Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

গান্ধীহত্যা, নাথুরাম ও আরএসএস : প্রকৃত ইতিহাস

রাম পুনিয়ানি
রশিদ ও নাথুরাম যে ঘৃণা পোষণ করত আজকের প্রেক্ষাপটে তার অর্থ হল, যে যুবকেরা লাঠি, তরোয়াল ও পিস্তল উঁচিয়ে হাঁটছে ধর্মীয় মিছিলগুলিতে তারা নিঃসন্দেহেই অপরাধী, কিন্তু অপরাধের দায় অনেক বেশি পড়বে ঘৃণার মতাদর্শে মগজ ধোলাই, ঘৃণা ভাষণ এবং সামাজিক গণমাধ্যমের সেই পোস্টগুলির ওপর যা দিনরাত ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিরোধী বিদ্বেষ বর্ষণ করে চলে। পাড়া প্রতিবেশের দিকে একটু তাকালেই দেখা যাবে ধর্মমিশ্রিত জাতীয়তাবাদকে অস্ত্র করে কীভাবে ঘৃণার চাষ ও বিস্তার ঘটছে।
gandhi hotya, nathuram o rss

২০২৩ সালের এপ্রিলে জাতীয় শিক্ষা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ পর্ষদ (এনসিইআরটি) বিদ্যালয় শিক্ষা পাঠক্রমের জাতীয় প্রস্তাবনা, ২০২৩ সংক্রান্ত ঘোষণার মাধ্যমে এতদিনকার পাঠ্যপুস্তক থেকে বহু অংশ বাতিল করে দেয়। মুঘল ইতিহাসের কিছু অংশ, ২০০২ সালের গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার উল্লেখ, জাতি ও বর্ণ ব্যবস্থার উদ্ভব সংক্রান্ত অংশগুলির পাশাপাশি গান্ধীহত্যা সংক্রান্ত কিছু অংশও বাতিল কেরে দেয়। বাতিল করা অংশটিতে বলা হয়েছিল : “হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের স্বপক্ষে তাঁর (মহাত্মা গান্ধীর) দৃঢ়পণ সংগ্রাম হিন্দু চরমপন্থীদের এতটাই রুষ্ট করেছিল যে তারা তাঁর প্রাণহানির একের পর এক চেষ্টা করে গেছে… গান্ধীজির হত্যা ভারতে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক সংঘাত পরিস্থিতির চমকপ্রদ পরিবর্তন ঘটিয়েছিল… ভারত সরকার সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো সংগঠনগুলিকে কড়া হাতে দমন করে… রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) মত সংগঠনগুলিকে কিছুদিনের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।”

ব্রাহ্মণ সন্তান নাথুরাম গডসেকে হিন্দু চরমপন্থী হিসেবে অভিহিত করা সহ বাতিলকৃত সমস্ত অংশগুলিকে আমরা কীভাবে দেখব সেটা বোঝার প্রয়োজন রয়েছে। 

যখন আব্দুল রশিদ নামে এক মুসলিম স্বামী শ্রদ্ধানন্দকে হত্যা করেছিল তখন গান্ধী ওই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেও রশিদকে ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন তাকে দোষ না দিয়ে প্রকৃতপক্ষে দোষ দিতে হবে তাদের, যারা এই বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি করেছে। একইভাবে গান্ধী ও বিশেষ করে তাঁর শিষ্য সর্দার প্যাটেল নাথুরাম গডসেকে দেখেছিলেন সমাজে বিদ্যমান বিদ্বেষের অভিব্যক্তি হিসেবে।

তাঁর নিজের খুনের জন্যে নাথুরাম সম্পর্কে অভিমত দেওয়া অবশ্যই গান্ধীজির পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু এ ধরনের কাপুরুষোচিত ঘটনাবলীর প্রতি গান্ধীজির মনোভাব কেমন ছিল সেটা বোঝা গিয়েছিল যখন ১৯৪৪ সালে পুণের নিকটবর্তী পাঁচগড়িতে নাথুরাম গডসে ছোরা নিয়ে তাঁর উপর হামলা চালায়। একটি প্রার্থনা সভায় ঘটনাটি ঘটেছিল। সেখানে নাথুরাম “নেহরু শার্ট, পায়জামা, জ্যাকেটে সেজে গান্ধীজির দিকে ধেয়ে যায়। সে একটি ছোরা উঁচিয়ে ধরে চীৎকার করে গান্ধী বিরোধী শ্লোগান দিচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গেই নাথুরামকে কাবু করে দেওয়া হয়… সেবার গান্ধীজী বেঁচে গিয়েছিলেন। তখনই প্রতিক্রিয়ায় গান্ধীজী নাথুরামকে তাঁর সাথে আট দিন থেকে যেতে বলেন যাতে তাঁরা এই সময়ে একে অপরকে জানতে পারেন। নাথুরাম সেই আমন্ত্রণ প্রত্যাখান করেন। মহানুভব গান্ধীজির বদান্যতায় তাকে চলে যেতে দেওয়া হয়। দু’টি ঘটনার ক্ষেত্রেই গান্ধীজির প্রতিক্রিয়া ছিল অভিন্ন।

গান্ধীজি যেমন স্বামী শ্রদ্ধানন্দের হত্যার ক্ষেত্রে বিদ্বেষকেই অভিযুক্ত করেছিলেন, তাঁর শিষ্য প্যাটেলও একই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আরএসএস-কে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ভ্রান্ত ধারণা থেকে কেউ কেউ মনে করে একমাত্র প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু চাপ দেওয়াতেই আরএসএস নিষিদ্ধ হয়। ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ভারত সরকার এই মর্মে  যে বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করে সেটা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। তখন প্যাটেল ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

সেই বিজ্ঞপ্তিতে সরকারের তরফে বলা হয়, “দেশের স্বাধীনতা ও সুনামকে ধ্বংস করা জন্যে  এই মুহূর্তে হিংসা ও বিদ্বেষের যে শক্তিগুলি তৎপর হয়ে উঠেছে তাদের শেকড় সমূলে উপড়ে ফেলার লক্ষ্যে’ আরএসএস-কে নিষিদ্ধ করা হল।… লক্ষ্য করা গেছে, দেশের নানা জায়গায় আরএসএস-এর সদস্যরা অগ্নিসংযোগ, লুঠতরাজ, ডাকাতি ও হত্যার মত হিংসাত্মক ঘটনা ঘটাচ্ছে এবং অবৈধ অস্ত্রশস্ত্র মজুত করে চলেছে। দেখা গেছে তারা লিফলেট বিলি করে সরকারের প্রতি জনগণের ক্ষোভ সৃষ্টি করে তাদেরকে আহ্বান জানাচ্ছে সন্ত্রাসবাদী কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে। পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের তারা প্ররোচিত করছে সরকারের বিরুদ্ধাচারণ করতে।”

আরএসএস-এর দ্বিতীয় অধ্যক্ষ এম. এস গোলওয়ালকারকে একটি চিঠিতে প্যাটেল বলেছেন, “তাদের (আরএসএস সদস্যদের) সমস্ত বক্তৃতা সাম্প্রদায়িক বিষে ভরা…এই বিষের শেষ ফলাফলে, দেশকে গান্ধীজির অমূল্য জীবনকে বলি দিতে হয়েছে। আরএসএস-এর জন্যে সরকার বা জনগণের এক বিন্দু সহানুভূতিও অবশিষ্ট নেই। বস্তুতপক্ষে তাদের প্রতি মানুষের ক্ষোভ বেড়েই চলেছে। গান্ধীজির হত্যার পর যখন আরএসএস সদস্যরা আনন্দ প্রকাশ করে মিষ্টি বিতরণ করেছে তখন এই বিরোধিতা আরো তীব্র হয়েছে”।

আরএসএস প্রচার করে যে আদালত তাদের ওপর “বেআইনি” নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এমনকী এই কথাটাও অর্ধসত্য মাত্র। এনসিআরইটির পাঠ্যবইয়ে যে অংশ বাতিল করা হয়েছে সেখানেও সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে আরএসএস-এর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্যেই। হিংসাত্মক ঘটনার জন্যে ব্যক্তি নাথুরামের চেয়ে বিদ্বেষের বিষই যে অধিকতর দায়ী সেটা গান্ধী, নেহরু, প্যাটেল এরা সকলেই উপলব্ধি করেছিলেন। একই ব্যাপার ঘটেছে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ ও গান্ধীজির হত্যার ক্ষেত্রেও। আরএসএস মহাত্মা গান্ধীর প্রতি মুখে শ্রদ্ধা জানায় আর মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ এবং বৈষম্যভরা কর্তৃত্বতান্ত্রিক প্রাচীন সমাজের গৌরব আগের মতই গেয়ে চলে ।

যে বিদ্বেষটি নাথুরামের মধ্যে প্রোথিত ছিল প্রাথমিকভাবে সেটা এসেছিল আরএসএস থেকে। কেন আমি মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করেছি- বইয়ে গডসে লিখেছেন, “হিন্দুদের উন্নতিসাধনের কাজকর্মে জড়িত থাকার পর আমার মনে হল হিন্দুদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার রক্ষার জন্যে দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শামিল হওয়া জরুরি। ফলে আমি সঙ্ঘ (আরএসএস) ছেড়ে হিন্দু মহাসভায় যোগ দিলাম।” তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, মহাত্মা গান্ধী মুসলিমদের তোষণ করার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান সৃষ্টির পথ সুগম করেছেন। তখনকার সময়ে হিন্দুত্বের স্বপক্ষে সোচ্চার একমাত্র রাজনৈতিক দল হিন্দু মহাসভায় যোগদান করে সেই দলের পুণে শাখার সাধারণ সম্পাদক হন নাথুরাম। পরবর্তীতে তিনি প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হয়ে অগ্রণী নামে একটি পত্রিকা বের করেন। পরে আরেকটি প্রকাশনাও বেরোয় যার নামে তিনি দেন হিন্দু রাষ্ট্র

রশিদ ও নাথুরাম যে ঘৃণা পোষণ করত আজকের প্রেক্ষাপটে তার অর্থ হল, যে যুবকেরা লাঠি, তরোয়াল ও পিস্তল উঁচিয়ে হাঁটছে ধর্মীয় মিছিলগুলিতে তারা নিঃসন্দেহেই অপরাধী, কিন্তু অপরাধের দায় অনেক বেশি পড়বে ঘৃণার মতাদর্শে মগজ ধোলাই, ঘৃণা ভাষণ এবং সামাজিক গণমাধ্যমের সেই পোস্টগুলির ওপর যা দিনরাত ধর্মীয় সংখ্যালঘু বিরোধী বিদ্বেষ বর্ষণ করে চলে। পাড়া প্রতিবেশের দিকে একটু তাকালেই দেখা যাবে ধর্মমিশ্রিত জাতীয়তাবাদকে অস্ত্র করে কীভাবে ঘৃণার চাষ ও বিস্তার ঘটছে। এক অর্থে, আমরা পাকিস্তানের পথই অনুসরণ করছি। ওই দেশে ইসলামী মৌলবাদ হিন্দু ও খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার চাষ করে যার ফলে তাঁদের উপর নিপীড়ন চলে ব্যাপক আকারে। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ সিংহলী জাতীয়তাবাদ জন্ম দিয়েছে তামিল, মুসলিম ও খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর উপর নির্যাতনের।

এনসিইআরটি-র উদ্যোগে পাঠ্যসূচির অংশ বিশেষ বাতিলের পর এখন হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও তাদের সমর্থকরা ঘৃণা ছড়ানোর কর্মকাণ্ডে আরো তীব্রতা এনেছে যার ফলে সংখ্যালঘুরা দুর্বিষহ হিংসার শিকার হয়ে ক্রমে আরো বেশি কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট মহল্লায় জমাটবদ্ধ হতে তাঁরা বাধ্য হচ্ছে। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ঘেটোর সংখ্যা তার ফলে বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে পাঠ্যসূচির অংশ বাতিলের পক্ষাবলম্বন, বিশেষ করে গান্ধীহত্যা, নাথুরামের ভূমিকা এবং এর সাথে জড়িত ঘৃণার মতাদর্শের পক্ষাবলম্বন বিভাজনের কর্মসূচি রূপায়ণেরই প্রচেষ্টা।

ভাষান্তর: শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার

আরও পড়ুন: হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সঙ্গে আম্বেদকরের মতাদর্শ কি সঙ্গতিপূর্ণ?

এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ, ফলো করুন আমাদের Whatsapp Channel

 


প্রকাশের তারিখ: ৩০-জানুয়ারি-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৫১ টি নিবন্ধ
২৫-মে-২০২৬

২২-মে-২০২৬

১৯-মে-২০২৬

০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬