সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
লাভ জিহাদিদের কথা
দেবরাজ দেবনাথ
আরএসএস-এর সাফল্য এখানেই যে ভিনধর্মে স্বেচ্ছায় প্রেম বা স্বেচ্ছা ধর্মান্তর বলে কিছু সম্ভব তা গণচেতনা থেকে প্রায় মুছে দিতে সক্ষম হওয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাভ জিহাদ সংক্রান্ত অপপ্রচারের বন্যা এতদূর বিস্তৃত হয়েছিল যে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ বা হরিয়ানার বিস্তৃত অংশে গত দশকের মাঝামাঝিতে মেয়েদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়াটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য ভারতে যে ১২টি রাজ্যে এখন ধর্মান্তরণ-বিরোধী আইন চালু হয়েছে তার প্রায় সবটাই বিজেপি শাসনে।

দেড় শতক আগে গালিব লিখেছিল: জীবন-মৃত্যুর ফারাক নেই ভালোবাসায়। যেই কাফিরের জন্যে জান চলে যায়, তাকে দেখেই বেঁচে থাকি আমরা! মানুষের কাছে ভালোবাসা এক মৌল প্রণোদনা। সহজাত হৃদয়ের প্রবৃত্তি। অন্য যে কোনো মানবিক গুণ, অনুভূতি, সম্পদের মতন ভালোবাসাও শ্রেণিসমাজের গোড়া থেকেই শাসক শ্রেণির হাতে কখনও লুণ্ঠিত হয়, কখনও খল হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
বহু সংস্কৃতির দেশ ভারত ভালোবাসার বহুমুখিনতায় সম্যক পরিচিত ছিল। প্রণয় হলেই পরিণয় নয় সবসময়। সে ইতিহাসও ভারতে চলিত। আমরা দেখেছি ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের মধ্যে বেদ-নির্দেশিত বর্ণ-ব্যবস্থার কারণে অজস্র প্রেম কার্যত ট্র্যাজিক কিংবদন্তি হয়ে উঠেছে। আমরা মনে করতে পারি বৈষ্ণব কবি চণ্ডীদাসকে। চৈতন্যপূর্ব বাংলায় বৈষ্ণব ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম সাধক কবি যখন লিখছেন— চণ্ডীদাস কহে শুন বিনোদিনী,/সুখ দুখ দুটি ভাই।/সুখের লাগিয়া যে করে পিরীতি,/দুখ যায় তার ঠাঁই।। তখন তার পিরিতির বাস্তব অবলম্বন ছিল বিধবা রজকিনী রামী। বাঁশুলীর মন্দিরের পুকুরঘাটে রামীর রোজ কাপড় কাচতে আসা ও তার পানে মন্দিরের পূজারী ব্রাহ্মণ চণ্ডীদাসের প্রেমময় চোখে চেয়ে থাকা সাতশো বছর আগে এক অকল্পনীয় দুঃসাহস ছিল। চণ্ডীদাস নিজে ব্রাহ্মণ হওয়ায় সামাজিক আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতেন কিছুদূর বটে, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। একে শূদ্র, তায় বিধবা মেয়ে। এই সম্পর্ক তাই দীর্ঘসময় ছিল নিষিদ্ধই।
এমনিতে অনুলোম বিবাহ শাস্ত্রসম্মত। কিন্তু ছেলেটি উচ্চবর্ণের ও মেয়েটি নিম্নবর্ণের হলেই তা আসলে খাটে। তা-ও ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যের মধ্যে এই বিবাহের চলাচল হতে পারে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই শূদ্রের সঙ্গে উচ্চতর বর্ণের এই বৈবাহিক বন্ধন চলতে পারে না। এমনটাই বিধান হিন্দু শাস্ত্রপ্রণেতাদের। ফলে স্বভাবতই অন্তর্বিবাহের বাঁধন ভারতে আর্যকাল থেকেই শক্ত। কিন্তু রাজশাসন ও সাম্রাজ্য পরিচালনের প্রয়োজন এই বাঁধনকে প্রায়শই শিথিল করেছে। বাহমনি সুলতানি সাম্রাজ্যের মুসলিম শাসক ও বিজয়নগর বা গুজরাটের হিন্দু রাজকন্যাদের বিবাহ আসলে হিন্দু মহর্ষিদের ইসলামিকরণের পক্ষে সওয়াল করে না, এগুলি ছিল রাজত্ব রক্ষার রণকৌশল মাত্র।
ভারতের দুটি মহাকাব্যিক লোককাহিনির কথা আমরা বলব। মহাভারতে দেখি ক্ষত্রিয় রাজা শান্তনু জেলের মেয়ে সত্যবতীকে অনায়াসে বিবাহ করতে পারছেন। কিন্তু সুতপুত্র কর্ণ দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে অংশগ্রহণ করতে গেলে তাকে তার শূদ্র জন্মপরিচয়ের কারণে বিতাড়িত হতে হচ্ছে। এই কঠোর ও কঠিন দ্বৈত বাস্তবতা ছিল ভারতের সমাজমনে প্রোথিত।
প্রেমের অমোঘতা ও বিবাহের ঐতিহাসিক বাধ্যবাধকতাকে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি বারংবার। মধ্যযুগের ভারতে আমরা মনে রাখব যোধা ও আকবরের ঘটনাবলীকেও। আকবর, জাহাঙ্গির, আলমগীর সহ মোঘল সম্রাটদের বহু হিন্দু স্ত্রী বিবাহের পরে ইসলামে ধর্মান্তর করেননি, বরং তাদের হিন্দু আচারই পালন করেছেন খোদ মুসলিম সম্রাটের অন্দরমহলেও। এই কথাগুলো মনে রাখা দরকার কারণ মধ্যযুগের ভারত অধিকাংশত মুসলিম শাসক দ্বারা শাসিত ছিল, অথচ রাজক্ষমতার হাতে শাসিতের ধর্মের বলপূর্বক বদল দস্তুর ছিল না।
প্রসঙ্গত আমরা মনে রাখব সুহা ভট্টকে। কাশ্মীরের এই ব্রাহ্মণ পণ্ডিত স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করেন যখন সিকান্দার শাহ কাশ্মীরের শাসক। এইটুকু ঐতিহাসিক তথ্য। এছাড়া সুহা ভট্ট কেবল অপরাপর ব্রাহ্মণদের জোর করে ইসলামে ধর্মান্তর করতেন বলে পরবর্তীতে কিছু কাশ্মীরি রাজসাহিত্যে পাওয়া যায়। যদিও তার লক্ষ্য সেখানে থাকত ব্রাহ্মণ্যধর্মের কঠোর নিষ্পেষণকারী বর্ণবাদকে চুরমার করা। তবে এই অংশের বক্তব্যের সাপেক্ষে ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণের যথেষ্ট অভাব রয়েছে।
আমরা এক অন্যরকম প্রেমের উল্লেখও করব। মীরাবাঈ ছিলেন ষোড়শ শতকের রাজপুত ভোজরাজ সিং-এর স্ত্রী। আদ্যোপান্ত কৃষ্ণভক্ত। তার কৃষ্ণভক্তির প্রাবল্য এতটাই ছিল যে ভোজরাজ মারা গেলে তিনি সহমরণে যেতে অস্বীকার করেন কৃষ্ণই তার প্রকৃত স্বামী এই যুক্তিতে। কঠোর রাজপুত সমাজে স্বভাবতই এই বিদ্রোহের কারণে তিনি কোপের মুখে পড়েন, বিশেষত একজন মেয়ে হওয়ায়। মোদ্দায় ভারতে হিন্দুধর্মের মধ্যে ও বাইরে প্রেম ও বৈবাহিক সম্পর্কের জটিলতা বরাবরই বর্তমান ছিল। তেমনি এই জটিলতাকে উপেক্ষা করে তার অসংখ্য সাহসী ও সহজ প্রকাশও ছিল। এই গতিশীলতাই ভারতের সমাজকে উদার ও সমন্বয়বাদী করেছে কালক্রমে। তারই উদাহরণ আমরা পেতে পারি কোলহাপুরের রাজা ছত্রপতি সাহু যখন বিশ শতকের গোড়ায় আইন প্রণয়ন করে অসবর্ণ বিবাহে জোর দেন। এক আশ্চর্য প্রগতিশীলতার পরিচয় বহন করেন।
ভারতের ইতিহাসে এই উদাহরণ আকছার মেলে যেখানে প্রেম বা বিবাহবন্ধনের পরেও সংশ্লিষ্ট দুটি মানুষের দুজনেই তাদের পূর্বে পালিত ধর্মই পালন করে চলেছে। আবার স্বেচ্ছায় স্বামীর ধর্মকে গ্রহণ করবার নজিরও মেলে। ভারতে প্রায় সাত শতক ইসলাম ধর্ম পালন করা রাজন্যবর্গ অধিকাংশ ভূখণ্ড শাসন করেছে। অথচ তাতেও বলপূর্বক ধর্মান্তরকে হাতিয়ার করে ভারতের জনসংখ্যার ব্যাপক ইসলামিকরণ ঘটানো হয়নি। বরং আশ্চর্য হয়ে দেখি একদিকে মালিক মহম্মদ জায়সী আওয়াধে, আরেকদিকে সৈয়দ আলাওল বাংলায় পদ্মাবতীর মনোমুগ্ধকর প্রেমকাহিনি লেখেন যেখানে প্রেমের ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক আবেদনই মুখ্য হয়ে ওঠে, বাদশাহ আলাউদ্দিনের পদ্মাবতীর প্রেমানলে দগ্ধ হওয়া আত্মনিবেদনও রাজা রত্নসেনের একান্ত অনুরাগী পদ্মাবতীর সহমরণের সিদ্ধান্তকে টলাতে পারেনি। যদিও কাব্যে লেখা আছে জওহরের আগে বাদশাহের হাতেই নিজের দুই সন্তানের দায়ভার তুলে দিয়ে যান পরমাসুন্দরী পদ্মাবতী।
ভারতের এই বহুত্ববাদী ইতিহাস কেবলই প্রগতিশীল ঐতিহ্যকে বহন করে তা নয়, অসংখ্য রক্ষণশীল কাঠামো ও উপাদানের বিরুদ্ধে রীতিমতো একনাগাড়ে লড়াই করেই কার্যত আধুনিক এক প্রেমবীক্ষা তৈরি হতে পেরেছিল। অথচ ইদানিংকালে এই বীক্ষণ কড়া প্রতিরোধের মুখে। ভারতে ১৯৫৪ সাল থেকে বিশেষ বিবাহ আইন প্রচলিত। ভিন ধর্মের দুই মানুষের বিবাহ এই আইনের আওতায় যথেষ্ট সহজ। অথচ হিসাব করলে দেখা যায় ২০০৫ সাল অবধিও মাত্র আড়াই শতাংশ ভারতীয় আন্তঃধর্ম বিবাহ করে থাকে। অথচ এই দশকেই ভারতে লাভ জিহাদ তথা রোমিও জিহাদের তত্ত্ব ব্যাপক হারে ছড়াতে শুরু হল। বিশেষত কেরল আর কর্ণাটকের কিছু ঘটনাকে হাতিয়ার করে। হিন্দু জনজাগৃতি সমিতি প্রথম ২০০৯ সালে এই লাভ জিহাদের তত্ত্ব প্রচার করে। এর অর্থ হল সংগঠিতভাবে মুসলিম ছেলেরা প্রেমের ফাঁদে জড়িয়ে অ-মুসলিম মেয়েদের বিয়ে করে মগজধোলাই করে ধর্মান্তরণ ঘটায়। এমনকি এই ধর্মান্তরিত নব্য-মুসলিম মেয়েরাই আন্তর্জাতিক স্তরে ইসলামিক স্টেটের মতন জঙ্গি গোষ্ঠীতে নিযুক্ত হয়ে থাকে। আবার কেউ কেউ পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়ার মতন ভারতীয় জঙ্গি গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী হয়ে ওঠে। এই অভিযোগ নিয়ে কার্যত আদাজল খেয়ে নেমে পড়ে হিন্দুত্ববাদী নানান সংগঠন। কেরলে, কর্ণাটকে রাজ্য পুলিশ, সি.আই.ডি, এমনকি কেন্দ্রীয় এন আই এ অবধি গত ১৫ বছরে অসংখ্যবার অসংখ্য কেসে তদন্ত চালিয়েও কেউ কোথাও কোনো সংগঠিত লাভ জিহাদ চক্রের হদিশ বা ন্যূনতম প্রমাণ পাননি।
এই হিন্দু জনজাগৃতি সমিতির সঙ্গে প্রকাশ্য যোগাযোগ ছিল সনাতন সংস্থার। এদের প্রত্যক্ষ হাত ছিল ২০০৯ সালের গোয়া বোম্বিংয়ে, কমিউনিস্ট নেতা গোবিন্দ পানসারে, সমাজকর্মী নরেন্দ্র দাভোলকর ও এম.এম. কালবুর্গী এবং সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশদের খুন করবার পেছনে সরাসরি সংযোগ ছিল এদের। ২০০৭ সাল অবধিও কেবল এরা কর্ণাটকের দক্ষিণ অংশে মূলত পার্কে, বেঞ্চে, রাস্তার ধারে বসে থাকা যুগলদের ধোলাই করত পশ্চিমি সংস্কৃতির আগ্রাসনের অজুহাতে। ২০০৯ সাল থেকে এদের কথায় সাম্প্রদায়িকতা ঢোকে যখন এরা বলে ‘সুন্দর দেখতে মুসলিম তরুণ'দের চিহ্নিত করে মাদ্রাসারা ‘হিন্দু তরুণী'দের ‘শিকার’ করে ধর্মান্তর করে। কোনোরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তারা বলে দেয় প্রায় ৩০ হাজার হিন্দু মেয়েদের এই জিহাদচক্রের বলি হবার কথা। নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবার জন্য এরা এদের পোস্টারে ব্যবহার করত বলিউড অভিনেতা সাইফ আলি খান ও আমির খানের কথা যারা ‘হিন্দু মেয়েদের বিয়ে করে সন্তানোৎপাদন করে তাদের ছেড়ে দেয়’। আরএসএস-এর সঙ্গে এদের সংযোগ কতটা ঘনিষ্ঠ তা স্পষ্ট হয় যখন কিছু বছর পরেই ‘লাভ জিহাদ’ শব্দটি ব্যবহার না-করেই আলি আকবর খাঁ, শাহরুখ খান, সুনিধি চৌহানদের মতো ৭৩ জন সেলিব্রিটি মুসলিম পুরুষ ও তাদের হিন্দু স্ত্রীদের বৈবাহিক কথাসমৃদ্ধ একটি ই-মেইল বিভিন্ন সংবাদসংস্থাকে পাঠায় আরএসএস।
২০১৭ সালে হাদিয়ার ঘটনা অন্যরকমভাবে নাড়া দেয় লাভ জিহাদ বিতর্ককে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আন্তঃধর্মের বিবাহ ঘটলে বিবাহের পরে ধর্মান্তরই দস্তুর ছিল। অথচ হাদিয়া প্রথমে ইসলামে ধর্মান্তরিত হয় আইনত। তার বেশ কিছু কাল পরে বিবাহের আবেদন জানায় এক মুসলিম যুবককে।
আরএসএস-এর সাফল্য এখানেই যে ভিনধর্মে স্বেচ্ছায় প্রেম বা স্বেচ্ছা ধর্মান্তর বলে কিছু সম্ভব তা গণচেতনা থেকে প্রায় মুছে দিতে সক্ষম হওয়া। সোশ্যাল মিডিয়ায় লাভ জিহাদ সংক্রান্ত অপপ্রচারের বন্যা এতদূর বিস্তৃত হয়েছিল যে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ বা হরিয়ানার বিস্তৃত অংশে গত দশকের মাঝামাঝিতে মেয়েদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়াটা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য ভারতে যে ১২টি রাজ্যে এখন ধর্মান্তরণ-বিরোধী আইন চালু হয়েছে তার প্রায় সবটাই বিজেপি শাসনে। অথচ সুপ্রিম কোর্ট বারংবার রাষ্ট্রসংঘের সনদে স্বীকৃত ‘কোনো ধর্ম বা বিশ্বাসকে গ্রহণ ও পালন করবার স্বাধীনতা’ যাতে বিঘ্নিত না-হয় তার নির্দেশ দিয়ে থাকে। লাভ জিহাদের অফিশিয়াল দেড় দশকে লাভ জিহাদের তত্ত্ব বারংবার ভুয়ো প্রমাণিত হলেও ভারতের এই বারো রাজ্যের ধর্মান্তরণ-বিরোধী আইন প্রণয়ন বেশ কিছু দিক ইঙ্গিত করে।
এই গোটা বিতর্কটাই আদ্যোপান্ত পুরুষতান্ত্রিক। মেয়েদের ব্যক্তিগত মতামত ও অধিকারের ন্যূনতম গুরুত্বও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি স্বীকার করে না। কাউকে বিয়ে করবার বা না-করবার যে সংবিধান স্বীকৃত অধিকার, তা ভারতের মেয়েদের হাতের নাগালের বাইরেই থাকে। এই জাতীয় আইন প্রণয়নই হল আসলে অভিযুক্ত মুসলিম তাই দোষী এই ভাবনার পরিসর থেকে, যা অন্যায়। মেয়েদের ব্যক্তিসত্তার অস্তিত্বটুকুই দলিত। মেয়েরা পরিবার ও গোষ্ঠীর সম্পদ— এই মনোভাবের লালন আসলে লাভ জিহাদের তত্ত্বকে দাবানল হতে সাহায্য করেছে।
টাটা গোষ্ঠীর গয়নার ব্র্যান্ড হল তানিশক। ২০২০ সালে তারা একটি বিজ্ঞাপন বানায় যেখানে একটি মুসলিম পরিবারে একটি হিন্দু মেয়ের বিবাহ হয়। বিয়ের পরেও মেয়েটি তার ধর্মীয় পরিচয় বদলায়নি। মেয়েটির মুসলিম শাশুড়ি সন্তানসম্ভবা বৌমার জন্য হিন্দুমতে সাধ অনুষ্ঠানের ইন্তেজাম করে যা আদতে শরিয়তি সংস্কৃতি নয়। বৌমা যখন প্রশ্ন করে, ‘মা, এই রীতিনিয়ম তো আপনাদের ঘরে হয়ই না, তাই না?’ এর উত্তরে শাশুড়ি বলে, ‘কিন্তু মেয়েকে খুশি রাখবার রীতিনীতি তো সব ঘরেই হয়!’ এই বিজ্ঞাপনটি লাভ জিহাদকে উৎসাহ দিচ্ছে এই অভিযোগে সোশাল মিডিয়া তোলপাড় হয়ে যায়। তানিশকও বিজ্ঞাপনটি প্রত্যাহার করে নেয় ক্ষমা চেয়ে। বৃহৎ পুঁজির প্রগতিশীলতা আদতে দেখনদারি ছাড়া কিচ্ছু না, তা দিনের আলোর মতন বোঝা যায় আরেকবার।
বিবাহ যে আসলে দুই লিঙ্গের বা সমলিঙ্গের সমানাধিকারের মঞ্চ থেকে দুই পক্ষেরই স্বেচ্ছাবন্ধন এবং এটি অনড় নয়, এই প্রগতিশীল ধারণা ভারতের আধিপত্যবাদী পারিবারিক মূল্যবোধের সঙ্গে খাপ খায় না। ফলে গত ১৫ বছরে লাভ জিহাদ আদালতের চত্বরে বারংবার ভুয়ো বলেই প্রমাণিত হয়েছে; কিন্তু তাতে তার সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি, উত্তরোত্তর বেড়েছে। কারণ এইটাই যে লাভ জিহাদ কোনো সংগঠিত জিহাদ না-হলেও, লাভ জিহাদের তত্ত্ব প্রচার করে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটানো ও ভারতীয় জনতা পার্টিকে নির্বাচনীভাবে লাভবান করে তোলা একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা। এই প্রচেষ্টার মূলে নিহিত আছে ভারতকে একমাত্র ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির আখড়া করে তোলা। যেখানে মেয়েদের স্বাধীন চেতনা ভূলুণ্ঠিত থাকবে, ঐতিহ্যের নাম করে তারা বুর্জোয়া প্রগতির যাবতীয় সুযোগ থেকেই বঞ্চিত হবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিযুক্ত থাকবে। আপামর মুসলিম সমাজকে মেয়েধরা গোছের দানবীয় অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে পারলে ভারতীয় সমাজে বহুসংস্কৃতির সমন্বয় বা সংমিশ্রণকে গোড়াতেই রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। আধা-সামন্ত আধা-বুর্জোয়া ভারতে সামন্তবাদী মূল্যবোধের এই জয়গান ক্রমে দৃশ্যমান হচ্ছে এই লাভ জিহাদের মতন তত্ত্বের হাত ধরে। অথচ সামন্ত ভারতেই এর চেয়ে উন্নততর চেতনার অস্তিত্ব ছিল যখন আমরা দেখি : মৈমনসিংহ-গীতিকার পালাগানে প্রেম কার্যত প্রচলিত সমাজের আঁটোসাঁটো নিয়মশৃঙ্খলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, গজদানি ও মমিনা খাতুনের অনুরাগ কিম্বা ব্রাহ্মণ জয়চন্দ্র ও এক মুসলমানীর প্রেমগাথা স্বাধীন মুক্ত প্রেমের জয়ধ্বজাই তুলে ধরে। আবার আরও কিছু পরে দেখি স্বাধীনতা সংগ্রামরত ভারতে নারী সত্যাগ্রহ কমিটির সম্পাদিকা শান্তি দাস ১৯৩২ সালে কলকাতার টাউন হলে মহিলা কংগ্রেসের অধিবেশনে এমন কিছু প্রস্তাব আনলেন যাতে তোলপাড় পড়ে গেল। এর একটি ছিল : দুই ভিন্ন ধর্মের পুরুষ নারীর বিবাহের অধিকার। সভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ এর বিরোধিতা করে ঠিকই। কিন্তু মৃদু হলেও আধুনিকতার স্বরের অস্তিত্ব উপনিবেশের ভারতে বর্তমান ছিল।
‘ঘৃণার বাজারে’, বিদ্বেষের কালে ভালোবাসা এবং ভালোবাসার-কথা বলে যাওয়া আসলে জিহাদ (সংগ্রাম)। লাভ জিহাদের ঝটিতি প্রসার ভারতের মর্মমূলে গাঁথা এত সহস্র বছরের প্রেম নামক এক ধর্মনিরপেক্ষ মানবিক বৃত্তিকে আমূল দলন করতে পারবে, ভারতে ক্রমবর্ধমান ইসলামভীতিকে আরও ব্যাপক করতে পারবে— এই আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করতে হলে আমাদেরও ভারতের যাবতীয় প্রগতিশীল ঐতিহ্যকেই ও সহস্র বছর ধরে পূর্বজরা যে-ভালোবাসার কাহিনি বুনেছেন তাকেই করতে হবে হাতিয়ার।
প্রকাশের তারিখ: ১৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
