Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

কর্নাটকের ভোটের বার্তা

নন্দন রায়
যে প্রশ্নটা এবারের কর্নাটক বিধানসভা নির্বাচনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তা হল এই নির্বাচনে বিজেপি কি আদৌ হেরেছে? এর উত্তর একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না। অনেকের কাছে এই প্রশ্নোত্তর হেঁয়ালির মতো শোনাবে। যে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কংগ্রেস এবার জিতেছে, তার পরে এই প্রশ্ন তোলার অর্থ কী? আসলে আমরা বলতে চাইছি যে ২০১৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় বিজেপির সমর্থন ভিত্তি কিন্তু হ্রাস পায়নি। সঠিকভাবে বলতে গেলে ২০১৮ সালে বিজেপি যেখানে মোট প্রদত্ত ভোটের ৩৬.২ শতাংশ পেয়েছিল, এবারে তা মাত্র ০.৩ শতাংশ কমে হয়েছে ৩৫.৯ শতাংশ। ২০১৮ সালের প্রাপ্ত ভোটের তুলনায় এবারে কংগ্রেস প্রায় ৫ শতাংশ ভোট বেশি পাওয়াতে তাদের জেতা আসন সংখ্যা ৫৫টি বেড়ে গিয়েছে। বিপরীতে বিজেপি ও কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট শতাংশের ব্যবধান বেশ অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় বিজেপির আসন সংখ্যা ৩৮টি কমে গিয়েছে।
Karnataka Election

যে দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা হোক না কেন, কর্নাটকের নির্বাচনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বার্তা হল মোদির অপরাজেয়তার মিথ ভেঙে গিয়েছে। একথা সত্যি যে এর আগে হিমাচল প্রদেশের ভোটেও বিজেপি পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু ধারে ভারে ও গুরুত্বে হিমাচলের সঙ্গে কর্নাটকের কোনও তুলনা চলে না। কর্নাটকে বিজেপির পরাজয় আরও গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে বিজেপি-আরএসএস চক্র অনেক পরিকল্পনা করে এই রাজ্যটিতে গুজরাট মডেলের রেপ্লিকা তৈরি করতে চেয়েছিল যাতে দাক্ষিণাত্যের ‘গেটওয়ে’ এই রাজ্যে এমন একটা উদাহরণ প্রতিষ্ঠা করা যায় যা দেখে দক্ষিণের রাজ্যগুলি বুঝতে পারে আগামী দিনগুলিতে নয়া-ফ্যসিবাদী বিজেপি তাদের জন্য কী উপহার দিতে চলেছে।

বছর দুয়েক আগে পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি পরাজিত হয়েছিল বটে, কিন্তু সেই বিজেপি ছিল একাধারে ‘বহিরাগত’ এবং অন্যদিকে ঝড়তি-পড়তি তৃণমূলীতে বোঝাই। রুটি-রুজির লড়াইকে বুথস্তর পর্যন্ত নিয়ে যেতে না-পারায় বামপন্থীদের দুর্বলতা ও গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলির জোড়াতালি দেওয়া জোট দুই স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির মহারণের মধ্যে পড়ে মানুষের মনে তেমন কোনও রেখাপাত করতে পারেনি। ফলে রাজ্যে ফিরে এসেছে দুর্নীতি-দুষ্কৃতি-লুম্পেনরাজ। সারা দেশে এ এক অন্যন্য কুশাসন। 

হিন্দি বলয়ের বাইরে, বিশেষত গোটা দ্রাবিড় ভূমে, অর্থাৎ দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলিতে এবং আসাম ছাড়া পূর্ব ও উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলিতে, যেখানে শক্তিশালী ভাষাগত সাংস্কৃতিক পরিচিতির দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে অথবা তুলনায় বিচ্ছিন্ন জাতিগত পরিচিতির শক্তিশালী আবেদন রয়েছে (উত্তর-পূর্বে), সেখানে হোমোজিনিয়াস ব্রাহ্মণ্যবাদী আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। কর্নাটকে বিজেপি সেই চেষ্টা করেছিল যা আপাতত পরাজিত হয়েছে। যদি প্রশ্ন ওঠে গো-বলয়ে বিজেপি কি এই বিরোধিতার সম্মুখীন হয় না? আপাতত এর উত্তর: না। কারণ প্রথমত, এই অঞ্চলের ভাষাগুলি তেমন কোনও শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তোলেনি এবং দ্বিতীয়ত, মুখ্যত এই সামাজিক-অর্থনৈতিক-মনস্তাত্বিক এবং রাজনৈতিক কারণে ঊনবিংশ শতাব্দী থেকে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুত্বের আবেদন জনসাধারণের মনে রেখাপাত করানোর জন্য আরএসএস-এর প্রচেষ্টা সম্ভব হয়েছিল।

যে কর্পোরেট-কমিউনাল আঁতাত এখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন, আদানির পতনের পরের ঘটনাবলি দেখিয়ে দিয়েছে জনগণের দুর্দশায় মোদির অহরহ অশ্রুমোচন কী নিদারুণ ভণ্ডামির প্রমাণ। যে ‘বিকাশ’-এর ঢক্কানিনাদে বিজেপি আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করে, কর্নাটকের নির্বাচনের প্রচারে তা নিয়ে বিজেপির নেতাদের মুখে একটি কথাও শোনা যায়নি। খোদ মোদি এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গোরা দুর্নীতি নিয়ে অথবা কর্মসংস্থান নিয়ে মুখে কুলুপ এঁটে রেখেছিল। আরও দেখা গেল যে এইসব অনুপান ছাড়া ক্রমাগত সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের প্রচেষ্টা এবং জঙ্গি জাতীয়তাবাদের আস্ফালন, অন্তত কর্নাটকের এবারের নির্বাচনে, তার ম্যাজিক হারিয়ে ফেলেছে।

শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে কর্নাটকের নির্বাচনে ভোটদানের ক্ষেত্রে সামাজিক ও রাজনৈতিক নিপীড়ক শ্রেণিগুলির বিরোধিতায় অর্থাৎ অন্যভাবে বললে, কর্পোরেট-কমিউনাল শ্রেণির বিরোধিতার ছবিটি স্পষ্ট। লোকনীতি-সিএসডিএস-এর সমীক্ষা অনুসারে নিম্নবর্গীয় মানুষ ভোট দিয়েছেন কংগ্রেসকে। কর্নাটকের সবচেয়ে ধনী এলাকা যেমন বেঙ্গালুরু শহর, উদুপী ও দক্ষিণ কর্নাটকে প্রান্তিক মানুষরা বিজেপিকে খুব কম ভোট দিয়েছেন, অথচ বড়লোকরা ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। আবার উচ্চবর্ণ জাতিগুলি বেশি ভোট দিয়েছে বিজেপিকে, কিন্তু কুরুবা, দলিত, আদিবাসী এবং মুসলিমরা ঢেলে ভোট দিয়েছে কংগ্রেসকে। কিন্তু ওবিসি সম্প্রদায়ের প্রদত্ত ভোট খানিকটা ব্যতিক্রমী— তারা বিজেপি ও কংগ্রেসকে প্রায় সমান অনুপাতে ভোট দিয়েছেন। এটা মোদির কারণেও হতে পারে। কিন্তু শ্রেণি সচেতনতার, শ্রেণি-সমন্বয় এবং শ্রেণি-সহযোগিতার ছবিটি, বিশেষ করে সচেতনতার ছবিটি আবছা— বামপন্থী দলগুলি ভোট পায়নি বললেই চলে (সিপিআই ০.০২ শতাংশ, সিপিআই(এম) ০.০৬ শতাংশ, লিবারেশন ও ফরোয়ার্ড ব্লক কিছুই পায়নি)। লিঙ্গায়েত ও ভোক্কালিগা উভয় সম্প্রদায়ই এবারে কংগ্রেসকে তুলনায় বেশি ভোট দিয়েছেন, যদিও ঐতিহ্যগতভাবে এরা যথাক্রমে বিজেপি ও জেডিএস-এর সমর্থক। 

একটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল এক বৃহৎ সংখ্যক কংগ্রেস সমর্থকরা ভোটের প্রচার শুরু হওয়ার আগেই মনস্থির করে ফেলেছিলেন যে তারা কংগ্রেসকেই ভোট দেবেন। এক্ষেত্রে তাই এই প্রশ্নটি ওঠা স্বাভাবিক যে ২২ দিন ব্যাপী কর্নাটকের ২০টি বিধানসভা এলাকাজুড়ে ভারত-জোড়ো যাত্রা কি কংগ্রেসের পালে হাওয়া টানতে পেরেছিল? এর উত্তর যে ইতিবাচক তা ফলাফল দেখিয়ে দিচ্ছে। তদুপরি যেখানে বিজেপির প্রচারে শুধুই মেরুকরণ, সেখানে কংগ্রেসের নেতারা জীবন-জীবিকার সমস্যার কথাই তুলে ধরেছিল। 

অমিত শাহ বলেছিলেন কংগ্রেস জিতলে দাঙ্গা হবে। অথচ মনিপুরে ডাবল ইঞ্জিনের সরকার থাকা সত্ত্বেও সেখানেই জাতি-দাঙ্গা লেগেছে। কর্নাটক দখলে বিজেপি এতটাই মরিয়া ছিল যে ঐরকম ভয়াবহ দাঙ্গার প্রশমনে খোদ প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি কথাও বললেন না। বরং কর্নাটকে পড়ে থেকে ‘জয় বজরংবলীর’ নামে ভোট চেয়ে কর্নাটকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর উসকানি দিলেন। এটা তো প্রমাণিত যে এদেশের ইতিহাসে বিজেপি-ই দাঙ্গাবাজ, বিরোধীরা নয়। সারাক্ষণ গোটা দেশকে আভ্যন্তরীণ ও বহির্দেশীয় কল্পিত শত্রুর ভয় দেখিয়ে ত্রস্ত করে রেখে ধান্ধাবাজ পুঁজির সেবা করে এবং বিরোধী কন্ঠস্বরকে দমন করে মোদি যে কৌশলে একাদিক্রমে নয় বছর রাজত্ব করে চলেছেন, সেইসব চমক দেওয়া কায়দা-কানুন ক্রমশ তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে। ধ্রুপদী ফ্যসিবাদের বিপরীতে নয়া-ফ্যসিবাদের সমস্যা হল যে যুদ্ধ লাগাতে পারে না, গণতন্ত্রের ভেক ধরেই তাকে চলতে হবে, সংবিধানের নামগান করেই তাকে সংবিধানকে পঙ্গু করার জন্য অন্তর্ঘাত চালাতে হবে। বিরোধী শিবিরের অনৈক্য তো আছেই, সেই জন্য মোদি ভোটে ম্যাজিক দেখাতে পারেন। কিন্তু এতদসত্ত্বেও, নির্বাচন কমিশন সহ সমস্ত স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে  কব্জা করেও কর্নাটকের মতো বিপর্যয়কে রোধ করার ক্ষমতা তার নেই। 

দুই

যে প্রশ্নটা এবারের কর্নাটক বিধানসভা নির্বাচনে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, তা হল এই নির্বাচনে বিজেপি কি আদৌ হেরেছে? এর উত্তর একই সঙ্গে হ্যাঁ এবং না। অনেকের কাছে এই প্রশ্নোত্তর হেঁয়ালির মতো শোনাবে। যে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কংগ্রেস এবার জিতেছে, তার পরে এই প্রশ্ন তোলার অর্থ কী? আসলে আমরা বলতে চাইছি যে ২০১৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় বিজেপির সমর্থন ভিত্তি কিন্তু হ্রাস পায়নি। সঠিকভাবে বলতে গেলে ২০১৮ সালে বিজেপি যেখানে মোট প্রদত্ত ভোটের ৩৬.২ শতাংশ পেয়েছিল, এবারে তা মাত্র ০.৩ শতাংশ কমে হয়েছে ৩৫.৯ শতাংশ। ২০১৮ সালের প্রাপ্ত ভোটের তুলনায় এবারে কংগ্রেস প্রায় ৫ শতাংশ ভোট বেশি পাওয়াতে তাদের জেতা আসন সংখ্যা ৫৫টি বেড়ে গিয়েছে। বিপরীতে বিজেপি ও কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট শতাংশের ব্যবধান বেশ অনেকটা বেড়ে যাওয়ায় বিজেপির আসন সংখ্যা ৩৮টি কমে গিয়েছে।

বিজেপি ও কংগ্রেসের আসন সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধির পেছনে জেডি(এস)-এর প্রাপ্ত ভোট ও আসন সংখ্যারও অবদান রয়েছে। ২০১৮ সালে জেডি(এস)-এর প্রাপ্ত ভোট শতাংশ ছিল ১৮.৩ শতাংশ, যেটা এবারে  হ্রাস পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১৩.৪ শতাংশ। অর্থাৎ হ্রাসের পরিমান কংগ্রেসের ভোটবৃদ্ধির সমান। অর্থাৎ বিজেপির মূল্যে নয়, কংগ্রেস জিতেছে জেডি(এস)-এর মূল্যে। এখানে একটা কথা অবশ্যই বলে রাখা দরকার যে এক দল থেকে আর এক দলে ভোটের চলন এমন সরল পাটিগণিতের নিয়ম মেনে হয় না, তা অনেক বেশি জটিল, কারণ ভোট দেয় মানুষ। এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব এক জটিল বিজ্ঞান। এমনটা হতে পারে যে এবারে বিজেপির কিছু ভোট কংগ্রেসের পক্ষে গিয়েছে এবং জেডি(এস)-এর কিছু ভোট বিজেপির বাক্সে গিয়েছে। মোট সংখ্যার বিচারে এর ফলে কিছু তারতম্য হবে না ঠিকই, কিন্তু আসন জেতা-হারার ক্ষেত্রে এর কিছু প্রভাব পড়তে পারে। এরকম কিছু ঘটেছে মনে হয়, নইলে উগ্র হিন্দুত্বের জন্য কুখ্যাত কিছু এলাকায় কংগ্রেস থাবা বসাতে পারলো কীভাবে? বাগালকোট জেলার বিলাগি আসনে, চামারাজানগরে, মালান্দ জেলার কোদাগু কেন্দ্রে, চিকমাগালুরু কেন্দ্রে প্রভৃতি আরও বেশ কিছু বিজেপির জেতা আসন কংগ্রেস এবার ছিনিয়ে নিয়েছে। এগুলি ভোটের চলনের জটিলতার প্রমাণ।

প্রচার শুরু হওয়ার আগেই গরিষ্ঠ সংখ্যক মানুষ কাকে ভোট দেবেন সেই ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলা, বিজেপির পরাজয় সুনিশ্চিত করার জন্য ট্র্যাডিশনাল জেডি(এস) সমর্থকের একটা অংশের কংগ্রেসকে ভোট দেওয়া, বিজেপির ঘৃণার উদ্গীরণের ও বিভাজনের বিপরীতে রাহুল গান্ধীর ভারতজোড়ো যাত্রা, প্রচারে বিজেপির প্ররোচনার ফাঁদে পা না-দিয়ে জীবন ও জীবিকার সমস্যাগুলি তুলে ধরা প্রভৃতি পদক্ষেপ মেরুকরণের রাজনীতির এবং অর্থ ও বাহুবলের প্রদর্শনের সীমাবদ্ধতাকে প্রকট করে দিয়েছে। 

কিন্তু আমরা এখানে ভোটের সংখ্যা তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে বসিনি। আমাদের উদ্দেশ্য রাজনৈতিক বিশ্লেষণ। মোদির ভোটের প্রচারের ধরনের সঙ্গে মমতা ব্যানার্জির প্রচারের মিল কৌতুকের উদ্রেক করে। মমতা যেমন বলেন ২৯৪টি আসনে আমিই প্রার্থী, সব জায়গায় আমাকে দেখেই ভোট দিন, একইভাবে মোদি সব কাজ ছেড়ে কর্নাটকেই পড়েছিলেন। গত ছমাসে তিনি ১১ বার কর্নাটকে এসেছেন, ৪৬টি সভা করেছেন, ২৫ কিলোমিটার রোড শো করেছেন। তদুপরি ‘চল্লিশ পারসেন্ট কমিশনের সরকার’-এর বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না-নিয়ে মোদি তার প্রচারে আঞ্চলিক কোনও নেতাকে সঙ্গী না-করে শুধু নিজেকেই তুলে ধরেছেন, সভায় সভায় শ্রোতাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন এই নির্বাচন তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির নির্বাচন, মানুষ যেন তাকে দেখেই ভোট দেন। মমতা ও মোদি এই মরিয়া প্রচারের ধরন আসলে তাদের আতঙ্কের বহিঃপ্রকাশ। বাইরে যতই কেউ নিজেকে ‘রাফ এন্ড টাফ’ দেখাবার চেষ্টা করুন না কেন, যতই ‘ছাপ্পান্ন ইঞ্চি ছাতি’ বাজান না কেন, অন্তরে তারা সব স্বৈরতন্ত্রীর মতোই নিরাপত্তাহীনতায় সর্বদাই তটস্ত থাকেন। আগ্রাসন তাদের আত্মরক্ষার কৌশল। সুতরাং বলা যায় এই নির্বাচনে পরাজয় আসলে মোদির ব্যক্তিগত পরাজয়। 

তিন 

বিজেপির পরাজয়ের প্রভাব আগামী দিনে অন্যান্য রাজ্যে কি পড়বে? বিশেষত আগামী বছরের লোকসভা নির্বাচনে? এই প্রশ্নেরও উত্তর যুগপৎ হ্যাঁ ও না। গোটা দ্রাবিড়ভূমির সরকারি ক্ষমতা থেকে বিজেপির অপসারণ এই অঞ্চলের রাজ্যগুলিতে কিছুটা ripple effect ফেলবে একথা অনস্বীকার্য। বহুদিন পরে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে ক্ষমতার অলিন্দে ফিরে আসা কংগ্রেসকে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তিশগড়ে আসন্ন প্রাদেশিক নির্বাচনে নিশ্চয় উদ্দীপ্ত করবে। কিন্তু সেই উদ্দীপনা এই রাজ্যগুলিতে বিজেপির পুনর্দখলের অভিযানকে কতটা ঠেকাতে পারবে সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। বেশ কিছুদিন আগে মধ্যপ্রদেশে বিজেপি ও কংগ্রেস সরকারের অনুসৃত নীতির মধ্যে তফাৎ চোখে পড়ে না-বলে প্রভাত পট্টনায়েক খেদ প্রকাশ করেছিলেন। 

আসলে কর্পোরেট-কমিউনাল আঁতাতের রাজনৈতিক অর্থনীতি একমাত্র বামপন্থীরাই সঠিকভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারে, কোনও বুর্জোয়া দলের মতাদর্শ এই দৃষ্টিভঙ্গি আয়ত্ত করতে পারে না। কিন্তু জাতীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার মতো প্রয়োজনীয় শক্তি বামপন্থীদের হাতে নেই। ইতিহাস দেখায় যে ১৯৩০-এর দশকে জার্মানির শেষ স্বাধীন নির্বাচনে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের সাথে কমিউনিষ্টরা একই সরকারে শামিল হবে কিনা এই নিয়ে দীর্ঘসূত্রিতার সুযোগে হিটলার ক্ষমতা দখল করে তড়িৎগতিতে ফ্যাসিবাদ কায়েম করতে পেরেছিল (The Rise and Fall of The Third Reich, W.L. Shirer. ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে ডিমিত্রভ়ের সূত্রায়ন কমিউনিষ্ট আন্তর্জাতিকের সপ্তম কংগ্রেসে গৃহীত হয় ১৯৩৩ সালের এই ঘটনার পরে, ১৯৩৫ সালে)। 

মনে রাখতে হবে কর্নাটকের নির্বাচনে বিজেপি পরাজিত হলেও তার সমর্থন ভিত্তি অটুট রয়ে গিয়েছে। ফলে তারা নতুন সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলবে এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখা কষ্টকর করে তুলবে। উপরন্তু টাকার থলি কিন্তু দিল্লির হাতে। সেই বাবদে মোদির প্রতিহিংসার প্রত্যাঘাতও নতুন সরকারকে সইতে হবে। কংগ্রেসের পক্ষে সে বড়ো সুখের সময় নয়। মহারাষ্ট্রে সরকার ফেলার মতোই বিজেপির অন্তর্ঘাতের আশঙ্কা থাকবে। বিজেপি প্রাণপণে সেই চেষ্টাও করবে।

যদি ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের কথা বিবেচনা করা যায় তাহলে গণৎকার না-হলেও বলা যায় যে, যেহেতু কর্পোরেট-কমিউনাল আঁতাত বহাল রয়েছে, সেই কারণে বিজেপির অর্থ ও পেশিশক্তিও বহাল রয়েছে পুরো মাত্রায়। তদুপরি বহাল আছে কর্পোরেট মিডিয়ার নিঃসপত্ন সহযোগিতা। এবারের ভোট গণনার দিনও দেখা গিয়েছে যেই মুহূর্তে বিজেপির পরাজয় নিশ্চিত হয়ে গেল, সেই মুহূর্ত থেকে দেশের সবচেয়ে বড় খবর— কর্নাটকের ভোট গণনা থেকে সরে এসে উত্তরপ্রদেশের নগর-পালিকা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের খবর প্রচার করতে শুরু করেছে। অদৃষ্টের পরিহাস; ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছে যে নগর-পালিকা নির্বাচন যোগীর চমৎকারিত্বে ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত নির্বাচনের ‘কায়দায়’ সংঘটিত হয়েছে! 

সুতরাং জাতীয় নির্বাচনে বিজেপি কী খেল দেখাবে সেটা এখনই বলা যাবে না। ভারতের গণতান্ত্রিক সাধারণতন্ত্রের চরিত্র থেকে সাধারণতন্ত্র শব্দটি কবেই হঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ছিল গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের দ্বারা দেশ শাসনের ধারণা। এখান থেকেও গণতন্ত্র শব্দটিও ছেঁটে ফেলার কাজটাও সম্পূর্ণতা প্রাপ্তির মুখে। বাকি আছে কেবল নির্বাচন শব্দটা। সেটা থাকবে এবং নির্বাচন হবেও। তবে সেই নির্বাচনে কোন ‘অঘটন’ ঘটবে কিনা সেটা কোটি টাকার প্রশ্ন। 

এই নিবন্ধে ব্যবহৃত সংখ্যা তথ্যগুলি ইলেকশন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে এবং ১৫ মে তারিখে ‘দি হিন্দু’ পত্রিকায় প্রকাশিত লোকনীতি-সিএসডিএস সমীক্ষা থেকে নেওয়া হয়েছে।

মতামত লেখকের নিজস্ব


প্রকাশের তারিখ: ২০-মে-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৪৯ টি নিবন্ধ
২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬