Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

ব্রাজিলে লুলার জয়, বিশ্বের জন্যও জয়

বিজয় প্রসাদ
২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তিনি কমিউনিটি অফ লাতিন আমেরিকান অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান স্টেটস(সিইএলএসি) গোষ্ঠী গড়ে তোলাতেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। লুলা বলেছেন, এই দুটি মঞ্চেই তিনি নতুন শক্তি সঞ্চারিত করবেন এবং নেতৃত্ব দেবেন যাতে এই দুই মঞ্চকে একটা সোশাল ডেমেক্রেটিক প্রকল্পের দিশায় পরিচালিত করা যায়। যুদ্ধের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং জনগণের প্রকৃত ও নির্দিষ্ট মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী এমন একটা দুনিয়া গড়ে তোলার কাজে এই দুই মঞ্চকে প্রয়াসী করে তুলতে চান তিনি।
Lula Win Brazil

৩০ অক্টোবর, ২০২২। ব্রাজিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ডে জয়ী হলেন লুই ইনাসিও লুলা ডা সিলভা (‌লুলা নামেই সুপরিচিত)‌। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত এই নির্বাচনে   হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। লুলা পেয়েছেন ৫০.‌৯ শতাংশ ভোট (‌৬ কোটি)‌। প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি জাইর বোলসোনারো পেয়েছেন ৪৯ শতাংশ ভোট (‌৫ কোটি ৮০ লক্ষ)‌। দেশের উত্তর ও উত্তর পূর্বাঞ্চল, যে এলাকায় খুব বেশি সংখ্যায় থাকেন আফ্রো–ব্রাজিলিয় এবং ভূমিপুত্র ভোটদাতারা, সেই সব এলাকায় বিপুল ভোটে জিতেছেন লুলা। দেশের দক্ষিণাঞ্চল সমর্থন করেছে বোলসোনারোকে। ব্রাজিলের ধনীরা ভোট দিয়েছেন বোলসোনারোকে, গরিবেরা ভোট দিয়েছেন লুলাকে — ফলে শ্রেণি বিভাজন একেবারে স্পষ্ট। কিন্তু যে অংশের ভোটাররা রক্ষণশীল ইভানজেলিক্যাল গির্জার অনুগামী, তাঁদের সিদ্ধান্তটা ঘোলাটে ধরনের। 

২ অক্টোবর প্রথম দফার ভোটে লুলা অন্যান্য প্রার্থীদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন, পেয়েছিলেন বোলসোনারোর চেয়ে ৬০ লক্ষ বেশি ভোট। কিন্তু তিনি সরাসরি মোট ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি পাননি। তাই তখনই তাঁকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায়নি। দ্বিতীয় রাউন্ডে এসে লুলা ও বোলসোনারোর ব্যবধান কমেছে। তবে এতটা কমেনি যে বোলসোনারোই ফের রাষ্ট্রপতি থেকে যেতে পারেন। টাকার থলি, রাস্তার সন্ত্রাস, ভুয়ো খবর — সব হাতিয়ারই কাজে লাগিয়েছেন বোলসোনারো।  কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। ২০০৩ থেকে ২০১০, দু দফায় দেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন লুলা। এবার ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি তিনি ফিরে আসবেন ব্রাসিলিয়ার প্যালেসিও ডো প্ল্যানালটোতে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্বভার সামলাতে।

মানবতার উভয়সঙ্কট

লুলার জন্ম ১৯৪৫ সালে। কিশোর বয়সেই তিনি গাড়ি কারখানার শ্রমিক হিসাবে কাজে যোগ দেন (‌১৯ বছর বয়সে কারখানার মধ্যেই দুর্ঘটনায় তাঁর হাতের দুটি আঙুল কাটা পড়ে)‌। সামরিক একনায়কত্বের দমবন্ধ করা বছরগুলিতে (‌১৯৬৪–১৯৮৫)‌ লুলা শ্রমিক আন্দোলন এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলতে সাহায্য করেন। ১৯৮০ সালে বামপন্থীদের একটি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগ দিয়ে গড়ে তোলেন দ্য ওয়ার্কার্স পার্টি (‌পিটি)‌। এই দল বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন এবং অন্যান্য গণ সংগঠনগুলিকে সঙ্গে নিয়ে (‌যার মধ্যে পড়ে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ভূমিহীন শ্রমিক আন্দোলন, দ্য এমএসটি)‌ গড়ে তোলে এক বড়সড় প্রচার আন্দোলন। সেই আন্দোলনের ধাক্কাতেই একনায়কতন্ত্রের অবসান হয়। একনায়কতন্ত্রের পতনের পরের বছর ১৯৮৬ সালে লুলা ব্রাজিলের কংগ্রেসে নির্বাচিত হন। গোটা দেশের মধ্যে তিনিই পেয়েছিলেন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক ভোট। প্রথম দিককার এই সব সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে  জনগণতন্ত্র এবং সমাজতান্ত্রিক নীতির প্রতি লুলার রাজনৈতিক অঙ্গীকার — একটি ধারায় এসে মিলে গিয়েছিল।

ক্ষুধা, অশিক্ষা ও গৃহহীনতা— এর মধ্যে কোনটা আগে, কোনটা পরে সমাধান করা দরকার, এই জিজ্ঞাসা সব সময়ই মানবতার কাছে উভয়সঙ্কট। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন লুলা যথাসাধ্য প্রয়াস চালিয়েছিলেন এমন সব কাঠামো গড়ে তুলতে যার সাহায্যে এই উভয়সঙ্কট থেকে চিরকালের জন্য উত্তরণ ঘটানো যাবে। এগুলিকে চিরকালের মতো  পিছনে ফেলে রেখে এগিয়ে যাওয়া যাবে। ক্ষুধাকে চিরতরে নির্বাসন দেওয়ার লক্ষ্যে যে বিপুল অভিযান চলেছিল — (‌হাঙ্গার)‌ জিরো থেকে বোলসা ফ্যামিলিয়া পর্যন্ত—তার ফলে ক্ষুধার অভিশাপ ঝেঁটিয়ে সাফ করা সম্ভব হয়েছিল। এরই জেরে ২০১০ সালে রাষ্ট্রসঙ্ঘের তরফ থেকে লুলা পেয়েছিলেন ‘‌গ্লোবাল চ্যাম্পিয়ন ইন দ্য ব্যাটল এগেনস্ট হাঙ্গার’‌ সম্মান। সরকারি বিশ্ববিদ্যলয় গড়ে তোলা, সরকারি আবাসন–সহ দেশের পরিকাঠামো গড়ে তোলায় সরকারি কোষাগারের অর্থ কাজে লাগানো— এসবের ফলে ব্রাজিলের আর্থিক বৃদ্ধির হার অনেকটা বেড়েছিল এবং দেশে সামাজিক বৈষম্য কমেছিল। রাষ্ট্রপতি পদে লুলার এবং তাঁর উত্তরসূরি দিলমা রুসেফের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এইসব সমাজতন্ত্রীদের সাফল্যগুলিকে একেবারে উল্টে দিয়েছিল চরম দক্ষিণপন্থীরা। এর অন্যতম সূচক হল, ক্ষুধার্ত জনসংখ্যার হার বেড়ে গিয়েছিল এমন একটা স্তর পর্যন্ত যা ১৯৯০এর দশকের পর্ব থেকে আর কখনও দেখা যায়নি (‌তীব্র ক্ষুধার অনিশ্চয়তা থেকে ভুগছেন ব্রাজিলে এমন নাগরিকদের সংখ্যা ২০১৮ থেকে ২০১৯ এর মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছিল)‌। এবং ২০২০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের অর্ধেক জনসংখ্যাই ছিল ক্ষুধার্ত।

প্রথম ও দ্বিতীয় রাউন্ডের মধ্যবর্তী সময়ে, লুলা একটা চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে সম্বোধন করেছিলেন ব্রাজিলের ভাবীকালের জনগণকে। সেই চিঠিতে ছিল ১৩টি পয়েন্ট। সেসবের গভীরে ছিল এই শপথ যে,অর্থনীতিতে  নতুন করে গতিসঞ্চার করে সামাজিক জীবনের পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে, এবং সেই বদল আসবে শিল্পায়ন এবং নলেজ সেক্টরের আধুনিকীকরণের নীতির ভিত্তিতে। কাঁচা মাল রপ্তানি ও তৈরি পণ্য আমদানি— অর্থনীতির এই ছক থেকে সরে আসতে হবে ব্রাজিলকে। যখন ফোর্ড কোম্পানি জানাল সাও বারনারডোর (‌সাও পাওলো রাজ্যে)‌ কারখানা তারা বন্ধ করে দেবে তখন বোলসোনারো জানিয়েছিলেন এটা অবশিল্পায়নের আরও একটা  নজির, তবে এর বিরুদ্ধে তিনি আর লড়াই করবেন না। জানিয়েছিলেন, ওই কারখানাকে সাহায্য করার জন্য কোনও সরকারি অর্থ খরচ করবেন না। বোলসোনারো অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসাবে কৃষিবাণিজ্যকেই উৎসাহ দিয়েছেন। একইসঙ্গে দেশের শিল্পভিত্তিকে অবহেলা করেন তিনি (‌এই নীতি বদলের ফল দঁড়িয়েছে বিমান রপ্তানিকারী দেশ থেকে ব্রাজিল পরিণত হয়েছে সয়া রপ্তানিকারী দেশে)‌। লুলা তাঁর চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘‌রেসপিরেটর, সার, ডিজেল, কিংবা গ্যাসোলিন আমদনির ওপর ব্রাজিলের নির্ভর করে থাকার দরকার নেই। মাইক্রোপ্রসেসর, উপগ্রহ, বিমান এবং প্ল্যাটফর্ম আমদানির ওপর নির্ভর করে থাকার দরকার নেই। সফটঅয়্যার, প্রতিরক্ষা, টেলিকমিউনিকেশনস এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ক্ষেত্রে আমাদের দেশের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেগুলিকেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়া উচিত।’‌

দক্ষিণপন্থার হামলা

ব্রাজিলে নতুন প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে। স্বাভাবিক ভাবেই ব্রাজিলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা শ্রমিক শ্রেণি ও কৃষকদের স্বার্থবাহী নয়। ব্রাজিলের রাজনৈতিক জগতের রয়েছে তিনটি ব্লক — বিফ (‌গোমাংস)‌, বাইবেল ও বুলেট (‌ব্যানকাডাস ডো বোই, ডো বিবলিয়া এ ডা বালা)‌। একটি ব্লক সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমর্থনকারী (‌বুলেট)‌, দ্বিতীয় ব্লক ইভানজেলিক্যাল পার্লামেন্টারি ফ্রন্ট (‌বাইবেল)‌ এবং তৃতীয় ব্লকটিতে রয়েছে বৃহৎ কৃষিবাণিজ্য  কোম্পানিগুলি যারা চায় কৃষিক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণে চালু থাকা সব আইন ও অরণ্য সংরক্ষণে চালু সবরকম বিধিনিষেধ পুরোপুরি গোল্লায় যাক (‌বিফ)‌। এই তিনটি ব্লক এবং দ্য সেনট্রাও (‌দ্য সেন্টার)‌–এর  চরম সুবিধাবাদী রাজনৈতিক প্রকল্পগুলিই ন্যাশনাল কংগ্রেসে এবং বেশিরভাগ রাজ্যের রাজনৈতিক কাঠামোয় আধিপত্য কায়েম করে রেখেছে। লুলা ও দিলমা যেসব অ্যাজেন্ডা সাজিয়েছিলেন তাতে চরম ক্রুদ্ধ হয়ে এই সব রাজনৈতিক শক্তিগুলি ব্রাজিলের আকাশে জড়ো হয়েছিল কালো মেঘের মতো এবং এরাই ২০১৬ সালে পরিষদীয় অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দিলমাকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল এবং লুলাকে ফাঁদে ফেলেছিল আইনি জটিলতাকে কাজে লাগিয়ে। এরই জেরে ২০১৮ সালে ৫৮০ দিনের জন্য তাঁকে জেলে থাকতে হয়েছিল। ‌ ‘legislative coup‌’‌ বা ‌‘পরিষদীয় অভ্যুত্থান’‌ এবং ‘lawfare’‌— এই দুটি শব্দবন্ধ এত বেশি ব্যবহার হয়েছে যে তা ব্রাজিলের জনগণের শব্দভাণ্ডারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গিয়েছিল। তাঁরা দেখেছিলেন সেনট্রাও দেশের এলিট ও তাঁদের বহুজাতিক বন্ধুদের স্বার্থরক্ষায় কোনও পদ্ধতিই কাজে লাগাতে বাকি রাখছে না।

দিলমা ও লুলার ওপর যে হামলা নামল তার ফলেই (‌২০১৬–২০১৮)‌ মিশেল টেমারের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পদ সুগম হল এবং তার পর ২০১৮র রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিতলেন বোলসোনারো। বোলসোনারোর রাষ্ট্রপতি পদে মেয়াদকালীন বৈশিষ্ট্য দুটো— প্রথমত, দেশে দক্ষিণপন্থার এতদূর বাড়বাড়ন্ত হল যে এটা একটা ব‌ড়সড় আন্দোলন হিসাবে দেখা দিল এবং দ্বিতীয়টি হল, অতিমারি ও দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটের মোকাবিলায় বোলসোনারোর সরকারের চরম ব্যর্থতা। খণ্ড–বিখণ্ড দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি ক্রমশ জড়ো হল বোলসোনারোর চারপাশে এবং তিনি হয়ে উঠলেন তাঁদের ত্রাতা বা মেসায়া (‌বোলসোনারোর মধ্যনাম মেসসিয়াস)‌। ক্রমশ বোলসোনারো সব ধরনের শালীনতা এবং গণতন্ত্রের মূল রীতিনীতির তোয়াক্কা না করেই চলতে শুরু করলেন এবং দেশে তার গ্রহণযোগ্যতাও বাড়ল। নির্বাচনী প্রচারের সময় লুলা বলেছিলেন, ‘‌বোলসোনারো একজন ডাহা মিথ্যবাদী যিনি তাঁর ক্ষমতায় থাকার মেয়াদকালীন ৬৪৯৮ বার মিথ্যা কথা বলেছেন।’‌ নতুন এই দক্ষিণপন্থী আন্দোলনের লব্‌জই হয়ে দাঁড়াল সত্যকে অস্বীকার করা, হিংসার হুমকি দেওয়া এবং হিংসাত্মক হামলাকে কাজে লাগানোর অবাধ লাইসেন্স পেয়ে যাওয়া। প্রতিষ্ঠানের পুরনো তিনটি স্তম্ভকে (‌বিফ, বাইবেল, বুলেট)‌ এখন আরও উগ্র চেহারা দিল ক্ষমতার কর্তৃত্বে থাকা লোকজনের দপ্তরগুলি। কর্তৃত্বে থাকা ওই সব লোকেরাই রাস্তার হিংসা নিয়ন্ত্রণ করত। আর এই সুযোগে বড় কৃষকেরা (‌কৃষিবাণিজ্য লবির স্বার্থবাহী)‌, ইভানজেলিক্যাল গির্জাগুলি এবং নিরাপত্তা বাহিনী তাদের নিজেদের প্রকল্পকেই ব্রাজিলের জাতীয় প্রকল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য উঠে পড়ে লাগল।

দুটো নয়, একটাই ব্রাজিল

অন্যায়ভাবে লুলাকে কিউরিটিবা জেলে আটকে রাখা হয়েছিল। দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে ও শালীনতা–ভদ্রতার নিয়মকানুনগুলিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে লুলা চাইলেন একাট সোশাল ডেমোক্রেটিক প্রকল্প গড়ে তুলতে। এই লক্ষ্য সফল করার জন্য তিনি হাত মেলালেন মধ্যপন্থী–দক্ষিণ এবং বামেদের  (‌বিশেষত এমএসটির)‌ সঙ্গে। এই সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে ব্রাজিলের জন্য যে প্রকল্পটি সামনে চলে এল তাহল, জেল থেকে লুলাকে ছাড়িয়ে আনতে হবে (‌লুলা লিভরে!‌)‌। ১৯২১ সালের এপ্রিলে আদালতের আদেশে লুলা মুক্তি পেলেন এবং তাঁর মুক্তির জন্য প্রচারই শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচারে। যখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেল যে নির্বাচনে তিনি জিতে গেছেন, তখন সাও পাওলোয় লুলা একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি তাঁর প্রকল্পটিকে স্পষ্ট করে তুলেছিলেন :‌‘‌ব্রাজিলের মানুষ ভালভাবে বাঁচতে চান’‌। এর মানে তাঁরা চান ভাল কাজের সুযোগ এবং উন্নত মানের সরকারি পরিষেবা। তবে অন্য যে কোনও জিনিসের তুলনায় ‘‌ব্রাজিলের মানুষ’‌ সবচেয়ে ‘‌বেশি চান তাঁদের হারিয়ে যাওয়া আশা ফিরে পেতে, যার মানে আমি বুঝি তাঁরা চান গণতন্ত্র যা শুধু সুন্দর শব্দ হিসাব আইনের বইতে লেখা থাকবে না, বরং সেটা হবে ধরতে–ছুঁতে পারার মতো একটি বিষয় যা প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে তোলা যায়।’‌ তিনি বললেন এটাই হল ‘‌সত্যিকারের, নির্দিষ্ট অথবা মূর্ত গণতন্ত্র’‌ যা অন্ততপক্ষে, ক্ষুধা ও দারিদ্র দূর করবে।

ন্যাশনাল কংগ্রেসে নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সেনট্রাও এবং বোলসোনারোপন্থীদের। এর ফলে লুলার প্রকল্প বাধার সামনে পড়বে। লুলা যা করতে চান তার অনেক কিছুই আটকে দেওয়ার জন্য সেনট্রাও এবং বোলসোনারোপন্থীরা তাদের প্রভাব খাটাবে। লুলা চান ক্ষুধা দূরীকরণ এবং ১.৬ বিলিয়ন একরের অ্যামাজন বৃষ্টি অরণ্যকে রক্ষা করার জন্য সরকারি অর্থ কাজে লাগাতে। এতেও তারা বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে লুলা জয়ী হয়েছেন কারণ বামেদের রাজনৈতিক সংগঠনগুলি লক্ষ লক্ষ মানুষকে রাস্তায় নামিয়েছে, সেই মানুষেরা একথা বুঝিয়ে দিয়েছেন যে লুলাকে ফিরিয়ে আনাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং লুলা যে অ্যাজেন্ডাগুলি সামনে নিয়ে আসছেন সেগুলির ওপর তাঁদের বিশ্বাস রয়েছে। লুলার জয়ের পর যে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে তাতে একটা বিপদও লুকিয়ে রয়েছে। দক্ষিণপন্থী রাজননৈতিক শক্তিগুলি এটা নজরে রাখবে যাতে লক্ষ লক্ষ এই সব মানুষেরা ধীরে ধীরে ছত্রভঙ্গ হয়ে ফিরে যায় এবং বোলসোনারো ও দক্ষিণপন্থীদের রাজনৈতিক ছলাকলার বিরুদ্ধে লুলার যে অ্যাজেন্ডা রয়েছে সেগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কোনও স্থায়ী ব্যূহ যাতে গড়ে না ওঠে। অক্টোবর মাসে প্রচারের সময় লুলা মধ্যপন্থী–দক্ষিণ–দের একটা বড় অংশকে টেনে আনতে পেরেছিলেন (‌এদের মধ্যে ছিলেন রাষ্ট্রপতি পদে প্রাক্তন প্রার্থী ব্রাজিলিয়ান ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট–এর সিমোনে টেবেট ও প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ফার্নান্দো হেনরিকে কারডোসোকে। ইনি ব্রাজিলিয়ান সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা)‌। লুলার জন্য কারডোসো একটা ভিডিও প্রচার করেছিলেন যেখানে তিনি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন ‘‌গণতন্ত্র ও শালীনতা ফেরানোর সংগ্রামের ইতিহাস’‌–কে এবং জানিয়েছিলেন এটাই স্বৈরতন্ত্র–পরবর্তী পর্বের বৈশিষ্ট্য। পরবর্তী পর্বে জাতীয় কংগ্রেসে লুলার অ্যাজেন্ডাগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে মধ্যপন্থী দক্ষিণ–দের এই ভূমিকা, যার মধ্যে পড়েন লুলার সঙ্গী জেরালডো অ্যালকমিন— খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

নির্বাচনে জয়ের পর তাঁর ভাষণে লুলা আশা জাগিয়ে বলেছেন, ‘‌এই বিশ্বে দুটো ব্রাজিলের অস্তিত্ব নেই। আমরা একটাই দেশ, একই জনগণ, একটা মহান জাতি। যে পরিবারে ঝগড়াঝাঁটি রয়েছে সেখানে কেউ থাকতে চায় না। সময় এসেছে যখন পরিবারগুলোকে এক জায়গায় আনতে হবে, ঘৃণার অপরাধমূলক প্রচারকে কাজে লাগিয়ে সম্পর্কে ‌যে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে, সেই সম্পর্ককে ফের জুড়তে হবে। দ্বিধাবিভক্ত দেশে কেউই থাকতে পছন্দ করেন না।’‌ যাঁকে একটা দ্বিধাবিভক্ত দেশ শাসন করতে হবে এগুলো স্রেফ তাঁর কথার কথা, নাকি তা একজন রাজনৈতিক নেতার আশাবাদ যিনি দক্ষিণপন্থীদের ঘন কালো মেঘের পর্দা ছিন্ন করে টিকে থাকতে পারবেন— সেটাই এখন দেখার।

লুলার আন্তর্জাতিকতাবাদ

ব্রাজিলের বিদেশ মন্ত্রক পরিচিত ইটমারাটি নামে। কারণ ওই নামের একটি বাড়িতেই রয়েছে বিদেশ মন্ত্রক। মন্ত্রকের পদস্থ এক আধিকারিক আমাকে বলেছেন যে দপ্তরের ৮০ শতাংশ কর্মী নির্বাচনে লুলার জয়ই চেয়েছিলেন। বোলসোনারোর অপরিচিত রাজনীতি রীতিমতো এলোমেলো করে দিয়েছিল বিদেশ দপ্তরের পেশাদার অফিসারদের। রাষ্ট্রসঙ্ঘ একটা ‘‌অকাজের সংগঠন’‌, ওখান ‘জড়ো হয়েছে কমিউনিস্টরা’— বোলসোনারের এমন মন্তব্য তাঁদের হতভম্ব করে দিয়েছিল। বোলসোনারো ও তাঁর বিদেশমন্ত্রী আর্নেস্তো আরাউজো যে সব শব্দবন্ধ ব্যবহার করতেন তার বেশির ভাগটাই মনে হত যেন লিখে দিয়েছেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরামর্শদাতা স্টিভ ব্যানন। আরাউজো বলেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ‘‌একটা মার্কসবাদী ষড়যন্ত্র’‌। আরাউজো একথাও বলেছিলেন যে, ‘‌কালাচারাল মার্কসবাদীদের’ হাত থেকে ‘‌ইহুদিপন্থী–খ্রিস্টান সভ্যতা’কে রক্ষা করবেন বোলসোনারো। বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বোলসোনারোর ভুলভাল মন্তব্য এবং ব্রাজিলের বহুদিনের চুক্তিগুলিকে কোনওরকম গুরুত্ব না দেওয়ায় ইটামারাটিতে রীতিমতো ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। ফলে বিশ্ব সংক্রান্ত ইস্যুগুলির নেতৃত্বে লুলাই ফিরুন, এটা চাইছিলেন বিদেশ দপ্তরের অফিসারেরা।

বস্তুত , ন্যাশনাল কংগ্রেস দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর শক্ত মুঠিতে থাকার কারণে, লুলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাজেন্ডা হতে পারে তাঁর আন্তর্জাতিকতাবাদ। লুলা ইতিমধ্যেই বলেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সংঘাত বাড়ানোর পক্ষে নন তিনি (‌নতুন ঠাণ্ডা যুদ্ধ)‌। বরং কূটনৈতিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে রাশিয়া ও পশ্চিমের মধ্যে তিনি শান্তি ফেরাতে চান। একথা এখন সবাই ভুলে গেছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনার একটা অ্যাজেন্ডা তৈরি করতে সহায়তা করেছিলেন লুলা। তবে পরে তা খারিজ করে দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। পশ্চিমী শক্তি এবং প্রধান দুটি ইউরেশিয়ান রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়ার মধ্যে সংঘাত যাতে আরও না বাড়ে তা কার্যকর করতে বিশ্বমঞ্চে এবার সেই একই প্রতিভাকে সামনে দেখা যাবে। রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিলের ২ বছর মেয়াদি আসনও (‌যে মেয়াদ শেষ হবে ২০২৩ সালের শেষে)‌ লুলার পক্ষে একটা কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠবে।

ব্রাজিলের আর কোনও রাষ্ট্রপতিই লুলার মতো এত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নন। ব্রাজিলের আর কোনও রাষ্ট্রপতিই বিদেশে এত সম্মান পাননি। কারণ আন্তার্জাতিকতাবাদী হিসাবে তাঁর ভূমিকা যে কত গুরুত্বপূর্ণ সেটা পরিস্ফুট হয়েছিল লুলা রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন পর্বে। ২০০৩ থেকে ২০০৯ —  এই সাত বছরে  (‌ব্রাজিল–রাশিয়া–ভারত–চীন–দক্ষিণ আফ্রিকা)‌–কে নিয়ে ব্রিকস গোষ্ঠী গড়ে তোলা লুলার নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছিল।  ২০০৮ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে তিনি কমিউনিটি অফ লাতিন আমেরিকান অ্যান্ড ক্যারিবিয়ান স্টেটস (‌সিইএলএসি)‌ গোষ্ঠী গড়ে তোলাতেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। লুলা বলেছেন, এই দুটি মঞ্চেই তিনি নতুন শক্তি সঞ্চারিত করবেন এবং নেতৃত্ব দেবেন যাতে এই দুই মঞ্চকে একটা সোশাল ডেমেক্রেটিক প্রকল্পের দিশায় পরিচালিত করা যায়। যুদ্ধের বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করে এবং জনগণের প্রকৃত ও নির্দিষ্ট মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী এমন একটা দুনিয়া গড়ে তোলার কাজে এই দুই মঞ্চকে প্রয়াসী করে তুলতে চান তিনি। এটা খুবই স্পষ্ট যে ব্রিকস এবং সিইএলএসি — এই দুই মঞ্চকেই লুলা কাজে লাগানোর চেষ্টা করবেন যাতে একটা বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় (‌ইউরেশিয়ার সংহতিকে আটকাতে যে ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে পশ্চিমী চাপে)‌।  লাতিন আমেরিকায় আঞ্চলিকতাবাদের প্রসার ঘটাতেও এই দুই মঞ্চকে কাজে লাগাতে চান তিনি।

২০২৩ সালে যখন লুলা ব্রাজিলের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেবেন, তখন গোটা বিশ্ব মনরো নীতির ২০০ তম বার্ষিকী পালন করবে। ১৮২৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার বলেছিল যে সমগ্র আমেরিকা মহাদেশ (‌দ্য আমেরিকাজ)‌ থাকবে ওয়াশিংটনের ছত্রছায়ায়। এটা এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গী ১৯৯১ সালের পর গোটা বিশ্বকে তার আওতায় আনার চেষ্টা হয়েছে। বিশ্বগ্রাসী এই মনরো নীতিতে রীতিমতো ক্ষুব্ধ বহু দেশ। কারণ এই নীতি শান্তি প্রতিষ্ঠার বদলে সংঘাতকে গভীরতর করার বিপদ বাড়িয়ে দেয়। বিশ্বায়িত এই মনরো নীতির বিরুদ্ধে লুলার নেতৃত্ব এই বিষয়টিকেই সামনে নিয়ে আসে যে, ব্রাজিলের নির্বাচনে লুলার জয় যেমন ব্রাজিলের লোকেদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সমান গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বের জনগণের জন্যও।

ভাষান্তর: সুচিক্কণ দাস


প্রকাশের তারিখ: ০৩-নভেম্বর-২০২২
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

খুব ভালো লাগলো লেখাটে পড়ে ৷
- KOUSHIK SEN, ০৩-নভেম্বর-২০২২


খুবই সুন্দর একটি লেখা। কিন্তু একথা মনে রাখা দরকার যে যে দ্বিতীয় পর্বের ভোটে যখন লুলার সঙ্গে বোলসোনানোর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে তখন উভয়ের মধ্যে ৬০ লক্ষের ব্যবধান কমে দঁড়িয়েছে ২০ লক্ষে। অর্থাৎ প্রতিক্রিয়ার শক্তি ৪০ লক্ষ ভোটবাড়িয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। এটা বিপদের কথা। - (সম্পাদিত)
- nandan ray, ০৩-নভেম্বর-২০২২


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সমসাময়িক বিভাগে প্রকাশিত ২৪৯ টি নিবন্ধ
২৯-মার্চ-২০২৬

২২-মার্চ-২০২৬

১৯-মার্চ-২০২৬

১৩-মার্চ-২০২৬

০৪-মার্চ-২০২৬

২৪-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২০-ফেব্রুয়ারি-২০২৬