবং বেশিরভাগ আদিবাসীর জমি পতিত জমি এলাকার প্রান্ত জুড়ে। আবার, বনাঞ্চলের বিধিনিষেধ থেকে অবমুক্ত বেশিরভাগ জমিই সম্ভবত চাষের অনুপযুক্ত এবং ফলে সেখানে কৃষি দীর্ঘস্থায়িত্ব পাবে না। নিম্ন উৎপাদনশীল জমিতে আদিবাসীদের জমির স্বত্ত্বপ্রদান এই সমস্যার সমাধান করবে না। যদিও বামপন্থীরা জমির অধিকারকে কৃষি-সংক্রান্ত উৎপাদনশীলতা ও কৃষি-বহির্ভূত নিযুক্তির সাথে যুক্ত করেই দেখেছে, এর সাথে সাশ্রয়ী কৃষি ব্যবস্থার প্রশ্নকেও আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ভারতীয় পরিবেশ আন্দোলন সাশ্রয়ী কৃষি ব্যবস্থাকে সনাতনী গোষ্ঠীগত অধিকারের পুনরুজ্জীবনের সাথে এক করে দেখে, কিন্তু বিদ্যমান অর্থনৈতিক কাঠামো বা উৎপাদন সম্পর্কগুলিকে ধর্তব্যের মধ্যে নেয় না। ফলে পরম্পরাগত জ্ঞানকে উন্নীত করে এক পরিপূরক ও সহযোগিতামূলক সম্পদ ব্যবহারের পদ্ধতি নির্মানের প্রশ্ন এখনও উত্তরহীন রয়ে গেছে।
পরবর্তী পর্বগুলিতে
- আদিবাসীদের জীবন জীবিকা এবং কৃষি সংকট
- আদিবাসী সমাজ, বনাঞ্চল ও বিশ্বায়ন
- উন্নয়ন ও উচ্ছেদের রাজনীতি
- ভারতীয় গণতন্ত্রে আদিবাসী সমাজ
- উত্তরকথন : ঐক্যবদ্ধ মোর্চার গঠন
ভাষান্তর ঃ শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার
প্রকাশের তারিখ: ০৭-নভেম্বর-২০২২
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
