সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
কর্মসংস্থানের দিশা নেই রাজ্য বাজেটে
রতন খাসনবিশ
কোষাগারের অবস্থা কতটা বেসামাল সেটা অনুমান করার মতো তথ্য নেই। কিন্তু এটা বোঝা যাচ্ছে যে, সরকার প্রাণপণে চেষ্টা করছেন সরকারি কর্মচারি বাবদ খরচ কমিয়ে আনতে। সেটা ডিএ আটকে রেখে, পেনশনে জটিলতা এনে এবং নতুন নিয়োগে নানা ভাবে বাধা সৃষ্টি করে, নানা ভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফল দাঁড়িয়েছে এই, যখন আমরা এগিয়ে বাংলার কথা বলছি, তখন রাজ্যের মাথাপিছু জিডিপির হার দাঁড়িয়েছে ওড়িশার নিচে, শিল্পে বৃদ্ধির হার সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম এবং কিছু পরিষেবা বৃদ্ধির হার সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। সরকারি প্রকল্পগুলি চলে মন্থর গতিতে।

রাজ্য বাজেটে (২০২৬-২৭) যে বিষয়টি সমধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হল এই যে, রাজস্ব খাতে সরকারের যে আয় রাজস্বখাতে খরচ তার তুলনায় ২১৭৫৬ কোটি টাকা বেশি। এই বাড়তি খরচের টাকাটা আসছে যাকে বলা হয় ক্যাপিটাল রিসিপ্ট, যার মূল জায়গাটা হল ধারের টাকা, সেখান থেকে। এর অর্থ সুস্পষ্ট। সরকার তার প্রতিশ্রুত খরচ মেটাবার উপায় উদ্ভাবন করছেন সবার ওপর ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দিয়ে। যেটা লক্ষ্য করছি তা হল, সরকারি ব্যয়ের যে অংশটি খেলা, মেলা, ধার, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবসাথী ইত্যাদি কর্মসূচি রূপায়ণে দরকার, এত টাকা ধার করার দরকার পড়ছে সেগুলোকে চালিয়ে যাওয়ার জন্য।
বিষয়টি একটু বিস্তৃত ভাবে আলোচনা করা দরকার। একটি রাজ্যে সরকার চালাবার জন্য যে খরচ হয় বাজেটে তার পোশাকি নাম হল এক্সপেনডিচার অন জেনারাল সার্ভিসেস। এর মধ্যে আসে সরকারি দপ্তরগুলির কর্মচারিদের মাইনে, এবং অন্যান্য প্রশাসনিক ব্যয়। বাজেটে দেখা যাচ্ছে এই খাতে অর্থাৎ যে খাতটিকে বলা হয় জেনারাল সার্ভিসেস, তাতে মোট খরচ আসল কমে এসেছে। গত আর্থিক বর্ষে এই বাবদ খরচ ছিল ৯৪৯৬৬৩৩৩৭ হাজার টাকা। ২০২৬-২৭ এর প্রস্তাবিত বাজেটে এ বাবদ খরচ কমানো হয়েছে। অঙ্কটি দাঁড়িয়েছে ৯২৯২৩৫৬০৮ হাজার টাকা। আরেকটু বিস্তারিত হিসাবে ঢুকে দেখা যেতে পারে খরচ কোথায় কমানো হয়েছে। সরকার চালাবার খরচ কমেনি। বরং কিছু পরিমাণে হলেও সেটা বেড়েছে। যেগুলো আর্থিক পরিষেবা সেখানেও খরচ কমেছে। ঋণ পরিশোধ বাবদ খরচ অনেকটাই বেড়েছে। প্রশাসনিক ব্যয়ভার কমেনি। বরং তা বেশ কিছুটা বেড়েছে। কোপ পড়েছে পেনশন খাতে এবং সরকারি অন্যান্য পরিষেবা খাতে। গত বছর এই খাতে সংশোধিত ব্যয় হিসাবে দেখানো হয়েছে ২৫৭৮৬.৭০ কোটি টাকা। আগামী বছরের বাজেট অনুসারে এ বাবদ প্রস্তাবিত ব্যয় হল ১৮৭৬৫.২৫ কোটি টাকা। আনুমানিক, ৭ হাজার কোটি টাকার খরচ কমানো হয়েছে পেনশন ও অন্যান্য সাধারণ পরিষেবার ক্ষেত্রে। এর অর্থ হল, পেনশন দেওয়ার দায় সরকার ক্রমশ কমিয়ে আনছে। কমিয়ে আনছে যেগুলো সাধারণ পরিষেবা সেগুলো বাবদ খরচ। দৃশ্যত এতে একটি চমৎকার ব্যবস্থা। প্রশাসন চালাবার দায়িত্ব যাদের হাতে তাদের ব্যয়বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি চালিয়ে যাওয়ার খরচ। খরচ কমছে নিরীহ পেনশনভোগীদের বিব্রত করে, খরচ কমছে সরকারি পরিষেবা বন্ধ করে।
📲 এখন এক ক্লিকেই মার্কসবাদী পথ আপনার হোয়াটস অ্যাপে
বাজেটে প্রস্তাবিত যা ব্যয় সেটি বিশ্লেষণ করলে আরেকটি চিত্তাকর্ষক বিষয় নজরে আনা যেতে পারে। বাজেট পাবলিকেশন নম্বর ৯:স্টেটমেন্ট ৬ থেকে পাওয়া যায়, কোন কোন সেক্টরে কী পরিমাণ টাকা খরচ করার প্রস্তাব আছে এই বাজেটে। একটু খুঁটিয়ে দেখলে যা বেরিয়ে আসে সেটা এরকম যে, সরকারি খরচের প্রায় অর্ধেক ধরা আছে মুখ্যমন্ত্রী স্ব-ইচ্ছায় যেগুলো খরচ করে বাজেটের একটা জনমোহিনী রূপ দিতে পারেন। এ বাজেটে দেখছি (স্টেটমেন্ট ৬) খরচের একটি তালিকা দেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার মোট খরচ করবেন ৩৯৬০৮৪.১৭ কোটি টাকা। এই খরচের মধ্যে কৃষিতে যাবে ২৪ হাজার কোটি টাকা, গ্রামোন্নয়নে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা, শিক্ষা, খেলাধূলা ও সংস্কৃতি বাবদ ১১,৫৩০ কোটি টাকা, তপশিলী জাতি ও তপশিলী উপজাতিদের উন্নতির জন্য যাবে ৬৯১৫.৩৭ কোটি টাকা, আর একটি আশ্চর্য খাতে ধরা আছে ১৪৪৪৮৬.৪৯ কোটি টাকা। খাতটির গায়ে লেখা রয়েছে অন্যান্য। যেখানে পুরো খরচ হল ৩৯৬০৮৪.১৭ কোটি টাকা, সেখানে তার ৪০ শতাংশের বেশি টাকা ব্যয়বরাদ্দ ধরা আছে একটি বিশেষ খাতে সরকার যার নাম দিয়েছেন অন্যান্য। কী সেই অন্যান্য যাতে বাজেটে ৪০ শতাংশের বেশি খরচ ধরা হয়েছে? সরকারি বাজেটে তার কোনও উল্লেখ নেই। সরকারি বাজেটে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের উল্লেখ নেই, উল্লেখ নেই যূবসাথী প্রকল্পের, উল্লেখ নেই নিউ টাউনের দুর্গামণ্ডপ অথবা শিলিগুড়ির মহাকাল মন্দিরের জন্য সরকারি খরচের পরিমাণ। আমাদের অনুমান, এই সবই ‘অন্যান্য’ তালিকভুক্ত। ৩৯৬০৮৪.১৭ কোটি টাকার মধ্যে ১৪৪৪৮৬.৪৯ কোটি টাকা খরচ হবে মুখ্যমন্ত্রীর যাতে ডোল দিয়ে ভোট কিনতে পারেন এবং প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতায় ইন্ধন যোগাতে পারেন, সেই বাবদ।
সামাজিক দায় হিসাবে বেকার ভাতা কিংবা মহিলাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে কিছু অর্থদান কখনই খারিজ করা যায় না। সরকারকে এসবের দায়ভাগ গ্রহণ করতে হতে পারে। কিন্তু সরকারের মূল কাজ হবে এমন সুযোগ সৃষ্টি করা যাতে মহিলাদের পরনির্ভরশীলতা হ্রাস পায় (এমনকী রাষ্ট্রীয় নির্ভরতারও প্রয়োজন পড়ে না)। যুব সম্প্রদায়ের নিয়োগবৃদ্ধির সুযোগ আসতে থাকে সরকারি প্রকল্পগুলিকে কেন্দ্র করে, সরকারের কাছে সাধারণ নাগরিকদের এটাই থাকে প্রত্যাশা। তার বদলে এমন একটি বাজেট তৈরি করা যার অর্ধেক টাকা বরাদ্দ থাকে ভোট কেনার লক্ষ্যে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার অথবা যুবসাথি প্রকল্পকে জোরদার করা, এটি কখনই কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না। এই প্রসঙ্গে মাও সে তুঙের একটি কথা স্মরণে আসে, একটি মানুষকে রোজ একটি করে মাছ দান করা ভাল। কিন্তু আরও ভাল হল তাকে মাছ ধরার কৌশল শেখানো যাতে সে স্বাবলম্বী হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের ট্র্যাজেডি হল এখানে মাছ ধরার কৌশল শেখানো হবে না। বরং সে বাবদ খরচ ক্রমশ কমানো হবে। এবং প্রশাসন এমনভাবে তৈরি থাকবে যাতে তা রোজ একটি করে মাছ দান করে দিদির ওপর নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বাড়ায়।
🔍 আরও পড়ুন: —এক ‘যৌক্তিক’ পরিবর্তনে শ্রমের দাম আরও সস্তা —শ্রমিকের জন্য খরচে টান, পুজোর ভাণ্ডার উপচে পড়ে —কোনও এক গাঁয়ের বধূর কথা
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে এ বছর যে বাজেট পেশ করা হয়েছে তার খরচের দিকটি পর্যালোচনা করলে দেখা যাচ্ছে, প্রায় ৪০ শতাংশের মতো খরচের গতিমুখ মুখ্যমন্ত্রী নির্ধারিত। এই খরচের বিস্তারিত বিবরণ অবশ্যই বাজেট স্টেটমেন্ট-এ চেপে রাখা হয়েছে। আয়ের দিকটি অবশ্য চেপে রাখার কোনও ব্যবস্থা নেই। দেখা যাচ্ছে যে, সরকারের রাজস্ব বাবদ যা আয়, রাজস্বখাতে খরচ তার চেয়ে অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ হয় ঋণের টাকা থেকে। যে টাকা মুখ্যমন্ত্রী অন্যান্য হিসাবে রাজস্ব খাতে খরচ হিসাবে ধার্য করেছেন, সে টাকার পুরোটাই আসবে ঋণ থেকে। ঋণ গ্রহণের ছবিটা এই রকম : ২০২৬-২৭ সালের বাজেট অনুসারে রাজ্য সরকার বাজার থেকে ধার করবে ৮০৪৪৪.৫৫ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে ধার আসবে ১২০৪০.০০ কোটি টাকা। মোট ধারের অঙ্ক দাঁড়াবে ১০৮২৮৮.৪৪ কোটি টাকা। রাজ্য সরকারের বক্তব্য, রাজ্যের জেডিপি যে হারে বাড়ছে তাতে এই পরিমাণে ধার করেও রাজকোষ ঘাটতি কমিয়ে আনা সম্ভব। কথাটা অস্বীকার করা যায় না। সন্দেহ আছে অবশ্য রাজ্যের জিডিপির বৃদ্ধির হার যা দেখানো হয় সেটি নিয়েই। অমিত মিত্র অনেক কারসাজি করে এই রাজ্যের জিডিপি ও তার বৃদ্ধির হার বাড়িয়ে রেখেছেন বটে, তবে সেটা কতটা বাস্তবানুগ সে নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এই সরকার বদল হয়ে অন্য একটি সরকার না আসা পর্যন্ত সরকারি কোষাগারের বাস্তব ছবিটা একেবারেই পরিষ্কার হবে না।
কোষাগারের অবস্থা কতটা বেসামাল সেটা অনুমান করার মতো তথ্য নেই। কিন্তু এটা বোঝা যাচ্ছে যে, সরকার প্রাণপণে চেষ্টা করছেন সরকারি কর্মচারী বাবদ খরচ কমিয়ে আনতে। সেটা ডিএ আটকে রেখে, পেনশনে জটিলতা এনে এবং নতুন নিয়োগে নানা ভাবে বাধা সৃষ্টি করে, নানা ভাবে চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফল দাঁড়িয়েছে এই, যখন আমরা এগিয়ে বাংলার কথা বলছি, তখন রাজ্যের মাথাপিছু জিডিপির হার দাঁড়িয়েছে ওড়িশার নীচে, শিল্পে বৃদ্ধির হার সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম এবং কিছু পরিষেবা বৃদ্ধির হার সর্বভারতীয় গড়ের চেয়ে কম। সরকারি প্রকল্পগুলি চলে মন্থর গতিতে। আসলে যে কর্মীরা এই সব প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ডি এ বঞ্চিত করে এবং পেনশন না দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাদের মনোবল কমিয়ে আনা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী করেন ভোটের রাজনীতি যেখানে এই কর্মচারীরা ভোটদাতাদের ২ শতাংশের বেশি নন। তাদের ডিএ দেওয়ার বদলে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে টাকা বাড়ানো ভোটের দিক থেকে অনেক বেশি লাভজনক। মুখ্যমন্ত্রী সরল অঙ্কটি কষেন, অঙ্কটি যে আরও জটিল, তুষ্ট সরকারি কর্মচারী ছাড়া সরকারি প্রকল্প যে উদ্যমহীনতার ফলে গতিহীন হয়ে যেতে বাধ্য, এটা তিনি বুঝতে চান না।
প্রকাশের তারিখ: ১৭-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay







