সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
কৃষ্ণ ধর স্মরণে
সৌমিত্র লাহিড়ী
পথ চলতে চলতে তিনি অনুভব করেছেন--- পথের মাঝখানে পাথর, দুপাশে পাথর সেই পাথর সরিয়ে নতুন পথ খুঁজতে খুঁজতে তিনি বলেছেন--- জীবন কি শুধু জীবনযাপন শুধু কবি জানে রহস্য তার অনন্য উচ্চারণে বলেছেন--- আমার স্বপ্নের নির্মাণে কোনো পাহারাদার নেই

তাঁর চেতনা ও বিশ্বাসের ভূমি
২০০৪ সালের ১ জুন, কবি কৃষ্ণ ধর-কে তাঁর সারা জীবনের সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি নজরুল পুরস্কারে সম্মানিত করার পর আকাশবাণীর কলকাতা কেন্দ্র তাঁর একটি সাক্ষাৎকার বাক্যন্ত্রে ধরে রাখার আয়োজন করেছিল৷ উদ্দেশ্য, কবির দীর্ঘ সাক্ষাৎকার এবং কবির এক ডজন কবিতা পাঠ করিয়ে রাখবে তারা আর্কাইভের জন্য৷ সাক্ষাৎকার নেওয়ার দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর৷
কবি কৃষ্ণ ধর এবং আমি মুখোমুখি বসে প্রশ্নের ধরন ও গতিপ্রকৃতির রূপরেখা একটু আলোচনা করে নিয়ে, শুরু করে দিয়েছিলাম৷ বেশ দীর্ঘই ছিল সেই সাক্ষাৎকার৷ কৃষ্ণদাও স্বতঃস্ফূর্ত ও সপ্রতিভভাবে প্রশ্নবাণ সামলে একের পর এক উত্তর দিয়ে গেলেন৷ সমস্যা দেখা দিল তারপর৷ গৃহীত সাক্ষাৎকার ও কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ সংরক্ষণের জন্য সেভ করার সময় কী যেন যান্ত্রিক সমস্যা হচ্ছিল৷ সেসময় ঘরে এলেন সুপরিচিত এক সাহিত্যিক, আমাদের দুজনেরই প্রিয়জন, আকাশবাণীর পদস্থ আধিকারিক৷ তিনি ‘পারছ না কেন, খুব সহজ ব্যাপার’ বলতে বলতে মাউস ঘোরাতে শুরু করলেন এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে জিভ কেটে বলে উঠলেন সর্বনাশ হয়ে গেল৷ ভুলবশত তিনি ডিলিট করে দিয়েছেন সম্পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি ও কবিতাপাঠ৷ কোনোভাবেই হারিয়ে যাওয়া বস্তুটি আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হল না৷ তখন বারবার নিজের ভুল স্বীকার করে ফের আর-একটা সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন৷ আমরা অসহায় ও বিপন্ন৷ এরকম রিপিট করা যায় না৷ প্রথমবারের স্বতঃস্ফূর্ততা পরের বার থাকা সম্ভব নয়৷ তবু আমরা অনুরোধ ফেলতে পারলাম না, এক কাপ কফি খেয়ে ফের কাজ শুরু করেছিলাম৷ আগের মতো হল না, কিন্তু শেষপর্যন্ত বাক্যন্ত্রে বিধৃত করা সম্ভব হল৷ আমরা সকলেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম৷
সেদিন আমার চোখে মানুষ হিসাবে কৃষ্ণদার পরিমাপ অনেকটা বেড়ে গেল৷ পঁচাত্তর বছর পার করা এক টানটান মেরুদণ্ডী কবি ন্যূনতম ক্ষোভ প্রকাশ করলেন না৷ দ্বিতীয়বার প্রশ্নের উত্তর দিতেও অস্বীকৃত হলেন না, যদিও তখন তিনি দৃশ্যতই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন৷ কৃষ্ণদার স্নেহপ্রবণ মন ও যুক্তিবাদী স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম৷ ভুলকে ভুল হিসাবেই নিলেন, কোনো অসূয়া প্রকাশ করলেন না৷ তাঁর মৃত্যুর পর আর্কাইভ থেকে বের করে এনে সেটাই প্রচার করা হয়েছে কয়েকদিন আগে৷ কিছু কিছু কাটছাঁট হয়েছে কিনা সময়ের প্রয়োজনে, এখন আর তা বোঝার উপায় নেই৷ অন্তত আমার নিজের কিছুই মনে নেই৷
২.
সুভাষ মুখোপাধ্যায়, অরুণ মিত্র, মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়, রাম বসু, সিদ্ধেশ্বর সেন, গোলাম কুদ্দুস, কিরণশংকর সেনগুপ্ত, মণীন্দ্র রায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ বিশিষ্ট কবির জীবনাবসানের পর চল্লিশের দশকের উত্তাল সময়ের কবিদের মধ্যে সম্ভবত শেষ প্রতিনিধি ছিলেন কবি কৃষ্ণ ধর৷ আমাদের খুবই সৌভাগ্য যে, কবি-সাংবাদিক এবং গদ্যশিল্পী কৃষ্ণ ধর দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন৷ ৯৪ বছর বয়সে গত ১২ অক্টোবর তাঁর জীবনাবসান ঘটেছে৷ শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁর কলম ছিল সক্রিয় ও সতেজ৷ আশি বছর অতিক্রম করার পরও কবি কৃষ্ণ ধর দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘হাঁটব, থামব না’৷
কোন সময় কবি একথা বলছেন? প্রাসঙ্গিক দুটি কবিতা থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি লক্ষ করা যেতে পারে---
বণিকের ভুবন বাজারে চড়া দামে বিকোচ্ছে
মানুষের কবিতার তাজা রক্ত মাংস
ফিরিওয়ালার হাতে হাতে আজ তার জীবনযাপন
(আমাদের কষ্টের শস্যগুলি)
‘কবিকে প্রশ্ন করে, তুমি লেখো এতসব শব্দাবলি ছন্দের বিন্যাসে
পাথর সরাতে পারো কবি, সময়ের বুক থেকে
পারো দিতে অন্নের সন্ধান৷’ (হা অন্ন)
বিশ্বায়নের ঘোরলাগা সময়ে কবিতাও বাজারি পণ্য হয়ে যাচ্ছে৷ ফেরিওয়ালার রাংতামোড়া বিপুল পণ্যের বাজারমূল্য সৃষ্টি করে কবিকেও বাজারি প্রতিযোগিতায় নামতে হচ্ছে এমন ভয়ংকর সময়ে, যখন কবি বলছেন--- হাঁটব, থামব না---
এই দৃঢ় প্রত্যয়-ই কবিকে দিয়েছে গভীর আহ্বানের অস্ত্র---
চটজলদি তৈরি হয়ে যাও, দিগন্ত আমাদের ডাকছে
যত দেখছো বাজবিজুলির চমক সবই মেঘের চক্কর
আমরা তা মাথায় নিয়েই এগোব, মুসাফিরের মতো৷ দাঁড়াব না৷
(হাঁটব, থামব না)
১৯৪৮ সালে, অর্থাৎ ৭৫ বছর আগে, ‘অঙ্গীকার’ নামে তাঁর প্রথম কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছিল৷ কাকতালীয় হলেও এই তাৎপর্য লক্ষণীয় যে, ৭৫ বছর আগেই তিনি অঙ্গীকার শিরোনামের মধ্যবর্তিতায় নিজের মনোজগতের যে প্রত্যয়দৃপ্ত বর্ণপরিচয় উপস্থিত করেছিলেন, জীবনের শেষপ্রান্তে এসেও তার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি৷ সেই দৃঢ় গভীর প্রত্যয়দৃপ্ত উচ্চারণই ধ্বনিত হয়েছিল কিছুদিন আগে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘হাঁটব, থামব না’-তেও৷ একটু অপ্রাসঙ্গিক হলেও এই তথ্য উল্লেখের লোভসংবরণ করতে পারছি না যে, কবি কৃষ্ণ ধরের প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘অঙ্গীকার’কে স্বাগত জানিয়ে সমালোচনা লিখেছিলেন স্বয়ং কবি জীবনানন্দ দাশ৷
যে যেখানে আছো, কালের রাখাল তুমি ভিয়েৎনাম, এ জন্মের নায়ক, পদধ্বনি, পলাতক, শব্দহীন শোভাযাত্রা, বিরুদ্ধ বাতাস, হে সন্ধিক্ষণ, প্রিয় বাক্ কথা রাখো, দুঃসময়, নির্বাচিত কবিতা, নির্বাচিত কাব্যনাটক, হাঁটব থামবো না, কয়েকটি কবিতা সহ অনেকগুলি কবিতা ও কাব্যনাটক সংকলন তাঁর প্রায় আশি বছরের সাহিত্যজীবনে প্রকাশিত হয়েছিল৷ এ-সবই তাঁর অবিরল সাহিত্যযাপনের ফসল৷ তিরিশটিরও বেশি কাব্যনাটক তিনি রচনা করেছেন৷ হাতে গোনা দ-একজন কবি ছাড়া আর কোনো কবি এত কাব্যনাটক রচনায় হাত দেননি৷ পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি প্রায় ৩০টি কাব্যনাটক-এর একটি সুবৃহৎ সংকলন ২০০৯ সালের প্রতিষ্ঠাদিবসে প্রকাশ করেছিল৷ ইংরেজি, ফরাসি সহ বেশ কয়েকটি বিদেশি ভাষায় তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে৷ মারাঠি, হিন্দি ইত্যাদি ভারতীয় ভাষাতেও তাঁর কবিতার অনুবাদ বিচ্ছিন্নভাবে নানা সময়ে প্রকাশিত হয়েছে৷
১৯৯০ সালে কাব্যনাটক ‘বিরুদ্ধ বাতাস’ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানজনক সুধা বসু স্মৃতি পুরস্কার লাভ করেছিল৷ ১৯৮০ সালেই তিনি কবিতার জন্য পেয়েছিলেন ‘শিশিরকুমার পুরস্কার’৷
৩.
কবি কৃষ্ণ ধর দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে কবিতার পাশাপাশি নিয়মিত নানা প্রসঙ্গে অজস্র ধারায় গদ্যও লিখেছিলেন, কখনও অধ্যাপকীয় অনুশাসন মেনে, আবার কখনো-বা সাংবাদিকের সরল স্বচ্ছ গদ্যে৷ তাঁর গদ্যগ্রন্থগুলির মধ্যে আছে--- আধুনিক কবিতার উৎস, কলকাতার তিন শতক, ভারতের মুক্তি সংগ্রামে বাংলা, দেশনায়ক সুভাষ, মস্কো থেকে দেখা, অন্য দেশ অন্য নগর৷ এছাড়াও প্রখ্যাত সম্পাদক বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের মূল্যবান জীবনীগ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন৷ একই সঙ্গে সংগ্রহ করেছেন বিবেকানন্দবাবুর বহু বিখ্যাত এবং ইতিহাস সৃষ্টিকারী সম্পাদকীয়গুলির নির্বাচিত সংকলন, যা উত্তরকালের পাঠকের সামনে বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়ের শক্তিশালী কলম এবং দৃঢ়চেতা অনমনীয় মনোভাবের পরিচয় তুলে ধরেছে৷ সাংবাদিকতার দর্শন : আদর্শ ও বিচ্যুতি---পরিমার্জিত ‘প্রতিভাস’ সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৫ সালে৷ সাংবাদিকতার ছাত্রছাত্রী শুধু নন, সাধারণ গণতান্ত্রিক সচেতন যেকোনো পাঠক বইটি পড়লে গণমাধ্যমের আদর্শ ও বিচ্যুতি সহজেই চিহ্নিত করতে পারবেন৷ প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন ৪০ বছরের বেশি সক্রিয় পেশাজীবনের বেশিরভাগ সময়ই তাঁর কেটেছিল সংবাদপত্র জগতে৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করার পর প্রথম জীবনে তিনি কিছুকাল বাংলা ভাষার অধ্যাপকও ছিলেন৷ পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যাপনা করেছেন৷ আংশিক সময়ের অধ্যাপক হিসাবে কয়েক প্রজন্মের সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের কর্মী সংগঠকদের পাঠদান করেছেন৷ ছাত্রছাত্রীমহলে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন তিনি৷ তাঁর অননুকরণীয় ব্যক্তিত্ব ও সুভদ্র ব্যবহার তাঁদের স্মৃতিতে বিশেষ মর্যাদার আসন নিয়েছে৷ তিনি কিন্তু পেশাগতভাবে ছিলেন মূলত সাংবাদিক৷ যুগান্তর, বসুমতী সহ নানা পত্রপত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছিলেন৷ যুগান্তর এবং বসুমতী পত্রিকায় দীর্ঘ সময় তিনি সম্পাদক ছিলেন৷ বসুমতী এবং যুগান্তর সেইসময় বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল৷ বিবেকানন্দ মুখোপাধ্যায়, নন্দগোপাল সেনগুপ্ত, প্রভাতকুমার গোস্বামী, সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার সহ বহু বিশিষ্ট সাংবাদিকের পাশাপাশি বসে কাজ করার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল৷
শেষজীবনে আত্মজৈবনিক দুটি গ্রন্থ তিনি রচনা করেছিলেন৷ প্রথমটি ‘আট দশক সাতকাহন’ এবং দ্বিতীয়টির নাম ‘ঝাঁকি দর্শন’৷ আত্মজীবনী লেখার বিষয়ে তাঁর বিশেষ সংকোচ ছিল৷ তিনি সচরাচর নিজেকে সামনে আনতেন না, আড়াল ভালোবাসতেন৷ ‘আট দশক সাতকাহন’ কয়েকটি কিস্তিতে একটি মাসিক সাহিত্যপত্রে ছাপা হয়েছিল৷ সকলেই বিস্মিত হয়েছিলেন, যাপিত জীবন, ফেলে আসা সময় সময়ের ঘূর্ণিপাকে জড়িয়ে থাকা জীবন, সময়ের চরিত্র বৈশিষ্ট্য যতটা তাঁর কলমে উঠে এসেছিল সেই রচনায়, সেখানে তাঁর নিজের কথা ছিল খুব সামান্যই--- একজন পর্যবেক্ষক যেন ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছেন, দর্শন ও অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করেছেন৷ নির্মেদ গদ্যে অনবদ্য রচনা সেই স্মৃতিচারণ, কিন্তু বলেও যেন অনেকটাই না বলা থেকে গিয়েছিল তাঁর৷ তাই অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মুক্তাক্ষরে উঠে এসেছিল আরও একটি গদ্যগ্রন্থ ‘ঝাঁকি দর্শন’৷ টুকরো টুকরো স্মৃতি, ছায়াছবির মতো কাটা কাটা অথচ যেন কাটা নয়৷ টুকরো গদ্যের এক বর্ণময় বুনন, কেউ কারও সঙ্গে যুক্ত নয়, কিন্তু পরও না, যেন পড়শি৷ টুকরো গদ্যের আর একটি সংকলনের কথা না বলা হলে বিশেষ অন্যায় হয়ে যাবে৷ কবি কৃষ্ণ ধর যুগান্তর পত্রিকায় এক সময় সাপ্তাহিক একটি ফিচার লিখতেন ‘বই পড়ুয়ার বৈঠকে’৷ ৭০০-৮০০ শব্দের ছোটো পরিসরে এক একজন লেখক-শিল্পীকে পরিচয় করিয়ে দিতেন যেন তিনি৷ সেই লেখকের প্রধান বৈশিষ্ট্য, ভাষা ও রচনা রীতি, প্রধান কাজ, স্বভাব ও কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ঘটনাবলি সম্পূর্ণ নিরাসক্ত ভক্তিতে নির্মেদ সরল গদ্যে বিধৃত করতেন৷ প্রকাশের সময় দারুণ জনপ্রিয় হলেও পর্দার আড়ালে আত্মগোপন করে থাকতেন তিনি৷ তাঁর দেখা প্রায় ৪০ জন বিশিষ্ট মানুষকে তিনি উপস্থাপিত করেছিলেন৷ সেই রচনাগুলি জড়ো করে তুলে দিয়েছিলেন পরবর্তী প্রজন্মের পাঠকের হাতে৷ গদ্যের অনন্যতা ও বিষয়ের বৈচিত্র্য ‘কলাম’টিকে বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল৷ শেষজীবনের গদ্যগ্রন্থগুলির মধ্যে আরও একটি উজ্জ্বল সংকলন ‘সাহিত্যের সাজঘর’৷ সাজঘরের সাহিত্য নয়, সাহিত্যের সাজঘর৷ শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গে সারাজীবনে ছোটো-বড়ো নানা ধরনের গদ্য তিনি লিখেছিলেন৷ অধিকাংশ সময়েই সম্পাদকের তাড়নায়, কখনো-বা নিজের তৎপরতায়৷ সেইসব রচনাও অবহেলার যোগ্য নয়৷ স্পষ্টতই তাদের দু-মলাটের অন্তরালে বিধৃত করার প্রয়োজন ছিল৷ দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা, অধ্যয়ন, মত বিনিময়জাত ভাবনাচিন্তার প্রতিফলন সেখানে লক্ষ করা যায়৷ তাঁর অভিমত এবং প্রকাশভঙ্গি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ৷ কটু মন্তব্য না করেও যে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ ও সমালোচনা করা যায়, তার দৃষ্টান্ত হিসাবে এই রচনাগুলির বিশেষ গুরুত্ব আছে৷ অজস্র গদ্য তিনি লিখেছেন, স্বল্প পরিসরে তার বিচারবিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন সম্ভব না, স্বতন্ত্র নিবন্ধ প্রয়োজন৷
৪.
কবি কৃষ্ণ ধর প্রথমেই উল্লেখ করা সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন যে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর খবর শুনে কিশোর বয়সে তিনি লিখেছিলেন তাঁর প্রথম কবিতা৷ কী লিখেছিলেন তা আর মনে করতে পারেননি, তবে প্রচণ্ড বিষণ্ণ ও ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিলেন তা শেষজীবনেও স্মরণ করতে পারতেন৷ সারা জীবন সময়কে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন তিনি৷ উত্তাল চল্লিশের আন্দোলন-সংগ্রাম, ফ্যাসিবিরোধী সংগ্রাম, দুর্ভিক্ষ ও মানুষের সংগ্রাম, দেশভাগ, দাঙ্গা, আইএনএ-র বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম, তেভাগা আন্দোলন ইত্যাদি ঐতিহাসিক ঘটনাবলি তাঁর কবিমানসে গভীর প্রভাব ফেলেছিল৷ চল্লিশের দশক যেন তাঁর কবিমানসের গতিপথ নির্ণয় করে দিয়েছিল৷ তাই এক-একটি দশক পেছনে পড়ে থেকেছে, তিনি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগিয়েছেন৷ তাই ‘ভাঙন দেখেও তাঁর কোনো হতাশার বিষাদ বিভ্রম নেই’৷
পথ চলতে চলতে তিনি অনুভব করেছেন---
‘পথের মাঝখানে পাথর, দুপাশে পাথর’
সেই পাথর সরিয়ে নতুন পথ খুঁজতে খুঁজতে তিনি বলেছেন---
‘জীবন কি শুধু জীবনযাপন
শুধু কবি জানে রহস্য তার’
অনন্য উচ্চারণে বলেছেন--- ‘আমার স্বপ্নের নির্মাণে কোনো পাহারাদার নেই’৷
‘হাঁটব, থামব না’ কবি কৃষ্ণ ধরের পরিণত চেতনা ও উপলব্ধির ফসল৷ মাত্র ৪৮ পৃষ্ঠার এই সংকলনে ৪২টি কবিতা আছে৷ সংকলনের প্রতিটি কবিতায় ঘুরে ঘুরে সমকালের বিপন্নতা, অনুসন্ধান, অন্বয় আর সংগ্রামের রেখাপাত ঘটেছে৷ পরিণত বয়সের কথাও উল্লেখ করেছেন তাঁর কবিতায় বারবার৷ মুখ ও মুখোশের পার্থক্য ধরা যখন শক্ত হয়ে উঠছে, তখন অমল মানুষের সন্ধানী কবি বলছেন---
‘ইতিহাস তাঁকেই খোঁজে, আমি তাঁকে খুঁজি সমকালে
বিমূঢ় কুয়াশা চিরে যদি তার দেখা পাই
আমি খুঁজে তাঁকে স্বদেশে, বিদেশে
জাগতিক প্রচ্ছদে আঁকা অপ্রতিম অমল মানুষ’
(এখনো তাঁকেই খুঁজি)
সচেতন ও সামাজিক কবি তাই উপলব্ধি করতে পারছেন কান্নার শব্দ৷ কান্নার শব্দ বাড়ছে দিনের পর দিন৷ স্বৈরাচার, ব্যাভিচার, অমানবিক নিষ্ঠুরতা অসাম্যের সমাজে অনিবার্যভাবে বাড়বে৷ কবি হাঁটতে হাঁটতে যেন হোঁচট খাচ্ছেন, পথের মাঝখানে পাথর, দুপাশে পাথর অর্থাৎ প্রতিবন্ধকতার নিষ্ঠুর প্রতিরোধ৷ কবি উপলব্ধি করছেন, যারা পথে বেরিয়েছিল দিনের নাগাল পায়নি, অথচ এমন তো হবার কথা ছিল না৷ পাথরের চোখ থাকে না, হৃদয় থাকে না, পাথরের কানও থাকে না৷ কিন্তু যে গাছগুলো ছায়া দিয়েছিল, ঝড় বৃষ্টি থেকে বাঁচিয়েছিল, তারা কান্নার ধ্বনি শুনছে স্তব্ধ হয়ে৷ আর তখনই কবির মনে হচ্ছে---
অন্ধকারে কারা বলছে, আমরা আছি, থাকব
কান্না ছাপিয়ে সেই আশ্বাস বাতাসে ডানা মেলে
স্বপ্নের ঘোরে কারা যেন পাথর সরাতে থাকে
হাতের উত্তাপে পাথরগুলো তখন গলে গলে কান্নার জলে
মিশে আজন্মের নদী হয়ে যায়৷’ (কান্নার শব্দ বাড়ছে)
কবির জীবনবোধ, কাব্যভাবনা ও দার্শনিক উপলব্ধির জটিল প্রকাশ লক্ষ করা যায় তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে৷ একই সঙ্গে আছে তাৎক্ষণিক সময়ের প্রয়োজনে লেখা নানা সময়ের অজস্র কবিতাও৷ অবশ্য এসব কবিতাতেও তাঁর উপলব্ধির গভীর তটরেখা স্পর্শ করার জন্য পাঠকের কবিতা পাঠের পূর্ব অভ্যাস একান্ত প্রয়োজন৷ প্রত্যয়ী কবিও দীর্ঘ পথ চলতে চলতে আত্ম অনুসন্ধান করেছেন বারবার৷ সময়ের শরীরে জমে থাকা নানান ধূসর মলিনতা, সংশয়, ঘৃণা, বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা কবিকে চঞ্চল করেছে, ক্ষোভ-বিক্ষোভে প্রশ্নদীর্ণ হয়ে পড়েছেন তিনি৷ অনেক কবিতায় এর প্রতিফলন ঘটেছে৷ প্রকৃতি, সময়ও মানুষের মিলন এবং সংঘর্ষে এক অনন্য জটিল অথচ মুক্তর মতো স্বচ্ছ কবিতার পঙ্ক্তি উঠে এসেছে নানা কবিতায় নানান বিভঙ্গে৷ এইসব পঙ্ক্তি স্মৃতিধার্য হয়ে উঠতে পারে, কবিতা প্রেমিকদের কণ্ঠে উচ্চারিত পুনরুচ্চারিত হতে পারে৷ কবি কৃষ্ণ ধরের সমগ্র কবিজীবনের উপলব্ধির মূল নির্যাস কী? দ্বিধাহীনভাবে বলা যায় সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি দিয়েছেন ছোট্ট দুটি শব্দে---হাঁটব, থামব না৷
দৃঢ় প্রত্যয়ে হেঁটে চলা মানুষটিকেও প্রকৃতির নিয়মে পরিণত বয়সে চিরদিনের জন্য থেমে যেতে হল৷ ৯৪ বছরের অবিরাম পথচলা শেষ হয়ে গেল ১২ অক্টোবর গোধূলিবেলায় এক সাধারণ নার্সিংহোমের আইসিইউ-তে৷ দৃঢ় দৃপ্ত বিভঙ্গে শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে কবিতার নির্মাণশিল্পে নিমগ্ন এক সৈনিক কৃষ্ণ ধর কবিতার খাঁজে খাঁজে তাঁর অঙ্গীকার আর মানবজাতির অপরাজেয় সংগ্রামের চেতনা প্রথিত রেখেছিলেন৷ যৌবনের উচ্ছ্বাস অনেক সংযত ও সংহত হয়ে এসেছিল শেষজীবনে৷ দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার বহুবর্ণের বিচ্ছুরণে বারবার শানিত করেছেন নিজের চেতনাকে৷ কলকারখানায় খেতখামারে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রতিনিয়ত জীবনযাপনের অভিঘাতে শিল্পের আশ্চর্য জাদুদণ্ড স্পর্শ করেছেন, মানবসমাজের বিজয়ের রথ এগিয়ে নিয়ে চলেছেন তাঁদের শিল্প চিনে নিতে ভুল করেননি তিনি---
‘তাকেই তো বলব শিল্পী, শুধু তুলি বা কলমে নয়
ক্ষেত ও খামারে, বিশ্বকর্মার কারখানায়,
দুরন্ত বর্ষার নদীস্রোতে
উজানি নৌকায়, পাথর খাদানে সর্বত্রই তাঁর গতি৷’
৫.
‘এখনো তাঁকেই খুঁজি’তে কবিতাই যে উপলব্ধির প্রতিফলন ঘটেছিল তারই আরও বর্ণময় রূপ আমরা পেয়ে যাই ‘ইচ্ছাপত্র’ শিরোনামের আশ্চর্য কবিতায়৷ সময় সচেতন কবি, আশি বছর এই পৃথিবীতে বসবাস করার পর, তাঁর ইচ্ছাপত্র বা উইল ছন্দে গেঁথে লিপিবদ্ধ করে রাখার মধ্যে কোনো নতুনত্ব বা বিস্ময় ছিল না, কিন্তু তাঁর চেতনা ও বিশ্বাসের ভূমি আমাদের রণপায়ে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জোগায়৷ প্রত্যয়ী কলমে কবি বলছেন---
শোক নয়, এ দেহকে নতুন সজ্জায় ঢেকে
দিয়ে এসো শুশ্রূষার কাজে, সে তাই চেয়েছে
কান্না দিয়ে ভিজিয়ো না তাকে
দুয়ার পেরোতে দাও, আকাশ দেখুক তাকে
পৃথিবীকে ভালোবেসে পৃথিবীর নিরাময় চেয়ে
রেখে যাব নিজের শরীর
১২ অক্টোবর ২০২২ সন্ধ্যায় কবির শরীর থেকে কবিরই শেষ ইচ্ছাপত্র-র নির্দেশে জনস্বার্থে ব্যবহারের জন্য চোখের কর্নিয়া তুলে নেওয়া হয়েছিল৷ পরের দিন অর্থাৎ ১৩ অক্টোবর সকালে তাঁর প্রিয় বাসভূমি সুরেন্দ্রনাথ সমবায় আবাসনে নিয়ে আসা হল৷ আবাসন থেকে শেষবারের মতো বের হলেন বেলা সাড়ে এগারোটায়৷ তখন কয়েকজন সাহিত্য-সংস্কৃতিজগতের সহযাত্রী ও আত্মীয়পরিজন শেষ বিদায় জানাতে এসেছিলেন৷ তাঁরা শেষ বিদায় জানালেন, মন্থর গতিতে শববাহী যান এগিয়ে গেল ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে যেখানে কবির শেষ ইচ্ছা অনুসরণ করে কবির মরদেহ তুলে দেওয়া হল চিকিৎসাবিজ্ঞানের কাজে ব্যবহার করার জন্য৷ শেষযাত্রার সেই সংক্ষিপ্ত পদচারণার সময় মনের মধ্যে গুনগুন করে ধ্বনিত হচ্ছিল---
দুয়ার পেরোতে দাও, আকাশ দেখুক তাকে
পৃথিবীকে ভালবেসে পৃথিবীর নিরাময় চেয়ে
রেখে যাব নিজের শরীর৷
প্রকাশের তারিখ: ১১-নভেম্বর-২০২২
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
