সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
লেখক শিল্পীদের প্রতি
জ্যোতি বসু
এই শ্বাসরুদ্ধ অবস্থার মধ্যে আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। তাই আমরা আক্রান্ত শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণকে সচেতন করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি। একাজে এই রাজ্যের বুদ্ধিজীবীদের কাছে আমাদের অনেক আশা। তাঁরা অতীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামের ঐতিহ্য রচনা করে গেছেন। আজ ব্যাপক জনগণের সঙ্গে লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরাও আক্রান্ত। আপনাদের কাছে অনুরোধ ভূলুণ্ঠিত গণতন্ত্র ও বিপন্ন মানবিকতার রক্ষার জন্য আপনাদের অসামান্য শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসুন। বিবৃতি দিন, আপনাদের লেখার মধ্য দিয়ে, শিল্পের মধ্য দিয়ে, জনগণের উপর সীমাহীন নিপীড়নের কথা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিন। সকলের সাহায্য নিয়ে আমরা নিশ্চয়ই এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারব আমাদের বিশ্বাস।

গণতন্ত্র আজ বিপন্ন। এদেশে গণতন্ত্র কতটুকুই আর আছে? সভা ইত্যাদি করা যায় না। এমন অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে যে সংসদীয় গণতন্ত্রে যেন কোনও বিরোধী থাকবে না। বহু মত আমরা মানুষের কাছে রাখি। মানুষ তা থেকে বেছে নেন। জনগণই তো শেষকথা বলবেন। কিন্তু যেটুকু অধিকার সংসদীয় গণতন্ত্রে স্বীকৃত তা-ও আর থাকছে না। যেখানে কংগ্রেসের বিরোধী শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, সেখানেও তা থাকছে না। আমরা স্পষ্টভাবে বক্তব্য রেখেছি, আন্দোলন সংগ্রাম করেছি, কখনও জিতেছি, কখনও-বা হেরেছি। মানুষ ঠিক করবেন কোনটা শ্রেয়। এখানে রাষ্ট্রশক্তি হাতে নিয়ে গায়ের জোরে দাবিয়ে রাখা হচ্ছে। বিনাবিচারে আটক, পুঁজিবাদী দেশেও হয় না। কিন্তু এখানে কংগ্রেস বরাবর এই কালাকানুন চালু রেখেছে এবং বিরোধীদলগুলি ও যাঁরা গণতান্ত্রিক আন্দোলন করেন তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
মিসা বন্দিদের তামিলনাডুতে পাঠানো হয়েছে। রাজ্যপালকে বলেছি এটা করলেন কেন? তিনি বিস্ময় প্রকাশ করার ভান করলেন। কিন্তু কোনও প্রতিকার হয়নি। যা চলছিল তাই চলছে। গরিব লোকেরা আইনের সাহায্যও নিতে পারেন না। এ তো প্রতিহিংসামূলক আচরণ।
ব্যাপক মানুষের কাছে আমাদের বক্তব্য কি করে পৌঁছাব? বড়লোকের কাগজে তো আমাদের বক্তব্য ছাপানো হয় না। আমেরিকাতেও বিরোধীদের বক্তব্য ছাপার ব্যবস্থা আছে। তাই আমাদের সভাসমিতির মাধ্যমে লোকের কাছে পৌঁছাতে হয়। কিন্তু ওরা আমাদের সভাসমিতি করতে দিচ্ছে না।
এতেও সন্তুষ্ট না— ওদের ইচ্ছে অন্য কোনও পার্টি থাকবে না। ভোট করব, সংসদীয় গণতন্ত্র নামে রাখব। কিন্তু ভোট দিতে দেব না, গণতন্ত্র থাকবে না।
এসব তো চলতে পারে না। যেভাবেই হোক জনমত সৃষ্টি করতে হবে এসবের বিরুদ্ধে।
আমাদের বন্ধু কৃষক-শ্রমিক-মধ্যবিত্ত জনগণ। একলক্ষ ওয়ারেন্ট বেরিয়েছে তাঁদের গ্রেপ্তারের জন্য। একটা গ্রামে সব পুরুষ অধিবাসীর নামে ওয়ারেন্ট বার করা হয়েছে। প্রতিপক্ষকে জেলে দেবার জন্য আমরা ওয়ারেন্ট বার করিনি।
আধা ফ্যাসিস্ট আক্রমণ শুরু হয়েছে। বহুকাল আগে ফ্যাসিবাদ শুনেছি। রাজনৈতিক গুণ্ডামি ইত্যাদি অর্থনৈতিক কারণে অনেকদিন ধরে হয়। কিন্তু সরকারি যন্ত্রের সঙ্গে গুণ্ডারা এক হয়েছে। নকশালপন্থীদের আগেই বলেছিলাম— প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে আপনাদের শেষ করে দেবে। তাই হয়েছে। এখন ছাত্রপরিষদ, যুব কংগ্রেস ইত্যাদি নামে শাসকদল একটার পর একটা হামলা চালাচ্ছে। দিনদুপুরে রাহাজানি করছে, দখল, খুন অভিযান চলছে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে। আত্মরক্ষার কোনও সুযোগ নেই। লক্ষ করবেন সেইসব এলাকায় তারা হামলা করছে, যেখানে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শক্তিশালী। নোটিশ দিচ্ছে আমাদের লোকেদের পাড়া ছাড়ার জন্য, উদ্দেশ্য অন্যদের সন্ত্রস্ত করা। অত্যাচার মহিলাদের উপরেও হচ্ছে। বর্ধমান শহরে ১৫ জনকে হত্যা করেছে দেড়বছরে। একটা লোক ধরা পড়েনি। কালনায় ৮ জন। পুলিশ সুপাররা উদ্যোগ নিচ্ছে। বাইরের লোকদের এসব কথা বললে তারা হতবাক হয়ে যান। বিশ্বাস করাই অন্যদের পক্ষে শক্ত হয়। ওদের দোষ দেব কি! এক পাড়ায় যা হচ্ছে, অন্য পাড়ায় লোক জানতে পারে না। কারণ বহুল প্রচারিত খবরের কাগজ এসব সংবাদ ছাপে না। এ পর্যন্ত ৫৫০ জন বন্ধু-দরদি হারিয়েছি। ওরা এতেও সন্তুষ্ট নয়। এখন আমাদের ছত্রভঙ্গ করতে চাইছে। তবে রাজনীতি দিয়ে নয়— গুণ্ডামি দিয়ে, সন্ত্রাস সৃষ্টি করে। মানুষকে ভোট দিতে দেওয়া হয় না— পাইপগান হাতে পুলিশের সামনে এসব হচ্ছে।
আমরা তাই চাই— রাজনীতিতে একমত না হলেও, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সবার কাছে আবেদন— গণতন্ত্রের ন্যূনতম শর্ত পরিস্থিতি আমাদের রক্ষা করতে হবে। আমেরিকা ব্রিটেনের সাংবাদিকেরাও এত মিথ্যা রিপোর্ট দেন না, যা এখানকার সংবাদপত্রগুলি ছাপে। ধর্মঘটের রিপোর্ট, কে জি বসুর বাড়ি আক্রান্ত হবার খবর ইত্যাদি অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়।
জনমত সংগঠিত করা তাই সহজ নয়, জানাতে বা বলতে পারলে এসব ঘটনা, অনেক কাজ হত। কিন্তু দুঃখ করে লাভ নেই। আমরা কমিউনিস্টরা যে কোনও অবস্থার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু এভাবে স্টিমরোলার চলতে থাকলে কেউ রেহাই পাবে না। কোনও শুভ শক্তিই অবশিষ্ট থাকবে না। দেশ-বিদেশের ইতিহাস সেই শিক্ষাই দেয়। শুরু হয় কমিউনিস্টদের দিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা সমগ্র জনগণকে গ্রাস করে। এখনো এইসব আক্রমণ নৃশংসতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যদি সবাই মিলে প্রতিবাদ জানানো যায়— তবে এর কিছুটা প্রতিবিধান নিশ্চয়ই হবে।
আপনাদের কাছে আমার আবেদন— এসব নৃশংস ঘটনার খানিকটাও যদি আপনারা আপনাদের ভাষায় বলেন, সরকারের কাছে তুলে ধরেন দলবদ্ধভাবে, তাহলে অনেক কাজ হয়। যেমনভাবে যতটুকু সম্ভব— একটা বিবৃতিও যদি দেন এসবের বিরুদ্ধে তাহলেও অনেক কাজ হয়।
এই শ্বাসরুদ্ধ অবস্থার মধ্যের আমাদের মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। তাই আমরা আক্রান্ত শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত জনগণকে সচেতন করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি। একাজে এই রাজ্যের বুদ্ধিজীবীদের কাছে আমাদের অনেক আশা। তাঁরা অতীতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রামের ঐতিহ্য রচনা করে গেছেন। আজ ব্যাপক জনগণের সঙ্গে লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরাও আক্রান্ত। আপনাদের কাছে অনুরোধ ভূলুণ্ঠিত গণতন্ত্র ও বিপন্ন মানবিকতার রক্ষার জন্য আপনাদের অসামান্য শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসুন। বিবৃতি দিন, আপনাদের লেখার মধ্য দিয়ে, শিল্পের মধ্য দিয়ে, জনগণের উপর সীমাহীন নিপীড়নের কথা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিন। সকলের সাহায্য নিয়ে আমরা নিশ্চয়ই এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারব আমাদের বিশ্বাস।
২৪ জানুয়ারি ১৯৭২। ভারতসভা হল। সন্ত্রাসবিরোধী লেখক শিল্পী কলাকুশলী সম্মেলন।
জননেতা শ্রী জ্যোতি বসুর আহ্বানে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লেখক শিল্পীদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সাহিত্যিক বরেন বসু।
সভায় আলোচনার ভিত্তিতে স্থির হয় যে, অবিলম্বে পশ্চিমবঙ্গে শিল্পী-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী ঐক্য গড়ে তোলার জন্য সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালানো দরকার। সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ঐক্য গড়ে তোলার জন্য এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করার জন্য কতকগুলি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সন্ত্রাস প্রতিহত করে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে সন্ত্রাসবিরোধী লেখক শিল্পী কলাকুশলী সম্মেলন নামে একটি মঞ্চ গঠিত হয়। আরও স্থির হয় অবিলম্বে একটি কনভেনশন ডাকা হবে। আহ্বায়ক নির্বাচিত হন নিমাই ঘোষ ও কিশলয় সেন। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭২। স্থায়ী সংগঠনের চেহারা দিতে মঞ্চের ডাকে সরলা রায় মেমোরিয়াল হলে ডাকা হয় একটি কনভেনশন। সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে হয় গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী কলাকুশলী সম্মিলনী। বিদ্যুৎ গোস্বামী এবং কিশলয় সেনকে আহ্বায়ক, মন্মথ রায়কে সভাপতি করে গঠিত হয় ৭১-জনের প্রস্তুতি কমিটি। নতুন সংগঠনের প্রথম সম্মেলন হয় পরের বছর ১৫-১৬ ডিসেম্বর। নন্দগোপাল সেনগুপ্ত সভাপতি এবং আশু সেন ও কিশলয় সেন যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৫, সংগঠন এক বিশেষ কনভেনশন থেকে গ্রহণ করে এক নতুন সংবিধান। সংগঠনের নাম পরিবর্তন করে হয় পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী সঙ্ঘ।
শিরোনাম মার্কসবাদী পথের
প্রকাশের তারিখ: ০৬-জানুয়ারি-২০২৩
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮১ টি নিবন্ধ
২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬
২৭-জানুয়ারি-২০২৬
০১-জানুয়ারি-২০২৬
১৫-নভেম্বর-২০২৫
১১-নভেম্বর-২০২৫
০৪-নভেম্বর-২০২৫
০৪-নভেম্বর-২০২৫
০৩-নভেম্বর-২০২৫
০২-নভেম্বর-২০২৫
২২-অক্টোবর-২০২৫
