Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ভারত কি হিন্দু রাষ্ট্রের কিনারায়? (দ্বিতীয় পর্ব)

সৌমিত্র বসু
আরএসএস চায় সারা দেশে একটি অভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ও একটি মাত্র সরকারি ভাষা। বিজেপি সরকারের মাধ্যমে হিন্দি ভাষাকে তারা সেই স্তরে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই কারণেই আজকে আমাদের চিন্তা-চেতনার ওপর আঘাত নেমে আসছে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে পুরাণকে ইতিহাস বলে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করা হচ্ছে। দর্শনেরও বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে- বস্তুবাদী দর্শনের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বলা হচ্ছে ধর্মতত্ত্বই একমাত্র দর্শন। আধুনিক বিজ্ঞানকে পৌরাণিক যুগের দান বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
Is India on the brink of a Hindu state Part II

প্রথম পর্বের পরে... 

প্রাচীন ভারত ও ভারতীয় আর্য সম্পর্কিত

প্রথমত, ভারতীয় আর্যরা যে এই দেশের প্রাচীনতম সুসভ্য জনগোষ্ঠী এর কোনও প্রামাণ্য তথ্য এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আরএসএস প্রচার করে আমাদের দেশের সুপ্রাচীন সভ্যতা হল বৈদিক সভ্যতা এবং সেই সভ্যতার ধারক ও বাহক হল আর্যরা, যারা এই দেশেরই প্রাচীন অধিবাসী। এর বিরুদ্ধ মতামতও আছে। সমাজ সংস্কারক 'জ্যোতিবা ফুলে'-র মতে, ভারতবর্ষের আসল অধিবাসী বা ভূমিপুত্র ছিল আদিবাসীরা, যারা পরবর্তী সময়ে আর্যদের আগমনের পর ব্রাহ্মণদের দ্বারা পরাজিত হয় ও উৎপীড়িত হয়। জ্যোতিবা ফুলে সংস্কৃত-শিক্ষিত আর্যদের ব্রাহ্মণ বলেছেন। আরএসএসও উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সরাসরি আর্যদের বংশভূত (biological lineal descendents) বলে প্রচার করে। জ্যোতিবা ফুলের মতে সকল আর্যই বহিরাগত। তারা ভূমিপুত্র নয়। এক্ষেত্রে জ্যোতিবা ফুলের এই মতবাদ নিম্নবর্গীয় বর্ণের দলিতদের পক্ষে ও উচ্চবর্ণের বিপক্ষে অর্থাৎ জাত-পাত (Caste) ভিত্তিক। সেরকম আরএসএস এর মতবাদ এক্ষেত্রে জাতি ও ধর্ম কেন্দ্রিক।

কিন্তু, এছাড়াও প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদদের কাছে যা প্রামাণ্য তথ্য আছে তাতে দেখা যায় যে বেদের মধ্যে যেটা প্রাচীনতম সেই ঋকবেদও খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ সালের বেশি পুরোনো নয়, অন্যদিকে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো অঞ্চলে খননকার্য থেকে যে সভ্যতার হদিশ পাওয়া গেছে, যা এখন সিন্ধু সভ্যতা হিসেবে বেশি পরিচিত, তার বয়সকাল খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০-২৫০০ সালের মতো। সিন্ধু অববাহিকার অন্যান্য অঞ্চলে আরও যেসব সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে, ঐতিহাসিকদের মতে, তার মধ্যে কিছু খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ থেকে ৪০০০ বছরেরও পুরনো। ভারতের আদিম মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় আজ থেকে প্রায় ২ লক্ষ থেকে ৪ লক্ষ বছর, দ্বিতীয় হিমযুগের (Ice Age) সময়কার। কিন্তু ভারতের মানুষ সভ্যতা সৃষ্টি করেছিল আজ থেকে ৫০০০ বছর আগে, প্রধানত এই সিন্ধু নদের উপত্যকায়। তার আগে মানুষের জীবনধারাকে তাদের সংস্কৃতি বলা হতো। অনেক ঐতিহাসিকদের মতে, ঐ সময়কালের অনেক পরে খ্রিষ্টপূর্ব ১৫০০ সাল নাগাদ মধ্য এশিয়া ভুখণ্ডের থেকে একটি জনগোষ্ঠী পারস্যের মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে প্রবেশ করে এবং সেই অঞ্চলে অধিষ্ঠিত হয়। তারাই হল আর্যদের একটি অংশ। পরে তারা দেশের বিভিন্ন অংশে তাদের উপস্থিতি বিস্তার করে। অতএব, ঐতিহাসিক ও প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতামত অনুযায়ী আমাদের দেশের আর্যাগমনের আগেও মুসভা জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল, তাদের দ্রাবিড় বলি, আদিবাসী বলি, যাই বলি না কেন। ভারতীয় আর্যদের মধ্যে যারা বর্ণহিন্দু ছিল তাদের ভাষা ছিল বৈদিক-সংস্কৃত। কিন্তু ভারতবর্ষে প্রাচীনতম ভাষার যে নিদর্শন পাওয়া গেছে, ঐতিহাসিকদের মতে তা হল প্রাচীন দ্রাবিড় ভাষা (যদিও হরপ্পা সভ্যতার লিপিগুলির পাঠোদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি)। সিন্ধু সভ্যতা এটাও প্রমাণ করে যে বৈদিক সভ্যতার সঙ্গে তার প্রভূত পার্থক্য ছিল। প্রধানত, সিন্ধু উপত্যকার সভ্যতা বৈদিক সভ্যতার থেকে প্রাচীন ও অনেক বেশি উন্নত ছিল। সেই সময় গ্রামের অস্তিত্ব থাকলেও একইসাথে এক উন্নত ও সুপরিকল্পিত নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল সিন্ধু উপত্যকায়। মহেঞ্জাদারো ও হরপ্পায় এর নিদর্শন পাওয়া গেছে।

এক ধরনের মতামত ৯০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকে প্রচারিত হতে থাকে (কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিসহ), যে সিন্ধু সভ্যতা হল আর্য Aryan দের সভ্যতা। কিন্তু আমরা যদি এই দুটি সভ্যতার মধ্যে তুলনা করে দেখি তাহলে দেখব দুটি সভ্যতার মধ্যে বিরাট ফারাক রয়েছে। ফারাক রয়েছে সময়ের, জীবনধারার বিশ্বাসের এবং ভাষার প্রকৃতির।

ঋক বেদে ভারতীয় আর্যদের জীবনধারা ও সংস্কৃতি প্রভৃতির নিদর্শন পাওয়া যায়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এই দুই সভ্যতার মধ্যে যে পার্থক্য আছে সেটাও প্রতিফলিত হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইরফান হাবিব তার People's History of India প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্ব ও The Indus Civilization গ্রন্থে The Indus Civilisation and The Rigveda শীর্ষক আলোচনায় বলেছেন 'We shall first consider the question of the reconciability of the Rigveda with what we know of the Indus civilization. Since the Rigveda is pre-eminently a religious text, consistign mainly of hymns to deities, the crucial area of comparison must be the religious one....... What the seals and copper amulets tell us is the Indus deities were mostly zoomorphic, represented by various animals.......... the great Rigvedic deities are, however, practically all anthropomorphic in conception that is, idealized in human or super human forms; and zoomorphism is practically absent"। এছাড়াও ওই আলোচনাতেই এই দুই সভ্যতার মধ্যেই তিনি আরও কয়েকটি পার্থক্য উল্লেখ করে বলেছেন- "Among the Indus clay figurines found in private houses, representation of "Mother Goddess" are particularly numerous. The Rigveda has no female deity that is either as prominent or similarly link to any fertility cult. There is no Rigvedic goddess either, who has the body of a tiger, as on an Indus cylinder seal.

The lack of similarity continues when one considers the ways of disposing the dead. The Indus people buried their dead, and there is no good evidence at all of cremation. The Rigveda, on the other hand, recognizes 'cremation' as the principal method, using the word 'non-cremation' an-agnidagdhah for burial.

ভারতবর্ষের প্রাচীন ভাষা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে স্টিভেন রজার ফিশার তাঁর A History of Language গ্রন্থের Indian Languages অধ্যায়ে বলেছেন “It is generally accepted that Dravidian-with no identifiable cognates among the world's languages- was India's most widely distributed, indigenous language family when Indo-European speakers first intruded from the north-west over 3000 years ago. The highly advanced Indus Valley culture of 4000 years ago may well have ben elaborated, for example by Proto-Dravidians, speakers.”

সুতরাং এটা পরিষ্কার যে, আর্যাগমনের পূর্বে এই অঞ্চলের অধিবাসীবৃন্দের মূল ভাষা ছিল আদি দ্রাবিড়। বৈদিক সভ্যতায় বর্ণহিন্দুদের মূল ভাষা ছিল সংস্কৃত।

মহেঞ্জাদারো ও হরপ্পা অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর আচার-আচারণ, জীবনধারা, জীবিকা, সংস্কৃতি এবং ঋকবেদে উল্লেখিত ভারতীয় আর্যদের জীবিকা, জীবনধারা, আচার-আচরণ ও সংস্কৃতির মধ্যে বিস্তর ফারাক ছিল। ফারাক রয়েছে সময়ের, জীবনধারার, বিশ্বাসের এবং ভাষার প্রকৃতির। সুতরাং, সিন্ধুনদ সংলগ্ন জনপদে থাকার সুবাদে সেখানকার অধিবাসীরা যে নামটির 'হিন্দু' ধারক হয়েছিলেন, সেই নামটিকে সেই জনপদের বিভিন্ন সময়ের অধিষ্ঠিত জনগোষ্ঠীর জীবনশৈলী, সংস্কৃতি, ভাষা ও উপাসনা সংক্রান্ত বিষয়গুলির মধ্যে ভিন্নতা ও পার্থক্যকে অস্বীকার করে অভিন্ন বলে উল্লেখ করার এই সুপ্রাচীন জনপদের এক নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর উত্তরসূরিদের প্রয়াসকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও কর্তৃত্ববাদী বলে ব্যাখ্যা করাটাই যুক্তিযুক্ত। এছাড়া আমরা যদি বর্তমান ভারতের চিত্রটাও দেখি তাহলে সেখানেও তো কত বৈচিত্র, কত ভিন্নতা। উত্তর ভারত, দক্ষিণ ভারত, পূর্ব ভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বসবাসকারীদের মধ্যে ভাষায় ও সংস্কৃতিতে বিরাট পার্থক্য তো রয়েছে, উপাসনার ক্ষেত্রেও বিভিন্নতা রয়েছে অঞ্চলভিত্তিতে।


যদি আমরা ঋকবেদের আর্যদের ভারতবর্ষে আগমনের সময়, তাদের ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়া এবং পববর্তী সময়ে পাকাপাকিভাবে বসবাস করার সময় পরিলক্ষিত করি তাহলে দেখতে পাই প্রথম কয়েক শতবর্ষ সামরিক আগ্রাসন, সাম্রাজ্য বিস্তার (এলাকা দখল) এবং নিজেদের টিকে থাকার পর্ব। এই সময় তারা স্থানীয় মানুষজনেরও সাহায্যের জন্য উদগ্রীব থাকে।

উপরোক্ত প্রথমপর্বের পরে, তারা নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে ব্যস্ত থাকে এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীকে প্রভাবিত করে সহযোগিতা নিয়ে সমাজের বিভিন্ন ও ভিন্ন স্তর বিন্যাস করতে উদ্যত হয়। প্রথম থেকেই তাদের উদ্দেশ্য ছিল এলাকা বিস্তার/দখল করা এবং সেখানকার বসবাসকারী মানুষকে তাদের অধীনস্থ করার উদ্দেশ্য ছিল আসলে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। কিছু গোষ্ঠীও এ বিষয়ে তাদের সহযোগী শক্তি হয় কিন্তু শত্রু ছিল কম না। অনার্য, পানিয়া, মগধী প্রভৃতি। এদের বারংবার নিজেদের অধীনে আনতে চেয়েছে আর্যরা। এদের সঙ্গে শত্রুতার মূল বিষয় ছিল ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত বৈশিষ্ট্য। অনার্যরা ছিল নগর সভ্যতায় উন্নত। তারাই ছিল আর্যদের মূল শক্তিশালী প্রতিপক্ষ। অসুর অগ্নিকে পূজা করত না বা বলিতে বিশ্বাসী ছিল না আর মগধীরা নাকি নিকৃষ্ট বংশ ও নিম্নবর্গীয় গোষ্ঠী। এই সব কারণে আর্যরা তাদের পরাজিত করে তাদের অধীনস্থ করতে চাইত। আর্যরা এদেরকে অধীনস্থ না করতে পেরে তাদের হয়রানি করতো। ঋকবেদের আর্যদের যখন সমাজে একটু নিয়ন্ত্রণ আসলো তখন তারা বর্ণভেদের সৃষ্টি করলো। ব্রাহ্মণ একদম উপরের সারিতে তারপরে রাজন্য বা ক্ষত্রিয়, তৃতীয় বৈশ্য ও চতুর্থত শুদ্র।

একই সাথে তারা বর্ণভেদে সৃষ্টি করলো এবং এই ব্যবস্থাকে ফলপ্রসু করার জন্য স্থানীয় মানুষদের সহযোগিতাও চাইল। কখনো তোষামোদ করে বা অন্যথায় জবরদস্তি করে।

ব্যবসায়ী, কারিগর, জমির সঙ্গে যুক্ত শ্রমজীবী মানুষদের বৈশ্য বর্ণে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মগধের মানুষজন মূলত ব্যবসায়ী ও ঋণদাতা ছিল। পানিরাও ব্যবসায়ী ছিল। এদের সাথে আর্যদের চরম বিরোধ ছিল এবং এদের বৈশ্য বর্ণে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। আর্যদের সমাজে নিয়ন্ত্রণ কায়েম হতেই তারা এই বর্ণভেদের ব্যবস্থা প্রচলন করে।

এরপর বিভিন্ন পর্যায়ে ভারতবর্ষের মাটিতে শাসক গোষ্ঠীর পরিবর্তন ঘটে। একসময় শক্তিশালী (নন্দ) রাজবংশকে সরে যেতে হয়, গ্রীকরা ভারতে আক্রমণ করে এবং পরে এই সময়কালে মৌর্য রাজবংশ শাসক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য থেকে পর্যায়ক্রমে সম্রাট অশোক হন সেই রাজবংশের প্রধান। শাসনের কেন্দ্রে ছিল পূর্ব ভারত এবং সেখানে তখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মের আবির্ভাব ঘটে জৈন ও বৌদ্ধ। এইসময়কালে ব্যবসার ও অর্থনৈতিক বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে মুদ্রার আবির্ভাব ঘটে। জৈন ধর্ম এখনও ভারতে আছে কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম প্রাথমিকভাবে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লেও পরে তার উৎসস্থল থেকে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যেতে থাকে।

এইসময়কালে ব্যবসার ও অর্থনৈতিক বিনিময়ের মাধ্যম মুদ্রার আর্বিভাব ঘটলো, পূর্বে দেখা যায় গরু ছিল বিনিময়ের মাধ্যম। এই সময় লোহারও আবিষ্কার হলে এবং তার সাহায্যে জনবসতি, চলার পথ তৈরি করতে অরণ্য/জঙ্গল পরিস্কার করাটা অনেক সহজসাধ্য হল। এরপরের পর্যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০ and ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ একটা অস্থির সময় আসে। মৌর্য রাজবংশের উচ্ছেদ হল শুঙ্গদের দ্বারা, কিন্তু সেটা ছিল সাময়িক। এরপরে এলো 'গুপ্ত'দের যুগ। এই সময়টা অর্থাৎ গুপ্তদের শাসনকালটা কম বেশি স্থিতিশীল। তাদের প্রভাব অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়ল অনেকটা জুড়েই।


মাঝখানের সময়টা ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাব একটু হ্রাস পেয়েছিল, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রাধান্য পাওয়াতে, কিন্তু এইসময়কালে ব্রাহ্মণ্যবাদ পুনরায় আধিপত্যের স্থানে ফিরে এল। বৌদ্ধ ধর্ম কার্যত ভারতবর্ষ থেকে বহিষ্কৃত হল। শুঙ্গ ও গুপ্ত রাজবংশ উভয়ই হিন্দুধর্মের সমর্থক ছিল। এই সময়কালে পুরাণকে সংকলন করে পুনর্লিখন করার কাজ শুরু হল এই রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায়, ব্রাহ্মণ্যবাদকে উচ্চতর ও উত্তম হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে। বর্ণবাদ আসলে সমাজকে শ্রেণিবদ্ধ ও পদানুক্রমিক করেছিল আর্থ-সামাজিক কারণে কিন্তু বিষয়টা প্রকাশ হল ধর্মকে সামনে উপস্থিত করে এবং ব্রাহ্মণরা ছিল চারটি উল্লেখিত বর্ণের একদম উপরে সারিতে।

এর মধ্যে বর্ণের সাথে আবার জাতির আবির্ভাব ঘটল। সেটা অন্য আলোচনা। মনুস্মৃতি অত বিশদে ডুব দেয়নি কারণ মনুসংহিতা প্রাথমিকভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদের দ্বারা সৃষ্ট সংহিতা এবং অনুশাসন।

বর্তমান পরিস্থিতি:

আরএসএস চায় সারা দেশে একটি অভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি ও একটি মাত্র সরকারি ভাষা। বিজেপি সরকারের মাধ্যমে হিন্দি ভাষাকে তারা সেই স্তরে আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। সেই কারণেই আজকে আমাদের চিন্তা-চেতনার ওপর আঘাত নেমে আসছে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে পুরাণকে ইতিহাস বলে চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করা হচ্ছে। দর্শনেরও বিকৃতি ঘটানো হচ্ছে- বস্তুবাদী দর্শনের অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে বলা হচ্ছে ধর্মতত্ত্বই একমাত্র দর্শন। আধুনিক বিজ্ঞানকে পৌরাণিক যুগের দান বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এম এস গোলওয়ালকার তাঁর Bunch of Thoughts গ্রন্থে বলেছেন "The modern plastic surgery too was a gift to the outside world by our ancient masters of Ayurveda"

এমনকি, শিক্ষাক্ষেত্রে প্রধান বা উপাচার্য নিয়োগ, গবেষণা সংস্থার প্রধান নিয়োগ, প্রশাসনিক আমলাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও আরএসএস প্রভাবিত ব্যক্তিদেরই বাছাই করছে। এছাড়াও ধারাবাহিকভাবে বিচার ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা চলেছে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে।

বর্তমান ভারত রাষ্ট্র বৃহৎ বুর্জোয়া শ্রেণির নেতৃত্বে বুর্জোয়া ও জমিদারদের শ্রেণি-শোষণের যন্ত্র। অর্থাৎ বুর্জোয়া ও জমিদারদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা এবং এই বুর্জোয়া-জমিদার জোটের নেতৃত্বে রয়েছে বৃহৎ বুর্জোয়ারা। একইভাবে আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থায় (কেন্দ্রীয় সরকার) রয়েছে ওই উপরে উল্লেখিত শ্রেণিদের প্রতিনিধিবর্গ। ভারতে এখন এই শাসকশ্রেণির যে অংশের প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল (বিজেপি) কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসীন, তারা তাদের মতাদর্শ সম্পর্কিত চিন্তাধারাই সারা দেশে লাগু করার চেষ্টা করছে। বলাই বাহুল্য যে, বিজেপি, (আরএসএস) এর মতাদর্শই প্রচার করবে এবং করছেও তাই। শাসক-শ্রেণির এই মতাদর্শই আমাদের দেশের মানুষের স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনার জগতের উপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। কার্ল মার্কস এক্ষেত্রে যা বলে গেছেন তা একটি বাক্যে প্রতিফলন করতে গেলে বলতে হয়, The ruling ideas are the ideas of the ruling class. ভারতেও এর ব্যতিক্রমী কিছু দেখা যাচ্ছে না এবং আরএসএস এর এই মতাদর্শ, এই চিন্তাভাবনা সরাসরি ভারতীয় সংবিধানের মর্মবস্তুর বিপরীত উপাদানে পরিপুষ্ট, সেই কারণে ভারতীয় সংবিধানও আজ সরাসরি এক সংঘাতের সম্মুখীন।

ভারতীর সংবিধান ও মনুস্মৃতি

স্বাধীনতার পর ভারতীয় সংবিধান কার্যকরী হয়েছে ১৯৫০ সালের ২৬শে জানুয়ারি।

এই সংবিধান রচনার প্রক্রিয়ায় প্রায় ৩ বছরের মতো সময় অতিবাহিত রয়েছে। তদানিন্তন কনস্টিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি-তে মোট ১৬৫ দিন অধিবেশন বসেছে। বিশদে মূল আলোচনা হয়েছে মোট ১০১ দিন। আলোচনা হয়েছে কী কী বিষয় এই সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে। আলোচনা হয়েছে, বিতর্ক হয়েছে। বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। যুক্তি, বিকল্প-যুক্তি উত্থাপনের মাধ্যমে প্রস্তাবগুলি কোনোটা গৃহীত হয়েছে, কোনওটা বাতিল হয়েছে। প্রাথমিক আলোচনার পর একটি খসড়াও এই কনস্টিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি-তে পেশ করা হয়। তার পরিপ্রেক্ষিতেও বিস্তারিত আলোচনা হয়। এগুলি " কনস্টিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি-র বিতর্ক" হিসেবে খ্যাত। আমাদের দেশের তদানিন্তন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেমন - কংগ্রেস, আকালি দল, কমিউনিস্ট পার্টি, মুসলিম লিগ-এর প্রতিনিধিরা এবং একাধিক নির্দল প্রতিনিধিরা এই কনস্টিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি-র সদস্য ছিলেন। এর সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর যেমন বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান, মুসলিম, পারসি, শিখ সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ ছিলেন। এই সদস্যদের মধ্যে ১৫ জন মহিলা প্রতিনিধিও ছিলেন। এই মহিলা প্রতিনিধিদের মধ্যে ১০ জন মহিলা প্রতিনিধি বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং, এই কনস্টিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি? সেশনগুলিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের, বিভিন্ন ধরনের এবং বিভিন্ন ভাবাদর্শের মানুষের মতামত উত্থাপিত হয়েছিল এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতেই সংশ্লিষ্ট প্রস্তাবাবলি ও বিতর্ক মীমাংসার মাধ্যমেই আমাদের দেশের সংবিধান পূর্ণাঙ্গ পায়।

এই সংবিধানে আমাদের দেশের মানুষকে আকাঙ্ক্ষিত ও প্রয়োজনীয় মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, কিছু মৌলিক কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে, কয়েকটি নিদের্শক নীতিও রাখা হয়েছে, নাগরিকত্ব সম্পর্কেও বলা হয়েছে। এছাড়া আরও বহুবিধ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে এই সংবিধানে।


এই সংবিধানের একটি মুখবন্ধ আছে (Preamble of the Indian Constitution)। আমাদের ভারতের সংবিধানের মুখবন্ধটি হল এর প্রারম্ভিক এবং প্রস্তাবনা আকারে সংক্ষেপে এই সংবিধানের মূল দর্শন ও উদ্দেশ্যের সারমর্ম। এখানে বলা হয়েছে আমরা, ভারতের জনগণ, একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র গড়ে তোলার জন্যে একনিষ্ঠভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি। এবং সমস্ত নাগরিকদের জন্য সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক ন্যায়, চিন্তা, মত-প্রকাশ, আস্থা, বিশ্বাস ও উপাসনার স্বাধীনতা; পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা অর্জনের সমতা, ব্যক্তির মর্যাদা ও দেশের ঐক্য ও সংহতির ক্ষেত্রে ভ্রাতৃত্ববোধ-কে নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হচ্ছে। (১৯৭৬ সালে ৪২তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ‘সোসালিস্ট’ ও ‘সেক্যুলার’ এই দুটি শব্দ অন্তর্ভুক্ত হয় এবং একই সাথে ইউনিটি অফ দ্য নেশান-এর পরিবর্তে ইউনিটি অ্যান্ড ইন্টিগ্রিটি অফ দ্য নেশান যুক্ত করা হয়।

এই মুখবন্ধ রচনার ক্ষেত্রেও কনস্টিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি-তে আলোচনার সময় বিতর্ক হয়েছে। একাধিক প্রস্তাব এসেছে। যুক্তি ও বিকল্প-যুক্তি উত্থাপিত হয়েছে। এমনকি, এমনও প্রস্তাব এসেছিল যে মুখবন্ধের শুরুটাই হবে, "In the name of the God' বলে। কিন্তু বিস্তারিত আলোচনার পর সেই প্রস্তাব ভোটাভুটির মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায়।

আরএসএস-এর না-পসন্দ এই ভারতীয় সংবিধান। তাদের মতে, ভারতীয় সংবিধান হল জটিল এবং পাশ্চাত্য থেকে অনুকরণ করা এবং এতে স্বদেশীয় কোনও ভাবধারাই প্রতিফলিত হয়নি। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-এর আয়োজিত 'ধর্ম সংসদ' থেকে বর্তমান ভারতীয় সংবিধানকে আখ্যা দেওয়া হয়েছে অ-হিন্দু বলে। আসলে আরএসএস ভারতীয় সংবিধানের পরিবর্তে 'মনুস্মৃতি'কেই ভারতের উপযোগী বলে মনে করে। আরএসএস-এর মূল পরমর্শদাতা, পথপ্রদর্শক ও মার্গ-দর্শক সাভারকার বলে গেছেন "Manusmriti is that scriputre which is most worshipable after Vedas for our Hindu Nation and which from ancient time has become the basis of our culture customs, thought and practice. This boook for centuries has codified the spiritual and divine march of our nation. Even to-day the rules which are followed by crores of Hindus in their lives and practice are based on Manusmriti. To-day Manusmriti is Hindu Law."

যখন কনস্টিউয়েন্ট অ্যাসেমব্লি, ভারতীয় সংবিধানকে চুড়ান্ত করল, আরএসএস অসন্তুষ্ট হল। ১৯৪৯ সালে ৩০শে নভেম্বর তাদের মুখপত্র 'অর্গানাইজর'-এর সম্পাদকীয় কলমে বলা হল “But in our Constitution there is no mention of the unique constitutional development in ancient Bharat. Manu's Laws were written long before Lycurgus of Sparta or Solon of Persia. To this day, his laws as enunciated in the Manusmriti excite the admiration of the world and elicit spontaneous obidience and conformity. But to our constitutional pundits that means nothing."

এই মনুস্মৃতি বা Code Laws of Manu, যেখানে বর্ণ ব্যবস্থা আছে, যেখানে ব্রাহ্মণ্যবাদ রয়েছে, যেখানে শূদ্র (দলিত) ও মহিলাদের সম্পর্কে অবমাননাকর ব্যবস্থার বিধান আছে সেই মনুস্মৃতির প্রবর্তনের মাধ্যমে আমাদের দেশের সামাজিক স্থিতি প্রতিষ্ঠা করার কথা বলে থাকে আরএসএস।

শেষ পর্ব আগামীকাল 


প্রকাশের তারিখ: ২৯-ডিসেম্বর-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৫০ টি নিবন্ধ
০৭-মে-২০২৬

২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬