সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সোশাল মিডিয়া ও ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ
সুচিক্কণ দাস
বলিভিয়ার কথাই ধরা যাক। বলিভিয়ায় এখন ক্ষমতায় রয়েছে ইভো মোরালেসের দল বামপন্থী মুভমেন্ট টুয়ার্ডস সোশালিজম দল (এমএএস)। সেদেশের স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমের খবর, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ১০৪১টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ৪৫০টি পেজ, ১৪টি গ্রুপ এবং ১৩০টি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টকে পুরোপুরি মুছে দেওয়া হয়েছে সেদেশের মিডিয়া থেকে। এইসব অ্যাকাউন্টগুলি ছিল সরকারে ক্ষমতাসীন মুভমেন্ট টুয়ার্ডস সোশালিজম (MAS-IPSP)-এর সমর্থকদের। নিষিদ্ধ করে দেওয়া কোনও অ্যাকাউন্টকেই আর ফেরানো হয়নি। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল, ‘কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেন্টিক বিহেভিয়ার’ বা ‘সমন্বিত এলোমেলো ব্যবহার’। যদিও এই অভিযোগের অর্থ কী এবং কারা এসবের মানদণ্ড ঠিক করে দিল, সেবিষয়ে কোনও ব্যাখ্যাই দেয়নি সেদেশের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম কর্তৃপক্ষ।

১। সোশাল মিডিয়া ও ‘ভুয়ো দুনিয়া’ নির্মাণ
ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম— একদা এইসব নতুন প্রযুক্তির মিডিয়াগুলো (সোশাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যম) এসেছিল মতপ্রকাশের একটা মাধ্যম হিসাবে। এর পিছনে ছিল নতুন ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার। পুঁজি তার মুনাফার স্বার্থেই জনপ্রিয় করে তুলতে চেয়েছিল ডিজিটাল প্রযুক্তি-নির্ভর এই সব গণমাধ্যমকে। এবং সেই উদ্দেশ্য সফলও হয়েছিল। কিন্তু নয়া উদারবাদী জমানার পুঁজি, পুঁজিবাদের গোড়ার যুগের সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষাকারী বুর্জোয়া গণতন্ত্রকে সেবা করে না। সেবা করে নয়া উদারবাদী পুঁজিকে, রাজনৈতিক ভাবে যা চরিত্রের দিক থেকে একচেটিয়া, ক্রোনি, লুঠেরা, আধিপত্যকারী এবং প্রতিষ্ঠিত বিধিবিধান অগ্রাহ্যকারী। সেই একই বৈশিষ্ট্য বহন করে নয়া উদারবাদী মিডিয়া, যার মধ্যে পড়ে সোশাল মিডিয়াও। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক যেসব ইস্যুগুলি জনজীবনের ভালমন্দের জন্য চর্চা করা জরুরি, সেটা হতে না দেওয়াই নয়া উদারবাদী মিডিয়ার লক্ষ্য। যেমন ভারতে মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারি ইত্যাদি ইস্যুগুলিকে পাশ কাটিয়ে অধিকাংশ মূলস্রোতের মিডিয়া জাতপাত, ধর্মীয় বিভাজন, ক্রিকেট কিংবা বিনোদনের দিকে সাধারণ মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতে ব্যস্ত। এমনকী, নয়া উদারবাদী পুঁজির কেন্দ্র আমেরিকাতেও তেমনই ঘটে। তাই আমেরিকায় দুটো বিশালকায় ব্যাঙ্কে লালবাতি জ্বললেও এবং বহু আমানতকারীর ক্ষতি হলেও সেই খবর চলে যায় ইউক্রেন যুদ্ধের অনেক পরে। যেন ব্যাঙ্কে লালবাতি জ্বললেও এবং তা নয়া উদারবাদী পুঁজির সঙ্কট প্রমাণ করলেও, সেটা কোনও খবরই নয়। ইউক্রেনে ‘রাশিয়া হারল’ কিনা সেটাই বড় ব্যাপার। এক কথায়, যতদিন যাচ্ছে এবং নয়া উদারবাদী পুঁজির সঙ্কট যত সামনে আসছে, ততই সেগুলো দৃষ্টির আড়ালে রেখে অন্য এক ভিন্ন দুনিয়ার ছবি নির্মাণে ব্যস্ত নয়া উদারবাদী মিডিয়া থেকে শুরু করে সোশাল মিডিয়া, সকলেই।
২। সোশাল মিডিয়া যখন ফ্যাসিবাদের হাতিয়ার
আধুনিক প্রযুক্তি ভিত্তিক সোশাল মিডিয়ার অন্য দিকটা হল ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ। যত দিন যাচ্ছে ততই একাধিক দেশে, যেখানে ক্ষমতায় রয়েছে গণতান্ত্রিক বা সমাজবাদী শক্তি, সেখানে খোলাখুলি দক্ষিণপন্থী ও ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলিকে মদত দিচ্ছে সোশাল মিডিয়া। এসব দেশে নির্বাচিত, প্রগতিশীল সরকারগুলিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সপক্ষে জনমত গড়ে তুলছে সোশাল মিডিয়া। এমনকী অভ্যুত্থানেও মদত দিচ্ছে। ইদানীং বেশ কিছু দেশে এই প্রয়াস চালানো হচ্ছে একেবারে খোলাখুলি।
বলিভিয়ার কথাই ধরা যাক। বলিভিয়ায় এখন ক্ষমতায় রয়েছে ইভো মোরালেসের দল বামপন্থী মুভমেন্ট টুয়ার্ডস সোশালিজম দল (এমএএস)। সেদেশের স্থানীয় একটি সংবাদমাধ্যমের খবর, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ১০৪১টি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ৪৫০টি পেজ, ১৪টি গ্রুপ এবং ১৩০টি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টকে পুরোপুরি মুছে দেওয়া হয়েছে সেদেশের মিডিয়া থেকে। এইসব অ্যাকাউন্টগুলি ছিল সরকারে ক্ষমতাসীন মুভমেন্ট টুয়ার্ডস সোশালিজম (MAS-IPSP)-এর সমর্থকদের। নিষিদ্ধ করে দেওয়া কোনও অ্যাকাউন্টকেই আর ফেরানো হয়নি। এদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হল, ‘কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেন্টিক বিহেভিয়ার’ বা ‘সমন্বিত এলোমেলো ব্যবহার’। যদিও এই অভিযোগের অর্থ কী এবং কারা এসবের মানদণ্ড ঠিক করে দিল, সেবিষয়ে কোনও ব্যাখ্যাই দেয়নি সেদেশের ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম কর্তৃপক্ষ। সংবাদমাধ্যমের যে প্রতিবেদনে এই খবরটি প্রকাশিত হয়েছে সেটি লিখেছেন বলিভিয়ারই সাংবাদিক অস্কার অ্যালফ্রো। তিনি দেখিয়েছেন, ‘কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেন্টিক বিহেভিয়ার’ এমন একটা ধারণা, যাকে চিহ্নিত করা হয় সুবিধামতো ব্যবহার করা যায় এমন অ্যালগরিদমের সাহায্যে। এরকম মেঠো গোছের অ্যালগরিদমের সাহায্যে কোনও গোষ্ঠীর সামাজিক কিংবা অন্যান্য মনোভাব বিচার করা বেশ কঠিন। অথচ মুভমেন্ট টুয়ার্ডস সোশালিজম-এর পক্ষের গোষ্ঠীগুলিকে নিষিদ্ধ করার কাজে সেই গোলমেলে অ্যালগরিদিমকেই কাজে লাগানো হয়েছে।
আসলে বলিভিয়ায় মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমগুলি নিয়ন্ত্রণ করে দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীগুলি। ফলে জাতীয় সংবাদমাধ্যমের বিকল্প হিসাবে বামপন্থীরা সোশাল মিডিয়াকেই তাদের হাতিয়ার হিসাবে কাজ লাগানোর পরিকল্পনা করেছিলেন। তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ করতে বিরোধীপক্ষকে সাহায্য করার যুক্তিতে মেটার ফেসবুক হাত শক্ত করছে ‘মেম্বারস অফ অপোজিশন’-এর। যেন সর্বত্র বিরোধীদের স্বার্থ দেখাটাই ফেসবুকের কাজ। আসলে মুভমেন্ট টুয়ার্ডস সোশালিজম-এর বিরোধী দক্ষিণপন্থীদের মদত দেওয়াটাই মেটার আসল লক্ষ্য যাতে তারা খোলাখুলি সরকার বিরোধী ঘৃণা-ভাষণ ছড়াতে পারে এবং জাতিগত বৈষম্যের মনোভাবে উস্কানি দিতে পারে। ২০২০ সালে এই ‘মেম্বারস অফ অপোজিশন’ গোষ্ঠীই বলিভিয়ায় অভ্যুত্থানে মদত দিয়েছিল। এবং চরম দক্ষিণপন্থী জেনিন আনেজকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের পদে বসিয়েছিল। মেটা এখন তাদের মদত দেয় এসব কথা জেনেই।
বলিভিয়ায় আনেজের শাসনকালটা ছিল পুরোপুরি ফ্যাসিস্ত জমানা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে বহু নাৎসি নেতা জার্মানি থেকে পালিয়ে এসে বলিভিয়ায় আশ্রয় নেয়। তারাই এদেশে, বিশেষ করে বলিভিয়ার পূর্ব দিকের এলাকাগুলিতে, নাৎসি মতবাদের বীজ বুনেছিল। এখন যারা বলিভিয়ার রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ এবং মতামতের দিক থেকে চরম দক্ষিণপন্থী, ওই এলাকাগুলিই এখন তাদের ঘাঁটি। আনেজের আমলে এদেরই নেতৃত্বে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা ঘটেছে।
যেমন সাকাবা গণহত্যার ঘটনা। ইভো মোরালেসকে অগণতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতাচ্যুত করে আনেজকে ক্ষমতায় বসানোর প্রতিবাদে যখন ইভোর সমর্থকেরা বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন, তখন পুলিশ ও সেনা তাদের ওপর এলোপাথাড়ি গুলি চালালে ১১ জন নিহত ও ৯৮ জন আহত হন। একইভাবে আনেজের বাহিনী ঘটিয়েছিল সেনকাটা গণহত্যা, যেখানে গুলিতে আরও ১১ জন নিহত হয় ও ৮০ জন আহত হন। এরপর গুলিতে নিহতদের দেহ নিয়ে যখন মিছিল হয় তখন রাজধানী লা পাজ শহরে মিছিলকারীদের ওপর হামলা করে সরকারি বাহিনী। এবং আন্দিজ এলাকার ভূমিপুত্রদের পতাকা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ‘৪০৭৮ ডিক্রি’ এমনভাবে জারি করেছিল শাসক আনেজ যে তাতে সশস্ত্র পুলিশকে গুলি করে মারার ক্ষমতা দেওয়া হয়। এটা এতটাই ন্যক্কারজনক নির্দেশ ছিল যে তার নিন্দা করতে বাধ্য হয় অ্যামেনস্টি ইন্টারন্যাশনালও। ওই ডিক্রি অনুযায়ী সেনাবাহিনীকে কোনও জবাবদিহি করতে হত না।
এর আগে যখন বলিভিয়ার সংসদের নিম্নকক্ষের প্রেসিডেন্টের পদ থেকে যখন এমএএস-এর প্রতিনিধি ভিক্টর বোরডা ইস্তফা দিতে বাধ্য হন, তখন দক্ষিণপন্থীরা তাঁর ভাইয়ের ওপর নির্যাতন চালিয়ে বোরডাদের পারিবারিক বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। বোঝাই যাচ্ছে, বিরোধীপক্ষের হয়ে দাঁড়ানোর অজুহাতে মেটা বলিভিয়ায় চরম দক্ষিণপন্থী শক্তিকে সরাসরি মদত দিচ্ছে। সাংবাদিক অস্কার অ্যালফ্রো জানিয়েছেন, মেম্বারস অফ দ্য অপোজিশন গোষ্ঠী এখনও হামলা ও বিদ্রোহে মদত দিয়ে চলেছে। আর তাদের প্রকাশ্যেই মদত দিচ্ছে মেটা। অথচ তথাকথিত ইনঅথেন্টিক বিহেভিয়ার–এর যুক্তি দেখিয়ে সোশাল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে দিচ্ছে না ক্ষমতাসীন ‘অলটারনেট ফর সোশালিজম’-এর সমর্থকদের। তার চেয়েও বড় কথা, বলিভিয়াসহ একাধিক দেশে ফেসবুক ইংরেজি ছাড়া অন্য বিদেশি ভাষায় ভুয়ো খবর অনায়াসে প্রচারের জন্য এখন কুখ্যাত হয়ে উঠেছে। কারণ তাদের নাকি বিদেশি ভাষায় প্রচারিত সেই সব ভুয়ো খবর পরীক্ষা করে দেখার মতো কর্মী নেই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও কাজ করছে না।
একসময় মেটার মতো ডিজিটাল মঞ্চকে ভালরকম কাজে লাগানো সম্ভব হয়েছিল ফ্যাসিস্ত আনেজের শাসনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে। এর জেরেই আনেজকে ভোটে হারিয়ে ক্ষমতায় আসেন এমএএস-এর সদস্য লুই আর্সে। আরে এখন আর্সের বিরুদ্ধে লোককে খেপিয়ে তোলার কাজে ‘মেম্বারস অফ অপোজিশন’কে সোশাল মিডিয়ায় সুযোগ করে দিচ্ছে মেটা। আর এমএএস সমর্থকদের প্রচারের অ্যাকাউন্টগুলিকে ছেঁদো যুক্তিতে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে জনমতকে প্রভাবিত করার সুযোগ পাচ্ছে দক্ষিণপন্থীরা মেটা কর্তৃপক্ষের সরাসরি মদতে। এভাবে ফ্যাসিস্ত শক্তিকে মদত দিয়ে মেটা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে বলিভিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। একে ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ ছাড়া কী ই বা বলা যাবে।
বলিভিয়ার সাংবাদিকদের অভিযোগ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস অ্যাপ এখন সোশাল মিডিয়ায় এমএএস-এর প্রচারের কণ্ঠরুদ্ধ করে এগিয়ে রেখেছে চরম দক্ষিণপন্থীদের। এবং এভাবে ফের ফ্যাসিস্তপন্থীদের অভ্যুত্থানের জমি তৈরিতে সাহায্য করছে। অথচ গণহত্যার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আনেজ ও তার সঙ্গীরা এখন জেলে। যাদের হাত লাল গণহত্যার রক্তে, বলিভিয়ায় তাদেরই পক্ষ নিয়েছে মেটা।
৩। মেটা ও বোলসোনারোর ব্রাজিল
বলিভিয়াই একমাত্র উদাহরণ নয়। ২০২১ সালে নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ের পর, সেবছর ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে যে দাঙ্গা হয়েছিল সেখানে লোক জড়ো করার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল ফেসবুক ও হোয়াটস অ্যাপকে। যদিও সেই অপরাধে এখনও পর্যন্ত কারও শাস্তি হয়নি।
ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম ভুয়ো খবর ছড়াতে কতটা দক্ষ তার প্রমাণ ব্রাজিল। ২০১৮ সালে ফেসবুক ব্যবহার করে যে ব্যাপক ভুয়ো প্রচার চালানো হয়েছিল ব্রাজিলে, তার জেরেই ভোটে জিতে ক্ষমতায় বসতে পেরেছিলেন জাইর বোলসোনারো। এবং এবার নির্বাচনে জিতে লুলা ক্ষমতায় আসার পরও, একই কীর্তি চালিয়ে যাচ্ছে মেটা। এবার নির্বাচনের আগেও লুলার বিরুদ্ধে একই ধরনের ভুয়ো প্রচার চালিয়েছিল ফেসবুক।
২০১৭ সালের কথাই ধরা যাক। সেবার আইন করে সোশাল মিডিয়ায় নির্বাচনী প্রচারে জোর দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু সোশাল মিডিয়ায় ঘৃণা ভাষণ বন্ধ করা ও ভুয়ো খবর বাদ দেওয়ার প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিলেন ব্রাজিলের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মাইকেল তেমার। মানেটা স্পষ্ট। ভোটের প্রচার চলবে, কিন্তু ঘৃণা ভাষণ ও ভুয়ো খবর বন্ধ করা যাবে না। দক্ষিণপন্থীরা এর চেয়ে ভাল কী আর চাইতে পারে! ফলে ২০১৮-র নির্বাচনের সময় ব্রাজিলে অনলাইনে ভুয়ো প্রচার চলল পুরোদমে। ফেসবুকের একজন প্রাক্তন ডেটা বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, নয় নয় করেও ব্রাজিল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বোলসোনারো ও ট্রাম্পের হয়ে করা প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ ভুয়ো প্রচার বাদ দিতে হয়েছিল। এটা শুধু ফেসবুকের হিসাব। এতে টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস অ্যাপের হিসাব ধরা হয়নি।
২০১৮ সালে ব্রাজিলে প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দেখা গেল, ফেসবুক থেকে লক্ষ লক্ষ ফোন নম্বর যোগাড় করে বোলসোনারোর হয়ে ভোট প্রচার চালিয়েছেন এক শাঁসালো ব্যবসায়ী। আর একইসঙ্গে তিনি ভুয়ো প্রচার চালিয়েছেন হোয়াটসঅ্যাপে। এই সব ভুয়ো প্রচার দেখেছিলেন ৭৪ শতাংশ ভোটদাতা। যারা দেখেছিলেন তাঁদের ৫৬ শতাংশ এই সব প্রচারে বিশ্বাস করেছিলেন। মানে তাঁরা এসবে বিশ্বাস করে সেবার বাম প্রার্থীকে ভোট দেননি। ফলে বোলসোনারোর জয়ের পথ সুগম হয়। কী ছিল সেই সব ভুয়ো প্রচারে? বলা হয়েছিল, ছেলেমেয়েদের সমকামিতা শিক্ষা দিতে বোলসোনারোর বিরোধীপক্ষ স্কুলে স্কুলে ‘গে কিট’ পাঠাচ্ছে। সমীক্ষায় এটাও দেখা গেছে, বোলসোনারোর ৯৬ শতাংশ সমর্থক সেবার বিশ্বাস করেছিলেন যে, ভোটে রিগিং হয়েছে। ভোটের সময় হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো মেসেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে দক্ষিণপন্থীরা বামপন্থীদের ১৪ গুণ বেশি মেসেজ পাঠিয়েছিল এবং সেগুলির অধিকাংশই ছিল ভুয়ো বার্তা।
মেটা ভু্য়ো খবরে কতটা নজর দেয়, তা পরীক্ষা করার জন্য মানবাধিকার সংগঠন গ্লোবাল উইটনেস ব্রাজিলে নির্বাচনের আগে ফেসবুকে ১০টি বিজ্ঞাপন দেয়। তার পাঁচটিতে ছিল নির্বাচন নিয়ে ভুয়ো তথ্য। বাকি পাঁচটা খবর ছিল নির্বাচন পদ্ধতিকেই বেআইনি ঘোষণা করার দাবিতে। ফেসবুক পরীক্ষা না করে ১০টা বিজ্ঞাপনই প্রকাশ করে দিয়েছিল। ব্রাজিলে নিয়ম রয়েছে সরকার নির্দিষ্ট সময়সীমার আগে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে কোনও নির্বাচনী বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না। কিন্তু নির্বাচন কমিশন স্বীকৃত দলীয় প্রচারগোষ্ঠীর বাইরে বেসরকারি উদ্যোগে প্রচার শুরু করে দিতে কোনও বাধা নেই। দেখা গেছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বোলসোনারোর সমর্থক গোষ্ঠী বেসরকারিভাবে যত বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, তা ছিল লুলার সমর্থকদের চেয়ে ১৬ গুণ। এমনকি কোভিড মোকাবিলায় ব্যর্থতার দায় ঢাকতে বোসলোনারোর দল প্রচার করতে চেয়েছিলেন যে, কোভিডের টিকা নিলেই এডস হবে। পরে দেশের সুপ্রিম কোর্টের কড়া মনোভাবের ফলে ফেসবুক এবং ইউটিউব থেকে এই ভিডিও সরিয়ে নেওয়া হয়।
মেটার নীতি বদল না হওয়া পর্যন্ত এসব কাণ্ডকারখানা চলবে। সেকারণে ব্রাজিলের ৯০টি সিভিল সোসাইটি সংগঠন চাইছে এমন আইন জারি করতে যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অক্ষুন্ন রেখেই সোশাল মিডিয়া ভুয়ো এবং বিকৃত খবর আটকানো যায়। ফেসবুক এধরনের ভুয়ো ও বিকৃত খবর প্রচার করে নিজেদের মুনাফার স্বার্থেও। একটা কনটেন্টের যত বেশি প্রচার, তত মুনাফা। অতএব ভুল-ঠিক বিচারের দরকার কী, এমনটাই মেটার অবস্থান। আর সেই অবস্থানের দৌলতেই দেদার সমর্থন করা যায় দক্ষিণপন্থীদের। তাদের হয়ে প্রচারেও মুনাফা। আবার তারা ক্ষমতায় এলেও মুনাফা। এভাবে মুনাফার সন্ধান মিলিয়ে দেয় দক্ষিণপন্থী রাজনীতি আর সোশাল মিডিয়ার মালিক পুঁজিপতিদের। গড়ে ওঠে ক্রোনি পুঁজি ও দক্ষিণপন্থীদের এক নতুন ধরনের জোট যা সত্যকে আড়াল করে ক্রমাগত মিথ্যার নির্মাণ করে যায়। সেকারণে ফেসবুকের প্রাক্তন কর্তা ইয়েল এইজেনস্ট্যাট মন্তব্য করেছিলেন, মিথ্যা বেচেই আংশিক লাভ হয় ফেসবুকের। তারা এমন বিপজ্জনক হাতিয়ার বিক্রি করে যাতে তথ্য যুদ্ধকে নতুন একটা স্তরে পৌঁছে দেওয়া যায়।
৪। বার্মায় ঘৃণা ও ভুয়ো খবরের ব্যবসা
বার্মার কথাও ধরা যেতে পারে। অ্যামেনস্টি ইন্টারন্যাশনালের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাগ্নেস ক্যালামার্ড জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে বার্মায় রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে খুন করা হয়, নির্যাতন ও ধর্ষণ করা হয়, এবং হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে বার্মা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। এই সব ঘটনার কয়েক মাস আগে থেকেই ফেসবুকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উসকে দিয়ে লাগাতার প্রচার চালানো হয়। এর ফলেই রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা নেমে আসে। অ্যাগ্নেসের কথায়, যখন সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে, তখন ঘৃণা ভাষণ ও ভুয়ো খবর প্রচার করে উস্কানি দিয়ে কোটি কোটি ডলার মুনাফা করেছে মেটা। এটাকে এ্যাগ্নেস বলেছেন, ‘হেট-স্পাইরালিং অ্যালগরিম’। ২১ বছরের রোহিঙ্গা শরণার্থী সৈদুল্লাহ বলেন, ‘ফেসবুকে আমি ভয়ঙ্কর সব জিনিস দেখেছি। ভাবতাম, খারাপ লোকেরা এসব লিখেছে। পরে আমি বুঝলাম, যারা এসব লিখেছে তারাই শুধু নয়, ফেসবুক নিজেও এই ষড়যন্ত্রে জড়িত। এই সব অবাধে প্রচার করতে দিয়ে ফেসবুক ওদের সাহায্য করছে।’
মেটা তখনই মুনাফা করে যখন অনেক বেশি বেশি লোক অনেকক্ষণ ধরে ফেসবুকে থাকে। সেটা সম্ভব কৌশলে ঘৃণা ও মিথ্যা প্রচার করতে পারলে। ফলে ঘৃণা ভাষণ ও বিদ্বেষ ছড়ানোটা মেটার ব্যবসানীতির একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কারণ এসব খবরেই অনেক বেশি লোককে অনেক বেশি সময় ফেসবুকে ধরে রাখা যায়। একইসঙ্গে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ নজর রাখে যাতে দ্রুত এই ধরনের খবরগুলো ছড়াতে থাকে। এটাই হল ফেবুকের নজরদারি ভিত্তিক বিজনেস মডেল। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, বার্মায় একটি পোস্টে একজন মুসলিম মানবাধিকার কর্মীকে জাতীয় বিশ্বাসঘাতক হিসাবে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়েছিল। সেই পোস্ট শেয়ার হয়েছিল ১ হাজার বার। এরপরেই কমেন্ট আসতে শুরু করে, এই সব কুকুরদের গুলি করে মারা উচিত। বুঝতেই পারা যাচ্ছে কত সহজে একজন মানবাধিকার কর্মীকে দেশদ্রোহী সাজিয়ে দিতে পারে ফেসবুক। বার্মার সেনা বাহিনীর সিনিয়র জেনারেল মিন আউঙ হ্লাইং ২০১৭ সালে ফেসবুকে যে পোস্ট করেছিলেন তাতে লেখা ছিল, ‘আমরা খোলাখুলি জানিয়ে দিচ্ছি যে আমাদের দেশে রোহিঙ্গা বলে কোনও জনগোষ্ঠী নেই।’ এই ভদ্রলোকই ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশের ক্ষমতা দখল করেছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন মায়ানমার সম্পর্কে যে সিদ্ধান্তে গিয়ে পৌঁছেছে তা হল, সেদেশে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অত্যাচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে সোশাল মিডিয়া এবং ফেসবুকই।
নির্বাচনের আগে-পরে এদেশেও মেটা কীভাবে বিজেপিকে তুলে ধরে তার নজিরও আমাদের দেখা আছে।
এক কথায় বললে, ফেসবুকে যত লোক যত বেশি সময় থাকবে ততই ফেসবুকের মুনাফা বাড়বে। সুতরাং, যত ঘৃণা ভাষণ বাড়বে, যত ভু্য়ো খবরে উত্তেজনা ছড়াবে, যত বেশি তিক্ততা ও বৈষম্য তৈরি হবে, ততই লোকে ফেসবুকে হামলে পড়বে। আর ফেসবুকের লাভ ততই বাড়বে। ঘৃণা ও মিথ্যাকে পুঁজি করে মুনাফা কামানো— এটা ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা ইনস্টাগ্রামের মতো কেউ পারে না।
৫। ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ
বলিভিয়া, ব্রাজিল কিংবা বার্মায় আমরা নানা ভূমিকায় ফেসবুককে দেখলাম। ট্রাম্পের হয়েও অভ্যুত্থান সংগঠিত করতে দেখা গেছে মেটাকে। আরও অনেকভাবে মেটাকে দেখা যাচ্ছে কখনও ইউক্রেনে, কখনও জর্জিয়ায়, কখনও বা ইয়েমেনে। একেক দেশে একেক রকম কৌশল নিয়ে দক্ষিণপন্থী, ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলিকে মদত দেয় মেটা। মদত দেয় অত্যাচারে। মদত দেয় অভ্যুত্থানে। মদত দেয় ফ্যাসিবাদী শক্তিকে। সোশাল মিডিয়া ততক্ষণই সোশাল, যতক্ষণ হিংসা ও ঘৃণার প্রচার ছাড়াই তার মুনাফা সুনিশ্চিত হয়। আবার মুনাফা বাড়িয়ে নিতে যখন-তখন সরাসরি ফ্যাসিবাদী ও দক্ষিণপন্থীদের হয়ে প্রচারে নেমে পড়তে পারে মেটা। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ তখন সন্ত্রাস, ঘৃণা ভাষণ ও ভু্য়ো খবর প্রচারের হাতিয়ার। মেটা তখন আসলে ডিজিটাল ফ্যাসিবাদের প্রতীক, যা তাকে দেয় বিপুল মুনাফা। তাই শ্রেণি নিরপেক্ষ ডিজিটাল প্রযুক্তির ধারণা একটা বায়বীয় বিষয় যা যে কোনও মুহূর্তে মিলিয়ে যেতে বাধ্য।
প্রকাশের তারিখ: ১৭-মার্চ-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
