সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সকলের জন্য বাড়ি: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
ওয়েব ডেস্ক মার্কসবাদী পথ
মোদী সরকার ঘোষণা করেছিল যে, ২০২২ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিককে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারায়, প্রকল্পটির সময় ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। যদিও, সময় বাড়ানো হলেও, পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয়নি। ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত, শহরাঞ্চলের মধ্যে মাত্র ৩২ লক্ষ বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ১২ লক্ষ। প্রায় ৬০ লক্ষ বাড়ি নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আরও লক্ষনীয় হলো, এই প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও, ২০২৩-২৪-এর জন্য প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার শহরাঞ্চলের বাজেট তার আগের বছরের থেকে ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই অধিকাংশ মানুষের এখনও মাথার উপরে পাকা ছাদ নেই।

এক ক্লিকে ফলো করুন মার্কসবাদী পথের হোয়াটসঅ্যাপচ্যানেল
প্রতিশ্রুতি: স্বাধীনতার পঁচাত্তর বছরে, অর্থাৎ ২০২২ সালের মধ্যে প্রতিটি ভারতীয়ের থাকবে নিজের বাড়ি
–২০১৪, নরেন্দ্র মোদী
গ্যারান্টির বাস্তবতা
২০২৩, হাউজিং অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্ক (এইচএলআরএন) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, ‘শহর এবং গ্রাম-ভারতের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ জরুরি পরিষেবার সুযোগ ছাড়াই অপর্যাপ্ত স্থানে বসবাস করে চলেছেন। এর মধ্যে ৪০ লক্ষেরও বেশি মানুষ পুরোপুরি গৃহহীন। এবং কমপক্ষে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ শহরাঞ্চলে কোনও ঘরবাড়ি ছাড়াই কোনও মতে বসবাস করছেন।’
প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমওয়াইএ), যা আগে ছিল ইন্দিরা আবাস যোজনা। মোদী সরকারের নাম পরিবর্তনের ফলে এখন তাই হয়েছে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা (পিএমওয়াইএ)। এর দু’টি ক্ষেত্র, গ্রাম এবং শহর। পিএমএওয়াই-এর অধীনে, ৪০ শতাংশ অর্থ দিতে হয় রাজ্য সরকারকে।
মোদী সরকার ঘোষণা করেছিল যে, ২০২২ সালের মধ্যে দেশের প্রতিটি নাগরিককে বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেবে। কিন্তু সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে না পারায়, প্রকল্পটির সময় ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। যদিও, সময় বাড়ানো হলেও, পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হয়নি। ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত, শহরাঞ্চলের মধ্যে মাত্র ৩২ লক্ষ বাড়ি তৈরি করা হয়েছে। যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ১২ লক্ষ। প্রায় ৬০ লক্ষ বাড়ি নির্মাণের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। আরও লক্ষনীয় হলো, এই প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলেও, ২০২৩-২৪-এর জন্য প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার শহরাঞ্চলের বাজেট তার আগের বছরের থেকে ১০ শতাংশ কমানো হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই অধিকাংশ মানুষের এখনও মাথার উপরে পাকা ছাদ নেই।
অন্যদিকে, গ্রামীণ এলাকায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ৯৪ লক্ষ। তার মধ্যে ৩৬ লক্ষ বাড়ির নির্মাণ কাজ এখনও পর্যন্ত শুরুই হয়নি।
একেবারেই অপর্যাপ্ত বরাদ্দ
আবাসনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি মূল্যায়ন করা যেতে পারে ২০১১ সালের আর্থ-সামাজিক ও জাতিগত জনগণনা থেকে, আবাসন থেকে বঞ্চিত মানুষের তথ্যের ভিত্তিতে। তারপর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। ২০১৮ সালে, শহরাঞ্চলে আবাসনের ঘাটতি ছিল ২ কোটি ৯০ লক্ষ, যা ২০১২ সালের চাহিদার তুলনায় ১৫৯ শতাংশ বেশি!
গৃহহীন পরিবার, অ-বস্তি পরিবার, অপর্যাপ্ত খুপরিতে বসবাসকারী ও বস্তিবাসী পরিবারগুলির কথা বিবেচনা করে, ২০২২ সালে চাহিদা পৌঁছয় প্রায় ৫ কোটির কাছাকাছি। এর থেকে উঠে আসা তথ্যই বলছে যে, মোট শহরবাসীর প্রায় ৫০ শতাংশেরই কোনও বাড়ি নেই।
২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে নেওয়া একটি সমীক্ষা অনুসারে, ভারতের আটটি বৃহত্তম শহরে ‘নূন্যতম আয় গোষ্ঠীর’ মধ্যে আবাসিকদের বাসস্থানের জন্য আবাসনের মোট চাহিদা ছিল ১৯.৮ লক্ষ ইউনিট। কিন্তু সরবরাহ হয়েছে মাত্র ২৫,০০০ ইউনিট। বাড়ির চাহিদা আর তা পাওয়ার মধ্যে দেখা যাচ্ছে এই বড় ব্যবধান। মোদী সরকারের বরাদ্দ বাজেট, এই দাবি পূরণের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত! যা তার বহুল প্রচারিত ঘোষণাকেই ধাপ্পাবাজিতে পরিণত করে। ঘোষণা এবং প্রতিশ্রুতি গুলি প্রচার এবং বিজ্ঞাপন সর্বস্ব! বাস্তবের ছবির সঙ্গে তার বহুযোজনের ফারাক!
দুর্নীতি
গ্রামীণ উন্নয়ন ও পঞ্চায়েত রাজ বিষয়ক স্থায়ী কমিটি, ২০২১-২২ সালে এই প্রকল্পের অধীনে বাড়ি বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের কথা বিভিন্ন সার্ভেতে তুলে ধরেছে।
খারাপ গুণমান
প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি বিপিএল-বাড়ির জন্য মাথাপিছু ফ্লোর এলাকা ৬০ বর্গফুটেরও কম। ২০১২-১৭ সালে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অংশের (ইডব্লিউএস) জন্য নির্মিত বাসস্থানগুলির মধ্যে মাত্র ৫০ শতাংশের ক্ষেত্রে স্থায়ী কাঠামো হয়েছে। এই ধরনের ২০ শতাংশ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অংশের পরিবারে গড়ে অন্তত একটি বিবাহিত দম্পতি আছে, যাদের নেই আলাদা কোনও ঘর। বাড়িগুলিকে বসবাসের উপযোগী করে তুলতে মানুষ আরও বেশি করে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে এবং ফলে ঋণের বোঝার ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে তারা।
পরিযায়ীদের জন্য নেই কোনও ঘর
জনগণনা অনুসারে, ২০১১ সালে ভারতে পরিযায়ী মানুষের সংখ্যা ছিল ৪৫ কোটি ৬০ লক্ষ। জনসংখ্যার ৩৮ শতাংশ। কোভিড লকডাউনের সময় পরিযায়ী শ্রমিকদের এই দুর্দশা বেআব্রু হয়ে পড়ে। এদের মধ্যে বেশির ভাগেরই নিজস্ব বাড়ি এবং জমির মালিকানা নেই। ফলে আবাস যোজনা পরিষেবার আওতায় আসার যোগ্যতার মাপকাঠিতেই এরা বাতিল হয়ে যায়। পিএমএওয়াই-এর আওতায় সেই মানুষরাই পাকা বাড়ি পান, যাদের আগে থেকে নিজেদের জমিতে কাঁচা বাড়ি আছে। অর্থাৎ, যাদের নিজেদের জমি নেই, তাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিয়ে কোনও ভাবনা এই প্রকল্পে নেওয়া হয়নি। এভাবে আমাদের জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরও বেশি মানুষ, তাদের ‘নিজের বাড়ি’ থাকার অধিকার থেকেই বঞ্চিত।
মোদীর বুলডোজার রাজ: উচ্ছেদই নিউ-নর্মাল!
‘নিজের বাড়ি থাকার আমাদের স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছে... আমি যখন শহরে আসি, তখন ভাড়া-ঘরে থাকতাম, আর যখন বিয়ে করি, তখন অন্যত্র চলে যাই, আমি শুধু আমার মারা যাওয়ার আগে আমার সন্তানদের মাথার ওপর একটা ছাদ দিয়ে যেতে চেয়েছিলাম।’
–একজন মহিলা, নয়াদিল্লির তুঘলকাবাদে যার নিজের তৈরি বাড়ি ২০২৩ সালের এপ্রিলে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
হাউজিং অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্ক (এইচএলআরএন) এবং তার সহযোগী সংস্থাগুলির দ্বারা সংগৃহীত তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ সালের মধ্যে, সরকার ১,৫৩,৮২০ টিরও বেশি বাড়ি ভেঙে দিয়েছে। যার ফলে দেশের গ্রাম-শহরে ৭,৩৮,৪৩৮ জনকে গায়ের জোরে তাদের বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে উচ্ছেদ-পর্ব এমন দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা গত সাত বছরে সর্বোচ্চ রেকর্ড করেছে। ২০২৩ সালে ভেঙে ফেলা হয় ১,০৭,৪৪৯ টিরও বেশি বাড়ি। জোরজবরদস্তি উচ্ছেদ করা হয় অন্তত ৫,১৫,৭৫২ জনকে।
মানে, প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় অন্তত ২৯৪টি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে !
প্রতি ঘণ্টায় উচ্ছেদের শিকার ৫৮ জন!
প্রতিবেদন জানাচ্ছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ১৬.৮ লক্ষেরও বেশি মানুষকে তাদের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মানুষ উচ্ছেদ ও ভিটে মাটি থেকে উৎখাতের মারাত্মক হুমকির মুখে। বেশিরভাগ উচ্ছেদই (৫৮.৭ শতাংশ) হয়েছে ‘বস্তি’ সরানো, অধিগ্রহণ, ‘নগর সৌন্দর্যায়নের’ অছিলায়। সিল্কিয়ারা টানেলে আটকে পড়া ৪১ জন শ্রমিককে উদ্ধারকারী র্যাট মাইনারদের সাহসী দলনেতা ওয়াকিল হাসানের বাড়ি পর্যন্ত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হাউজিং অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্কের রিপোর্ট বলছে, এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান আসলে খুব ছোট করে দেখানো! প্রকৃত চেহারা ভয়াবহ!
‘শাস্তি’ দেওয়ার জন্য বুলডোজারের ব্যবহার বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিজেপি সরকারের ‘হল-মার্ক’ হয়ে উঠেছে। খারগোনে (মধ্যপ্রদেশ), প্রয়াগরাজ এবং সাহারানপুর (উত্তরপ্রদেশ), নুহ (হরিয়ানা) এবং জাহাঙ্গীরপুরী (দিল্লি)-তে এধরনের ‘আপাতদৃষ্টিতে’ ‘শাস্তিমূলক ব্যবস্থা’ নেওয়া হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী ৭২ শতাংশ ক্ষেত্রে, সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা করেনি।
মোদী রাজ মানেই বুলডোজার রাজ! ধ্বংসের রাজ! যা আসলে মর্যাদার সাথে বাঁচার, বসবাসের অধিকারকে আক্রমণ করে।
ভাষান্তর: শমীক মণ্ডল
ঋণ: সিআইটিইউ সেন্টার
আরো পড়ুনঃ
কর্মসংস্থান: দাবি, প্রচার, বাস্তবতা
সঙ্কটে গণতন্ত্র! পরাস্ত করুন বিজেপিকে!
প্রতিহত করুন হিন্দুত্ব রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা! পরাস্ত করুন বিজেপিকে!
প্রতারিত মেহনতিরা, পরাস্ত করুন বিজেপিকে
প্রতারিত কৃষকেরা, পরাস্ত করুন বিজেপিকে
প্রকাশের তারিখ: ০৪-এপ্রিল-২০২৪
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
