Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

বার বার সুকান্ত

অমিতাভ দাশগুপ্ত
১৯৪৯ সালে বে-আইনি কমিউনিস্ট পার্টির নিষিদ্ধ ইশতেহার বিলি করতে গিয়ে, খাদ্য আন্দোলনের শহীদের ভেজা শব্দ নিয়ে মিছিলে হেঁটে ব্যর্থ ক্ষোভে উদাসীন কলকাতার পাথর-বাঁধানো পথে মুখ থুবড়ে ফেটে যেত যে জ্বালা। সেই আগুনের দিনগুলিতে রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে পলাতক। পথে-গঞ্জে ক্রোধে-বিপ্লবে শামিল ছিলেন সুকান্ত। তাঁর প্রত্যাশার সঙ্গে রক্তে-মাংসে জড়িয়ে যেন আমাদের তাজা প্রাণের অমোঘ বিশ্বাস
Sukanta again and again

আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ— সুকান্ত লিখলেন । তারপর আর তিন বছর তিনি বেঁচে ছিলেন। না, আমি কোনও নাটকীয়তা করতে চাইছি না। হয়ত অনিবার্যভাবেই তিনি মারা গেছেন। তবে আমাদের কাছে এই দুঃসহতা এবং মৃত্যু একটি সমান্তরাল রেখার ছুটে আসে। অল্প বয়স থেকে খুব চড়া তারে নিজেকে বেঁধে নিলে আঙুলের একটু এধার-ওধার হয়ে সমস্ত যন্ত্রটা ভেঙে দুমড়ে যায় শুনেছি, সুকান্তর কবিতা লেখা ও কবিতা পাঠ করা সবটাই একটা প্রচণ্ড আবেগতাড়িত ঝড়ের ব্যাপার ছিল। সে-ঝড় শিরা-ধমনী, রক্ত-মাংসের শরীরে ধরে রাখতে পারে না। সুকান্ত পারেননি। 

কলকাতার শহরতলিতে একটি কারখানা। হাজার তিনেক শ্রমিক কাজ করেন। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে অসংখ্য অভিযোগ তাঁদের। লাগাতার ধর্মঘট হয়। ঘেরাও। বিক্ষোভ ফেটে পড়ে। মালিক উত্তর দেয় কারখানা বন্ধ করে দিয়ে। বছর ঘুরে যায়। অর্ধাশন, অনশন মাথায় নিয়ে দাঁতে দাঁত দিয়ে বাহাদুর শ্রমিকরা লড়ে যেতে থাকেন। অবশেষে আবার কারখানার গেট খোলে। ইউনিয়ন জনসভা ডেকেছিলেন বিকেলে। নিশানে নিশানে চোখের ভোজ একেবারে । ক্লাস টেন-এর বেশি পড়তে পারেনি আহসান। বটুলিং-এর কাজ করে৷ ঝরনার মতো চকচকে মুখ, রোগা চটপটে শরীর, লাফ দিয়ে মাইক ধরে দাড়ায়৷ ছোকরা আবার কী বলবে— অস্ফুট গুঞ্জরণ, চাপা বিরক্তি পোড় খাওয়া টোল- খাওয়া শ্রমিকদের চোখে মুখে। তারা ইউনিয়নের নেতাদের কাছ থেকে কাজের কথা শুনতে চায়। ততক্ষণ আহসানের কাঁপা তীক্ষ্ণ গলায় শুরু হয়ে গেছে— 

‘কোথাও নেই কো পার 
মারী ও মড়ক, মন্বন্তর, ঘন ঘন বন্যায় 
আঘাতে আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন ভাঙা নৌকোর পাল, 
এখানে চরম দুঃখ কেটেছে সর্বনাশের খাল।’ 

পদ্য পড়ছে আহসান। তা হোক— রুক্ষ তামাটে চুলগুলিকে পেছনের দিকে ঠেলে দিতে যেয়ে পাঁজরের খুব নিচু থেকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে প্রসেসিং ডিপার্টমেন্টের ঝানু কারিগর রামবিলাসের। লক্-আউটের তেষট্টি দিনে তার উনিশ বছরের জোয়ান ছেলে প্রায় বিনা পথ্যি বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। প্রথমদিকের দিশেহারা গলা ক্রমশ আশ্বস্ত, সংহত হয়ে আসতে থাকে। উঁচু গ্রামের পর্দা ছুঁয়ে যায়। 

‘তুমি তো প্রহর গোনো, তারা মুদ্রা গনে কোটি কোটি,
…শূন্য মাঠে কঙ্কাল-করোটি। 
তোমাকে বিদ্রূপ করে, হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকে— 
কুজ্ঝটি তোমার চোখে, তুমি ঘুরে ফেরো দুর্বিপাকে 

ঝড়ের গভীরে কেন্দ্র। হাজার চোখের একাগ্র লক্ষ হয়ে উঠতে থাকে মুখচোরা, মিছিলের শেষ সারির অতি নগণ্য আহসান। শরীরের মূর্তি ভেঙে ফেলে আজান বা উদাত্ত মন্ত্রোচ্চারণের মতো আয়তনবান চারপাশে অসংখ্য বুকে চারিয়ে যেতে থাকে একদম আঁত থেকে উঠে আসা শব্দগুলি— 

‘তোমার ফসল, তোমার মাটি 
তাদের জীয়ন ও মরণ-কাঠি      
তোমার চেতনা চালিত হাতে।
এখনও কাঁপবে আশঙ্কাতে?
স্বদেশ-প্রেমের ব্যঙ্গমা পাখি 
মারণ-মন্ত্র বলে, শোনো তা কি? 
এখনও কি তুমি আমি স্বতন্ত্র?’ 

একটি কবিতাতেই যেন মুশেয়ারা বসে গেছে। ঈষভিন্ন ঠোঁট, শ্রবণ উৎকর্ণ করে শুনছে জনমানুষ যেন একটা শব্দ পেরিয়ে না-যায়। এরপর বক্তৃতা হবে— হতে পারে। বোধহয় কোনও দরকার থাকে না তার। ফেরার পথে কারখানা হলুদ-রঙা চওড়া পাঁচিলের কাঠ-কয়লায় ফুটিয়ে তোলা দুটি আঁকা-বাঁকা লাইনের সামনে দাঁড়াই। বিকেলেই লেখা হয়েছে— 

‘রক্তে আনো লাল, 
রাত্রির গভীর বৃত্ত থেকে 
ছিঁড়ে আনো ফুটন্ত সকাল।’ 

রুটির থেকে আরেকটু বেশি। শিল্প। ঘরে ফেরা মানুষদের অসংখ্য চোখে সুকান্তর অবয়বহীন ছবি। মধ্যবিত্ত, সংশয়বাদী রক্ত বিশ্বাস করতে চায় না, এভাবে তিনি আছেন।

সুকান্ত তিন ভাবে আমার কাছে এসেছেন। প্রথমে আমাদের বিচারবিহীন অভিভূত হওয়ার বয়সে। মনে পড়ে এক জায়গায় প্রায় এহেন লিখেছিলাম। ... আমাদের কৈশোর বলে কিছু ছিল না সেদিন। গ্রাম-শহরে যুদ্ধের দিনগুলোয় মাঝরাত থেকে কেরোসিন তেল, চাল আর কাপড়ের জন্য শ্রান্তিহীন লাইন দিতে হয়। আমার যৌবন কাটে খাদ্যের সারিতে, প্রতীক্ষার। মোটা, রুলটানা লাল কাগজে খুদে খুদে করে রুগণের মতো জায়গা বাঁচিয়ে লিখতে হত। পিঠে পিঠ দিয়ে এভাবেই একটানা রেলের বগির মতো আসে যুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, আগস্ট বিপ্লব, ১৬ আগস্টের দাঙ্গা, দেশবিভাগ। এই বার বার বিপর্যয়ে আমাদের কৈশোর— প্রথম তারুণ্য অস্বীকৃত অভিশপ্ত। 

বঞ্চিত শরীর-মন জুড়ে তাই কেবল মার খাওয়ার জালা ছড়িয়ে ছিল। ১৯৪৯ সালে বে-আইনি কমিউনিস্ট পার্টির নিষিদ্ধ ইশতেহার বিলি করতে গিয়ে, খাদ্য আন্দোলনের শহীদের ভেজা শব্দ নিয়ে মিছিলে হেঁটে ব্যর্থ ক্ষোভে উদাসীন কলকাতার পাথর-বাঁধানো পথে মুখ থুবড়ে ফেটে যেত যে জ্বালা। সেই আগুনের দিনগুলিতে রবীন্দ্রনাথ আমাদের কাছে পলাতক। পথে-গঞ্জে ক্রোধে-বিপ্লবে শামিল ছিলেন সুকান্ত। তাঁর প্রত্যাশার সঙ্গে রক্তে-মাংসে জড়িয়ে যেন আমাদের তাজা প্রাণের অমোঘ বিশ্বাস—  

ভারতবর্ষ! কার প্রতীক্ষা করো, 
কান পেড়ে কার শুনছো পদধ্বনি
বিদ্রোহে হবে পাথরেরা থরোথরো 
কবে দেখা দেবে লক্ষ প্রাণের খনি?’

আমাদের প্রথম বয়স ও প্রথম পর্যায়ের সুকান্ত-পরিচয় এভাবেই শুরু ও শেষ হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে সুকান্ত যেন কবিই রইলেন না আমাদের কাছে। এমনকি, খুবই লজ্জিত হয়ে পড়তাম ভেবে যে এককালে এমন অ-কবির লেখা নিয়ে মূর্খের মতো প্রবল নাচানাচি করেছি। মেধা, বোধ, বিবেচনা ইত্যাদি বড়ো বড়ো শব্দগুলি তখন অভিধান ছেড়ে আমাদের মাথায় নেমে এসেছে। অনেকেই মনে করছেন সাহিত্য-বিষয়ে সাম্যবাদী এমন-কি মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও একপেশে। বেকারি ও দারিদ্র্যের সঙ্গমে জন্মানো যেন-তেন প্রকারণে রুটি রুজি ও কিছুটা সাহিত্যিক খ্যাতি অর্জনের জন্য দ্বি-মুখী জীবনযাপন ও সুবিধাবাদের পায়ে দাস্যবৃত্তি এ-সময় আমাদের চরিত্রে তাদের শিকড় চালিয়ে দিয়েছে। পিওর পোয়েট্রি বা পরিশুদ্ধ কবিতা। ঈশ্বর, নির্জনতা, নিঃসঙ্গ হলুদ বাড়ি, কামদা যুবতী, পুরাণ ইতিহাস, সুকুমার শিল্প, কারিগরির মিহি কাজ— এসব জিনিস নিয়ে খুব মাখামাখি করছি সবাই। ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই সুকান্ত তখন আমাদের সবার কাছে একেবারে অবসোলিট হয়ে গিয়েছিলেন। এখনও। এই সত্তরের অগ্নিগর্ভ বাঙলাদেশের বিস্ফোরণের মুহূর্তে, আমাদের অনেক মাতব্বর শিল্পী সাহিত্যিকদের কাছে সুকান্ত, কি স্লোগানের চেয়ে বেশি? 

আজ চারপাশের থমথমে, আগুনপারা বাঙলায় আমাদের যাবতীয় ভণ্ডামি, অসততা ও চাতুর্যের ওপর ক্রোধ ও ধিক্কারের বারুদ জমছে। এখন কেবল পলতের আগুন চলে যাওয়ার অপেক্ষা। ‘৭০ সালের বাঙলা, রাজনীতি, মানুষ, শিল্প সব একদম পালটে যেতে বসেছে। এই নতুন মানচিত্রে সে-ভাবে বাঁচা তো দূরের কথা, টিকে থাকবার জন্য আমাদের ঢের ধর্ম ও অশ্রুপাত করতে হবে। বাঙলার হাজার হাজার লড়াকু কিষাণদের ঘরের একটি ছেলেও আমাদের কবিতা পড়েনি। কুলি ধাওড়ায়, শ্রমিকদের মহল্লায় মহল্লায় সারিতে সারিতে একটি বারের জন্য আমাদের কবিতা প্রতিবেশীর মতো জীবনে, হরতালে লড়াই-এ অনিবার্য বা ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেনি। শহরের বুদ্ধিদীপ্ত, সংগ্রামী, তরুণরা ভুলক্রমেও আমাদের কবিতার অন্তর একটি পঙক্তি নিয়ে পোস্টার তৈরি করে না। আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থ, অসহায়, মূর্খ শবদেহের ওপর দিয়ে সুকান্ত আবার, রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে আসছেন। সুকান্তের ‘'চিল’-এর মতোই তীব্র লোভ আর ছোঁ মারার দস্যু প্রকৃতির পরম ব্যর্থতার শেষে আমরা সময়ের নিষ্ঠুর ফুটপাথে নালা-নর্দমায় মুখ গুঁজে পড়ে আছি। 

সূত্র- সুকান্ত স্মৃতি, সুজিতকুমার নাগ (সম্পাদিত) 


প্রকাশের তারিখ: ০৯-আগস্ট-২০২৫
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
সংস্কৃতি বিভাগে প্রকাশিত ৮৩ টি নিবন্ধ
০৯-মে-২০২৬

০৯-মে-২০২৬

২১-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৭-জানুয়ারি-২০২৬

০১-জানুয়ারি-২০২৬

১৫-নভেম্বর-২০২৫

১১-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৪-নভেম্বর-২০২৫

০৩-নভেম্বর-২০২৫