সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ভারত@৭৫
সীতারাম ইয়েচুরি
য়াত কমরেড সীতারাম ইয়েচুরি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সাধারণ সম্পাদক। ছিলেন মার্কসবাদী পথের নিয়মিত লেখক। প্রথম লেখা ১৯৯৪, ফেব্রুয়ারি সংখ্যায়, ‘মাও জে দঙয়ের বিপ্লবী কমকাণ্ড’। তারপর লিখেছেন কুড়িটির বেশি প্রবন্ধ। ‘বর্তমান ভারতীয় রাজনীতিতে জাতপাত ও শ্রেণি’ থেকে ‘বিজেপি: এখন নয়, কখনোই নয়’। ‘বিশ্বায়নের বিকল্প সমাজতন্ত্র’ থেকে ‘গণসংগ্রামের মধ্যে দিয়েই গড়ে উঠবে বাম ও গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’। পত্রিকায় শেষ লেখা ২০২২, আগস্ট সংখ্যায়, ‘ভারত @ ৭৫’।

আমরা যখন ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের ৭৫তম বার্ষিকীর দিকে এগিয়ে চলেছি, ঠিক সেই সময়েই আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সাধারণতন্ত্রকে একটা ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ‘হিন্দুত্ব রাষ্ট্র’-এ বদলে দেওয়ার লক্ষ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা ন্যারেটিভ বা ব্যাখ্যা রচনা করা হচ্ছে। স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ভারতের যে মহাকাব্যিক সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা অর্জনের পর ভারতীয় সংবিধানের আওতায় গড়ে তোলা ভারতীয় রাষ্ট্র– দুটোকেই পুরোপুরি নাকচ করে এবং সম্পূর্ণ তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে নতুন এই নতুন ব্যাখ্যা নির্মাণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। অথচ, নতুন ব্যাখ্যায় বলতে চাওয়া হচ্ছে, ভারতের সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে সেইদিন, যেদিন আমাদের সংবিধানের ৩৭০ ধারা এবং ৩৫ ক ধারা বিলোপ করা হয়েছে। সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ২০১৯ এর ৫ আগস্ট, যেদিন জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের অস্তিত্ব বিলোপ করে দেওয়া হয়। সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে ২০২০ সালের ৫ আগস্ট, যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে রামমন্দির নির্মাণের সূচনা করা হয়েছে।
এই ন্যারেটিভ বা ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে রয়েছে ইতিহাসের বহুবিধ বিকৃতির ওপর এবং এমন সব জোরালো দাবির ওপর যেগুলি আদতে অনৈতিহাসিক এবং অবৈজ্ঞানিক। একটা দেশ হিসাবে ভারতবর্ষ সম্পর্কে ধারণা, জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস-এর ভূমিকা এবং এধরনের আরও নানা বিষয়কেই চ্যালেঞ্জ করছে এই বিকৃত ব্যাখ্যা। এই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়ে, বিকৃত এই ব্যাখ্যাকে পরাস্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব ইস্যুগুলির যথাযথ মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
দৃষ্টিভঙ্গীর সংগ্রাম
নতুন এই ন্যারেটিভ বা ব্যাখ্যা রাতারাতি গজিয়ে ওঠেনি। প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক, মতাদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গী, যা আত্মপ্রকাশ করেছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্বে, সেইসব দৃষ্টিভঙ্গীর প্রায় শতাব্দীব্যাপী সংগ্রামের পরিণতি থেকেই এর জন্ম হয়েছে। সুতরাং এই মন্থনপর্ব থেকে যে বহুতর ধ্যান–ধারণার উদ্ভব হয়েছে, এখন সেগুলোর পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন।
১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন মহাত্মা গান্ধী,যা তিনি ‘চৌরি চৌরা ঘটনা’-র পর প্রত্যাহার করে নেন। ১৯২১ সালে গড়ে ওঠে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯২৫ সালে জন্ম হয় আরএসএস-এর। সেই পর্ব থেকেই এই তিনটি পৃথক ধারা বা দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে সুতীব্র সংগ্রামের সূচনা হয়। ভবিষ্যতে স্বাধীন ভারতের চরিত্র কী হবে, এবং কেমন হবে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রকাঠামো– এগুলিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছিল ত্রিধারার এই দৃষ্টিভঙ্গীগত সংগ্রাম।
স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক চরিত্র কেমন হবে– এই বিষয়গুলিকে কেন্দ্র করে এই তিন দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে একটা ধারাবাহিক সংগ্রামের জন্ম হয় সেই পর্বেই। ভারতবর্ষ হল বহুত্ববাদী এবং নানাবিধ বৈচিত্রসম্পন্ন দেশ– এই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দিয়ে কংগ্রেস এবং কমিউনিস্টরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, দেশ হিসাবে ভারতের ঐক্য এবং ভারতের জনগণের ঐক্য সংহত করা যাবে তখনই, যখন বহুতর বৈচিত্রের মধ্যে অন্তর্লীন সাধারণত্বের যোগসূত্রটিকে শক্তিশালী করা সম্ভব হবে এবং যখন ভারতের বহুত্ববাদের প্রতিটি প্রকাশকে– ভাষাগত, জাতিগত, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বিষয়গুলিকে সম্মান জানানো হবে এবং সেগুলিকে দেখা হবে সমতার নীতির ভিত্তিতে। এই নীতি আরও একটি বিষয়কে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তা হল, এই বৈচিত্রের ওপর অভিন্নতা বা একত্ববাদ চাপিয়ে দেওয়ার কোনও রকম চেষ্টা হলে তার পরিণাম হবে ভয়ঙ্কর সামাজিক বিস্ফোরণ।
এই উপলব্ধির ভিত্তিতে মূলধারার কংগ্রেসি দৃষ্টিভঙ্গি যে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করেছিল তা হল, স্বাধীন ভারতকে গড়ে তোলা উচিত একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্র হিসাবে। একই লক্ষ্যের প্রতি সহমত পোষণ করেও কমিউনিস্টরা আরও অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে ভেবেছিল। তাদের ভাবনাটা ছিল এরকম– ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রকে আরও সংহত করতে হলে দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে ততদূর পর্যন্ত প্রসারিত করতে হবে যাতে প্রতিটি ব্যক্তির সামাজিক-অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করা যায় এবং সেটা একমাত্র সমাজতন্ত্রেই সম্ভব।
এই দুটি দৃষ্টিভঙ্গী ব চিন্তাধারা সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে অজ্ঞেয়বাদী অবস্থান ছিল তৃতীয় ধারার। সেই ধারার যুক্তি ছিল, স্বাধীন ভারতের চরিত্র নির্ধারিত হওয়া উচিত দেশের মানুষের ধর্মীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে। এমন দৃষ্টিভঙ্গীর অভিব্যক্তি ছিল দ্বিবিধ– একদিকে মুসলিম লিগ ‘ইসলামিক রাষ্ট্র’-এর দাবির পক্ষে এবং অন্যদিকে আরএসএস ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এর দাবির পক্ষে সওয়াল করে যাবে। ইসলামিক রাষ্ট্র গঠনের দাবিটি সফল হয়েছিল দুর্ভাগ্যজনকভাবে ভারত বিভাজনের মধ্যে দিয়ে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই বিভাজনে আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়া, মদত দেওয়া ও প্ররোচনা জোগানোর কাজটি করেছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ শাসকেরা এবং সেই প্রক্রিয়ার সবরকমের পরিণাম এখনও পর্যন্ত উত্তেজনা ও কুসংস্কারকে তীব্রভাবে জিইয়ে রেখেছে। তবে হিন্দু রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনাকারেরা স্বাধীনতার সময়ে তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছিল। কিন্তু আধুনিক ভারতকে উগ্র অসহিষ্ণুতায় জারিত, ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন একটি ‘হিন্দু রাষ্ট্র’–এ বদলে দেওয়ার প্রকল্প সফল করার প্রয়াস তারা ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে গেছে। এক কথায়, সমসাময়িক ভারতে মতাদর্শগত সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক সঙ্ঘাত আসলে এই তিন ধারার দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যেকার সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা। একথা বলাও নিষ্প্রয়োজন যে, এই সংগ্রামের ওঠাপড়াই ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’র বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’র বাস্তবায়ন বা অর্জন প্রক্রিয়ার দিশা ও অন্তর্বস্তুকে নির্ধারিত করে দেবে। (‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’ সম্পর্কে আমরা পরবর্তীতে ফিরে আসব)।
পুঁজিবাদী বিকাশের পথ
কমিউনিস্টরা আগাগোড়াই একথা বলে আসছে যে, আমাদের সাধারণতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে সংহত করার লক্ষ্য তখনই সফল হবে, যখন স্বাধীন ভারত একদিকে যখন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে বন্ধন ছিন্ন করতে সক্ষম হবে এবং অন্যদিকে শ্বাসরোধকারী সামন্ততান্ত্রিক অবশেষের নিগড় ভেঙে ফেলতে পারবে। স্বাধীনতা আন্দোলনকে কংগ্রেস দল যে এই যুক্তিসঙ্গত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারবে না, সেটা স্পষ্ট হয়ে যায় তখনই, যখন এই দল স্বাধীনতা-পরবর্তী পর্বে এদেশের শাসকশ্রেণি, অর্থাৎ বড় বুর্জোয়ার নেতৃত্বে ভূস্বামী শ্রেণির সঙ্গে জোটবদ্ধ বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষা করতে শুরু করে– এবং বিকাশের পুঁজিবাদী পথ অনুসরণ করে। এই পথটাই ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।
কিন্তু কীভাবে? প্রথমত, স্বাধীনতা সংগ্রামের পর্বে যে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী সামাজিক চেতনা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সেই চেতনাকে পিছনের দিকে ঠেলে দিয়ে এবং জাতপাত এবং সাম্প্রদায়িক আবেগভিত্তিক সামাজিক চেতনাকে অনুমোদন দিয়ে এবং তাকে আরও শক্তিশালী করে। দ্বিতীয়ত, সকলকে সঙ্গে নিয়ে ভারত গড়ার প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করার বদলে কংগ্রেস দল ক্রমাগত শোষিত জনতার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে ক্রমশ আরও বেশি করে দেশ গড়ার প্রক্রিয়া থেকে ধারাবাহিকভাবে ছেঁটে ফেলতে শুরু করে।
স্বাধীনতার প্রথম ছয় দশকে আমাদের অভিজ্ঞতায় এই বিষয়টিই প্রশ্নাতীতভাবে সঠিক বলে প্রমাণিত হয়েছে। এই বিষয়টাই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে বা তৃতীয় ধারাকে ‘হাতিয়ার’ জুগিয়ে দিয়েছে, যাতে তারা ভারতের শাসকশ্রেণিগুলির অনুসরণ করা নীতিসমূহের বিরুদ্ধে জনগণের মধ্যে ক্রমশ দানা বেঁধে ওঠা অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে তাদের নিজেদের শক্তি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে, আজকের দিনে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য নিছক একটা ঘোষণা এবং সেই ঘোষণাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বার বার সজোরে উচ্চারণ করাটাই ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভারতকে রক্ষা করা ও তাকে শক্তিশালী করার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বরং বলা ভাল, শুধুমাত্র ঘোষণার করার শক্তি একেবারেই সীমাবদ্ধ।
টিকে থাকা প্রাক্-পুঁজিবাদী সামাজিক চেতনা
‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’-কে যদি যথার্থই বাস্তবে অর্জন করতে হয়, তবে আরও একটি সমান গুরুত্বপূর্ণ উপাদানকে খেয়ালে রাখতে হবে যা সেই অর্জনের পথে বাধাস্বরূপ। শাসকশ্রেণিগুলি পুঁজিবাদী বিকাশের যে পথ অনুসরণ করে চলেছে সেখানে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজির সঙ্গে সমঝোতা এবং সামন্ততান্ত্রিক ভূস্বামীকূলের সঙ্গে আপস ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সুতরাং, ভারতের যে পুঁজিবাদী বিকাশের পথ সেটা মোটেই ক্ল্যাসিক্যাল পুঁজিবাদী পথে হচ্ছে না। ক্ল্যাসিক্যাল পথে পুঁজিবাদ উদ্ভূত হয় সামন্ততন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে, মোটেই সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে আপস করে নয়।
সামন্ততন্ত্রের টিকে থাকা অবশেষগুলিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করার কাজে অক্ষমতার মানেই হল, উপরিকাঠামের স্তরে, এমন একটা সামাজিক চেতনাকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখা যা সামন্ততন্ত্রের সঙ্গে এবং অন্যান্য প্রাক–পুঁজিবাদী রূপের সঙ্গে সম্পর্কিত। ধর্ম ও জাতপাতের আধিপত্য, যা প্রাক-পুঁজিবাদী রূপের সামাজিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, তা আজকের সামাজিক ব্যবস্থাতেও বেশ শক্তিশালী হয়েই টিকে রয়েছে। সামন্ততন্ত্রের টিকে থাকা অবশেষের ওপর জোর করে পুঁজিবাদকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে এমন একটা পরিস্থিতির জন্ম হয় যেখানে সামন্ততন্ত্রের টিকে থাকা অবশেষের সঙ্গে সম্পর্কিত চেতনার পশ্চাদপদতা এবং আজকের বিশ্বায়িত পুঁজিবাদী চেতনার অবক্ষয়িত, সুখ–স্বাচ্ছন্দ্যসর্বস্ব ‘ভোগলিপ্সা’ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
এধরনের খণ্ডিত–খর্বিত পুঁজিবাদী বিকাশের পরিণামে ভারতে শ্রেণি গঠনের প্রক্রিয়া কার্যকর হচ্ছে ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত, জাতপাতের বিভাজনে দীর্ণ এক সমাজ-কাঠামোর চৌহদ্দির মধ্যে। এদেশে প্রাক্–পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্কসমূহ উচ্ছেদ করার মধ্যে দিয়ে শ্রেণি গঠনের প্রক্রিয়া আদৌ কার্যকর হচ্ছে না। বরং তা কার্যকর হচ্ছে প্রাক্–পুঁজিবাদী সামাজিক সম্পর্কসমূহের সঙ্গে আপস করে। এরই পরিণামে সমসাময়িক ভারতে শোষিত ও শোষক শ্রেণিগুলির মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে এমন একটা অভিন্নতা বা সাধারণ বৈশিষ্ট্য যার অস্তিত্ব দুই শ্রেণির মধ্যেই রয়েছে। সুতরাং সেকারণে ভারতে শ্রেণি সংগ্রাম এগোতে পারে একমাত্র অর্থনৈতিক শোষণ এবং সামাজিক নিপীড়ণ– একইসঙ্গে এই দুইয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম গড়ে তোলার মধ্যে দিয়ে।
এভাবে উপরিকাঠামোর স্তরে, সামন্ততান্ত্রিক অবক্ষয় পুঁজিবাদী অধঃপতনের সঙ্গে মিলে গিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি করছে যেখানে সমাজের ক্রমবর্ধমান অপরাধীকরণের প্রক্রিয়া টিকে থাকছে বটেই, এমনকী জাতপাতভিত্তিক ও সাম্প্রদায়িক অনুভূতির দ্বারা জারিত সামাজিক চেতনার সংস্পর্শে এসে তা পল্লবিত হয়ে উঠছে। ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’-কে যদি বাস্তবায়িত করতে হয় তাহলে এধরনের চেতনাকে পরাস্ত করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে আদৌ তেমনটা ঘটছে না। বরং, সুনির্দিষ্টভাবে এই চেতনাকেই হিন্দুত্বের শক্তি উসকে দিচ্ছে তাদের রাজনৈতিক-নির্বাচনী সুবিধার জন্য।
ভারতীয় রাজনীতি সাম্প্রতিককালে যে দক্ষিণপন্থার দিকে ঢলে পড়েছে, তার উত্থানের উর্বর ক্ষেত্রই হল এধরনের বাস্তবতা। এই বাস্তবতাই ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’-কে পুরোপুরি খারিজ করার প্রয়াসে শক্তি জোগায় এবং তার পরিবর্তে ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ গঠনের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা: জাতীয়তাবাদ
জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাতিরাষ্ট্রগুলির উদ্ভব—এটা ছিল সামন্ততন্ত্রকে স্তর থেকে পুঁজিবাদের স্তরে মানব সমাজের রূপান্তরের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইউরোপে এই পর্বে গির্জার কর্তৃত্ব থেকে রাষ্ট্রকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার সংগ্রামও আত্মপ্রকাশ করে। সামন্তবাদের অস্তিত্বের সর্বোচ্চ পর্বে সব ধরনের সভ্যতায় রাজা ও সম্রাটেরা তাদের শাসনের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় স্বর্গীয় অনুমতি নামক অতিকথার আশ্রয় নিত। কিন্তু যখন সামন্তবাদকে পরাজিত করে পুঁজিবাদ বিজয়ী হল, তখন সেই স্বর্গীয় অনুমতির অতিকথা থেকে রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে আলাদা করে ফেলা হল। সেটাই ছিল পুঁজিবাদের বিজয়ের তাৎপর্য। শেষ পর্যন্ত ১৬৪৮ সালে ভেস্তফালিয়া চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সেই চুক্তিতেই জাতি–রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের নীতিগুলি এবং তার অনুসারী আন্তর্জাতিক আইনগুলি চূড়ান্ত হয়েছিল। এবং একথা সাধারণভাবে বিশ্বাস করা হয় যে, ভেস্তাফালিয়া চুক্তিই রাষ্ট্রগুলির সার্বভৌমত্বের নীতির ভিত্তিতে একটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করেছিল; রাষ্ট্রগুলির মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানাধিকারের নীতি প্রতিষ্ঠিত করেছিল; কোনও একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্য কোনও রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না এই নীতিরও প্রতিষ্ঠা করেছিল। এই সব নীতিসমূহকেই এককথায় বলা হত ভেস্তফালিয় ব্যবস্থা বা ভেস্তফালিয়ান সিস্টেম। ইউরোপের প্রধান প্রধান শক্তিগুলির মধ্যে ১৬৪৪–৪৮ সালের মধ্যে ভেস্তফালিয় শান্তি চুক্তি আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়েছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্যাসিবাদের পরাজয় পর্বে এবং এই পরাজয়ের ফলশ্রুতিতে উপনিবেশবাদ পিছু হঠতে শুরু করে। সেই পর্বে উপনিবেশবাদ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে পরিচালিত জনগণের সংগ্রাম সদ্য স্বাধীন দেশগুলিতে জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রচরিত্রের বহুবিধ ধরনকে সামনে নিয়ে এসেছিল। নিশ্চিতভাবেই বহুবিধ এই নির্মাণগুলি এই পর্বে উদ্ভূত হয়েছিল ভারত–সহ বিভিন্ন দেশে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের পরিণতিতে।
আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা: ভারতীয় মহাজাতিত্ব
ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে উৎখাত করে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ভারতীয় জনগণের মহাকাব্যিক সংগ্রামের পর্বেই ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’–র ধারণাটি আত্মপ্রকাশ করে। ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’ বলতে ঠিক কী বোঝায়? সহজ কথায় বললে, বহুস্তরে-বিন্যস্ত, জটিল বহুমাত্রিকতা বিষয়ে সচেতন থেকেও, এই ধারণাটি যে ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করে তা হল ভারত এমনই একটা দেশ যে নিজের বিপুল বৈচিত্রকে অতিক্রম করেই সমগ্র দেশের জনগণের অত্যন্ত শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক (inclusive) ঐক্য অর্জনের দিকে এগিয়ে চলেছে। ২০১০ সালে নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হেম্যান সেন্টার ফর হিউম্যানিটিজ-এ অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে ভারতে রাজনীতি ও রাজনৈতিক অর্থনীতির মধ্যেকার সম্পর্ক বিষয়ে একাধিক বক্তা ভাষণ দেন। সেই সব ভাষণ সংশোধিত হয়ে প্রবন্ধ আকারে প্রকাশিত হয়। সেই প্রবন্ধ সংকলনের ভূমিকায় অধ্যাপক আকিল বিলগ্রামি (আকিল সে সময় ছিলেন হেম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর হিউম্যানিটিজ সেন্টারের চেয়ারপার্সন) ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’–র বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণ বিষয়ে তখন যা বলেছিলেন সেটা এরকম:
‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’-কে জাতির এমন একটা আদর্শ হিসাবে দেখা যেতে পারে– যে আদর্শে, ভেস্তফালিয়ার শান্তিচুক্তি সম্পাদনের পর ইউরোপে যা কিছু আত্মপ্রকাশ করেছিল, সেগুলির সম্পূর্ণ গতিপথকেই খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। ইউরোপে তখন যে বিষয়টা সামনে এসেছিল তা হল একটা নতুন ধরনের রাষ্ট্রের বৈধতা খোঁজার বাধ্যতা। রাষ্ট্রের ‘স্বর্গীয় অধিকার’, যে অধিকার আরোপিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সম্রাট বা সাম্রাজ্ঞীর ওপর— এই ধরনের পুরনো ঘোলাটে ধারণার কাছে, সেই পরিস্থিতিতে, নতুন করে আবেদন জানানোর কোনও সুযোগও ছিল না। ভেস্তফালিয়ার শান্তিচুক্তির পর ইউরোপে নতুন যা কিছু আত্মপ্রকাশ করেছিল সেই সব বিষয়গুলি একদল নতুন ধরনের প্রজাদের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্বের নতুন একটা রূপের মধ্যে বৈধতা খোঁজার চেষ্টা করেছিল। সেই নতুন ধরনের প্রজারা হলেন ‘নাগরিক’। রাষ্ট্রের অস্তিত্বের নতুন রূপের অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটা মনস্তত্ত্বেরও একইসঙ্গে বৈধতা খোঁজার চেষ্টা চলছিল। অস্তিত্বের সেই নতুন রূপটি হল ‘নেশন’ বা ‘জাতি’। পরে এই অনুভূতিরই নাম দেওয়া হয়েছিল ‘জাতীয়তাবাদ’। এবং এই অনুভূতি নাগরিক জনতার মধ্যে জাগিয়ে তোলার দরকার হয়ে পড়েছিল। জাতির অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য ইউরোপ যে সাধারণ প্রক্রিয়াকে গ্রহণ করেছিল তা হল, জাতির মধ্যেই একটা বহিঃশত্রুকে খুঁজে বের করা, জাতির মধ্যেই থাকা সেই বহিরাগতকে, সেই ‘অপর’–কে খুঁজে বের করা (আইরিশ ও ইহুদি এই দুটো নাম করা যায়) যাদের ঘৃণা করতে হবে এবং পদানত করে রাখতে হবে। আরও কিছু সময়ের ব্যবধানে, এই বিষয় সংক্রান্ত আলাপ–আলোচনাকে আরো বেশি সংখ্যাতত্ত্ব ও রাশিবিজ্ঞান ভিত্তিক করে নিয়ে, অপর বা বহিরাগতের নাম দেওয়া হল ‘সংখ্যালঘু’। এবং যে পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়ে জাতির জন্য অনুভূতিকে সৃষ্টি করা ও জাগিয়ে তোলা হয়েছিল তার নামকরণ করা হল ‘মেজরিটারিয়ানিজম’ বা সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ।’ (সোশাল সায়েন্টিস্ট, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি, ২০১১)
আরএসএস–বিজেপির লক্ষ্য হল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক আধুনিক ভারতীয় সাধারণতন্ত্রকে বদলে দিয়ে তাদের ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এর ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করা। এই বিষয়টা, এক অর্থে, সেই ভেস্তফালিয় মডেলেই ফিরে যাওয়া, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে পদানত করে রাখে (মূলত মুসলিম: জাতির ভেতরে বহিরাগত শত্রু) এবং এই মডেল ‘ভারতীয় মহাজাতিত্ব’–এর বিপরীতে ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’–কে উৎসাহ দেয়। এ হল, বস্তুত, সেই ধরনের জাতীয়তাবাদের ধারনায় ফিরে যাওয়া ভারতের বুদ্ধিজীবী মহলের আলোচনায় যার আধিপত্য ছিল ভারতের জনগণের স্বাধীনতা সংগ্রামের ঝড় ওঠার আগে। ‘মেজরিটারিয়ানিজম’ বা ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ’–এর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা রাষ্ট্র– চরম অসহিষ্ণু ফ্যাসিবাদি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ যার আরেক রূপ— নাকচ করে দেয় সেই মূল বিষয়টিকেই, যাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় মহাজাতিত্ব-র চেতনা বিকশিত হয়ে উঠেছিল এবং যে চেতনার মধ্যে বিধৃত ছিল ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’। এই ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ আসলে ‘একটা নতুন ধরনের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব’–এর উদ্ভবেরই প্রতিফলন।
আরএসএস–বিজেপির ধ্বজাধারীরা ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’কে নিছক একটা আধিবিদ্যক ধারণা বলে উড়িয়ে দেয়। ভারতীয় (হিন্দু) জাতীয়তাবাদকেই তারা প্রদত্ত বাস্তবতা বলে জোর দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ব্রিটিশের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ভারতীয় জনগণের মহাকাব্যিক সংগ্রাম থেকে উদ্ভূত ভারতীয় মহাজাতিত্ব (‘দ্য আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’)–র বিরুদ্ধে বিজেপি এখন এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল পশ্চাদপদতাকে, যার নাম ভারতীয় (হিন্দু) জাতীয়তাবাদ। এবিষয়ে আকিল বিলগ্রামি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ তিনটিগুরুত্বপূর্ণ দশকে জনগণের যে বিশাল ও ধারাবাহিক জমায়েতগুলি ভারতবর্ষ প্রত্যক্ষ করেছে সেটা সম্ভব হত না যদি না এই ধরনের একটা বিকল্প এবং সকলকে সঙ্গে নিয়ে চলার আদর্শ তাদের অনুপ্রাণিত করত।’ (সোশাল সায়েন্টিস্ট, ভল্যুম ৩৯, নভেম্বর ১-২, ২০১১)।
ভারতের ভাষাগত, ধর্মীয়, জাতিগত, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি বৈচিত্র আমাদের জ্ঞাত বিশ্বের যে কোনও দেশের তুলনায় অনেক বেশি বিশাল ও পরিব্যাপ্ত। সরকারিভাবে এর আগে যে বিষয়টি নথিভুক্ত করা হয়েছে তা হল, ভারতে রয়েছে অন্তত ১৬১৮টি ভাষা, ৬৪০০ জাতিবর্ণ, ৬টি প্রধান ধর্ম যার মধ্যে ৪টির জন্ম এদেশেই। রয়েছে নৃতাত্ত্বিকভাবে চিহ্নিত ৬টি জাতিগোষ্ঠী। এইসব উপাদানকে একসঙ্গে রেখেই একটা দেশ হিসাবে ভারতকে রাজনৈতিকভাবে শাসন করা হচ্ছে। এই বৈচিত্রের অন্য এক পরিমাপ হল ভারতে পালিত হয় ২৯টি প্রধান ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব এবং সম্ভবত এদেশেই রয়েছে বিশ্বের অন্য সব দেশের তুলনায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ধর্মীয় ছুটির দিন।
যারা বলেন এই বিশাল বৈচিত্রকে ব্রিটিশ ঐক্যবদ্ধ করেছিল, তারা এই তথ্যটা ভুলে যান যে, এই উপমহাদেশকে দু-টুকরো করার কাজটি করেছে ব্রিটিশেরাই, যার পরিণতিতে ১০ লক্ষ লোকের মৃত্যু হয়েছিল এবং বিশাল সংখ্যক মানুষ সাম্প্রদায়িক পরিযানে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের রয়েছে একটা কলঙ্কজনক ইতিহাস। সে ইতিহাস হল তারা ফেলে রেখে গেছে এমন সব উত্তরাধিকার যা এখনও তাদের উপনিবেশ হিসাবে থাকা দেশগুলির ক্ষতচিহ্নকে বিষিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে এমন ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশ ছাড়াও ঘটছে প্যালেস্তাইন ও সাইপ্রাসে। স্বাধীনতার জন্য সাধারণ মানুষের দেশজোড়া সংগ্রামই দেশের বৈচিত্রকে একসূত্রে গ্রথিত করেছিল এবং ৬৬০-র বেশি সামন্ততান্ত্রিক ছোট ছোট রাজ্যকে আধুনিক ভারত হিসাবে সংহত করেছিল, যা থেকে উৎসারিত হয়েছিল এক নিখিল–ভারতীয় চেতনা।
কমিউনিস্টদের ভূমিকা
ভারতীয় কমিউনিস্টরা ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’–র বিকাশের প্রক্রিয়ায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। বস্তুত, ঠিক এই কারণেই, এবং স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে কমিউনিস্টদের দূরদর্শীসুলভ অঙ্গীকার থাকায়, আজকের পরিস্থিতিতে ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’-কে যদি বাস্তবায়িত করতে হয়, তাহলে সেখানে কমিউনিস্টদের ভূমিকাই হবে একেবারে কেন্দ্রীয় চরিত্রের। এই প্রসঙ্গে বিবেচনায় আনতে হবে তিনটি ইস্যুকে, যেগুলি আজকের দিনেও ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’–র মূল উপাদান হিসাবে রয়ে গেছে।
জমির প্রশ্ন: ১৯৪০এর দশকে দেশের বিভিন্ন অংশে জমির প্রশ্নে সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলেন কমিউনিস্টরা। এগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল কেরলে পুন্নাপারা ভায়লার লড়াই, বাংলার তেভাগা আন্দোলন, আসমের সুর্মা উপত্যকার সংগ্রাম, মহারাষ্ট্রের ওয়ালি অভ্যুত্থান প্রমুখ। এই সব লড়াইয়ের শীর্ষবিন্দু ছিল তেলেঙ্গানার সশস্ত্র সংগ্রাম। এই সংগ্রামই ভূমি সংস্কারের প্রশ্নটিকে একেবারে কেন্দ্রীয় মঞ্চে এনে ফেলেছিল। এসবেরই পরিণামে জমিদারি প্রথা এবং বিশাল বিশাল ভূসম্পত্তির এস্টেটগুলি অবলুপ্ত হয়েছিল। এবং তারই জেরে ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’-র প্রকল্প নির্মাণে কমিউনিস্টরা বিশাল সংখ্যক কৃষক সমাজকে টেনে এনেছিলেন। সামন্ততান্ত্রিক দাসত্ববন্ধন থেকে কোটি কোটি মানুষকে মুক্ত করার কাজে এইসব সংগ্রামগুলি সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছিল। আজকের ‘ভারতীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি’র সৃষ্টিতেও বিরাট ভূমিকা রেখেছিল এই সব সংগ্রাম।
আজকের পরিস্থিতিতে নতুন কৃষি আইনে জোর করে জমি অধিগ্রহণের ইস্যুটি খুবই বিপজ্জনক মাত্রার হয়ে উঠেছে। জোর করে নির্বিচারে কৃষিজমি অধিগ্রহণের বিষয়টি আইনসিদ্ধ করে, জোর করে লক্ষ লক্ষ কৃষককে জমি থেকে উৎখাত করে, কৃষি সঙ্কটকে আরও তীব্রতর করে তোলা হয়েছে। সেকারণে জমির প্রশ্নটি বামপন্থী শক্তির কাছে এখনও পর্যন্ত খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু হিসাবে রয়ে গেছে। বামপন্থীরাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক শক্তি, যারা কৃষকদের ক্রমবর্ধমান দুর্গতির বিরুদ্ধে, এবং পুঁজির আদি সঞ্চয় প্রক্রিয়াকে তীব্র করে তুলেছে, যেসব নয়া–উদারবাদী নীতি সেগুলির বিরুদ্ধে, কৃষি সংগ্রাম গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছে।
ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠন: দ্বিতীয়ত, ভারতীয় কমিউনিস্টরা স্বাধীন ভারতে রাজ্যগুলির ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠনের দাবিতে বিপুল গণসংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আজকের ভারতের রাজনৈতিক ‘মানচিত্র’ যুক্তিসঙ্গতভাবে বৈজ্ঞানিক ও গণতান্ত্রিক ধারায় যাঁরা রচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কমিউনিস্টরাও। বিশালঅন্ধ্র,ঐক্য কেরল এবং সংযুক্ত মহারাষ্ট্রের জন্য সংগ্রামে অন্যান্যদের সঙ্গে এমন সব ব্যক্তিরা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যাঁরা পরে এদেশের প্রথম সারির কমিউনিস্ট হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। এই লড়াইয়ের জেরে ভারতে বসবাসকারী বহু ভাষিক সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে সমানাধিকারের ভিত্তিতে ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’কে বাস্তবায়িত করার প্রক্রিয়ায় অঙ্গীভূত করে নেওয়ার পথ সুগম হয়েছিল।
এমনকী, রাজ্যগুলির ভাষাভিত্তিক পুনর্গঠনের পরেও, আজকের দিনে, ছোট ছোট রাজ্যের অনেক সমস্যা ও দাবিগুলি সামনে আসছে। এথেকেই বোঝা যায়, আমাদের দেশে, বিশেষ করে উত্তরপূর্ব ভারতে, ভাষা-বর্ণ-উপজাতি-ধর্ম-সংস্কৃতি–ভিত্তিক বিদ্যমান বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পরিচিতিসত্ত্বাগুলির সমানাধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। ছোট রাজ্যের দাবিগুলি সেই সমস্যারই প্রতিফলন। সমস্ত ভাষিক গোষ্ঠী এবং পৃথক বর্ণ-উপজাতি-ধর্ম-সংস্কৃতি ভিত্তিক জাতিগোষ্ঠীগুলির জাতীয় পরিচিতিসত্ত্বার সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে যদি সমতার নীতি অবলম্বন করা হয়, যদি এই সব এলাকার অর্থনৈতিক পশ্চাদপদতার মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দসহ নির্দিষ্ট পরিকল্পনা রচনা করা যায়, যদি বিদ্যমান সমস্ত সুবিধা উপভোগের জন্য সবার সমামাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়, তাহলেই সমতার নীতির অভাববোধ থেকে উঠে আসা ছোট রাজ্যের দাবি ও সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। এদেশে একমাত্র বামপন্থীরাই একেবারে আন্তরিকভাবে এই বিষয়টার পক্ষে লড়াই করে। এবং এই লড়াইয়ের লক্ষ্য হল ভারতের ঐক্য ও সংহতিকে আরও শক্তিশালী করা।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ: তৃতীয়ত, ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি কমিউনিস্টদের অবিচল অঙ্গীকারের ভিত্তি হল ভারতের বাস্তবতার স্বীকৃতি। একথা পুনরাবৃত্তি করা অহেতুক হবে না যে, বিপুল বৈচিত্র সত্ত্বেও ভারতের ঐক্য রক্ষা করা যাবে শুধুমাত্র এই বৈচিত্রের মধ্যে অন্তর্লীন থাকা সাধারণত্বের বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে। এই বৈচিত্রের ওপর জোর করে কোনও একরূপতা চাপিয়ে দিলে এই ঐক্যকে রক্ষা করা যাবে না। যদিও এখন এদেশের সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলি বর্তমানে সেটাই করার চেষ্টা করছে। ভারতের সামাজিক জীবনের সমস্ত স্বভাবধর্ম বা বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে একথা সত্যি। তবে কোনও রকম একরূপতা জোর করে চাপিয়ে না দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে ধর্মের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বিভাজন এবং তার পরিণতিতে ভয়ানক সব সাম্প্রদায়িক হানাহানির ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর, ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’–কে বাস্তবায়িত করার প্রচেষ্টার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের সংজ্ঞা হল রাজনীতি থেকে ধর্মের বিচ্ছেদ। সেই সংজ্ঞা নিরূপণ করাই ছিল কমিউনিস্টদের লক্ষ্য। কিন্তু সেই লক্ষ্যের মাত্র অর্ধেক পথ পর্যন্ত এগিয়ে ছিল ভারতীয় শাসকশ্রেণিগুলি। রাজনীতি থেকে ধর্মের বিচ্ছেদের মানে হল যে কোনও ব্যক্তির পছন্দমতো বেছে নেওয়া ধর্মবিশ্বাসের নিরাপত্তা দেবে রাষ্ট্র। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনও ধর্মের হয়ে প্রচার করবে না বা নির্দিষ্ট কোনও ধর্মকে অন্য ধর্মের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে না। অথচ কাজের বেলায় দেখা গেল ভারতীয় শাসকশ্রেণিগুলি এই বিষয়টিকে বিকৃত করে যে জিনিসটা দাঁড় করিয়েছে তা হল, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ মানে সব ধর্মের সমতা। এর মধ্যে অন্তর্নিহিত হয়ে যে বিষয়টা থেকে যায় তা হল সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মবিশ্বাসের প্রতি ভেতর থেকে গড়ে ওঠা একটা পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব। বস্তুত এই মনোভাবই সাম্প্রাদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিগুলিকে টিকে থাকার শক্তি জোগানোর কাজে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
এখনকার পরিস্থিতিতে এক্ষেত্রেও বামপন্থীরাই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের ঝান্ডাকে সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে উঁচুতে তুলে ধরে রেখেছে। তারাই সাম্প্রদায়িকতাবাদের বিরুদ্ধে জনগণের সম্ভাব্য বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াসের বর্শামুখ হয়ে রয়েছে। এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের রক্ষার কাজে একনিষ্ঠ লড়াকুর ভূমিকা পালন করছে। বামপন্থীরাই এখন ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, আমাদের দেশের সমানাধিকার সম্পন্ন নাগরিক হিসাবে তাদের পরিচিতিকে রক্ষা করছে।
গ্রাম ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত জনগণকে টেনে আনা; সামাজিকভাবে নিপীড়িত জনগণ, বিশেষ করে যারা এখনও জঘন্য ধরনের জাতপাত–ভিত্তিক নিপীড়ণ ও অত্যাচারের শিকার হয়ে আছে, তাদের সমাবেশিত করা;অসংখ্য ভাষিক সংখ্যালঘুদের টেনে নিয়ে আসা; এবং বহু ধর্মে বিশ্বাসী ভারতীয় জনগণকে সমাবেশিত করা; এবং সর্বোপরি সব ভারতীয়কে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়ের এমন একটা পথে টেনে আনা যেখানে সকলের স্থান রয়েছে, এগুলোই হল অন্তর্ভুক্তিমূলক ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ অথবা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’র কেন্দ্রীয় বিষয়, যা এখনও এক অসম্পূর্ণ অ্যাজেন্ডা হয়ে রয়ে গেছে। এই অসম্পূর্ণ কাজ সম্পন্ন করার যে সংগ্রাম, সেটাই সিপিআইএম এবং ভারতীয় বামপন্থীদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অ্যাজেন্ডা। সেকারণেই ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ অথবা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’র বাস্তবায়নের সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার কাজে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রয়েছে সিপিআইএম এবং ভারতীয় বামপন্থীদের।
আরএসএস-এর দৃষ্টিভঙ্গী
আরএসএস–এর প্রতিষ্ঠার ২ বছর আগে ভি ডি সাভারকার ১৯২৩ সালে একটি মতাদর্শগত প্রচার পুস্তিকা বের করেছিলেন। পুস্তিকার শিরোনাম ছিল ‘হিন্দুত্বের সারকথা’। পরে যখন পুস্তিকাটি ফের ছাপা হয় তখন এর নাম বদলে রাখা হয় ‘হিন্দুত্ব: হিন্দু কে?’ এই মতাদর্শগত প্রচার পুস্তিকার মূল বিষয় ছিল একথা সংজ্ঞায়িত করা: ধর্মবিশ্বাস যাই হোক না কেন, সেইসব মানুষ যারা মনে করে ভারত তাদের মাতৃভূমি (মাদারল্যান্ড), পিতৃভূমি (ফাদারল্যান্ড) এবং পুণ্যভূমি (হোলি ল্যান্ড) তারাই হিন্দুত্বের এক্তিয়ারভুক্ত। ভারতে বসবাস করে, অথচ যাদের পুণ্যভূমি আলাদা যেমন মুসলিম (মক্কা ও মদিনা) এবং খ্রিশ্চান (যাদের পুণ্যভূমি বর্তমানে যুদ্ধবিধ্বস্ত প্যালেস্তাইনের জেরুজালেম), তারা হিন্দুত্বের এক্তিয়ার–বহির্ভূত।
সাভারকার জোর দিয়ে আরও যে কথা বলেছিলেন তা হল, হিন্দুত্ব একটা রাজনৈতিক প্রকল্প এবং এর সঙ্গে হিন্দু ধর্মের কোনও সম্পর্ক নেই। হিন্দুত্বের প্রতিষ্ঠাকল্পে তাঁর স্লোগান ছিল, ‘সামরিক বাহিনীর হিন্দুকরণ করো, হিন্দুত্বরাজের সামরিকীকরণ করো’। বিষাক্ত ঘৃণা, হিংসা ও সন্ত্রাসে জারিত এখনকার হিন্দুত্ব-প্রচারের প্রেরণার উৎস এই স্লোগানই।
আরএসএস নির্মাণ করা জাতীয়তাবাদই ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার মতাদর্শগত–তাত্ত্বিক নায্যতা জুগিয়েছিল (এই বিষয়টি হিন্দু ধর্ম থেকে শত যোজন দূরের এবং সেকারণেই এর নাম দেওয়া উচিত ‘হিন্দুত্ব রাষ্ট্র’)। ১৯৩৯ সালে আর এসএসের তৎকালীন সরসঙ্ঘচালক বা শীর্ষ নেতা ‘উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইনড’ শীর্ষক রচনায় এই কথাগুলি প্রথম স্পষ্ট করে উচ্চারণ করেছিলেন। এই সংজ্ঞাই আরএসএসের মতাদর্শকে একটা স্পষ্ট আকার দিয়েছিল। এবং এই মতাদর্শগত-তাত্ত্বিক ভিত্তির জোগান দেওয়াটা শুধুমাত্র ভাবনা ও নীতির নিরিখেই ছিল না, বরং একইসঙ্গে তা যুগিয়ে দিয়েছিল সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিও, যাকে কাজে লাগিয়ে সেই কাল্পনিক হিন্দুত্ব রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য অর্জন করা যাবে।
আরএসএসের প্রয়াত প্রধানের একটি স্পষ্টোক্তির মধ্যে এই প্রতিপাদ্যটি খুঁজে পাওয়া যাবে,
‘অন্য কোনও বিদেশি জাতির সশস্ত্র হামলার আগে টানা প্রায় আট কিংবা দশ হাজার বছর ধরে এই দেশে প্রতিষ্ঠিত ছিল হিন্দুদের অবিসংবাদিত এবং অবাধ অধিকার।’ এবং সেকারণেই এই দেশ ‘পরিচিতি পেয়েছিল হিন্দুস্থান হিসাবে, হিন্দুদের দেশ হিসাবে’ (এম এস গোলওয়ালকার, ১৯৩৯, পৃষ্ঠা ৬)। ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে আরএসএসের কিছু এসে যায় না। হিন্দুস্থান শব্দটাই ব্যবহার করেছিল আরবেরা। সিন্ধু (ইন্দাস) নদের ওপারের দেশকে বোঝাতে। সিন্ধু নদের ওপারের দেশগুলিতে যারাই থাকত তাদেরই বলা হত ‘হিন্দুজ’ (ধ্বনিতত্ত্বে আরবিতে ‘এস’ হয়ে যায় ‘এইচ’!)।
এধরনের অবৈজ্ঞানিক ও অনৈতিহাসিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে হিন্দুরা সবসময়ই এবং ধারাবাহিকভাবে একটাই জাতি ছিল এবং এখনও রয়েছে, এই বিষয়টা ‘প্রতিষ্ঠা’ করার পর, হিন্দুত্ববাদী শ্রেষ্ঠত্বের প্রবক্তারা এবার একধাপ এগোলেন। তারা জোর দিলেন এই ধরনের হিন্দু জাতির গোঁড়া, ধর্মতাত্ত্বিক উপাদানের ওপর:
প্রশ্নাতীতভাবে সিদ্ধান্তটা জোর করেই আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে...হিন্দুস্থানে রয়েছে এবং অবশ্যই থাকার দরকার রয়েছে প্রাচীন হিন্দু জাতির। অন্য কোনও কিছু নয়, বরং রয়েছে সেই হিন্দু জাতিই। অতএব যা কিছু বিষয় জাতীয় নয়, অর্থাৎ হিন্দু জাতি, ধর্ম, সংস্কৃতি এবং ভাষা ইত্যাদি, সেগুলিকে স্বাভাবিকভাবেই থাকতে হবে সত্যিকারের ‘জাতীয়’ জীবনে গ্রহণীয় আচরণসমূহের সীমারেখার বাইরেই।
এরকম পরিস্থিতিতে, একমাত্র সেই আন্দোলনগুলিই সত্যিকারের ‘জাতীয়’ যেগুলির লক্ষ্য হল বর্তমান নিশ্চলতার উৎস যে হিন্দু জাতি তার পুনর্নির্মাণ করা, তাতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করা এবং তাকে নিশ্চলতা থেকে মুক্ত করা। তারাই একমাত্র জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিক হিন্দু বংশ ও জাতিকে গৌরবান্বিত করার আকাঙ্ক্ষা যাদের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। একমাত্র সত্যিকারের সেই জাতীয়তাবাদীরাই কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে এবং লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হতে পারে। বাকি সবাই হয় বিশ্বাসঘাতক এবং জাতীয় স্বার্থের শত্রু, কিংবা আরও একটু উদার মনোভাব নিয়ে বলা যায়, তারা নির্বোধ (গোলওয়ালকার, ১৯৩৯, পৃষ্ঠা ৪৩৪৪)।
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বলতে যা ভাবা হয়েছিল, এটা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া বইটিতে জওহরলাল নেহরু বিষয়টাকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, ‘ভারতবর্ষ হল বারে বারে মুছে ফেলে লেখার মতো এক প্রাচীন পাণ্ডুলিপি, যার ওপর স্তরে স্তরে নানা চিন্তাধারা ও স্বপ্নবিহ্বল ভাবনা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে, এবং তথাপি স্তরে স্তরে লিপিবদ্ধ বিষয়গুলির কোনওটাই পুরোপুরি লুকিয়ে রাখা যায়নি কিংবা আগে লেখা কোনও কিছুই পুরোপুরি মুছে ফেলা যায়নি।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,
‘হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড়, চীন, / শক-হুন-দল-পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।’ এবং সেই এক দেহ হল ভারতবর্ষ।
সুতরাং, আরএসএস–এর যা পরিকল্পনা, তা আসলে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয়তাবাদ’ হিসাবে ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত গঠনের ভাবনা’ বাস্তবায়নের পথ থেকে এক ধাপ পিছু হঠা। আজকের দিনে যে বিষয়ে উস্কানি দেওয়া হচ্ছে, তা হল একটা নির্ভেজাল হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদ যার লক্ষ্য হল ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠা করা।
আরএসএস ও স্বাধীনতা সংগ্রাম
কমিউনিস্ট মতবাদে বিশ্বাসী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ভূমিকা খুব ভালভাবেই নথিবদ্ধ করা আছে। সিপিআই(এম) পলিটব্যুরোর ৯ জন প্রতিষ্ঠাতা সদস্যই ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী, যাঁরা ব্রিটিশের জেলে বহু বছর কাটিয়েছিলেন এবং পরে কংগ্রেসি শাসনেও তাঁরা জেল খেটেছেন। ভেল্লোর জেলে ১৯৪৭ এর ১৫ আগস্ট জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন কমরেড এ কে গোপালন। ব্রিটিশরা তাঁকে সেই জেলে বন্দি করে রেখেছিল। ছাত্রাবস্থায় জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কারণে হরকিষেণ সিং সুরজিৎকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আন্দামানের সেলুলার জেলের মার্বেল ফলকে যাঁদের নাম লেখা রয়েছে তাঁদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই কমিউনিস্ট এবং বিপ্লবী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বিপরীতে স্বাধীনতা সংগ্রামে পুরোপুরি অনুপস্থিত ছিল আরএসএস। বস্তুত, স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে সরে গিয়ে সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও দাঙ্গা লাগানোর কাজে ব্যস্ত ছিল তারা। স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে একটাই যোগাযোগের দাবি করতে পারে আরএসএস। এবং সেটি হল ভি ডি সাভারকার। এমনকি এটাও মিথ্যা তথ্য মিশিয়ে উদ্ভাবন করা।এবং ছক কষা।
জাতীয় আন্দোলনের বিশিষ্ট ইতিহাসকার, হিন্দুত্বের প্রবণতার প্রতি যিনি দরদী ছিলেন, সেই আর সি মজুমদার নথিবদ্ধ করে গেছেন যে, ১৯১৩ সালের ১৪ নভেম্বর সাভারকার ব্রিটিশের কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করে একটি আর্জি পেশ করেছিলেন এবং তাতে তাঁকে আন্দামানের সেলুলার জেল থেকে ছেড়ে দেওয়ার আবেদন জানান। ব্রিটিশের নীতি ছিল ভাগ করে শাসন করো। সাভারকারকে আত্মসমর্পণ করার দাম মেটাতে হয়েছিল ব্রিটিশের এই নীতির প্রকাশ্য মিত্র হয়ে। তাঁর আর্জিতে ব্রিটিশকে তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন: যে কোনও ব্যক্তি যিনি অন্তর থেকে ভারতের ও মানবজাতির মঙ্গল চান, তিনি কখনই অন্ধভাবে সেই কাঁটা বিছানো পথে পা দেবেন না যে পথ ১৯০৬-০৭ সালে উত্তেজনায়ভরা ও আশাহীন পরিস্থিতিতে শান্তি ও প্রগতির পথ থেকে আমাদের প্রতারিত করে ভুলপথে নিয়ে গিয়েছিল। সুতরাং, যদি সরকার তাদের বহুবিধ বদান্যতা দেখিয়ে এবং ক্ষমা প্রদর্শন করে আমাকে মুক্তি দেয়, তাহলে আমি ইংরেজ সরকারের সাংবিধানিক প্রগতি ও আনুগত্যের সবচেয়ে জোরালো প্রবক্তা ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারব না এবং সেটাই হল সাংবিধানিক প্রগতির প্রাথমিক শর্ত (আর সি মজুমদার, পেনাল সেটলমেন্টস ইন আন্দামানস, পৃষ্ঠা ২১১-১৩)।
ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে লেখা আরও একটি চিঠিতে সাভারকার লিখেছিলেন: আমি একথা স্বীকার করছি যে আমার বিচার নিরপেক্ষ হয়েছে এবং ন্যায্য শাস্তিই আমি পেয়েছি। ফেলে আসা দিনে যেসব হিংসাত্মক পদ্ধতি আমি অবলম্বন করেছিলাম, আমি সেগুলিকে অন্তর থেকে তীব্রভাবে ঘৃণা করি, এবং সমস্ত শক্তি দিয়ে আইন ও সংবিধানকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার কাজে আমি নিজেকে কর্তব্যে আবদ্ধ বলে মনে করি এবং এব্যাপারে কাজ করার জন্য যতদূর পর্যন্ত আমাকে অনুমতি দেওয়া হবে, ততদূর পর্যন্ত ভবিষ্যতে সংস্কারকে সফল করে তুলতে আমি আগ্রহী (এই চিঠির ফ্যাকসিমিলি প্রকাশিত হয়েছিল ফ্রন্টলাইন, এপ্রিল ৭, ১৯৯৫ সংখ্যার ৯৪ পৃষ্ঠায়)।
ব্রিটিশের সঙ্গে শান্তি স্থাপনের পর তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময়ে সাভারকারের রাজনীতি ছিল ব্রিটিশের বিরোধিতা না করে কংগ্রেস ও বামপন্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের বিরোধিতা করা। হিন্দু মহাসভার নেতা হিসাবে তিনি এটা নিশ্চিত করেছিলেন যে, হিন্দু মহাসভার কোনও সদস্য বা সংগঠনপন্থী কেউ যেন ১৯৪২ এর ভারত ছাড়োর মতো আন্দোলনে অংশগ্রহণ না করে। একেবারে নির্দিষ্টভাবে তিনি হিন্দুদের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন তাঁরা যেন ওই আন্দোলন সমর্থন না করেন (দেখুন, অম্বা প্রসাদ, দ্য ইন্ডিয়ান রিভল্ট অফ ১৯৪২)।
‘সব হিন্দু সংগঠনপন্থীদের কাছে আমি এই স্পষ্ট নির্দেশ দিচ্ছি যে, সাধারণভাবে, কেউ সরকারি পরিষেবার সুবিধাজনক কোনও পদে বা অবস্থানে থাকলে, তাঁরা স্ব স্ব পদে বা অবস্থানে থেকে যাবেন এবং তাঁদের দৈনন্দিন কর্তব্য করে যাবেন’ (নূরানির লেখায় উদ্ধৃত, ফ্রন্টলাইন, ডিসেম্বর ১, ১৯৯৫)।
বস্তুত, ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় বোম্বে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের পর্যবেক্ষণ ছিল, ‘সঙ্ঘ একনিষ্ঠভাবে নিজেদেরকে আইনের চৌহদ্দিতে বেঁধে রেখেছিল এবং বিশেষত ১৯৪২-এর আগস্টে শুরু হওয়া অশান্তিতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থেকেছিল’ (অ্যান্ডারসন অ্যান্ড ডামলে, শ্রীধর ডি, দ্য ব্রাদারহুড এই স্যাফ্রন: দ্য রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ অ্যান্ড হিন্দু রিভাভাইভালিজম, ভিস্তার পাবলিকেশনস, নিউ দিল্লি, ১৯৮৭)। এমনকী আরএসএসের অন্যতম শীর্ষনেতা নানাজি দেশমুখ একবার প্রশ্ন তুলেছিলে, ‘কেন সংগঠন হিসাবে আরএসএস মুক্তি সংগ্রামে অংশ নেয়নি?’ (দেশমুখ, নানা, আর এস এস: ভিক্টিম অফ স্ল্যানডার, ভিশন বুকস, নিউদিল্লি, ১৯৭৯)। এছাড়াও পুরো জাতীয় আন্দোলনের পর্ব জুড়ে আরএসএস সবসময় ছোট ছোট দেশীয় রাজ্যগুলির সঙ্গে সহযোগিতা করে গেছে। এই সব দেশীয় রাজ্যগুলি স্বাধীনতা সংগ্রামের কট্টর বিরোধী ছিল। আরএসএসের অন্যতম ঘনিষ্ঠমিত্র ছিলেন কাশ্মীরের রাজা হরি সিং যিনি স্বাধীন ভারতে যোগদানে অনিচ্ছুক ছিলেন।
এই সব বাস্তব ঘটনাকে আড়াল করার জন্য আরএসএস কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার করে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে বামপন্থীদের ভূমিকা কী ছিল, তার সমৃদ্ধ নথিবদ্ধ ইতিহাস ইতিমধ্যেই গ্রথিত হয়ে আছে। তার খুঁটিনাটিতে যাওয়ার অবশ্য দরকার নেই। এই তথ্য নজরে আনাই যথেষ্ট যে, যখন এই দেশ ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ৫০-তম বার্ষিকী পালন করছিল, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডক্টর শঙ্করদয়াল শর্মা, ৯/১০ আগস্টের মধ্যরাতের সংসদের অধিবেশনের ভাষণে বলেছিলেন: ‘‘কানপুর, জামশেদপুর, আহমেদাবাদের মিলগুলিতে ব্যাপকহারে ধর্মঘটের পর, ১৯৪২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর লন্ডনে সেক্রেটারি অফ স্টেটকে দিল্লি থেকে পাঠানো এক বার্তায় কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছিল: ‘এই দলের অনেক সদস্যের আচরণ স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, ব্রিটিশ-বিরোধী বিপ্লবের উপাদানেই এই দলটি গঠিত’।’’ (জোর আমাদের)
দেশভাগের আতঙ্ক
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছেন যে এখন থেকে ১৪ আগস্ট দিনটিকে দেশভাগের বিভীষিকা স্মরণ দিবস হিসাবে উদযাপন করা হবে।
এই উপমহাদেশের বিভাজনই খুব সম্ভবত বিপুল সংখ্যক জনগণের ছিন্নমূল হয়ে দেশান্তরী হওয়ার একমাত্র উদাহরণ। ঠিক কত মানুষ সেই সময় সীমান্ত পেরিয়েছিলেন তার নিখুঁত হিসাব কষা কার্যত অসম্ভব, তবে সেই সময় আন্দাজ ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষ সীমান্ত পেরিয়েছিলেন (ভারত তখন ৭২,৯৫,৮৭০ জন এবং পাকিস্তান ৭২,২৬,৬০০ জন ছিন্নমূল মানুষকে চিহ্নিত করেছিল) এবং সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘর্ষে ১০ থেকে ২০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। সেটা ছিল এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা যা আজকের দিনেও ক্ষত এবং কুসংস্কারকে বিষিয়ে তুলছে। এতে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল হিন্দু, মুসলিম ও শিখ সকলকেই।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসকে দেশভাগের বিভীষিকা স্মরণ দিবস হিসাবে উদযাপনের জন্য বেছে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদি এমন একটা বার্তা দিতে চেয়েছেন যার মধ্যে সাম্প্রদায়িক গন্ধ রয়েছে। স্পষ্টতই, তিনি চান এখনকার প্রজন্ম শুধু দেশভাগের আতঙ্ককেই স্মরণ করবে না বরং, বাস্তবে সেই আতঙ্ক যেন তাদের স্মৃতিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে। না হলে, তিনি সহজেই ৩ জুন তারিখটিকে স্মরণের জন্য বেছে নিতে পারতেন কারণ ওই দিনেই ব্রিটিশ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন দেশভাগের দিন-তারিখ ঘোষণা করেছিলেন।
এধরনের পদক্ষেপের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলা যাতে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রকে বদলে দিয়ে সর্বোচ্চ মাত্রায় অসহিষ্ণু, ধর্মতাত্ত্বিক, ফ্যাসিবাদীবৈশিষ্ট্য সম্পন্ন হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে সহজসাধ্য করে তোলা যায়।
দ্বিজাতিতত্ত্ব
‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’ই দেশভাগের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। ভি ডি সাভারকারই সর্বপ্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থে দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশ করেছিলেন। ১৯৩৭ সালে আমেদাবাদের কর্ণাবতীতে অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভার সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে সাভারকার বলেছিলেন, ‘আজকের দিনে এটা ধরে নেওয়া যায় না যে ভারত একটি একেশ্বরবাদী এবং সমসত্ত্ববিশিষ্ট জাতি। বরং এর ঠিক উল্টোটাই সত্যি। ভারতে এখন প্রধানত দুটি জাতি রয়েছে– হিন্দু ও মুসলিম’ (সমগ্র সাভারকার বাদমে, ভল্যুম ৬, মহারাষ্ট্র প্রান্তিক হিন্দুস্তান পাবলিকেশন,১৯৬৩-৬৫, পৃষ্ঠা ২৯৬)।
পরে ১৯৩৯এর মার্চে আবারও হিন্দু মহাসভার সম্মেলনে সভাপতির ভাষণে সাভারকার ঘোষণা করেন: ‘আমরা হিন্দুরা নিজেরাই একটা জাতি....আমরা নিজেরাই নিজেদেরকে এক চিরস্থায়ী জাতি হিসাবে চিহ্নিত করেছি’ (দ্রষ্টব্য, ইন্ডিয়ান অ্যানুয়াল রেজিস্টার, ১৯৩৯, ভল্যুম ২)।
এর ২ বছর পর ১৯৪০ সালের ২২ মার্চ লাহোরে অল-ইন্ডিয়া মুসলিম লিগের সম্মেলনে দেওয়া সভাপতির ভাষণে মহম্মদ আলি জিন্নাহ বলেছিলেন, ‘একটি একক রাষ্ট্রের অধীনে এই ধরনের দুটি জাতিকে একই জোয়ালে জুতে দেওয়া হলে, যার মধ্যে এক পক্ষ সংখ্যাগত বিবেচনায় সংখ্যালঘু এবং অন্য পক্ষ সংখ্যাগুরু, অবশ্যই তার পরিণামে অসন্তোষ ক্রমশ বাড়তে থাকবে এবং এই ধরনের একটি রাষ্ট্রের সরকারের যে কোন কাঠামোই তৈরি করা হোক না কেন তা চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হবে।’
পরে দেখা গেল জিন্নাহর মতকে মেনে নিয়ে সাভারকারও ফের বললেন, ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে মিস্টার জিন্নাহর সঙ্গে আমার কোনও বিবাদ নেই। আমরা হিন্দুরা নিজেরাই একটা জাতি এবং এটাও ঐতিহাসিক সত্য যে, হিন্দু ও মুসলিমরা দুটি জাতি।’ (দ্রষ্টব্য, ইন্ডিয়ান অ্যানুয়াল রেজিস্টার, ১৯৪৩, ভল্যুম ২)।
সঙ্ঘ পরিবার ও মোদির সর্বশ্রেষ্ঠ নেতা সাভারকার দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশ করার ক্ষেত্রে জিন্নাহর চেয়ে এগিয়েই ছিলেন। সেই দ্বিজাতিতত্ত্ব পেশের কারণেই দেশভাগ হয়েছিল। এবং একাজে ব্রিটিশ দারুণভাবে মদত ও উস্কানি দিয়েছিল।
গান্ধী হত্যা
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ মৃদুলা মুখার্জি ২০১১ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের মালদায় অনুষ্ঠিত ভারতীয় ইতিহাস কংগ্রেসে সভাপতির ভাষণে বলেন: ‘১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দুটি জাতি-রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল। বলা যায়, এর মধ্যে সাভারকারের পেশ করা জাতির সংজ্ঞাকে সত্যি প্রমাণ করেছিল পাকিস্তান। কিন্তু সাভারকার যেখানে রয়ে গেলেন সেই ভারত কোনওভাবেই এই সংজ্ঞাকে মেনে নেয়নি। মনে হয়, এব্যাপারে সবচেয়ে বড় বাধা হিসাবে দাঁড়িয়েছিলেন মহাত্মা নিজেই। তাই তাঁকে সরিয়ে দেওয়াটা আবশ্যিক হয়ে পড়ে। মহাত্মা বেঁচে থাকলে, হিন্দু রাষ্ট্র কিংবা অখণ্ড ভারত এইদুয়ের কোনওটাকেই বাস্তবায়িত করা যেত না।
‘এবিষয়ে সকলেই একমত যে গান্ধী হত্যার জন্য দায়ী ছিল সাভারকারের নেতৃত্বাধীন হিন্দু মহাসভার একটা উগ্রপন্থী শাখাই। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে যখন গান্ধীজিকে হত্যা করা হল, তখন এই ষড়যন্ত্রের মাথা হিসাবে সাভারকারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। ঘটনাচক্রে গান্ধী হত্যার বিচারে তিনি রেহাই পেয়েছিলেন। সেটাও হতে পেরেছিল এই মামলার রাজসাক্ষীর বিবৃতির সঙ্গে অন্যান্য প্রমাণাদির অসঙ্গতির কারণে, যদিও সেটা ছিল ফৌজদারি দণ্ডবিধির একটা টেকনিক্যাল পয়েন্ট মাত্র। সর্দার প্যাটেল ছিলেন অত্যন্ত উচ্চশ্রেণির ফৌজদারি আইনজীবী। তবে তিনিও ব্যক্তিগতভাবে সাভারকারের অপরাধ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। না হলে তিনি নিজেই সাভারকারকে বিচারের কাঠগড়ায় তুলতে দিতেন না। সর্দার প্যাটেল খুব স্পষ্টভাষায় জওহরলাল নেহরুকে বলেছিলেন,‘সরাসরিভাবে সাভারকারের অধীনে থাকা হিন্দু মহাসভার একটা উগ্রপন্থী শাখা এই ষড়যন্ত্রের সলতে পাকিয়েছিল এবং ষড়যন্ত্র যাতে শেষ পর্যন্ত সফল হয় সেজন্য তৎপর ছিল।
‘ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি জীবন লাল কাপুরের অধীনে ১৯৬৫ সালে এবিষয়ে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। কমিশন তাদের রিপোর্টে যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল তা এরকম:
‘এই সব তথ্য একসঙ্গে গ্রথিত করলে তা স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে সাভারকার এবং তাঁর নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীই এই হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল এবং বাকি অন্য সব তত্ত্ব পুরোপুরি খারিজ হয়ে যায়।’
নিষিদ্ধ হল আরএসএস
আরএসএস ও মোদি সরকার আজকের দিনে যে সর্দার প্যাটেলকে তাদের নিজেদের ছকের মধ্যে আত্মসাৎ করে ফেলতে চাইছে, মহাত্মা গান্ধীর হত্যার পর সেই সর্দার প্যাটেলই আরএসএসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সর্দার প্যাটেলের নিজের মুসাবিদা করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আরএসএসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। সেই বিজ্ঞপ্তিতে লেখা হয়েছিল: ‘সঙ্ঘের আপত্তিকর ও ক্ষতিকর কার্যকলাপ নিরবচ্ছিন্ন ভাবে জারি রয়েছে। সঙ্ঘের কার্যকলাপই হিংসার রাজনীতির উদ্গাতা এবং হিংসার প্রেরণাদাতা। হিংসাত্মক এই কার্যকলাপের বলি হয়েছেন অনেকেই। এই হিংসার রাজনীতির হামলায় সর্বশেষ এবং সবচেয়ে মূল্যবান ক্ষতি হল এই যে,গান্ধীজি নিজেও এই হিংসার রাজনীতির কারবারীদের হাতেই নিহত হলেন।’
মহাত্মার ব্যক্তিগত সচিব প্যারেলাল তাঁর বই মহাত্মা গান্ধী: দ্য লাস্ট ফেজ–এ লিখেছেন: ‘গান্ধী হত্যার পর এক তরুণের কাছ থেকে সর্দার প্যাটেল একটা চিঠি পেয়েছিলেন। চিঠির বয়ান অনুয়ায়ী সেই তরুণকে ভুল বুঝিয়ে আরএসএস–এর সংগঠনে শামিল করা হয়েছিল কিন্তু পরে তাঁর মোহভঙ্গ হয়। চিঠিতে সেই তরুণ লিখেছেন, কীভাবে কয়েকটি এলাকায় আরএসএসের সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যাতে একটা সুসংবাদ শোনার জন্য তারা যেন সেই ভয়ঙ্কর শুক্রবারে তদের রেডিও সেট চালু রাখে। গান্ধী হত্যার খবরটা জানার পর দিল্লিসহ বেশ কিছু জায়গায় আরএসএসের ঘনিষ্ঠ বৃত্তে মিষ্টি বিলি করা হয়েছিল।’ (পৃ ৭৫৬)।
কার্যত ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৪৯ সাআলের ১০ জুলাই পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল আরএসএস। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আলোচনার জন্য ব্যগ্র হয়েইছিল আরএসএস। এর জেরেই ভারত সরকারের সঙ্গে তারা একটা প্রতারণামূলক সমঝোতা করে। আরএসএস নেতারা সর্দার প্যাটেলের সঙ্গে আলোচনায় এই মর্মে রাজি হয়েছিল যে, আরএসএস টিকে থাকবে সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবে এবং রাজনীতিতে জড়াবে না। সেকারণে আরএসএসের দরকার ছিল তাদের নেতৃত্বাধীন ও তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি রাজনৈতিক শাখার, যাতে তারা রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে পারে। নেহরু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার পর হিন্দু মহাসভার নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি হিন্দু কোড বিল সংশোধনের বিরোধিতা করেছিলেন। তখন তিনি পৃথক একটি রাজনৈতিক দল গড়তে চেয়েছিলেন। ১৯৫২ সালে ভারতীয় জনসঙ্ঘ–এর প্রতিষ্ঠার কাজে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে সহযোগিতা করার জন্য ক্যাডারদের পাঠিয়েছিল আরএসএস। সেই সংঠনেরই এখনকার মূর্তিমান রূপ হল বিজেপি (বাসু, তপন; দত্ত প্রদীপ; সরকার,সুমিত;সরকার, তনিকা; সেন, সম্বুদ্ধ; খাকি শর্টস:স্যাফ্রন ফ্ল্যাগস, ট্র্যাক্টস ফর দ্য টাইম/ ওরিয়েন্ট লংম্যান, নিউ দিল্লি, ১৯৯৩)।
ফলে বিজেপি আর অন্য কিছুই নয়। আদতে বিজেপি হল আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা, যারা রাষ্ট্রশক্তিকে এবং ভারত রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সাংবিধানিক সাধারণতন্ত্রকেতারা ধ্বংস করতে চাইছে এবং সেই জায়গায় প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে আরএসএসর রাজনৈতিক প্রকল্পকে। সেই প্রকল্প হল চরমমাত্রায় অসহিষ্ণু, ধর্মতাত্ত্বিক, ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ‘হিন্দুত্ব রাষ্ট্র’–এর প্রতিষ্ঠা। এটাই মোদির ‘নতুন ভারত’–এর আসল কথা। আরএসএসের ধ্বংসযজ্ঞের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের বর্তমান সংবিধানকে ধ্বংস করা। চারটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে ভারতের সংবিধান। সেগুলি হল, ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, সামাজিক ন্যায় এবং অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব। ২০১৪ সাল থেকে প্রতিটি স্তম্ভের ওপর হামলা শুরু হয়েছে এবং ২০১৯ এর পর এই হামলা তীব্রতর হয়েছে।
কর্পোরেট-সাম্প্রদায়িক দুষ্টচক্রের মাধ্যমে ভারতীয় সংবিধানের গুরুত্ব প্রবলভাবে খর্ব করা হচ্ছে। ২০১৪ সালে থেকে এই দুষ্টচক্রের উৎপত্তি। এই দুষ্টচক্র চায় অবাধ নয়া–ঔপনিবেশিক সংস্কার, এরা লুঠ করছে জাতীয় সম্পদ, তীব্রতর করছে অর্থনৈতিক শোষণ এবং সামাজিক নিপীড়ণ। প্রতিষ্ঠা করছে একটা এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামো যা ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনাকে সফল করার জন্য আবশ্যিক। একই সঙ্গে আবার উদ্ভূত হয়েছে একেবার জঘন্য ধরনের ক্রোনি পুঁজিবাদ।
স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির ধ্বংস
সংসদ, বিচার ব্যবস্থা, নির্বাচন কমিশন, সিবিআই, ইডি এবং অনান্য সব প্রতিষ্ঠান সংবিধান দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায় নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য। এখন পরিকল্পনামাফিক সেগুলির গুরুত্ব খর্ব করা হচ্ছে।
সিপিআইএম কেন্দ্রীয় কমিটি এই সব ঘটনাবলির বিকাশ নিয়মিত বিশ্লেষণ করে চলেছে। একইসঙ্গে নজর রেখেছে কী ভাবে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবন জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে সেবিষয়েও। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও সাংবিধানিক গ্যারান্টিপ্রাপ্ত জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার আক্রমণ বেড়েই চলেছে।
কোভিড অতিমারি সামলানোর কাজে চূড়ান্ত ব্যর্থতা, টিকার স্বল্পতা, এবং তার সঙ্গে জনস্বাস্থ্য পরিষেবা কাঠামোর শোচনীয় হাল জনগনের জীবনধারণকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। নির্মম ঔদাসীন্যে সরকারে এসব বিষয়ে একেবার চোখ বুজে রয়েছে। এখন সরকার শুধু একমনে নতুন ভারত-এর স্লোগানের আড়ালে তাদের ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রকল্প অনুসরণ করে চলেছে। এই প্রকল্পের একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জনগণের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা।
অযৌক্তিক ভাবনাচিন্তায় উৎসাহ দান: যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাপ্রক্রিয়ার বিনাশ
ভারতে ‘হিন্দুত্ব রাষ্ট্র’–এর পশ্চাগদামী প্রকল্প সফল করার লক্ষ্যে বিজেপি/আরএসএস যে প্রয়াস চালাচ্ছে তার কেন্দ্রীয় বিষয় হল জনগণের সামাজিক চেতনাকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করা। এর জন্যই বিচার-বিবেচনাহীন, অস্পষ্টতায় ভরা ভাবনাচিন্তা এবং অপযুক্তি বা যুক্তিহীনতাকে প্রশ্রয় দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়ে। চিন্তার জগতে এই প্রক্রিয়াকে কাজে লাগিয়ে ইতিহাসের জায়গায় হিন্দু পৌরাণিক কল্পকথা এবং দর্শনের জায়গায় হিন্দু ধর্মতত্ত্বকে বসানো হচ্ছে। এখন যেসব পাঠক্রম আমাদের ছাত্র ও যুবদের পড়ানো হয়, বিজেপি সরকার পরিকল্পিত উপায়ে সেইসব পাঠক্রম নতুন করে রচনা করছে। এবং যেসব বিশ্ববিদ্যালয় যুক্তিবাদ এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার সূতিকাগার, সেগুলির প্রভাবকে ক্রমাগত খর্ব করছে এবং উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন পদে তাদেরই নিয়োগ করছে, যারা হিন্দুত্বের মতাদর্শের অনুগামী।
এই সর্বনাশা পরিকল্পনাকে সফল করে তোলার জন্যদার্শনচর্চার স্তরে, তারা মূল হাতিয়ার হিসাবে যুক্তিবর্জিত, অস্পষ্টতায় ভরা ভাবনাচিন্তার ধারাকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। গেওর্গ লুকাচের মৌলিক এবং সম্ভাবনাপূর্ণ রচনা ডেসট্রাকশন অফ রিজন, যা আসলে দর্শনচর্চার জগতে যুক্তিবর্জিত চিন্তাধারার অস্তিত্বের সমালোচনা, সেই সমালোচনার বিষয়গুলিকে আজকের দিনের ভারতীয় পরিপ্রেক্ষিতে পুনরায় স্মরণ করার দরকার আছে। জার্মানি কীভাবে হিটলারের পথ আঁকড়ে ধরল, দার্শনিক জ্ঞানচর্চার জগতে সেই পথরেখাটিকে খুঁজে বের করে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন লুকাচ। ঊনবিংশ শতকে সারা পৃথিবীকে একটা জ্ঞানদীপ্ত যুক্তিবাদী দর্শন উপহার দিয়েছিল জার্মানি। সেই জার্মানির পথ কীভাবে হিটলারে গিয়ে শেষ হল, বিশেষ করে সেই বিষয়টা নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন লুকাচ। হেগেলিয় ডায়ালেকটিকস এবং যে হেগেল ‘নিজের মাথার ওপর ভর করে দাঁড়িয়েছিলেন সেই হেগেলকে তাঁর পায়ের ওপর দাঁড় করানোর’ লক্ষ্যে কার্ল মার্কসের রচনা— এগুলিই ছিল জার্মান জনগণের দার্শনিক ঐতিহ্য। তাহলে নাৎসিবাদের যুক্তিবর্জিত দর্শন কীভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছিল সেই জার্মান জনগণই? লুকাচের বিতর্কে কেন্দ্রীয়ভাবে যে বিষয়টা সজোরে উঠে এসেছে তা হল, ‘সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বে অযুক্তিবাদ একটা আন্তর্জাতিক ঘটনা’।
সংজ্ঞা থেকেই এটা স্পষ্ট যে যুক্তিবর্জিত ভাবনাচিন্তার ধারা এমন একটা মতাদর্শগত প্রবণতা যা, যা কিছুই যুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, তার বিরোধী। এর মূল লক্ষ্য হল, ইওরোপিয় জ্ঞানদীপ্তির যুগ থেকে আজকের সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন পর্যন্ত, এই দীর্ঘ পর্বে যুক্তিবর্জিত ভাবনাচিন্তার যত ধরনের প্রকাশ দেখা গেছে, সেগুলিকে ব্যবহার করে মানবিক বিষয়গুলির ব্যাখ্যা ও সমাধানে যুক্তির সক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা এবং বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞানের হদিশ দিতে পারে যুক্তির এমন ক্ষমতাকেও চ্যালেঞ্জ করা। সময়ের যে কোনও বিন্দুতে জ্ঞান কখনই সম্পূর্ণ বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে উঠতে পারে না। সেকথা অগ্রাহ্য করেই যুক্তিবর্জিত চিন্তভাবনার ধারাটি বাস্তবতা ও জ্ঞানের মধ্যেকার দ্বান্দ্বিক সম্পর্ককে পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। লুকাচ বলেছেন, বাস্তবতা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান যতটা, বস্তুনিষ্ঠ জগৎ তার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধতর ও জটিলতর। দ্বন্দ্বমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করে এবং যুক্তিবাদের ওপর নির্ভর করে জ্ঞান ও বস্তুনিষ্ঠ জগতের মাঝে বিদ্যমান ব্যবধানের মধ্যে সেতু গড়ে তোলা এবং এভাবে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বাস্তবতা সম্পর্কে ধারণা গড়ে তোলার বদলে যুক্তিবর্জিত চিন্তভাবনার ধারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছয় যে, ‘সম্পূর্ণ বাস্তবতা বিষয়ে যুক্তিসিদ্ধ জ্ঞান অর্জন করা আদৌ সম্ভব নয়’। পুরো বাস্তবতাকে বোঝা সম্ভব হবে বা আত্মস্থ করা যাবে একমাত্র ‘বিশ্বাস’ কিংবা ‘উপলব্ধি’ দিয়ে এবং সেটাই হল ‘জ্ঞানের’ উচ্চতর রূপ। হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদ সাধারণ জনমানসে এই ধরনের ‘বিশ্বাস’ যুগিয়ে যায় এবং এভাবে নিজেকেও পুষ্ট করে তোলে যাতে নয়া–উদারবাদী অ্যাজেন্ডাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং ভারতকে একটা একচেটিয়াবাদী, ধর্মতাত্ত্বিক, ফ্যাসিষ্টবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার জোড়া লক্ষ্য পূরণ করা যায়।
হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের ভ্রান্ত চেতনাকে সংহত করার জন্য আরএসএস/ বিজেপি/ মোদির জোট এখন যে পদ্ধতি কাজে লাগাচ্ছে তা হল, তারা এটা নিশ্চিত করাতে চাইছে যে জনমত গঠনে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের প্রভাব খুবই কম। বরং আবেগের কাছে আর্জি জানানো এবং ব্যক্তিগত বিশ্বাসই জনমত গঠনে বেশী প্রভাবশালী উপাদান।
সংবাদমাধ্যম এবং সোশাল মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে, আবেগে ঠাসা আবেদন জানিয়ে এবং ব্যক্তিপূজার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে তারা ধারাবাহিকভাবে প্রচার বোমায় আমাদের বিদ্ধ করছে। সেই প্রচার হল, ভারত এখন এমনভাবে সমৃদ্ধি লাভ করছে যে তা আগে কখনও দেখা যায়নি, এবং ভারতকে স্বপ্নের এলডোরাডো করে তোলার পথে একমাত্র বাধা হল মুসলিম, ক্রিশ্চান ও কমিউনিস্টরা।
আরএসএস/বিজেপি/ মোদির জোট গড়ে তুলছে একটা কল্পনার জগৎ যেখানে লোককে বাঁচতে হচ্ছে এবং লড়াই করতে বাধ্য হতে হচ্ছে এমন সব ইস্যুতে যেগুলির আবেদন পুরোপুরি আবেগভিত্তিক এবং যেগুলির সঙ্গে তাদের দৈনন্দিন অস্তিত্বের দুর্ভোগ-যন্ত্রণার কোনও সম্পর্ক নেই। তীব্রতর শোষণ এবং নিপীড়ণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে তারা সাধারণের লোকের নজর ঘুরিয়ে দিতে চাইছে।
আরএসএস/ বিজেপি সরকারের অধীনে দর্শনচর্চার স্তরে এই ধরনের যুক্তিবিবর্জিত চিন্তাধারাই আজকের দিনে ভারতের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জীবনের সর্বস্তরে পরিব্যাপ্ত হয়ে পড়ছে। সোজা কথায় বললে এ হল— যুক্তিহীনতা বা যুক্তির বিনাশ, কিংবা বলা যায় যুক্তিপূর্ণভাবে ভাবা ও কাজ করার ক্ষমতার বিসর্জন।
উপসংহার
সামগ্রিকতাবাদী এই পদ্ধতিকে কাজে লাগিয়েই ভারতীয় সংবিধান, আমাদের স্বাধীনতা-পরবর্তী সাধারণতন্ত্র এবং ‘আইডিয়া অফ ইন্ডিয়া’ বা ‘আধুনিক ভারত নির্মাণের ভাবনা’-কে ধ্বংস করা হচ্ছে।
সমান শক্তিসম্পন্ন সামগ্রিক একটা প্রতি–আক্রমণ আমাদের গড়ে তুলতে হবে ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতীয় সাধারণতন্ত্রকে প্রথমে রক্ষা করা ও পরবর্তী ধাপে তাকে শক্তিশালী করার জন্য। এই প্রতি-আক্রমণে অবশ্যই চালাতে হবে রাজনৈতিক, মতাদর্শগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক-সহ সমস্ত ক্ষেত্রে। এর লক্ষ্য হবে, অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ফ্যাসিবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হিন্দুত্বের যে আধিপত্য গড়ে তোলা হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে একটা পাল্টা, প্রতিস্পর্ধী-আধিপত্য গড়ে তোলা।
কীভাবে শাসকশ্রেণির আইডিয়া বা ভাবনাগুলিই তাদের যুগের আধিপত্যকামী আইডিয়া হয়ে দাঁড়ায়– জার্মান ইডিওলজি–তে তা ব্যাখ্যা করেছেন মার্ক্স ও এঙ্গেলস। গ্রামশি বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে, শাসকশ্রেণির আধিপত্য শুধুমাত্র রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানগুলিই চাপিয়ে দেয় না। রাষ্ট্র হল সেই ‘বাইরের পরিখা’, যার ওপারে রয়েছে ‘সারি সারি দুর্গ ও মাটির দেওয়াল’-এর একটা শক্তিশালী রণসজ্জা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও মূল্যবোধের একটা বিস্তৃত নেটওয়ার্ক যা শাসকশ্রেণিগুলির আইডিয়া বা ভাবনাগুলি-সহ খোদ সেই শ্রেণিগুলির আধিপত্যকেই শক্তি জুগিয়ে চলে।
সাধারণ মানুষের মননের সঙ্গে এই আধিপত্যের যোগসূত্র গড়ে তোলা ও এই আধিপত্য বোধকে জনমানসে সঞ্চারিত করার জন্য থাকে সামাজিক সম্পর্কসমূহ এবং তার অনুসারী সামাজিক কাঠামোগুলির এক জটিল জাল। পরিবার, সামাজিক গোষ্ঠী, জাতপাত, ধর্ম, ধর্মীয় স্থান এবং ধর্মীয় উৎসব, থিয়েটার, চলচ্চিত্র, টেলিভিশনের মতো নানা ধরণের সাংস্কৃতিক প্রকাশমাধ্যম, সোশাল মিডিয়ার অনুষ্ঠানসমূহ– এসবই হল সেই পদ্ধতি, যার সাহায্যে মূল্যবোধ ও মতামত গড়ে তোলার লক্ষ্যে ক্রমাগত অখাদ্যের যোগান দেওয়া হয়। এইভাবে নির্মাণ করা মূল্যবোধ ও মতামতগুলিই হিন্দুত্ব আধিপত্যের ‘আইডিয়া’ বা ভাবনাকে লালন করে। এই প্রক্রিয়ায় তারা সৃজন করে ‘অতিকথা’ কিংবা ‘সাধারণ সংস্কৃতি’। এই ‘সাধারণ সংস্কৃতি’ আর কিছুই নয়, এ হল হিন্দুত্ব, হিন্দুত্বের আইডিয়া বা ভাবনা এবং অনুসারী মূল্যবোধগুলির একটা বাছাই করা সঞ্চার প্রক্রিয়া যাকে ‘সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান’ বলে চালানো হয়।
নতুন সংস্কৃতি সৃজনের মাধ্যমে সমাজজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ, পাল্টা প্রতিস্পর্ধী-আধিপত্য গড়ে তুলতে হলে উৎপাদন সম্পর্কের বিরুদ্ধে, অর্থনৈতিক শোষণের বিরুদ্ধে শ্রেণি সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি যে কৌশলে হিন্দুত্বের আধিপত্যের প্রভাব আরও ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ও শক্তিশালী করে তোলা হচ্ছে, নাগরিক সমাজের পরিসরে সেই কৌশলের বিরুদ্ধেও গড়ে তুলতে হবে সহযোগী রাজনৈতিক সংগ্রাম।
পাল্টা প্রতিস্পর্ধী এই আধিপত্যের ভিত্তি অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে শ্রমজীবী জনতা, কৃষক সমাজ, মহিলা, দলিত, আদিবাসী, যুব–ছাত্র সহ অন্যান্যদের মধ্যে শ্রেণি-শোষণের বিরুদ্ধে মূল সংগ্রামকে শক্তিশালী করে তুলে। এই ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে অবশ্যই আরও এগিয়ে যেতে হবে যাতে আমরা আমাদের বিপ্লবী লক্ষ্য পিপলস ডেমোক্রেসি বা জনগণতন্ত্র অর্জন করতে পারি এবং সেই সাফল্যকে হাতিয়ার করে এগিয়ে চলতে পারি সমাজতন্ত্রের অভিমুখে।
এই সব শ্রেণিগুলির সংগ্রামের শক্তিকে সংহত করে আরও বৃহত্তর একটা ঐক্য গড়ে তোলার দরকার আছে। দরকার আছে সমাজের বিভিন্ন অংশকে একত্রিত করে তোলার ঠিক যেমনভাবে আমাদের মহাকাব্যিক স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় একত্রিত হয়েছিল সমাজের বিভিন্ন অংশ। আজকের ভারতবর্ষকে রক্ষা করে, যাতে এই দেশকে আরও উন্নত ভবিষ্যতের দিকে আমরা নিয়ে যেতে পারি, সেজন্যই এই ঐক্যের দরকার আছে।
যখন আমরা ভারতের স্বাধীনতার ৭৫তম বার্ষিকীর মুখোমুখি সেই সময় আমাদের সামনে রয়েছে দুটি বিকল্প— হয় ভারতকে পিছনের দিকে টেনে নিয়ে গিয়ে তাকে মধ্যযুগের অন্ধকারে নিক্ষেপ করা, হিন্দুত্ব যাকে তুলে ধরতে চাইছে ‘হিন্দু সভ্যতার গৌরব’ হিসাবে, নতুবা ভারতকে টেনে নিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতের আলোর অভিসারের দিকে, যেখানে এই দেশ হয়ে উঠবে আধুনিক, সমুখপানে প্রসারিত–দৃষ্টি এক প্রজাতন্ত্র যা প্রভাবিত করবে গোটা বিশ্বকে।
ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস
প্রকাশের তারিখ: ১২-সেপ্টেম্বর-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
